মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ১২৯
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
ওফাত ও ওফাতপূর্ব অসুস্থতা
১২৯. হযরত আবূ মূসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (ﷺ) যখন অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং তাঁর রোগ বেড়ে গেল (এবং তিনি মসজিদে গিয়ে নামায পড়াতে অপারগ হয়ে গেলেন) তখন তিনি বললেন, (আমার পক্ষ থেকে) আবূ বকরকে নির্দেশ দাও, যেন তিনি (মসজিদে নামাযের জন্য সমবেত) লোকদের নামায পড়িয়ে দেন। হযরত আয়েশা রাযি. নিবেদন করলেন, তিনি অত্যন্ত কোমলপ্রাণ মানুষ। তিনি যখন নামায পড়ানোর জন্য আপনার স্থানে দাঁড়াবেন, তখন নামায পড়াতে পারবেন না। (হযরত আয়েশার এ কথা শোনার পরও) তিনি বললেন, আবু বকরকে নির্দেশ দাও, যেন তিনি নামায পড়িয়ে দেন। হযরত আয়েশা রাযি. আবারও ঐ কথা বললেন এবং তিনি আবারও নির্দেশ দিলেন যে, আবু বকরই নামায পড়িয়ে দেন। (এর সাথে তিনি হযরত আয়েশাকে তিরস্কার করতে গিয়ে) বললেন: فانكن صواحب يوسف তারপর বার্তাবাহক (হুযূর (ﷺ)-এর নির্দেশ নিয়ে) হযরত আবু বকরের নিকট আসল। নির্দেশ অনুযায়ী তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জীবদ্দশাতেই লোকদের নামায পড়ালেন। -বুখারী, মুসলিম
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ أَبِي مُوسَى قَالَ: مَرِضَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاشْتَدَّ مَرَضُهُ، فَقَالَ: «مُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِّ بِالنَّاسِ» قَالَتْ عَائِشَةُ: إِنَّهُ رَجُلٌ رَقِيقٌ، إِذَا قَامَ مَقَامَكَ لَمْ يَسْتَطِعْ أَنْ يُصَلِّيَ بِالنَّاسِ، قَالَ: «مُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِّ بِالنَّاسِ» فَعَادَتْ، فَقَالَ: «مُرِي أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِّ بِالنَّاسِ، فَإِنَّكُنَّ صَوَاحِبُ يُوسُفَ» فَأَتَاهُ الرَّسُولُ، فَصَلَّى بِالنَّاسِ فِي حَيَاةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

ওফাতকালীন অসুস্থতার সময়ে মসজিদে গিয়ে নামায পড়াতে হুযুর (ﷺ)-এর একেবারে অক্ষম হয়ে যাওয়ার পর তাঁর নির্দেশে হযরত আবু বকরের নামায পড়ানোর এ ঘটনা বুখারী শরীফের বিভিন্ন অধ্যায়ে একাধিক সাহাবায়ে কেরাম থেকে কোথাও খুবই সংক্ষেপে আবার কোথাও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত আবু মূসা আশআরী রাযি.-এর যে হাদীস এখানে লিখা হয়েছে, এটা ইমাম বুখারী (রহঃ) باب أَهْلُ الْعِلْمِ وَالْفَضْلِ أَحَقُّ بِالإِمَامَةِ শিরোনামে বর্ণনা করেছেন। ঐ অধ্যায়েই এ ঘটনা সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের এবং এর পূর্বের অধ্যায়ে হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীসগুলোও ইমাম বুখারী লিপিবদ্ধ করেছেন। এগুলোর মধ্যে এ ঘটনাটি অতি সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে। এর তিন অধ্যায় পরে إِنَّمَا جُعِلَ الإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ শিরোনামে হযরত আয়েশা রাযি. থেকে এ ঘটনা সম্পর্কে যে হাদীস ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন, এর দ্বারা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানা যায়। এর সারসংক্ষেপ এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ওফাতের আট দিন পূর্বে হযরত আয়েশার ঘরে স্থানান্তরিত হয়ে যাওয়ার পরও অসুখের প্রচণ্ডতা ও দুর্বলতা অনেক বৃদ্ধি 'পাওয়া সত্ত্বেও কয়েক দিন পর্যন্ত প্রতি নামাযের সময় মসজিদে গিয়ে অভ্যাস অনুযায়ী নিজেই নামায পড়াতে থাকেন। তারপর একদিন এমন হল যে, এশার আযান হয়ে গিয়েছে এবং মানুষ জামাআতে নামায আদায় করার জন্য মসজিদে সমবেত হয়ে গিয়েছে; কিন্তু এমন সময় রোগের প্রচণ্ডতার কারণে হুযুর (ﷺ)-এর উপর মূর্ছাভাব ও অবসাদ এসে গেল। পরে যখন এ ভাব কেটে গেল, তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, লোকেরা কি মসজিদে নামায আদায় করে নিয়েছে? উত্তরে বলা হল, লোকেরা এখনও নামায আদায় করেনি, তারা আপনার অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বললেন, আমার জন্য একটি পাত্রে পানি রাখ। হুযূর (ﷺ)-এর ধারণা ছিল যে, গোসল করার দ্বারা ইনশাআল্লাহ্ অসুখের প্রচণ্ডতা কমে যাবে এবং তিনি মসজিদে গিয়ে নামায পড়াতে পারবেন। হযরত আয়েশা রাযি. বর্ণনা করেন যে, আমরা একটি পাত্রে পানি রাখলাম। তিনি গোসল করে দাঁড়াতে লাগলেন, এমন সময় আবার মূর্ছা ও অবসাদ ভাব দেখা দিল। পরে যখন এ অবস্থা কেটে গেল, তখন তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, লোকেরা কি নামায পড়ে নিয়েছে? উত্তরে বলা হল, এখনো নামায পড়া হয়নি, লোকেরা আপনার অপেক্ষায় রয়েছে। এরপর তিনি আবার পাত্রে পানি রাখতে বললেন, আবার গোসল করলেন এবং মসজিদে যাওয়ার জন্য দাঁড়াতে চাইলেন, এমন সময় আবার মূর্ছাভাব দেখা দিল। তারপর যখন এ অবস্থা কেটে গেল, তখন আবার জিজ্ঞাসা করলেন, লোকেরা কি নামায পড়ে নিয়েছে? উত্তরে বলা হল, এখনো নামায পড়া হয়নি, তারা আপনার অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি তখন আবার পাত্রে পানি রাখতে বললেন এবং গোসল করে মসজিদে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতে চাইলেন, এবারও ঐ মূর্ছাভাব দেখা দিল। (মোটকথা, তিনবার এমন হল।) এরপর যখন এ অবস্থা দূর হল এবং জিজ্ঞাসা করার পর বলা হল যে, এখনো মসজিদে জামাআত হয়নি, মানুষ আপনার অপেক্ষায় মসজিদে সমবেত হয়ে বসে আছে, তখন তিনি বললেন, আবু বকরকে আমার পক্ষ থেকে বলে দাও, যেন নামায পড়িয়ে দেয়।
হযরত আবূ মূসা আশআরীর যে রিওয়ায়াত উপরে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, এতেও রয়েছে এবং এ ঘটনা সংক্রান্ত অধিকাংশ রিওয়ায়াতে এসেছে যে, হযরত আয়েশা রাযি. এ ক্ষেত্রে নিবেদন করলেন যে, আমার পিতা আবু বকর রাযি. অত্যন্ত কোমলপ্রাণ মানুষ। তিনি যখন নামায পড়ানোর জন্য আপনার স্থানে দাঁড়াবেন, তখন তিনি ভেঙ্গে পড়বেন এবং নামায পড়াতে পারবেন না। এ জন্য তাঁর স্থলে হযরত উমরকে নির্দেশ দেওয়া হোক। কেননা, তিনি দৃঢ় অন্তরের মানুষ। কিন্তু হুযুর (ﷺ) তাঁর এ কথা গ্রহণ করলেন না এবং তিনি যখন দ্বিতীয় বার ঐ কথাই বললেন, তখন হুযুর (ﷺ) তাকে ধমক দিলেন এবং বললেন, আবু বকরকেই আমার এ নির্দেশ পৌঁছানো হোক, যে তিনিই যেন নামায পড়িয়ে দেন। নির্দেশ অনুযায়ী হযরত বিলাল রাযি. হযরত আবু বকর রাযি.-কে এ হুকুম পৌঁছিয়ে দিলেন। (হযরত আবু বকরের এ কথা জানা ছিল না যে, হযরত আয়েশা রাযি. এ ব্যাপারে হুযুর (ﷺ)-এর নিকট কি নিবেদন করেছিলেন।) তিনিও নিজের মানসিক অবস্থার দিকে খেয়াল করে হযরত উমরকে বললেন যে, আপনি নামায পড়িয়ে দিন। উমর রাযি. বললেন, হুযুর (ﷺ) আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং আপনিই নামায পড়িয়ে দিন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হযরত আবূ বকর নামায পড়ালেন। আগেই এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে যে, এটা ছিল এশার নামায, আর এটাই প্রথম নামায ছিল, যা হুযুর (ﷺ)-এর কঠোর নির্দেশে তাঁর ওফাতকালীন অসুস্থতার সময় হযরত আবূ বকর রাযি. পড়িয়েছিলেন। এরপর হুযুর (ﷺ)-এর ওফাত পর্যন্ত তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তিনিই মসজিদে নববীতে নামায পড়াতে থাকেন।

সামনে হযরত আয়েশা রাযি.-এর এ রিওয়ায়াতেই একথাও রয়েছে যে, তারপর একদিন যোহরের নামাযের সময় যখন মসজিদে নববীতে জামাআতের সাথে নামায শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং হুযুর (ﷺ)-এর নির্দেশ অনুযায়ী হযরত আবূ বকর রাযি. নামায পড়াচ্ছিলেন, এমন সময় হুযুর (ﷺ) কিছুটা সুস্থতাবোধ করলেন এবং দু'ব্যক্তির সাহায্যে তিনি মসজিদে আগমন করলেন। হযরত আবূ বকর রাযি. যখন তাঁর আগমন টের পেলেন, তখন তিনি পেছনে সরে এসে মুক্তাদীদের কাতারে শামিল হতে চাইলেন। হুযুর (ﷺ) ইশারায় বললেন যে, পেছনে সরে আসবেন না, নিজের স্থানে থাকুন। যে দু'ব্যক্তি তাঁকে মসজিদে নিয়ে গিয়েছিল তাদেরকে বললেন যে, আমাকে আবূ বকরের বরাবর বসিয়ে দাও। কথামত তাই করা হল। এখন আসল ইমাম হুযূর (ﷺ) হয়ে গেলেন এবং আবূ বকর মুক্তাদী হয়ে গেলেন। কিন্তু দুর্বলতার কারণে হুযুর (ﷺ)-এর তাকবীর ইত্যাদির আওয়াজ যেহেতু সব নামাযী শুনতে পারত না, তাই তাকবীর ইত্যাদি হযরত আবূ বকরই বলতে থাকলেন। কোন কোন বর্ণনাকারী এ বিষয়টি এভাবে প্রকাশ করেছেন যে, আবূ বকর রাযি. হুযূর (ﷺ)-এর এক্তেদা করে যাচ্ছিলেন, আর অবশিষ্ট সকল নামাযী আবূ বকরের এক্তেদা করে যাচ্ছিলেন। মর্ম এটাই যে, সাধারণ নামাযীদের কানে হুযুর (ﷺ)-এর তাকবীর ইত্যাদির আওয়াজ পৌঁছত না, আবু বকরের আওয়াজই পৌঁছত এবং সে অনুসারেই লোকেরা রুকু ও সিজদা করত। এটা ছিল ঐ যোহরের নামায, যার উল্লেখ পূর্বেও বিভিন্ন রিওয়ায়াতে এসেছে। একথাও উল্লেখ করে আসা হয়েছে যে, এ নামাযের পর হুযুর (ﷺ) মিম্বরে উঠে ভাষণও দিয়েছিলেন- যা মসজিদে নববীতে তাঁর শেষ ভাষণ ছিল। একথার উপর সবাই একমত যে, হযরত আবূ বকরকে নিজের জায়গায় ইমাম বানানোর পর হুযুর (ﷺ) যোহরের এ নামায মসজিদে এসে আদায় করেছিলেন। এ নামায ছাড়া অন্য কোন নামায তিনি এ দিনগুলোতে মসজিদে এসে আদায় করেছেন কিনা এতে মতভেদ রয়েছে।

এখানে এ কথাটিও উল্লেখ করার মত যে, এ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রিওয়ায়াতে স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি.-এর এ বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমি যে বার বার হুযূর (ﷺ)-এর নিকট আরয করেছিলাম যে, আবূ বকর রাযি. খুবই কোমলপ্রাণ মানুষ। তিনি যখন আপনার জায়গায় দাঁড়াবেন, তখন তিনি ভেঙ্গে পড়বেন এবং নামায পড়াতে পারবেন না। এর আসল কারণ ছিল আমার এ ধারণা যে, যে ব্যক্তি হুযূর (ﷺ)-এর জায়গায় দাঁড়িয়ে নামায পড়াবে তাকে লোকেরা ভাল চোখে দেখবে না। এ জন্যই আমি চাচ্ছিলাম যে, হুযুর (ﷺ) যেন তাঁকে নামায পড়ানোর নির্দেশ না দেন। হুযুর (ﷺ) সম্ভবত তাঁর অন্তরে এভাবে অনুভব করে নিয়েছিলেন। এ জন্য তিনি তাঁকে ধমক দিলেন ও বললেন : إِنَّكُنَّ صَوَاحِبُ يُوسُفَ হযরত আয়েশা এ কথা বুঝতে পারলেন না যে, হুযুর (ﷺ) তাঁকে নিজের জীবদ্দশায় নামাযের ইমাম বানিয়ে পরবর্তী সময়ের জন্য উম্মতের ইমামতে কুবরা তথা খেলাফতের ফায়সালা নিজের এ কাজ দ্বারা করে দিতে চান। হুযুর (ﷺ) তাঁকে ইমাম বানাতে পীড়াপীড়ি এ উদ্দেশ্যেই ছিল।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান