মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

৫- নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ৬৫৭
- নামাযের অধ্যায়
৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - আযানের ফযীলত ও মুয়াযযিনের উত্তর দান
৬৫৭। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আছ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, তোমরা মুয়াযযিনের আযান শুনলে তার বাক্যসমূহের অনুরূপ বাক্য দ্বারা আযানের জবাব দিবে। তারপর আমার উপর দরূদ পড়বে। কেননা আমার উপর একবার দরূদ পাঠকারীর প্রতি আল্লাহ্ পাক দশবার রহমত নাযিল করেন। তারপর আমার জন্য আল্লাহর নিকট উছীলা কামনা করবে। আর তা হল বেহেশতে একটি উচ্চ মর্যাদার স্থান। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে মাত্র একজন বান্দা ব্যতীত কেউই তার উপযুক্ত নয়। আমি আশা করি, সেই বান্দা আমিই। আর যে ব্যক্তি আমার জন্য উছীলা চাইবে, তার জন্য আমার সুপারিশ ওয়াজিব (অবধারিত) হয়ে যাবে। -মুসলিম
كتاب الصلاة
بَابُ فَضْلِ الْاَذَانِ وَاِجَابَةِ الْـمُؤَذِّنِ
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِذَا سَمِعْتُمُ الْمُؤَذِّنَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ ثُمَّ صَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّهُ مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا ثُمَّ سَلُوا اللَّهَ لِيَ الْوَسِيلَةَ فَإِنَّهَا مَنْزِلَةٌ فِي الْجَنَّةِ لَا تَنْبَغِي إِلَّا لِعَبْدٍ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ وَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَنَا هُوَ فَمَنْ سَأَلَ لِيَ الْوَسِيلَةَ حَلَّتْ عَلَيْهِ الشَّفَاعَةُ. رَوَاهُ مُسلم

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটির মূল বিষয়বস্তু তিনটি- আযানের জবাব দেওয়া, আযানের পর দরূদ শরীফ পড়া এবং তারপর আযানের দু'আ পড়া।

আযানের জবাব দু'রকম। এক হলো মৌখিক জবাব, দ্বিতীয় হলো কর্মগত জবাব।

কর্মগত জবাবের অর্থ আযান যেজন্য দেওয়া হয় সে কাজ করা। আযান দেওয়া হয় নামাযের প্রস্তুতি নিয়ে জামাতে শামিল হওয়ার জন্য। কাজেই যে ব্যক্তি আযান শুনবে, তার কর্তব্য পাক-পবিত্র হয়ে জামাতে শামিল হওয়ার জন্য বের হয়ে পড়া। এটা আযানের কর্মগত জবাব। এটা জরুরি।

দ্বিতীয় হলো মৌখিক জবাব। এটা সুন্নত। অর্থাৎ মুআযযিন আযানের ভেতর যে শব্দগুলো উচ্চারণ করে, শ্রোতাও তাই উচ্চারণ করবে। আলোচ্য হাদীছে কেবল এতটুকুই বলা হয়েছে যে, তোমরা যখন আযান শোন, তখন মুআযযিন যা বলে তাই বলো। এর বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.-এর হাদীছে। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إِذَا قَالَ الْمُؤَذِّنُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ . فَقَالَ أَحَدُكُمُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ . ثُمَّ قَالَ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ . قَالَ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ ثُمَّ قَالَ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ . قَالَ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ . ثُمَّ قَالَ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ . قَالَ لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ . ثُمَّ قَالَ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ . قَالَ لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ . ثُمَّ قَالَ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ . قَالَ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ . ثُمَّ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ . قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ . مِنْ قَلْبِهِ دَخَلَ الْجَنَّةَ

'মুআযযিন যখন বলে الله أكبر الله أكبر তোমাদের প্রত্যেকে বলবে اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ

যখন বলে أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ তোমরা বলবে أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ

যখন বলে أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهُ তোমরা বলবে أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهُ

যখন বলে حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ তোমরা বলবে لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ

যখন বলে حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ তোমরা বলবে لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ

যখন বলে الله أكبر الله أكبر তোমাদের প্রত্যেকে বলবে اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ

যখন বলে لَا إِلَ إِلَّا الله তোমরা বলবে لَا إِلَ إِلَّا الله

যে ব্যক্তি অন্তর থেকে এরূপ বলবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৫; সুনানে আবু দাউদ: ৫২৭; সুনানে নাসাঈ ৬৭৭; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১৮৪৭; সুনানে দারিমী: ১২৩৯; মুসনাদুল বাযযার ২৫৮; সহীহ ইবন খুযায়মা: ৪১৭; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার ৮৮৪; সহীহ ইবন হিব্বান ১৬৮৫; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৯২৬)

حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ ও حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ এর জবাব

এ হাদীছ দ্বারা যেমন আযানের জবাব দেওয়ার ফযীলত জানা গেল, তেমনি জবাবের শব্দসমূহ কী হবে তাও জানা গেল। রিয়াযুস সালেহীনের মূল হাদীছে বলা হয়েছে, মুআযযিন যা বলে তোমরা তাই বলবে। বাহ্যত তার সাথে বিস্তারিত এ হাদীছটির বিরোধ মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে কোনও বিরোধ নেই। কেননা ওখানে সংক্ষেপে বলা হয়েছে 'তোমরা তাই বলবে'। তার মানে জবাবের অধিকাংশ শব্দ মুআযযিনের শব্দের অনুরূপ হবে, কেবল حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ . حَيَّ عَلَى الصَّلاةِ ব্যতিক্রম। এ দু'টির জবাব হলো لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ অর্থাৎ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কারও ভালো কাজ সম্পন্ন করা ও মন্দ কাজ হতে বিরত থাকার ক্ষমতা নেই।

এ জবাব খুবই যুক্তিযুক্ত। কেননা বাকি শব্দগুলো হলো আল্লাহ তা'আলার যিকির এবং তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্যদান। এ কাজে মুআযযিন ও শ্রোতা একইরকম হবে, এটাই স্বাভাবিক। মুআযযিন যখন আল্লাহর যিকির করে, তখন শ্রোতাও যিকির করার দ্বারা নিজ ঈমান তাজা করবে। অনুরূপ মুআযযিন যখন তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্যদান করে, তখন শ্রোতাও একই সাক্ষ্যদান দ্বারা নিজ ঈমানের নবায়ন করবে। পক্ষান্তরে حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ (এসো নামাযের দিকে) ও حَيَّ عَلَى الْفَلاح (এসো সফলতার দিকে) হলো নামায ও সফলতার প্রতি আহ্বান। এখন শ্রোতাও যদি একই কথা বলে, তবে তাও আহ্বানই হবে। মুআযযিন ও শ্রোতা উভয়ে আহ্বানকারী হলে সাড়াদাতা হবে কে? তাই এ ক্ষেত্রে শ্রোতার কর্তব্য মুআযযিনের আহ্বানে সাড়া দেওয়া। অর্থাৎ নামায ও সফলতার দিকে অগ্রসর হওয়া। কিন্তু এর জন্য দরকার আল্লাহর সাহায্য। আল্লাহর তাওফীক ও সাহায্য ছাড়া কারও পক্ষেই কোনও ইবাদত করা এবং ইবাদতের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই শ্রোতা বলছে- لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কারও ভালো কাজ সম্পন্ন করা ও মন্দ কাজ হতে বিরত থাকার ক্ষমতা নেই)। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি এ ডাকে সাড়া দিতে প্রস্তুত। সুতরাং তুমি আমাকে সাহায্য করো।

الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِّنَ النَّوْمِ এর জবাব
ফজরের আযানে অতিরিক্ত বলা হয় الصَّلاةُ خَيْرٌ مِّنَ النَّوْمِ (ঘুম অপেক্ষা নামায উত্তম)। এর জবাব হলো صَدَقْتَ وَبَرَرْتَ (সত্য বলেছ এবং পুণ্যের কাজ করেছ)। অবশ্য এটা হানাফী, শাফি'ঈ ও হাম্বলী মাযহাবের আমল। সহীহ হাদীছ দ্বারা এটা প্রমাণিত নয়। তবে মাযহাবসমূহের ইমামগণ সালাফের যমানার লোক হওয়ায় তাদের সিদ্ধান্তসমূহ অবশ্যই দলীলনির্ভর হতো। তাই বলা যায় কোনও দলীলের ভিত্তিতেই الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِّنَ النَّوْمِ এর এ জবাব স্থির করেছেন। সুতরাং জবাব হিসেবে এটা বলার অবকাশ অবশ্যই আছে। হাঁ, বিশুদ্ধ হাদীছ দ্বারা এটা প্রমাণিত না হওয়ায় কেউ চাইলে মুআযযিনের মতো একই বাক্য উচ্চারণ করতে পারে। আলোচ্য হাদীছে বর্ণিত সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী এ জবাবকে অগ্রাধিকারও দেওয়া যেতে পারে।

আযানের মতো ইকামতের শব্দসমূহেরও উত্তর একই। কেবল قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ (নামায দাঁড়িয়ে গেছে)-এর উত্তরে বলতে হয় أَقَامَهَا اللهُ وَأَدامَ (আল্লাহ নামায কায়েম রাখুন ও স্থায়ী রাখুন)।

أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ এর জবাব

উল্লেখ্য, কোনও কোনও বর্ণনায় أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ এর উত্তর দেওয়ার পর অতিরিক্ত কিছু কথা বলারও উল্লেখ পাওয়া যায়। হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি মুআযযিনের আযান শোনে, সে যদি বলে-

أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ ، رَضِيتُ بِاللهِ رَبًّا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا ، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا.

তবে তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৬)

জ্ঞাতব্য, অনেকে أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ এর উত্তরে দরূদ শরীফ পড়ে এবং বলে صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم । কিন্তু এটা ভুল। আমরা উল্লিখিত হাদীছ দ্বারা জানতে পারলাম এর উত্তরেও أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ -ই বলতে হবে। দরূদ শরীফ পড়া নিঃসন্দেহে অনেক বড় নেকীর কাজ। কিন্তু তাই বলে হাদীছে যেখানে যা বলতে বলা হয়েছে তা না বলে দরূদ শরীফ পড়লে প্রকৃতপক্ষে তা নেকীর কাজ হবে না; বরং হাদীছের শিক্ষা অমান্য করা হবে।

আযানের পর দরূদ শরীফ পড়া
আযানের সময় দরূদ শরীফ কখন পড়তে হবে, তা আলোচ্য হাদীছেই বলে দেওয়া হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

ثُمَّ صَلُّوْا عَلَيَّ (তারপর আমার প্রতি দরূদ পড়ো)। অর্থাৎ আযান শেষ হলে আমার প্রতি দরূদ পড়ো। কোন দরূদ পড়তে হবে, নির্দিষ্ট করে তা বলা হয়নি। বোঝা গেল হাদীছে বর্ণিত যে-কোনও দরূদই পড়া যেতে পারে। এ সময় দরূদ পড়ার কী ফযীলত? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

فَإِنَّهُ مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا (কেননা যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরূদ পড়ে, আল্লাহ তার প্রতি তার বদলে দশবার রহমত নাযিল করেন)। একবার দরূদ পড়ার বিনিময়ে দশবার আল্লাহ তা'আলার রহমত লাভ করা অনেক বড় বিষয়। এত বড় ফযীলত যে-কোনও সময় দরূদ পড়ার দ্বারাই অর্জিত হয়। হাদীছের এ বাক্যটিতে তাই বলা হয়েছে। তবে আযানের বেলায় এর সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আর তা হচ্ছে আযানের শব্দাবলি শেষ হওয়ার পর এবং আযানের দু'আ পড়ার আগে। দরূদ পড়ার পর আযানের যে দু'আ পড়তে হয়, এ হাদীছে তা স্পষ্টভাবে না বলে কেবল ইশারা করে দেওয়া হয়েছে। অন্য হাদীছে সে দু'আটি এসেছে। এখানে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

ثُمَّ سَلُوا اللَّهَ لِيَ الْوَسِيلَة (তারপর আমার জন্য আল্লাহর কাছে অসিলা প্রার্থনা করো)। অর্থাৎ وَسِيلَةٌ (অসিলা) সম্পর্কিত দু'আটি পড়ো, যা অন্য হাদীছে এসেছে। প্রশ্ন হচ্ছে অসিলা কী? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-فَإِنَّهَا مَنْزِلَةٌ فِي الْجَنَّةِ (অসিলা হলো জান্নাতের একটি স্থান)। অর্থাৎ উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থান। মূলত এটি জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থান। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অসিলা কী? তিনি বললেন-أَعْلَى دَرَجَةٍ فِي الْجَنَّةِ لَا يَنَالُهَا إِلَّا رَجُلٌ وَاحِدٌ أَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَنَا هُوَ. 'জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থান, যা একজন ব্যক্তিই লাভ করবে। আশা করি আমিই হব সে ব্যক্তি।' (জামে' তিরমিযী: ৩৬১২; মুসনাদে আহমাদ: ৭৫৯৮)

আলোচ্য হাদীছেও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- 'এ মর্যাদা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল এক বান্দার জন্যই উপযোগী। আমি আশা করি সে আমিই'। বলাবাহুল্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশা ব্যর্থ যাওয়ার নয়। তার মানে জান্নাতের উচ্চতর এ স্থানটি কেবল তাঁর জন্যই বরাদ্দ রয়েছে।

প্রশ্ন হতে পারে, যা তাঁর জন্য বরাদ্দ রয়েছে, তা যাতে তিনি পান সেজন্য দু'আ করার কী প্রয়োজন, দু'আ না করলেও তো তিনি তা অবশ্যই পাবেন?

এর উত্তর হলো, অবশ্যই তিনি তা পাবেন। তারপরও সেজন্য দু'আ করতে বলা হয়েছে দু'আকারীর নিজের ফায়দার জন্য। অন্যের জন্য এমন অনেক দু'আ করার কথা বলা হয়েছে, যা করলে দু'আকারীর নিজেরই ফায়দা। এটিও সে রকমই। এ দু'আ করার দ্বারা দু'আকারীর নিজেরই উপকার হয় এবং সে উপকার বিশাল। বলা হয়েছে-

فَمَنْ سَأَلَ لِيَ الْوَسِيلَةَ حَلَّتْ لَهُ الشَّفَاعَةُ (সুতরাং যে ব্যক্তি আমার জন্য অসিলা প্রার্থনা করবে, তার জন্য শাফা'আত অবধারিত হয়ে যাবে)। কাজ অতি হালকা, কিন্তু প্রাপ্তি অনেক বড়। সামান্য কয়েকটি শব্দের এ দু'আ পড়ার দ্বারা আখিরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা'আত নসীব হবে, এরচে' বড় ফায়দা আর কী হতে পারে? তাঁর শাফা'আত দ্বারা উম্মত বিভিন্ন রকম ফায়দা পেতে পারে, যেমন পাপী ব্যক্তির পাপ মার্জনা করে শুরুতেই তাকে জান্নাত দিয়ে দেওয়া হবে, যে ব্যক্তি আপন আমলের দ্বারা শুরুতেই জান্নাত পেয়ে যাবে, তাকে জান্নাতের উচ্চমর্যাদা দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, আযানের মতো জবাবের শব্দসমূহও ধারাবাহিক বলতে হয়। অর্থাৎ মুআযযিন যখন যে শব্দ উচ্চারণ করে, তখন সেই শব্দের উত্তর দেওয়া হবে। হাঁ, কোনও ব্যস্ততার কারণে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে না পারলে আযান শেষ হওয়ার পর একইসঙ্গে ধারাবাহিকভাবে সবগুলো শব্দের উত্তর দেবে। তারপর দরূদ পড়ে দু'আ পাঠ করবে।

একইসঙ্গে একাধিক স্থানে আযান হলে সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী আযানের উত্তর দেবে। পরপর একাধিক স্থানে আযান হলে সর্বপ্রথম যে আযান শোনা যায়, তার উত্তর দেবে। তারপর চাইলে অন্যান্য আযানেরও উত্তর দিতে পারে। তবে উত্তরের ফযীলত লাভের জন্য তা জরুরি নয়। প্রথমবারের উত্তর দেওয়াই যথেষ্ট।

হাদীছ থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. আযান ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ এক নিদর্শন। কাজেই আযানকে বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্বের দৃষ্টিতে দেখতে হবে।

খ. যখন আযান হয়, তখন আযানের শব্দসমূহ খুব মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে।

গ. আযান শুনলে তার জবাব দেওয়া উচিত।

ঘ. আযানের জবাব আযানের শব্দসমূহেরই অনুরূপ। তবে حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ ও حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ এর জবাব হলো لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ

ঙ. আযানের পর প্রথমে দরূদ শরীফ এবং তারপর আযানের দু'আ পড়া উচিত।

চ. আযানের উত্তর, তারপর দরূদ শরীফ এবং তারপর দু'আ পড়ার অনেক বড় ফযীলত রয়েছে। আর তা হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা'আত লাভ।

ছ. জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ একটি স্থানের নাম وَسِيلَة (অসিলা)। এ মর্যাদা কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যই নির্ধারিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)