মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

১২- ক্রয় - বিক্রয়ের অধ্যায়

হাদীস নং: ২৮০৮
- ক্রয় - বিক্রয়ের অধ্যায়
৪. প্রথম অনুচ্ছেদ - সুদ
২৮০৮। হযরত ওবাদা ইবনে সামেত (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন: স্বর্ণ স্বর্ণের বিনিময়ে, রৌপ্য রৌপ্যের বিনিময়ে, গম গমের বিনিময়ে, যব যবের বিনিময়ে, খুর্মা খুর্মার বিনিময়ে, নিমক নিমকের বিনিময়ে আদান-প্রদান করা হইলে সমান সমান ও সমপরিমাণে হইতে হইবে এবং উভয় দিক হইতে উপস্থিত যখন তখন আদান-প্রদান হইতে হইবে। অবশ্য এইসব বস্তুর বিনিময় যদি এক জাতীয় বস্তু অপর জাতীয় বস্তুর সহিত হয়, তবে সেই ক্ষেত্রে তোমরা পরিমাণ যাহা ইচ্ছা নির্ধারিত করিতে পার যদি উভয়পক্ষ হইতে উপস্থিত আদান-প্রদান অনুষ্ঠিত হয়। -মুসলিম
كتاب البيوع
وَعَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ وَالْفِضَّةُ بِالْفِضَّةِ وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ وَالْملح بالملح مثلا بِمثل سَوَاء بسَواءٍ يَدًا بِيَدٍ فَإِذَا اخْتَلَفَتْ هَذِهِ الْأَصْنَافُ فَبِيعُوا كَيْفَ شِئْتُمْ إِذَا كَانَ يَدًا بِيَدٍ» . رَوَاهُ مُسلم

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ-বিষয়ক হাদীসসমূহ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) হযরত উমর (রা) হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা) হযরত আবু বকর (রা) হযরত আবু হুরায়রা (রা) প্রমুখসহ আরো অনেক সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। এসব হাদীসের দাবি ও উদ্দেশ্য এই যে, যে ছয় জিনিসের কথা এ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে (অর্থাৎ সোনা, রূপা, গম, যব (বার্লি), খেজুর, লবণ) যদি এ সবের কোন জাতের সাথে সে জাতীয় জিনিস দ্বারা বিনিময় করা হয় (যেমন গম দিয়ে এর বিনিময়ে গম নেয়া হয়) তবে এ বিষয় তখনই বৈধ হবে যখন উভয় দ্রব্য সমান ও নগদ আদান-প্রদান হবে। যদি কম বেশি হয় অথবা লেন-দেন নগদ (হাতে হাতে) না হয়, বরং ঋণ ও ধারের কথাবার্তা হয় তবে তা বৈধ হবে না বরং এটা এক প্রকার সুদের ব্যাপার হবে। এতে উভয় পক্ষ সুদের পাপে জড়িত হবে।

হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ (র) 'হজ্জাতুল্লাহিল বালিগা' গ্রন্থে এ সব হাদীসের ব্যাখ্যায় যা বলেছেন তার মর্মকথা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে এবং তাঁর পূর্বে জাহিলী যুগে যে সুদের প্রচলন ছিল এবং যাকে 'রিবা' বলা হত তা যখন ঋণ ও ধার জাতীয় সুদ ছিল। যার নমুনা (যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে) এরূপ ছিল যে, যে সব পুঁজিপতি মহাজন সুদী ব্যবসা করত অভাবী লোকজন তাদের নিকট থেকে ঋণ করত এবং এ বিষয় নির্ধারিত হত যে, এতে অতিরিক্তসহ অমুক সময় পর্যন্ত পরিশোধ করবে। এরপর যদি নির্ধারিত সময়ে সে পরিশোধ করতে সক্ষম না হত তবে আরো সময় নিত আর এ সময়ের হিসাবের মধ্যে সুদের টাকায় আরো অতিরিক্ত নির্ধারিত হত। (শাহ্ সাহেব বলেন,) এ সুদী কারবারেরই প্রচলন ছিল। আর এটাকেই রিবা বলা হত। কুরআন মাজীদে সরাসরি ইহাকে হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তা'আলারই নির্দেশে ক্রয়-বিক্রয়ের কোন কোন পন্থাও রিবার নির্দেশে অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা দেন এবং এ থেকেও বাঁচার তাকিদ প্রদান করেন। এসব হাদীসে এ ঘোষণাই করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ও দাবি হচ্ছে হাদীসে বর্ণিত উপরোল্লিখিত ছয়টি দ্রব্যের মধ্যে কোন প্রকার যদি অনুরূপ জাতীয় দ্রব্যের সাথে বিনিময় করা হয় তবে শর্ত হচ্ছে কোন ভাগে কম-বেশি হবে না, বরং সমান সমান হবে এবং লেন-দেন নগদ হবে। যদি বিনিময়ের মধ্যে কম-বেশি হয় অথবা লেন-দেন নগদ না হয় তবে তা এক প্রকার সুদ হবে এবং উভয় পক্ষ গুনাহগার হবে

হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (র) স্বীয় রীতি অনুযায়ী এ নির্দেশের যে দর্শন বর্ণনা করেছেন, তার সারকথা হচ্ছে- আল্লাহ তা'আলা বিলাসী ও অতি উঁচুস্তরের জাঁক-জমকের জীবন-যাপন পছন্দ করেন না। কেননা যে ব্যক্তি অতি উচুস্তরের বিলাসী জীবন-যাপন করবে সে অবশ্যম্ভাবীরূপে দুনিয়া অম্বেষণে বেশি জড়িত হবে। পক্ষান্তরে আখিরাতের জীবনকে সুন্দর করতে ও আত্মার পবিত্রতার চিন্তা থেকে অতটুকুই গাফিল হবে। এ ছাড়া অতিরিক্ত উঁচুনিচুর ফলে সমাজে যে বিভিন্ন প্রকার ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি হয় তা সৃষ্টি হবে। বিলাসী ও উঁচু পর্যায়ের জীবনের দাবি হচ্ছে প্রতিটি জিনিস উৎকৃষ্ট থেকে উৎকৃষ্টতর ও উন্নত মানের ব্যবহার করা হবে। গম উন্নত মানের খাওয়া হবে, খেজুর উন্নতমানের খাওয়া হবে, সোনা-রূপা উৎকৃষ্ট মানের ব্যবহার করা হবে। যার বাস্তব নমুনা প্রায়ই এরকম হয়ে থাকে যে, যদি নিজের নিকট উত্তম দ্রব্য না থাকে বরং নিম্নমানের থাকে তবে সে বেশি পরিমাণ দিয়ে তার পরিবর্তে উত্তম মানের অল্প পরিমাণ নিয়ে নেয়। বস্তুত কম-বেশি করে এক দ্রব্য অনুরূপ দ্রব্য দিয়ে বিনিময় করা সাধারণত বিলাসী ও উঁচু জীবন যাপনের দাবি থেকে হত। তাই এর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে এ পথে বাধা প্রদান করা হয়। এবং একটা সীমা পর্যন্ত তা বন্ধ করা হয়।

আল্লাহই এ নির্দেশের রহস্য ভাল জানেন। হাদীসে কেবল উল্লেখিত ছয়টি জিনিস সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে উম্মতের ফকীহ-মুজতাহিদগণ এ বিষয়ে প্রায় ঐক্যমত পোষণ করেন যে, এই ছয়টি জিনিস ছাড়াও যে সব জিনিস উক্ত প্রকারের সেগুলোরও হুকুম এটাই। যদিও বিস্তারিত বিবরণে ফকীহগণের অভিমতের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য ও মতভেদ রয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান