মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

৯- কুরআনের ফাযাঈল অধ্যায়

হাদীস নং: ২২২১
২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - কিরাআতের ভিন্নতা ও কুরআন সংকলন প্রসঙ্গে
২২২১। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান খলীফা ওসমান গনী (রাঃ)-এর নিকট মদীনায় আগমন করিলেন, আর তখন তিনি (হুযায়ফা) ইরাকীদের সাথে থাকিয়া আর্মেনিয়া ও আযারবাইজান জয় করার জন্য শামবাসীদের সহিত যুদ্ধ করিতেছিলেন। লোকের বিভিন্ন রীতিতে কোরআন পাঠ হযরত হুযায়ফাকে উদ্বিগ্ন করিয়া তুলিল। হুযায়ফা হযরত ওসমানকে বলিলেন, হে আমীরুল মু'মিনীন! ইহুদী ও নাসারা -দের ন্যায় আল্লাহর কিতাবে বিভিন্নতা সৃষ্টির পূর্বে আপনি এই জাতিকে রক্ষা করুন। সুতরাং হযরত ওসমান উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসার নিকট বলিয়া পাঠাইলেন, আপনার নিকট রক্ষিত কোরআনের সহীফাসমূহ (খণ্ডসমূহ) আমাদের নিকট পাঠাইয়া দিন। আমরা উহা বিভিন্ন মাসহাফে (কিতাবে) অনুলিপি করিয়া অতঃপর উহা আপনাকে ফিরাইয়া দিব। বিবি হাফসা উহা হযরত ওসমানের নিকট পাঠাইয়া দিলেন আর হযরত ওসমান সাহাবী যায়দ ইবনে সাবেত, আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবায়র, সায়ীদ ইবনে আ'স ও আব্দুল্লাহ্ ইবনে হারেস ইবনে হেশামকে উহা লিপি করিতে নির্দেশ দিলেন। সেমতে তাঁহারা বিভিন্ন মাসহাফে উহার অনুলিপি করিলেন। সে সময় হযরত ওসমান কুরাইশী তিনজনকে বলিয়া দিয়াছিলেন, যখন কোরআনের কোন স্থানে যায়দের সাথে আপনাদের মতভেদ হইবে, তখন আপনারা উহা কুরাইশদের রীতিতেই লিপিবদ্ধ করিবেন। কেননা, কোরআন (মূলতঃ) তাহাদের রীতিতেই নাযিল হইয়াছে। তাঁহারা সে মতে কাজ করিলেন। অবশেষে যখন তাঁহারা সমস্ত সহীফা বিভিন্ন মাসহাফে অনুলিপি করিলেন, হযরত ওসমান উক্ত সহীফাসমূহ বিবি হাফসার নিকট ফেরত পাঠাইলেন এবং তাহারা যাহা অনুলিপি করিয়াছিলেন উহার এক এক কপি রাজ্যের এক এক এলাকায় পাঠাইয়া দিলেন, আর ইহাছাড়া যে কোন সহীফায় বা মাসহাফে লেখা কোরআনকে জ্বালাইয়া দিতে নির্দেশ দিলেন।
ইবনে শেহার মুহরী বলেন, যায়দ ইবনে সাবেতের পুত্র খারেজা আমাকে জানাইয়াছেন যে, তিনি তাঁহার পিতা যায়দ ইবনে সাবেতকে বলিতে শুনিয়াছেন, আমরা যখন কোরআন নকল করি, তখন সূরা আহযাবের একটি আয়াত পাইলাম না, যাহা আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-কে পড়িতে শুনিয়াছি। অতএব, আমরা উহা তালাশ করিলাম এবং খুযাইমা ইবনে সাবেত আনসারীর নিকট উহা পাইলাম। অতঃপর আমরা উহাকে উহার সূরায় মাসহাফে সংযোজন করিলাম। তাহা হইতেছে, “মিনাল মু'মিনীনা রিজালুন সাদাকু মা আহাদুল্লাহা আলাইহি।” —বুখারী
وَعَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ: أَنَّ حُذَيْفَةَ بْنَ الْيَمَانِ قَدِمَ عَلَى عُثْمَانَ وَكَانَ يُغَازِي أَهْلَ الشَّامِ فِي فَتْحِ أَرْمِينِيَّةَ وَأَذْرَبِيجَانَ مَعَ أَهْلِ الْعِرَاقِ فَأَفْزَعَ حُذَيْفَةَ اخْتِلَافُهُمْ فِي الْقِرَاءَةِ فَقَالَ حُذَيْفَةُ لِعُثْمَانَ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ أَدْرِكْ هَذِهِ الْأُمَّةَ قَبْلَ أَنْ يَخْتَلِفُوا فِي الْكِتَابِ اخْتِلَافَ الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى فَأَرْسَلَ عُثْمَانُ إِلَى حَفْصَةَ أَنْ أَرْسِلِي إِلَيْنَا بِالصُّحُفِ نَنْسَخُهَا فِي الْمَصَاحِفِ ثُمَّ نَرُدُّهَا إِلَيْكِ فَأَرْسَلَتْ بِهَا حَفْصَةُ إِلَى عُثْمَانَ فَأَمَرَ زَيْدَ بْنَ ثَابِتٍ وَعَبْدَ اللَّهِ بْنَ الزبير وَسَعِيد بن الْعَاصِ وَعبد الرَّحْمَن بْنَ الْحَارِثِ بْنِ هِشَامٍ فَنَسَخُوهَا فِي الْمَصَاحِفِ وَقَالَ عُثْمَانُ لِلرَّهْطِ الْقُرَشِيِّينَ الثَّلَاثِ إِذَا اخْتَلَفْتُمْ فِي شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ فَفَعَلُوا حَتَّى إِذَا نَسَخُوا الصُّحُفَ فِي الْمَصَاحِفِ رَدَّ عُثْمَانُ الصُّحُفَ إِلَى حَفْصَةَ وَأَرْسَلَ إِلَى كُلِّ أُفُقٍ بِمُصْحَفٍ مِمَّا نَسَخُوا وَأَمَرَ بِمَا سِوَاهُ مِنَ الْقُرْآنِ فِي كُلِّ صَحِيفَةٍ أَوْ مُصْحَفٍ أَنْ يُحْرَقَ قَالَ ابْن شهَاب وَأَخْبرنِي خَارِجَة بن زيد بن ثَابت سَمِعَ زَيْدَ بْنَ ثَابِتٍ قَالَ فَقَدْتُ آيَةً مِنَ الْأَحْزَابِ حِينَ نَسَخْنَا الْمُصْحَفَ قَدْ كُنْتُ أَسْمَعُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقْرَأُ بِهَا فَالْتَمَسْنَاهَا فَوَجَدْنَاهَا مَعَ خُزَيْمَةَ بْنِ ثَابِتٍ الْأَنْصَارِيِّ (مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا الله عَلَيْهِ)

فَأَلْحَقْنَاهَا فِي سُورَتِهَا فِي الْمُصْحَفِ. رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

'জ্বালাইয়া দিতে নির্দেশ দিলেন'—ইহাতে বুঝা গেল যে, ব্যবহারের অযোগ্য কোরআনের কপি জ্বালাইয়া দেওয়াই উত্তম। তবে পরবর্তী ওলামাদের কেহ কেহ উহাকে পানিতে ধুইয়া উহার অক্ষর মুছিয়া ফেলিতে বলিয়াছেন। ইহা তৎকালের হাতের লিখার পক্ষে সম্ভবপর ছিল। একালের ছাপানো অক্ষরে ইহা সম্ভবপর নহে। সুতরাং উহা জ্বালাইয়া দেওয়া বা কবরস্থানে দাফন করাই উত্তম।
‘সূরা আহযাবের একটি আয়াত পাইলাম না'—অর্থাৎ, লিখিতরূপে পাইলাম না। উক্তিটি হযরত যায়দ সিদ্দিকী আমলের সংকলন সম্পর্কেই করিয়াছেন। কেননা, ওসমানী আমলে সংকলন হয় নাই যাহাতে কোন আয়াতের পাওয়া না পাওয়ার কথা আসিতে পারে, হইয়াছে শুধু পূর্বোল্লিখিত কপির নকল মাত্র। কিন্তু হযরত যায়দের পুত্র সময়ের উল্লেখ না করিয়া কথাটি এমনভাবে বলিয়াছেন যাহাতে বাহ্য দৃষ্টিতে মনে হয় যে, উহা ওসমানী আমলেরই কথা। মোটকথা, সিদ্দিকী আমলের সংকলনকালে হুযুরের সরকারী দপ্তরের লিখার বাহিরে সূরা তওবার শেষ আয়াতটি আবু খুযাইমা এবং সূরা আহযাবের এই আয়াতটি খুযাইমা ইবনে সাবেত ব্যতীত অপর কোন সাহাবীর নিকট লিখিতরূপে পাওয়া যায় নাই। অবশ্য হাফেয সাহাবীদের সকলের সিনায়ই ইহা বিদ্যমান ছিল।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মিশকাতুল মাসাবীহ - হাদীস নং ২২২১ | মুসলিম বাংলা