মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

রসনার ক্ষতি সম্পর্কে অধ্যায়

হাদীস নং: ১৪৩
রসনার ক্ষতি সম্পর্কে অধ্যায়
পরিচ্ছেদ: ছয় বাক্য বিশিষ্ট বিষয় সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে
১৪৩. 'উলায়ম (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা ঘরের ছাদে বসা ছিলাম, এ সময় আমাদের সাথে একজন সাহাবী ছিলেন ইয়াযিদ বলেন, আমরা তাকে 'আবাস আল-গিফারী বলে চিনতাম। মানুষ মহামারীর মধ্যে বের হচ্ছিল তখন 'আবাসা বললো, হে মহামারী! আমাকে উঠিয়ে নাও। একথা তিনি তিনবার বললো তখন উলায়ম বললো, কেন এমন কথা বলছ? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কি এ কথা বলেন নি যে, তোমাদের কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কারণ মৃত্যুর পর মানুষের আমল বন্ধ হয়ে যায়। মৃত্যুর পর সন্তুষ্টি বা অনুগ্রহ) লাভের জন্য তাকে আর দুনিয়াতে ফেরত পাঠানো হয় না। এরপর তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ছয়টি কাজ সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে যেন তোমাদের মৃত্যু হয়। তা হলো, মূর্খ লোকেরা আমির নিযুক্ত হবে এবং দারোয়ানের সংখ্যা অধিক হবে, ফলে জুলুম নির্যাতন বৃদ্ধি পাবে। হত্যাকারী থেকে কিসাস বা বিনিময় নেয়া হবে না, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হবে, এমন কিছু তরুণের জন্ম হবে, যারা গানের সুরে কুরআন পাঠ করবে আর তাদের উদ্দেশ্য হবে গান গাওয়া ও আনন্দ পাওয়া। যদিও তাদের মধ্যে কম সংখ্যক লোকই কুরআন বুঝবে।
كتاب آفات اللسان
باب ما جاء في السداسيات
عن عليم قال كنا جلوسا على سطح معنا رجل من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم قال يزيد لا أعلمه الا عبسا الغفاري والناس يخرجون في الطاعون فقال عبس يا طاعون خذني ثلاثا يقولها فقال له عليم لم تقول هذا؟ ألم يقل رسول الله صلى الله عليه وسلم لا يتمنى أحدكم الموت فإنه عند انقطاع عمله (5) ولا يرد فيستعتب (6) فقال اني سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول بادروا بالموت ستا أمرة السفهاء وكثرة الشرط (7) وبيع الحكم واستخفافا بالدم (8) وقطيعة الرحم ونشئا (9) يتخذون القرآن مزامير (10) يقدمونه يغنيهم وان كان (11) أقل منهم فقها

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছে কোনও কষ্টের কারণে মৃত্যু কামনা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কোন রকম কষ্ট তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। কষ্ট দুনিয়াবী হতে পারে এবং পরকালীনও হতে পারে। দুনিয়াবী কষ্ট বিভিন্ন রকমের। অসুখ-বিসুখের কষ্ট, খাদ্যকষ্ট, মানসিক কষ্ট ইত্যাদি। পরকালীন কষ্ট বলতে এমন কোনও ফিতনাকে বোঝায়, যে কারণে নিজের দীন ও ঈমান রক্ষা কঠিন হয়ে যায়। এখানে মূলত দুনিয়াবী কষ্টের কথা বোঝানো হয়েছে। দুনিয়াবী কষ্টের কারণে মৃত্যু কামনা করা জায়েয নয়। কেননা আগের হাদীছসমূহ দ্বারা আমরা জানতে পেরেছি দুনিয়াবী কষ্টের ভেতর কল্যাণ নিহিত থাকে। দুনিয়ার জীবনটাই তো পরীক্ষার জীবন। এখানে মানুষকে যেমন সুখ-সাচ্ছন্দ্য দ্বারা পরীক্ষা করা হয়, তেমনি পরীক্ষা করা হয় কষ্ট-ক্লেশ দ্বারাও। দেখা হয় সুখ-সাচ্ছন্দ্যে সে কেমন শোকর আদায় করে আর কষ্ট-ক্লেশে কতটুকু ধৈর্য ধরে। শোকর দ্বারা যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হয়, তেমনি তা লাভ হয় সবর দ্বারাও। কষ্ট-ক্লেশে সবর করলে গুনাহ মাফ হয় ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এটা তো আখিরাতের অতিবড় লাভ। মৃত্যুকামনা দ্বারা সেই লাভ পরিত্যাগ করা কোনও বুদ্ধির কথা নয়। মু'মিন ব্যক্তি আল্লাহর পথের যাত্রী। প্রতি কদমে সে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে অগ্রসর হয়। প্রতিটি নেককাজ দ্বারা তার নৈকট্য বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর নৈকট্য লাভই তার পরম লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য মৃত্যু দ্বারা ব্যহত হয়। যা পরম লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করে, আল্লাহর পথের পথিক তা কিভাবে চাইতে পারে? কষ্টের কারণে? কোনও কষ্টই স্থায়ী নয়। যেই কষ্টে পড়ে মৃত্যু কামনা করা হয়, আল্লাহ চাহেন তো একদিন তা ঘুচে যাবেই। কুরআন মাজীদে ইরশাদ-

{فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا (5) إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا (6)} [الشرح: 5، 6]

“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তিও থাকে।”
অন্যত্র ইরশাদ-
‘আল্লাহ সংকটের পর স্বাচ্ছন্দ্য সৃষ্টি করে দেবেন।”

{سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرٍ يُسْرًا (7)} [الطلاق: 7]

যখন দুঃখ-কষ্ট কেটে যাবে, সেই সুখের দিনে কত ইবাদত-বন্দেগী করা সম্ভব! দুনিয়া আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। স্বস্তির সংগে বেঁচে থাকলে এখানে আখিরাতের কত ফসল বোনা যায়। সম্ভব হয় কত পুণ্যসঞ্চয় করা। আর মৃত্যুকামনা দ্বারা আখিরাতের সঞ্চয় লাভের সুযোগ উপেক্ষা করা হয়। এটা কোনও প্রশংসনীয় কাজ নয়; বরং একদিক থেকে এটা আখিরাতের কল্যাণলাভের প্রতি অনাগ্রহেরও ইঙ্গিত বহন করে। তাই হাদীছে মৃত্যুকামনা করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাছাড়া এর দ্বারা বিপদ-আপদে অধৈর্য এবং আল্লাহর ফয়সালায় অসন্তুষ্টিরও বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যা সম্পূর্ণ নাজায়েয। অধিকন্তু জীবন একটা নি'আমত। নি'আমত বিলুপ্তির আকাঙ্ক্ষা করা নিন্দনীয়। এক হাদীছে ইরশাদ-

«لا يتمنى أحدكم الموت، ولا يدع به من قبل أن يأتيه، إنه إذا مات أحدكم انقطع عمله، وإنه لا يزيد المؤمن عمره إلا خيرا»

‘তোমাদের কেউ যেন মৃত্যু আসার আগে তার আকাঙ্ক্ষা না করে এবং তার জন্য দু’আ না করে। কেননা মৃত্যু হলে আমল বন্ধ হয়ে যায়। আর মু'মিনের আয়ু তার কেবল কল্যাণই বৃদ্ধি করে।
অপর এক হাদীছে আছে-

لا يتمنى أحدكم الموت إما محسنا فلعله يزداد، و إما مسيئا قلعله يستعيب

‘তোমাদের কেউ মৃত্যু কামনা করবে না। সে যদি সৎকর্মশীল হয়, তবে (বেঁচে থাকলে) আশা করা যায় আরও বেশি সৎকর্ম করতে পারবে। আর যদি অসৎকর্মশীল হয়, তবে তাওবা করবে ও নিজেকে সংশোধন করে ফেলবে।
এসব হাদীছ দ্বারা বোঝা যায়, মু'মিন ব্যক্তির পক্ষে দীর্ঘায়ু সর্বাবস্থায় কল্যাণকর। কেননা আয়ু যত দীর্ঘ হয়, ততই বেশি পুণ্য সংরক্ষিত হয়। সেই হিসেবে দীর্ঘজীবি ব্যক্তি বেশি পুণ্যবান হয়ে থাকে। তাই এক হাদীছে আছে-

خياركم من طال عمرا و خشن عمله

“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, যার আয়ু দীর্ঘ হয় এবং আমল হয় উত্তম।"
হাঁ, মৃত্যুকামনা যদি দীন ও ঈমান হেফাজতের লক্ষ্যে হয় বা আল্লাহর সাক্ষাতলাভের অধীর আগ্রহে এবং তাঁর সান্নিধ্যের আস্বাদ উপভোগের উদ্দেশ্যে হয়, তা জায়েয আছে। সাহাবায়ে কিরামের অনেকে এরকম মৃত্যুকামনা করেছেন। তবে সে ক্ষেত্রেও 'হে আল্লাহ! আমাকে মৃত্যু দাও' বা 'হে আল্লাহ! আমাকে আর বাঁচিয়ে রেখ না এরূপ শব্দে সাধারণভাবে মৃত্যুকামনা ঠিক নয়। বরং হাদীছে যেভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, সেভাবেই শর্তযুক্তভাবে দু'আ করা উচিত। অর্থাৎ বলবে, হে আল্লাহ! বেঁচে থাকা যতদিন আমার পক্ষে কল্যাণকর হয়, ততদিন আমাকে বাঁচিয়ে রাখ আর যখন মৃত্যুই আমার জন্য কল্যাণকর হবে, তখন আমাকে মৃত্যু দিও।
বেঁচে থাকা কল্যাণকর হওয়ার মানে দীন ও ঈমান রক্ষার সংগে বেঁচে থাকা। এরূপ বেঁচে থাকা অবশ্যই কাম্য। আর মৃত্যু কল্যাণকর হওয়ার মানে বেঁচে থাকলে ঈমান ও আমল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা থাকা। এ অবস্থায় ঈমানের সংগে মৃত্যুই কল্যাণকর। যখন দেশে ঈমান-আমল রক্ষার পরিবেশ না থাকে, চারদিকে বদ্দীনী পরিবেশ ছড়িয়ে পড়ে, বহুমুখী ফিতনা বেঈমানীর দিকে ডাকে, ফলে ঈমান-আমল রক্ষা কঠিন হয়ে যায়, স্বাভাবিকভাবেই তখন বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয় হয়ে যায়।
এক হাদীছে আছে-

وإذا كان أمراء كم شراركم و أغنياءكم بخلاءكم و أموركم إلى نسائكم فيظن الأرض خير لكم من ظهرها

'যখন তোমাদের নেতৃবর্গ হয় নিকৃষ্ট লোক, তোমাদের ধনীরা হয় কৃপণ এবং তোমাদের কর্তৃত্ব থাকে নারীদের হাতে, তখন তোমাদের জন্য ভূপৃষ্ঠ অপেক্ষা ভূগর্ভই শ্রেয়।"

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. দুনিয়ায় যত কষ্ট-ক্লেশই হোক না কেন, কিছুতেই মৃত্যু কামনা করা উচিত নয়। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকাই মু'মিনের কর্তব্য।

খ. কষ্ট-ক্লেশ দুর্বিষহ হয়ে উঠলে এ হাদীছে যেভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে সেভাবে দু'আ করবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান