মা'আরিফুল হাদীস

রোযা অধ্যায়

হাদীস নং: ১০৯
রোযা অধ্যায়
বিনা ওযরে ফরয রোযা ভাঙ্গার কাফ্ফারা
১০৯. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)এর কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ এক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ধ্বংস হয়ে গিয়েছি। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: কি হয়েছে? লোকটি বলল, আমি রোযা অবস্থায় স্ত্রীসঙ্গম করে ফেলেছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি কোন গোলাম আযাদ করতে পারবে? সে বলল, না। তিনি জি জ্ঞাসা করলেন: তুমি কি একাধারে দু'মাস রোযা রাখতে পারবে? সে বলল, না। এবার তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কি ষাটজন মিসকীনকে খাবার দিতে পারবে? সে বলল, এ সামর্থ্যও আমার নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: তুমি বসে থাক। (হয়তো আল্লাহ্ তা'আলা তোমার জন্য কোন উপায় বের করে দিবেন।) আবূ হুরায়রা বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)ও সেখানে বসে রইলেন। আমরাও এ অবস্থায় বসা ছিলাম, হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)এর কাছে খেজুরের এক বিরাট থলে আসল। তিনি তখন ডাক দিয়ে বললেন: মাসআলা জিজ্ঞাসাকারী লোকটি কোথায়? সে বলল, এই যে, আমি হাজির। তিনি বললেন: এ থলেটি নিয়ে নাও এবং (নিজের পক্ষ থেকে) সদাকা করে দাও। সে বলল, আমার চেয়ে বেশী অভাবী কোন মানুষের উপর সদাকা করব? আল্লাহর কসম। মদীনার দু' প্রান্তের প্রস্তরময় ভূমির মাঝে (অর্থাৎ, মদীনায় সম্পূর্ণ জনপদে) আমার পরিবারের চেয়ে বেশী অভাবী কোন পরিবার নেই। (তার এ কথা শুনে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (নিজের অভ্যাসের বিপরীত) এমনভাবে হাসলেন যে, তাঁর দান্দান মোবারক বেশ খানিকটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। (অথচ অভ্যাস হিসাবে তিনি কেবল মুচকি হাসতেন।) তারপর বললেনঃ এগুলো নিজের পরিবারের লোকদেরকেই খাইয়ে দাও। -বুখারী, মুসলিম
کتاب الصوم
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسٌ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، إِذْ جَاءَهُ رَجُلٌ فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلَكْتُ. قَالَ : « وَمَا لَكَ؟ » قَالَ : وَقَعْتُ عَلَى امْرَأَتِي وَأَنَا صَائِمٌ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : « هَلْ تَجِدُ رَقَبَةً تُعْتِقُهَا؟ » قَالَ : لاَ ، قَالَ : « فَهَلْ تَسْتَطِيعُ أَنْ تَصُومَ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ » ، قَالَ : لاَ ، فَقَالَ : « فَهَلْ تَجِدُ إِطْعَامَ سِتِّينَ مِسْكِينًا » . قَالَ : لاَ ..... قَالَ : اِجْلِسْ وَمَكَثَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَبَيْنَا نَحْنُ عَلَى ذَلِكَ أُتِيَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِعَرَقٍ فِيهَا تَمْرٌ (وَالعَرَقُ المِكْتَلُ الضَّخْم) قَالَ : « أَيْنَ السَّائِلُ؟ » فَقَالَ : أَنَا ، قَالَ : « خُذْهَا ، فَتَصَدَّقْ بِهِ » فَقَالَ الرَّجُلُ : أَعَلَى أَفْقَرَ مِنِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ فَوَاللَّهِ مَا بَيْنَ لاَبَتَيْهَا - يُرِيدُ الحَرَّتَيْنِ - أَهْلُ بَيْتٍ أَفْقَرُ مِنْ أَهْلِ بَيْتِي ، فَضَحِكَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى بَدَتْ أَنْيَابُهُ ، ثُمَّ قَالَ : « أَطْعِمْهُ أَهْلَكَ »
(رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, কোন ব্যক্তি যদি রমযানের রোযার মধ্যে প্রবৃত্তির তাড়নায় এমন ভুল করে বসে, তাহলে এর কাফ্ফারা এই যে, যদি একটি গোলাম আযাদ করার সামর্থ্য থাকে, তাহলে গোলাম আযাদ করে দেবে। আর যদি এর সামর্থ্য না থাকে, তাহলে একাধারে দু' মাস রোযা রাখবে, যদি এরও শক্তি না থাকে, তাহলে ষাটজন মিসকীনকে খানা খাওয়াতে হবে। অধিকাংশ ইমাম ও ফকীহদের মাযহাব এটাই। তবে এ ব্যাপারে ইমামদের মতবিরোধ রয়েছে যে, এ কাফফারা কি কেবল ঐ অবস্থায় ওয়াজিব হবে যখন কেউ বোযা রেখে স্ত্রীসঙ্গম করে ফেলে, না ঐ অবস্থাতেও ওয়াজিব হবে, যখন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করে রোযা ভেঙ্গে ফেলে। ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ)-এর নিকট এ কাফ্ফারা কেবল স্ত্রীসঙ্গমের বেলায় প্রযোজ্য হবে। কেননা, হাদীসে যে ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে, সেটা স্ত্রীসঙ্গমেরই ঘটনা। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, সুফিয়ান সাওরী, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহঃ) প্রমুখ ইমামদের মাযহাব এই যে, এ কাফ্ফারা আসলে রমযানের রোযার প্রতি অমর্যাদা প্রদর্শনের কারণে এবং এ অপরাধের শাস্তি হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে যে, সে নিজের প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে রমযানের রোযার মর্যাদা রক্ষা করে নাই; বরং রোযা ভেঙ্গে ফেলেছে। আর এ অপরাধটি উভয় অবস্থায়ই সমান। তাই কেউ যদি জেনে-শুনে পানাহার করে রোযা ভেঙ্গে ফেলে, তাহলে তার উপরও কাফফারা ওয়াজিব হবে।

এ হাদীসে একটি আশ্চর্য বিষয় এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘটনার সাথে জড়িত ঐ সাহাবীকে গরীব-মিসকীনকে দান করার জন্য খেজুরের যে বিরাট থলেটি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সে যখন বলল যে, সারা মদীনায় আমার পরিবারের চেয়ে বেশী অভাবী কোন পরিবার নেই, তখন তিনি এগুলো তার নিজের প্রয়োজনেই ব্যবহার করে নেওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলেন। এ ব্যাপারে অধিকাংশ ইমামদের মত এই যে, এর অর্থ এই নয় যে, এভাবে তার কাফ্ফারা আদায় হয়ে গেল; বরং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার উপস্থিত প্রয়োজন ও অভাবের দিকে লক্ষ্য করে খেজুরগুলো নিজের খরচে নিয়ে আসতে সেই সময়কারমত অনুমতি দিয়ে দিলেন; কিন্তু কাফ্ফারা তার দায়িত্বে ওয়াজিব রয়ে গেল। আর মাসআলা এটাই যে, যদি রমযানের রোযা এমন কোন ব্যক্তি এভাবে ভেঙ্গে ফেলে, যে উপস্থিত সময়ে গোলাম আযাদ করতে পারে না, একাধারে দু'মাস রোযাও রাখতে পারে না এবং অভাব ও দারিদ্র্যের কারণে ষাটজন মিসকীনকে আহারও করাতে পারে না; তাহলে কাফ্ফারা তার দায়িত্বে ওয়াজিব থাকবে। সে এটা আদায় করার নিয়্যত রাখবে এবং যখনই সামর্থ্য হবে, তখন ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। ইমাম যুহরী প্রমুখ কতিপয় ইমামের মত এই যে, শরী‘আতের সাধারণ বিধান ও মাসআলা তো এটাই; কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ সাহাবীর সাথে এক ধরনের ব্যতিক্রমী আচরণ করেছেন এবং তার কাফ্ফারা এভাবেই আদায় হয়ে গিয়েছে।

এ ঘটনাটি বুখারী ও মুসলিমে কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে হযরত আয়েশা রাযি. থেকেও বর্ণিত হয়েছে। হাফেয ইবনে হাজার (রহঃ) 'ফতহুল বারী' গ্রন্থে লিখেছেন, কোন কোন আলেম মনীষী (যাদেরকে আমাদের উস্তাদগণ দেখেছেন) দু' খণ্ড বিশিষ্ট পুস্তক লিখে আবূ হুরায়রা রাযি.-এর এ হাদীসের দীর্ঘ ব্যাখ্যা করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে, এ হাদীস দ্বারা এক হাজার মাসআলা ও সূক্ষ্ম বিষয় জানা যায়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান