মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)
১৪- বিবাহ-শাদী সম্পর্কিত অধ্যায়
হাদীস নং: ৩২৯৪
১১. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - খুল্‘ই (খুলা‘ তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে
৩২৯৪। হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ্ (ﷺ) আমাকে বলিলেন, মুআয! জানিয়া রাখ, আল্লাহ্ তা'আলা দাস মুক্ত করা অপেক্ষা তাঁহার নিকট প্রিয়তর কোন বস্তু যমীনের উপর সৃষ্টি করেন নাই। এভাবে আল্লাহ্ তাআলা তালাক অপেক্ষা তাঁহার নিকট ঘূর্ণিততর বস্তুও যমীনের উপর তৈয়ার করেন নাই। —দারা কুতনী
وَعَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا مُعَاذُ مَا خَلَقَ اللَّهُ شَيْئًا عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنَ الْعَتَاقِ وَلَا خَلَقَ اللَّهُ شَيْئًا عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ أَبْغَضَ إِلَيْهِ مِنَ الطَّلاقِ» . رَوَاهُ الدَّارَقُطْنِيّ
হাদীসের ব্যাখ্যা:
পরিশিষ্ট
এক সাথে তিন তালাকঃ
মাহমুদ ইবনে লবীদের হাদীস (১৮ নং) হইতে বুঝা যায় যে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া বেদআত ও হারাম। তাবেয়ীদের মধ্যে হযরত তাউস ও ইকরেমা বলেন, যেহেতু ইহা সুন্নতের বিপরীত, অতএব, ইহাকে সুন্নত অনুসারে এক তালাক (রাজয়ী) গণ্য করিতে হইবে। সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ), আবু বকর ও ওমরের খেলাফতের দুই বছরকাল (একসাথে) তিন তালাক এক তালাকই ছিল। অতঃপর হযরত ওমর (রাঃ) বলিলেন, “যে কাজ (অর্থাৎ, তিন তালাক দেওয়া) মানুষের বুঝিয়া শুনিয়া ধীরে-আস্তে করা (অর্থাৎ, তিন তোহরে তিন তালাক দেওয়া) উচিত ছিল, মানুষ তাহাতে তাড়াতাড়ি করিতে (অর্থাৎ, তিন তালাক একসাথে দিতে) আরম্ভ করিয়াছে। সুতরাং এখন হইতে আমাদের ইহাকে (তিন তালাকরূপে) কার্যকরী করিয়া দেওয়াই উচিত।” রাবী বলেন, “অতঃপর তিনি উহাকে কার্যকরী করিয়াছিলেন।”
কিন্তু জমহুরে সাহাবা, তাবেয়ীন ও ইমামগণ সকলেই বলেন, একসাথে তিন তালাক দেওয়া বেদআত ও গোনাহর কাজ, তবে ইহাতে তিন তালাকই হইয়া যাইবে। (১) মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা ও দারা কুতনীতে হযরত ইবনে ওমরের সেই তালাকের ঘটনায় (২ নং হাদীসে) ইহাও অধিক রহিয়াছে যে, অতঃপর ইবনে ওমর বলিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! যদি আমি তাহাকে (একসাথে) তিন তালাক দিতাম ?” তিনি বলিলেন, তবে তুমি তোমার প্রভুর নাফরমানী করিতে। অবশ্য তোমার স্ত্রী তোমা হইতে পৃথক (বায়েন) হইয়া যাইত। (২) মুসনাদে আবদুর রাজ্জাকে আছে, সাহাবী হযরত ওবাদা ইবনে সামেতের বাবা সামেত তাঁহার এক স্ত্রীকে হাজার তালাক দিলেন। অতঃপর ওবাদা যাইয়া রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)কে জিজ্ঞাসা করিলেন। উত্তরে তিনি বলিলেন, আল্লাহর নাফরমানীর সাথে তিন তালাকের দ্বারাই তাহার স্ত্রী তাহা হইতে পৃথক হইয়া গিয়াছে। বাকী নয় শত সাতানব্বইটি হইল সীমালঙ্ঘন ও অন্যায়। ইহাতে আল্লাহ্ চাহেন তো তাহাকে শাস্তি দিবেন আর চাহেন তো মাফ করিয়া দিবেন। (৩) ইমাম ওকী (তাঁহার কিতাবে) মুআবিয়া ইবনে আবু ইয়াহ্ইয়া হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, এক ব্যক্তি হযরত ওসমান (রাঃ)-এর নিকট আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আমি আমার স্ত্রীকে হাজার তালাক দিয়াছি, (এখন ইহার হুকুম কি?) তিনি বলিলেন, “সে তিন তালাকেই তোমা হইতে পৃথক হইয়া গিয়াছে।”
(৪) সেই ইমাম ওকী আ'মাসা হইতে, আ'মাসা হাবীব ইবনে আবু সাবেত হইতে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি হযরত আলীর নিকট আসিয়া বলিল, আমি আমার স্ত্রীকে হাজার তালাক দিয়াছি, (ইহার হুকুম কি?) তিনি বলিলেন, তিন তালাক দ্বারাই তোমার স্ত্রী তোমা হইতে পৃথক হইয়া গিয়াছে। বাকীগুলিকে তুমি তোমার অন্য স্ত্রীদের প্রতি ভাগ করিয়া দাও। (৫) মুআত্তা মালেকে আছে, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদের নিকট আসিয়া বলিল, আমি আমার স্ত্রীকে আট তালাক দিয়াছি, (ইহার হুকুম কি?) তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “ইহাতে অন্যেরা কি বলিয়াছেন?” সে বলিল, তাঁহারা বলিয়াছেন, সে আমা হইতে পৃথক হইয়া গিয়াছে। ইহা শুনিয়া তিনি বলিলেন, “তাঁহারা ঠিকই বলিয়াছেন।”
বাকী রহিল হযরত ইবনে আব্বাসের বর্ণনা। সে সম্পর্কে কথা হইল এই যে, নবী করীম (ﷺ)-এর পক্ষ হইতেই তাঁহার প্রথম হুকুমের 'নাসেখ' বা 'রহিতকারী দলীল' বিদ্যমান ছিল, কিন্তু তখন তাহা সাধারণ্যে প্রকাশ পায় নাই। পরে যখন প্রকাশ পাইয়াছে তখন হযরত ওমর (রাঃ) তাহা জারি করিয়াছেন মাত্র, অথবা নবী করীম (ﷺ)-এর হুকুম কোন 'ইল্লত' বা 'কারণ'-এর সাথে সংযুক্ত ছিল। ওমরের আমলে সে কারণ বিদুরিত হওয়ার দরুন সে হুকুম আপনা আপনিই রহিত হইয়া যায়। অন্যথায় জানিয়া শুনিয়া হযরত ওমর (রাঃ) হুযূর (ﷺ)-এর বিপরীত করিয়াছেন আর জানিয়া শুনিয়াই সমস্ত সাহাবী বিশেষ করিয়া মুজতাহিদ সাহাবীগণ —— যাঁহাদের মধ্যে হযরত ওসমান ও হযরত আলীও আছেন, ইহাতে চুপ রহিয়াছেন—ইহা কল্পনা করাও যায় না।
অপরদিকে আমরা দেখিতেছি, বর্ণনাকারী স্বয়ং হযরত ইবনে আব্বাসও ইহা মানিয়া লইয়াছেন এবং ইহার অনুরূপ ফতওয়া দিতেছেন। (উপরে গিয়াছে ১৯ নং) ইমাম মালেকের মুআত্তায় আছে, এক ব্যক্তি আসিয়া হযরত ইবনে আব্বাসকে বলিল, “আমি আমার স্ত্রীকে একশত তালাক দিয়াছি। এখন আমার প্রতি আপনার হুকুম কি?” ইবনে আব্বাস বলিলেন, “তিন তালাক দ্বারাই সে তোমা হইতে ছুটিয়া গিয়াছে। বাকী সাতানব্বইটি দ্বারা তুমি আল্লাহর কিতাবের আয়াতের সাথে বিদ্রুপ করিয়াছ।” এখানে এ কথাও স্মরণযোগ্য যে, স্বয়ং রাবীর মত বা ফতওয়া যদি তাঁহার বর্ণনার বিপরীত হয়, তখন ফকীহগণ সে বর্ণনাকে দলীলরূপে গ্রহণ করেন না। মোটকথা, এ আলোচনা দ্বারা, বিশেষ করিয়া ইবনে মাসউদের হাদীস দ্বারা দেখা গেল যে, ইহার উপর মুজতাহিদ সাহাবীগণের ইজমা হইয়া গিয়াছে এবং পরবর্তী ইমামগণও ইহার উপর একমত হইয়াছেন।
এক সাথে তিন তালাকঃ
মাহমুদ ইবনে লবীদের হাদীস (১৮ নং) হইতে বুঝা যায় যে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া বেদআত ও হারাম। তাবেয়ীদের মধ্যে হযরত তাউস ও ইকরেমা বলেন, যেহেতু ইহা সুন্নতের বিপরীত, অতএব, ইহাকে সুন্নত অনুসারে এক তালাক (রাজয়ী) গণ্য করিতে হইবে। সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ), আবু বকর ও ওমরের খেলাফতের দুই বছরকাল (একসাথে) তিন তালাক এক তালাকই ছিল। অতঃপর হযরত ওমর (রাঃ) বলিলেন, “যে কাজ (অর্থাৎ, তিন তালাক দেওয়া) মানুষের বুঝিয়া শুনিয়া ধীরে-আস্তে করা (অর্থাৎ, তিন তোহরে তিন তালাক দেওয়া) উচিত ছিল, মানুষ তাহাতে তাড়াতাড়ি করিতে (অর্থাৎ, তিন তালাক একসাথে দিতে) আরম্ভ করিয়াছে। সুতরাং এখন হইতে আমাদের ইহাকে (তিন তালাকরূপে) কার্যকরী করিয়া দেওয়াই উচিত।” রাবী বলেন, “অতঃপর তিনি উহাকে কার্যকরী করিয়াছিলেন।”
কিন্তু জমহুরে সাহাবা, তাবেয়ীন ও ইমামগণ সকলেই বলেন, একসাথে তিন তালাক দেওয়া বেদআত ও গোনাহর কাজ, তবে ইহাতে তিন তালাকই হইয়া যাইবে। (১) মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা ও দারা কুতনীতে হযরত ইবনে ওমরের সেই তালাকের ঘটনায় (২ নং হাদীসে) ইহাও অধিক রহিয়াছে যে, অতঃপর ইবনে ওমর বলিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! যদি আমি তাহাকে (একসাথে) তিন তালাক দিতাম ?” তিনি বলিলেন, তবে তুমি তোমার প্রভুর নাফরমানী করিতে। অবশ্য তোমার স্ত্রী তোমা হইতে পৃথক (বায়েন) হইয়া যাইত। (২) মুসনাদে আবদুর রাজ্জাকে আছে, সাহাবী হযরত ওবাদা ইবনে সামেতের বাবা সামেত তাঁহার এক স্ত্রীকে হাজার তালাক দিলেন। অতঃপর ওবাদা যাইয়া রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)কে জিজ্ঞাসা করিলেন। উত্তরে তিনি বলিলেন, আল্লাহর নাফরমানীর সাথে তিন তালাকের দ্বারাই তাহার স্ত্রী তাহা হইতে পৃথক হইয়া গিয়াছে। বাকী নয় শত সাতানব্বইটি হইল সীমালঙ্ঘন ও অন্যায়। ইহাতে আল্লাহ্ চাহেন তো তাহাকে শাস্তি দিবেন আর চাহেন তো মাফ করিয়া দিবেন। (৩) ইমাম ওকী (তাঁহার কিতাবে) মুআবিয়া ইবনে আবু ইয়াহ্ইয়া হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, এক ব্যক্তি হযরত ওসমান (রাঃ)-এর নিকট আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আমি আমার স্ত্রীকে হাজার তালাক দিয়াছি, (এখন ইহার হুকুম কি?) তিনি বলিলেন, “সে তিন তালাকেই তোমা হইতে পৃথক হইয়া গিয়াছে।”
(৪) সেই ইমাম ওকী আ'মাসা হইতে, আ'মাসা হাবীব ইবনে আবু সাবেত হইতে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি হযরত আলীর নিকট আসিয়া বলিল, আমি আমার স্ত্রীকে হাজার তালাক দিয়াছি, (ইহার হুকুম কি?) তিনি বলিলেন, তিন তালাক দ্বারাই তোমার স্ত্রী তোমা হইতে পৃথক হইয়া গিয়াছে। বাকীগুলিকে তুমি তোমার অন্য স্ত্রীদের প্রতি ভাগ করিয়া দাও। (৫) মুআত্তা মালেকে আছে, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদের নিকট আসিয়া বলিল, আমি আমার স্ত্রীকে আট তালাক দিয়াছি, (ইহার হুকুম কি?) তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “ইহাতে অন্যেরা কি বলিয়াছেন?” সে বলিল, তাঁহারা বলিয়াছেন, সে আমা হইতে পৃথক হইয়া গিয়াছে। ইহা শুনিয়া তিনি বলিলেন, “তাঁহারা ঠিকই বলিয়াছেন।”
বাকী রহিল হযরত ইবনে আব্বাসের বর্ণনা। সে সম্পর্কে কথা হইল এই যে, নবী করীম (ﷺ)-এর পক্ষ হইতেই তাঁহার প্রথম হুকুমের 'নাসেখ' বা 'রহিতকারী দলীল' বিদ্যমান ছিল, কিন্তু তখন তাহা সাধারণ্যে প্রকাশ পায় নাই। পরে যখন প্রকাশ পাইয়াছে তখন হযরত ওমর (রাঃ) তাহা জারি করিয়াছেন মাত্র, অথবা নবী করীম (ﷺ)-এর হুকুম কোন 'ইল্লত' বা 'কারণ'-এর সাথে সংযুক্ত ছিল। ওমরের আমলে সে কারণ বিদুরিত হওয়ার দরুন সে হুকুম আপনা আপনিই রহিত হইয়া যায়। অন্যথায় জানিয়া শুনিয়া হযরত ওমর (রাঃ) হুযূর (ﷺ)-এর বিপরীত করিয়াছেন আর জানিয়া শুনিয়াই সমস্ত সাহাবী বিশেষ করিয়া মুজতাহিদ সাহাবীগণ —— যাঁহাদের মধ্যে হযরত ওসমান ও হযরত আলীও আছেন, ইহাতে চুপ রহিয়াছেন—ইহা কল্পনা করাও যায় না।
অপরদিকে আমরা দেখিতেছি, বর্ণনাকারী স্বয়ং হযরত ইবনে আব্বাসও ইহা মানিয়া লইয়াছেন এবং ইহার অনুরূপ ফতওয়া দিতেছেন। (উপরে গিয়াছে ১৯ নং) ইমাম মালেকের মুআত্তায় আছে, এক ব্যক্তি আসিয়া হযরত ইবনে আব্বাসকে বলিল, “আমি আমার স্ত্রীকে একশত তালাক দিয়াছি। এখন আমার প্রতি আপনার হুকুম কি?” ইবনে আব্বাস বলিলেন, “তিন তালাক দ্বারাই সে তোমা হইতে ছুটিয়া গিয়াছে। বাকী সাতানব্বইটি দ্বারা তুমি আল্লাহর কিতাবের আয়াতের সাথে বিদ্রুপ করিয়াছ।” এখানে এ কথাও স্মরণযোগ্য যে, স্বয়ং রাবীর মত বা ফতওয়া যদি তাঁহার বর্ণনার বিপরীত হয়, তখন ফকীহগণ সে বর্ণনাকে দলীলরূপে গ্রহণ করেন না। মোটকথা, এ আলোচনা দ্বারা, বিশেষ করিয়া ইবনে মাসউদের হাদীস দ্বারা দেখা গেল যে, ইহার উপর মুজতাহিদ সাহাবীগণের ইজমা হইয়া গিয়াছে এবং পরবর্তী ইমামগণও ইহার উপর একমত হইয়াছেন।
