আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

১২- শরীআতে যিনা ব্যভিচারের দন্ড বিধি

হাদীস নং: ৭০৩
- শরীআতে যিনা ব্যভিচারের দন্ড বিধি
যেনার স্বীকারোক্তি।
৭০৩। ইয়াহ্ইয়া ইবনে সাঈদ (রাহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি জানতে পেরেছেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আসলাম গোত্রের হায্যাল নামক এক ব্যক্তিকে বললেনঃ “হে হাযযাল! তুমি যদি এ অপরাধ তোমার চাদরের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে তবে তোমার জন্য ভালোই হতো”। ইয়াহ্ইয়া ইবনে সাঈদ (রাহঃ) বলেন, আমি এক মজলিসে এই হাদীস বর্ণনা করলাম এবং সেখানে ইয়াযীদ ইবনে নুআইম ইবনে হাযযাল উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, হাযযাল আমার দাদা ছিলেন এবং হাদীসটি সহীহ ও প্রমাণিত।
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরা উল্লেখিত হাদীসসমূহের উপর আমল করি । কোন ব্যক্তি কর্তৃক যেনার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই তার উপর হদ্দ ( শাস্তির দণ্ড) কার্যকর করা যাবে না, যতোক্ষণ সে চারটি ভিন্ন ভিন্ন মজলিসে চারবার যেনার অপরাধ স্বীকার না করে । ইমাম আবু হানীফা (রাহঃ) এবং হানাফী বিশেষজ্ঞ আলেমদের এটাই সাধারণ মত। চারবার যেনার স্বীকারোক্তি করার পর সে যদি তা প্রত্যাহার করে, তবে তার এই প্রত্যাহার গ্রহণযোগ্য হবে এবং তাকে ছেড়ে দিতে হবে।**
أبواب الحدود في الزناء
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، أَخْبَرَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، أَنَّهُ بَلَغَهُ، أنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِرَجُلٍ مِنْ أَسْلَمَ يُدْعَى هَزَّالا: «يَا هَزَّالُ، لَوْ سَتَرْتَهُ بِرِدَائِكَ لَكَانَ خَيْرًا لَكَ» ، قَالَ يَحْيَى: فَحَدَّثْتُ بِهَذَا الْحَدِيثِ فِي مَجْلِسٍ فِيهِ يَزِيدُ بْنُ نُعَيْمِ بْنِ هَزَّالٍ، فَقَالَ: هَزَّالٌ جَدِّي، وَالْحَدِيثُ صَحِيحٌ حَقٌّ.
قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا كُلِّهِ نَأْخُذُ، وَلا يُحَدُّ الرَّجُلُ بِاعْتِرَافِهِ بِالزِّنَى حَتَّى يُقِرَّ أَرْبَعَ مَرَّاتٍ فِي أَرْبَعِ مَجَالِسَ مُخْتَلِفَةٍ، وَكَذَلِكَ جَاءَتِ السُّنَّةُ: لا يُؤْخَذُ الرَّجُلُ بِاعْتِرَافِهِ عَلَى نَفْسِهِ بِالزِّنَا حَتَّى يُقِرَّ أَرْبَعَ مَرَّاتٍ، وَهُوَ قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ، وَالْعَامَّةِ مِنْ فُقَهَائِنَا.
وَإِنْ أَقَرَّ أَرْبَعَ مَرَّاتٍ ثُمَّ رَجَعَ قُبِلَ رَجُوعُهُ وَخُلِّيَ سَبِيلُهُ

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

** ইসলামী আইন এটা জরুরী মনে করে না যে, যেনাকারী অবশ্যই তার অপরাধ স্বীকার করবে অথবা যেসব লোক তাকে যেনায় লিপ্ত দেখেছে, তারা এসে শাসকবর্গকে তা অবহিত করবে। এ নের বাধ্যবাধকতা ইসলামী আইনে নেই। কিন্তু অপরাধ প্রমাণিত হয়ে গেলে শাসকবর্গের তা ক্ষমা করে দেয়ার এখতিয়ার আর থাকে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “যে ব্যক্তি এসব কদর্য অপরাধের কোন একটিতে লিপ্ত হয়, সে যেন তা আল্লাহর বিছানো পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু সে যদি আমাদের সামনে তার পর্দা খুলে দেয়, তবে আমরা তার উপর আল্লাহর কিতাবের আইন কার্যকর করবো" (জাসসাসের আহ্কামুল কুরআন)।
মায়েয ইবনে মালেক আল-আসলামী (রা) যেনার অপরাধ করলে হাযযাল ইবনে নুআইম তাকে বলেন, তুমি রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর কাছে গিয়ে নিজ অপরাধের কথা স্বীকার করো। তিনি তাঁর কাছে এসে নিজ অপরাধের কথা প্রকাশ করলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিকে তাকে রজমের শাস্তি দেন এবং অপরদিকে হাযযালকে বলেনঃ “তুমি যদি তার অপরাধ লুকিয়ে রাখতে—প্রকাশ না করতে, তবে তা তোমার জন্য ভালোই হতো” (আবু দাউদ)। রাসূলুল্লাহ ﷺ আরো বলেনঃ “আল্লাহর শাস্তিসমূহ আপোসে ক্ষমা করে দিতে হবে। কিন্তু শাস্তিযোগ্য যে অপরাধের খবর আমাদের কাছে পৌঁছবে, তার শাস্তি বিধান আমাদের উপর বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে” (আবু দাউদ, নাসাঈ)।
সাক্ষ্য ছাড়া আর যে জিনিসের মাধ্যমে যেনার অপরাধ প্রমাণিত হয়, তা হচ্ছে অপরাধীর নিজ স্বীকারোক্তি। তাকে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করতে হবে যে, সে একটি মেয়েলোকের সাথে এমনভাবে যেনা করেছে, যেভাবে সুরমা- শলাকা সুরমাদানীর মধ্যে ঢুকানো থাকে। সেই সাথে আদালতকেও পূর্ণ নিশ্চিত হতে হবে যে, অপরাধী বাইরের কোনরূপ চাপ ছাড়াই স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে তার অপরাধ স্বীকার করছে। ইমাম আবু হানীফা, আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইবনে আবু লায়লা, ইসহাক ইবনে রাহওয়ায়হ ও হাসান ইবনে সালেহ-এর মতে একবার স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়, বরং আলাদাভাবে চারবার স্বীকারোক্তি করতে হবে। ইমাম মালেক, শাফিঈ, উছমান আল-বাত্তি ও হাসান বসরীর মতে একবারের স্বীকারোক্তিই যথেষ্ট।
কিন্তু শাস্তিদানের মুহূর্তে অথবা তার পূর্বে যদি অপরাধী স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে তবে তার শাস্তিদান বন্ধ রাখতে হবে, সে শাস্তির ভয়েই এই স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করুক না কেন। মায়েয আসলামী (রা)-র গায়ে যখন পাথর পড়তে লাগলো, তিনি পালাতে লাগলেন আর বললেন, হে লোকেরা! তোমরা আমাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে ফেরত নিয়ে যাও। আমার কবিলার লোকেরা আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। তারা বলেছিল, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিবেন না। কিন্তু দায়িত্বশীল লোকেরা তার কথা শুনেনি এবং তারা তাকে মেরে ফেলে। রাসূলুল্লাহ ﷺ একথা জানতে পেরে বলেনঃ “তোমরা তাকে ছেড়ে দিলে না কেন? তাকে আমার কাছে নিয়ে আসতে। হয়তো সে তওবা করতো এবং আল্লাহ তার তওবা কবুল করতেন।
যে ব্যক্তি এসে অপরাধ স্বীকার করবে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে না যে, সে কার সাথে যেনা করেছে। কারণ এতে একজনের পরিবর্তে দু'জনকে দণ্ড দিতে হয়। অথচ শরীআত মানুষকে ধরে ধরে শাস্তি দেয়ার পক্ষপাতী নয়। অবশ্য অপরাধী যদি বলে যে, সে অমুক স্ত্রীলোকের সাথে যেনা করেছে, তবে নিশ্চয় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সেও যদি অপরাধ স্বীকার করে তবে তাকেও শাস্তি দেয়া হবে। কিন্তু সে যদি অস্বীকার করে তবে কেবল স্বীকারোক্তিকারীকেই শাস্তি দেয়া হবে।
এক্ষেত্রে স্বীকারোক্তিকারীকে যেনার শাস্তি দেয়া হবে না যেনার মিথ্যা অপবাদ আরোপের শাস্তি (আশি বেত্রাঘাত) দেয়া হবে, তা নিয়ে মতভেদ আছে। ইমাম মালেক ও শাফিঈর মতে তাকে যেনার শাস্তিই দেয়া হবে। কারণ সে নিজেই তার অপরাধ স্বীকার করেছে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা ও আওযাঈর মতে তাকে যেনার মিথ্যা অপবাদের শাস্তি দিতে হবে। কেননা দ্বিতীয় পক্ষের অস্বীকৃতি তার যেনার অপরাধকে সন্দেহপূর্ণ করে তুলেছে। ইমাম মুহাম্মাদের মতে, তাকে যেনার শাস্তিও দেয়া হবে এবং মিথ্যা অপবাদের শাস্তিও দেয়া হবে। কেননা সে নিজেই যেনার স্বীকারোক্তি করেছে, অপরদিকে অন্যের উপর যেনার অপবাদ আরোপ করেছে। ইমাম শাফিঈর একটি কথাও এই মতের সমর্থন করে। “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর কাছে এসে স্বীকারোক্তি করে যে, সে অমুক স্ত্রীলোকের সাথে যেনা করেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ মেয়েটিকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করলে সে তা অস্বীকার করে। তাই তিনি পুরুষ লোকটির উপর শান্তি কার্যকর করেন এবং মেয়েলোকটিকে ছেড়ে দেন" (আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ)।
অপর এক বর্ণনায় আছে, “রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথমে তার উপর যেনার শাস্তি কার্যকর করেন। অতঃপর স্ত্রীলোকটির কাছে জিজ্ঞেস করা হলে সে তা অস্বীকার করে। অতঃপর তিনি পুরুষলোকটির উপর মিথ্যা অপবাদের শাস্তিও কার্যকর করেন” (আবু দাউদ, নাসাঈ)। কিন্তু সনদের দিক থেকে হাদীসটি দুর্বল। এর এক রাবী কাসিম ইবনে ফাইয়াদকে হাদীস বিশারদগণ বিশ্বাসের অযোগ্য ঘোষণা করেছেন। তাছাড়া নবী ﷺ এক পক্ষের বক্তব্য শুনেই রায় দিবেন, তা কল্পনা করা যায় না। তাই হাদীসটি বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকেও গ্রহণযোগ্য নয় (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ - হাদীস নং ৭০৩ | মুসলিম বাংলা