কিতাবুস সুনান (আলমুজতাবা) - ইমাম নাসায়ী রহঃ

৫০. আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রসমূহ

হাদীস নং: ৫৫২২
আন্তর্জাতিক নং: ৫৫২২
আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রসমূহ
কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা
৫৫২১. আমর ইবনে আলী (রাহঃ) ......... শাদ্দাদ ইবনে আউস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার (শ্রেষ্ঠ ক্ষমা প্রার্থনা) এই যে, বান্দা বলবেঃ

"হে আল্লাহ! আপনি আমার রব! আপনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আমি আপনার বান্দা, আমি আপনার সাথে কৃত ওয়াদা ও অঙ্গীকারের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছি। যতটুকু আমার দ্বারা সম্ভব। আমি যা করেছি তার অনিষ্ট হতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আপনার কাছে আমি আমার গুনাহের কথা স্বীকার করছি। আর আপনার নিয়ামতের কথা স্বীকার করছি। আমাকে ক্ষমা করুন। আপনি ব্যতীত আর কেউ গুনাহ মাফ করতে পারে না।"

যদি কেউ এই দুআ ভােরবেলা দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে পড়ে। তারপর মৃত্যুবরণ করে, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যদি কেউ দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে সন্ধ্যায় পড়ে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
كتاب الاستعاذة
الِاسْتِعَاذَةُ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعَ وَذِكْرُ الِاخْتِلَافِ عَلَى عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُرَيْدَةَ فِيهِ
أَخْبَرَنَا عَمْرُو بْنُ عَلِيٍّ قَالَ حَدَّثَنَا يَزِيدُ وَهُوَ ابْنُ زُرَيْعٍ قَالَ حَدَّثَنَا حُسَيْنٌ الْمُعَلِّمُ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُرَيْدَةَ عَنْ بُشَيْرِ بْنِ كَعْبٍ عَنْ شَدَّادِ بْنِ أَوْسٍ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِنَّ سَيِّدَ الِاسْتِغْفَارِ أَنْ يَقُولَ الْعَبْدُ اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي وَأَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ فَإِنْ قَالَهَا حِينَ يُصْبِحُ مُوقِنًا بِهَا فَمَاتَ دَخَلَ الْجَنَّةَ وَإِنْ قَالَهَا حِينَ يُمْسِي مُوقِنًا بِهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ خَالَفَهُ الْوَلِيدُ بْنُ ثَعْلَبَةَ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ কালিমাগুলোর প্রতিটি শব্দে শব্দে আবদিয়তের অভিব্যক্তি ঘটেছে বলেই যে এর অনন্য মর্যাদা, তা বলাই বাহুল্য। সর্বপ্রথম আরয করা হয়েছে:
اَللّٰهُمَّ أَنْتَ رَبِّيْ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِيْ وَأَنَا عَبْدُكَ
“হে আল্লাহ! তুমিই আমার রব বা প্রতিপালক। তুমি ব্যতীত কোন মালিক ও মা'বুদ নেই। তুমিই আমাকে অস্তিত্ব দান করেছো। আর আমি তোমারই বান্দা।"
وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلٰى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ
"আমি ঈমান আনয়ন করে তোমার সাথে আনুগত্যের যে ওয়াদা-অঙ্গীকার করেছি, আমার সাধ্য অনুসারে আমি তার উপর কায়েম থাকার চেষ্টা করবো।" এটা বান্দার পক্ষ থেকে তার দীনতা-হীনতা-দুর্বলতার স্বীকারোক্তি। সাথে সাথে ঈমানী ওয়াদা-অঙ্গীকারের নবায়নও বটে। তারপর আরয করা হয়েছে:
أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ
"আমার দ্বারা যে খাতা-কসুর, ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে এবং আগামীতে হবে, সেগুলোর অনিষ্ট থেকে হে আমার মালিক ও মওলা, তোমারই আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" এতে নিজ ত্রুটি-বিচ্যুতির স্বীকারোক্তির সাথে সাথে আল্লাহর দরবারে আশ্রয় প্রার্থনাও রয়েছে। তারপর বলা হয়েছে:
أَبُوْءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوْءُ بِذَنْبِيْ
"আমি আমার প্রতি তোমার যে এনাম-এহসান, উপকার ও দয়া, সেগুলোর কথা সাথে সাথে আমার নিজের অপরাধী হওয়ার কথা অকুণ্ঠচিত্তে অকপটে স্বীকার করছি।"
সর্বশেষে দরখাস্তঃ
فَاغْفِرْ لِيْ فَإِنَّهٗ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلَّا أَنْتَ
“হে আমার মালিক ও মওলা! তুমি তোমার রহম ও করমে আমার গুনাহগুলো মার্জনা করে দাও! কেননা, আমার গুনাহসমূহ মাফ করবে, তুমি ছাড়া এমন যে আর কেউই নেই। কেবল তুমিই আমাকে মার্জনা করতে পার।"

সত্য কথা হলো, যে ঈমানদার বান্দার এতটুকু মা'রিফত ও প্রজ্ঞা থাকবে যে, তার আলোকে সে তার নিজের ও নিজ আমলের হাকীকত উপলব্ধি করতে পারে, সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলার আযমত ও জালালত তথা মাহাত্ম্য এবং তাঁর হকসমূহও সে জানে, সে ব্যক্তি কেবল নিজেকে অপরাধী ও গুনাহগারই মনে করবে এবং পুণ্যের সঞ্চয় যে তার একান্তই কম, এ ব্যাপারে সে রিক্তহস্ত, এ চেতনাটুকুও তার থাকবে। তারপর তার দেলের আওয়ায এবং আল্লাহ তা'আলার হুযুরে তার আকৃতি তাই হবে, যার অভিব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শিক্ষা দেওয়া এ ইস্তিগফারের দু'আয় ঘটেছে। এ বৈশিষ্ট্যের জন্যেই একে 'সাইয়েদুল ইস্তিগফার' বা ক্ষমা প্রার্থনার সেরা দু'আ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এ হাদীসটি পৌঁছে যাওয়ার পর তাঁর প্রতি ঈমান পোষণকারী প্রতিটি উম্মতির উচিত হলো এর জন্যে যত্নবান হওয়া এবং কমপক্ষে প্রতিদিনে ও রাতে একবার সাচ্চা দেলে আল্লাহ তা'আলার দরবারে এ ইস্তিগফার করা। আল্লাহ তা'আলার রহমত হোক আমাদের উস্তাদ হযরত মওলানা সিরাজ আহমদ সাহেব রশীদপুরী (র)-এর প্রতি, আজ থেকে ৪৫ বছর পূর্বে১ দারুল উলুম দেওবন্দে মিশকাত শরীফের দরস দানকালে যখন ক্লাসে এ হাদীসটি পড়ান, তখন তিনি ক্লাসের সকল ছাত্রকে এটি মুখস্থ করার তাগিদ দেন এবং পরদিন সকলের মুখে মুখস্থ তা শুনবেন বলেও বলে দেন। সত্যি সত্যি পরের দিন প্রায় সকল ছাত্রের মুখ থেকেই তিনি তা শুনেও ছিলেন। তিনি তখন প্রতি দিনে ও প্রতি রাতে অন্তত একবার করে তা অবশ্যই পাঠ করার জন্যে ওসিয়ত করেছিলেন।

টিকা ১. এ বক্তব্যটি ১৯৬৯ সালে লিখিত, মানে আজ ১৯৯৬ সাল থেকে প্রায় ৭০ বৎসর পূর্বেকার কথা। অনুবাদক।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)
সুনানে নাসায়ী - হাদীস নং ৫৫২২ | মুসলিম বাংলা