মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)
আল-কুরআন এর ফযীলত, তাফসীর ও শানে নুযূল অধ্যায়
হাদীস নং: ৩০
আল-কুরআন এর ফযীলত, তাফসীর ও শানে নুযূল অধ্যায়
পরিচ্ছেদ: কুরআন তিলাওয়াতের ফজীলত এর অনুসরণ এবং তদানুযায়ী আমল প্রসঙ্গ।
৩০। আনাস ইবন মালিক (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু মুসা-আশআরী (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, কুরআন তিলাওয়াতকারী মুমিন কমলা লেবুর ন্যায়, যার স্বাদ ভাল এবং যার ঘ্রাণও সুন্দর। আর কুরআন তিলাওয়াতকারী নয় এমন মুমিন শুকনা খেজুরের মত, যা স্বাদ ভাল তবে তার কোন গ্রাণ নাই, আবার কুরআন তিলাওয়াতকারী পাপিষ্ট রায়হানার মত যার স্বাদ তিক্ত তবে তার গ্রান সুন্দর, আর কুরআন তিলাওয়াতকারী নয় এমন পাপিষ্ট মাকাল ফলের মতো, যার স্বাদ তিক্ত এবং যার কোন গ্রান নাই।
(বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিযী, ইবন মাজাহ অন্যান্য গ্রন্থসুত্র।)
(বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিযী, ইবন মাজাহ অন্যান্য গ্রন্থসুত্র।)
كتاب فضائل القرآن وتفسيره وأسباب نزوله
باب فضل قراءة القرآن والتعبد به والعمل بما فيه
عن أنس بن مالك أن أبا موسى الأشعري رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم مثل المؤمن الذي يقرأ القرآن مثل الأترجة (5) طعمها طيب وريحها طيب (6) ومثل المؤمن الذي لا يقرأ القرآن كمثل التمرة طعمها طيب (7) ولا ريح لها ومثل الفاجر (8) الذي يقرأ القرآن كمثل الريحانة (9) مر طعمها وريحها طيب ومثل الفاجر الذي لا يقرأ القرآن كمثل الحنظلة (10) مر طعمها ولا ريح لها
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীছটিতে বিভিন্ন উপমা দ্বারা চার শ্রেণির মানুষের গুণাগুণ বর্ণনা করা হয়েছে। কোনও বিষয়বস্তুকে দৃষ্টান্ত বা উপমা দ্বারা ব্যাখ্যা করা হলে তা খুব হৃদয়গ্রাহী হয়ে থাকে। তাতে সে বিষয়বস্তু ভালোভাবে বুঝে আসে ও অন্তরে রেখাপাত করে। পবিত্র কুরআন ও হাদীছ শরীফে এ রীতির বহুল ব্যবহার রয়েছে। এ হাদীছটিতে চার শ্রেণির লোকের গুণাগুণ যেসকল উপমা দ্বারা তুলে ধরা হয়েছে তা নিম্নরূপ।
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ الَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ مَثَلُ الْأَتْرُجَّةِ: رِيْحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا طَيِّبٌ (যে মমিন কুরআন পড়ে, তার দৃষ্টান্ত কমলালেবু, যার ঘ্রাণ উত্তম এবং স্বাদ উত্তম)। 'যে মুমিন কুরআন পড়ে'-এর অর্থ কুরআন পড়া যার নিয়মিত আমল, যে ব্যক্তি এ আমলকে নিজ অভ্যাসে পরিণত করেছে। এমন নয় যে, কোনওদিন পড়ল, কোনওদিন পড়ল না।
কুরআন পাঠের তিনটি স্তর
কুরআন পড়ারও আবার বিভিন্ন স্তর আছে। এক তো হলো অর্থ না বুঝে পড়া। এটা সর্বনিম্ন স্তর। এরূপ পড়া নিরর্থক নয়। এতেও ছাওয়াব পাওয়া যায়। প্রতি হরফে এক নেকী, যা দশগুণে বৃদ্ধি করা হয়। কুরআন মাজীদকে মানবরচিত বই-পুস্তকের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না যে, না বুঝে পড়লে কোনও ফায়দা নেই।
দ্বিতীয় স্তর হলো অর্থ বুঝে পড়া। কুরআন মাজীদের অর্থ বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, যেন পাঠক কুরআনের অর্থের মধ্যে চিন্তাভাবনা করে। অর্থ না বুঝলে চিন্তাভাবনা কীভাবে করা যাবে? সাধারণ স্তরের পাঠকও যদি আয়াতের মধ্যে চিন্তাভাবনা করে, তবে সে তা দ্বারা তার মনে বিপুল খোরাক পেতে পারে। কুরআন মাজীদের রয়েছে গভীর প্রভাব। চিন্তাভাবনার সঙ্গে পাঠ করলে মন-মস্তিষ্কে তার দারুণ প্রভাব পড়ে। ফলে জীবন বদলানো সহজ হয়। কুরআন তো জীবন বদলানোর জন্যই। আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত বান্দারূপে জীবন গঠন করাই কুরআনপাঠের আসল উদ্দেশ্য।
কুরআন পাঠের তৃতীয় স্তর হলো কুরআনের ভেতর যে অফুরন্ত জ্ঞান-তত্ত্বের সমাহার রয়েছে, তা থেকে আপন সামর্থ্য অনুযায়ী আহরণ করতে থাকা। সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক যুগের জ্ঞানসাধক মনীষীবর্গের এক বড় অংশ সে আহরণ প্রক্রিয়ায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের সে প্রচেষ্টায় যেমন মানুষের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে, তেমনি মানুষ তাদের পার্থিব জীবন শান্তিময় ও পরকালীন জীবন সাফল্যমণ্ডিত করার রসদও লাভ করেছে।
কুরআন এক হিদায়াতগ্রন্থ। জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে আল্লাহ তা'আলার মর্জি মোতাবেক চলার নির্দেশনা এর ভেতর রয়েছে। আমাদের মহান উলামা, ফুকাহা ও মুহাদ্দিছগণ তাদের অক্লান্ত সাধনা ও গবেষণা দ্বারা কুরআনের সেসব নির্দেশনা সুবিন্যস্ত আকারে সর্বস্তরের মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। ফলে আজ যে-কেউ ইচ্ছা করলেই কুরআনী হিদায়াত অনুযায়ী জীবন গঠনের চেষ্টা চালাতে পারে।
কুরআন পাঠকারী মুমিনের দৃষ্টান্ত
আলোচ্য হাদীছে যে কুরআনপাঠের কথা বলা হয়েছে, এ তিনও স্তরের পাঠই তার অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি নিয়মিত কুরআন পাঠ করে, তাকে তুলনা করা হয়েছে কমলালেবুর সঙ্গে। কমলালেবুর বিশেষ দু'টি বৈশিষ্ট্য আছে। একটি হলো তার সুন্দর ঘ্রাণ, আর দ্বিতীয়টি উত্তম স্বাদ। প্রথমটি বাইরের গুণ আর দ্বিতীয়টি ভেতরের। অর্থাৎ এ ফলটি বাহির ও ভেতর উভয়দিক থেকেই উত্তম। ফলে মানুষ উভয়দিক থেকেই তা উপভোগ করতে পারে। খেয়েও আরাম পায়, ঘ্রাণ নিয়েও আমোদিত হয়। যে মুমিন নিয়মিত কুরআন পড়ে, তার অবস্থাও এরকমই। তারও বাহির ও ভেতর দু'ই উত্তম। তার ভেতরে আছে ঈমানের আস্বাদ, বাইরে কুরআন তিলাওয়াতের মাধুর্য। তার তিলাওয়াতের ধ্বনি শ্রোতাকে আমোদিত করে। শ্রোতা তার দ্বারা উপকৃত হয়। তার তিলাওয়াত যে শোনে, সেও তার মতো ছাওয়াব পায়। পাঠক ও শ্রোতা বা তাদের যে-কেউ যদি অর্থও বোঝে, তবে সে অর্থ তাদের অন্তরে রেখাপাত করে। যে পাঠক কুরআনের আলেমও, তার ইলম ও আমল অনুপাতে মানুষ তার দ্বারা উপকার পেয়ে থাকে। তার মজলিসে বসলে দীনের ইলম ও আমলে উন্নতি লাভ হয়। তার সঙ্গে কথা বললে জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার দ্বারা ঈমান ও আমলের হেফাজত হয়।
উল্লেখ্য, যে ব্যক্তি অর্থ বোঝে না, কিন্তু তা সত্ত্বেও নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে, সেও কুরআনের পাঠক বটে, তবে হাদীছ ও সালাফের পরিভাষায় সাধারণত কারী বা কুরআনের পাঠক বলতে কুরআনের আলেমকে বোঝানো হয়। কাজেই হাদীছের উপমাটি পূর্ণাঙ্গরূপে কুরআনের আলেমের জন্যই প্রযোজ্য, যদিও যারা আলেম নয় কিন্তু তা সত্ত্বেও কুরআন পাঠ করে, তারাও হাদীছটির শাব্দিক ব্যাপকতার কারণে কোনও না কোনও স্তরে এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
লক্ষণীয়, ঈমানকে তুলনা করা হয়েছে ফলের স্বাদের সঙ্গে আর কুরআনপাঠকে তুলনা করা হয়েছে ঘ্রাণের সঙ্গে। এর কারণ হলো ফলের যেমন স্বাদটাই আসল, মুমিন ব্যক্তিরও তেমনি আসল হলো ঈমান। ঈমান থাকলে কুরআন তিলাওয়াতের আমল গ্রহণযোগ্য হয়, অন্যথায় নয়। যেমন ফলের স্বাদ ঠিক থাকলে বাইরের ঘ্রাণের মূল্যায়ন হয় আর স্বাদ ঠিক না থাকলে ঘ্রাণের মূল্য থাকে না।
যে মুমিন কুরআন পড়ে না, তার দৃষ্টান্ত
وَمَثَلُ الْمُؤْمِنِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كَمَثَلِ التَّمْرَةِ: لَا رِيحَ لَهَا وَطَعْمُهَا حُلْو (আর যে মুমিন কুরআন পড়ে না, তার দৃষ্টান্ত খেজুর, যার ঘ্রাণ নেই কিন্তু স্বাদ মিষ্ট)। খেজুর মিষ্ট হওয়ায় তার স্বাদের মূল্যায়ন হয়। কিন্তু ঘ্রাণ না থাকায় কেউ তা শুঁকে আনন্দ পায় না। তদ্রূপ যে মুমিন কুরআন পড়ে না, তার ঈমানের তো মূল্যায়ন হবে এবং যা-কিছু নেক আমল করবে তাও গ্রহণযোগ্য হবে, কিন্তু কুরআন না পড়ার দরুন সে যেন ঘ্রাণবিহীন সুস্বাদু ফল। অর্থাৎ মানুষ যে তিলাওয়াত শুনে আনন্দ ও ছাওয়াব পাবে বা তিলাওয়াতের অর্থ বুঝে উপকৃত হবে, তার বেলায় সেরকমটা হয় না।
কুরআন পাঠকারী মুনাফিকের দৃষ্টান্ত
وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ الَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كَمَثلِ الرَّيَحَانَةِ : رِيحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا مُر (যে মুনাফিক কুরআন পড়ে, তার দৃষ্টান্ত সুগন্ধি ফুল, যার ঘ্রাণ ভালো কিন্তু স্বাদ তিতা)। ফুল তার সুরভি দ্বারা অন্যকে আমোদিত করে, কিন্তু স্বাদ তিতা হওয়ায় কেউ তা খেয়ে মজা পায় না। ফলে কেউ খায়ও না। অর্থাৎ তার বাহির তো ভালো, কিন্তু ভেতর মন্দ। মুনাফিকের অবস্থাও এরকমই। তার বাইরের দিকটি আকর্ষণীয়। কুরআন তিলাওয়াতের মাধুর্য দ্বারা সে অন্যকে আকৃষ্ট করে, মানুষ তা শুনে উপকৃতও হতে পারে, কিন্তু সে নিজে উপকৃত হয় না। তার ভেতর ভালো নয়। সেখানে রয়েছে কুফরের অন্ধকার ও মুনাফিকীর বিস্বাদ। অর্থাৎ তার ঈমান নেই। ঈমান না থাকায় তার তিলাওয়াত এবং তার অন্য কোনও আমলের কোনও মূল্য নেই। তা আল্লাহ তা'আলার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
যে মুনাফিক কুরআন পড়ে না, তার দৃষ্টান্ত
وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كَمَثَلِ الْحَنْظَلَةِ : لَيْسَ لَهَا رِيحٌ وَطَعْمُهَا مُر (আর যে মুনাফিক কুরআন পড়ে না, তার দৃষ্টান্ত হানযালা ফল, যার কোনও ঘ্রাণ নেই আবার স্বাদও তিতা)। الْحَظَلَةُ একপ্রকার ফল। আকারে ছোট ও শক্ত। কাঁচা ফলের রং সবুজ। অনেকটা ছোট তরমুজের মতো গোলাকার। পাকা ফলের রং হলুদ। কোনও ঘ্রাণ নেই। স্বাদ তিতা। এর বৈজ্ঞানিক নাম Citrullus Colocynthis। এর আদি নিবাস ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চল। এর লতা অনেকটা তরমুজ লতার মতো। বাংলায় এটি রাখালশসা, কুন্দ্রি, গবাক্ষী ইত্যাদি নামে পরিচিত।
যে মুনাফিক কুরআন পড়ে না, তাকে এই ফলটির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কারণ এ ফলটির যেমন ভেতর-বাহির উভয়ই মন্দ, না সুবাস আছে আর না ভালো স্বাদ, মুনাফিকেরও সেই অবস্থা। তারও ভেতর-বাহির উভয়ই মন্দ। ভেতরে ঈমান নেই; আছে কুফরের অন্ধকার ও মুনাফিকীর বিস্বাদ। আবার কুরআন পড়ে না বলে বাইরের সৌন্দর্যও তার নেই।
হাদীছটি থেকে শিক্ষণীয়
ক. ঈমানই মুমিন ব্যক্তির আসল ধন।
খ. কুরআন তিলাওয়াত মুমিন ব্যক্তিকে সুবাসিত করে এবং তা দ্বারা সে নিজে উপকৃত হয়, অন্যেও উপকার পায়।
গ. কোনও মুমিনের কুরআনপাঠে অবহেলা করা উচিত নয়। কেননা কুরআন তিলাওয়াত না করলে সে সুবাসবিহীন ফলের মতো হয়ে যাবে। সে নিজেও কুরআন তিলাওয়াতের উপকার থেকে বঞ্চিত থাকবে, অন্যেও তার দ্বারা উপকৃত হতে পারবে না।
ঘ. প্রত্যেকের খুব সতর্ক থাকা উচিত যাতে অন্তরে মুনাফিকী জন্মাতে না পারে। অন্তরে মুনাফিকী থাকলে কুরআন তিলাওয়াতসহ অন্য কোনও নেক আমলই গ্রহণযোগ্য হয় না।
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ الَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ مَثَلُ الْأَتْرُجَّةِ: رِيْحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا طَيِّبٌ (যে মমিন কুরআন পড়ে, তার দৃষ্টান্ত কমলালেবু, যার ঘ্রাণ উত্তম এবং স্বাদ উত্তম)। 'যে মুমিন কুরআন পড়ে'-এর অর্থ কুরআন পড়া যার নিয়মিত আমল, যে ব্যক্তি এ আমলকে নিজ অভ্যাসে পরিণত করেছে। এমন নয় যে, কোনওদিন পড়ল, কোনওদিন পড়ল না।
কুরআন পাঠের তিনটি স্তর
কুরআন পড়ারও আবার বিভিন্ন স্তর আছে। এক তো হলো অর্থ না বুঝে পড়া। এটা সর্বনিম্ন স্তর। এরূপ পড়া নিরর্থক নয়। এতেও ছাওয়াব পাওয়া যায়। প্রতি হরফে এক নেকী, যা দশগুণে বৃদ্ধি করা হয়। কুরআন মাজীদকে মানবরচিত বই-পুস্তকের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না যে, না বুঝে পড়লে কোনও ফায়দা নেই।
দ্বিতীয় স্তর হলো অর্থ বুঝে পড়া। কুরআন মাজীদের অর্থ বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, যেন পাঠক কুরআনের অর্থের মধ্যে চিন্তাভাবনা করে। অর্থ না বুঝলে চিন্তাভাবনা কীভাবে করা যাবে? সাধারণ স্তরের পাঠকও যদি আয়াতের মধ্যে চিন্তাভাবনা করে, তবে সে তা দ্বারা তার মনে বিপুল খোরাক পেতে পারে। কুরআন মাজীদের রয়েছে গভীর প্রভাব। চিন্তাভাবনার সঙ্গে পাঠ করলে মন-মস্তিষ্কে তার দারুণ প্রভাব পড়ে। ফলে জীবন বদলানো সহজ হয়। কুরআন তো জীবন বদলানোর জন্যই। আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত বান্দারূপে জীবন গঠন করাই কুরআনপাঠের আসল উদ্দেশ্য।
কুরআন পাঠের তৃতীয় স্তর হলো কুরআনের ভেতর যে অফুরন্ত জ্ঞান-তত্ত্বের সমাহার রয়েছে, তা থেকে আপন সামর্থ্য অনুযায়ী আহরণ করতে থাকা। সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক যুগের জ্ঞানসাধক মনীষীবর্গের এক বড় অংশ সে আহরণ প্রক্রিয়ায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের সে প্রচেষ্টায় যেমন মানুষের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে, তেমনি মানুষ তাদের পার্থিব জীবন শান্তিময় ও পরকালীন জীবন সাফল্যমণ্ডিত করার রসদও লাভ করেছে।
কুরআন এক হিদায়াতগ্রন্থ। জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে আল্লাহ তা'আলার মর্জি মোতাবেক চলার নির্দেশনা এর ভেতর রয়েছে। আমাদের মহান উলামা, ফুকাহা ও মুহাদ্দিছগণ তাদের অক্লান্ত সাধনা ও গবেষণা দ্বারা কুরআনের সেসব নির্দেশনা সুবিন্যস্ত আকারে সর্বস্তরের মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। ফলে আজ যে-কেউ ইচ্ছা করলেই কুরআনী হিদায়াত অনুযায়ী জীবন গঠনের চেষ্টা চালাতে পারে।
কুরআন পাঠকারী মুমিনের দৃষ্টান্ত
আলোচ্য হাদীছে যে কুরআনপাঠের কথা বলা হয়েছে, এ তিনও স্তরের পাঠই তার অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি নিয়মিত কুরআন পাঠ করে, তাকে তুলনা করা হয়েছে কমলালেবুর সঙ্গে। কমলালেবুর বিশেষ দু'টি বৈশিষ্ট্য আছে। একটি হলো তার সুন্দর ঘ্রাণ, আর দ্বিতীয়টি উত্তম স্বাদ। প্রথমটি বাইরের গুণ আর দ্বিতীয়টি ভেতরের। অর্থাৎ এ ফলটি বাহির ও ভেতর উভয়দিক থেকেই উত্তম। ফলে মানুষ উভয়দিক থেকেই তা উপভোগ করতে পারে। খেয়েও আরাম পায়, ঘ্রাণ নিয়েও আমোদিত হয়। যে মুমিন নিয়মিত কুরআন পড়ে, তার অবস্থাও এরকমই। তারও বাহির ও ভেতর দু'ই উত্তম। তার ভেতরে আছে ঈমানের আস্বাদ, বাইরে কুরআন তিলাওয়াতের মাধুর্য। তার তিলাওয়াতের ধ্বনি শ্রোতাকে আমোদিত করে। শ্রোতা তার দ্বারা উপকৃত হয়। তার তিলাওয়াত যে শোনে, সেও তার মতো ছাওয়াব পায়। পাঠক ও শ্রোতা বা তাদের যে-কেউ যদি অর্থও বোঝে, তবে সে অর্থ তাদের অন্তরে রেখাপাত করে। যে পাঠক কুরআনের আলেমও, তার ইলম ও আমল অনুপাতে মানুষ তার দ্বারা উপকার পেয়ে থাকে। তার মজলিসে বসলে দীনের ইলম ও আমলে উন্নতি লাভ হয়। তার সঙ্গে কথা বললে জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার দ্বারা ঈমান ও আমলের হেফাজত হয়।
উল্লেখ্য, যে ব্যক্তি অর্থ বোঝে না, কিন্তু তা সত্ত্বেও নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে, সেও কুরআনের পাঠক বটে, তবে হাদীছ ও সালাফের পরিভাষায় সাধারণত কারী বা কুরআনের পাঠক বলতে কুরআনের আলেমকে বোঝানো হয়। কাজেই হাদীছের উপমাটি পূর্ণাঙ্গরূপে কুরআনের আলেমের জন্যই প্রযোজ্য, যদিও যারা আলেম নয় কিন্তু তা সত্ত্বেও কুরআন পাঠ করে, তারাও হাদীছটির শাব্দিক ব্যাপকতার কারণে কোনও না কোনও স্তরে এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
লক্ষণীয়, ঈমানকে তুলনা করা হয়েছে ফলের স্বাদের সঙ্গে আর কুরআনপাঠকে তুলনা করা হয়েছে ঘ্রাণের সঙ্গে। এর কারণ হলো ফলের যেমন স্বাদটাই আসল, মুমিন ব্যক্তিরও তেমনি আসল হলো ঈমান। ঈমান থাকলে কুরআন তিলাওয়াতের আমল গ্রহণযোগ্য হয়, অন্যথায় নয়। যেমন ফলের স্বাদ ঠিক থাকলে বাইরের ঘ্রাণের মূল্যায়ন হয় আর স্বাদ ঠিক না থাকলে ঘ্রাণের মূল্য থাকে না।
যে মুমিন কুরআন পড়ে না, তার দৃষ্টান্ত
وَمَثَلُ الْمُؤْمِنِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كَمَثَلِ التَّمْرَةِ: لَا رِيحَ لَهَا وَطَعْمُهَا حُلْو (আর যে মুমিন কুরআন পড়ে না, তার দৃষ্টান্ত খেজুর, যার ঘ্রাণ নেই কিন্তু স্বাদ মিষ্ট)। খেজুর মিষ্ট হওয়ায় তার স্বাদের মূল্যায়ন হয়। কিন্তু ঘ্রাণ না থাকায় কেউ তা শুঁকে আনন্দ পায় না। তদ্রূপ যে মুমিন কুরআন পড়ে না, তার ঈমানের তো মূল্যায়ন হবে এবং যা-কিছু নেক আমল করবে তাও গ্রহণযোগ্য হবে, কিন্তু কুরআন না পড়ার দরুন সে যেন ঘ্রাণবিহীন সুস্বাদু ফল। অর্থাৎ মানুষ যে তিলাওয়াত শুনে আনন্দ ও ছাওয়াব পাবে বা তিলাওয়াতের অর্থ বুঝে উপকৃত হবে, তার বেলায় সেরকমটা হয় না।
কুরআন পাঠকারী মুনাফিকের দৃষ্টান্ত
وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ الَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كَمَثلِ الرَّيَحَانَةِ : رِيحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا مُر (যে মুনাফিক কুরআন পড়ে, তার দৃষ্টান্ত সুগন্ধি ফুল, যার ঘ্রাণ ভালো কিন্তু স্বাদ তিতা)। ফুল তার সুরভি দ্বারা অন্যকে আমোদিত করে, কিন্তু স্বাদ তিতা হওয়ায় কেউ তা খেয়ে মজা পায় না। ফলে কেউ খায়ও না। অর্থাৎ তার বাহির তো ভালো, কিন্তু ভেতর মন্দ। মুনাফিকের অবস্থাও এরকমই। তার বাইরের দিকটি আকর্ষণীয়। কুরআন তিলাওয়াতের মাধুর্য দ্বারা সে অন্যকে আকৃষ্ট করে, মানুষ তা শুনে উপকৃতও হতে পারে, কিন্তু সে নিজে উপকৃত হয় না। তার ভেতর ভালো নয়। সেখানে রয়েছে কুফরের অন্ধকার ও মুনাফিকীর বিস্বাদ। অর্থাৎ তার ঈমান নেই। ঈমান না থাকায় তার তিলাওয়াত এবং তার অন্য কোনও আমলের কোনও মূল্য নেই। তা আল্লাহ তা'আলার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
যে মুনাফিক কুরআন পড়ে না, তার দৃষ্টান্ত
وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كَمَثَلِ الْحَنْظَلَةِ : لَيْسَ لَهَا رِيحٌ وَطَعْمُهَا مُر (আর যে মুনাফিক কুরআন পড়ে না, তার দৃষ্টান্ত হানযালা ফল, যার কোনও ঘ্রাণ নেই আবার স্বাদও তিতা)। الْحَظَلَةُ একপ্রকার ফল। আকারে ছোট ও শক্ত। কাঁচা ফলের রং সবুজ। অনেকটা ছোট তরমুজের মতো গোলাকার। পাকা ফলের রং হলুদ। কোনও ঘ্রাণ নেই। স্বাদ তিতা। এর বৈজ্ঞানিক নাম Citrullus Colocynthis। এর আদি নিবাস ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চল। এর লতা অনেকটা তরমুজ লতার মতো। বাংলায় এটি রাখালশসা, কুন্দ্রি, গবাক্ষী ইত্যাদি নামে পরিচিত।
যে মুনাফিক কুরআন পড়ে না, তাকে এই ফলটির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কারণ এ ফলটির যেমন ভেতর-বাহির উভয়ই মন্দ, না সুবাস আছে আর না ভালো স্বাদ, মুনাফিকেরও সেই অবস্থা। তারও ভেতর-বাহির উভয়ই মন্দ। ভেতরে ঈমান নেই; আছে কুফরের অন্ধকার ও মুনাফিকীর বিস্বাদ। আবার কুরআন পড়ে না বলে বাইরের সৌন্দর্যও তার নেই।
হাদীছটি থেকে শিক্ষণীয়
ক. ঈমানই মুমিন ব্যক্তির আসল ধন।
খ. কুরআন তিলাওয়াত মুমিন ব্যক্তিকে সুবাসিত করে এবং তা দ্বারা সে নিজে উপকৃত হয়, অন্যেও উপকার পায়।
গ. কোনও মুমিনের কুরআনপাঠে অবহেলা করা উচিত নয়। কেননা কুরআন তিলাওয়াত না করলে সে সুবাসবিহীন ফলের মতো হয়ে যাবে। সে নিজেও কুরআন তিলাওয়াতের উপকার থেকে বঞ্চিত থাকবে, অন্যেও তার দ্বারা উপকৃত হতে পারবে না।
ঘ. প্রত্যেকের খুব সতর্ক থাকা উচিত যাতে অন্তরে মুনাফিকী জন্মাতে না পারে। অন্তরে মুনাফিকী থাকলে কুরআন তিলাওয়াতসহ অন্য কোনও নেক আমলই গ্রহণযোগ্য হয় না।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)