মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

৫- নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ১১৪৭
২৮. তৃতীয় অনুচ্ছেদ - মোকতাদীর কর্তব্য ও মসবুকের করণীয়
১১৪৭। তাবেয়ী হযরত ওবায়দুল্লাহ্ ইবনে আব্দুল্লাহ্ (রাঃ) বলেন, একদা আমি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট যাইয়া বলিলাম, (আম্মা!) আপনি কি আমাকে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর এন্তেকালের রোগ সম্পর্কে কোন বর্ণনা দান করিবেন না ? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ (নিশ্চয়ই করিব, শুন,) নবী করীম (ﷺ)-এর রোগ যখন গুরুতর আকার ধারণ করিল, তিনি একবার বলিলেন, লোকেরা কি নামায পড়িয়া ফেলিয়াছে ? আমরা বলিলাম, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তাহারা আপনার অপেক্ষা করিতেছে। হুযূর বলিলেনঃ আমার জন্য গামলায় পানি ঢাল। হযরত আয়েশা বলেন, আমরা তাহা করিলাম। হুযূর গোসল করিলেন এবং খুব কষ্টে দাঁড়াইতে চাহিলেন; কিন্তু অজ্ঞান হইয়া গেলেন। অতঃপর জ্ঞান লাভ করিলেন এবং পুনঃ জিজ্ঞাসা করিলেন, লোকেরা কি নামায পড়িয়া ফেলিয়াছে ? আমরা বলিলাম, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তাহারা আপনার অপেক্ষা করিতেছে। হুযূর বলিলেন, আমার জন্য গামলায় পানি ঢাল। হযরত আয়েশা বলেন, হুযূর উঠিয়া বসিলেন এবং পুনঃ গোসল করিলেন। অতঃপর দাঁড়াইতে চেষ্টা করিলেন; কিন্তু আবার অজ্ঞান হইয়া গেলেন। পুনরায় জ্ঞান লাভ করিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, লোকেরা কি নামায পড়িয়া ফেলিয়াছে ? আমরা বলিলাম, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তাহারা আপনার অপেক্ষায় আছে। হুযূর আবার বলিলেন, আমার জন্য গামলায় পানি ঢাল। হুযূর উঠিয়া বসিলেন এবং তৃতীয়বার গোসল করিলেন। অতঃপর দাঁড়াইতে চেষ্টা করিলেন; কিন্তু এবারও অজ্ঞান হইয়া গেলেন। অতঃপর জ্ঞান লাভ করিলেন এবং আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, লোকেরা কি নামায পড়িয়া ফেলিয়াছে ? আমরা বলিলাম, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তাহারা আপনার অপেক্ষায় আছে।
(হযরত আয়েশা বলেন,) লোকেরা তখন দ্বিতীয় এশার নামাযের জন্য নবী করীম (ﷺ)-এর অপেক্ষায় মসজিদে অবস্থান করিতেছিল। নবী করীম (ﷺ) হযরত আবু বকরের নিকট লোক পাঠাইলেন, তিনি যেন লোকদের নামায পড়াইয়া দেন। বার্তাবাহক আবু বকরের নিকট পৌঁছিয়া বলিল, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) আপনাকে নির্দেশ দিতেছেন, আপনি যেন লোকদের নামায পড়াইয়া দেন। (হযরত আয়েশা বলেন,) হযরত আবু বকর (রাঃ) একজন কোমল হৃদয় ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বলিলেন, হে ওমর! আপনি লোকদের নামায পড়াইয়া দিন। হযরত ওমর (রাঃ) বলিলেন, আপনিই ইহার জন্য অধিকতর যোগ্য। (হযরত আয়েশা বলেন,) সুতরাং হযরত আবু বকরই সেই কয়দিনের (১৭ দিনের) নামায পড়াইলেন। অতঃপর একদিন নবী করীম (ﷺ) কিছুটা উপশম বোধ করিলেন এবং দুই ব্যক্তির সাহায্যে — যাহাদের মধ্যে একজন হযরত আব্বাস ছিলেন—যোহরের নামাযের জন্য বাহির হইলেন, আর তখন হযরত আবু বকর লোকদের নামায পড়াইতেছিলেন। হযরত আবু বকর যখন হুযূরকে দেখিলেন, পিছনে সরিয়া যাইতে উদ্যত হইলেন, তখন নবী করীম (ﷺ) তাঁহাকে ইশারা করিলেন যেন পিছনে না সরেন এবং সাথীদ্বয়কে বলিলেন, আমাকে আবু বকরের পাশে বসাও। সুতরাং তাঁহার তাঁহাকে তাঁহার পাশে বসাইলেন এবং নবী করীম (ﷺ) বসিয়া রহিলেন। (অর্থাৎ, দাঁড়াইতে পারিলেন না)।
রাবী ওবায়দুল্লাহ্ বলেন, একবার আমি (হযরত আব্বাসের পুত্র) হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাসের নিকট গেলাম এবং তাঁহাকে বলিলাম, হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর এন্তেকালের রোগ সম্পর্কে আমাকে যে বিবরণ দান করিয়াছেন, তাহা কি আপনার নিকট পেশ করিব না ? তিনি বলিলেন, করুন। অতঃপর আমি তাঁহার নিকট হযরত আয়েশার বিবৃত বিবরণ পেশ করিলাম। তিনি উহার কোন অংশই অস্বীকার করিলেন না। শুধুমাত্র একথাই জিজ্ঞাসা করিলেন, যে ব্যক্তি হযরত আব্বাসের সহিত ছিলেন, হযরত আয়েশা কি আপনাকে তাঁহার নাম বাতলাইয়াছেন? আমি বলিলাম, না। তিনি বলিলেন, সেই ব্যক্তি ছিলেন হযরত আলী (রাঃ)। — মোত্তাঃ
عَن عبيد الله بن عبد الله بن عتبَة قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى عَائِشَةَ فَقُلْتُ أَلَا تُحَدِّثِينِي عَنْ مَرَضِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَتْ بَلَى ثَقُلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم فَقَالَ: «أصلى النَّاس؟» قُلْنَا لَا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَهُمْ يَنْتَظِرُونَكَ فَقَالَ: «ضَعُوا لِي مَاءً فِي الْمِخْضَبِ» قَالَتْ فَفَعَلْنَا فَاغْتَسَلَ فَذَهَبَ لِيَنُوءَ فَأُغْمِيَ عَلَيْهِ ثُمَّ أَفَاقَ فَقَالَ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: «أَصَلَّى النَّاسُ؟» قُلْنَا لَا هُمْ يَنْتَظِرُونَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: «ضَعُوا لِي مَاءً فِي الْمِخْضَبِ» قَالَتْ فَقَعَدَ فَاغْتَسَلَ ثُمَّ ذَهَبَ لِيَنُوءَ فَأُغْمِيَ عَلَيْهِ ثُمَّ أَفَاقَ فَقَالَ: «أَصَلَّى النَّاسُ؟» قُلْنَا لَا هُمْ يَنْتَظِرُونَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ: «ضَعُوا لِي مَاءً فِي الْمِخْضَبِ» فَقَعَدَ فَاغْتَسَلَ ثُمَّ ذَهَبَ لِيَنُوءَ فَأُغْمِيَ عَلَيْهِ ثُمَّ أَفَاقَ فَقَالَ: «أَصَلَّى النَّاسُ» . قُلْنَا لَا هُمْ يَنْتَظِرُونَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَالنَّاسُ عُكُوفٌ فِي الْمَسْجِدِ يَنْتَظِرُونَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِصَلَاةِ الْعِشَاءِ الْآخِرَةِ. فَأَرْسَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى أَبِي بَكْرٍ بِأَنْ يُصَلِّيَ بِالنَّاسِ فَأَتَاهُ الرَّسُولُ فَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُكَ أَنْ تُصَلِّيَ بِالنَّاسِ فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ وَكَانَ رَجُلًا رَقِيقًا يَا عُمَرُ صَلِّ بِالنَّاسِ فَقَالَ لَهُ عُمَرُ أَنْتَ أَحَقُّ بِذَلِكَ فَصَلَّى أَبُو بَكْرٍ تِلْكَ الْأَيَّامَ ثُمَّ إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وجد من نَفْسِهِ خِفَّةً وَخَرَجَ بَيْنَ رَجُلَيْنِ أَحَدُهُمَا الْعَبَّاسُ لِصَلَاةِ الظُّهْرِ وَأَبُو بَكْرٍ يُصَلِّي بِالنَّاسِ فَلَمَّا رَآهُ أَبُو بَكْرٍ ذَهَبَ لِيَتَأَخَّرَ فَأَوْمَأَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِأَنْ لَا يَتَأَخَّرَ قَالَ: «أَجْلِسَانِي إِلَى جَنْبِهِ» فَأَجْلَسَاهُ إِلَى جَنْبِ أَبِي بَكْرٍ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم قَاعد. قَالَ عُبَيْدُ اللَّهِ: فَدَخَلْتُ عَلَى عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبَّاسٍ فَقُلْتُ لَهُ أَلَا أَعْرِضُ عَلَيْكَ مَا حَدَّثتنِي بِهِ عَائِشَةُ عَنْ مَرَضِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ قَالَ هَاتِ فَعَرَضْتُ عَلَيْهِ حَدِيثَهَا فَمَا أَنْكَرَ مِنْهُ شَيْئًا غَيْرَ أَنَّهُ قَالَ أَسَمَّتْ لَكَ الرَّجُلَ الَّذِي كَانَ مَعَ الْعَبَّاسِ قلت لَا قَالَ هُوَ عَليّ رَضِي الله عَنهُ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. 'দ্বিতীয় এশা' – তৎকালের আরবগণ মাগরিবকে প্রথম এশা এবং এশাকে দ্বিতীয় এশা বলিত। হাদীসটি উপরের হযরত আয়েশার ১০৭২ নং হাদীসেরই বিস্তারিত বিবরণ। আর উহাতে হুযূরের বসিয়া ইমামত করার এবং হযরত আবু বকর মোকতাদী ও মোকাব্বের হইয়া নামায পড়ার কথাই রহিয়াছে। এই হাদীস হইতে একথাও বুঝা গেল যে, হুযূরের ওফাতের পর খেলাফতের জন্য সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত ব্যক্তি হযরত আবু বকরই ছিলেন। কেননা, হুযূর (ﷺ) ইসলামে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য তাঁহাকে আপন খলীফা নিযুক্ত করিয়াছেন।

২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাতের আগের বৃহস্পতিবার ইশার সময় খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে তাঁর পক্ষে মসজিদে গিয়ে ইমামত করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই তিনি ঘরের লোকদের হুকুম দিলেন, যেন তারা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-কে ইমামত করতে বলেন। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-এর মন ছিল অত্যন্ত নরম। কুরআন মাজীদ তিলাওয়াতকালে তাঁর কান্না চলে আসত। কান্নার বেগ বেশি হলে স্বাভাবিক গতিতে তিলাওয়াত করা সম্ভব হয় না। ইমামত করার সময় এরূপ অবস্থা হলে সাবলীলভাবে কুরআন পাঠ করা কঠিন হয়ে যায়। আবার সময়টা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতাকালীন। এ কারণে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি, এমনিতেও উদ্বিগ্ন ছিলেন। এ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্থানে দাঁড়িয়ে ইমামত করতে তাঁর অনেক বেশি চাপবোধ হওয়ার কথা। সেদিকে ইঙ্গিত করে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. বলেন যে, আপনার স্থানে দাঁড়িয়ে তিনি নামায পড়লে কান্নার কারণে মানুষকে কিরাআত, তাকবীর ইত্যাদি শোনাতে পারবেন না। অর্থাৎ কান্না অবস্থায় তাঁর উচ্চারণ জড়িয়ে যাবে। আওয়াজও উঁচু হবে না। ফলে মুক্তাদীগণ তা শুনতে পাবে না।

কিন্তু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব ওজর গ্রাহ্য করলেন না। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. তাঁর সবচে' বেশি প্রিয় মানুষ। বিভিন্ন আলামত-ইঙ্গিত দ্বারা বোঝা যায়, তাঁর একান্ত কামনা ছিল তাঁর ওফাতের পর হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-ই যেন প্রথম খলীফা হিসেবে মনোনীত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে নামাযের ইমামরূপে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করাটা এ কামনা পূরণে সহায়ক ছিল। অন্য কেউ এ দায়িত্ব পালন করলে তার দিকে কিছু লোকের ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা ছিল। হয়তো এটাকে তারা তার খলীফারূপে মনোনয়নের প্রতি ইঙ্গিত মনে করত। সে আশঙ্কার পথ বন্ধ করার জন্য হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-কে দিয়েই ইমামত করানোর প্রয়োজন ছিল। তাই সব ওজর প্রত্যাখ্যান করে তিনি বারবার হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-কেই ইমামত করার হুকুম দিতে বললেন।

সেমতে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্থলাভিষিক্তরূপে নামাযের ইমামত করলেন। এটা ছিল বৃহস্পতিবার ইশার নামায। এরপর থেকে সোমবার ফজর পর্যন্ত টানা ১৭ ওয়াক্ত নামাযে তিনি ইমামত করেন। ওফাতের পর যখন খলীফা নিয়োগের পালা আসে, তখন হযরত উমর ফারূক রাযি, হযরত আলী রাযি. প্রমুখ শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণ নামাযের এই ইমামতকে তাঁর বৃহত্তর ইমামত অর্থাৎ খেলাফতের পদমর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার পক্ষে একটি বড় শক্তিরূপে অবলম্বন করে নিয়েছিলেন।

যাহোক, এস্থলে এ হাদীছের মূল বিষয় হল কুরআন তিলাওয়াতকালে ক্রন্দন করা। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. তিলাওয়াতকালে খুব কাঁদতেন। এটা প্রকৃত মুমিনদের শান। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
মুমিন তো তারাই, (যাদের সামনে) আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় ভীত হয়, যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ পড়া হয়, তখন তা তাদের ঈমানের উন্নতি সাধন করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে
اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُتَشَابِهًا مَثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ ذَلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ
"আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী- এমন এক কিতাব যার বিষয়বস্তুসমূহ পরস্পর সুসামঞ্জস্য, (যার বক্তব্যসমূহ) পুনরাবৃত্তিকৃত, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে এর দ্বারা তাদের শরীর রোমাঞ্চিত হয়। তারপর তাদের দেহমন বিগলিত হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। এটা আল্লাহর হিদায়াত, যার মাধ্যমে তিনি যাকে চান সঠিক পথে নিয়ে আসেন আর আল্লাহ যাকে বিপথগামী করেন, তাকে সঠিক পথে আনার কেউ নেই।

কুরআন পড়ে দেহমন বিগলিত হওয়া মহান লোকদের মধ্যে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. ছিলেন শ্রেষ্ঠতম। মদীনা মুনাউওয়ারায় হিজরতের আগে তিনি মক্কা ছেড়ে পরিব্রাজকরূপে ভূপৃষ্ঠে ঘুরে বেড়ানো ও আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে জীবন কাটিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লে ইবনুদ্দাগিনাহ নামক মক্কার এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি তাঁকে নিরাপত্তা দিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। এ সময় তিনি বাড়ির আঙিনায় একটি ইবাদতখানা বানিয়ে সেখানে ইবাদত-বন্দেগী ও যিকর-তিলাওয়াতে মশগুল থাকেন। তিনি যখন বিগলিত মনে কুরআন তিলাওয়াত করতেন আর অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকতেন, তখন আশপাশের নারী-পুরুষ সকলে ঘর থেকে বের হয়ে আসত এবং তাঁর নিকট জড়ো হয়ে কুরআন শ্রবণে মগ্ন হয়ে পড়ত। কুরায়শ নেতৃবর্গ এটাকে অনেক বড় ঝুঁকিরূপে দেখছিল। তারা ভাবছিল, এভাবে চলতে থাকলে মক্কার সকল নারী-পুরুষ নিজ ধর্ম ছেড়ে ইসলাম কবুল করে নেবে। সুতরাং তাদের চাপে পড়ে ইবনুদ্দাগিনাহ তার দেওয়া নিরাপত্তা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। পরিশেষে হিজরতের পালা আসে। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনা মুনাওয়ারায় চলে আসেন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. এ হাদীছ প্রমাণ করে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-ই ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বাপেক্ষা বেশি প্রিয় সাহাবী।

খ. প্রথম খলীফা হিসেবে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-ই ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বাপেক্ষা পসন্দের ব্যক্তি।

গ. ‘ইলম ও আমলে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকেই ইমামরূপে মনোনীত করা উচিত।

ঘ. কুরআন পাঠকালে সম্ভব হলে ক্রন্দন করা উচিত। অন্ততপক্ষে ক্রন্দনের ভাব তো অবলম্বন করা চাই-ই।
২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান