মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)
কবীরা ও অন্যান্য গুনাহের বর্ণনা অধ্যায়
হাদীস নং: ১৩৯
কবীরা ও অন্যান্য গুনাহের বর্ণনা অধ্যায়
পরিচ্ছেদ: সম্পদশালী হওয়ার লালসা থেকে ভীতি প্রদর্শন
১৩৯. 'উরওয়া ইবন যুবায়র (রা) থেকে বর্ণিত যে, মিসওয়ার ইবন মাখরামা (রা) তাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, 'আমর ইবন 'আওফ বনি 'আমির ইব্ন লুয়াই এর মিত্র ছিলেন এবং তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)- এর সাথে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আবু 'উবায়দা ইবন জাররাহ (রা) কে বাহরায়নে জিযিয়া আদায় করার জন্য পাঠান। তিনি বাহরায়ন বাসীদের সাথে সন্ধিচুক্তি করেছিলেন এবং আলা ইব্ন হাদরামী (রা) কে তাদের শাসক নিযুক্ত করেছিলেন। আবু 'উবায়দা (রা) বাহরায়ন থেকে ধন সম্পদ নিয়ে মদীনায় ফিরে আসলে আনসারগণ তাঁর আগমনের কথা শুনতে পান। তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে ফযরের নামায পড়লেন। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নামাযান্তে ঘুরে বসলে তারা তাঁর সামনে হাযির হলে তিনি তাদেরকে দেখে মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, আমার মনে হয়, তোমরা শুনতে পেয়েছ যে আবূ 'উবায়দা বাহরায়ন থেকে কিছু নিয়ে ফিরে এসেছে। তারা বললো, হাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ), তিনি বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর এবং তা তোমাদেরকে আনন্দিত করবে, এ আশা রাখ, আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের ব্যাপারে দারিদ্র্যের ভয় করি না, তবে আমি তোমাদের ব্যাপারে আশংকা করি যে, তোমাদের পূর্বকালের লোকদের জন্য পৃথিবী যেমনিভাবে প্রশস্ত হয়ে গিয়েছিল, তদ্রূপ তা তোমাদের জন্যও প্রশস্ত হবে। এরপর তোমরাও তাদের মত সম্পদের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়বে। অবশেষে তা তোমাদেরকে তাদের মত আখিরাত থেকে গাফেল করে দেবে।
كتاب الكبائر وأنواع اخرى من المعاصي
باب ما جاء في الترهيب من الغنى مع الحرص
عن عروة بن الزبير (1) أن المسور بن محزمة أخبره أن عمرو بن عوف وهو حليف بني عامر بن لؤى وكان شهد بدرا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم أخبره أن رسول الله صلى الله عليه وسلم بعث ابا عبيدة بن الجراح إلى البحرين يأتي بجزيتها وكان رسول الله صلى الله عليه وسلم هو صالح أهل البحرين وامر عليهم العلاء بن الحضرمي فقدم أبو عبيدة بمال من البحرين فسمعت الأنصاربقدومه فوافت صلاة الفجر مع رسول الله صلى الله عليه وسلم فلما صلى رسول الله صلى الله عليه وسلم صلاة الفجر انصرف فتعرضوا له فتبسم رسول الله صلى الله عليه وسلم حين رآهم فقال أظنكم قد سمعتم أن أبا عبيدة قد جاء وجاء بشيء؟ قالوا أجل يا رسول الله قال فأبشروا وأملوا ما يسركم فوالله الفقر ما أخشى عليكم ولكن أخشى أن تبسط الدنيا عليكم كما بسطت على من كان قبلكم فتنافسوها (2) كما تنافسوها وتلهيكم كما الهتهم
হাদীসের ব্যাখ্যা:
হাদীছে বাহরাইন থেকে জিযিয়ার অর্থ আসা, তা থেকে অংশ পেতে আনসারদের আগ্রহ এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে তাদের লক্ষ্য করে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপদেশবাণী বর্ণিত হয়েছে।
বাহরাইন ইসলামী হুকুমতের অধীনে আসে হিজরী ৮ম সনে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলা ইবনুল হাযরামী রাযি.-কে সেখানকার শাসনকর্তা মুনযির ইবন ‘সাওয়ী'-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন। তিনি তাঁর মারফত মুনযিরের কাছে ইসলামী দাওয়াতের একখানি পত্রও পাঠিয়েছিলেন। হযরত 'আলা রাযি. বাহরাইনে পৌঁছে পত্রখানি মুনযিরের হাতে তুলে দিলে তিনি তখনই ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার গোত্রের লোকজনও ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। তবে সেখানকার মাজুসী সম্প্রদায় ইসলামগ্রহণে রাজি হয়নি। তারা জিযিয়া আদায়ের শর্তে হযরত 'আলা রাযি.-এর সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করে। জিযিয়া ধার্য করা হয়েছিল মাথাপিছু এক দীনার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়নের যুদ্ধের পর হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.-কে জিযিয়ার অর্থ নিয়ে আসার জন্য বাহরাইন পাঠান। তিনি জিযিয়ার অর্থ নিয়ে যথাসময়ে মদীনা মুনাউওয়ারায় ফিরে আসেন। তার পরিমাণ ছিল এক লক্ষ দিরহাম। হযরত আবূ উবায়দা রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তা হাজির করলে তিনি মসজিদের এক কোণে তা রেখে দিতে বলেন। সেখানে তা একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই চারদিকে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, হযরত আবূ উবায়দা রাযি, বাহরাইন থেকে বিপুল অর্থকড়ি নিয়ে এসেছেন। বর্ণনাকারী বলেন
فسمعت الأنصار بقدوم أبي عبيدة، فوافوا صلاة الفجر مع رسول الله ﷺ (আনসারগণ আবূ উবায়দার আগমনের কথা শুনতে পেলেন। ফলে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ফজরের নামাযে মিলিত হলেন)। সাধারণত পাঁচ ওয়াক্তের নামাযে এত মুসল্লী হতো না। কারণ প্রত্যেক এলাকায় আলাদা আলাদা মসজিদ ছিল। মুসল্লীগণ আপন আপন মহল্লার মসজিদেই নামায আদায় করত। কেবল জুমু'আর দিনেই জুমু'আর নামায আদায়ের জন্য সকলে মসজিদে নববীতে চলে আসত। ফজরের নামায আদায়ের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন আনসারগণ তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাদের দেখে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঁচ করতে পারলেন হয়তো তারা আবূ উবায়দার আগমন-সংবাদ শুনতে পেয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন
فتبسم رسول اللہ ﷺ حين رآهم، ثم قال: «أظنكم سمعتم أن أبا عبيدة قدم بشيء من البحرين؟ (তাদেরকে দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে দিলেন। তারপর বললেন, আমার মনে হয় তোমরা শুনতে পেয়েছ আবূ উবায়দা বাহরাইন থেকে কিছু নিয়ে এসেছে)। কেন তিনি হেসেছিলেন? সম্ভবত এতসংখ্যক সাহাবীকে একসঙ্গে দেখতে পাওয়ার খুশিতে। এমনিতেও তিনি যে-কোনও আগুন্তুককে মুচকি হাসির সঙ্গেই গ্রহণ করতেন। কোনও সাহাবী এসে দেখা করলে চেহারায় আনন্দের উদ্ভাস লক্ষ করা যেত।
তাঁর হাসির কারণ এরকমও হতে পারে যে, তিনি হয়তো অনুভব করছিলেন কিভাবেই না অর্থের প্রতি মানুষের স্বভাবজাত আগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যায়। তিনি তাদের অন্তরে দুনিয়াবিমুখতার চেতনা সঞ্চার করে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে ত্যাগের মানসিকতা প্রবল। সবসময়ই নিজের উপর অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়ান। আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে চূড়ান্ত পর্যায়ের দুনিয়াবিমুখ। তিনি তাদের মধ্যে সশরীরে হাজির রয়েছেন। এতদ্সত্ত্বেও কিভাবে অর্থকড়ির সংবাদ শুনে তারা হাজির হয়ে পড়েছেন।
বলাবাহুল্য, আনসারদের অন্তরে অর্থের মোহ ছিল না। তাদের অধিকাংশই ছিলেন নিতান্তই গরীব। কাজেই তাদের এ আগমন লোভের কারণে নয়; বরং ছিল প্রয়োজনের তাগিদে। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লক্ষ্য তো তাদেরকে চূড়ান্ত পর্যায়ের ত্যাগ ও নির্মোহ মানসিকতার আদর্শরূপে গড়ে তোলা এবং তাদের অন্তরে দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়ের হীনতা ও তুচ্ছতার বোধ বদ্ধমূল করে দেওয়া। তাই তিনি হযরত আবূ উবায়দা রাযি.-এর নিয়ে আসা অর্থকে شيء শব্দে ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ কিছু বা সামান্য কিছু। তাঁর দৃষ্টিতে লক্ষ দিরহামও সামান্য কিছুই বটে। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত রেখেছেন তার বিপরীতে লক্ষ দিরহাম কী, সমগ্র দুনিয়াও অতি সামান্যই। বিভিন্ন হাদীছে তিনি এ কথা স্পষ্ট করেছেন।
সাহাবীগণও ছিলেন বড় সরল, অকপট। তারা বললেন- أجل يا رسول الله (হাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ)। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধারণা সত্য বলে তারা স্বীকার করলেন। শুধু أجل (হাঁ) না বলে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ' বলে সম্বোধনও করেছেন। এটাই আদব। বড় ও সম্মানিত ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে কেবল 'হাঁ' বা 'না' না বলে সম্মানসূচক সম্বোধনও করা চাই। প্রিয় ব্যক্তিকে সম্বোধন করার মধ্যে একরকম আস্বাদও নিহিত থাকে। ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ' সম্বোধনের মধ্যে যে আনন্দ ও আস্বাদ রয়েছে, তার কি কোনও তুলনা আছে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে তারা যে উদ্দেশ্যে এসেছেন তা পূরণ হবে বলে আশ্বস্ত করলেন। বললেন, তোমরা সুসংবাদ নাও এবং যা তোমাদের আনন্দিত করবে তার আশা কর। তারপর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর আনীত দীনের রূহানী সবক দিলেন। তাদেরকে দিলেন যুহদের শিক্ষা। একজন মুমিনের জন্য দারিদ্র্য নয়; বরং ধনই যে বেশি বিপজ্জনক সে ব্যাপারে তাদের হুঁশিয়ার করলেন। তিনি বললেন
فوالله ما الفقر أخشى عليكم، ولكني أخشى أن تبسط الدنيا عليكم كما بسطت على من كان قبلكم (আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের ভয় করি না। বরং আমি ভয় করি যে, তোমাদের প্রতি দুনিয়া প্রশস্ত করে দেওয়া হবে, যেমনটা প্রশস্ত করে দেওয়া হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি)। ওহী দ্বারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হয়েছিল যে, অচিরেই তাঁর উম্মত দুনিয়ার দিকে দিকে জয়লাভ করবে। তাতে করে বড় বড় রাজা-বাদশার ধনভাণ্ডার তাদের দখলে চলে আসবে আর এভাবে তাদের বর্তমান দারিদ্র্য দূর হয়ে যাবে, তারা প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যাবে। তিনি জানতেন মানুষের দীন ও ঈমানের জন্য ধন-সম্পদ যতবেশি ক্ষতিকর, অভাব-অনটন ততটা ক্ষতিকর নয়। অন্যদিকে সন্তানের প্রতি পিতার যে মায়া-মমতা, উম্মতের প্রতি তাঁর মায়া-মমতা ছিল তারচে'ও বেশি। পিতা-মাতা তো সন্তানের দুনিয়ার দিকটাই দেখে। অর্থ-সম্পদ থাকলে দুনিয়ায় আরাম-আয়েশে থাকা যায়। অভাব-অনটনে নানা কষ্ট পেতে হয়। তাই পিতা-মাতা সন্তানের ক্ষেত্রে ভয় করে দারিদ্র্যের, যাতে তাদের মৃত্যুর পর সন্তান অভাব-অনটনে কষ্ট না পায়। কিন্তু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের জন্য আখিরাতের মুক্তির চিন্তা করতেন। উম্মত যাতে জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি পেয়ে চিরসুখের জান্নাত পেয়ে যায়, সেটাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্যবস্তু। এর জন্য দরকার দীন ও ঈমানের হেফাজত। বেশি বিত্তবৈভব দীন ও ঈমানের জন্য বিপজ্জনক। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা'আলা বলেন
إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى أَنْ رَآهُ اسْتَغْنَى
বস্তুত মানুষ প্রকাশ্য অবাধ্যতা করছে। কেননা সে নিজেকে ঐশ্বর্যশালী মনে করে।
তো ঐশ্বর্যশালী হয়ে গেলে মানুষ যেহেতু প্রকাশ্যে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীছে সতর্ক করেছেন যে, আমি তোমাদের জন্য দারিদ্রের নয়; বরং দুনিয়ার প্রাচুর্যেরই ভয় করি। হাদীছের পরবর্তী অংশে তিনি এ ভয়ের কারণ ব্যাখ্যা করে দেন যে
فتنافسوها كما تنافسوها فتهلككم كما أهلكتهم (ফলে তোমরা পরস্পর রেষারেষিতে লিপ্ত হবে, যেমনটা তারা রেষারেষিতে লিপ্ত হয়েছিল। পরিণামে তা তোমাদের ধ্বংস করবে, যেমন তাদের ধ্বংস করেছিল)। এটা পরীক্ষিত বিষয় যে, অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য দেখা দিলে মানুষ পরস্পরে রেষারেষিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তখন প্রত্যেকের চেষ্টা থাকে কিভাবে অন্যকে ছাড়িয়ে যাবে। কেউ যখন দেখে অন্য কেউ তাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখন তার প্রতি বিদ্বিষ্ট হয়ে পড়ে। সে বিদ্বেষ থেকে সৃষ্টি হয় শত্রুতা। তখন একে অন্যের ক্ষতি করতে চায়। যে-কোনও উপায়ে অন্যকে দাবিয়ে রেখে নিজে উপরে উঠতে চায়। এভাবে পরস্পরে শুরু হয়ে যায় মারামারি হানাহানি। মানুষের ইতিহাসে রক্তপাতের যত ঘটনা ঘটেছে, তার একটা বড় অংশই ঘটেছে অর্থবিত্তের প্রতিযোগিতা থেকে। অতীতে বহু জাতি এই হানাহানিতে ধ্বংস হয়ে গেছে। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন
اتقوا الشح، فإن الشح أهلك من كان قبلكم، حملهم على أن سفكوا دماءهم واستحلوا محارمهم
তোমরা লোভ-লালসা হতে বিরত থাক, কেননা লোভ-লালসা তোমাদের পূর্বের লোকদেরকে ধ্বংস করেছে। তা তাদেরকে তাদের রক্তপাত করতে এবং তাদের জন্য নিষিদ্ধ বিষয়সমূহকে হালাল করতে প্ররোচিত করেছিল।
অতীতের উদাহরণ টেনে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ উম্মতকে সতর্ক করেন যে, অতীতে যেমন প্রাচুর্যের রেষারেষিতে দুনিয়ার বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, আমার ভয় তোমরাও তেমনি রেষারেষিতে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। অর্থাৎ প্রাচুর্য তো দেখা দেবে। কিন্তু সাবধান! তোমরা সে কারণে একে অন্যের প্রতি রেষারেষিতে লিপ্ত হয়ে যেয়ো না। বরং যার যা অর্জিত হয় তাতে সন্তুষ্ট থেকো। দৃষ্টি রেখো আখিরাতের দিকে। সেখানে যাতে মুক্তিলাভ হয়, সর্বদা সেজন্য চিন্তিত ও সচেষ্ট থেকো।
উল্লেখ্য, এ হাদীছটিতে প্রদত্ত ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়েছিল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর খুব বেশি দিন যায়নি। হযরত উমর ফারূক রাযি.-এর আমলেই রোম, পারস্য ও মিশরের বিস্তীর্ণ এলাকা এ উম্মতের দখলে চলে আসে। এসব শক্তির ধনভাণ্ডার তাদের করতলগত হয়। হযরত উছমান রাযি.-এর আমলে এ উম্মত অভাবনীয় প্রাচুর্য লাভ করে। এমনও দেখা যায় যে, যাকাতদাতা কাকে যাকাত দেবে এরকম লোক খুঁজে পাচ্ছে না।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সতর্কবাণী এ উম্মতের প্রতিরক্ষার কাজ করেছে। প্রাচুর্যের সয়লাবে সামগ্রিকভাবে এ উম্মত ভেসে যায়নি। একটা অংশ সবসময়ই নির্মোহ চরিত্র ধরে রেখেছে। তারা নিজেরাও প্রাচুর্যের ক্ষতি হতে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছে এবং অন্যদেরকেও বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। তবে এ কথাও সত্য যে, অভাব-অনটনকালে উম্মত যে চারিত্রিক ও নৈতিক মানদণ্ড রক্ষায় সক্ষম হয়েছিল, বিত্ত-বৈভব দেখা দেওয়ার পর তাদের বিপুল অংশ আর তা রক্ষা করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে তাদের যে অধঃপতন শুরু হয়, কালক্রমে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে।
আজকের অবস্থা তো ভয়াবহ। কোথায় সাহাবা তাবিঈনের সেই যুহদ ও সেই তাকওয়া-পরহেযগারী। আজ অর্থবিত্তের মোহ, প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা ও সেই প্রতিযোগিতা থেকে জন্ম নেওয়া হিংসা-বিদ্বেষ, মারামারি, হানাহানিতে এ উম্মত বিপর্যস্ত। এর থেকে মুক্তির জন্য উম্মতকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার দিকে ফিরে আসতে হবে। ঘরে-বাইরে সর্বত্র সে শিক্ষার ব্যাপক চর্চা ছড়িয়ে দিতে হবে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. প্রিয়জন ও আগুন্তুকদের হাসিমুখে গ্রহণ করা ও মুখে আনন্দভাব ফুটিয়ে তোলা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত।
খ. সম্পদের প্রতি আকর্ষণ মানুষের স্বভাবগত বিষয়। এ আকর্ষণ যাতে সীমালঙ্ঘনের কারণ না হয়, তাই অন্তরে সর্বদা আখিরাতের চিন্তা জাগরুক রাখা চাই।
গ. নিজের অধীন ও সম্পৃক্তজনরা যাতে অর্থ-সম্পদের মোহে না পড়ে যায়, মুরুব্বী ও গুরুজনদের কর্তব্য সেদিকে লক্ষ রাখা এবং সে বিষয়ে তাদেরকে সচেতন ও সতর্ক করা।
ঘ. কারও ধন-দৌলত অর্জিত হয়ে গেলে তার উচিত সে ধন-দৌলতের ফিতনা ও তার অনিষ্টকারিতা সম্পর্কে সাবধান থাকা, যাতে তা তার অন্তরে বিদ্বেষ ও অহমিকা সৃষ্টি করতে না পারে।
ঙ. অন্যের ধন-দৌলত দেখে কিছুতেই তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও রেষারেষিতে লিপ্ত হতে নেই। নিজের যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা চাই।
বাহরাইন ইসলামী হুকুমতের অধীনে আসে হিজরী ৮ম সনে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলা ইবনুল হাযরামী রাযি.-কে সেখানকার শাসনকর্তা মুনযির ইবন ‘সাওয়ী'-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন। তিনি তাঁর মারফত মুনযিরের কাছে ইসলামী দাওয়াতের একখানি পত্রও পাঠিয়েছিলেন। হযরত 'আলা রাযি. বাহরাইনে পৌঁছে পত্রখানি মুনযিরের হাতে তুলে দিলে তিনি তখনই ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার গোত্রের লোকজনও ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। তবে সেখানকার মাজুসী সম্প্রদায় ইসলামগ্রহণে রাজি হয়নি। তারা জিযিয়া আদায়ের শর্তে হযরত 'আলা রাযি.-এর সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করে। জিযিয়া ধার্য করা হয়েছিল মাথাপিছু এক দীনার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনায়নের যুদ্ধের পর হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.-কে জিযিয়ার অর্থ নিয়ে আসার জন্য বাহরাইন পাঠান। তিনি জিযিয়ার অর্থ নিয়ে যথাসময়ে মদীনা মুনাউওয়ারায় ফিরে আসেন। তার পরিমাণ ছিল এক লক্ষ দিরহাম। হযরত আবূ উবায়দা রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তা হাজির করলে তিনি মসজিদের এক কোণে তা রেখে দিতে বলেন। সেখানে তা একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই চারদিকে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, হযরত আবূ উবায়দা রাযি, বাহরাইন থেকে বিপুল অর্থকড়ি নিয়ে এসেছেন। বর্ণনাকারী বলেন
فسمعت الأنصار بقدوم أبي عبيدة، فوافوا صلاة الفجر مع رسول الله ﷺ (আনসারগণ আবূ উবায়দার আগমনের কথা শুনতে পেলেন। ফলে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ফজরের নামাযে মিলিত হলেন)। সাধারণত পাঁচ ওয়াক্তের নামাযে এত মুসল্লী হতো না। কারণ প্রত্যেক এলাকায় আলাদা আলাদা মসজিদ ছিল। মুসল্লীগণ আপন আপন মহল্লার মসজিদেই নামায আদায় করত। কেবল জুমু'আর দিনেই জুমু'আর নামায আদায়ের জন্য সকলে মসজিদে নববীতে চলে আসত। ফজরের নামায আদায়ের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন আনসারগণ তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাদের দেখে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঁচ করতে পারলেন হয়তো তারা আবূ উবায়দার আগমন-সংবাদ শুনতে পেয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন
فتبسم رسول اللہ ﷺ حين رآهم، ثم قال: «أظنكم سمعتم أن أبا عبيدة قدم بشيء من البحرين؟ (তাদেরকে দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে দিলেন। তারপর বললেন, আমার মনে হয় তোমরা শুনতে পেয়েছ আবূ উবায়দা বাহরাইন থেকে কিছু নিয়ে এসেছে)। কেন তিনি হেসেছিলেন? সম্ভবত এতসংখ্যক সাহাবীকে একসঙ্গে দেখতে পাওয়ার খুশিতে। এমনিতেও তিনি যে-কোনও আগুন্তুককে মুচকি হাসির সঙ্গেই গ্রহণ করতেন। কোনও সাহাবী এসে দেখা করলে চেহারায় আনন্দের উদ্ভাস লক্ষ করা যেত।
তাঁর হাসির কারণ এরকমও হতে পারে যে, তিনি হয়তো অনুভব করছিলেন কিভাবেই না অর্থের প্রতি মানুষের স্বভাবজাত আগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যায়। তিনি তাদের অন্তরে দুনিয়াবিমুখতার চেতনা সঞ্চার করে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে ত্যাগের মানসিকতা প্রবল। সবসময়ই নিজের উপর অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়ান। আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে চূড়ান্ত পর্যায়ের দুনিয়াবিমুখ। তিনি তাদের মধ্যে সশরীরে হাজির রয়েছেন। এতদ্সত্ত্বেও কিভাবে অর্থকড়ির সংবাদ শুনে তারা হাজির হয়ে পড়েছেন।
বলাবাহুল্য, আনসারদের অন্তরে অর্থের মোহ ছিল না। তাদের অধিকাংশই ছিলেন নিতান্তই গরীব। কাজেই তাদের এ আগমন লোভের কারণে নয়; বরং ছিল প্রয়োজনের তাগিদে। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লক্ষ্য তো তাদেরকে চূড়ান্ত পর্যায়ের ত্যাগ ও নির্মোহ মানসিকতার আদর্শরূপে গড়ে তোলা এবং তাদের অন্তরে দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়ের হীনতা ও তুচ্ছতার বোধ বদ্ধমূল করে দেওয়া। তাই তিনি হযরত আবূ উবায়দা রাযি.-এর নিয়ে আসা অর্থকে شيء শব্দে ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ কিছু বা সামান্য কিছু। তাঁর দৃষ্টিতে লক্ষ দিরহামও সামান্য কিছুই বটে। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত রেখেছেন তার বিপরীতে লক্ষ দিরহাম কী, সমগ্র দুনিয়াও অতি সামান্যই। বিভিন্ন হাদীছে তিনি এ কথা স্পষ্ট করেছেন।
সাহাবীগণও ছিলেন বড় সরল, অকপট। তারা বললেন- أجل يا رسول الله (হাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ)। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধারণা সত্য বলে তারা স্বীকার করলেন। শুধু أجل (হাঁ) না বলে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ' বলে সম্বোধনও করেছেন। এটাই আদব। বড় ও সম্মানিত ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে কেবল 'হাঁ' বা 'না' না বলে সম্মানসূচক সম্বোধনও করা চাই। প্রিয় ব্যক্তিকে সম্বোধন করার মধ্যে একরকম আস্বাদও নিহিত থাকে। ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ' সম্বোধনের মধ্যে যে আনন্দ ও আস্বাদ রয়েছে, তার কি কোনও তুলনা আছে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে তারা যে উদ্দেশ্যে এসেছেন তা পূরণ হবে বলে আশ্বস্ত করলেন। বললেন, তোমরা সুসংবাদ নাও এবং যা তোমাদের আনন্দিত করবে তার আশা কর। তারপর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর আনীত দীনের রূহানী সবক দিলেন। তাদেরকে দিলেন যুহদের শিক্ষা। একজন মুমিনের জন্য দারিদ্র্য নয়; বরং ধনই যে বেশি বিপজ্জনক সে ব্যাপারে তাদের হুঁশিয়ার করলেন। তিনি বললেন
فوالله ما الفقر أخشى عليكم، ولكني أخشى أن تبسط الدنيا عليكم كما بسطت على من كان قبلكم (আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের ভয় করি না। বরং আমি ভয় করি যে, তোমাদের প্রতি দুনিয়া প্রশস্ত করে দেওয়া হবে, যেমনটা প্রশস্ত করে দেওয়া হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি)। ওহী দ্বারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হয়েছিল যে, অচিরেই তাঁর উম্মত দুনিয়ার দিকে দিকে জয়লাভ করবে। তাতে করে বড় বড় রাজা-বাদশার ধনভাণ্ডার তাদের দখলে চলে আসবে আর এভাবে তাদের বর্তমান দারিদ্র্য দূর হয়ে যাবে, তারা প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যাবে। তিনি জানতেন মানুষের দীন ও ঈমানের জন্য ধন-সম্পদ যতবেশি ক্ষতিকর, অভাব-অনটন ততটা ক্ষতিকর নয়। অন্যদিকে সন্তানের প্রতি পিতার যে মায়া-মমতা, উম্মতের প্রতি তাঁর মায়া-মমতা ছিল তারচে'ও বেশি। পিতা-মাতা তো সন্তানের দুনিয়ার দিকটাই দেখে। অর্থ-সম্পদ থাকলে দুনিয়ায় আরাম-আয়েশে থাকা যায়। অভাব-অনটনে নানা কষ্ট পেতে হয়। তাই পিতা-মাতা সন্তানের ক্ষেত্রে ভয় করে দারিদ্র্যের, যাতে তাদের মৃত্যুর পর সন্তান অভাব-অনটনে কষ্ট না পায়। কিন্তু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের জন্য আখিরাতের মুক্তির চিন্তা করতেন। উম্মত যাতে জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি পেয়ে চিরসুখের জান্নাত পেয়ে যায়, সেটাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্যবস্তু। এর জন্য দরকার দীন ও ঈমানের হেফাজত। বেশি বিত্তবৈভব দীন ও ঈমানের জন্য বিপজ্জনক। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা'আলা বলেন
إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى أَنْ رَآهُ اسْتَغْنَى
বস্তুত মানুষ প্রকাশ্য অবাধ্যতা করছে। কেননা সে নিজেকে ঐশ্বর্যশালী মনে করে।
তো ঐশ্বর্যশালী হয়ে গেলে মানুষ যেহেতু প্রকাশ্যে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীছে সতর্ক করেছেন যে, আমি তোমাদের জন্য দারিদ্রের নয়; বরং দুনিয়ার প্রাচুর্যেরই ভয় করি। হাদীছের পরবর্তী অংশে তিনি এ ভয়ের কারণ ব্যাখ্যা করে দেন যে
فتنافسوها كما تنافسوها فتهلككم كما أهلكتهم (ফলে তোমরা পরস্পর রেষারেষিতে লিপ্ত হবে, যেমনটা তারা রেষারেষিতে লিপ্ত হয়েছিল। পরিণামে তা তোমাদের ধ্বংস করবে, যেমন তাদের ধ্বংস করেছিল)। এটা পরীক্ষিত বিষয় যে, অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য দেখা দিলে মানুষ পরস্পরে রেষারেষিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তখন প্রত্যেকের চেষ্টা থাকে কিভাবে অন্যকে ছাড়িয়ে যাবে। কেউ যখন দেখে অন্য কেউ তাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখন তার প্রতি বিদ্বিষ্ট হয়ে পড়ে। সে বিদ্বেষ থেকে সৃষ্টি হয় শত্রুতা। তখন একে অন্যের ক্ষতি করতে চায়। যে-কোনও উপায়ে অন্যকে দাবিয়ে রেখে নিজে উপরে উঠতে চায়। এভাবে পরস্পরে শুরু হয়ে যায় মারামারি হানাহানি। মানুষের ইতিহাসে রক্তপাতের যত ঘটনা ঘটেছে, তার একটা বড় অংশই ঘটেছে অর্থবিত্তের প্রতিযোগিতা থেকে। অতীতে বহু জাতি এই হানাহানিতে ধ্বংস হয়ে গেছে। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন
اتقوا الشح، فإن الشح أهلك من كان قبلكم، حملهم على أن سفكوا دماءهم واستحلوا محارمهم
তোমরা লোভ-লালসা হতে বিরত থাক, কেননা লোভ-লালসা তোমাদের পূর্বের লোকদেরকে ধ্বংস করেছে। তা তাদেরকে তাদের রক্তপাত করতে এবং তাদের জন্য নিষিদ্ধ বিষয়সমূহকে হালাল করতে প্ররোচিত করেছিল।
অতীতের উদাহরণ টেনে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ উম্মতকে সতর্ক করেন যে, অতীতে যেমন প্রাচুর্যের রেষারেষিতে দুনিয়ার বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, আমার ভয় তোমরাও তেমনি রেষারেষিতে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। অর্থাৎ প্রাচুর্য তো দেখা দেবে। কিন্তু সাবধান! তোমরা সে কারণে একে অন্যের প্রতি রেষারেষিতে লিপ্ত হয়ে যেয়ো না। বরং যার যা অর্জিত হয় তাতে সন্তুষ্ট থেকো। দৃষ্টি রেখো আখিরাতের দিকে। সেখানে যাতে মুক্তিলাভ হয়, সর্বদা সেজন্য চিন্তিত ও সচেষ্ট থেকো।
উল্লেখ্য, এ হাদীছটিতে প্রদত্ত ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়েছিল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর খুব বেশি দিন যায়নি। হযরত উমর ফারূক রাযি.-এর আমলেই রোম, পারস্য ও মিশরের বিস্তীর্ণ এলাকা এ উম্মতের দখলে চলে আসে। এসব শক্তির ধনভাণ্ডার তাদের করতলগত হয়। হযরত উছমান রাযি.-এর আমলে এ উম্মত অভাবনীয় প্রাচুর্য লাভ করে। এমনও দেখা যায় যে, যাকাতদাতা কাকে যাকাত দেবে এরকম লোক খুঁজে পাচ্ছে না।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সতর্কবাণী এ উম্মতের প্রতিরক্ষার কাজ করেছে। প্রাচুর্যের সয়লাবে সামগ্রিকভাবে এ উম্মত ভেসে যায়নি। একটা অংশ সবসময়ই নির্মোহ চরিত্র ধরে রেখেছে। তারা নিজেরাও প্রাচুর্যের ক্ষতি হতে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছে এবং অন্যদেরকেও বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। তবে এ কথাও সত্য যে, অভাব-অনটনকালে উম্মত যে চারিত্রিক ও নৈতিক মানদণ্ড রক্ষায় সক্ষম হয়েছিল, বিত্ত-বৈভব দেখা দেওয়ার পর তাদের বিপুল অংশ আর তা রক্ষা করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে তাদের যে অধঃপতন শুরু হয়, কালক্রমে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে।
আজকের অবস্থা তো ভয়াবহ। কোথায় সাহাবা তাবিঈনের সেই যুহদ ও সেই তাকওয়া-পরহেযগারী। আজ অর্থবিত্তের মোহ, প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা ও সেই প্রতিযোগিতা থেকে জন্ম নেওয়া হিংসা-বিদ্বেষ, মারামারি, হানাহানিতে এ উম্মত বিপর্যস্ত। এর থেকে মুক্তির জন্য উম্মতকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার দিকে ফিরে আসতে হবে। ঘরে-বাইরে সর্বত্র সে শিক্ষার ব্যাপক চর্চা ছড়িয়ে দিতে হবে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. প্রিয়জন ও আগুন্তুকদের হাসিমুখে গ্রহণ করা ও মুখে আনন্দভাব ফুটিয়ে তোলা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত।
খ. সম্পদের প্রতি আকর্ষণ মানুষের স্বভাবগত বিষয়। এ আকর্ষণ যাতে সীমালঙ্ঘনের কারণ না হয়, তাই অন্তরে সর্বদা আখিরাতের চিন্তা জাগরুক রাখা চাই।
গ. নিজের অধীন ও সম্পৃক্তজনরা যাতে অর্থ-সম্পদের মোহে না পড়ে যায়, মুরুব্বী ও গুরুজনদের কর্তব্য সেদিকে লক্ষ রাখা এবং সে বিষয়ে তাদেরকে সচেতন ও সতর্ক করা।
ঘ. কারও ধন-দৌলত অর্জিত হয়ে গেলে তার উচিত সে ধন-দৌলতের ফিতনা ও তার অনিষ্টকারিতা সম্পর্কে সাবধান থাকা, যাতে তা তার অন্তরে বিদ্বেষ ও অহমিকা সৃষ্টি করতে না পারে।
ঙ. অন্যের ধন-দৌলত দেখে কিছুতেই তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও রেষারেষিতে লিপ্ত হতে নেই। নিজের যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা চাই।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)