মা'আরিফুল হাদীস

রোযা অধ্যায়

হাদীস নং: ৭৯
রোযা অধ্যায়
রমযান শরীফের বিশেষ করে এর শেষ দশ দিনের আমলসমূহের মধ্যে একটি আমল হচ্ছে ইতিকাফ। ইতিকাফের স্বরূপ হচ্ছে এই যে, একজন বান্দা সব কিছু থেকে নির্লিপ্ত হয়ে এবং সবাইকে ছেড়ে কেবল আল্লাহ তা'আলার ধ্যানে মগ্ন হয়ে তাঁর দরজায় (অর্থাৎ, মসজিদের এক কোণে) পড়ে থাকবে এবং নিরিবিলি পরিবেশে তাঁর ইবাদত ও যিকিরে লিপ্ত থাকবে। এটা আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের; বরং তাদের মধ্যে যারা উঁচু পর্যায়ের- তাদের ইবাদত। এ ইবাদতের উত্তম সময় রমযান শরীফ এবং বিশেষভাবে রমযানের শেষ দশকই হতে পারত। এ জন্য এ সময়টাকেই এর জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।

কুরআন নাযিল হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মধ্যে সবার নিকট থেকে পৃথক হয়ে নীরবে নির্জনে আল্লাহর ইবাদত ও যিকিরের যে ব্যাকুল আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল, যার ফলে তিনি একাধারে কয়েক মাস পর্যন্ত হেরার গুহায় নির্জনবাস করতে থাকলেন, এটা যেন তাঁর প্রথম ইতিকাফ ছিল। আর এ ইতিকাফের দ্বারা তাঁর আত্মিক শক্তি এ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, এখন তাঁর উপর কুরআন অবতরণ শুরু হয়ে যেতে পারে।

বস্তুতঃ হেরা গুহার এ ইতিকাফের শেষ দিনগুলোতেই আল্লাহর ওহীবাহক ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল সূরা 'আলাক'-এর প্রাথমিক আয়াতগুলো নিয়ে আগমন করলেন। সঠিক অনুসন্ধান অনুযায়ী এটা রমযানের মাস ও এর শেষ দশক ছিল এবং ঐ রাতটি শবে ক্বদর ছিল। এ কারণেও ইতিকাফের জন্য রমযান শরীফের শেষ দশককে নির্বাচন করা হয়েছে।

আত্মার লালন ও এর উন্নতি এবং জৈবিক শক্তির উপর এটাকে প্রবল ও বিজয়ী রাখার জন্য রমযানের সারা মাসের রোযা তো উম্মতের প্রতিটি ব্যক্তির জন্য ফরয করা হয়েছে। এভাবে যেন নিজের অন্তরে ফেরেশতা শক্তিকে বিজয়ী ও পশু-চরিত্রকে দমন করার জন্য এতটুকু সাধনা ও নফসের এতটুকু কুরবানীকে প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য করে দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন এ পবিত্র মাসে আল্লাহর হুকুম পালন ও তাঁর ইবাদতের নিয়্যতে দিনের বেলায় পানাহার না করে, স্ত্রী-সম্ভোগ থেকে বিরত থাকে এবং সর্বপ্রকার গুনাহর কাজ- এমনকি অহেতুক কথাবার্তাও বর্জন করে চলে, আর এ নিয়মেই সারাটি মাস অতিবাহিত করে। বস্তুতঃ এটা হচ্ছে রমযানে আত্মার লালন ও এর পরিশুদ্ধির একটি সাধারণ ও বাধ্যতামূলক কোর্স। এর চেয়ে আরো উঁচু পর্যায়ে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে এবং উর্ধ্বজগতের সাথে সম্বন্ধ স্থাপনের জন্য ইতিকাফের রীতি বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। ইতিকাফকালে একজন মানুষ সবার নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং সকলের নিকট থেকে দূরত্ব অবলম্বন করে আপন মালিক ও মাওলার ঘরে এবং যেন তাঁরই পদপ্রান্তে পড়ে থাকে, তাঁকেই স্মরণ করে, তাঁরই ধ্যানে মগ্ন থাকে, তারই তসবীহ ও প্রশংসা করে, তাঁর দরবারে তওবা-ইস্তিগফার করে, নিজের অন্যায়-অপরাধ ও গুনাহ খাতার জন্য কান্নাকাটি করে, দয়াময় মালিকের কাছে রহমত ও মাগফেরাত প্রার্থনা করে, তাঁর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য কামনা করে। এভাবেই তার দিন কাটে এবং এ অবস্থায়ই তার রাত চলে। আর একথা স্পষ্ট যে, এর চেয়ে সৌভাগ্য একজন বান্দার আর কী হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রতি বছর খুবই যত্ন ও গুরুত্বসহকারে রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। এমন কি এক বছরে যখন কোন কারণে ইতিকাফ ছুটে গেল, তখন পরবর্তী বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করলেন। এ ভূমিকার পর এবার এ সংক্রান্ত কিছু হাদীস পাঠ করে নিন:
৭৯. হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। তাঁর এ রীতি মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রীগণও ইতিকাফ করেছেন। -বুখারী, মুসলিম
کتاب الصوم
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ : « أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، كَانَ يَعْتَكِفُ العَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللَّهُ ، ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ »
(رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রীগণ নিজেদের হুজরায় ইতিকাফ করতেন, আর মহিলাদের জন্য ইতিকাফের স্থান হচ্ছে তাদের ঘরের ঐ জায়গাটিই, সাধারণত যা তারা নামায পড়ার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখে। আর যদি ঘরে নামাযের কোন স্থান নির্ধারিত না থাকে, তাহলে ইতিকাফকারী মহিলাগণ গৃহের যে কোন একটি স্থান নির্বাচন করে নিবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ৭৯ | মুসলিম বাংলা