ফিকহুস সুনান ওয়াল আসার

১৩. রাষ্ট্র ও প্রশাসন

হাদীস নং: ১৯৫৯
রাষ্ট্র ও প্রশাসন
অল্প মানুষ হলেও সফরে বা স্বদেশে সর্বদা আমীর নিয়োগ করতে হবে
(১৯৫৯) আবু সায়ীদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যদি তিনব্যক্তি কোনো সফরে বের হয়, তবে তারা তাদের একজনকে আমীর নিযুক্ত করবে।
كتاب الخلافة و الإمارة
عن أبي سعيد الخدري رضي الله عنه مرفوعا: إذا خرج ثلاثة في سفر فليؤمروا أحدهم

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

(আবু দাউদ। সনদের বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য। অনুরূপ অর্থে একটি হাদীস বাযযার সহীহ সনদে উমার রা. থেকে সঙ্কলন করেছেন। তিনি ইবন উমার রা. থেকেও অনুরূপ অর্থে আরেকটি হাদীস সহীহ সনদে সঙ্কলন করেছেন। তাবারানি ইবন মাসউদ রা. থেকে অনুরূপ অর্থে একটি হাদীস সহীহ সনদে সঙ্কলন করেছেন)। [সুনান আবু দাউদ, হাদীস-২৬০৮; তাবারানি, আল মু'জামুল আওসাত, হাদীস-৮০৯৩]

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আমাদের দীনে ঐক্য ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হয় সকলের উপর একজন আমীর থাকা ও তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার দ্বারা। তাই ইসলাম তার অনুসারীদের সামষ্টিক শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য যেমন একজন সর্বজনীন আমীর মনোনীত করাকে জরুরি সাব্যস্ত করেছে, তেমনি তার অনুসারীদের যে-কোনও ছোট-বড় দলের জন্য আমীর বানানোর প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে, তা দীনী-দুনিয়াবী সকল কাজের বেলায়ই। যেমন নামাযের জন্য ইমাম ও জিহাদের জন্য আমীর বা সেনাপতি। সে ধারাতেই সফরের ক্ষেত্রে হুকুম করা হয়েছে যে, যদি একাধিক ব্যক্তি মিলে সফর করা হয়, তবে তাদের একজনকে যেন আমীর বানিয়ে নেওয়া হয়, যেমনটা আলোচ্য হাদীছে বলা হয়েছে।

মুসাফিরদলের জন্য একজনের আমীর হওয়া এ কারণে জরুরি যে, সফরে দীনী-দুনিয়াবী বিভিন্ন কাজ থাকে। সেসব কাজে একেকজনের একেক মত থাকতে পারে। যদি আমীর না থাকে, তবে প্রত্যেকে আপন মতকে প্রাধান্য দিতে চাইবে। সে ক্ষেত্রে ঝগড়া-ফাসাদ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। যেমন সফরে যাত্রা কখন শুরু করা হবে, যাতায়াত কীভাবে করা হবে, খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা কী হবে, কোথায় রাত্রিযাপন করা হবে, কোন নামায কোথায় পড়া হবে ইত্যাদি বিষয়গুলোতে সাধারণত সফরসঙ্গীদের একেকজনের একেক মত হয়ে থাকে। এ অবস্থায় কোনও একজন সিদ্ধান্তদাতা যদি না থাকে, তবে স্বাভাবিকভাবেই বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। এতে করে সফরের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর থেকে বাঁচা কেবল তখনই সম্ভব, যখন সকলে মিলে একজনকে আমীর বানিয়ে নেবে এবং সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকলে তার কথামতো চলবে।

কাউকে আমীর বানানোর পর সকলের জন্য তার কথা মানা ও তার অনুগত হয়ে চলা একান্ত জরুরি। আমীর বানানোর উদ্দেশ্যই তার আনুগত্য করার মাধ্যমে সফরকে ফলপ্রসূ করে তোলা, তাতে আমীর যেমনই হোক। অর্থাৎ বয়সে ছোট হোক বা বড়, শিক্ষা-দীক্ষায় সবার উপরে থাকুক বা নাই থাকুক। এমনিভাবে বংশমর্যাদা, গায়ের রং ইত্যাদি কোনওকিছুই বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য কেবল এতটুকুই যে, তার মধ্যে আমীর হওয়ার যোগ্যতা আছে কি না।

প্রকাশ থাকে যে, আমীর হওয়া মানে কর্তৃত্ববাদী হওয়া নয়। ইসলামের শিক্ষা হলো আমীরের মন-মস্তিষ্কে থাকবে সেবার দৃষ্টিভঙ্গি। বর্ণিত আছে-
سَيِّدُ الْقَوْمِ فِي السَّفَرِ خَادِمُهُمْ، فَمَنْ سَبَقَهُمْ بِخِدُمَةٍ لَمْ يَسْبقُوهُ بِعَمَلٍ إِلَّا الشَّهَادَةَ.
সফরে দলের নেতা হবে তাদের সেবক। যে ব্যক্তি সেবা দিয়ে তাদের উপর অগ্রগামী হয়, তাকে তারা শাহাদাত ছাড়া আর কোনও আমল দ্বারা পেছনে ফেলতে পারে না। (বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ৮০৫০)

এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুরু করে সাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের পরবর্তীকালের বুযুর্গানে দীন আমীর হিসেবে সর্বদা সেবকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেবার ক্ষেত্রে দলের অন্যদের তুলনায় আমীরই সর্বদা অগ্রগামী থাকত। তার এ নীতি ও কর্মের কারণে তার অধীন লোকজনও সর্বতোভাবে তার হুকুম মানতেও সচেষ্ট থাকত। বর্তমানকালে অধিকাংশ লোকই এ আদর্শ হারিয়ে ফেলেছে।

কর্তৃত্ববাদী না হওয়ার আরও একটি দিক হলো পরামর্শ করা। কাউকে আমীর বানানো হলে সে যে সফর বিষয়ক সবকিছুই নিজ ইচ্ছামতো করবে, এটা ঠিক নয়। রাষ্ট্রের আমীরের জন্য যেমন পরামর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা জরুরি, তেমনি সফরসহ অন্যান্য বিষয়ের আমীরেরও কর্তব্য পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করা।

পরামর্শের পর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার অবশ্যই তার। কিন্তু তাই বলে পরামর্শ ছাড়া একাকী কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে, এটা কিছুতেই সমীচীন নয়।

সফর সম্পর্কিত কোনও বিষয়ে সঙ্গীদের দ্বারা যদি কোনও ভুল-ত্রুটি হয়ে যায় কিংবা আমীরের হুকুম মানতে গড়িমসি করে, সে ক্ষেত্রে আমীর তাদেরকে শারীরিক বা আর্থিক কোনও শাস্তি দিতে পারবে কি? না, শাস্তি দেওয়ার কোনও অধিকার তার নেই। সে তাদেরকে বোঝাবে, উপদেশ দেবে, বড়জোর তিরস্কার করতে পারবে। শাস্তি দেওয়াটা রাষ্ট্রের বা আইনানুগ কর্তৃপক্ষের কাজ। সফরের আমীর সে অধিকার রাখে না।

উল্লেখ্য, আমীরের হুকুম ততক্ষণই মানা জরুরি, যতক্ষণ তার হুকুম কুরআন-সুন্নাহর পরিপন্থি না হবে। কেননা হুকুম মানার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে মূলনীতি শিক্ষা দিয়েছেন যে-

لا طَاعَةَ لِمَخْلُوقِ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ

'সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতা হয় এমন কাজে কোনও মাখলুকের আনুগত্য নেই।' (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা : ৩৩৭১৭; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক : ৩৭৮৮; মুসনাদে আহমাদ : ৩৮৮৯; মুসনাদুল বাযযার : ১৯৮৮; শারহুস সুন্নাহ : ২৪৫৫; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর : ৩৮১)

সুতরাং সফরকালে দলনেতা যদি এমন কোনও কাজের হুকুম দেয়, যে কাজটি করলে গুনাহ হয়, তবে সে হুকুম কিছুতেই পালন করা যাবে না।

আরও উল্লেখ্য, সঙ্গীদের উপর সফরের আমীরের কর্তৃত্ব কেবল সফর সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কাজেই সঙ্গীদের ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনও অধিকার তার নেই। সে ক্ষেত্রে তারা স্বাধীন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. সফরকালে দলের উপযুক্ত একজনকে আমীর বা দলনেতা বানিয়ে নিতে হবে।

খ. দলনেতা মনোনীত করবে দলের লোকজনই। নিজ আগ্রহে কেউ নিজেকে নেতা বানিয়ে নেবে না।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান