মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ১৩৩
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
ওফাত ও ওফাতপূর্ব অসুস্থতা
১৩৩. হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত আবু বকর রাযি. ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে আপন আবাসস্থল সুন্‌হ থেকে আসলেন। ঘোড়া থেকে নেমে তিনি মসজিদে নববীতে আসলেন, কিন্তু কারো সাথে কথা বললেন না। প্রথমে হযরত আয়েশার ঘরে আসলেন এবং সোজা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে গিয়ে পৌঁছলেন। তখন তাঁকে একটি ইয়ামানী চাদরে ঢেকে রাখা হয়েছিল। হযরত আবু বকর রাযি. চাদরটি সরিয়ে দিয়ে চেহারা মুবারক খুললেন। তারপর হুযুর (ﷺ)-এর উপর ঝুঁকে পড়লেন ও চুমু খেলেন, তারপর বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান। আল্লাহ তা'আলা আপনার উপর দু'টি মৃত্যু একত্রিত করবেন না। যে মৃত্যু আপনার জন্য অবধারিত ছিল, সে মৃত্যু এসেই গিয়েছে। (এ পর্যন্ত হযরত আয়েশার বর্ণনা ছিল। সামনে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বর্ণনা উদ্ধৃত করা হচ্ছে। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, আবূ বকর রাযি. হযরত আয়েশার ঘর থেকে বাইরে আসলেন। এ সময় হযরত উমর রাযি. লোকদের সাথে কথাবার্তা বলছিলেন। হযরত আবূ বকর হযরত উমরকে বললেন, বসে যাও, কিন্তু হযরত উমর রাযি. (তাঁর বিশেষ অবস্থার কারণে) বসতে অস্বীকার করলেন। (আবূ বকর রাযি. তখন মিম্বরের দিকে আসলেন।) এবার সবাই হযরত উমরকে ছেড়ে হযরত আবু বকরের বক্তব্য শোনার জন্য তার দিকে এসে গেলেন। তিনি (মিম্বর থেকে) ভাষণ দিতে গিয়ে (হামদ ও সালাত এবং তাওহীদ ও রেসালাতের সাক্ষ্য দানের পর) বললেনঃ আম্মাবাদ, তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি মুহাম্মদ (ﷺ)-এর ইবাদত করত, তাহলে তিনি তো ওফাত পেয়ে গিয়েছেন। আর তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করত, তিনি তো চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। মহান আল্লাহ বলেন, "মুহাম্মদ তো কেবল একজন রাসূল, তাঁর পূর্বে অনেক রাসূল অতিক্রান্ত হয়েছেন। অতএব, তিনি যদি মারা যান অথবা শহীদ হয়ে যান, তাহলে কি তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুতঃ কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তাহলে এতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ্ তাদেরকে প্রতিদান দিবেন"।
হযরত ইবনে আব্বাস বলেন, আল্লাহর কসম। এমন মনে হল যে, আবু বকরের এ আয়াত তিলাওয়াত করার পূর্বে যেন লোকেরা জানতই না যে, আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেছেন। (অর্থাৎ, এ সময় সবাই এ আয়াতের বিষয়বস্তু থেকে গাফেল হয়ে গিয়েছিল।) তারপর সব লোকেরা গ্রহণ করে নিল এবং সবার মুখে এটি উচ্চারিত হতে লাগল। আমি সবাইকে এ আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনছিলাম। -বুখারী
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: إِنَّ أَبَا بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَقْبَلَ عَلَى فَرَسٍ مِنْ مَسْكَنِهِ بِالسُّنْحِ، حَتَّى نَزَلَ فَدَخَلَ المَسْجِدَ، فَلَمْ يُكَلِّمُ النَّاسَ حَتَّى دَخَلَ عَلَى عَائِشَةَ، فَتَيَمَّمَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُغَشًّى بِثَوْبِ حِبَرَةٍ، فَكَشَفَ عَنْ وَجْهِهِ ثُمَّ أَكَبَّ عَلَيْهِ فَقَبَّلَهُ وَبَكَى، ثُمَّ قَالَ: «بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي، وَاللَّهِ لاَ يَجْمَعُ اللَّهُ عَلَيْكَ مَوْتَتَيْنِ أَمَّا المَوْتَةُ الَّتِي كُتِبَتْ عَلَيْكَ، فَقَدْ مُتَّهَا»
قَالَ الزُّهْرِيُّ: وَحَدَّثَنِي أَبُو سَلَمَةَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ أَبَا بَكْرٍ خَرَجَ وَعُمَرُ بْنُ الخَطَّابِ يُكَلِّمُ النَّاسَ فَقَالَ: اجْلِسْ يَا عُمَرُ، فَأَبَى عُمَرُ أَنْ يَجْلِسَ، فَأَقْبَلَ النَّاسُ إِلَيْهِ، وَتَرَكُوا عُمَرَ، فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ:
" أَمَّا بَعْدُ فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ يَعْبُدُ مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَإِنَّ مُحَمَّدًا قَدْ مَاتَ، وَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ يَعْبُدُ اللَّهَ فَإِنَّ اللَّهَ حَيٌّ لاَ يَمُوتُ، قَالَ اللَّهُ: {وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ} إِلَى قَوْلِهِ {الشَّاكِرِينَ} وَقَالَ: وَاللَّهِ لَكَأَنَّ النَّاسَ لَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ أَنْزَلَ هَذِهِ الآيَةَ حَتَّى تَلاَهَا أَبُو بَكْرٍ، فَتَلَقَّاهَا مِنْهُ النَّاسُ كُلُّهُمْ، فَمَا أَسْمَعُ بَشَرًا مِنَ النَّاسِ إِلَّا يَتْلُوهَا ". (رواه البخارى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

উপরের কোন কোন হাদীস থেকে আগেই জানা গিয়েছে যে, যে দিন হুযূর (ﷺ)-এর ওফাত হয়, সেদিন সকালে তাঁর অবস্থা অনেক ভাল ও স্বস্তিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এ জন্যই হযরত আবু বকর রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের আবাসস্থলে 'সুন্‌হ', চলে গিয়েছিলেন। তিনি তখনও সেখানেই ছিলেন, এ দিকে হুযুর (ﷺ)-এর ওফাত হয়ে গেল। যারা এ সংবাদ জানতে পারল, তারা সমবেত হতে লাগল। তাদের মধ্যে হযরত উমর রাযি. ও ছিলেন, যিনি কোন ভাবেই একথা মানতে; বরং শুনতেও প্রস্তুত ছিলেন না যে, হুযূর (ﷺ) ইন্তিকাল করে গিয়েছেন। হাফেয ইবনে হাজার এ হাদীসেরই ব্যাখ্যায় মুসনাদে আহমদের বরাতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন যে, যখন হুযুর (ﷺ) ইন্তিকাল করলেন এবং আমি তাঁকে চাদর পরিয়ে দিলাম, তখন হযরত উমর ও মুগীরা ইবনে শো'বা রাযি. আসলেন এবং হুযুর (ﷺ)-কে দেখার জন্য ভিতরে আসার অনুমতি চাইলেন। আমি তখন পর্দার ভিতর চলে গেলাম এবং তাঁদের দু'জনকেই অনুমতি দিলাম। তাঁরা দু'জনই ভিতরে আসলেন। হযরত উমর রাযি. হুযুর (ﷺ)-কে দেখে বললেন, واغشيناه (হায়। কেমন মূর্ছা যাওয়া।) তারপর উভয়ে যখন বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন হযরত মুগীরা রাযি. হযরত উমরকে বললেন, এটা মূর্ছা যাওয়া নয়, হুযুর (ﷺ) তো বিদায় হয়ে গিয়েছেন। হযরত উমর রাযি. তখন তাকে জোরে ধমক দিলেন এবং বললেন, হুযুর (ﷺ)-কে সে সময় পর্যন্ত দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেওয়া হবে না, যে পর্যন্ত না অমুক অমুক কাজ আঞ্জাম দিবেন- যেগুলো এ পর্যন্ত আঞ্জাম দেওয়া হয়নি। বস্তুতঃ হযরত উমরের এ অবস্থাই ছিল এবং তিনি পূর্ণ জোর দিয়ে লোকদেরকে একথাই বলে যাচ্ছিলেন। এ অবস্থায়ই হযরত আবূ বকর রাযি. ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে এসে পৌঁছলেন। প্রথমে মসজিদে আসলেন, যেখানে লোকজন সমবেত ছিল, কিন্তু কারো সাথে কোন কথা বললেন না; বরং হযরত আয়েশার হুজরায় প্রবেশ করলেন, চেহারা মুবারক থেকে কাপড় সরালেন, কাঁদতে কাঁদতে চুমু খেলেন এবং বললেন, আমার পিতা মাতা আপনার উপর কোরবান। যে মৃত্যু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জন্য লিপিবদ্ধ ছিল সেটা এসেই গিয়েছে।

(বুখারী শরীফেরই অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, হযরত আবু বকর রাযি. এ সময় إِنَّا لِلَّہِ وَإِنَّا إِلَیْہِ رَاجِعُون ও বললেন।) এরপর হযরত আবূ বকর রাযি. বাইরে তাশরীফ আনলেন। এখানে হযরত উমর রাযি. নিজের ধারণা অনুযায়ী লোকদের সামনে ভাষণ দিচ্ছিলেন। হযরত আবু বকর রাযি. তাকে বললেন, বসে যাও, অর্থাৎ, লোকদের সামনে যে বক্তব্য রাখছ তা বন্ধ করে দাও। কিন্তু হযরত উমর রাযি. এ সময় অবস্থার কাছে এমন পরাজিত ছিলেন যে, হযরত আবু বকরের কথা তিনি মানলেন না; বরং মানতে পরিষ্কার অস্বীকৃতি জানালেন। হযরত আবু বকর রাযি. হযরত উমরকে এ অবস্থায় ছেড়ে দিয়ে মসজিদের মিম্বরে তাশরীফ আনলেন। এবার সব মানুষ হযরত উমরকে ছেড়ে দিয়ে আবু বকরের নিকট এসে গেল। তিনি তখন ঐ ভাষণ দিলেন, যা হাদীসের অনুবাদে শব্দে শব্দে উদ্ধৃত করে দেওয়া হয়েছে। আর তিনি সেখানে কুরআন মজীদের সূরা আলে এমরানের ১৪৪ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন।
হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-এর এ ভাষণ ও এ আয়াত প্রতিটি ঈমানদারের অন্তরে এ বিশ্বাস সৃষ্টি করে দিল যে, হুযুর (ﷺ)-কে একদিন এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে, তাই বিদায় নিয়েছেন। আর আমাদের জীবন-মরণ তাঁরই প্রদর্শিত পথে হওয়া উচিত। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন যে, এ বিশেষ মুহূর্তে হযরত আবু বকর রাযি.-এর মুখে এ আয়াত শোনার পর সবার মুখেই এটা উচ্চারিত হচ্ছিল। সবাই এ আয়াত তিলাওয়াত করে নিজের মনকে এবং অন্যদেরকে ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হেদায়াতের উপর দৃঢ়পদ থাকার সবক দিচ্ছিল।

এ ঘটনা প্রসঙ্গেই সামনে ইমাম যুহরী সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, স্বয়ং হযরত উমর রাযি. বলেছেন যে, যখন আবূ বকর রাযি. وَمَا مُحَمَّدٌ اِلَّا رَسُوۡلٌ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন, তখন নিজের ভুল উপলব্ধি করে আমার এ অবস্থা হয়ে হয়ে গেল যে, আমি যেন নিষ্প্রাণ হয়ে গেলাম, আমার পায়ে এতটুকু শক্তি রইল না যে, আমি দাঁড়াতে পারি। আমার অন্তর সায় দিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিশ্চয়ই ওফাত পেয়ে গেছেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান