মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ ইব্‌ন আব্দুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনচরিত অধ্যায়

হাদীস নং: ২৭০
সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ ইব্‌ন আব্দুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনচরিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদ: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও উম্মু সালামা (রা)-এর বিয়ে
২৭০. উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন একদিন আমার স্বামী আবূ সালামা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর দরবার থেকে এসে আমাকে বলল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মুখে একটি কথা শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি। তিনি বলেছেন যে, কোন মুসলমান বিপদে পড়ে যদি ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন পাঠ করে, তারপর বলে হে আল্লাহ্! আমার এই বিপদে আপনি আমাকে আশ্রয় দিন এবং তদপেক্ষা উত্তম বিনিময় আমাকে দান করুন, তাহলে তাকে তেমন বিনিময় দেয়া হবে। উম্মু সালামা (রা) বলেন, আবু সালামার এই কথা আমি স্মরণে রেখেছিলাম। আমার স্বামী আবু সালামা (রা) এর মৃত্যুবরণের পর আমি ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন পাঠ করেছি এবং দু'আ করে বলেছি, হে আল্লাহ্ আমার বিপদে আপনি আমাকে আশ্রয় দিন এবং এর চাইতে উত্তম বিনিময় আমাকে দান করুন। এরপর আমি আপন মনে বললাম, আবূ সালামার চাইতে উত্তম পুরুষ আমার জন্যে আর কোথায় পাব? আমার ইদ্দত শেষ হবার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। আমি তখন একটি কাঁচা চামড়া দাবাগত বা পরিশোধন করছিলাম। ইত্যবসরে আমি আমার দুহাত ধুয়ে নিলাম এবং তাঁকে ভেতরে আসতে বললাম। খেজুরের আঁশ ভর্তি একটি চামড়ার বালিশ আমি তাঁর বসার জন্যে দিলাম। তিনি তাতে বসলেন। এরপর তিনি আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলেন। তাঁর কথা শেষ হবার পর আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (ﷺ) আপনার প্রতি আমার আগ্রহ না থাকার কথা নয় তবে কথা হল যে, আমি একজন আত্মঅভিমানী ও ক্ষ্যাপা প্রকৃতির মহিলা-আমি আশংকা করছি যে, যদি আমি আপনার সাথে এমন কোন অসৌজন্যমূলক আচরণ করে ফেলি যার দ্বারা মহান আল্লাহ্ আমাকে শাস্তি দিবেন। তাছাড়া আমার তো বেশ বয়স হয়েছে। আর আমার নিজের সন্তান-সন্ততিও রয়েছে। জবাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তুমি যে আত্মঅভিমান ও ক্ষ্যাপা হওয়ার কথা বললে অবিলম্বে মহান আল্লাহ্ তোমার এই অবস্থা দূর করে দিবেন। বেশি বয়স হবার ক্ষেত্রে আমারও তো একই অবস্থা। আর তোমার সন্তান সন্ততি ওরা আমার সন্তান সন্ততি ও পোষ্যরূপে গণ্য হবে। উম্মু সালামা (রা) বলেন, এই প্রেক্ষিতে আমি নিজেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জন্যে সমর্পণ করলাম এবং তিনি আমাকে বিয়ে করলেন। উম্মু সালামা (রা) বলেন বস্তুতঃ মহান আল্লাহ্ আবূ সালামার বিনিময়ে আমাকে তদপেক্ষা উত্তম রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে দান করলেন।
كتاب سيرة أول النبيين وخاتم المرسلين نبينا محمد بن عبد الله صلى الله عليه وسلم
باب ما جاء في زواجه - صلى الله عليه وسلم - بأم سلمة رضي الله عنها
عن أم سلمة (2) رضي الله عنها قالت أتاني أبو سلمة يوما من عند رسول الله - صلى الله عليه وسلم - فقال لقد سمعت من رسول الله قولا فسررت به، قال لا تصيب أحدا من المسلمين مصيبة فيسترجع عند مصيبته ثم يقول اللهم أجرني في مصيبتي وأخلف لي خيرا منها الا فعل ذلك به، قالت أم سلمة فحفظت ذلك منه، فلما توفي أبو سلمة استرجعت وقلت اللهم أجرني في مصيبتي وأخلف لي خيرا منه، ثم رجعت الي نفسي قلت من أين لي خير من أبي سلمة، فلما انقضت عدتي استأذن علي رسول الله - صلى الله عليه وسلم - وأنا أدبغ إهابا لي فغسلت يدي من القرظ وأذنت له فوضعت له وسادة أكم حشوها ليف فقعد عليها فخطبني الي نفسي، فلما فرغ من مقالته قلت يا رسول الله ما بي أن لا تكون بك الرغبة في ولكني امرأة في غير شديدة فأخاف أن تري مني شيئا يعذبني الله به، وأنا أمرأة قد دخلت في السن، وأنا ذات عيال، فقال اما ما ذكرت من الغيرة فسوف يذهبها الله عز وجل منك، وأما ما ذكرت من السن فقد أصابني مثل الذي أصابك، وأما ما ذكرت من عيال فانما عيالك عيالي، قالت فقد سلمت لرسول الله - صلى الله عليه وسلم - فتزوجها رسول الله - صلى الله عليه وسلم - فقالت أم سلمة فقد أبدلني الله بأبي سلمة خيرا منه رسول الله - صلى الله عليه وسلم

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হাদীছটিতে বর্ণিত দু'আ সম্পর্কে ওয়াদা দেওয়া হয়েছে যে, কোনও বিপদ-আপদে পতিত ব্যক্তি এটি পড়লে আল্লাহ তা'আলা তাকে অবশ্যই প্রতিদান দেবেন এবং সে যা হারাল তার বদলে উত্তম স্থলাভিষিক্ত দান করবেন। বলাবাহুল্য এ ওয়াদা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পক্ষ থেকে নয়; বরং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই দিয়েছেন। কাজেই এ ওয়াদার সত্যতায় কোনও সন্দেহ নেই।

হাদীছটির বর্ণনাকারী হযরত উম্মু সালামা রাযি. বলেন, আবূ সালামার ইন্তিকালের পর এ দু'আটি আমার স্মরণ হল। আমি দু'আটি পড়লাম। কিন্তু এর শেষাংশ বলতে আমার মন প্রস্তুত হচ্ছিল না। মনে মনে ভাবছিলাম, আবূ সালামার চেয়ে ভালো আর কে হতে পারে! তিনি এমন ছিলেন, এমন ছিলেন- এই বলে তাঁর গুণাবলি কল্পনা করছিলাম। তারপরও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু এ দু'আটি পড়তে বলেছেন, তাই তাঁর প্রতি উৎসর্গিতপ্রাণ ও তাঁর কথার উপর গভীর আস্থাবতী সাহাবিয়া উম্মু সালামা রাযি. দু’আটি শেষপর্যন্ত পড়লেন। আল্লাহ তা’আলা সে দু’আ কবুল করলেন। আবূ সালামার স্থানে তিনি (স্বামী হিসেবে) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেলেন।

উল্লেখ্য, কারও জীবনে এ জাতীয় ওয়াদার সুফল পাওয়ার বিষয়টি তার ঈমান ও বিশ্বাসের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখে। একটি হাদীছে কুদসীতে ইরশাদ হয়েছে-
أَنَا عِنْدَ ظَنّ عَبْدِي بِي
'আমি আমার সম্পর্কে আমার বান্দার ধারণার কাছে থাকি (অর্থাৎ আমার সম্পর্কে আমার বান্দা যেমন ধারণা করে, আমি তার প্রতি সেরকম আচরণই করে থাকি)’।
(সহীহ বুখারী: ৭৫০৫; সহীহ মুসলিম: ২৬৭৫; জামে' তিরমিযী: ২৩৮৮; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৭৬৮৩; সুনানে ইবন মাজাহ ৩৮২৩; মুসনাদে আহমাদ: ৮১৬৩; সুনানে দারিমী: ২৭৭৩; মুনাদুল বাযযার: ৮৯০৮; সহীহ ইবনে হিব্বান: ৬৩৩; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ৯৭৪)

সুতরাং এ দু'আটি পড়ার সময় মনোযোগ যত গভীর ও বিশ্বাস যত দৃঢ় থাকবে, সুফল পাওয়ার সম্ভাবনাও ততো বেশি থাকবে।

হাদীছটিতে যে-কোনও মসিবতের বেলায়ই এ দু'আটি পড়তে বলা হয়েছে। সে মসিবত শারীরিক হোক, আর্থিক হোক কিংবা হোক মান-সম্মান সম্পর্কিত। এরূপ যে-কোনও বিপদে এ দু'আটি পড়া উচিত। এমনিভাবে সে মসিবত যদি হয় কারও প্রাণবিয়োগ, যেমন পিতা-মাতা, সন্তান, স্বামী, স্ত্রী, ভাইবোন বা যে-কোনও প্রিয়জনের মৃত্যু, তবে মুমিন ব্যক্তিকে গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে অবশ্যই এ দু'আটি পড়তে হবে। হযরত উম্মু সালামা রাযি. এ দু'আটি পড়ে দুনিয়াতেই তার সুফল পেয়েছিলেন। আমরাও যদি তাঁর মতো করে বিপদ-আপদে এ দু'আটি পড়ি, তবে অবশ্যই আমরাও এর সুফল পাব।

এ দু'আটি পড়ার দাবি বিপদে নিজেকে স্থির রাখা ও ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া। কেউ মুখে দু'আটি পড়ল কিন্তু মনে সবর নেই, আচার-আচরণে স্থিরতা নেই এবং নেই আল্লাহর ফয়সালায় আত্মসমর্পণ ও আদব-কায়দার লেহাজ, তবে সে দু'আপাঠ অসার কথামাত্র হয়ে যায়। এরূপ ব্যক্তি দু'আর কী সুফল পেতে পারে? মনে রাখতে হবে, কুরআন-সুন্নাহর দু'আ গভীর অর্থ ও ভাব বহন করে। তার সম্পর্ক বিশ্বাস ও কর্মের সঙ্গে। দু'আর সঙ্গে জীবনপগঠনেরও সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃত অর্থে ইসলামী দু’আসমূহ জীবনগঠনেরই মূলমন্ত্র। তাই দু'আপাঠ দ্বারা জীবনগঠনে অনুপ্রাণিত হওয়া ও আচার-আচরণ পরিশীলিত করে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রাখা অতীব জরুরি। সুন্দর সুফল পাওয়ার বিষয়টা এরই মধ্যে নিহিত। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. যে-কোনও মসিবত প্রকৃত অর্থে বান্দার জন্য আল্লাহ তা'আলার নি'আমত, যেহেতু তা দ্বারা আল্লাহ অভিমুখী হওয়া ও দু'আয় রত হওয়ার সুযোগ মেলে এবং লাভ হয় অশেষ নেকী।

খ. প্রিয়জনকে হারানো ছাড়াও যে-কোনও মসিবতে হাদীছে বর্ণিত দু'আটি পড়তে হবে।

গ. যে-কোনও দু'আ পড়ার সময় সে দু'আ সম্পর্কে হাদীছে যে ওয়াদা আছে তার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা অতীব জরুরি। সে বিশ্বাসের বদৌলতেই হযরত উম্মু সালামা রাযি. দু'আটির সুফল লাভ করেছিলেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান