মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ১৩০
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
ওফাত ও ওফাতপূর্ব অসুস্থতা
১৩০. হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মৃত্যুশয্যায় আমাকে বলতেনঃ হে আয়েশা! আমি ঐ (বিষ মাখা) খাবারের কিছু কষ্ট সবসময় অনুভব করে আসছি- যা আমি খায়বারে খেয়েছিলাম। আর এ মুহূর্তে আমি অনুভব করছি যে, এ বিষের প্রভাবে আমার রগ ছিড়ে যাচ্ছে। -বুখারী
کتاب المناقب والفضائل
عَنِ عَائِشَةَ قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ فِي مَرَضِهِ الَّذِي مَاتَ فِيهِ: «يَا عَائِشَةُ مَا أَزَالُ أَجِدُ أَلَمَ الطَّعَامِ الَّذِي أَكَلْتُ بِخَيْبَرَ، فَهَذَا أَوَانُ وَجَدْتُ انْقِطَاعَ أَبْهَرِي مِنْ ذَلِكَ السُّمِّ» (رواه البخارى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

৭ম হিজরীতে যখন খায়বার বিজয় হল এবং যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে সন্ধিও হয়ে গেল, তখন ইয়াহুদীদের পক্ষ থেকে হুযুর (ﷺ)-এর জন্য একটি ভুনা বকরী হাদিয়া হিসাবে পাঠানো হল। মেশকাত শরীফে আবু দাউদ ও দারেমীর একটি রিওয়ায়াত রয়েছে, যার মধ্যে পরিষ্কার ও স্পষ্টরূপে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ ভুনা বকরীর মধ্যে এক ইয়াহুদী মহিলা এমন বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল যে, কোন মানুষ এটা খেলে তৎক্ষণাৎ শেষ হয়ে যাবে। আর এ ইয়াহুদী মহিলা কোনরূপে একথাও জেনে নিয়েছিল যে, হুযুর (ﷺ) রানের গোশত বেশী পছন্দ করেন। তাই ঐ ঘাতিনী এ বকরীর রানে বেশী পরিমাণে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল। যাহোক, ঐ ভুনা বকরী খাওয়ার জন্য হুযুর (ﷺ)-এর সামনে রাখা হল। হুযুর (ﷺ)-এর সাথে আরো কয়েকজন সাথী এ খাবারে শরীক ছিলেন। যেই মাত্র হুযুর (ﷺ) এ বকরীর রান থেকে একটি লোকমা উঠিয়ে নিয়ে খেলেন, তৎক্ষণাৎ হাত গুটিয়ে নিলেন এবং সাথীদেরকেও বললেন যে, তোমরা হাত গুটিয়ে নাও, একটুও খেয়োনা, এতে বিষ মিশানো রয়েছে। সাথে সাথে হুযুর (ﷺ) ঐ ইয়াহুদী মহিলাকে ডেকে আনতে বললেন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এতে বিষ মিশিয়েছ? সে বলল, একথা কে বলেছে? তিনি বললেন, আমার হাতে যে বকরীর রানটি রয়েছে, সেই আল্লাহর হুকুমে আমাকে বলে দিয়েছে যে, আমার মধ্যে বিষ মাখানো হয়েছে। ইয়াহুদী মহিলা তখন স্বীকার করে নিল যে, হ্যাঁ, আমি বিষ মিশিয়েছি এবং এটা এজন্য করেছি যে, আপনি যদি সত্য নবী হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার উপর এ বিষের কোন প্রতিক্রিয়া হবে না, আর যদি নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি মরে যাবেন এবং আপনি মরে গেলে আমরা শান্তি ও স্বস্তি পেয়ে যাব। এখন আমার বিশ্বাস হয়ে গেল যে, আপনি সত্য নবী। ঐ বর্ণনায়ই রয়েছে যে, হুযুর (ﷺ) তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। ঐ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রিওয়ায়াত থেকে আরো বিস্তারিত কিছু তথ্যও জানা যায়- যেগুলোর উল্লেখ এখানে অপ্রয়োজনীয়।

এখানে খায়বারের ঐ ঘটনার উল্লেখ কেবল এ কথা ব্যক্ত করার জন্য করা হয়েছে যে, খায়বারে বিষমাখা লোকমা খাওয়ার ঐ ঘটনা জানা হয়ে যাক, যার উল্লেখ ব্যাখ্যাধীন হাদীসে করা হয়েছে। ঐ মহিলা বকরীর রানে যে বিষ মিশিয়ে ছিল এটা এমনই ছিল যে, এর একটি গ্রাস খেলে মানুষ মরে যাবে; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁর কুদরতে অলৌকিকভাবে হুযূর (ﷺ)-কে রক্ষা করে নিলেন। কিন্তু এর কিছুটা প্রতিক্রিয়া অবশিষ্ট রয়ে গেল, যার কিছু যন্ত্রণা তিনি কখনো কখনো অনুভব করতেন। এর মধ্যে আল্লাহর হেকমত ও অভিপ্রায় এই ছিল যে, যখন দ্বীনের দাওয়াত, উম্মতের তা'লীম-তরবিয়্যত ও আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার ঐ কাজ তাঁর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে যাবে- যার জন্য তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছিল, তখন এ বিষের প্রতিক্রিয়া পূর্নরূপে প্রকাশ পেয়ে তাঁর ওফাতের ওসীলা হবে এবং এভাবে আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার সৌভাগ্য ও মর্যাদাও লাভ হবে।

এ ব্যাখ্যার আলোকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর উপরের হাদীসের মর্ম পূর্ণরূপে বুঝে নেওয়া যেতে পারে। হযরত আয়েশা রাযি. এ হাদীসে হুযুর (ﷺ)-এর যে বাণী ও অবস্থা বর্ণনা করেছেন, এটা বাহ্যত ঐ দিনেরই, যে দিন হুযুর (ﷺ)-এর ওফাত হয়েছিল এবং ঐ ভীষণ কষ্ট শুরু হয়েছিল, যার উল্লেখ সামনের কোন কোন হাদীসে আসবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান