মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

৫- নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ৬৫৬
- নামাযের অধ্যায়
৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - আযানের ফযীলত ও মুয়াযযিনের উত্তর দান
৬৫৬। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, যে মানুষ, জ্বিন অথবা অন্যকিছু মুয়াযযিনের আযানের শব্দ শ্রবণ করবে, সে রোজ কিয়ামতে তার জন্য সাক্ষ্য প্রদান করবে। -বুখারী
كتاب الصلاة
بَابُ فَضْلِ الْاَذَانِ وَاِجَابَةِ الْـمُؤَذِّنِ
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا يَسْمَعُ مَدَى صَوْتِ الْمُؤَذِّنِ جِنٌّ وَلَا إِنْسٌ وَلَا شَيْءٌ إِلَّا شَهِدَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ البُخَارِيّ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. আল্লাহ্ তা'আলা এ বিশ্বের সমগ্র বস্তুতে তাঁর মা'রিফাত ছড়িয়ে দিয়েছেন। কেননা আল্লাহর বাণী وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ “এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রশংসা ও মহিমা ঘোষণা করে না।" (১৭, সূরা বনী ইসরাঈল: 88)
কাজেই মুআযযিন যখন আযান দেয় এবং তাতে আল্লাহর মাহাত্ম্য, একত্ব, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রিসালাত এবং দীনের দাওয়াত প্রকাশ পায় তখন জিন-ইনসান ব্যতীত অপরাপর সৃষ্টিও তা শুনতে পায় এবং বুঝতে পারে। এসব বস্তু কিয়ামতের দিন তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আযান দানে এবং মুআযযিনের রয়েছে ঈর্ষণীয় মর্যাদা। আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ "এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক।" (৮৩, সূরা মুতাফফিফীন: ২৬)

২. আব্দুর রহমান ইবন আবু সা'সা'আ একজন প্রবীণ আনসারী তাবি'ঈ ছিলেন। তিনি পল্লি অঞ্চলে বাস করতেন। বকরি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সে কালের আরব পল্লি বর্তমান কালের মতো ছিল না। লোকজন খুব কম থাকত। নাগরিক কোনও সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যেত না। তাই নিতান্ত জরুরি না হলে মানুষ তখন পল্লিতে বসবাস করতে চাইত না। আব্দুর রহমান ইবন আবু সা'সা'আ স্বভাবগতভাবে পল্লিতে বসবাস পছন্দ করতেন। তিনি হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি.-এর শিষ্য ছিলেন। হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি, তাকে তার শৈশবে প্রতিপালন করেছেন। একজন দরদি উসতায হিসেবে হযরত আবু সা'ঈদ খুদরী রাযি. তাকে যে নসীহত করেছিলেন, এ হাদীছে তিনি তা তুলে ধরেছেন। হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. তাকে বলেন-

إِنِّي أَرَاكَ تُحِبُّ الْغَنَمَ وَالْبَادِيَةَ (আমি দেখছি তুমি ছাগল ও পল্লি ভালোবাস)।

মানুষ সাধারণত শহরেই বাস করতে পছন্দ করে। কিন্তু আব্দুর রহমান এর ব্যতিক্রম ছিলেন। তাই কিছুটা বিস্ময়ের সঙ্গে হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. তাকে এ কথা বলেন। এমনিতে গ্রামীণ নির্জন পরিবেশে বাস করা জায়েয আছে, যদিও সেখানে জুমু'আ ও জামাত পাওয়া কঠিন (উল্লেখ্য, এটা সে প্রাচীনকালের পল্লিগ্রামের কথা)। নির্জন পরিবেশে থাকলে নানা ফিতনা থেকে বাঁচা যায়। ফলে ঈমান ও আমলের হেফাজত সহজ হয়। অপরদিকে এর কিছু ক্ষতিও রয়েছে। এক তো আলেম-উলামার অভাব। ফলে তাদের সাহচর্যে গিয়ে জ্ঞানপিপাসা নিবারণ করা ও ইসলামী আদব-আখলাক শেখার সুযোগ হয় না। সৎ লোকের সাহচর্য থেকেও বঞ্চিত থাকতে হয়। অথচ ঈমান-আমলের উন্নতি ও হেফাজতের জন্যই এগুলো জরুরি। সে হিসেবে পল্লি অপেক্ষা শহরই বেশি কল্যাণকর। হাঁ, শহর-নগরে ব্যাপক ফিতনা দেখা দিলে পল্লিগ্রামে চলে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
يُوشِكُ أَنْ يَكُونَ خَيْرَ مَالِ الْمُسْلِمِ غَنَمٌ يَتْبَعُ بِهَا شَعَفَ الْجِبَالِ وَمَوَاقِعَ الْقَطْرِ يَفِرُّ بِدِينِهِ مِنْ الْفِتَنِ

এমন একদিন আসবে, যখন মুসলিম ব্যক্তির উৎকৃষ্ট সম্পদ হবে একপাল বকরি। সে তা নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় এবং বৃষ্টির স্থানে চলে যাবে। তার উদ্দেশ্য হবে ফিতনা থেকে আপন দীনের হেফাজত করা। (সহীহ বুখারী: ১৯; সুনানে আবু দাউদ: ৪২৬৭)

বকরিকে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে এজন্য যে, বকরি লালন-পালন করা খুব সহজ। তাতে বরকতও বেশি। একপাল বকরি লালন-পালন করার দ্বারা জীবন নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করা তুলনামূলক সহজ হয়।

যা হোক, হযরত আবু সা'ঈদ খুদরী রাযি. তাঁর প্রিয় শিষ্যকে যে উপদেশ দিলেন, তা ছিল আযান সম্পর্কে। তিনি বললেন-

فَإِذَا كُنْتَ فِي غَنَمِكَ أَوْ بَادِيتِكَ فَأَذَنْتَ لِلصَّلَاةِ، فَارْفَعْ صَوْتَكَ بِالنِّدَاءِ

(তুমি যখন তোমার ছাগলপালের সঙ্গে কিংবা পল্লিতে থাকবে আর এ অবস্থায় আযান দেবে, তখন আযানে তোমার আওয়াজ উঁচু করবে)। আযানের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে নামাযের জন্য ডাকা। আযানের আওয়াজ যত বেশি উঁচু হবে, তত বেশি দূর-দূরান্তের লোক আযান শুনতে পাবে। ফলে বেশি লোক তাতে সাড়া দেওয়ার সুযোগ পাবে। এজন্যই আযানের জন্য এমন লোক বেছে নেওয়া উত্তম, যার কণ্ঠস্বর বেশি বলিষ্ঠ। স্বপ্নযোগে আযান শেখানো হয়েছিল হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ ইবন আবদে রাব্বিহী রাযি.-কে। অথচ মুআযযিন তাঁকে না বানিয়ে বানানো হয়েছিল হযরত বিলাল রাযি.-কে। এর কারণ হিসেবে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন-إِنَّ هَذِهِ لَرُؤْيَا حَقٍّ فَقُمْ مَعَ بِلاَلٍ فَإِنَّهُ أَنْدَى وَأَمَدُّ صَوْتًا مِنْكَ فَأَلْقِ عَلَيْهِ مَا قِيلَ لَكَ وَلْيُنَادِ بِذَلِك.

নিশ্চয়ই এটা সত্য স্বপ্ন। সুতরাং (হে আব্দুল্লাহ ইবন যায়দ) তুমি বিলালের কাছে যাও। তার আওয়াজ তোমার তুলনায় বেশি মিষ্ট ও বলিষ্ঠ। কাজেই তোমাকে (আযানের যে কথাগুলো) শেখানো হয়েছে, তা তাকে শিখিয়ে দাও। সে এর দ্বারা আযান দিক। (জামে' তিরমিযী: ১৮৯; সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯; সহীহ ইবন খুযায়মা: ৩৬৩; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৯০৮)

এর দ্বারা বোঝা যায় আযানের সুর মধুর হওয়াও কাম্য। আযান ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এ নিদর্শন ইসলামের গৌরব ও মাহাত্ম্য প্রকাশ করে, মানুষকে দীনের প্রতি আকৃষ্ট করে। তাই এর শ্রুতিমধুর হওয়া বাঞ্ছনীয়, যাতে ইসলামের এ গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন নিয়ে কেউ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করার সুযোগ না পায়। তবে হাঁ, আযানের সুরের ভেতর অবশ্যই গাম্ভীর্য ও মহত্ত্বের ভাব থাকতে হবে। সঙ্গীতের মতো তাল ও লয়ের মিশ্রণে সুরের মূর্ছনা তোলা বা সুরের ভেতর কম্পন সৃষ্টি করে শ্রোতা মাতানোর চেষ্টা করা কিছুতেই আযানের মাহাত্ম্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এরূপ সুর আযানের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। তাই শুরু থেকেই সালাফ এ জাতীয় সুর প্রত্যাখ্যান করেছেন।

একবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. কোনও এক মুআযযিনকে বলেছিলেন, আমি আল্লাহর জন্য তোমাকে অপছন্দ করি। কারণ তুমি আযানে সীমালঙ্ঘন কর। এক বর্ণনায় আছে, তুমি তোমার আযানে ভান-ভণিতা করে থাক। হযরত উমর ইবন আব্দুল আযীয রহ. যখন মদীনা মুনাউওয়ারার গভর্নর ছিলেন, তখন এক মুআযযিন সুরের ঢেউ ও কম্পন তুলে আযান দিয়েছিল। তখন তিনি তাকে বলেছিলেন, হয় সহজ-সরলভাবে আযান দাও, নয়তো আমাদের থেকে দূর হয়ে যাও।

তো আযানের মূল উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য দূর সীমানায় আওয়াজ পৌঁছিয়ে মানুষকে নামাযের জন্য ডাকা। দ্বিতীয়ত আযানের ভেতর যে ফযীলত রয়েছে, তা অর্জন করাও একজন আখিরাতমুখী মুআযযিনের কামনা থাকবে বৈ কি। হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. সে ফযীলতের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন-

فَإِنَّهُ لَا يَسْمَعُ مَدَى صَوْتِ الْمُؤَذِّنِ جِنٌّ وَلَا إِنْسٌ وَلَا شَيْءٌ إِلَّا شَهِدَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَة (কেননা মুআযযিনের আযান যতদূর পৌঁছায়, ততদূর পর্যন্ত যত জিন, মানুষ ও অন্য কোনওকিছু তা শুনতে পায়, তারা সকলেই কিয়ামতের দিন তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে)। 'অন্য কোনওকিছু' বলে মানুষ ও জিন ছাড়া আরও যত মাখলুক আছে তাদের বোঝানো উদ্দেশ্য, তা প্রাণী হোক, উদ্ভিদ হোক বা কোনও জড়পদার্থ। সহীহ ইবন খুযায়মার বর্ণনায় আছে-

لا يَسْمَعُ صَوْتَهُ شَجَرٌ وَلَا مَدَرٌ وَلَا حَجَرٌ وَلَا جِنَّ وَلَا إِنْسٌ إِلَّا شَهِدَ لَهُ.

গাছপালা, মাটি, পাথর, জিন ও ইনসান যে-কেউ তার আওয়াজ শোনে, তার পক্ষে সাক্ষ্যদান করবে। (সহীহ ইবন খুযায়মা: ৩৮৯)

হযরত বারা ইবন আযিব রাযি. থেকে বর্ণিত আছে-

وَالْمُؤَذِّنُ يُغْفَرُ لَهُ بِمَدِّ صَوْتِهِ وَيُصَدِّقُهُ مَنْ سَمِعَهُ مِنْ رَطْبٍ وَيَابِسٍ وَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ مَنْ صَلَّى مَعَهُ

মুআযযিনের আওয়াজ যতদূর পৌঁছায়, ততদূর পর্যন্ত তার জন্য মাগফিরাত করা হয় এবং সজীব ও শুষ্ক যে-কেউ তার আওয়াজ শোনে, সে-ই তার তাসদীক করে। আর যারা তার সঙ্গে নামায আদায় করে, তাদের সমপরিমাণ ছাওয়াব তার অর্জিত হয়। (সুনানে নাসাঈ: ৬৪৬; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৮১৯৮)

জড়বস্তু কীভাবে দু'আ করে
প্রশ্ন হতে পারে, মাটি, পাথর ও জড়পদার্থ কীভাবে তার জন্য দু'আ করে, যখন এদের কোনও প্রাণ নেই?

এর উত্তর হলো, প্রাণ না থাকার দাবি সঠিক নয়। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে সবকিছুর তাসবীহ পাঠের কথা বর্ণিত আছে। প্রাণ না থাকলে তারা তাসবীহ পড়ে কীভাবে? জাহান্নামের আগুন সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলার সমীপে তা আরজ করে যে, আমার একাংশ অন্য অংশ গ্রাস করছে। প্রাণ না থাকলে আগুন কীভাবে এ কথা বলে? আসলে প্রত্যেক বস্তুর প্রাণ তার মতো করেই তো হবে।

একের প্রাণের সঙ্গে অন্যের প্রাণের মিল থাকতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। আমাদের জ্ঞান সীমিত হওয়ায় অন্যদের প্রাণ থাকার বিষয়টা বুঝতে পারি না।

দ্বিতীয় কথা হলো দু'আ করতে হলে ভাষাও থাকতে হবে। তা জড়পদার্থেরও কি ভাষা আছে যে, তারা দু'আ করবে? হাঁ, তাদেরও ভাষা আছে। ভাষা আছে জিন ও মানুষ ছাড়া অন্য সব প্রাণী ও বস্তুরাজিরও। সে ভাষা তাদের মতো করেই আছে। আর আছে বলেই তারা আল্লাহ তা'আলার তাসবীহ পাঠ করে। হাদীছে আছে-একবার এক ব্যক্তি গরুর পিঠে চড়লে গরু বলেছিল-

إِنِّي لَمْ أَخْلَقْ لِهَذَا، وَلَكِنِّي إِنَّمَا خُلِقْتُ لِلْحَرْثِ.

আমাকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়নি। আমাকে তো সৃষ্টি করা হয়েছে হালচাষের জন্য। (সহীহ মুসলিম: ২৩৮৮; জামে তিরমিযী: ৩৬৭৭; মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ২৪৭৫: মুসনাদুল বাযযার: ৭৬৬০; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার: ৩০৬৭)

হযরত জাবির রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِنِّي لَأَعْرِفُ حَجَرًا بِمَكَّةَ كَانَ يُسَلِّمُ عَلَيَّ قَبْلَ أَنْ أُبعث إِني لأعرفه الْآن.

আমি মক্কার ওই পাথরটি এখনও চিনি, যেটি নবুওয়াত লাভের আগে আমাকে সালাম দিত। (সহীহ মুসলিম: ২২৭৭; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩১৭০৫; সুনানে দারিমী: ২০: সহীহ ইবন হিব্বান: ৬৪৮২; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ১৯০৭: বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৩৭০৯)

সারকথা, প্রাণী হোক বা জড়পদার্থ, সকলের যার যার মতো করে ভাষা আছে এবং প্রত্যেকেই কিয়ামতের দিন মুআযযিনের পক্ষে সাক্ষ্যদান করবে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি, একবার এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমার কাজ কী? সে বলেছিল, আযান দেওয়া। তিনি বললেন-

نِعْمَ الْعَمَلُ ، يَشْهَدُ لَكَ كُلُّ شَيْءٍ سَمِعَكَ.

উত্তম আমল। যা-কিছুই তোমার আযান শোনে, তার প্রত্যেকটিই তোমার পক্ষে সাক্ষ্যদান করবে। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৫২)

হাদীছটিতে বলা হয়েছে- شَهِدَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ (তারা সকলেই কিয়ামতের দিন তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে)। অর্থাৎ মুআযযিনের ঈমানের সাক্ষ্য দেবে এবং সে যে নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে তার সাক্ষ্য দেবে। প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহ তা'আলা তো প্রকাশ্য-গুপ্ত সবকিছুই জানেন, তা সত্ত্বেও তাঁর কাছে সাক্ষ্য দেওয়ার কী প্রয়োজন?

উলামায়ে কেরাম এর উত্তরে বলেন, আখিরাতের বিচার দুনিয়ায় প্রচলিত বিচারব্যবস্থা অনুযায়ী পরিচালিত হবে। দুনিয়ায় যেমন একজন দাবিদার থাকে, তার বিপরীতে সে দাবির খণ্ডনকারী থাকে, আবার দাবির পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করা হয়, আখিরাতেও এ নিয়মেই বিচারকার্য সম্পন্ন হবে।

কেউ কেউ সাক্ষ্য দেওয়ার অর্থ করেছেন যে, এটা হবে কুল মাখলুকাতের সামনে। অর্থাৎ মুআযযিনের আযানের ধ্বনি যারা যারাই শুনতে পায়, তারা সকলে হাশরের ময়দানে সমস্ত মাখলুকের সামনে আযানদাতার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাক্ষ্যদান করবে।

হাদীছটির শেষে হযরত আবু সা'ঈদ খুদরী রাযি. বলেন-سَمِعْتُهُ مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ (আমি এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শুনেছি)। অর্থাৎ মুআযযিনের ফযীলত সম্পর্কে আমি তোমাকে যা শোনালাম, তা আমার নিজের কথা নয়; বরং এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা। আমি এটা সরাসরি তাঁকে বলতে শুনেছি।

উল্লেখ্য, এ হাদীছে কেবল সাক্ষ্যদানের কথা আছে। অপর এক হাদীছে মাগফিরাতের কথাও বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

الْمُؤَذِّنُ يُغْفَرُ لَهُ مَدَّ صَوْتِهِ، وَيَشْهَدُ لَهُ كُلُّ رَطْبٍ وَيَابِسٍ.

মুআযযিনের আওয়াজ যতদূর পর্যন্ত পৌছায়, ততদূর পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় আর তার জন্য সাক্ষ্য দেবে সজীব ও শুষ্ক সবকিছু। (সুনানে আবু দাউদ: ৫১৫; মুসনাদে আহমাদ: ৭৬০১; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১৮৬৩: সহীহ ইবন হিব্বান: ১৬৬৬; সুনানে ইবন মাজাহ ৭২৪; সহীহ ইবন খুযায়মা: ৩৯০; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ১৮৬১; শু'আবুল ঈমান: ২৭৯৪)

'ততদূর পর্যন্ত ক্ষমা করে দেওয়া'-এর অর্থ চূড়ান্ত পর্যায়ে ক্ষমা করে দেওয়া। ইমাম খাত্তাবী রহ. বলেন, মুআযযিনের পক্ষে যতদূর পর্যন্ত আওয়াজ পৌঁছানো সম্ভব হয়, সে যদি ততদূর পর্যন্ত আযানের আওয়াজ পৌঁছানোর চেষ্টা করে, অর্থাৎ আওয়াজ উঁচু করার জন্য নিজের চূড়ান্ত ক্ষমতা ব্যয় করে, তবে আল্লাহ তা'আলাও তাকে চূড়ান্ত রকমে ক্ষমা করে দেবেন। কেউ কেউ এর অর্থ করেন, গুনাহের যদি শরীর থাকত আর তাতে আওয়াজের শেষ সীমা পর্যন্ত সবটা স্থান পরিপূর্ণ হয়ে যেত, তবে এ পরিমাণ গুনাহও আযানের বদৌলতে ক্ষমা করে দেওয়া হতো। আবার কারও মতে এর অর্থ হলো, মুআযযিনের জন্য তার আওয়াজের শেষ সীমা পর্যন্ত রহমত বিস্তার করে দেওয়া হয়।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. মানুষকে সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরামের আগ্রহ-উদ্দীপনা ছিল অত্যন্ত গভীর। আমাদেরও সে আগ্রহ-উদ্দীপনা থাকা উচিত।

খ. ফিতনা-ফাসাদের সময় নিজ ঈমান রক্ষার খাতিরে প্রয়োজনে লোকালয় ছেড়ে নির্জন স্থানে চলে যাওয়া উত্তম।

গ. ছাগল লালন-পালন করা একটি বরকতপূর্ণ পেশা।

ঙ. আযান অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ আমল। প্রত্যেকের এ আমলের প্রতি আগ্রহ থাকা দরকার।

চ. সাধ্যমতো উচ্চ আওয়াজে আযান দেওয়া মুস্তাহাব।

ছ. মুআযযিন নিয়োগের সময় তার আওয়াজের বলিষ্ঠতাও বিবেচনায় রাখা উচিত।

জ. মাঠে-ময়দানেও অর্থাৎ যেখানে লোকজন নেই সেখানেও নামাযের সময় আযান দেওয়া মুস্তাহাব।
১. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.) ২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)