মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)
১৭- কিসাসের অধ্যায়
হাদীস নং: ৩৪৯৬
১. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - দিয়াত (রক্তপণ)
৩৪৯৬। হযরত আমর ইবনে শোআয়ব তাঁহার পিতার মাধ্যমে তাঁহার দাদা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) মক্কা বিজয়ের বৎসর এক ভাষণে বলিয়াছেনঃ হে লোকগণ! ইসলামে শপথ জোট বা চুক্তি নাই। অবশ্য জাহিলী যুগে যে সকল (মানবহিতৈষী) চুক্তি করা হইয়াছে, ইসলাম আসিয়া উহাকে আরও সুদৃঢ় করে। অমুসলিমদের মোকাবেলায় সমস্ত মুসলমান একক শক্তি। সাধারণ একজন মুসলমান কোন ব্যক্তিকে আশ্রয় দিলে সমস্ত মুসলমান উহা রক্ষা করিবে। দূরবর্তী সৈন্যগণ যে গনীমত লাভ করিবে (কেন্দ্র অথবা সেনাপতির) নিকটবর্তীগণও উহার অংশ পাইবে। অর্থাৎ, যুদ্ধে লিপ্ত সিপাহীরা যাহা অর্জন করিবে তাহাদের পিছনে বসিয়া থাকা সৈন্যরাও উহার অংশীদার হইবে। কোন কাফেরের খুনের বদলে কোন মু'মিনকে হত্যা করা যাইবে না। একজন কাফেরের দিয়ত (রক্তমূল্য) একজন মুসলমানের দিয়তের অর্ধেক। পশুর যাকাত এক জায়গায় বসিয়া থাকিয়া উসুল করা জায়েয নাই এবং যাকাত দেওয়ার ভয়ে পশুসহ দূরে চলিয়া যাওয়াও জায়েয নাই। লোকদের নিজ বসতিতে যাইয়াই যাকাত উসুল করিতে হইবে। অন্য আরেক রেওয়ায়তে আছে, আশ্রিত বা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত (যিম্মী ব্যক্তির দিয়ত হইল একজন স্বাধীন মুসলমানের অর্ধেক। —আবু দাউদ
وَعَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ: خَطَبَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ الفتحِ ثمَّ قَالَ: «أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّهُ لَا حِلْفَ فِي الْإِسْلَامِ وَمَا كَانَ مِنْ حِلْفٍ فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَإِنَّ الْإِسْلَامَ لَا يَزِيدُهُ إِلَّا شِدَّةً الْمُؤْمِنُونَ يَدٌ عَلَى مَنْ سِوَاهُمْ يُجِيرُ عَلَيْهِمْ أَدْنَاهُمْ وَيَرُدُّ عليهِم أقْصاهم يَردُّ سراياهم على قعيدتِهم لَا يُقْتَلُ مُؤْمِنٌ بِكَافِرٍ دِيَةُ الْكَافِرِ نِصْفُ دِيَةِ الْمُسْلِمِ لَا جَلَبَ وَلَا جَنَبَ وَلَا تُؤْخَذُ صَدَقَاتُهُمْ إِلَّا فِي دُورِهِمْ» . وَفِي رِوَايَةٍ قَالَ: «دِيَةُ الْمُعَاهِدِ نِصْفُ دِيَةِ الْحُرِّ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد
হাদীসের ব্যাখ্যা:
'لا حلف فى الاسلام' এই বাক্যের অর্থ হইল, জাহেলী যুগে পরস্পরের মধ্যে এই ওয়াদা-অঙ্গীকার হইত যে, তাহারা যৌথভাবে কোথাও লড়াই করিবে, লুটপাট করিবে, ন্যায় অন্যায়ের কোন বালাই ছাড়াই বিভিন্ন কাজে একে অন্যের সহযোগিতা করিবে এবং একজন মরিয়া গেলে অঙ্গীকারাবদ্ধ ব্যক্তি তাহার মালের ওয়ারিস হইবে ইত্যাদি। হুযূর (ﷺ) উক্ত বাক্য দ্বারা উহা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করিয়াছেন। 'وما كان من حلف الخ' এই বাক্যের অর্থ হইল, জাহেলী যুগে তাহাদের মধ্যে এই উত্তম কাজটিও পাওয়া যাইত যে, কোন নির্যাতিত মযলুমের সাহায্য করিবে, আপনজন ও আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করিবে, অসহায় বিপন্ন লোককে মদদ করিবে। হুযূর (ﷺ) বলিলেন যে, ইসলাম উহাকে আরও সুদৃঢ় করে। 'ويرد سراياهم على قعيدتهم' এই বাক্যের মধ্যে 'سرايا' অর্থ সেই সমস্ত মুজাহিদের উপদল যাহারা শত্রুর মোকাবেলায় যুদ্ধে লিপ্ত এবং গনীমতের মাল-সম্পদ হাসিল করিতেছে, তাহাদের অর্জিত গনীমত শুধু তাহারাই ভোগ করিবে না; বরং তাহাদের পিছনে যে বিরাট মুজাহিদ বাহিনী রহিয়াছে, তাহারাও ইহার অংশ পাইবে। 'لا يقتل مؤمن بكافر' কোন মু'মিনকে কোন হরবী কাফেরের খুনের বদলে কতল করা যাইবে না। তবে ফিল্মী কাফেরের বদলে কতল করা যাইবে এবং ফিল্মী কাফেরের দিয়ত মুসলমানের সমান। ইহাই ইমাম আবু হানীফার অভিমত। ‘কাফেরের রক্তপণ মুসলমানের রক্তপণের অর্ধেক।' ইহা ইমাম মালেক (রঃ)-এর অভিমত। ইমাম আহমদ (রঃ)-এর এক মতে কিতাবীদের দিয়ত মুসলমানের অর্ধেক, অন্য একমতে এক তৃতীয়াংশ। ইমাম শাফেয়ী বলেন, কাফেরের দিয়ত মুসলমানের এক তৃতীয়াংশ। হানাফী ওলামাগণ বলেন, প্রত্যেক যিম্মীর দিয়ত এক হাজার দীনার (অর্থাৎ, মুসলমানের সমান)। হযরত আবু বকর ও ওমর (রাঃ) যিম্মীর দিয়ত মুসলমানের সমপরিমাণ দিয়ত হিসাবে আদায় করিবার নির্দেশ দিতেন। ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন,
كانت دية الذمي مثل دية المسلم على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم وابي بكر وعمر وعثمان فلما كانت زمن معاوية جعلها النصف
হুযূর (ﷺ) এবং হযরত আবু বকর, ওমর ও ওসমানের যুগে যিম্মীর দিয়ত মুসলমানদের সমপরিমাণ ছিল ; কিন্তু হযরত মুআবিয়ার যুগে তাহা অর্ধেক করিয়া দেওয়া হয়। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, তাহারা জিযিয়া (রাষ্ট্রীয় কর) এই জন্য আদায় করিয়া থাকে, যেন তাহাদের জান আমাদের জানের ন্যায় এবং তাহাদের মাল আমাদের মালের ন্যায় হইয়া যায়। অতএব, হাদীসসমূহের বিপরীত এই ব্যাপারে যে মতভেদ রহিয়াছে, গ্রহণযোগ্য নহে। ★★ এই বাক্যের অর্থ হইল, সরকারী কার্যরত তহসীলদার, যে যাকাত উসুল করে, সে কোন এক স্থানে বসিয়া লোকদিগকে নিজ নিজ যাকাত লইয়া আসার জন্য আদেশ করিতে পারিবে না; বরং সে প্রত্যেকের বাড়ীঘরে যাইয়া উসুল করিবে। আর যাকাত প্রদানকারীকেও নির্দেশ করা যাইতেছে,' সে যেন যাকাত দিতে হইবে এই ভয়ে নিজের পশু লইয়া কোথাও দূরে যাইয়া আত্মগোপন না করে।
كانت دية الذمي مثل دية المسلم على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم وابي بكر وعمر وعثمان فلما كانت زمن معاوية جعلها النصف
হুযূর (ﷺ) এবং হযরত আবু বকর, ওমর ও ওসমানের যুগে যিম্মীর দিয়ত মুসলমানদের সমপরিমাণ ছিল ; কিন্তু হযরত মুআবিয়ার যুগে তাহা অর্ধেক করিয়া দেওয়া হয়। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, তাহারা জিযিয়া (রাষ্ট্রীয় কর) এই জন্য আদায় করিয়া থাকে, যেন তাহাদের জান আমাদের জানের ন্যায় এবং তাহাদের মাল আমাদের মালের ন্যায় হইয়া যায়। অতএব, হাদীসসমূহের বিপরীত এই ব্যাপারে যে মতভেদ রহিয়াছে, গ্রহণযোগ্য নহে। ★★ এই বাক্যের অর্থ হইল, সরকারী কার্যরত তহসীলদার, যে যাকাত উসুল করে, সে কোন এক স্থানে বসিয়া লোকদিগকে নিজ নিজ যাকাত লইয়া আসার জন্য আদেশ করিতে পারিবে না; বরং সে প্রত্যেকের বাড়ীঘরে যাইয়া উসুল করিবে। আর যাকাত প্রদানকারীকেও নির্দেশ করা যাইতেছে,' সে যেন যাকাত দিতে হইবে এই ভয়ে নিজের পশু লইয়া কোথাও দূরে যাইয়া আত্মগোপন না করে।
