আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৪. অধ্যায়ঃ জানাযা

হাদীস নং: ৫৪৩১
অধ্যায়ঃ জানাযা
অনুচ্ছেদ
৫৪৩১. হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখা হয়, অথবা বলেছেন, যখন তোমাদের কাউকে যখন কবরে রাখা হয়, তখন তার কাছে নীল পোষাক পরিহিত কালো দু'জন ফিরিশতা আসে। তাদের একজনকে বলা হয়, মুনকার, অপরজনকে বলা হয়, নাকীর। তাঁরা জিজ্ঞেস করে, এ লোকটি সম্পর্কে তুমি কি বলতে? তখন সে (তার জীবদ্দশায়) যা বলত তাই বলবে। সে বলবে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন মা'বুদ নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। তখন তারা বলে, আমরা জানতাম যে, তুমি একথা বলবে। তারপর তার জন্য তার কবর দৈর্ঘ্যে সত্তর হাত ও প্রস্থে সত্তর হাত প্রশস্ত করে দেওয়া হয় এবং তাকে বলা হয়, তুমি ঘুমিয়ে থাক। সে বলে, আমি আমার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যাই এবং তাদেরকে এ সংবাদটি জানিয়ে আসি। তারা (ফিরিশতাগণ) বলে, তুমি সেই বরের মত ঘুমিয়ে থাক, যাকে তার পরিবারের তার সবচেয়ে বেশি প্রিয়জনই জাগ্রত করে। এভাবে আল্লাহ তাকে তার সেই শয্যা থেকে পুনরুত্থিত করবেন।
আর যদি সে মুনাফিক হয়, সে বলে, আমি মানুষকে যেভাবে মন্তব্য করতে শুনেছি, তদ্রূপই বলেছি। আমি জানি না। তখন তারা বলে, আমরা জানতাম যে, তুমি একথা বলবে। তারপর ভূমিকে বলা হয়, তুমি তার জন্য সংকুচিত হয়ে যাও। তখন ভূমি তার জন্য এভাবে সংকুচিত হয়ে যায় যে, তার পাঁজরের হাঁড়গুলো একটা অপরটার ফাঁকে ঢুকে পড়ে। এভাবে আল্লাহ তাকে তার সেই শয্যা থেকে পুনরুত্থিত করা পর্যন্ত সে আযান পেতে থাকে।
(তিরমিযী (র) হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, হাদীসটি হাসান গারীব। ইবন হিব্বান ও তাঁর 'সহীহ' এ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।)
كتاب الجنائز
فصل
5434- وَعَن أبي هُرَيْرَة أَيْضا رَضِي الله عَنهُ أَن رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ إِذا قبر الْمَيِّت أَو قَالَ أحدكُم أَتَاهُ ملكان أسودان أزرقان يُقَال لأَحَدهمَا الْمُنكر وَللْآخر النكير فَيَقُولَانِ مَا كنت تَقول فِي هَذَا الرجل فَيَقُول مَا كَانَ يَقُول هُوَ عبد الله وَرَسُوله أشهد أَن لَا إِلَه إِلَّا الله وَأَن مُحَمَّدًا عَبده وَرَسُوله فَيَقُولَانِ قد كُنَّا نعلم أَنَّك تَقول هَذَا ثمَّ يفسح لَهُ فِي قَبره سَبْعُونَ ذِرَاعا فِي سبعين ثمَّ ينور لَهُ فِيهِ ثمَّ يُقَال لَهُ نم فَيَقُول أرجع إِلَى أَهلِي فَأخْبرهُم فَيَقُولَانِ نم كنومة الْعَرُوس الَّذِي لَا يوقظه إِلَّا أحب أَهله إِلَيْهِ حَتَّى يَبْعَثهُ الله من مضجعه ذَلِك وَإِن كَانَ منافقا قَالَ سَمِعت النَّاس يَقُولُونَ قولا فَقلت مثله لَا أَدْرِي فَيَقُولَانِ قد كُنَّا نعلم أَنَّك تَقول ذَلِك فَيُقَال للْأَرْض التئمي عَلَيْهِ فتلتئم عَلَيْهِ فتختلف أضلاعه فَلَا يزَال فِيهَا معذبا حَتَّى يَبْعَثهُ الله من مضجعه ذَلِك

رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَقَالَ حَدِيث حسن غَرِيب وَابْن حبَان فِي صَحِيحه
الْعَرُوس يُطلق على الرجل وعَلى الْمَرْأَة مَا داما فِي أعراسهما

হাদীসের ব্যাখ্যা:

উক্ত হাদীসের আলোকে এখন প্রশ্ন হল কবরের যিন্দেগী বলতে কি বুঝায়? বা যাকে কবরের মধ্যে দাফন করা হয় না, যার মৃতদেহকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয় বা শ্মশানে জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং দেহ ভস্মকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয়া হয় তাকে কি করে কবরের যিন্দেগীর বর্ণিত শাস্তি বা পুরস্কার দেয়া হবে?

কবরের আযাব সম্পর্কে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সে সম্পর্কে ব্যাখ্যাকারীগণ বলেন: কবরের আযাবের অর্থ, আলমে বারযাখের আযাব। মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত বিশাল যিন্দেগীকে বারযাখের যিন্দেগী বলা হয়। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তার উল্লেখ রয়েছে। সূরা 'আল-মুমিনুন'-এ বারযাখের যিন্দেগী সম্পর্কে বলা হয়েছে,

وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ -

"তাদের (মৃত ব্যক্তিদের) সামনে রয়েছে বারযাখ যা তাদেরকে পুনরত্থিত করা পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে।" (সূরা 'আল-মুমিনুন' - ১০০)
অর্থাৎ আল্লাহ্ মৃত ব্যক্তি ও দুনিয়ার মধ্যে এক পর্দা টেনে দেন-যার ফলে সে দুনিয়ার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে পারে না এবং কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করতে থাকে।

আলমে বারযাখের প্রমাণ সূরা ইয়াসীনেও রয়েছে। সত্যকথা বলার কারণে এক মুমিনকে তার জাতির লোকেরা হত্যা করে। মৃত্যুর পর আল্লাহ্ তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেন। বেহেশত লাভের পর তিনি তার জাতির জন্য মঙ্গল কামনা করতে থাকেন। বলা হয়েছে,

قِيلَ ادْخُلِ الْجَنَّةَ ۖ قَالَ يَا لَيْتَ قَوْمِي يَعْلَمُونَ (26) بِمَا غَفَرَ لِي رَبِّي وَجَعَلَنِي مِنَ الْمُكْرَمِينَ (27)

"তাকে বলা হলো, জান্নাতে প্রবেশ করো, সে বলে উঠলো হায়! আমার সম্প্রদায় যদি জানতে পারতো। (২৬) কিরূপ আমার প্রতিপালক আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিত করেছেন। (২৭)" (সূরা ইয়াসীন - ২৬-২৭)

মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত আছে। তোমাদের মধ্যে যার মৃত্যু হোক না কেন তাকে সকাল-সন্ধ্যা তার শেষ বাসস্থান দেখানো হয়। সে জান্নাতী কিংবা জাহান্নামী হোক তাকে বলা হয় কিয়ামতের দিন আল্লাহ কর্তৃক তোমার পুনরুত্থানের এ বাসস্থান হবে তোমার।

কিয়ামত অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তি আলমে বারযাখে অবস্থান করবে। তাই তার দেহ পানিতে ভাসুক বা মাটিতে নষ্ট হোক বা জ্বালানো হোক, তাতে কিছু আসে যায় না। সেখানে রূহ হয় শাস্তি, নয় আরাম উপভোগ করবে। মৃত্যুর সাথে সাথে যে সাওয়াল-জাওয়াব হয় তা আলমে বারযাখে হয়ে থাকে। মৃত ব্যক্তির রূহকে সাওয়াল করার জন্য আল্লাহ আলমে বারযাখে কবরের অবস্থা সৃষ্টি করতে পারেন। এবং সাময়িকভাবে রূহকে দেহের ভেতর রাখতে পারেন বা রূহ মনে করতে পারে যে, সে দেহের মধ্যে রয়েছে। দেহ ছাড়া রূহ কিভাবে সুখ-শান্তি অনুভব করবে তা 'স্বপ্ন' থেকে সহজে বুঝা যায়।

স্বপ্নে আমাদের রূহ দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ায় এবং আমাদের দেহ বিছানায় পড়ে থাকে। আলমে বারযাখে যে শাস্তি বা আরাম দেয়া হবে তা স্বপ্নের মত অনুভবের পর্যায়ে থাকবে না, বরং তা হবে বাস্তব। নেক লোকের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হবে এবং মন্দলোকের জন্য জাহান্নামের দরজা খুলে দেয়া হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান