আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ
৮- তালাক ও আনুষঙ্গিক অধ্যায়
হাদীস নং: ৫৮৯
- তালাক ও আনুষঙ্গিক অধ্যায়
তালাক দিয়ে বিদায় দেয়ার সময় কিছু মালপত্র দেয়া উচিৎ।
৫৮৯। ইবনে উমার (রাযিঃ) বলেন, প্রত্যেক তালাকপ্রাপ্তা নারী কিছু মালপত্র পাবে। তবে যে নারীর মুহর নির্ধারণ করা হয়েছে কিন্তু সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হয়েছে-সে নির্ধারিত মুহরের অর্ধেক পাবে (অতিরিক্ত কিছু পাবে না)।**
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরা এই মত গ্রহণ করেছি। অতিরিক্ত কিছু মাল দেয়া স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়। এজন্য তাকে চাপ দেয়াও যাবে না। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে তা বাধ্যতামূলক। স্ত্রীকে যদি সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হয় এবং তার জন্য মুহর নির্ধারণ করা না হয়ে থাকে তবে এক্ষেত্রে কিছু মাল আইনের আশ্রয় নিয়ে আদায় করা যাবে। এর সর্বনিম্ন পরিমাণ হচ্ছে বাড়িতে ব্যবহার্য স্ত্রীর কাপড়-চোপড়, ওড়না, জামা ইত্যাদি। ইমাম আবু হানীফা এবং আমাদের সকল ফিকহবিদের এই মত।
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরা এই মত গ্রহণ করেছি। অতিরিক্ত কিছু মাল দেয়া স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়। এজন্য তাকে চাপ দেয়াও যাবে না। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে তা বাধ্যতামূলক। স্ত্রীকে যদি সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হয় এবং তার জন্য মুহর নির্ধারণ করা না হয়ে থাকে তবে এক্ষেত্রে কিছু মাল আইনের আশ্রয় নিয়ে আদায় করা যাবে। এর সর্বনিম্ন পরিমাণ হচ্ছে বাড়িতে ব্যবহার্য স্ত্রীর কাপড়-চোপড়, ওড়না, জামা ইত্যাদি। ইমাম আবু হানীফা এবং আমাদের সকল ফিকহবিদের এই মত।
كتاب الطلاق
بَابُ: مُتْعَةِ الطَّلاقِ
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، حَدَّثَنَا نَافِعٌ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: «لِكُلِّ مُطَلِّقَةٍ مُتْعَةٌ إِلا الَّتِي تُطَلَّقُ، وَقَدْ فُرِضَ لَهَا صَدَاقٌ، وَلَمْ تُمَسَّ فَحَسْبُهَا نِصْفُ مَا فُرِضَ لَهَا» قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا نَأْخُذُ، وَلَيْسَتِ الْمُتْعَةُ الَّتِي يُجْبَرُ عَلَيْهَا صَاحِبُهَا إِلا مُتْعَةً وَاحِدَةً، هِيَ مُتْعَةُ الَّذِي يُطَلِّقُ امْرَأَتَهُ قَبْلَ أَنْ يَدْخُلَ بِهَا، وَلَمْ يَفْرِضْ لَهَا، فَهَذِهِ لَهَا الْمُتْعَةُ وَاجِبَةٌ، يُؤْخَذُ بِهَا فِي الْقَضَاءِ، وَأَدْنَى الْمُتْعَةِ لِبَاسُهَا فِي بَيْتِهَا: الدِّرْعُ وَالْمِلْحَفَةُ وَالْخِمَارُ، وَهُوَ قولُ أَبِي حَنِيفَةَ، وَالْعَامَّةِ مِنْ فُقَهَائِنَا رَحِمَهُمُ اللَّهُ
হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):
** তালাকপ্রাপ্তা নারীর খোরপোষঃ যে সকল তালাকপ্রাপ্তা নারীকে ইদ্দাত পালন করতে হয় না তারা তালাকদাতা স্বামীর নিকট থেকে খোরপোষ ও বাসস্থান প্রাপ্তির অধিকারী হয় না। কারণ তারা তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পরপরই অপর পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। কিন্তু যে সকল তালাকপ্রাপ্তা নারীকে ইদ্দাত পালন করতে হয় তারা ইদ্দাতের মেয়াদকালের জন্য তাদের তালাকদাতা স্বামীর নিকট থেকে খোরপোষ ও বাসস্থান পাবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وُجْدِكُمْ وَلَا تُضَارُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُوا عَلَيْهِنَّ وَإِنْ كُنَّ أُولَاتِ حَمْلٍ فَأَنْفِقُوا عَلَيْهِنَّ حَتَّى يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ
“তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যে স্থানে বসবাস করো, তাদেরকেও তথায় বসবাস করতে দাও। তাদেরকে সংকটে ফেলবার জন্য উত্যক্ত করো না। তারা গর্ভবতী হয়ে থাকলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তাদের জন্য ব্যয় করো। তারা যদি তোমাদের সন্তানদের দুধ পান করায় তবে তাদেরকে তাদের পারিশ্রমিক দাও" (সূরা তালাকঃ ৬)।
মহানবী (স) বলেনঃ তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দাতকাল পর্যন্ত খোরপোষ পাবে (হিদায়া, ২য় খণ্ড)।
হযরত উমার ফারূক (রা) তার খেলাফতকালে এই ফরমান জারী করেন যে, তালাকপ্রাপ্তা নারী তার ইদ্দাতকাল পর্যন্ত তার তালাকদাতা স্বামীর নিকট থেকে খোরপোষ ও বাসস্থান পাবার অধিকারী হবে।
ইমাম আবু হানীফা (র) তথা হানাফী মাযহাবমতে তালাকপ্রাপ্তা নারী তার ইদ্দাতকাল পর্যন্ত খোরপোষ ও বাসস্থান পাবার অধিকারী হবে (কুরতুবীর আহ্কামুল কুরআন, ১খ, পৃ. ১৬৭)।
তালাকের মাতাঃ কোন স্ত্রীলোককে তালাক দেয়ার পর যে 'উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয় তাকে পরিভাষায় 'মাতা' বলে। উপহার সামগ্রী বা মাতা (متعة) পাবে সেইসব তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীলোক যাদেরকে নির্জনে মিলনের পূর্বে তালাক দেয়া হয়েছে এবং পূর্বে মাহর (মোহরানা) নির্ধারিত করু হয়নি। যাদের সাথে নির্জনে মিলন হয়নি কিন্তু পূর্বে মাহর নির্ধারিত করা হয়েছে অথবা নির্জনে মিলনও হয়েছে এবং মাহরও নির্ধারিত করা হয়েছে তাদেরকে “মাতা” অর্থাৎ উপহার সামগ্রী প্রদান স্বামীর জন্য বাধ্যকর নয়, তবে সে ভদ্রতা, মানবিকতা ও সৌজন্যের খাতিরে তা প্রদান করতে পারে। এ সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ
لَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِنْ طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ مَا لَمْ تَمَسُّوهُنَّ أَوْ تَفْرِضُوا لَهُنَّ فَرِيضَةً وَمَتِّعُوهُنَّ عَلَى الْمُوسِعِ قَدَرُهُ وَعَلَى الْمُقْتِرِ قَدَرُهُ مَتَاعًا بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُحْسِنِينَ
“তোমরা স্ত্রীদের স্পর্শ করার এবং মাহর ধার্য করার পূর্বে যদি তালাক দাও তবে তাতে তোমাদের কোন পাপ নেই। তাদেরকে কিছু (মাতা) দেয়া তোমাদের কর্তব্য। সচ্ছল ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী এবং দরিদ্র ব্যক্তি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী (মাতা) প্রদান করবে। এটা সৎকর্মশীল লোকদের কর্তব্য" (সূরা বাকারাঃ ২৩৬)।
وللمطلقت متاع بالمعروف حقا على المتقين
“যেসব স্ত্রীলোককে তালাক দেয়া হয়েছে তাদেরকে প্রথামতো কিছু প্রদান করে বিদায় করা উচিৎ। এটা মুত্তাকী লোকদের কর্তব্য” (সূরা বাকারাঃ ২৪১)।
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّونَهَا فَمَتِّعُوهُنَّ وَسَرِّحُوهُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا
“হে মুমিনগণ! তোমরা মুমিনা নারীগণকে বিবাহ করে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিলে তোমাদের জন্য তাদের পালনীয় কোন ইদ্দাত নেই, যা তোমরা গণনা করবে। তোমরা তাদেরকে কিছু সামগ্রী (মাতা) দিবে এবং ভদ্রতার সাথে তাদেরকে বিদায় দিবে" (সূরা আহযাবঃ ৪৯)।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “তোমার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে কিছু সামগ্রী (মাতা) প্রদান করো, তা অর্ধ সা' (পৌণে দুই সের) খেজুরই হোক না কেন" (জুমউল জাওয়ামে, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৬, দ্র. বায়হাকী)।
এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে এক তালাক প্রদান করলে মহানবী ﷺ তাকে বলেনঃ “তুমি তোমার তালাক দেয়া স্ত্রীকে উপহার সামগ্রী (মাতা) দেয়ার মতো যদি কিছু না পাও তবে তোমার মাথার টুপিটি তাকে দিয়ে দাও" (কুরতবী, আল-জামে লি-আহ্কামিল কুরআন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২)।
অতএব কুরআন মজীদে ও হাদীস শরীফে তালাকপ্রাপ্তাকে মাতা' বা মুতা (উপহার সামগ্রী) দেয়ার যে নির্দেশ রয়েছে তা সম্পূর্ণ সাময়িক, অস্থায়ী, কোন স্থায়ী আর্থিক দায় নয়। আরবী ভাষার সুপ্রসিদ্ধ বিশ্বকোষ “লিসানুল আরাব” গ্রন্থে তালাকপ্রাপ্তাকে দেয় মাতা' বা সামগ্রীর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছেঃ মাতার অর্থ ‘এমন প্রত্যেক বস্তু যার দ্বারা উপকার লাভ করা যায় (كل ما انتفع به فهو المتاع الزاد القليل متاع) “মাতা হলো সামান্য পাথেয়” (৬খ, পৃ. ৪১২৭, কলাম ২)। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ
يا قوم انما هذه الحيوة الدنيا متاع وان الأخرة هي دار القرار
“হে আমার সম্প্রদায়। এ পার্থিব জীবন তো সামান্য উপভোগের বস্তু এবং আখেরাতই চিরস্থায়ী আবাস” (সূরা মুমিনঃ ৩৯)।
“মাতআতুল মারআ" বলা হয় তালাকের পর তাকে যা দেয়া হয় তাকে।”
আল্লাহ তাআলা কুরআন মজীদে তালাকপ্রাপ্তাকে যে মাতা (বস্তুসামগ্রী) দেয়ার কথা বলেছেন তা দুই প্রকারঃ একটি বাধ্যতামূলক এবং অপরটি ঐচ্ছিক বা মুস্তাহাব। যে নারীর বিবাহের সময় মাহর নির্ধারিত হয়নি এবং স্বামীর সাথেও নির্জনবাস হয়নি, তাকে ঐ অবস্থায় তালাক প্রদান করা হলে কিছু বস্তুসামগ্রী প্রদান করা তালাকদাতা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক, যার দ্বারা সে উপকৃত হতে পারে। যেমন পরিধেয় বস্ত্র, নগদ অর্থ, খাদ্য সামগ্রী ইত্যাদি। আর যে মাতা বা বস্তুসামগ্রী প্রদান তালাকদাতা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয় তা এই যে, কোন ব্যক্তি কোন নারীকে বিবাহ করার সময় মাহর ধার্য করলো, অতঃপর নির্জনবাসের আগে বা পরে তাকে তালাক দিয়েছে, তাকে অর্ধেক বা পূর্ণ মাহর প্রদানের পর সৌজন্যমূলকভাবে অতিরিক্ত যা প্রদান করে তা হলো মাতা। আবদুর রহমান (রা) তার স্ত্রীকে তালাক প্রদানের পর তাকে উপহার সামগ্রী (متاع) হিসেবে একটি ক্রীতদাসী প্রদান করেন।
খৃস্টান অভিধানবেত্তা ইলয়াস আনতুন ইলয়াস তার সুবিখ্যাত অভিধান গ্রন্থ আল-মুনজিদে লিখেছেনঃ
متعة المرأة وصلت به بعد الطلاق من نحو القميص والازار والملحفة وهي متعة الطلاق
“মাতা বা মুতা শব্দের অর্থ উপকার সাধন সামান্য পুঁজি। আর স্ত্রীলোকের মাতা হলো জামা, পাজামা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বস্তু যা তালাকের পর তাকে প্রদান করা হয় এবং একে বলে তালাকের মাতা” (আল-মুনজিদ, পৃ. ৭৪৫; মুজাম লুগাতিল ফুকাহা, পৃ. ৪০৩)।
ইমাম রাযী (র) লিখেছেন, মাতা বা মুতা উপকার লাভের এমন বিষয় যার উপকারিতা সাময়িক, বেশি দিন অবশিষ্ট থাকে না, অতি সত্বর নিঃশেষ হয়ে যায় (তাফসীর কবীর, ২খ, পৃ. ৪০৭)।
ইবনে উমার (রা) বলেন, প্রত্যেক তালাকপ্রাপ্তা নারী কিছু উপহার সামগ্রী (মুতআ) পাৰে । ইমাম মুহাম্মাদ (র) বলেন, স্ত্রীকে সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হলে এবং তার মাহর ধার্য না হয়ে থাকলে এক্ষেত্রে উপহার সামগ্রী প্রদান বাধ্যতামূলক, অন্য সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। এর সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো- বাড়িতে ব্যবহার্য স্ত্রীর কাপড়-চোপড়, ওড়না, জামা ইত্যাদি। ইমাম আবু হানীফা (র)-এর মতও তাই।
অতএব উপরোক্ত আলোচনা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, তালাকদাতা স্বামী তার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর খোরপোষ তার ইদ্দাতকাল সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত বহন করতে বাধ্য। এ বিষয়ে সকল মাযহাবের সকল যুগের আইনবেত্তা ফকীহগণ একমত।
ইসলামী আইনে প্রত্যেক বালেগ ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে স্বতন্ত্র সত্তা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য তারা নিজেরাই বহন ও পালন করবে, সে নারী হোক অথবা পুরুষ। প্রত্যেকের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার নিজের উপর বর্তায়। কেবল ব্যতিক্রম এই যে, স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণের এবং অভিভাবক তার অধীনস্তদের ভরণপোষণের জন্য দায়ী, অধীনস্তগণ বালেগ ও আত্মনির্ভরশীল না হওয়া পর্যন্ত। এ সমাজে পিতা-মাতা যেমন বালেগ পুত্র-কন্যার ভরণপোষণ করতে বাধ্য নয়, তেমন তালাকদাতা স্বামীও তার পরিত্যক্তা স্ত্রীর ভরণপোষণ করতে বাধ্য নয়। বিবাহ বন্ধন যেমন দুইজন নারী-পুরুষকে স্বামী-স্ত্রীতে পরিণত করে তাদের মধ্যে পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের সৃষ্টি করে, তেমনি তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন ছিন্ন করে তাদেরকে বিবাহের পূর্বের অবস্থায় নিয়ে যায় এবং তারা দুইজন সম্পর্কহীন দুই স্বতন্ত্র ব্যক্তিতে পরিণত হয় এবং তাদের মধ্যকার পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্যেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। এমনকি তালাকদাতা স্বামী ও তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে পরস্পর সংগমক্রিয়ায় লিপ্ত হলে ইসলামী দণ্ডবিধি মোতাবেক মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ভোগ করবে।
অবশ্য তালাকপ্রাপ্তা অসহায় হলে তার জন্য সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা হবে। এক ব্যক্তি তার সৎমাতাকে বিবাহ করলে উমার (রা) তাদের বিবাহ ভেঙ্গে দেন এবং বলেন, কে এই নারীর ভরণপোষণের দায়িত্ব বহন করতে সম্মত আছে? আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা) তার ভরণপোষণের ভার নিলেন এবং তাকে নিজের একটি বসতবাড়ি ছেড়ে দিলেন (আল-ইসাবা, ৩খ, পৃ. ৪৬৩; ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৭খ, পৃ. ৪৩২, কলাম ১) (অনুবাদক)।
أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وُجْدِكُمْ وَلَا تُضَارُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُوا عَلَيْهِنَّ وَإِنْ كُنَّ أُولَاتِ حَمْلٍ فَأَنْفِقُوا عَلَيْهِنَّ حَتَّى يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ
“তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যে স্থানে বসবাস করো, তাদেরকেও তথায় বসবাস করতে দাও। তাদেরকে সংকটে ফেলবার জন্য উত্যক্ত করো না। তারা গর্ভবতী হয়ে থাকলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তাদের জন্য ব্যয় করো। তারা যদি তোমাদের সন্তানদের দুধ পান করায় তবে তাদেরকে তাদের পারিশ্রমিক দাও" (সূরা তালাকঃ ৬)।
মহানবী (স) বলেনঃ তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দাতকাল পর্যন্ত খোরপোষ পাবে (হিদায়া, ২য় খণ্ড)।
হযরত উমার ফারূক (রা) তার খেলাফতকালে এই ফরমান জারী করেন যে, তালাকপ্রাপ্তা নারী তার ইদ্দাতকাল পর্যন্ত তার তালাকদাতা স্বামীর নিকট থেকে খোরপোষ ও বাসস্থান পাবার অধিকারী হবে।
ইমাম আবু হানীফা (র) তথা হানাফী মাযহাবমতে তালাকপ্রাপ্তা নারী তার ইদ্দাতকাল পর্যন্ত খোরপোষ ও বাসস্থান পাবার অধিকারী হবে (কুরতুবীর আহ্কামুল কুরআন, ১খ, পৃ. ১৬৭)।
তালাকের মাতাঃ কোন স্ত্রীলোককে তালাক দেয়ার পর যে 'উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয় তাকে পরিভাষায় 'মাতা' বলে। উপহার সামগ্রী বা মাতা (متعة) পাবে সেইসব তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীলোক যাদেরকে নির্জনে মিলনের পূর্বে তালাক দেয়া হয়েছে এবং পূর্বে মাহর (মোহরানা) নির্ধারিত করু হয়নি। যাদের সাথে নির্জনে মিলন হয়নি কিন্তু পূর্বে মাহর নির্ধারিত করা হয়েছে অথবা নির্জনে মিলনও হয়েছে এবং মাহরও নির্ধারিত করা হয়েছে তাদেরকে “মাতা” অর্থাৎ উপহার সামগ্রী প্রদান স্বামীর জন্য বাধ্যকর নয়, তবে সে ভদ্রতা, মানবিকতা ও সৌজন্যের খাতিরে তা প্রদান করতে পারে। এ সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ
لَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِنْ طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ مَا لَمْ تَمَسُّوهُنَّ أَوْ تَفْرِضُوا لَهُنَّ فَرِيضَةً وَمَتِّعُوهُنَّ عَلَى الْمُوسِعِ قَدَرُهُ وَعَلَى الْمُقْتِرِ قَدَرُهُ مَتَاعًا بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُحْسِنِينَ
“তোমরা স্ত্রীদের স্পর্শ করার এবং মাহর ধার্য করার পূর্বে যদি তালাক দাও তবে তাতে তোমাদের কোন পাপ নেই। তাদেরকে কিছু (মাতা) দেয়া তোমাদের কর্তব্য। সচ্ছল ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী এবং দরিদ্র ব্যক্তি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী (মাতা) প্রদান করবে। এটা সৎকর্মশীল লোকদের কর্তব্য" (সূরা বাকারাঃ ২৩৬)।
وللمطلقت متاع بالمعروف حقا على المتقين
“যেসব স্ত্রীলোককে তালাক দেয়া হয়েছে তাদেরকে প্রথামতো কিছু প্রদান করে বিদায় করা উচিৎ। এটা মুত্তাকী লোকদের কর্তব্য” (সূরা বাকারাঃ ২৪১)।
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّونَهَا فَمَتِّعُوهُنَّ وَسَرِّحُوهُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا
“হে মুমিনগণ! তোমরা মুমিনা নারীগণকে বিবাহ করে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিলে তোমাদের জন্য তাদের পালনীয় কোন ইদ্দাত নেই, যা তোমরা গণনা করবে। তোমরা তাদেরকে কিছু সামগ্রী (মাতা) দিবে এবং ভদ্রতার সাথে তাদেরকে বিদায় দিবে" (সূরা আহযাবঃ ৪৯)।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “তোমার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে কিছু সামগ্রী (মাতা) প্রদান করো, তা অর্ধ সা' (পৌণে দুই সের) খেজুরই হোক না কেন" (জুমউল জাওয়ামে, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৬, দ্র. বায়হাকী)।
এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে এক তালাক প্রদান করলে মহানবী ﷺ তাকে বলেনঃ “তুমি তোমার তালাক দেয়া স্ত্রীকে উপহার সামগ্রী (মাতা) দেয়ার মতো যদি কিছু না পাও তবে তোমার মাথার টুপিটি তাকে দিয়ে দাও" (কুরতবী, আল-জামে লি-আহ্কামিল কুরআন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২)।
অতএব কুরআন মজীদে ও হাদীস শরীফে তালাকপ্রাপ্তাকে মাতা' বা মুতা (উপহার সামগ্রী) দেয়ার যে নির্দেশ রয়েছে তা সম্পূর্ণ সাময়িক, অস্থায়ী, কোন স্থায়ী আর্থিক দায় নয়। আরবী ভাষার সুপ্রসিদ্ধ বিশ্বকোষ “লিসানুল আরাব” গ্রন্থে তালাকপ্রাপ্তাকে দেয় মাতা' বা সামগ্রীর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছেঃ মাতার অর্থ ‘এমন প্রত্যেক বস্তু যার দ্বারা উপকার লাভ করা যায় (كل ما انتفع به فهو المتاع الزاد القليل متاع) “মাতা হলো সামান্য পাথেয়” (৬খ, পৃ. ৪১২৭, কলাম ২)। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ
يا قوم انما هذه الحيوة الدنيا متاع وان الأخرة هي دار القرار
“হে আমার সম্প্রদায়। এ পার্থিব জীবন তো সামান্য উপভোগের বস্তু এবং আখেরাতই চিরস্থায়ী আবাস” (সূরা মুমিনঃ ৩৯)।
“মাতআতুল মারআ" বলা হয় তালাকের পর তাকে যা দেয়া হয় তাকে।”
আল্লাহ তাআলা কুরআন মজীদে তালাকপ্রাপ্তাকে যে মাতা (বস্তুসামগ্রী) দেয়ার কথা বলেছেন তা দুই প্রকারঃ একটি বাধ্যতামূলক এবং অপরটি ঐচ্ছিক বা মুস্তাহাব। যে নারীর বিবাহের সময় মাহর নির্ধারিত হয়নি এবং স্বামীর সাথেও নির্জনবাস হয়নি, তাকে ঐ অবস্থায় তালাক প্রদান করা হলে কিছু বস্তুসামগ্রী প্রদান করা তালাকদাতা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক, যার দ্বারা সে উপকৃত হতে পারে। যেমন পরিধেয় বস্ত্র, নগদ অর্থ, খাদ্য সামগ্রী ইত্যাদি। আর যে মাতা বা বস্তুসামগ্রী প্রদান তালাকদাতা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয় তা এই যে, কোন ব্যক্তি কোন নারীকে বিবাহ করার সময় মাহর ধার্য করলো, অতঃপর নির্জনবাসের আগে বা পরে তাকে তালাক দিয়েছে, তাকে অর্ধেক বা পূর্ণ মাহর প্রদানের পর সৌজন্যমূলকভাবে অতিরিক্ত যা প্রদান করে তা হলো মাতা। আবদুর রহমান (রা) তার স্ত্রীকে তালাক প্রদানের পর তাকে উপহার সামগ্রী (متاع) হিসেবে একটি ক্রীতদাসী প্রদান করেন।
খৃস্টান অভিধানবেত্তা ইলয়াস আনতুন ইলয়াস তার সুবিখ্যাত অভিধান গ্রন্থ আল-মুনজিদে লিখেছেনঃ
متعة المرأة وصلت به بعد الطلاق من نحو القميص والازار والملحفة وهي متعة الطلاق
“মাতা বা মুতা শব্দের অর্থ উপকার সাধন সামান্য পুঁজি। আর স্ত্রীলোকের মাতা হলো জামা, পাজামা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বস্তু যা তালাকের পর তাকে প্রদান করা হয় এবং একে বলে তালাকের মাতা” (আল-মুনজিদ, পৃ. ৭৪৫; মুজাম লুগাতিল ফুকাহা, পৃ. ৪০৩)।
ইমাম রাযী (র) লিখেছেন, মাতা বা মুতা উপকার লাভের এমন বিষয় যার উপকারিতা সাময়িক, বেশি দিন অবশিষ্ট থাকে না, অতি সত্বর নিঃশেষ হয়ে যায় (তাফসীর কবীর, ২খ, পৃ. ৪০৭)।
ইবনে উমার (রা) বলেন, প্রত্যেক তালাকপ্রাপ্তা নারী কিছু উপহার সামগ্রী (মুতআ) পাৰে । ইমাম মুহাম্মাদ (র) বলেন, স্ত্রীকে সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হলে এবং তার মাহর ধার্য না হয়ে থাকলে এক্ষেত্রে উপহার সামগ্রী প্রদান বাধ্যতামূলক, অন্য সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। এর সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো- বাড়িতে ব্যবহার্য স্ত্রীর কাপড়-চোপড়, ওড়না, জামা ইত্যাদি। ইমাম আবু হানীফা (র)-এর মতও তাই।
অতএব উপরোক্ত আলোচনা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, তালাকদাতা স্বামী তার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর খোরপোষ তার ইদ্দাতকাল সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত বহন করতে বাধ্য। এ বিষয়ে সকল মাযহাবের সকল যুগের আইনবেত্তা ফকীহগণ একমত।
ইসলামী আইনে প্রত্যেক বালেগ ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে স্বতন্ত্র সত্তা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য তারা নিজেরাই বহন ও পালন করবে, সে নারী হোক অথবা পুরুষ। প্রত্যেকের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার নিজের উপর বর্তায়। কেবল ব্যতিক্রম এই যে, স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণের এবং অভিভাবক তার অধীনস্তদের ভরণপোষণের জন্য দায়ী, অধীনস্তগণ বালেগ ও আত্মনির্ভরশীল না হওয়া পর্যন্ত। এ সমাজে পিতা-মাতা যেমন বালেগ পুত্র-কন্যার ভরণপোষণ করতে বাধ্য নয়, তেমন তালাকদাতা স্বামীও তার পরিত্যক্তা স্ত্রীর ভরণপোষণ করতে বাধ্য নয়। বিবাহ বন্ধন যেমন দুইজন নারী-পুরুষকে স্বামী-স্ত্রীতে পরিণত করে তাদের মধ্যে পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের সৃষ্টি করে, তেমনি তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন ছিন্ন করে তাদেরকে বিবাহের পূর্বের অবস্থায় নিয়ে যায় এবং তারা দুইজন সম্পর্কহীন দুই স্বতন্ত্র ব্যক্তিতে পরিণত হয় এবং তাদের মধ্যকার পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্যেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। এমনকি তালাকদাতা স্বামী ও তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে পরস্পর সংগমক্রিয়ায় লিপ্ত হলে ইসলামী দণ্ডবিধি মোতাবেক মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ভোগ করবে।
অবশ্য তালাকপ্রাপ্তা অসহায় হলে তার জন্য সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা হবে। এক ব্যক্তি তার সৎমাতাকে বিবাহ করলে উমার (রা) তাদের বিবাহ ভেঙ্গে দেন এবং বলেন, কে এই নারীর ভরণপোষণের দায়িত্ব বহন করতে সম্মত আছে? আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা) তার ভরণপোষণের ভার নিলেন এবং তাকে নিজের একটি বসতবাড়ি ছেড়ে দিলেন (আল-ইসাবা, ৩খ, পৃ. ৪৬৩; ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৭খ, পৃ. ৪৩২, কলাম ১) (অনুবাদক)।