মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)
সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনচরিত অধ্যায়
হাদীস নং: ৮০
সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনচরিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদ: রাসূলের (ﷺ) কতিপয় সাহাবী (রা) কর্তৃক ফিতনা হতে নিজ দ্বীন রক্ষার্থে হাবশায় হিজরত
(৮০) আবূ বকর ইব্ন আবদুর রহমান ইব্নল হারিছ ইবন্ হিশাম আল-মাখখুমী রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) সহধর্মিনী উম্মুল মু'মিনীন উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমরা হাবশায় (আবিসিনিয়া) উপনীত হওয়ার পর একজন উত্তম প্রতিবেশী পেলাম। তিনি স্বয়ং নাজ্জাশী। আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করলাম। নির্বিঘ্নে আল্লাহর ইবাদত করতে লাগলাম। আমাদের কোন প্রকার কষ্টের সম্মুখীন হতে হচ্ছিল না এবং কোন অপ্রীতিকর কথাও আমাদের শুনতে হচ্ছিল না। কুরাইশরা যখন তা (আমাদের সুঅবস্থার কথা) জানতে পারলো, তখন তারা ষড়যন্ত্র করে সিদ্ধান্ত নিল যে, নাজ্জাশীর কাছে আমাদের ব্যাপারে দু'জন শক্তিশালী ও দক্ষ দূত পাঠাবে এবং নাজ্জাশীর কাছে মক্কার দুর্লভ ও উৎকৃষ্ট সামগ্রী উপঢৌকন পাঠাবে। নাজ্জাশীর কাছে মক্কা থেকে যেসব সামগ্রী আসতো, তন্মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট বিবেচিত হতো সেখানকার চামড়া (বা চামড়াজাত সামগ্রী)। তাই তারা নাজ্জাশীর জন্য প্রচুর চামড়া (সামগ্রী) সংগ্রহ করলো। (তাছাড়া) নাজ্জাশীর রাজকর্মচারী ও দরবারীদের কাউকেই তারা উপহার দিতে বাদ রাখেনি। অতঃপর তারা এসব উপহার সামগ্রীসহ আবদুল্লাহ ইব্ন আবী রবী'আ ইবনল মুগীরা আল-মাখযূমী ও আমর ইব্নল আস ইবন্ ওয়ায়িল আস্-সাহমীকে নাজ্জাশীর কাছে প্রেরণ করলো এবং তাদের করণীয় কাজ তাদেরকে বুঝিয়ে দিল। তারা দূতদ্বয়কে বলে দিল, মুহাজিরদের সম্পর্কে নাজ্জাশীর সাথে কথা বলার পূর্বে তোমরা প্রত্যেক দরবারী বা রাজকর্মচারীকে তাদের উপহার প্রদান করবে। এরপর নাজ্জাশীকে প্রদেয় উপহারসামগ্রী পেশ করবে এবং তাঁকে অনুরোধ জানাবে, তিনি যেন মুহাজিরদের সাথে কোন কথাবার্তা না বলেই তাদেরকে তোমাদের হাতে সোপর্দ করেন। রাবী (উম্মু সালামা) বলেন, অতঃপর আমরা রওয়ানা হলাম এবং নাজ্জাশীর কাছে উপনীত হলাম। তখন আমরা উত্তম প্রতিবেশীর কাছে উত্তম স্থানে বসবাস করছিলাম। (এদিকে) দূতদ্বয় নাজ্জাশীর সাথে কথা বলার আগেই প্রতিটি দরবারী ও রাজকর্মচারীকে আনীত উপহার সামগ্রী প্রদান করে।
তারা (দূতদ্বয়) দরবারীদের প্রত্যেককে বললো, আমাদের দেশ থেকে কিছুসংখ্যক বেকুব যুবক বাদশাহর রাজ্যে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তারা নিজ জাতির ধর্ম পরিত্যাগ করেছে অথচ আপনাদের ধর্মও কবুল করেনি। তারা এক অভিনব ধর্ম তৈয়ার করেছে, যা আপনাদের কিংবা আমাদের কারোর কাছেই পরিচিত নয়। তাদের জাতির সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত লোকেরা আমাদেরকে বাদশাহর কাছে পাঠিয়েছেন যেন তিনি ওদেরকে ওদের স্বজাতির কাছে পেরত পাঠান। সুতরাং আমরা যখন ওদের ব্যাপারে বাদশাহর সাথে কথা বলবো, তখন আপনারা তাঁকে পরামর্শ দিবেন যেন তিনি ওদেরকে আমাদের কাছে সমর্পণ করেন; আর সমর্পণ করার পূর্বে তাদের সাথে যেন কোন কথা না বলেন। কারণ, ওদের বিষয়ে ওদের সম্প্রদায়ই অধিক অবগত এবং তাদের দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে তাদের জাতিই সবচেয়ে ভাল জানে। দরবারীরা এতে সবাই সম্মতি জ্ঞাপন করলো। অতঃপর তারা নাজ্জাশীর সম্মুখে তাদের আনীত উপহারসমুহ পেশ করলো। তিনি তা গ্রহণ করলেন। এরপর দূতদ্বয় বাদশাহর সাথে কথা বলতে শুরু করলো। তারা বললো, 'হে বাদশাহ, আমাদের দেশ থেকে কতিপয় নির্বোধ যুবক আপনার দেশে আশ্রয় নিয়েছে। তারা তাদের স্বজাতির ধর্ম পরিত্যাগ করেছে এবং আপনার ধর্মও গ্রহণ করেনি। তারা একটা উদ্ভট ধর্ম উদ্ভাবন করে নিয়েছে যা আপনার ও আমাদের কাছে অজ্ঞাত। তাদের ব্যাপারে তাদের কওমের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিরা আমাদেরকে আপনার কাছে প্রেরণ করেছেন। যারা আমাদেরকে প্রেরণ করেছেন, তাদের মধ্যে এমনকি এদের পিতা-পিতামহ, পিতৃব্য ও আত্মীয়-স্বজনও রয়েছেন, যেন আপনি এদেরকে তাদের (আত্মীয়-স্বজনদের) কাছে ফেরত পাঠান। এদের খবরাখবর, দোষ-ত্রুটি ইত্যাদি বিষয়ে তারাই (আত্মীয়-স্বজনরা) সবচেয়ে বেশী অবগত। রাবী উম্মু সালামা বলেন, নাজ্জাশী তাঁদের (মুসলিম মুহাজিরদের) কথা শুনুক এটা ছিল আবদুল্লাহ ইব্ন আবূ রবী'আ ও আমর ইব্নল 'আস-এর কাছে সবচেয়ে অবাঞ্ছিত ব্যাপার। বাদশাহর দরবারীরা বললো, জাঁহাপনা এরা সত্যই বলেছে। মুহাজিরদের জাতিই তাদের দোষত্রুটি ভাল জানে। সুতরাং আপনি ওদেরকে এই দুইজনের হাতে সমর্পণ করে দিন। এরা দু'জন ওদেরকে স্বদেশ ও স্বজাতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাক।
(এদের বক্তব্য শুনে) নাজ্জাশী ভীষণ রেগে গেলেন। পরে বললেন, আল্লাহর শপথ, আল্লাহর কসম, এ অবস্থায় ওদেরকে দূতদ্বয়ের হাতে সমর্পণ করবো না। একদল (নিরীহ) লোক আমার সান্নিধ্যে বাস করছে, তারা আমার দেশে (অতিথি) হয়ে এসেছে। তারা অন্যত্র না গিয়ে আমার কাছে আমাকে বেছে নিয়েছে। (সুতরাং) আমি তাদেরকে ডাকবো এবং এই আগন্তুকদ্বয় তাদের সম্পর্কে যা বলেছে, সে সম্পর্কে তাদের বক্তব্যও শুনবো। যদি দেখি, এরা দু'জন যেরূপ বলেছে, আশ্রিতরা সত্যিই তদ্রূপ, তাহলে তাদেরকে এদের হাতে সমর্পণ করবো এবং তাদের স্বজাতির কাছে ফেরত পাঠাবো। অন্যথায় আমি তাদেরকে ফেরত পাঠাবো না। (বরং যত দিন ইচ্ছা) আমার সুসান্নিধ্যে তারা থাকবে, যেমনটি তারা (এতদিন) থেকে আসছে। উম্মু সালামা বলেন, অতঃপর নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) সাহাবীগণকে ডেকে পাঠালেন। নাজ্জাশীর বার্তাবাহক যখন তাঁদেরকে ডাকতে গেল তখন তাঁরা পরামর্শ করার জন্য সমবেত হলেন। একে অপরকে জিজ্ঞেস করলেন বাদশাহর দরবারে গিয়ে তোমরা কী বলবে? (পরিশেষে) সবাই (ঐক্যমত হয়ে) বললেন, আল্লাহর শপথ, আমাদের নবী (ﷺ) যা আমাদেরকে শিখিয়েছেন এবং যেরূপ নির্দেশ করেছেন, আমরা তাই বলবো, পরিণতি যা হয় হবে।…
(আশ্রিত মুহাজিরগণ) দরবারে এলেন। নাজ্জাশী ইতোমধ্যেই তাঁর ধর্মযাজকদের ডেকে হাজির করে রেখেছেন। তারা তার চারপাশে তাদের কিতাবাদি (ইঞ্জিল) খুলে বসেছেন। বাদশাহ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদেও সেই ধর্মটা কী যা গ্রহণ করে তোমরা নিজ জাতিকে ছেড়ে এসেছ, অথচ তোমরা আমার ধর্মে কিংবা এই উম্মতসমূহের কারো কোন ধর্মে প্রবেশ করোনি? উম্মু সালামা (রা) বলেন, যিনি আমাদের পক্ষ থেকে বাদশাহর সাথে কথা বলছিলেন তিনি ছিলেন জাফর ইব্ন আবূ তালিব (রা), তিনি বললেন, হে সদাশয় সম্রাট, আমরা ছিলাম অজ্ঞ-মূর্খ জাতি। আমরা মূর্তি পূজা করতাম, মৃত জন্তুর মাংস ভক্ষণ করতাম এবং অশ্লীল ও খারাপ কাজে লিপ্ত থাকতাম, আমার নিকটাত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীকে অবজ্ঞা করতাম এবং আমাদের মধ্যে যে সবল সে দুর্বলের অধিকার হরণ করতো। আমরা এই অবস্থার মধ্যে দিনাতিপাত করছিলাম। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের কাছে আমাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল করে পাঠালেন। আমরা তাঁর বংশমর্যাদা, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও চারিত্রিক স্বচ্ছতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। তিনি আমাদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার ও তাঁর একত্বে বিশ্বাস করার আহ্বান জানান। আমরা এবং আমাদের পিতৃপুরুষরা আল্লাহ্ ভিন্ন অন্য যেসব বস্তু তথা পাথর, মূর্তি ইত্যাদির পূজা করতাম, তা তিনি পরিহার করতে বললেন। তিনি সত্যা বলা, আমানত রক্ষা করা, আত্মীয়ের সাথে সদাচরণ করা, প্রতিবেশীর সাথে ভাল ব্যবহার করা এবং নিষিদ্ধ কাজ ও রক্তপাত থেকে বিরত থাকার আদেশ দেন।
তিনি (রাসূল সা) আমাদের অশ্লীল কাজ করতে, মিথ্যা কথা বলতে, ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করতে ও নিরপরাধ সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করতে নিষেধ করেন। আমাদেরকে তিনি একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করতে নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে সালাত, যাকাত ও সিয়ামের নির্দেশ দেন। এমনিভাবে জাফর (রা) একে একে ইসলামের বিধানসমূহ তুলে ধরে বললেন, অতঃপর আমরা তাঁকে সত্য বলে মেনে নিলাম এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনলাম। তিনি যে বিধি-বিধান নিয়ে এসেছেন, তার অনুসরণ আমরা করতে শুরু করলাম। আমরা এক আল্লাহর ইবাদত করতে লাগলাম এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করলাম না। তিনি যেসব বিষয় হারাম ঘোষণা করলেন তা থেকে আমরা বিরত রইলাম, আর যে জিনিস তিনি হালাল ঘোষণা করলেন আমরা তা হালাল বলে মেনে নিলাম। এতে আমাদের জাতি আমাদের শত্রু হয়ে গেল, তারা আমাদের উপর নির্যাতন চালাতে লাগলো এবং আমাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত থেকে মূর্তিপূজার দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। তারা চায় যেন আমরা পুনরায় সেই সব ঘৃণ্য অপকর্মগুলো শুরু করি (হালাল মনে করে)। (এমনিভাবে) তারা যখন আমাদের উপর উৎপীড়ন শুরু করলো, যুলুম নির্যাতন করে আমাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুললো এবং (সর্বোপরি) তারা যখন আমাদের দীন পালনে বাধা হয়ে দাঁড়ালো তখন আমরা আপনার দেশে এসে আশ্রয় নিলাম। অন্যদের চেয়ে আপনাকেই উত্তম মনে করলাম এবং আপনার প্রতিবেশী হয়ে থাকতে আগ্রহী হলাম। এবং হে বাদশাহ, আমরা আশা করি আপনার কাছে আমরা অত্যাচারের শিকার হবো না।
উম্মু সালামা (রা) বলেন, নাজ্জাশী তাঁকে (জাফরকে (রা)) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের নবী আল্লাহর যে বাণী নিয়ে এসেছেন তার কোন অংশ তোমার কাছে আছে কি? জাফর বললেন, হ্যাঁ আছে। নাজ্জাশী বললেন, আমাকে পড়ে শোনাও। জাফর সূরা মারইয়ামের (কাফ. হা. 'আইন সোওয়াদ) শুরুর কতিপয় আয়াত পাঠ করে শোনালেন। (আয়াতগুলো শুনে) নাজ্জাশী কাঁদতে লাগলেন, আল্লাহর শপথ। এমনকি তাঁর দাঁড়ি অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল। (তাঁর সাথে) তাঁর ধর্মযাজকরাও কাঁদতে লাগলেন এবং তাঁদের কিতাবাদি (ইঞ্জিলসমূহ) ভিজিয়ে ফেললেন-পাঠকৃত আয়াতসমূহ শ্রবণ করে। অতঃপর নাজ্জাশী বললেন, আমি নিশ্চিত, আল্লাহর শপথ, এই বাণী এবং মূসা (আ)-এর কাছে যে বাণী আসতো তা একই উৎস থেকে আগত। হে কুরাইশ দূতদ্বয়, তোমরা বিদায় হও। আল্লাহর শপথ, আমি কিছুতেই তাঁদেরকে তোমাদের হাতে সমর্পণ করবো না।
উম্মু সালামা (রা) বলেন, আমরা যখন দরবার থেকে বের হয়ে আসলাম তখন আমর ইব্নল আস বললো, আল্লাহর কসম, আগামীকাল আমি তাদের দোষ-ত্রুটিসমূহ তুলে ধরবো এবং এদেরকে সমূলে উৎখাত করে ছাড়বো। আবদুল্লাহ ইব্ন আবী রবী'আ আমাদের ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত সংযত ছিল। সে (তার সঙ্গীকে) বললো, এরূপ করো না, যদিও তারা আমাদের বিরোধী, তথাপি তাদের মধ্যে রক্তের সম্পর্কের অনেক আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। আমর ইব্নল আস বললো, আল্লাহর শপথ, আমি অবশ্যই নাজ্জাশীকে বলবো যে, এরা ঈসা ইবন্ মারইয়মকে স্রেফ একজন বান্দা (আল্লাহ্) বলে বিশ্বাস করে। উম্মু সালামা (রা) বলেন, পরদিন সে (বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে) বলে, হে বাদশাহ, এরা ঈসা ইবন মারইয়ম সম্পর্কে খুব মারাত্মক কথা বলে থাকে। আপনি ওদের ডাকুন এবং ঈসা (আ) সম্পর্কে তাদের মতামত জিজ্ঞেস করে দেখুন। ঈসা (আ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য বাদশাহ পুনরায় মুহাজিরদের দরবারে ডেকে পাঠালেন। উম্মু সালমা (রা) বলেন, এবার আমরা আগের দিনের চেয়েও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হলাম। আবার (পরামর্শের জন্য) সবাই সমবেত হলেন। সবার এক প্রশ্ন, বাদশাহ ঈসা (আ) সম্পর্কে জানতে চাইলে তোমরা কী বলবে? অবশেষে সবাই স্থির করলেন, আল্লাহ্ শপথ তাঁর সম্পর্কে আল্লাহ্ যা বলেছেন এবং আমাদের নবী (ﷺ) যে লিখন নিয়ে এসেছেন, আমরা তাই বলবো, তাতে পরিণতি যা হবার তাই হবে। মুহাজিরগণ দরবারে হাজির হলে বাদশাহ জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা ঈসা ইবন মারইয়াম (আ) সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ কর? জাফর (রা) বললেন, আমাদের নবী (ﷺ) তাঁর সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছেন, আমরা তা-ই বলে থাকি (বিশ্বাস করি)। তিনি (ঈসা আ) আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসূল, তাঁরই ফুঁকে দেওয়া আত্মা এবং তাঁরই বাণী যা তিনি কুমারী মাতা ও পুরুষদের স্পর্শমুক্ত রমনী মারইয়ামের উপর নিক্ষেপ করেছিলেন। উম্মু সালামা (রা) বলেন, একথা শোনামাত্র নাজ্জাশী প্রবল উচ্ছ্বাস বশে মাটিতে হাত চাপড়িয়ে একখানা ক্ষুদ্র কাঠি হাতে নিলেন এবং বললেন, নিশ্চয় তুমি যা বলেছ তার সাথে ঈসা ইবন মারইয়মের এই কাঠির পরিমাণ পার্থক্যও নেই।
বাদশাহর এই কথা বলার সময় তাঁর পার্শ্বস্থ দরবারীরা (নাখোশ হয়ে) রুষ্টতা প্রকাশ করলো। বাদশাহ (তা লক্ষ্য করলেন এবং) বললেন, তোমরা রুষ্টতা প্রকাশ করলেও (আমার মত অপরিবর্তিত থাকবে)। তোমরা (হে মুহাজিরগণ) আমার ভূখণ্ডে মুক্ত-স্বাধীন। তোমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ (এবং নিশ্চিন্তে বসবাস কর)। যে তোমাদের গালাগাল করবে, তাকে জরিমানা করা হবে। এরপরও যদি কেউ তোমাদের গালমন্দ করে, তাকে আরো জরিমানা করা হবে। তোমাদের একজনকেও কষ্ট দিয়ে আমি যদি পাহাড়সম স্বর্ণ লাভ করি, তথাপি আমি তা পছন্দ করি না। (রাবী বলেন, বাদশাহ তাঁর এই ফরমানে 'দাইর' শব্দটি ব্যবহার করেছেন, হাবশী ভাষায় 'জাবাল' বা পাহাড়ের প্রতিশব্দ এটি।)। হে রাজকর্মচারীগণ, তোমরা এই দূতদ্বয়ের দেওয়া উপহারসামগ্রী ফিরিয়ে দাও। এগুলোতে আমার কোন প্রয়োজন নেই। আল্লাহর শপথ, তিনি যখন আমাকে এই রাজত্ব দান করেছেন, তখন এর বিনিময়ে আল্লাহ্ আমার কাছ থেকে কোন ঘুষ নেননি, তো আমি ঘুষ নেব কেন? আমার সিদ্ধান্তে কেউ ঐকমত্য পোষণ করেনি, তো আমি কেন তাদের মতামতের গুরুত্ব দেব?
উম্মু সালামা (রা) বলেন, এরপর তারা (দূতদ্বয়) চরম লাঞ্ছনার গ্লানি নিয়ে ফিরে গেল। তাদের আনীত উপহারসামগ্রীও ফেরত দেওয়া হলো। আমরা তাঁর কাছে অত্যন্ত নিরুদ্বেগ পরিবেশে ও পরম সুজন প্রতিবেশীর সাহচর্যে বসবাস করতে থাকলাম।
উম্মু সালামা (রা) বলেন, আল্লাহর শপথ (আমরা শান্তিতে বসবাস করছিলাম), এমন সময় এক ব্যক্তি নাজ্জাশীর সাথে তাঁর রাজত্বের অধিকার নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলো। সেই সময় আল্লাহর শপথ, আমরা যে চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে পতিত হয়েছিলাম, সেইরূপ দুশ্চিন্তার মধ্যে ইতিপূর্বে আমরা কখনও পতিত হইনি। আমাদের শঙ্কার কারণ ছিল, ঐ ব্যক্তি যদি নাজ্জাশীর বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়ে যায়, তাহলে সে হয়তো নাজ্জাশীর ন্যায় আমাদের অধিকার প্রদান করবে না। উম্মু সালামা (রা) বলেন, নাজ্জাশী (তাঁর সেই প্রতিদ্বন্দ্বির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে) চলে গেলেন। দুই প্রতিপক্ষের মাঝখানে পড়লো নীল নদ। রাসূলুল্লাহর (ﷺ) সাহাবীগণ বললেন, এমন কেউ কি এখানে আছেন, যিনি সেই যুদ্ধের সময় রণাঙ্গনে উপস্থিত হবেন এবং ফলাফল কি হয়, তা দেখে এসে আমাদের জানাবেন?
উম্মু সালামা (রা) বলেন, যুবাইর ইবনল আওয়াম বললেন, আমি আছি। বয়সে তিনি ছিলেন সবার মধ্যে কনিষ্ঠতম। সবাই মিলে একটি চামড়ার মশকে হাওয়া ভরে তা যুবাইরের বুকের উপর স্থাপন করা হলো। তিনি মশকের উপর ভর দিয়ে সাঁতরে নীল নদ পাড়ি দিয়ে কিনারায় উঠলেন এবং পরে পায়ে হেঁটে রণাঙ্গণে গিয়ে তাদের সাথে মিলিত হলেন। উম্মু সালামা (রা) বলেন, এই সময় আল্লাহর দরবারে আমরা দোয়া করতে থাকি যেন নাজ্জাশী তাঁর শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ী হন এবং দেশের উপর তাঁর কর্তৃত্ব বহাল থাকে। (যাহোক শেষ পর্যন্ত) হাবশার জনগণ নাজ্জাশীর কর্তৃত্ব মেনে নেয় এবং তাঁর রাজত্বে স্থিতি ফিরে আসে। আমরা সেখানে সর্বোত্তম স্থানে অবস্থান করছিলাম। অবশেষে আমরা রাসূলুল্লাহর (ﷺ) নিকট ফিরে যাই। তিনি তখনও মক্কায় অবস্থান করছিলেন।
(ইবন হিশাম, হাইছামী ও আহমদ)
তারা (দূতদ্বয়) দরবারীদের প্রত্যেককে বললো, আমাদের দেশ থেকে কিছুসংখ্যক বেকুব যুবক বাদশাহর রাজ্যে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তারা নিজ জাতির ধর্ম পরিত্যাগ করেছে অথচ আপনাদের ধর্মও কবুল করেনি। তারা এক অভিনব ধর্ম তৈয়ার করেছে, যা আপনাদের কিংবা আমাদের কারোর কাছেই পরিচিত নয়। তাদের জাতির সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত লোকেরা আমাদেরকে বাদশাহর কাছে পাঠিয়েছেন যেন তিনি ওদেরকে ওদের স্বজাতির কাছে পেরত পাঠান। সুতরাং আমরা যখন ওদের ব্যাপারে বাদশাহর সাথে কথা বলবো, তখন আপনারা তাঁকে পরামর্শ দিবেন যেন তিনি ওদেরকে আমাদের কাছে সমর্পণ করেন; আর সমর্পণ করার পূর্বে তাদের সাথে যেন কোন কথা না বলেন। কারণ, ওদের বিষয়ে ওদের সম্প্রদায়ই অধিক অবগত এবং তাদের দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে তাদের জাতিই সবচেয়ে ভাল জানে। দরবারীরা এতে সবাই সম্মতি জ্ঞাপন করলো। অতঃপর তারা নাজ্জাশীর সম্মুখে তাদের আনীত উপহারসমুহ পেশ করলো। তিনি তা গ্রহণ করলেন। এরপর দূতদ্বয় বাদশাহর সাথে কথা বলতে শুরু করলো। তারা বললো, 'হে বাদশাহ, আমাদের দেশ থেকে কতিপয় নির্বোধ যুবক আপনার দেশে আশ্রয় নিয়েছে। তারা তাদের স্বজাতির ধর্ম পরিত্যাগ করেছে এবং আপনার ধর্মও গ্রহণ করেনি। তারা একটা উদ্ভট ধর্ম উদ্ভাবন করে নিয়েছে যা আপনার ও আমাদের কাছে অজ্ঞাত। তাদের ব্যাপারে তাদের কওমের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিরা আমাদেরকে আপনার কাছে প্রেরণ করেছেন। যারা আমাদেরকে প্রেরণ করেছেন, তাদের মধ্যে এমনকি এদের পিতা-পিতামহ, পিতৃব্য ও আত্মীয়-স্বজনও রয়েছেন, যেন আপনি এদেরকে তাদের (আত্মীয়-স্বজনদের) কাছে ফেরত পাঠান। এদের খবরাখবর, দোষ-ত্রুটি ইত্যাদি বিষয়ে তারাই (আত্মীয়-স্বজনরা) সবচেয়ে বেশী অবগত। রাবী উম্মু সালামা বলেন, নাজ্জাশী তাঁদের (মুসলিম মুহাজিরদের) কথা শুনুক এটা ছিল আবদুল্লাহ ইব্ন আবূ রবী'আ ও আমর ইব্নল 'আস-এর কাছে সবচেয়ে অবাঞ্ছিত ব্যাপার। বাদশাহর দরবারীরা বললো, জাঁহাপনা এরা সত্যই বলেছে। মুহাজিরদের জাতিই তাদের দোষত্রুটি ভাল জানে। সুতরাং আপনি ওদেরকে এই দুইজনের হাতে সমর্পণ করে দিন। এরা দু'জন ওদেরকে স্বদেশ ও স্বজাতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাক।
(এদের বক্তব্য শুনে) নাজ্জাশী ভীষণ রেগে গেলেন। পরে বললেন, আল্লাহর শপথ, আল্লাহর কসম, এ অবস্থায় ওদেরকে দূতদ্বয়ের হাতে সমর্পণ করবো না। একদল (নিরীহ) লোক আমার সান্নিধ্যে বাস করছে, তারা আমার দেশে (অতিথি) হয়ে এসেছে। তারা অন্যত্র না গিয়ে আমার কাছে আমাকে বেছে নিয়েছে। (সুতরাং) আমি তাদেরকে ডাকবো এবং এই আগন্তুকদ্বয় তাদের সম্পর্কে যা বলেছে, সে সম্পর্কে তাদের বক্তব্যও শুনবো। যদি দেখি, এরা দু'জন যেরূপ বলেছে, আশ্রিতরা সত্যিই তদ্রূপ, তাহলে তাদেরকে এদের হাতে সমর্পণ করবো এবং তাদের স্বজাতির কাছে ফেরত পাঠাবো। অন্যথায় আমি তাদেরকে ফেরত পাঠাবো না। (বরং যত দিন ইচ্ছা) আমার সুসান্নিধ্যে তারা থাকবে, যেমনটি তারা (এতদিন) থেকে আসছে। উম্মু সালামা বলেন, অতঃপর নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) সাহাবীগণকে ডেকে পাঠালেন। নাজ্জাশীর বার্তাবাহক যখন তাঁদেরকে ডাকতে গেল তখন তাঁরা পরামর্শ করার জন্য সমবেত হলেন। একে অপরকে জিজ্ঞেস করলেন বাদশাহর দরবারে গিয়ে তোমরা কী বলবে? (পরিশেষে) সবাই (ঐক্যমত হয়ে) বললেন, আল্লাহর শপথ, আমাদের নবী (ﷺ) যা আমাদেরকে শিখিয়েছেন এবং যেরূপ নির্দেশ করেছেন, আমরা তাই বলবো, পরিণতি যা হয় হবে।…
(আশ্রিত মুহাজিরগণ) দরবারে এলেন। নাজ্জাশী ইতোমধ্যেই তাঁর ধর্মযাজকদের ডেকে হাজির করে রেখেছেন। তারা তার চারপাশে তাদের কিতাবাদি (ইঞ্জিল) খুলে বসেছেন। বাদশাহ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদেও সেই ধর্মটা কী যা গ্রহণ করে তোমরা নিজ জাতিকে ছেড়ে এসেছ, অথচ তোমরা আমার ধর্মে কিংবা এই উম্মতসমূহের কারো কোন ধর্মে প্রবেশ করোনি? উম্মু সালামা (রা) বলেন, যিনি আমাদের পক্ষ থেকে বাদশাহর সাথে কথা বলছিলেন তিনি ছিলেন জাফর ইব্ন আবূ তালিব (রা), তিনি বললেন, হে সদাশয় সম্রাট, আমরা ছিলাম অজ্ঞ-মূর্খ জাতি। আমরা মূর্তি পূজা করতাম, মৃত জন্তুর মাংস ভক্ষণ করতাম এবং অশ্লীল ও খারাপ কাজে লিপ্ত থাকতাম, আমার নিকটাত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীকে অবজ্ঞা করতাম এবং আমাদের মধ্যে যে সবল সে দুর্বলের অধিকার হরণ করতো। আমরা এই অবস্থার মধ্যে দিনাতিপাত করছিলাম। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের কাছে আমাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল করে পাঠালেন। আমরা তাঁর বংশমর্যাদা, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও চারিত্রিক স্বচ্ছতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। তিনি আমাদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার ও তাঁর একত্বে বিশ্বাস করার আহ্বান জানান। আমরা এবং আমাদের পিতৃপুরুষরা আল্লাহ্ ভিন্ন অন্য যেসব বস্তু তথা পাথর, মূর্তি ইত্যাদির পূজা করতাম, তা তিনি পরিহার করতে বললেন। তিনি সত্যা বলা, আমানত রক্ষা করা, আত্মীয়ের সাথে সদাচরণ করা, প্রতিবেশীর সাথে ভাল ব্যবহার করা এবং নিষিদ্ধ কাজ ও রক্তপাত থেকে বিরত থাকার আদেশ দেন।
তিনি (রাসূল সা) আমাদের অশ্লীল কাজ করতে, মিথ্যা কথা বলতে, ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করতে ও নিরপরাধ সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করতে নিষেধ করেন। আমাদেরকে তিনি একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করতে নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে সালাত, যাকাত ও সিয়ামের নির্দেশ দেন। এমনিভাবে জাফর (রা) একে একে ইসলামের বিধানসমূহ তুলে ধরে বললেন, অতঃপর আমরা তাঁকে সত্য বলে মেনে নিলাম এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনলাম। তিনি যে বিধি-বিধান নিয়ে এসেছেন, তার অনুসরণ আমরা করতে শুরু করলাম। আমরা এক আল্লাহর ইবাদত করতে লাগলাম এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করলাম না। তিনি যেসব বিষয় হারাম ঘোষণা করলেন তা থেকে আমরা বিরত রইলাম, আর যে জিনিস তিনি হালাল ঘোষণা করলেন আমরা তা হালাল বলে মেনে নিলাম। এতে আমাদের জাতি আমাদের শত্রু হয়ে গেল, তারা আমাদের উপর নির্যাতন চালাতে লাগলো এবং আমাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত থেকে মূর্তিপূজার দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। তারা চায় যেন আমরা পুনরায় সেই সব ঘৃণ্য অপকর্মগুলো শুরু করি (হালাল মনে করে)। (এমনিভাবে) তারা যখন আমাদের উপর উৎপীড়ন শুরু করলো, যুলুম নির্যাতন করে আমাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুললো এবং (সর্বোপরি) তারা যখন আমাদের দীন পালনে বাধা হয়ে দাঁড়ালো তখন আমরা আপনার দেশে এসে আশ্রয় নিলাম। অন্যদের চেয়ে আপনাকেই উত্তম মনে করলাম এবং আপনার প্রতিবেশী হয়ে থাকতে আগ্রহী হলাম। এবং হে বাদশাহ, আমরা আশা করি আপনার কাছে আমরা অত্যাচারের শিকার হবো না।
উম্মু সালামা (রা) বলেন, নাজ্জাশী তাঁকে (জাফরকে (রা)) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের নবী আল্লাহর যে বাণী নিয়ে এসেছেন তার কোন অংশ তোমার কাছে আছে কি? জাফর বললেন, হ্যাঁ আছে। নাজ্জাশী বললেন, আমাকে পড়ে শোনাও। জাফর সূরা মারইয়ামের (কাফ. হা. 'আইন সোওয়াদ) শুরুর কতিপয় আয়াত পাঠ করে শোনালেন। (আয়াতগুলো শুনে) নাজ্জাশী কাঁদতে লাগলেন, আল্লাহর শপথ। এমনকি তাঁর দাঁড়ি অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল। (তাঁর সাথে) তাঁর ধর্মযাজকরাও কাঁদতে লাগলেন এবং তাঁদের কিতাবাদি (ইঞ্জিলসমূহ) ভিজিয়ে ফেললেন-পাঠকৃত আয়াতসমূহ শ্রবণ করে। অতঃপর নাজ্জাশী বললেন, আমি নিশ্চিত, আল্লাহর শপথ, এই বাণী এবং মূসা (আ)-এর কাছে যে বাণী আসতো তা একই উৎস থেকে আগত। হে কুরাইশ দূতদ্বয়, তোমরা বিদায় হও। আল্লাহর শপথ, আমি কিছুতেই তাঁদেরকে তোমাদের হাতে সমর্পণ করবো না।
উম্মু সালামা (রা) বলেন, আমরা যখন দরবার থেকে বের হয়ে আসলাম তখন আমর ইব্নল আস বললো, আল্লাহর কসম, আগামীকাল আমি তাদের দোষ-ত্রুটিসমূহ তুলে ধরবো এবং এদেরকে সমূলে উৎখাত করে ছাড়বো। আবদুল্লাহ ইব্ন আবী রবী'আ আমাদের ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত সংযত ছিল। সে (তার সঙ্গীকে) বললো, এরূপ করো না, যদিও তারা আমাদের বিরোধী, তথাপি তাদের মধ্যে রক্তের সম্পর্কের অনেক আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। আমর ইব্নল আস বললো, আল্লাহর শপথ, আমি অবশ্যই নাজ্জাশীকে বলবো যে, এরা ঈসা ইবন্ মারইয়মকে স্রেফ একজন বান্দা (আল্লাহ্) বলে বিশ্বাস করে। উম্মু সালামা (রা) বলেন, পরদিন সে (বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে) বলে, হে বাদশাহ, এরা ঈসা ইবন মারইয়ম সম্পর্কে খুব মারাত্মক কথা বলে থাকে। আপনি ওদের ডাকুন এবং ঈসা (আ) সম্পর্কে তাদের মতামত জিজ্ঞেস করে দেখুন। ঈসা (আ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য বাদশাহ পুনরায় মুহাজিরদের দরবারে ডেকে পাঠালেন। উম্মু সালমা (রা) বলেন, এবার আমরা আগের দিনের চেয়েও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হলাম। আবার (পরামর্শের জন্য) সবাই সমবেত হলেন। সবার এক প্রশ্ন, বাদশাহ ঈসা (আ) সম্পর্কে জানতে চাইলে তোমরা কী বলবে? অবশেষে সবাই স্থির করলেন, আল্লাহ্ শপথ তাঁর সম্পর্কে আল্লাহ্ যা বলেছেন এবং আমাদের নবী (ﷺ) যে লিখন নিয়ে এসেছেন, আমরা তাই বলবো, তাতে পরিণতি যা হবার তাই হবে। মুহাজিরগণ দরবারে হাজির হলে বাদশাহ জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা ঈসা ইবন মারইয়াম (আ) সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ কর? জাফর (রা) বললেন, আমাদের নবী (ﷺ) তাঁর সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছেন, আমরা তা-ই বলে থাকি (বিশ্বাস করি)। তিনি (ঈসা আ) আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসূল, তাঁরই ফুঁকে দেওয়া আত্মা এবং তাঁরই বাণী যা তিনি কুমারী মাতা ও পুরুষদের স্পর্শমুক্ত রমনী মারইয়ামের উপর নিক্ষেপ করেছিলেন। উম্মু সালামা (রা) বলেন, একথা শোনামাত্র নাজ্জাশী প্রবল উচ্ছ্বাস বশে মাটিতে হাত চাপড়িয়ে একখানা ক্ষুদ্র কাঠি হাতে নিলেন এবং বললেন, নিশ্চয় তুমি যা বলেছ তার সাথে ঈসা ইবন মারইয়মের এই কাঠির পরিমাণ পার্থক্যও নেই।
বাদশাহর এই কথা বলার সময় তাঁর পার্শ্বস্থ দরবারীরা (নাখোশ হয়ে) রুষ্টতা প্রকাশ করলো। বাদশাহ (তা লক্ষ্য করলেন এবং) বললেন, তোমরা রুষ্টতা প্রকাশ করলেও (আমার মত অপরিবর্তিত থাকবে)। তোমরা (হে মুহাজিরগণ) আমার ভূখণ্ডে মুক্ত-স্বাধীন। তোমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ (এবং নিশ্চিন্তে বসবাস কর)। যে তোমাদের গালাগাল করবে, তাকে জরিমানা করা হবে। এরপরও যদি কেউ তোমাদের গালমন্দ করে, তাকে আরো জরিমানা করা হবে। তোমাদের একজনকেও কষ্ট দিয়ে আমি যদি পাহাড়সম স্বর্ণ লাভ করি, তথাপি আমি তা পছন্দ করি না। (রাবী বলেন, বাদশাহ তাঁর এই ফরমানে 'দাইর' শব্দটি ব্যবহার করেছেন, হাবশী ভাষায় 'জাবাল' বা পাহাড়ের প্রতিশব্দ এটি।)। হে রাজকর্মচারীগণ, তোমরা এই দূতদ্বয়ের দেওয়া উপহারসামগ্রী ফিরিয়ে দাও। এগুলোতে আমার কোন প্রয়োজন নেই। আল্লাহর শপথ, তিনি যখন আমাকে এই রাজত্ব দান করেছেন, তখন এর বিনিময়ে আল্লাহ্ আমার কাছ থেকে কোন ঘুষ নেননি, তো আমি ঘুষ নেব কেন? আমার সিদ্ধান্তে কেউ ঐকমত্য পোষণ করেনি, তো আমি কেন তাদের মতামতের গুরুত্ব দেব?
উম্মু সালামা (রা) বলেন, এরপর তারা (দূতদ্বয়) চরম লাঞ্ছনার গ্লানি নিয়ে ফিরে গেল। তাদের আনীত উপহারসামগ্রীও ফেরত দেওয়া হলো। আমরা তাঁর কাছে অত্যন্ত নিরুদ্বেগ পরিবেশে ও পরম সুজন প্রতিবেশীর সাহচর্যে বসবাস করতে থাকলাম।
উম্মু সালামা (রা) বলেন, আল্লাহর শপথ (আমরা শান্তিতে বসবাস করছিলাম), এমন সময় এক ব্যক্তি নাজ্জাশীর সাথে তাঁর রাজত্বের অধিকার নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলো। সেই সময় আল্লাহর শপথ, আমরা যে চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে পতিত হয়েছিলাম, সেইরূপ দুশ্চিন্তার মধ্যে ইতিপূর্বে আমরা কখনও পতিত হইনি। আমাদের শঙ্কার কারণ ছিল, ঐ ব্যক্তি যদি নাজ্জাশীর বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়ে যায়, তাহলে সে হয়তো নাজ্জাশীর ন্যায় আমাদের অধিকার প্রদান করবে না। উম্মু সালামা (রা) বলেন, নাজ্জাশী (তাঁর সেই প্রতিদ্বন্দ্বির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে) চলে গেলেন। দুই প্রতিপক্ষের মাঝখানে পড়লো নীল নদ। রাসূলুল্লাহর (ﷺ) সাহাবীগণ বললেন, এমন কেউ কি এখানে আছেন, যিনি সেই যুদ্ধের সময় রণাঙ্গনে উপস্থিত হবেন এবং ফলাফল কি হয়, তা দেখে এসে আমাদের জানাবেন?
উম্মু সালামা (রা) বলেন, যুবাইর ইবনল আওয়াম বললেন, আমি আছি। বয়সে তিনি ছিলেন সবার মধ্যে কনিষ্ঠতম। সবাই মিলে একটি চামড়ার মশকে হাওয়া ভরে তা যুবাইরের বুকের উপর স্থাপন করা হলো। তিনি মশকের উপর ভর দিয়ে সাঁতরে নীল নদ পাড়ি দিয়ে কিনারায় উঠলেন এবং পরে পায়ে হেঁটে রণাঙ্গণে গিয়ে তাদের সাথে মিলিত হলেন। উম্মু সালামা (রা) বলেন, এই সময় আল্লাহর দরবারে আমরা দোয়া করতে থাকি যেন নাজ্জাশী তাঁর শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ী হন এবং দেশের উপর তাঁর কর্তৃত্ব বহাল থাকে। (যাহোক শেষ পর্যন্ত) হাবশার জনগণ নাজ্জাশীর কর্তৃত্ব মেনে নেয় এবং তাঁর রাজত্বে স্থিতি ফিরে আসে। আমরা সেখানে সর্বোত্তম স্থানে অবস্থান করছিলাম। অবশেষে আমরা রাসূলুল্লাহর (ﷺ) নিকট ফিরে যাই। তিনি তখনও মক্কায় অবস্থান করছিলেন।
(ইবন হিশাম, হাইছামী ও আহমদ)
كتاب سيرة أول النبيين وخاتم المرسلين نبينا محمد بن عبد الله صلى الله عليه وسلم
باب ما جاء فى هجرة بعض الصحابة رضي الله عنه الى الحبشة فرارا بدينهم من الفتنة وهى أول هجرة فى الاسلام
عن أبي بكر بن عبد الرحمن) بن الحرث بن هشام المخزومى عن أم سلمة ابنة أبى أمية بن المغيرة زوج النبي صلى الله عليه وسلم قالت لما نزلنا أرض الحبشة جاورنا بها خير جار النجاشى، أمِّنا على ديننا وعبدنا الله لا نؤذى ولا نسمع شيئًا نكرهه؛ فلما بلغ ذلك قريشا ائتمروا أن يبعثوا إلى النجاشى فينا رجلين جلدين وان يهدوا للنجاشى هدايا مما يستطرف من متاع مكة؛ وكان من أعجب ما يأتيه منها اليه الأدم فجمعوا له ادما كثيرا ولم يتركوا من بطارقته بطريقا الا أهدوا له هدية ثم بعثوا بذلك مع عبد الله بن أبى ربيعة بن المغيرة المخزومى وعمرة بن العاص بن وائل السهمى وأمروهما أمرهم وقالوا لهما ادفعوا الى كلك بطريق هديته قبل أن تكلموا النجاشى فيهم، قم قدّموا للنجاشى هداياه ثم سلوه أن يسلمهم اليكم قبل أن يكلمهم، نالت فخرجنا فقد منا على النجاشى، ونحن عنده بخير دار وعند خير جار فلم يبق من بطارقته بطريق الا دفعا اليه هديته قبل أن يكلما النجاشى، ثم قالا لكل بطريق منهم أنه قد صبا الى بلد الملك منا غلمان سفهاء وفارقوا دين قومهم ولم يدخلوا فى دينكم وجاؤا بدين مبتدع لا نعرفه نحن ولا أنتم، وقد بعثنا إلى الملك فيهم أشراف قومهم ليردّهم، اليهم، فاذا كلمان الملك فيهم فتشيروا عليه بأن يسلمهم الينا ولا يكلمهم فان قومهم أعلى بهم عينا واعلم بما عابو عليهم فقالوا لهما نعم، ثم انهما قرّبا هداياهم إلى النجاشى فقبلها منهما، ثم كلماه فقالا له أيها الملك أنه قد صبا إلى بلدك منا غلمان سفهاء فارقوا دين قومهم ولم يدخلوا فى دينك وجاءوا بدين مبتدع لا نعرفه نحن ولا أنت، وقد بعثنا اليك فيهم أشراف قومهم حتى آباؤهم وأعمامهم وعشائرهم لتردهم اليهم فهم أعلى بهم عينا وأعلم بم عابوا عليهم وعاتبوهم فيه، قالت ولم يكن شئ أبغض إلى عبد الله بن أبى ربيعة وعمروا بن العاص من أن يسمع النجاشى كلامهم، فقالت بطارقته حوله صدقوا أيها الملك، قومهم أعلى بهم عينا واعلم بما عابوا عليهم بأسلمهم اليهما فليرداهم إلى بلادهم وقومهم، قال فغضل النجاشى ثم قال لا ها الله ايم الله إذًا لا أسلمهم اليهما ولا أكاد قوما جاورونى ونزلوا بلادى واختارونى على من سواى حتى أدعوهم فأسالهم ما يقول هذان فى أمرهم، فان كانوا كما يقولون اسلمتهم اليهما ورددتهم الى قومهم، وان كانوا على غير ذلك منعتهم منهما وأحسنت جوارهم ما جاورونى، قالت، ثم أرسل إلى اصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم فدعاهم، فلما جاءهم رسوله اجتمعوا: ثم قال بعضهم لبعض ما تقولون للرجل إذا جئتموه؟ قالوا نقول والله ما علمنا وما أمرنا به نبينا صلى الله عليه وسلم كائن فى ذلك ما هو كائن، فلما جاءوه وقد دعا النجاشى اساقفته فنشروا مصاحفهم حوله سألهم فقال ما هذا الدين الذى فارقتم فيه قومكم ولم تدخلوا فى دينى ولا فى دين أحد من هذه الأمم؟ قالت فكان الذى كلمه جعفر بن أبى طالب فقال له أيها الملك كنا قوما أهل جاهلية نعبد الأصنام ونأكل الميتة وتأتى الفواحش ونقطع الأرحام ونسيئ الجوار، يأكل القوى منا الضعيف، فكنا على ذلك حتى بعث الله الينا رسولا منا نعرف نسبه وصدقه وامانته وعفافه، فدعانا إلى الله لنوحده ونعبده ونخلع ما كنا نحن نعبد وأباؤنا من دونه من الحجارة والأوثان، وأمرنا بصدق الحديث وأداء الأمانة وصلة الرحم وحسن الجوار والكف عن المحارم والدماء، ونهانا عن الفواحش وقول الزور وأكل مال اليتيم وقذف المحصنة، وأمرنا أن نعبد الله وحده لا نشرك به شيئًا، وأمرنا بالصلاة والزكاة والصيام قال فعدد عليه أمور الاسلام: فصدقناه وآمنا به واتبعناه على ما جاء به وعبدنا الله وحده فلم نشرك به شيئًا، وحرمنا ما حرِّم علينا وأحللنا ما أحل لنا، فعدا علينا قومنا فعبونا وفتنونا عن ديننا ليردونا الى عبادة الأوثان من عبادة الله، وأن نستحل ما كنا نستحل من الخبائث، فلما قهرونا وظلمونا وشقوا علينا حالوا بيننا وبين ديننا خرجنا إلى بلدك واخترناك على من سواك ورغبنا فى جوارك ورجونا أن لا نظلم عندك أيها الملك، قالت، فقال له النجاشى هل معك مما جاء به عن الله من شئ؟ قالت فقال له جعفر نعم، فقال له النجاشى فاقرأه على، فقرأ عليه صدرًا من كهيعص قالت فبكى والله النجاشى حتى أخضل لحيته وبكت أساقفته حتى اخضلوا مصاحفهم حين سمعوا ما تلاه عليهم ثم قال النجاشى ان هذا والله والذى جاء به موسى ليخرج من مشكاة واحدة، انطلقا فوالله لا اسلمهم اليكم أبدًا ولا أكاد: قالت أم سلمة فلما خرجنا من عنده قال عمرو بن العاص والله لأنبئنهم غدًا عيبهم عندهم ثم أستأصل به خضراءهم قالت فقال له عبد الله بن أبى ربيعة وكان أتقى الرجلين فينا لا تفعل فان لهم ارحاما وان كانوا قد خالفونا، قال والله لأخبرنه أنهم يزعمون أن عيسى بن مريم عبد: قالت ثم غدا عليه الغد فقال أيها الملك إنهم يقولون فى عيسى بن مريم قولا عظيما فأرسل اليهم فاسألهم عما يقولون فيه، قالت فأرسل اليهم يسألهم عنه، قالت ولم ينزل بنا مثله، فاجتمع القوم فقال بعضهم لبعض ماذا تقولون فى عيسى إذا سألكم عنه؟ قالوا نقول والله فيه ما قال الله وما جاء به نبينا صلى الله عليه وسلم كائنا فى ذلك ما هو كائن، فلما دخلوا عليه قال لهم ما تقولون فى عيسى بن مريم؟ فقال له جعفر بن أبى طالب نقول فيه الذى جاء به نبينا صلى الله عليه وسلم هو عبد الله ورسوله وروحه وكلمته القاها إلى مريم العذراء البتول، قالت فضرب النجاشى بيده إلى الأرض فاخذ منها عودًا ثم قال ما عدا عيسى بن مريم ما قلت هذا العود: فتناخرت بطارقته حوله حين قال ما قال، فقال وإن نخرتم والله اذهبوا فأنتم سيوم بارضى والسيوم الآمنون من سبكم غرِّم ثم من سبكم غرم فما أحب أن لى دبرًا ذهبا وأنى آذيت رجلا منكم: والدبر بلسان الحبشة الجبل ردوا عليهما هداياهما فلا حاجة لنا بها، فوالله ما أخذ الله منى الرشوة حين رد على ملكى فآخذ الرشوة فيه، وما أطاع الناس فيَّ فأطيعهم فيه، قالت فخرجا من عنده مقبوحين مردودا عليهما ما جاءآ به وأقمنا عنده بخير دار مع خير جار، قالت فوالله إنا على ذلك إذ نزل به يعنى من ينازعه فى ملكه، قالت ما علمنا حزنا قط كان أشد من حزن حزناه عند ذلك تخوفا أن يظهر ذلك على النجاشى فيأتى رجل لا يعرف من حقنا ما كان النجاشى يعرف منه، قالت وسار النجاشى وبينهما عرّض النيل، قالت فقال أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم من رجل يخرج حتى يحضر وقعة القوم يأتينا بالخبر؟ قالت فقال الزبير بن العوام انا، قالت وكان من أحدث القوم سنا قالت فنفخوا له قربة فجعلها فى صدره ثم سبح عليها حتى خرج إلى ناحية النيل التى بها ملتقى القوم، ثم انطلق حتى حضرهم، قالت ودعونا الله للنجاشى بالظهور على عدوه والتمكين له فى بلاده، واستوسق عليه أمر الحبشة فكنا عنده فى خير منزل حتى قدمنا على رسول الله صلى الله عليه وسلم وهو بمكة