আখলাকুন্নবী (ﷺ)

কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ

হাদীস নং: ৮৩০
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
নবী (ﷺ) পার্থিব বস্তুর প্রতি অনাসক্ত, ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে নিজের তুলনায় অপরকে প্রাধান্য দিতেন, দুর্বলদের মাঝে সম্পদ বণ্টন করে দিতেন। দানশীলতা আর অল্পে তুষ্ট থাকা ছিলো তাঁর স্বভাবজাত গুণ। তিনি পার্থিব বস্তুর চাইতে পরকালীন বিষয়কে অধিক ভালবাসতেন। এ ছাড়া তিনি কোন যাঞ্চাকারীকে কখনোই খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না, কোন আবেদনকারীকেই নিষেধ করতেন না। আল্লাহ্ তাঁর উপর, তাঁর বংশধরদের উপর ও তাঁর মহীয়সী স্ত্রীদের উপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।
৮৩০। হযরত আনাস ইব্‌ন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি যবের রুটি ও গন্ধযুক্ত চর্বি নিয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে হাযির হলাম। তখন তাঁর বর্মটি যবের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হয়েছিলো। আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, মুহাম্মাদ-এর পরিবার এমন কোনো সকাল-সন্ধ্যা অতিবাহিত করেনি যেখানে এক সা' পরিমাণের চাইতে অধিক খাদ্যদ্রব্য গৃহে বিদ্যমান ছিলো। এ সময়ে তাঁর নয়টি ঘর ছিল অর্থাৎ নয়জন স্ত্রীর সংসার ছিল।
أبواب الكتاب
بَابٌ: ذِكْرُ زُهْدِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَإِيثَارِهِ الْأَمْوَالَ عَلَى نَفْسِهِ، وَتَفْرِيقِهَا عَلَى الْمُخْفِينِ مِنْ أَصْحَابِهِ إِذِ الْكَرَمُ طَبْعُهُ، وَالْبُلْغَةُ مِنْ شَأْنِهِ، وَالْقَنَاعَةُ سَجِيَّتُهُ، وَاخْتِيَارِهِ الْبَاقِي عَلَى الْفَانِي، وَأَنَّهُ مِنْ عَادَتِهِ أَلَا يَرُدَّ سَائِلًا، وَلَا يَمْنَعَ طَالِبًا، صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ.
830 - حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ عَلِيٍّ الْخُزَاعِيُّ، نَا مُسْلِمُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، نَا هِشَامٌ الدَّسْتُوَائِيُّ، نَا قَتَادَةُ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: مَشَيْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِخُبْزِ شَعِيرٍ وإَهَالَةٍ سَنِخَةٍ، وَلَقَدْ رَهَنَ دِرْعَهُ بِشَعِيرٍ، وَلَقَدْ سَمِعْتُهُ يَقُولُ: مَا أَصْبَحَ لِآلِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا صَاعٍ، وَلَا أَمْسَى، وَإِنَّهُنَّ يَوْمَئِذٍ تِسْعَةُ أَبْيَاتٍ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারের অবস্থা। মহান আল্লাহ্ তাঁকে সর্বশেষ নবী করে পাঠান। এ দুনিয়া যতদিন থাকবে ততদিনের জন্য তিনি নবী। সারা বিশ্বের ধনভাণ্ডারের চাবি তাঁকে দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি পার্থিব জীবনের ধ্বংসশীলতার প্রতি লক্ষ্য রেখে পরকালীন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে দুনিয়ার প্রাচুর্যের উপর প্রাধান্য দিয়েছিলেন। সুতরাং তাঁর পরিবারের কাছে কখনোই সকাল-সন্ধ্যার জন্যে এক সা' ওজনের চাইতে বেশি সম্পদ জমা থাকেনি। অথচ তখন তাঁর নয়জন স্ত্রীর নয়টি বিশিষ্ট পরিবার ছিল। যদিও বা কখনো অতিরিক্ত কোন জিনিস থাকতো, তিনি তা গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন।

২. হযরত আনাস রাযি. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিজ থেকে যবের রুটি ও বাসি চর্বি নিয়ে এসেছিলেন। অর্থাৎ এমন চর্বি, যা জ্বালানোর পর অনেক দিন গত হওয়ার কারণে ঘ্রাণ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। এই বাসি চর্বি দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুটি খেয়েছিলেন। এর দ্বারা খাওয়া-দাওয়ায় যে তিনি কতটা সাদামাটা ছিলেন সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আরাম-আয়েশের প্রতি চাহিদা না থাকায় যে-কোনওভাবে প্রয়োজন পূরণেই তিনি সন্তুষ্ট থাকতেন। ব্যস ক্ষুধা নিবারণের জন্য একটা কিছু খাবার হলেই হল। তা সুস্বাদু না বিস্বাদ, এর প্রতি লক্ষ ছিলনা। তবে হাঁ, মুখ দুর্গন্ধ হয়ে যায় এমন খাবার তিনি কিছুতেই খেতেন না, যেহেতু তাতে ফিরিশতারা কষ্ট পায়।

হযরত আনাস রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি- (মুহাম্মাদের পরিবারে সকালে এক সা' গমও থাকত না)। অপর এক বর্ণনায় আছে, এক সা' গমও না এবং অন্য কোনও খাদ্যশস্যও না। অর্থাৎ না যব, না খেজুর, না অন্য কিছু। তাঁদের সারা দিনের খাবারের পরিমাণ থাকত এরচেও কম। তাও যদি পরিবারের লোকসংখ্যা অল্প হতো, তবে সে অল্প খাবার দিয়েই চালিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু লোকসংখ্যা তো ছিল অনেক। হযরত আনাস রাযি. বলেন-
(অথচ তাঁরা ছিলেন ৯ ঘর)। অর্থাৎ ৯ স্ত্রীর ৯ ঘর। স্ত্রীগণ হলেন-
১. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.।
২. হযরত সাওদা বিনতে যাম'আ রাযি.।
৩. হযরত হাফসা বিনতে উমর রাযি.।
৪. হযরত উম্মু সালামা রাযি.।
৫. হযরত সাফিয়্যা রাযি.।
৬. হযরত যায়নাব বিনতে জাহশ রাযি.।
৭. হযরত জুওয়ায়রিয়া বিনতুল হারিছ রাযি.।
৮. হযরত উম্মু হাবীবা বিনতে আবী সুফয়ান রাযি. ও
৯. হযরত মায়মুনা রাযি.।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতকালে তাঁরা সকলেই জীবিত ছিলেন। তাঁদের কারও ছেলে-মেয়ে না থাকলেও মেহমান তো থাকতই। এ অবস্থায় এক সা' এরও কম খাদ্যশস্যে তাদের কী হতো? কিন্তু এ নিয়ে তাঁদের অভিযোগ ছিল এমন কোনও প্রমাণ নেই। তারা খুশিমনেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এহেন অভাব-অনটনের ভেতর দিয়ে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন।
প্রকাশ থাকে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বমোট স্ত্রী ছিলেন ১১ জন। তাদের মধ্যে দু'জন তাঁর জীবনকালেই ইন্তিকাল করেছিলেন। প্রথমজন উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রাযি., আর দ্বিতীয়জন হযরত যায়নাব বিনতে খুযায়মা রাযি.।

বলাবাহুল্য, এ খাদ্যাভাব ছিল এ মহান পরিবারবর্গের স্বেচ্ছা অবলম্বনকৃত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাইলে তাঁদেরকে বিলাসিতার মধ্যেই রাখতে পারতেন। কিন্তু না তিনি নিজে তা পসন্দ করেছেন, না তাঁরাও সেরকম জীবন কামনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে যখন ইসলামের দিগ্বিজয় হয়, তখন প্রচুর অর্থ-সম্পদ উম্মাতের হাতে আসে। উম্মাহাতুল মুমিনীনের ঘরে ঘরেও সে প্রাচুর্য পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁরা তা দিয়ে আরাম-আয়েশ করার পরিবর্তে আল্লাহর পথে খরচ করতেই বেশি ভালোবাসতেন। জীবনভর তাই করে গেছেন।

সা (صاع) সে কালের একটি পরিমাপ। বৃটিশ পদ্ধতি অনুযায়ী এক সা' = ২৭৩ তোলা। মেট্রিক পদ্ধতি অনুযায়ী এক সা' = ২,১৮৪২৭২ কিলোগ্রাম। আধা সা' = ১৩৬.৫ তোলা = ১.৫৯২১৩৬ কিলোগ্রাম।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. এ হাদীছ দ্বারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারবর্গের অসামান্য বিনয়, অল্পেতুষ্টি ও ধৈর্য-সহনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদেরও এসব গুণ আত্মস্থ করা উচিত।

খ. এর দ্বারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহা দানশীলতা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। আল্লাহর পথে দু'হাতে ব্যয় বিতরণ করতে না থাকলে তাঁর এমন খাদ্যাভাব দেখার কথা নয় যে, সেজন্য বর্ম বন্ধক রেখে খাদ্য সংগ্রহ করতে হবে।
২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান