শরহু মাআ’নিল আছার- ইমাম ত্বহাবী রহঃ

১৩. যাবতীয় ক্রয়-বিক্রয়র অধ্যায়

হাদীস নং: ৫৬৫৪
যাবতীয় ক্রয়-বিক্রয়র অধ্যায়
৯. যা বিক্রয় করা হতে নিষেধ করা হয়েছে যাবত না তা কবযা করা হবে
৫৬৫৪। ইবরাহীম ইবন মারযূক বলেন, আবু যুবাইর হযরত জাবের (রাযিঃ) হতে বর্ণনা করেন, একবার তিনি এমন এক ব্যক্তিকে বললেন, যে কোন বস্তু ক্রয় করে এবং তা কবযা করার পূর্বেই বিক্রয় করে, “আমি এরূপ ক্রয়-বিক্রয় পছন্দ করিনা।"
এই যে হযরত জাবির (রাযিঃ) তিনি সব বস্তুকেই এ ব্যাপারে (কবযা করার পূর্বে বিক্রয় নিষিদ্ধ হবার ব্যাপারে) সমান করে দেখিয়েছেন। খাদ্য ও অ-খাদ্য দ্রব্যের মাঝে কোন পার্থক্য করেন নি। অথচ তিনি জানতেন যে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এর নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য শুধু খাদ্যদ্রব্য। এটা একথাই প্রমাণ করে যে, নিষেধাজ্ঞা দ্বারা উদ্দেশ্য তা-ই, যার বর্ণনা আমরা পূর্বে পেশ করেছি।
যদি কেউ প্রশ্ন করে যে, হাদীসে উল্লেখিত নিষেধাজ্ঞা দ্বারা শুধু খাদ্যদ্রব্য উদ্দেশ্য করা হয়েছে অন্য সব বস্তু এর অন্তর্ভুক্ত নয় তা কি করে বুঝা গেল? জবাবে তাকে বলা হবে, কুরআন মজীদে আমরা এর উদাহরণ পেয়েছি। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন, لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنْتُمْ حُرُمٌ وَمَنْ قَتَلَهُ مِنْكُمْ مُتَعَمِّدًا অর্থাৎ তোমরা ইহরামের অবস্থায় কোন শিকার হত্যা করনা, আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করবে। আল্লাহ্ তা'আলা শিকার হত্যাকারীর উপর جزاء ওয়াজিব করেছেন, যা তিনি আয়াতে উল্লেখ করেছেন । অথচ উলামা-ই কিরাম ইচ্ছাপূর্বক শিকার হত্যাকারী ও ভুল করে হত্যাকারীর মধ্যে কোন পার্থক্য করেন নি।
তারা উভয়ের উপর একই جزاء ওয়াজিব করেন। আর আয়াতে যে শুধু ইচ্ছা পূর্বক হত্যা করা এর উল্লেখ করা হয়েছে, তা উক্ত হুকুমে ভুল করে হত্যাকারীর অন্তর্ভুক্ত হবার জন্য বাধার সৃষ্টি করেনি। একইভাবে আলোচ্য হাদীসে কবযা করার পূর্বে বিক্রয় করা সম্পর্কে যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তাতে খাদ্যের কথা উল্লেখ করা, ‘অ-খাদ্যদ্রব্য'কে নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হতে বাধার সৃষ্টি করেনা ।

আমরা এ বিষয় প্রত্যক্ষ করেছি যে, طعام (খাদ্য দ্রব্য) এর মধ্যে بيع سلم জায়িয আছে,অথচ অন্যান্য মালে بيع سلم জায়িয নেই। বস্তুতঃ খাদ্যদ্রব্য এমন বস্তু, যার মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় (بيوع) এর ব্যাপারে অধিকতর প্রশস্ততা রয়েছে, আর অন্যান্য বস্তুর তুলনায় ক্রয়-বিক্রয়ের বৈধতার পরিমাণও বেশী। অথচ এই খাদ্যদ্রব্যই কবযা করার পূর্বে বিক্রয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং যে সব বস্তুর মধ্যে بيع سلم জায়িয নয়, তা কবযা করার পূর্বে বিক্রয় করা নিষিদ্ধ হওয়া অধিকতর সংগত। অতএব রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) তার নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য এমন বস্তুকে করেছেন যে, তা নিষিদ্ধ হলে অন্য সব বস্তুও নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসে যায়। অন্য সব বস্তুকে আর পৃথকভাবে নিষেধ করার প্রয়োজন হয় না। পক্ষান্তরে নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য যদি খাদ্যদ্রব্য ব্যতীত অন্য সব বস্তু হত, তবে শ্রোতার পক্ষে খাদ্যের হুকুম কি তা বুঝা জটিল হয়ে পড়ত। শ্রোতা বুঝতেই পারতনা যে, খাদ্য দ্রব্যের হুকুমও কি অন্য সব বস্তুর মতই হবে, না কি তার জন্য ভিন্ন হুকুম। (অর্থাৎ কবযা করার পূর্বে তা বিক্রয় করা বৈধ হবে) কারণ, খাদ্যদ্রব্যে, بيع سلم জায়িয আছে, অথচ তখন তা মাওজুদ থাকেনা। অথচ, অন্যান্য বস্তুর মধ্যে بيع سلم জায়িয নয়। অতএব এক্ষেত্রে শ্রোতা একথা বলতে পারে যে, بيع سلم জায়িয হবার ব্যাপারে যেমন طعام (খাদ্য দ্রব্য) عروض (মাল আসবাব) হতে ভিন্ন। অনুরূপভাবে এখানেও এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, কবযা করার পূর্বে আসবাবপত্র তো বিক্রয় করা জায়িয নয়, কিন্তু খাদ্যদ্রব্য কবযা করার পূর্বেও বিক্রয় করা জায়িয হবে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বিশেষভাবে খাদ্য দ্রব্যের উল্লেখ করেছেন।
এর মধ্যে আরো একটি দলীল রয়েছে, আর তা হলো, যে কারণে কবযা করার পূর্বে ক্রেতার জন্য খাদ্য বিক্রয় করা হারাম, তা হলো, যে বস্তু ক্রেতার ; ضمان (দায়িত্ব) এ আসেনি, তার মুনাফা হালাল না হওয়া। কিন্তু ক্রেতা যখন উক্ত বস্তুর উপর (কবযা করার মাধ্যমে) দায়িত্ব গ্রহণ করল, তখন তার মুনাফা তার জন্য হালাল হয়ে গেল। অতএব যখনই সে ইচ্ছা করবে তখনই তা বিক্রয় করা তার জন্য বৈধ হবে। আর 'অ-খাদ্য দ্রব্যেও' তো এই একই কারণ বিদ্যমান। অর্থাৎ কবযা করার পূর্বে ক্রেতার পক্ষে তা বিক্রয় করে মুনাফা লাভ করা হালাল না হওয়া। কারণ নবী (ﷺ) যে বস্তু ক্রেতার ضمان (দায়িত্বে) এ আসেনি, তার মুনাফা গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। অতএব যেমন ضمان (দায়িত্ব) ভুক্ত হবার পূর্বে মুনাফা গ্রহণ করা হালাল না হবার হুকুমে খাদ্য, এবং আসবাবপত্র সবই দাখিল, অর্থাৎ বিক্রয় করার পূর্বে তার ضمان এ না এলে তার মুনাফা তার জন্য হালাল নয়। অনুরূপভাবে বিক্রয় করা এমন যাবতীয় বস্তু যার মুনাফা বিক্রেতার জন্য হালাল তার জন্য তা বিক্রয় করাও হালাল। আর যে বস্তুর মুনাফা গ্রহণ করা বিক্রেতার উপর হারাম, তা বিক্রয় করাও তার উপর হারাম।
রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) হতে এমন হাদীসও বর্ণিত হয়েছে, যাতে খাদ্য অখাদ্য নির্বিশেষে কবযা করার পূর্বে বিক্রয় করা নিষিদ্ধ হবার কবযা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমনঃ
كتاب البيوع و الصرف
5654 - حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ مَرْزُوقٍ، قَالَ: ثنا أَبُو عَاصِمٍ، عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ، عَنْ أَبِي الزُّبَيْرِ، عَنْ جَابِرٍ، فِي الرَّجُلِ يَبْتَاعُ الْمَبِيعَ , فَيَبِيعُهُ قَبْلَ أَنْ يَقْبِضَهُ , قَالَ: أَكْرَهُهُ فَهَذَا جَابِرٌ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَدْ سَوَّى بَيْنَ الْأَشْيَاءِ الْمَبِيعَةِ فِي ذَلِكَ , وَقَدْ عَلِمَ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَصْدَهُ بِالنَّهْيِ عَنِ الْبَيْعِ فِيهِ حَتَّى يُقْبَضَ إِلَى الطَّعَامِ بِعَيْنِهِ , فَدَلَّ ذَلِكَ النَّهْيُ , عَلَى مَا قَدْ تَقَدَّمَ وَصْفُنَا لَهُ. فَإِنْ قَالَ قَائِلٌ , فَكَيْفَ قَصَدَ بِالنَّهْيِ فِي ذَلِكَ إِلَى الطَّعَامِ بِعَيْنِهِ , وَلَمْ يَعُمَّ الْأَشْيَاءَ؟ [ص:40] قِيلَ لَهُ: قَدْ وَجَدْنَا مِثْلَ هَذَا فِي الْقُرْآنِ , قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ {لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنْتُمْ حُرُمٌ وَمَنْ قَتَلَهُ مِنْكُمْ مُتَعَمِّدًا} [المائدة: 95] فَأَوْجَبَ عَلَيْهِ الْجَزَاءَ الْمَذْكُورَ فِي الْآيَةِ. وَلَمْ يَخْتَلِفْ أَهْلُ الْعِلْمِ فِي قَاتِلِ الصَّيْدِ خَطَأً , أَنَّ عَلَيْهِ مِثْلَ ذَلِكَ , وَأَنَّ ذِكْرَهُ الْعَمْدَ , لَا يَنْفِي الْخَطَأَ. فَكَذَلِكَ ذِكْرُهُ الطَّعَامَ , فِي النَّهْيِ عَنْ بَيْعِهِ قَبْلَ الْقَبْضِ , لَا يَنْفِي غَيْرَ الطَّعَامِ. وَقَدْ رَأَيْنَا الطَّعَامَ يَجُوزُ السَّلَمُ فِيهِ , وَلَا يَجُوزُ السَّلَمُ فِي الْعُرُوضِ , وَكَانَ الطَّعَامُ أَوْسَعَ أَمْرًا فِي الْبُيُوعِ مِنْ غَيْرِ الطَّعَامِ ; لِأَنَّ الطَّعَامَ يَجُوزُ السَّلَمُ فِيهِ , وَإِنْ لَمْ يَكُنْ عِنْدَ الْمُسْلَمِ إِلَيْهِ , وَلَا يَكُونُ ذَلِكَ فِي غَيْرِهِ. فَلَمَّا كَانَ الطَّعَامُ أَوْسَعَ أَمْرًا فِي الْبُيُوعِ وَأَكْثَرَ جَوَازًا , وَرَأَيْنَاهُ قَدْ نَهَى عَنْ بَيْعِهِ حَتَّى يُقْبَضَ , كَانَ ذَلِكَ فِيمَا لَا يَجُوزُ السَّلَمُ فِيهِ أَحْرَى أَنْ لَا يَجُوزَ بَيْعُهُ حَتَّى يُقْبَضَ. فَقَصَدَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالنَّهْيِ إِلَى الَّذِي إِذَا نَهَى عَنْهُ , دَلَّ نَهْيُهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْهُ عَلَى نَهْيِهِ عَنْ غَيْرِهِ , وَأَغْنَاهُ ذِكْرُهُ لَهُ عَنْ ذِكْرِهِ لِغَيْرِهِ , فَقَامَ ذَلِكَ مَقَامَ النَّهْيِ , لَوْ عَمَّ بِهِ الْأَشْيَاءَ كُلَّهَا. وَلَوْ قَصَدَ بِالنَّهْيِ إِلَى غَيْرِ الطَّعَامِ , أَشْكَلَ حُكْمُ الطَّعَامِ فِي ذَلِكَ عَلَى السَّامِعِ , فَلَمْ يَدْرِ , هَلْ هُوَ كَذَلِكَ أَمْ لَا؟ لِأَنَّهُ يَجِدُ الطَّعَامَ يَجُوزُ السَّلَمُ فِيهِ , وَلَيْسَ هُوَ بِقَائِمٍ حِينَئِذٍ , وَلَيْسَ يَجُوزُ ذَلِكَ فِي الْعُرُوضِ , فَيَقُولُ كَمَا خَالَفَ الطَّعَامُ الْعُرُوضَ فِي جَوَازِ السَّلَمِ فِيهِ , وَلَيْسَ عِنْدَ الْمُسْلَمِ إِلَيْهِ , وَلَيْسَ ذَلِكَ فِي الْعُرُوضِ , فَكَذَلِكَ يُحْتَمَلُ أَنْ يَكُونَ مُخَالِفًا لَهُ فِي جَوَازِ بَيْعِهِ قَبْلَ أَنْ يُقْبَضَ , وَإِنْ كَانَ ذَلِكَ غَيْرَ جَائِزٍ فِي الْعُرُوضِ. فَهَذَا هُوَ الْمَعْنَى الَّذِي لَهُ قَصَدَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالنَّهْيِ عَنْ بَيْعِ مَا لَمْ يُقْبَضْ , إِلَى الطَّعَامِ خَاصَّةً. وَفِي ذَلِكَ حُجَّةٌ أُخْرَى , وَذَلِكَ أَنَّ الْمَعْنَى الَّذِي حَرُمَ بِهِ عَلَى مُشْتَرِي الطَّعَامِ بَيْعُهُ قَبْلَ قَبْضِهِ , هُوَ أَنْ لَا يَطِيبَ لَهُ رِبْحُ مَا فِي ضَمَانِ غَيْرِهِ , فَإِذَا قَبَضَهُ , صَارَ فِي ضَمَانِهِ , فَطَابَ لَهُ رِبْحُهُ فَجَازَ أَنْ يَبِيعَهُ حَيْثُ أَحَبَّ. وَالْعُرُوضُ الْمَبِيعَةُ , هَذَا الْمَعْنَى بِعَيْنِهِ , مَوْجُودٌ فِيهَا , وَذَلِكَ أَنَّ الرِّبْحَ فِيهَا قَبْلَ قَبْضِهَا , غَيْرُ حَلَالٍ لِمُبْتَاعِهَا , لِأَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ نَهَى عَنْ رِبْحِ مَا لَمْ يُضْمَنْ. فَكَمَا كَانَ ذَلِكَ قَدْ دَخَلَ فِيهِ الطَّعَامُ وَغَيْرُ الطَّعَامِ , وَلَمْ يَكُنِ الرِّبْحُ يَطِيبُ لِأَحَدٍ إِلَّا بِتَقَدُّمِ ضَمَانِهِ , لِمَا كَانَ عَنْهُ وَذَلِكَ الرِّبْحُ. فَكَذَلِكَ الْأَشْيَاءُ الْمَبِيعَةُ كُلُّهَا , مَا كَانَ مِنْهَا يَطِيبُ الرِّبْحُ فِيهِ لِبَائِعِهِ , فَحَلَالٌ لَهُ بَيْعُهُ , وَمَا كَانَ مِنْهَا يَحْرُمُ الرِّبْحُ فِيهِ عَلَى بَائِعِهِ , فَحَرَامٌ عَلَيْهِ بَيْعُهُ. وَقَدْ جَاءَتْ أَيْضًا آثَارٌ أُخَرُ , عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالنَّهْيِ عَنْ بَيْعِ مَا لَمْ يُقْبَضْ , لَمْ يَقْصِدْ فِيهَا إِلَى الطَّعَامِ وَلَا إِلَى غَيْرِهِ.
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান