আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৫. অধ্যায়ঃ পুনরুত্থান ও কিয়ামাত

হাদীস নং: ৫৫০৭
অধ্যায়ঃ পুনরুত্থান ও কিয়ামাত
পরিচ্ছেদ: হাওযে কাওসার, পাল্লা ও পুলসিরাত সম্পর্কে আলোচনা
৫৫০৭. হযরত ইবন উমার (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমার হাওয়ের বিস্তৃতি আদন ও আম্মানের মধ্যবর্তী স্থানের সমান। তার পানি বরফের চেয়ে অধিক ঠান্ডা, মধুর চেয়ে অধিক মিষ্টি ও মিশকের চেয়ে অধিক সুগন্ধিময়। তার পানপাত্রগুলো সংখ্যায় আকাশের তারকারাজির সমান। যে তা থেকে এক ঢোক পানি পান করবে সে এরপর কখনও তৃষ্ণার্ত হবে না। তাতে পানি পানের জন্য সর্বপ্রথম আগমনকারী মানুষ হবে দরিদ্র মুহাজিরগণ। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। তারা কারা? তিনি বললেন, যাদের মাথার চুল উসকো খুসকো, চেহারা জীর্ণ-শীর্ণ, কাপড় ময়লাযুক্ত, যাদের জন্য দরজা খোলা হয় না, যারা প্রাচুর্য মন্ডিতা নারীদেরকে বিবাহ করে না, যারা তাদের কাছে প্রাপ্য সবকিছু আদায় করে দেয় এবং তাদের পাপ্য তারা পুরোপুরি গ্রহণ করে না।
(আহমাদ (র) হাসান সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।)
كتاب البعث
فصل فِي الْحَوْض وَالْمِيزَان والصراط
5507- وَعَن ابْن عمر رَضِي الله عَنْهُمَا أَن رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ حَوْضِي كَمَا بَين عدن وعمان أبرد من الثَّلج وَأحلى من الْعَسَل وَأطيب ريحًا من الْمسك أكوابه مثل نُجُوم السَّمَاء من شرب مِنْهُ شربة لم يظمأ بعْدهَا أبدا أول النَّاس عَلَيْهِ ورودا صعاليك الْمُهَاجِرين
قَالَ قَائِل من هم يَا رَسُول الله قَالَ الشعثة رؤوسهم الشحبة وُجُوههم الدنسة ثِيَابهمْ لَا تفتح لَهُم السدد وَلَا ينْكحُونَ الْمُنَعَّمَاتِ الَّذين يُعْطون كل الَّذِي عَلَيْهِم وَلَا يَأْخُذُونَ كل الَّذِي لَهُم

رَوَاهُ أَحْمد بِإِسْنَاد حسن

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

قَوْله الشحبة وُجُوههم بِفَتْح الشين الْمُعْجَمَة وَكسر الْحَاء الْمُهْملَة بعْدهَا بَاء مُوَحدَة هُوَ من الشحوب وَهُوَ تغير الْوَجْه من جوع أَو هزال أَو تَعب
وَقَوله لَا تفتح لَهُم السدد أَي لَا تفتح لَهُم الْأَبْوَاب

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আদন (এডেন) ইয়েমেনের একটি মশহুর শহর। আম্মানও (আম্মান বর্তমানে জর্দানের রাজধানী) সিরিয়ার অন্তর্গত একটি প্রসিদ্ধ শহর। বালাকাআ আম্মানের নিকটবর্তী একটি জনপদ। বৈশিষ্ট এবং নিশানী হিসেবে আম্মানের বলাকাআ এর উল্লেখ করা হয়েছে। তার অর্থ হল আমাদের দুনিয়াতে আদন এবং বলাকাআ-এর নিকটবর্তী আম্মানের দূরত্ব যতটুকু আখিরাতে হাওযে কাওসারের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত দূরত্ব ততটুকু হবে। বলাবাহুল্য মাপতোল করে এ দূরত্ব নির্ণয় করে বলা হয়নি যে, এটা এত মাইল বা এত ফার্লং বা এত ফুটের ব্যবধান হবে। বরং তার প্রশস্ততা বুঝানোর জন্য আনুমানিক ভাবে বলা হয়েছে বস্তুতঃ অসংখ্য মাইলব্যাপী প্রশস্ত হবে হাওযে কাওসার।

অবশেষে বলা হয়েছে, হাওযে যারা সর্বপ্রথম পৌঁছবেন এবং পানি পান করার সৌভাগ্য হাসিল করবেন তারা হবেন গরীব মুহাজির যারা নিজেদের দৈন্যতা এবং দুনিয়া বিমুখতার কারণে চুল পরিপাটি করতেন না বরং চুল এলোমেলো থাকত। তারা পেরেশান থাকবেন, জামা কাপড় ময়লা থাকত, যাদেরকে কোন বিত্তবান নিজের মেয়ে বিয়ে দিত না এবং অগত্যা কোন স্থানে গমন করলে জামাকাপড়ের দৈন্যতার কারণে যাদেরকে স্বাগতম জানান হত না।

এটা অনুমিত হয় যে, দুনিয়া বিমুখতা, দীনের প্রতি ঐকান্তিকতা এবং আখিরাতের চিন্তার আধিক্যের কারণে যারা দুনিয়ার যিন্দেগীতে নিজেদের আরাম-আয়েশ কুরবান করেছেন এবং নিজেদের চুল পরিপাটি করতে পারেন নি এবং লেবাস-পোশাক সুন্দর রাখতে পারেন নি কিয়ামতের দিন তারা আখিরাতের পুরস্কার লাভ করার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার হাসিল করবেন। যারা হাল যামানায় এ অবস্থাকে 'তাকাস্বাফ' বা 'রুহবানিয়াত' বা 'দীনের গলদ ধারণার পরিণতি' জ্ঞান করেন তাদের এ সংক্রান্ত হাদীস সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা উচিত।

প্রত্যেক যুগের বিশেষ ব্যধি থাকে। যেরূপ এককালে রুহবানিয়াত এবং 'তরকে দুনিয়ার' অনৈসলামী চিন্তাধারা এবং আচরণকে অনেক লোক খালেস ইসলামী চেষ্টা সাধনা মনে করতেন ঠিক সেরূপ অনেকে হাল যামানার বিত্ত ও নফস পরস্তির দাবির সাথে ইসলামী চিন্তা ও তালিমের সামঞ্জস্য বিধান করার উপর মাত্রাধিক গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন।

وَاللّٰہُ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ

যখন পিপাসা পিপাসা বলে চিৎকার শোনা যাবে, তখন এক ধরনের লোককে হাওযে কাওসারের পানি সর্বাগ্রে পান করান হবে। তারা অশেষ মর্যাদার অধিকারী হবে এবং এই পানি পান করার পর পিপাসা তাদের কখনো স্পর্শ করবে না।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান