মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

রসনার ক্ষতি সম্পর্কে অধ্যায়

হাদীস নং: ১১৯
রসনার ক্ষতি সম্পর্কে অধ্যায়
পরিচ্ছেদ: তিনটি বিষয় উল্লেখ করে যা বর্ণিত হয়েছে
১১৯. আবূ হুরায়রা (রা) নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, যার মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে, সে মুনাফিক হিসাবে গণ্য হবে, যদিও সে নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং দাবী করে যে, সে একজন মুসলমান। আর তা হলো, যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে এবং আমানতের খিয়ানত করে।
كتاب آفات اللسان
باب ما جاء في الثلاثيات
عن أبي هريرة (1) عن النبي صلى الله عليه وسلم قال ثلاث من كن فيه فهو منافق وان صام وصلى وزعم أنه مسلم أذا حدث كذب واذا وعد أخلف واذا ائتمن خان

হাদীসের ব্যাখ্যা:

অপর এক হাদীছে আছে, মুনাফিকের আলামত চারটি। ইরশাদ হয়েছে-

أربع من كن فيه كان منافقا خالصا، ومن كانت فيه خصلة منهن كانت فيه خصلة من النفاق حتى يدعها : إذا اؤتمن خان، وإذا حدث كذب، وإذا عاهد غدر، وإذا خاصم فجر

চারটি বিষয় যে ব্যক্তির মধ্যে থাকবে সে একজন খাঁটি মুনাফিক সাব্যস্ত হবে। যার মধ্যে তা থেকে একটি থাকবে তার মধ্যে মুনাফিকীরই একটা খাসলত থাকবে, যাবৎ না সে তা ছেড়ে দেয়। তা হচ্ছে- তার কাছে যখন আমানত রাখা হয় খেয়ানত করে, যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা ভঙ্গ করে আর যখন কলহ বিবাদ করে তখন সীমালঙ্ঘন করে। (সহীহ বুখারী, হাদীছ নং ৩৪; সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ৫৮; সুনানে আবূ দাউদ, হাদীছ নং ৪৬৮৮; জামে তিরমিযী, হাদীছ নং ২৬৩২; সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীছ নং ২৫৪)

ইমাম ইব্ন হাজার আসকালানী রহ. বলেন, উভয় হাদীছের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। কেননা এই হাদীছে তিনটি আলামত উল্লেখ করার দ্বারা এ কথা প্রমাণ হয় না যে, অপর হাদীছে বর্ণিত চতুর্থটি আলামত নয়। মূল কথা হচ্ছে সবগুলোই মুনাফিকের আলামত, তবে সময় অনুপাতে একেকবার একেক ধরনের আলামত উল্লেখ করা হয়েছে।

মুনাফিকের প্রথম আলামত

এ হাদীছে বর্ণিত তিনটি আলামতের প্রথমটি হচ্ছে- إذا حدث كذب (যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে)। এর দ্বারা মিথ্যা কথা কত গুরুতর পাপ তা অনুমান করা যায়। কেননা প্রকৃত মুনাফিক হচ্ছে একজন সুবিধাবাদী কাফের। সে অন্তরে তার কুফর ও বেঈমানী গোপন রাখে আর বিভিন্ন স্বার্থ ও সুবিধাভোগের খাতিরে নিজেকে মুসলিম বলে জাহির করে। তার সবচে' বড় মিথ্যাচার হচ্ছে কাফের হয়েও নিজেকে মু'মিন ও মুসলিম বলে প্রকাশ করা। এত বড় বিষয়েও যখন সে মিথ্যা বলতে দ্বিধাবোধ করে না, তখন অন্যান্য ক্ষেত্রে তার মিথ্যা বলাটা তো খুবই স্বাভাবিক।

মোটকথা মিথ্যা বলাটা মুনাফিকের স্বভাব। কাজেই একজন মুসলিম ব্যক্তির কোনওক্রমেই মিথ্যা বলা উচিত নয়। যদি কখনও সে মিথ্যা কথা বলে ফেলে, তবে তার নিজ ঈমানের ব্যাপারে চিন্তা করা উচিত যে, তার ঈমান আসলে কোন্ স্তরে আছে।

একবার হযরত আব্দুল্লাহ ইব্ন জারাদ রাযি. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ! মু'মিন কি ব্যভিচার করতে পারে? তিনি বললেন, হাঁ, কখনও তার দ্বারা এটা ঘটে যেতে পারে। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, মু'মিন কি চুরি করতে পারে? তিনি বললেন, হাঁ, এটাও তার দ্বারা কখনও ঘটে যেতে পারে। তাঁর শেষ প্রশ্ন ছিল-

يا نبي الله ! هل يكذب المؤمن؟ قال: «لا». ثم أتبعها رسول الله ﷺ ، فقال لهذه الكلمة إنما يفتري الكذب الذين لا يؤمنون بآيات الله وأولئك هم الكاذبون

‘ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ! মু'মিন কি মিথ্যা বলতে পারে? তিনি বললেন, না। এই বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়াত পাঠ করলেনঃ-

إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْكَاذِبُونَ

[আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ তো (নবী নয়, বরং) তারাই করে, যারা আল্লাহর আয়াতের ওপর ঈমান রাখে না। প্রকৃতপক্ষে তারাই মিথ্যাবাদী]। (সূরা নাহল (১৬), আয়াত ১০৫) (আল-খারাইতী, মাসাবিউল আখলাক, হাদীছ নং ১২৭)

মুনাফিকের দ্বিতীয় আলামত

মুনাফিকের দ্বিতীয় আলামত হল- إذا وعد أخلف (যখন ওয়াদা করে, তা ভঙ্গ করে)। মু'মিন ব্যক্তি ওয়াদা রক্ষাকারী হয়ে থাকে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছেঃ-

وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا

“এবং যারা কোনও প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূরণে যত্নবান থাকে। (সূরা বাকারা (২), আয়াত ১৭৭)
ওয়াদাভঙ্গ কথা দ্বারাও হতে পারে, কাজ দ্বারাও হতে পারে। উভয়টিই মুনাফিকের আলামত। তবে এটা মুনাফিকের আলামত হবে তখনই, যখন ওয়াদা দেওয়ার সময়ই মনে মনে তা রক্ষা করার নিয়ত না থাকে। পক্ষান্তরে যদি রক্ষা করার নিয়ত থাকে কিন্তু বাস্তবিক কোনও ওযরবশত সে তা রক্ষা করতে না পারে, তবে তা মুনাফিকের আলামতরূপে গণ্য হবে না।

মুনাফিকের তৃতীয় আলামত

মুনাফিকের তৃতীয় আলামত হচ্ছে- إذا اؤتمن خان (যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে তাতে খেয়ানত করে)। আমানত রক্ষা করা মু'মিন ব্যক্তির এক অপরিহার্য গুণ। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনের পরিচয় দিতে গিয়ে যেসকল গুণের উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে এটিও একটি। ইরশাদ হয়েছেঃ-

وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ

“এবং যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। (সূরা মা'আরিজ (৭০), আয়াত ৩২)

যেহেতু আমানত রক্ষা মু'মিনের অপরিহার্য গুণ, তাই আমানতের খেয়ানত করতে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন ইরশাদ হয়েছেঃ-

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ

“হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও রাসূলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করো না এবং জেনেশুনে নিজেদের আমানতের খেয়ানত করো না। (সূরা আনফাল (৮), আয়াত ২৭)
এতে সম্বোধন করা হয়েছে 'মুমিন' বলে। অর্থাৎ খেয়ানত করা মু'মিনের কাজ হতে পারে না। আর আলোচ্য হাদীছ দ্বারা জানা গেল এটা মুনাফিকের আলামত।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের যমানার মুনাফিকদের মধ্যে এ সবগুলো আলামত বিদ্যমান ছিল। কোনও মু'মিন-মুসলিম কখনও মিথ্যা বলত না,আমানতের খেয়ানত করত না এবং ওয়াদাখেলাপিও করত না। এগুলো করত কেবল মুনাফিকরাই। যারা এগুলো করত, বোঝা যেত প্রকৃতপক্ষে তারা মুনাফিক। মুখে যে ঈমান ও ইসলামের কথা বলছে তা কেবলই ধোঁকা।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এগুলোকে মুনাফিকের আলামত সাব্যস্ত করেছেন, তখন সব যুগের মুনাফিকদের মধ্যেই এগুলো অবশ্যই পাওয়া যাবে। তবে যাদের মধ্যেই এসব চরিত্র দেখা যাবে তাদেরকেই যে মুনাফিক ও বেঈমান সাব্যস্ত করা যাবে, বিষয়টি এমন নয়। কেননা কালপরিক্রমায় মুমিন-মুসলিমদেরও অনেক আখলাকী অধঃপতন ঘটেছে। যেসব খাসলাত কেবল মুনাফিক ও বেঈমানদের মধ্যেই পাওয়া যেত, এখন তার অনেক কিছু মুসলিমদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। যেমন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের যমানায় খাঁটি মুমিনগণ সকলেই জামাতে নামায পড়ত। জামাত ছাড়ত কেবল মুনাফিকগণ। কিন্তু এখন কেবল মুনাফিক নয়; মুমিনদেরও অধিকাংশ লোক জামাতে নামায পড়ছে না।

মুনাফিকদের এ আলামতটি এখন মুসলমানদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তাই বলে তারাও যে মুনাফিক, এমন নয়। হাদীছে যে কারও মধ্যে এ সবগুলো পাওয়া গেলে তাকে খালেস মুনাফিক বলা হয়েছে তা সেই যমানার কথা। বর্তমানকালে এটা সাধারণভাবে প্রযোজ্য হবে না, যেহেতু মুসলিমগণদের মধ্যেও ব্যাপকভাবে এসব পাওয়া যাচ্ছে। তবে হাঁ, এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, যাদের মধ্যে এসব দোষ পাওয়া যাবে তারা মুনাফিক না হলেও পূর্ণাঙ্গ মু'মিনও নয়। তারা ত্রুটিযুক্ত ঈমানওয়ালা। তাই তাদের কর্তব্য পূর্ণাঙ্গ মু'মিন হওয়ার জন্য এসব খাসলাত ছেড়ে দেওয়া এবং এর বিপরীত গুণাবলী তথা আমানত রক্ষা করা, সত্য কথা বলা ও ওয়াদা রক্ষা করার গুণ পরিপূর্ণরূপে অর্জন করা।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. এ হাদীছ দ্বারা ইসলামে আখলাক-চরিত্র কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা অনুমান করা যায়।

খ. হাদীছে যে তিনটি বিষয়কে মুনাফিকের আলামত বলা হয়েছে, প্রত্যেক মু'মিনের উচিত সর্বপ্রযত্নে তা থেকে বেঁচে থাকা।

গ. নামায, রোযা ইত্যাদি ফরযগুলো নিঃসন্দেহে অবশ্যপালনীয়। কিন্তু এগুলো আদায় করেই ক্ষান্ত হয়ে যাওয়া উচিত নয়; নিজের ভেতর থেকে অসচ্চরিত্র দূর করে সচ্চরিত্র অর্জনেরও চেষ্টা করা উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান