মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)
৯- কুরআনের ফাযাঈল অধ্যায়
হাদীস নং: ২২২২
২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - কিরাআতের ভিন্নতা ও কুরআন সংকলন প্রসঙ্গে
২২২২। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি একবার খলীফা হযরত ওসমানকে জিজ্ঞাসা করিলাম, কিসে আপনাদিগকে উদ্বুদ্ধ করিল যে, আপনারা সূরা আনফাল’, যাহা মাসানির অন্তর্গত ও সূরা 'বারাআত' যাহা মেয়ীনের অন্তর্গত, উভয়কে এক জায়গায় করিয়া দিলেন, আবার উহাদের মধ্যখানে 'বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম' লাইনও লেখিলেন না আর উহাদিগকে স্থান দিলেন সাবয়ে তেওয়ালের মধ্যে ?—কিসে আপনাদিগকে এইরূপ করিতে উদ্বুদ্ধ করিল? হযরত ওসমান বলিলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর অবস্থা এই ছিল যে, দীর্ঘদিন এমনি অতিবাহিত হইত (তাহার উপর কিছু নাযিল হইত না); আবার কখনও তাঁহার উপর বিভিন্ন সূরা নাযিল হইত; যখন তাঁহার উপর কোরআনের কোন কিছু নাযিল হইত, তিনি তাহার কোন লেখক সাহাবীকে ডাকিয়া বলিতেন, এসকল আয়াতকে অমুক সূরায় রাখ, যাহাতে অমুক অমুক বর্ণনা রহিয়াছে, অতঃপর যখন অপর কোন আয়াত নাযিল হইত, বলিতেন, এই আয়াতকে অমুক সূরায় রাখ যাহাতে অমুক অমুক বর্ণনা রহিয়াছে। সূরা 'আনফাল' হইল মদীনায় প্রথম অবতীর্ণ সূরাসমূহের অন্তর্গত আর 'বারাআত' হইল অবতীর্ণের দিক দিয়া শেষ, অথচ ইহার বিবরণ উহার বিবরণেরই অনুরূপ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-কে উঠাইয়া লওয়া হইল, অথচ তিনি আমাদিগকে বলিয়া যাইতে পারিলেন না উহা আনফালের অন্তর্গত কিনা। এ কারণেই (অর্থাৎ, উভয়ের মদনী হওয়ার ও বিবরণ এক হওয়ার কারণেই) আমি পরস্পরকে মিলাইয়া দিয়াছি এবং বিসমিল্লাহর ছতরও লেখি নাই এবং উহাকে সাবয়ে তেওয়ালের মধ্যে স্থান দিয়াছি। —আহমদ, তিরমিযী ও আবু দাউদ
وَعَن ابْن عَبَّاس قَالَ: قلت لعُثْمَان بن عَفَّان مَا حملكم أَنْ عَمَدْتُمْ إِلَى الْأَنْفَالِ وَهِيَ مِنَ الْمَثَانِي وَإِلَى بَرَاءَةٍ وَهِيَ مِنَ الْمَئِينِ فَقَرَنْتُمْ بَيْنَهُمَا وَلم تكْتبُوا بَينهمَا سَطْرَ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ وَوَضَعْتُمُوهَا فِي السَّبع الطول مَا حملكم على ذَلِك فَقَالَ عُثْمَانُ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِمَّا يَأْتِي عَلَيْهِ الزَّمَان وَهُوَ تنزل عَلَيْهِ السُّور ذَوَات الْعدَد فَكَانَ إِذا نزل عَلَيْهِ الشَّيْء دَعَا بعض من كَانَ يَكْتُبُ فَيَقُولُ: «ضَعُوا هَؤُلَاءِ الْآيَاتِ فِي السُّورَةِ الَّتِي يُذْكَرُ فِيهَا كَذَا وَكَذَا» فَإِذَا نَزَلَتْ عَلَيْهِ الْآيَةُ فَيَقُولُ: «ضَعُوا هَذِهِ الْآيَةَ فِي السُّورَةِ الَّتِي يُذْكَرُ فِيهَا كَذَا وَكَذَا» . وَكَانَتِ الْأَنْفَالُ مِنْ أَوَائِلِ مَا نَزَلَتْ بِالْمَدِينَةِ وَكَانَتْ بَرَاءَة من آخر الْقُرْآن وَكَانَت قصَّتهَا شَبيهَة بِقِصَّتِهَا فَظَنَنْت أَنَّهَا مِنْهَا فَقُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَمْ يبين لنا أَنَّهَا مِنْهَا فَمِنْ أَجْلِ ذَلِكَ قَرَنْتُ بَيْنَهُمَا وَلِمَ أكتب بَينهمَا سَطْرَ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ وَوَضَعْتُهَا فِي السَّبْعِ الطُّوَلِ. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وَأَبُو دَاوُدَ
হাদীসের ব্যাখ্যা:
আয়াত ও সূরাসমূহের বিন্যাসঃ
এখানে রহিয়াছে, হুযুর তাঁহার লেখকদিগকে বলিতেন, “ইহা অমুক সূরার অমুক জায়গায় রাখ।” আর হুযূরকে বলিয়া দিতেন স্বয়ং জিব্রাঈল (আঃ)। মুসনাদে আহমদে আছে, হযরত ওসমান ইবনে আবিল আস (রাঃ) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর নিকট বসিয়া রহিয়াছি, এমন সময় তিনি চক্ষু উপরে উঠাইলেন অতঃপর নীচে নামাইলেন এবং বলিলেন, হযরত জিব্রাঈল এখন আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, এই আয়াতটি এই সূরার এই জায়গায় রাখুন—ইন্নাল্লাহা ইয়া'মুরু বিল আদলে ওয়াল এহ্সান। (এতকান, ৬০) ইহাতে বুঝা গেল যে, আয়াতসমূহের তরতীব (ক্রমবিন্যাস) আল্লাহর নির্দেশ অনুসারেই হইয়াছে। ইহার উপরই সমস্ত মুসলমানদের এজমা বা মতৈক্য রহিয়াছে।
বাকী রহিল সূরাসমূহের তরতীব। এ সম্পর্কে ওলামাদের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। কিন্তু সহীহ্ কথা এই যে, ইহাও আল্লাহ্ ও রাসূলের নির্দেশ অনুসারেই হইয়াছে। সাহাবীদের বিবেচনা অনুসারে হইলে মক্কী মদনী সূরা বা ছোট-বড় সূরা বা যে যে সূরায় অন্ততঃ যে বিষয়ের বর্ণনা অধিক রহিয়াছে সে সে সূরা অনুসারে অথবা সূরার প্রারম্ভিক শব্দাবলী অনুসারেই হইত। যেমন, 'হা-মীম'-ওয়ালা ও 'ত্বা-সীন'-ওয়ালা সূরাসমূহে হইয়াছে, অথচ মুসাব্বেহাতের তরতীব এই নিয়মে হয় নাই। তবে সূরা বারাআত বা তওবা সম্পর্কে হুযূরের নির্দেশ কি ছিল তাহা জানা যায় নাই। সম্ভবতঃ উহা সর্বশেষে নাযিল হওয়ার কারণেই।
তবে যে বলা হইয়া থাকে, হযরত আলী (রাঃ) নাযিল হওয়ার ক্রম অনুসারে এবং হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) অপর এক নিয়মে কোরআনের এক একটি তরতীব দিয়াছিলেন, তাহা সম্ভবতঃ তাঁহারা তাঁহাদের বুঝার সুবিধার জন্যই দিয়াছিলেন। সুতরাং কোন কোন পাশ্চাত্য লিখক যে বলেন, “মুহাম্মদের পর তাঁহার শিষ্যগণ কোরআনকে যত্রতত্রভাবে সাজাইয়াছেন। ফলে উহা বিষয়ওয়ারী হয় নাই।" ইহা তাহাদের ডাহা মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক কথা। ব্যাপার এই যে, কোরআন আসলে কতক খোতবা বা ভাষণের সমষ্টি। ভাষণে যেমন ভাষণদানকারী বক্তব্য-বিষয়কে শ্রোতাদের নিকট হৃদয়গ্রাহী ও তাহাদের অন্তরে বদ্ধমূল করার জন্য নানা পদ্ধতিতে নানা উপমা-উদাহরণ, নানা গল্প-কাহিনী ও নানা অলঙ্কার-ব্যঞ্জনা দ্বারা পুনঃ পুনঃ পেশ করেন, কোরআনে ঠিক তেমনই করা হইয়াছে। ইহার এক একটি সূরা এক একটি পূর্বস্থিরীকৃত (লওহে মাহফুযে স্থিরীকৃত) ভাষণ। ইহার কোনটি সম্পূর্ণ একবারে আর কোনটি আবশ্যক অনুসারে বিভিন্ন বারে নাযিল হইয়াছে। (কিন্তু উহার তরতীব আসল অনুসারেই দেওয়া হইয়াছে।) এ কারণেই তৎকালের কোরআনের বিরুদ্ধবাদী কবি-সাহিত্যিকরা অন্তরে উহাকে ঘায়েল করার সম্পূর্ণ ইচ্ছা রাখা সত্ত্বেও উহার ভাষা, বর্ণনা বা বিন্যাস সম্পর্কে কোন আপত্তি উত্থাপন করিতে পারেন নাই, অথচ তাহাদিগকে ইহার জন্য বার বার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হইয়াছে ; বরং তাহারা ইহার বিমোহনী শক্তির ভয়ে নিজেদের সন্তান-সন্ততি ও বন্ধু-বান্ধবকে উহা শুনিতে বাধা দিয়াছেন।
এখানে রহিয়াছে, হুযুর তাঁহার লেখকদিগকে বলিতেন, “ইহা অমুক সূরার অমুক জায়গায় রাখ।” আর হুযূরকে বলিয়া দিতেন স্বয়ং জিব্রাঈল (আঃ)। মুসনাদে আহমদে আছে, হযরত ওসমান ইবনে আবিল আস (রাঃ) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর নিকট বসিয়া রহিয়াছি, এমন সময় তিনি চক্ষু উপরে উঠাইলেন অতঃপর নীচে নামাইলেন এবং বলিলেন, হযরত জিব্রাঈল এখন আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, এই আয়াতটি এই সূরার এই জায়গায় রাখুন—ইন্নাল্লাহা ইয়া'মুরু বিল আদলে ওয়াল এহ্সান। (এতকান, ৬০) ইহাতে বুঝা গেল যে, আয়াতসমূহের তরতীব (ক্রমবিন্যাস) আল্লাহর নির্দেশ অনুসারেই হইয়াছে। ইহার উপরই সমস্ত মুসলমানদের এজমা বা মতৈক্য রহিয়াছে।
বাকী রহিল সূরাসমূহের তরতীব। এ সম্পর্কে ওলামাদের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। কিন্তু সহীহ্ কথা এই যে, ইহাও আল্লাহ্ ও রাসূলের নির্দেশ অনুসারেই হইয়াছে। সাহাবীদের বিবেচনা অনুসারে হইলে মক্কী মদনী সূরা বা ছোট-বড় সূরা বা যে যে সূরায় অন্ততঃ যে বিষয়ের বর্ণনা অধিক রহিয়াছে সে সে সূরা অনুসারে অথবা সূরার প্রারম্ভিক শব্দাবলী অনুসারেই হইত। যেমন, 'হা-মীম'-ওয়ালা ও 'ত্বা-সীন'-ওয়ালা সূরাসমূহে হইয়াছে, অথচ মুসাব্বেহাতের তরতীব এই নিয়মে হয় নাই। তবে সূরা বারাআত বা তওবা সম্পর্কে হুযূরের নির্দেশ কি ছিল তাহা জানা যায় নাই। সম্ভবতঃ উহা সর্বশেষে নাযিল হওয়ার কারণেই।
তবে যে বলা হইয়া থাকে, হযরত আলী (রাঃ) নাযিল হওয়ার ক্রম অনুসারে এবং হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) অপর এক নিয়মে কোরআনের এক একটি তরতীব দিয়াছিলেন, তাহা সম্ভবতঃ তাঁহারা তাঁহাদের বুঝার সুবিধার জন্যই দিয়াছিলেন। সুতরাং কোন কোন পাশ্চাত্য লিখক যে বলেন, “মুহাম্মদের পর তাঁহার শিষ্যগণ কোরআনকে যত্রতত্রভাবে সাজাইয়াছেন। ফলে উহা বিষয়ওয়ারী হয় নাই।" ইহা তাহাদের ডাহা মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক কথা। ব্যাপার এই যে, কোরআন আসলে কতক খোতবা বা ভাষণের সমষ্টি। ভাষণে যেমন ভাষণদানকারী বক্তব্য-বিষয়কে শ্রোতাদের নিকট হৃদয়গ্রাহী ও তাহাদের অন্তরে বদ্ধমূল করার জন্য নানা পদ্ধতিতে নানা উপমা-উদাহরণ, নানা গল্প-কাহিনী ও নানা অলঙ্কার-ব্যঞ্জনা দ্বারা পুনঃ পুনঃ পেশ করেন, কোরআনে ঠিক তেমনই করা হইয়াছে। ইহার এক একটি সূরা এক একটি পূর্বস্থিরীকৃত (লওহে মাহফুযে স্থিরীকৃত) ভাষণ। ইহার কোনটি সম্পূর্ণ একবারে আর কোনটি আবশ্যক অনুসারে বিভিন্ন বারে নাযিল হইয়াছে। (কিন্তু উহার তরতীব আসল অনুসারেই দেওয়া হইয়াছে।) এ কারণেই তৎকালের কোরআনের বিরুদ্ধবাদী কবি-সাহিত্যিকরা অন্তরে উহাকে ঘায়েল করার সম্পূর্ণ ইচ্ছা রাখা সত্ত্বেও উহার ভাষা, বর্ণনা বা বিন্যাস সম্পর্কে কোন আপত্তি উত্থাপন করিতে পারেন নাই, অথচ তাহাদিগকে ইহার জন্য বার বার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হইয়াছে ; বরং তাহারা ইহার বিমোহনী শক্তির ভয়ে নিজেদের সন্তান-সন্ততি ও বন্ধু-বান্ধবকে উহা শুনিতে বাধা দিয়াছেন।
