মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ১৮০
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হযরত আলী রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
১৮০. যির ইবনে হুবাইশ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আলী রাযি. বলেছেন: ঐ মহান সত্তার কসম। যিনি বীজ থেকে অঙ্কুর বের করেন এবং (বীর্য থেকে) প্রাণী সৃষ্টি করেন। নবীয়ে উম্মী (ﷺ) আমাকে বিশেষভাবে বলেছেন যে, আমাকে সেই বান্দাই মহব্বত করবে, যে খাঁটি মু'মিন, আর আমার প্রতি সেই ব্যক্তিই বিদ্বেষ পোষণ করবে, যে মুনাফিক। (মুসলিম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ زِرٍّ بْنِ حُبَيْشٍ، قَالَ: قَالَ عَلِيٌّ رَضِي الله عَنهُ : وَالَّذِي فَلَقَ الْحَبَّةَ، وَبَرَأَ النَّسَمَةَ، إِنَّهُ لَعَهِدَ النَّبِيُّ الْأُمِّيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَيَّ: «أَنْ لَا يُحِبَّنِي إِلَّا مُؤْمِنٌ، وَلَا يُبْغِضَنِي إِلَّا مُنَافِقٌ» (رواه مسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আলী রাযি.-কে যেসব মহান পুরস্কার ও দ্বীনি মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। যেমন তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে সর্বপ্রথম যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম। তেমনিভাবে তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আপন চাচাত ভাই ছিলেন এবং হুযুর (ﷺ) তাঁকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। তদ্রূপভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বীয় কন্যা হযরত ফাতেমা রাযি. কে তাঁর কাছে বিয়ে দিয়ে জামাতা হওয়ার মর্যাদা দান করেছেন। তেমনিভাবে তিনি অধিকাংশ যুদ্ধে হুযূর (ﷺ) এর সাথে থেকে জেহাদের ময়দানে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। আর উপরের হাদীস থেকে জানা গেল যে, খায়বার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের কথা ও কর্মের দ্বারা একথা প্রকাশ করেছেন যে, তিনি আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ। সারকথা, তাঁর এসব মর্যাদা ও এ জাতীয় অন্যান্য মর্যাদা ও ফযীলতের দাবী এটাই যে, প্রতিটি সত্যিকার মু'মিন তাঁকে ভালবাসবে। আর তাঁর প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণকারীদের ব্যাপারে এটাই বুঝতে হবে যে, তারা ঈমানের হাকীকত থেকে বঞ্চিত, তারা নেফাকের রোগে আক্রান্ত।

তবে একথাটি মনে রাখতে হবে যে, মহব্বত ও ভালবাসা দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ মহব্বত, যা আল্লাহ্ ও রাসূলের নিকট গ্রহণযোগ্য এবং শরী‘আতের সীমার মধ্যে হয়। অন্যথায় হযরত আলী রাযি.-এর মহব্বতের দাবীদারদের মধ্যে সর্বপ্রথম সিরিয়ালে আসে ঐসব বদনসীব, যারা তাঁকে খোদা মনে করে নিয়েছে। তারপর ঐ বদনসীবদের, যাদের আকীদা এই যে, নবুওয়াতের প্রকৃত হকদার ছিলেন হযরত আলী রাযি., আল্লাহ্ তা'আলা হযরত জিবরাঈলকে তাঁরই নিকট পাঠিয়ে ছিলেন, কিন্তু তিনি ভুলক্রমে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহর নিকট পৌঁছে গেলেন। অনুরূপভাবে শিয়াদের ইসমাঈলিয়্যা ও নাসিরিয়্যা ইত্যাদি ফের্কাসহ যারা নিজেদের ইমামদের ব্যাপারে এই শিরকী আকীদা পোষণ করে যে, তারা খোদারই রূপ এবং আল্লাহর গুণাবলী, ক্ষমতা ও এখতিয়ার তাদের অর্জিত রয়েছে। তদ্রূপভাবে ঐ শিয়া ইসনা আশারিয়া ফের্কা- যারা হযরত আলী রাযি. এবং তাঁর বংশধরদের মধ্যে ১১ জন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে নবী রাসূলদের ন্যায় নির্বাচিত, নিষ্পাপ ইমাম, পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূল থেকে শ্রেষ্ঠ, গুণাবলীতে তাদের চেয়ে অগ্রগামী ওহী ও কিতাবধারী, মু'জেযাধারী এবং জগত নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালনকারী হওয়ার আকীদা পোষণ করে। স্পষ্টতই এ ভালবাসা ঠিক তদ্রূপ, যেমন ভালবাসার দাবী খ্রীষ্টানরা হযরত ঈসা (আ.)-এর প্রতি পোষণ করে- যা তাদেরকে মুশরিক ও জাহান্নামী বানিয়ে দিয়েছে। মোটকথা, হযরত আলী রাযি. এর প্রতি এ ধরনের ভালবাসা পোষণকারীরা উলুহিয়্যাত (খোদায়ী) অথবা নবুওয়াতে অংশীদার স্থাপনকারী মুশরিক। হযরত আলী রাযি. তাদের এ ভ্রান্ত আকীদা থেকে মুক্ত ও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট। আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট গ্রহণযোগ্য ভালবাসা সেটাই, যা হযরত আলী রাযি. ও তাঁর বংশের মহান মনীষীদের প্রতি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত পোষণ করে থাকে।

এ হাদীসে হযরত আলী রাযি. এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদেরকে যে মুনাফেক বলা হয়েছে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য খারেজী ও নাসেবী সম্প্রদায়, যারা হযরত আলী রাযি.-এর প্রতি কুরআনী হিদায়াত থেকে দূরে সরে যাওয়ার অপবাদ দিয়েছে এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁকে পথভ্রষ্ট আখ্যা দিয়েছে, আর তাদের মধ্য থেকেই এক হতভাগা আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিম তাঁকে শহীদও করেছে।

হযরত উসমান রাযি.-এর শাহাদতের পর স্বয়ং সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে বিভিন্ন মতবিরোধ সৃষ্টি হয় এবং জঙ্গে জামাল ও সিফফীনের যুদ্ধের মত ঘটনাও ঘটে। এসব মতবিরোধ কিছু ভুলবুঝাবুঝির কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কেউই হযরত আলী রাযি.কে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গোমরাহ মনে করে তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত না। এটা এজতেহাদী মতবিরোধ ছিল এবং প্রত্যেক পক্ষই অপর পক্ষকে মু'মিন ও মুসলিম মনে করত এবং এর ঘোষণাও দিয়েছিল। পরবর্তীতে এ যুদ্ধ ও লড়াইয়ের কারণে উভয় পক্ষই দুঃখিত হয়েছিল এবং আফসোস করেছিল। এসবকিছুর পর হযরত হাসান রাযি.-এর সমঝোতা প্রতিষ্ঠা একথা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, যা কিছু হয়েছে, বিদ্বেষ ও শত্রুতার কারণে হয়নি; বরং এজতেহাদী মতবিরোধের কারণে হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত হাসান রাযি. সম্পর্কে বলেছিলেন:

إن ابني هذا سيد ولعل الله أن يصلح به بين فئتين عظيمتين من المسلمين

(আমার এ সন্তান মহান মর্যাদার অধিকারী সরদার, আশা করি আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর মাধ্যমে মুসলমানদের দু'টি বড় দলের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি করে দিবেন।) এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, এ দু'টি দল মুসলমানদের ছিল, কোন দলই মুনাফিকদের ছিল না।

সবশেষে একথাটিও উল্লেখযোগ্য যে, মুসলিম শরীফে যির ইবনে হুবাইশের এ হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর পূর্বে হযরত আনাস, হযরত বারা ইবনে আযেব, হযরত আবু হুরায়রা ও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বিভিন্ন সনদে হুযুর (ﷺ)-এর একথা বর্ণনা করা হয়েছে যে, আনসারদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করা ঈমানের নিদর্শন এবং তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা নেফাকের লক্ষণ। হযরত বারা ইবনে আযেবের হাদীসের শব্দমালা মুসলিম শরীফে এভাবে এসেছে:

لا يحبهم إلا مؤمن، ولا يبغضهم إلا منافق، من أحبهم أحبه الله، ومن أبغضهم أبغضه الله

(আনসারদের প্রতি কেবল ঐ ব্যক্তিই ভালবাসা পোষণ করবে, যে সত্যিকার মু'মিন হবে। আর তাদের প্রতি ঐ ব্যক্তিই বিদ্বেষ রাখবে, যে মুনাফিক হবে। যে ব্যক্তি আনসারদের প্রতি ভালবাসা রাখবে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ভালবাসবেন, আর যে তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে, সে আল্লাহর নিকট ঘৃণিত হবে।)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সাহাবীর ব্যাপারেও একথা বলেছেন যে, তাদের প্রতি ভালবাসা পোষণ ঈমানের লক্ষণ এবং তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা নেফাকের লক্ষণ, আর নিঃসন্দেহে এ ব্যাপারে হযরত আলী রাযি.-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের তাঁর মহব্বত, তাঁর রাসূলে পাকের মহব্বত এবং তাদের প্রিয়পাত্রদের মহব্বত ও ভালবাসা নসীব করুন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান