মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ১৩২
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
ওফাত ও ওফাতপূর্ব অসুস্থতা
১৩২. হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে যেসব অনুগ্রহ দ্বারা ধন্য করেছেন, এগুলোর মধ্যে একটি এ-ও যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ওফাত পেয়েছেন আমার ঘরে, আমার এখানে পালাক্রমে থাকার দিন, আমার বুক ও হাসলির মাঝে। (অর্থাৎ, তিনি এ অবস্থায় ওফাত পেয়েছেন যে, তিনি আমার বুক ও হাঁসলির সাথে জড়িয়ে ছিলেন। (আরেকটি অনুগ্রহ এই যে.) আল্লাহ্ তা'আলা অন্তিম মুহূর্তে আমার মুখের লালা ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মুখের লালা একত্রিত করে দিয়েছেন। (অর্থাৎ, শেষ সময়ে তাঁর মুখের লালা আমার গলায় ঢুকেছে এবং আমার মুখের লালা তাঁর মুখে গিয়েছে।) আয়েশা রাযি. (এর বিবরণ দিতে গিয়ে) বলেন, আমার ভাই আব্দুর রহমান ইবনে আবূ বকর আমার ঘরে আসলেন, তাঁর হাতে ছিল একটি মিসওয়াক। আর এ সময় আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বসা ছিলাম। আমি লক্ষ্য করলাম যে, তিনি আব্দুর রহমানের মিসওয়াকের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি বুঝে ফেললাম যে, তিনি মিসওয়াক করতে চান। তাই আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি এ মিসওয়াকটি আপনার জন্য নিয়ে নিব? তিনি মাথায় ইশারা করে বললেন, হ্যাঁ, নিয়ে নাও। আমি মিসওয়াকটি নিয়ে তাঁকে দিলাম। তিনি এর দ্বারা মিসওয়াক করতে চাইলেন, কিন্তু এটা তাঁর নিকট শক্ত মনে হল। আমি বললাম, আমি এটা আপনার জন্য নরম করে দিব? তিনি মাথা দিয়ে ইশারা করে বললেন, হ্যাঁ, নরম করে দাও। তখন আমি এটা (চিবিয়ে) নরম করে দিলাম, আর তিনি এর দ্বারা মিসওয়াক করে নিলেন। (এভাবে এ শেষ মুহূর্তে হুযুর (ﷺ)-এর মুখের লালা আমার গলায় এবং আমার মুখের লালা তাঁর গলায় চলে গেল।) হযরত আয়েশা বলেন, এ সময় তাঁর সামনে একটি পাত্রে পানি রাখা ছিল। তিনি বারবার এ পানিতে দু' তে ঢুকাতেন এবং হাত দ্বারা চেহারা মুছে নিতেন এবং এ অবস্থায়ই মুখে বলতেন: «لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، إِنَّ لِلْمَوْتِ سَكَرَاتٍ» (আল্লাহ্ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, নিশ্চয় মৃত্যুর বড় কঠিন যন্ত্রণা রয়েছে।) তারপর নিজের হাতটি উপরের দিকে উঠালেন এবং বলতে লাগলেনঃ «فِي الرَّفِيقِ الأَعْلَى» (মহান বন্ধুর মিলন চাই।) এ সময়ই রূহ কবয করে নেওয়া হল এবং উপরে উত্তোলিত হাতটি নীচের দিকে ঢলে পড়ল। -বুখারী
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: أَنَّ مِنْ نِعَمِ اللَّهِ عَلَيَّ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تُوُفِّيَ فِي بَيْتِي، وَفِي يَوْمِي، وَبَيْنَ سَحْرِي وَنَحْرِي، وَأَنَّ اللَّهَ جَمَعَ بَيْنَ رِيقِي وَرِيقِهِ عِنْدَ مَوْتِهِ: دَخَلَ عَلَيَّ عَبْدُ الرَّحْمَنِ، وَبِيَدِهِ السِّوَاكُ، وَأَنَا مُسْنِدَةٌ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَرَأَيْتُهُ يَنْظُرُ إِلَيْهِ، وَعَرَفْتُ أَنَّهُ يُحِبُّ السِّوَاكَ، فَقُلْتُ: آخُذُهُ لَكَ؟ فَأَشَارَ بِرَأْسِهِ: «أَنْ نَعَمْ» فَتَنَاوَلْتُهُ، فَاشْتَدَّ عَلَيْهِ، وَقُلْتُ: أُلَيِّنُهُ لَكَ؟ فَأَشَارَ بِرَأْسِهِ: «أَنْ نَعَمْ» فَلَيَّنْتُهُ، فَأَمَرَّهُ، وَبَيْنَ يَدَيْهِ رَكْوَةٌ أَوْ عُلْبَةٌ - يَشُكُّ عُمَرُ - فِيهَا مَاءٌ، فَجَعَلَ يُدْخِلُ يَدَيْهِ فِي المَاءِ فَيَمْسَحُ بِهِمَا وَجْهَهُ، يَقُولُ: «لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، إِنَّ لِلْمَوْتِ سَكَرَاتٍ» ثُمَّ نَصَبَ يَدَهُ، فَجَعَلَ يَقُولُ: «فِي الرَّفِيقِ الأَعْلَى» حَتَّى قُبِضَ وَمَالَتْ يَدُهُ. (رواه البخارى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসে হযরত আয়েশা রাযি. ঐ বিশেষ অনুগ্রহসমূহের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো হুযুর (ﷺ)-এর জীবনের শেষ মুহূর্তে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর উপর বর্ষিত হয়েছিল। একটি এই যে, হুযুর (ﷺ) আমার ঘরে ওফাত পেয়েছেন এবং সৌভাগ্যক্রমে ঐ দিনটি আমার পালার দিন ছিল। অর্থাৎ, যদিও হুযুর (ﷺ) ওফাতের আট দিন পূর্বে নিজের আকাঙ্খা ও অন্যান্য বিবিদের অনুমতিক্রমে আমার ঘরে স্থায়ীভাবে তাশরীফ নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু যে সোমবারে তাঁর ওফাত হয়েছে, সে দিনটি পালা হিসাবেও হুযুর (ﷺ)-এর আমার এখানে অবস্থানের দিন ছিল। দ্বিতীয় বিশেষ অনুগ্রহ আল্লাহ তা'আলা আমার উপর এই করেছেন যে, যে সময়টিতে হুযুর (ﷺ) ওফাত পান, সে সময় তিনি আমার বুক ও হাঁসুলির মাঝে ছিলেন। অর্থাৎ, হুযুর (ﷺ)-এর কোমর মুবারক আমার বুকের সাথে লাগা ছিল এবং মাথা মুবারক আমার হাঁসুলির সাথে লাগা ছিল। আল্লাহ্ তা'আলার তৃতীয় অনুগ্রহ ও পুরস্কার আমার প্রতি এই ছিল যে, এ শেষ সময়ে আমার ভাই আব্দুর রহমান ইবনে আবূ বকর ঘরে আসলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি মিসওয়াক। তাঁর মিসওয়াকটির দিকে হুযুর (ﷺ) এভাবে তাকালেন যে, আমি বুঝলাম, তিনি মিসওয়াক করতে চান। আমি হুযুর (ﷺ)-এর ইশারা পেয়ে ঐ মিসওয়াকটি আমার ভাইয়ের হাত থেকে নিয়ে তাঁকে দিলাম। তিনি যখন এটা ব্যবহার করতে চাইলেন, তখন শক্ত মনে হল। আমি নিবেদন করলাম, এটা কি আমি নরম করে দিব? তখন তিনি মাথায় ইশারা করে বললেন, হ্যাঁ, নরম করে দাও। তাই আমি এটা চিবিয়ে ও নরম করে দিলে তিনি মিসওয়াক করলেন।

এভাবে আল্লাহ্ তা'আলা এ অন্তিম সময়ে হুযুর (ﷺ)-এর লালা আমার মুখে এবং আমার মুখের লালা তাঁর মুখে একত্রিত করে দিয়েছেন। বাস্তব কথা এই যে, এ বিশেষ বিশেষ পুরস্কারসমূহের উপর হযরত আয়েশা রাযি. যতটুকু আনন্দ ও গৌরব প্রকাশ করেছেন এটা যথার্থই। সামনে হযরত আয়েশা রাযি. অন্তিম সময়ের যে অবস্থা বর্ণনা করেছেন, এতে ঐ শেষ সময়ের কঠিন কষ্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ সময় হুযুর (ﷺ)-এর সামনে পানির একটি পাত্র ছিল। তিনি বারবার এতে উভয় হাত ছেড়ে দিতেন এবং চেহারা মুবারক মুছে নিতেন। এ অবস্থায়ই তিনি মুখে বলতেনঃ «لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، إِنَّ لِلْمَوْتِ سَكَرَاتٍ» মনে রাখতে হবে যে, এ ধরনের কষ্ট আল্লাহর নৈকট্য লাভকারীদের আরো মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য হয়ে থাকে। সামনে হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, এ অবস্থাতেই তিনি হাত উপরের দিকে উঠালেন এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে নিবেদন করলেন, «فِي الرَّفِيقِ الأَعْلَى»
বিষয়টি এমন বুঝতে হবে যে, ঐ সময় ঊর্ধ্বজগত তাঁর সামনে তুলে ধরা হয়েছিল, যা নবী-রাসূল, সিদ্দীক, শহীদ ও পুণ্যবানদের ঠিকানা ও আবাস স্থল। তিনি হাত দ্বারা এর দিকে ইশারা করে আল্লাহর কাছে নিবেদন করলেন যে, আমাকে ঐ বন্ধুদের জগতে পৌঁছিয়ে দিন।
অতএব, রূহ কবয করে নেওয়া হল এবং উত্তোলিত হাত মুবারক নীচে নেমে আসল। কুরআন পাকে আম্বিয়ায়ে কেরাম, সিদ্দীক, শহীদ ও পুণ্যবান বান্দাদের উপর আল্লাহ তা'আলার বিশেষ অনুগ্রহ ও পুরস্কারসমূহের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে: وَحَسُنَ اُولٰٓئِکَ رَفِیۡقًا বাহ্যত হাদীসের في الرفيق الأعلى দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। এর পূর্বে বুখারী ও মুসলিমের বরাতে হযরত আয়েশারই যে রিওয়ায়াত উল্লেখ করা হয়েছে, এর দ্বারাও এটাই বুঝা যায়।

হাফেয ইবনে হাজার (রহঃ) ফতহুল বারীতে এ হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুস্তাদরাকে হাকেম প্রমুখের ঐসব রিওয়ায়াতের উল্লেখ করেছেন, যেগুলোতে বলা হয়েছে যে, হুযূর (ﷺ) যখন ইন্তিকাল করেন, তখন তিনি হযরত আলী রাযি.-এর কোলে ছিলেন। এর পর হাফেয ইবনে হাজার এ রিওয়ায়াত সমূহের ব্যাপারে লিখেছেন: وكل طريق منها لا يخلو عن شيعى فلا يلتفت اليها (অর্থাৎ, এসব রিওয়ায়াতের সনদে কোন না কোন শিয়া রাবী রয়েছে। এ জন্য এগুলো ভ্রুক্ষেপযোগ্যই নয়।) সামনে হাফেয ইবনে হাজার এসব রিওয়ায়াতের সনদের উপর বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। (ফতহুল বারী, পৃষ্ঠা-১০৩-১০৪ঃ খণ্ড-১৮)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ১৩২ | মুসলিম বাংলা