মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ১৭৯
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হযরত আলী রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
১৭৯. হযরত সাহল ইবনে সা'দ রাযি. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খায়বারের (যুদ্ধের) দিন বললেন, আগামীকাল আমি এ পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে অর্পণ করব, যার হাতে আল্লাহ্ তা'আলা খায়বারের বিজয় দান করবেন, আর সে আল্লাহ্ ও রাসূলকে ভালবাসে এবং আল্লাহ্ ও রাসূলও তাকে ভালবাসেন। তারপর যখন প্রভাত হল, তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)এর খেদমতে উপস্থিত হল। তারা সবাই আশা করছিল যে, পতাকা তাদেরকে দেওয়া হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন জিজ্ঞাসা করলেন, আলী ইবনে আবু তালেব কোথায়? তারা বলল, তিনি চোখের ব্যথায় আক্রান্ত। (এ জন্য এখানে উপস্থিত হতে পারেননি।) তিনি বললেন, তাঁকে ডেকে আনার জন্য কাউকে পাঠিয়ে দাও। তারপর তাঁকে উপস্থিত করা হল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন তাঁর দুই চোখে সামান্য থু থু লাগিয়ে দিলেন। ফলে তিনি এমন সুস্থ হয়ে গেলেন, যেন তাঁর কোন অসুখই ছিল না। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে পতাকা দান করলেন। (এটা এ কথার ইঙ্গিত ছিল যে, আজ এ বাহিনীর সেনাপতি তিনিই হবেন।) আলী রাযি. তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কি সে পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাব যে, তারা আমাদের মত হয়ে যায়? (অর্থাৎ, ইসলাম গ্রহণ করে নেয়।) তিনি বললেন, তুমি ধীরে স্থীরে যাও, আর যখন তাদের এলাকায় পৌছে যাবে, তখন তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত পেশ কর এবং ইসলাম গ্রহণ করার পর তাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে কি কি দায়িত্ব বর্তায়, এগুলোও বলে দাও। আল্লাহর কসম! আল্লাহ্ যদি তোমার মাধ্যমে একজন মানুষকেও হিদায়াত দান করেন, তাহলে এটা গনীমতের মালে লাল উট পাওয়ার চেয়েও তোমার জন্য উত্তম হবে। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ سَهْلِ بْنُ سَعْدٍ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ يَوْمَ خَيْبَرَ: «لَأُعْطِيَنَّ هَذِهِ الرَّايَةَ غَدًا رَجُلًا يَفْتَحُ اللهُ عَلَى يَدَيْهِ، يُحِبُّ اللهَ وَرَسُولَهُ وَيُحِبُّهُ اللهُ وَرَسُولُهُ» فَلَمَّا أَصْبَحَ النَّاسُ غَدَوْا عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كُلُّهُمْ يَرْجُونَ أَنْ يُعْطَاهَا، فَقَالَ أَيْنَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ فَقَالُوا: هُوَ يَا رَسُولَ اللهِ يَشْتَكِي عَيْنَيْهِ، قَالَ فَأَرْسِلُوا إِلَيْهِ، فَأُتِيَ بِهِ، فَبَصَقَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي عَيْنَيْهِ، وَدَعَا لَهُ فَبَرَأَ، حَتَّى كَأَنْ لَمْ يَكُنْ بِهِ وَجَعٌ، فَأَعْطَاهُ الرَّايَةَ، فَقَالَ عَلِيٌّ: يَا رَسُولَ اللهِ أُقَاتِلُهُمْ حَتَّى يَكُونُوا مِثْلَنَا؟ قَالَ: «انْفُذْ عَلَى رِسْلِكَ، حَتَّى تَنْزِلَ بِسَاحَتِهِمْ، ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ، وَأَخْبِرْهُمْ بِمَا يَجِبُ عَلَيْهِمْ مِنْ حَقِّ اللهِ فِيهِ، فَوَاللهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ» (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

খায়বার মদীনা থেকে ১৮৪ কিলোমিটার উত্তর দিকে অবস্থিত একটি স্থান। এটা ইয়াহুদীদের জনবসতি ছিল। এরা ছিল ঐসব ইয়াহুদী, যারা কোন কালে সিরিয়া থেকে বহিষ্কৃত হয়ে এখানে বসতি স্থাপন করেছিল। এরা সবাই ধনী ও সম্পদশালী ছিল। এখানে তারা অত্যন্ত সুদৃঢ় দূর্গ তৈরী করে নিয়েছিল এবং ঐ যুগের মান অনুযায়ী যুদ্ধ উপকরণের বিরাট ভাণ্ডারও গড়ে তুলেছিল। এ এলাকাটি সবুজ শ্যামল ও খুবই উর্বর ছিল।

মদীনা মুনাওয়ারার আশেপাশের যেসব ইয়াহুদীকে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ও অপকর্মের দরুন মদীনা থেকে বহিষ্কার ও নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল, তারাও এখানে এসে বসতি স্থাপন করে নিয়েছিল। এরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষ পোষণ করত ও অব্যাহত ষড়যন্ত্র পাকিয়ে যেত। মদীনা মুনাওয়ারা যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হিজরত স্থল ও মুসলমানদের রাজধানী ছিল- এ কারণে মদীনার জন্য খায়বারের এ ইয়াহুদীরা বিরাট উদ্বেগ ও আশংকার কারণ ছিল।

ষষ্ঠ হিজরীর শেষ দিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হুদাইবিয়া থেকে ফিরে এসে এবং মক্কার কুরাইশদের সাথে সন্ধি ও দশ বছরের জন্য যুদ্ধ বিরতি চুক্তি করে মদীনায় আসলেন। যিলহজ্বের পুরাটি মাস মদীনায়ই কাটালেন। ৭ম হিজরীর মহররম মাসে তিনি খায়বারের ভয়াবহ শত্রুশক্তি থেকে আত্মরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য মাত্র দেড় হাজার সাহাবীর বাহিনী নিয়ে খায়বারের দিকে রওয়ানা হলেন। খায়বারের কাছে পৌঁছে যে স্থানটিকে তিনি সৈন্যদের অবস্থানের জন্য উপযোগী মনে করলেন, সেখানেই অবস্থান গ্রহণ করলেন। রীতি অনুযায়ী তিনি খায়বারের ইয়াহুদীদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং সাথে এ কথাও জানিয়ে দিলেন যে, তারা যদি এখনই ইসলাম গ্রহণ করতে প্রস্তুত না থাকে, তাহলে রাজনৈতিক অধীনতা স্বীকার করে জিযিয়া আদায় করে যাবে। যদি এগুলোর মধ্য থেকে কোন কথাই গ্রহণ করা না হয়, তাহলে আমরা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী যুদ্ধ করব-যে পর্যন্ত না তারা ইসলাম গ্রহণ করে নেয় অথবা জিযিয়া দিতে সম্মত হয়। কিন্তু খায়বারের ইয়াহুদী নেতারা কোন প্রস্তাবই মানতে রাজী হল না; বরং ঔদ্ধত্বের সাথে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।
উপরে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইয়াহুদীরা সেখানে অনেকগুলো দূর্গ তৈরী করে নিয়েছিল। যেগুলোর মধ্যে যুদ্ধ উপকরণ ছাড়া পানাহার সামগ্রীরও বিরাট ভাণ্ডার ছিল। তারা নিশ্চিত ছিল যে, মুসলমানদের বাহিনী কোনক্রমেই এগুলোর উপর বিজয় অর্জন করতে পারবে না। যাহোক, যুদ্ধ শুরু হল এবং কয়েক দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকল। মুসলমানরা একটির পর একটি এভাবে কয়েকটি দূর্গ দখল করে নিল। কিন্তু একটি দূর্গ যা অত্যন্ত মজবুত ও শক্তিশালী ছিল এবং এর হেফাযত ও সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল, বার বার আক্রমণ সত্ত্বেও এটা জয় করা যাচ্ছিল না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একদিন বললেন, আগামীকাল আমি এ পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে অর্পণ করব, যে আল্লাহ্ ও রাসূলকে ভালবাসে আর আল্লাহ ও রাসূলও তাঁকে ভালবাসেন এবং আল্লাহ্ তাঁর হাতেই অর্থাৎ, তাঁর মাধ্যমেই বিজয় সম্পন্ন করবেন। আর এ শেষ দূর্গটিও দখলে এসে যাবে এবং এভাবে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটবে। তারপর এখানকার ইয়াহুদীরা হয় ইসলাম গ্রহণ করে নিবে, নয়তো রাজনৈতিক অধীনতা স্বীকার করে জিযিয়া দিতে সম্মত হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ ব্যক্তির নাম উল্লেখ করলেন না, যাকে আগামীকাল পতাকা দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কেবল এতটুকু বললেন যে, সে আল্লাহ্ ও রাসূলকে ভালবাসে, আর আল্লাহ ও রাসূলও তাঁকে ভালবাসেন এবং আল্লাহ্ তাঁর মাধ্যমে শেষ দূর্গটিও জয় করাবেন। নিঃসন্দেহে এটা বড় ফযীলত ও সৌভাগ্যের বিষয় ছিল। এ জন্য অনেকেই এর আকাঙ্খী ছিলেন যে, আগামীকাল পতাকা তাদেরকে দেওয়া হবে। হযরত আলী রাযি. এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। পরের দিন যখন সকাল হল, তখন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞাসা করলেন, আলী ইবনে আবু তালেব কোথায়? লোকেরা বলল, তাঁর চোখে অসুখ। এ জন্য তিনি এখানে উপস্থিত হতে পারেননি। হুযুর (ﷺ) বললেন, কাউকে পাঠিয়ে তাঁকে ডেকে নিয়ে আস। কথামত তিনি হুযুর (ﷺ)-এর খেদমতে এ অবস্থায় উপস্থিত হলেন যে, তাঁর উভয় চোখে ব্যথা ছিল। হুযুর (ﷺ) নিজের সামান্য থু থু তাঁর চোখে ছিটিয়ে দিলেন, ফলে তৎক্ষণাৎ কষ্ট দূর হয়ে গেল এবং এমন হয়ে গেলেন, যেন তাঁর চোখে কোন অসুখই ছিল না। তারপর তিনি পতাকা তাঁর হাতে দিলেন, আর এটা একথার আলামত ছিল যে, আজ সৈন্যদের নেতৃত্ব তিনিই দিবেন।

হযরত আলী রাযি. পতাকা হাতে নিয়ে হুযুর (ﷺ)কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কি এ ইয়াহুদীদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাব যে পর্যন্ত তারা ইসলাম গ্রহণ করে আমাদের মত না হয়ে যায়? তিনি বললেন, যদি আল্লাহ্ তা'আলা তোমার মাধ্যমে একজন মানুষকেও হিদায়াত দান করেন, আর তার ঈমানের দৌলত নসীব হয়ে যায়, তাহলে এটা তোমার জন্য এরচেয়ে অনেক উত্তম হবে যে, তুমি গনীমতে অনেক লাল উট পেয়ে যাও। (ঐ যুগে লাল উট আরবদের নিকট সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ ছিল।) হুযূর (ﷺ)-এর কথার মর্ম এই ছিল যে, আমাদের যুদ্ধের উদ্দেশ্য শত্রুর উপর জয় লাভ করে গনীমত হস্তগত করা নয়। আসল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে, আল্লাহর বান্দাদের হিদায়াত। যুদ্ধ ও জেহাদ ফী সাবীলিল্লাহর মধ্যে এ লক্ষ্যকেই সামনে রাখা চাই এবং এরই দাবী অনুযায়ী ভূমিকা নির্ধারণ করা চাই।

এখানে এ বিষয়টি স্পষ্ট করে দেওয়া উচিত যে, বুখারী ও মুসলিমের উপরে বর্ণিত হাদীসের রাবী হযরত সাহল ইবনে সা'দ রাযি. এ রেওয়ায়াতে উপস্থিত লোকদের কোন বৈশিষ্ট্য অথবা কোন সাময়িক প্রয়োজনের দাবীতে খায়বার যুদ্ধের শেষ পর্যায়ের কেবল এতটুকু ঘটনাই বর্ণনা করেছেন, যার দ্বারা হযরত আলী রাযি.-এর এ ফযীলত ও মর্যাদা জানা যায় যে, তিনি আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি বিশেষ ভালবাসা পোষণকারী ও তাদের ভালবাসার পাত্র ছিলেন। একথাও বর্ণনা করেননি যে, হুযুর (ﷺ)-এর কথা অনুযায়ী হযরত আলী রাযি.-এর হাতেই ইয়াহুদীদের শেষ দূর্গটির পতন ঘটে এবং খায়বার বিজয় পরিপূর্ণ হয়।

এখানে আমি (সংকলক) খায়বার যুদ্ধের প্রসঙ্গে কেবল এতটুকু লিখাই সমীচীন মনে করেছি, যার দ্বারা এর পটভূমি ও কিছুটা অবস্থা অবগত হওয়া যায়। খায়বার যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ শরী‘আত ও ইতিহাসের কিতাবসমূহে দেখে নেওয়া যেতে পারে।

এ হাদীস থেকে প্রাসঙ্গিকভাবে হুযুর (ﷺ)-এর দু'টি মো'জেযাও জানা গেল। একটি এই যে, হযরত আলী রাযি.-এর দু'চোখে খুবই ব্যথা ছিল। হুযুর (ﷺ) তাঁর চোখে নিজের পবিত্র মুখের সামান্য থুথু ছিটিয়ে দিলে তিনি এমন আরোগ্য লাভ করলেন যে, তাঁর যেন কোন অসুখই ছিল না। দ্বিতীয়টি এই যে, আগামীকাল বিজয় পরিপূর্ণ হওয়ার যে ভবিষ্যদ্বাণী তিনি করেছিলেন সেটাও পূর্ণ হল।

হযরত সাহল ইবনে সা'দ রাযি. বর্ণিত এ হাদীসের বিশেষ শিক্ষা এই যে, হযরত আলী রাযি. আল্লাহ্ ও রাসূলের মুহিব (প্রেমিক) ও মাহবুব (প্রিয়পাত্র) ছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের এবং উম্মতের বৃহৎ অংশের আকীদা এটাই, কিন্তু এর দ্বারা এ কথা অনিবার্য হয়ে পড়ে না যে, তিনি ছাড়া অন্য কারো আল্লাহর মুহিব ও মাহবুব হওয়ার সৌভাগ্য অর্জিত হয়নি; বরং আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি ঈমান পোষণকারী প্রতিটি মু'মিন নিজ নিজ ঈমানের স্তর অনুযায়ী আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের মুহিব ও মাহবুব। সূরা আলে ইমরানের আয়াত-
قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
এর প্রকৃষ্ট দলীল ও সাক্ষী।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান