আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ
২৪. অধ্যায়ঃ জানাযা
হাদীস নং: ৫৪৩০
অধ্যায়ঃ জানাযা
অনুচ্ছেদ
৫৪৩০. হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর নবী (ﷺ) এর সাথে জানাযায় হাযির হলাম। যখন দাফনকার্য সমাপ্ত হল এবং লোকজন চলে গেল, তখন আল্লাহর নবী (ﷺ) বললেন, নিশ্চয় সে এখন তোমাদের জুতোর আওয়ায শুনতে পাচ্ছে। এখন তার কাছে মুনকার-নাকীর নামক দু'জন ফিরিশতা এসেছে। তাদের চোখগুলো আমার ডেকচীর মত, তাদের ছেদন দন্ত গরুর শিঙ-এর মত এবং তাদের আওয়াজ বজ্রের মত। তারা তাকে উঠিয়ে বসায় এবং তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, সে কার ইবাদত করত? তার নবী কে ছিল? যদি সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়, যারা আল্লাহর ইবাদত করে, তবে সে বলে, আমি আল্লাহর ইবাদত করি, আমার নবী মুহাম্মদ। তিনি আমাদের কাছে সুষ্পষ্ট প্রমানাদি ও হিদায়েত নিয়ে এসেছেন, আমরা তাঁকে বিশ্বাস করেছি এবং তাঁর অনুসরণ করেছি। এটাই আল্লাহর বাণী
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
“যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী, তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে এবং পরকালে আল্লাহ্ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন।" (১৪:২৭)।
তখন তাকে বলা হয়, তুমি ইয়াকীনের উপর জীবন যাপন করেছ, তারই উপর (স্থিত অবস্থায়) মৃত্যুবরণ করেছ এবং তারই উপর পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং তার জন্য তার কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে, সে যদি সংশয়বাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে সে বলে, আমি জানি না, আমি মানুষকে যা বলতে শুনেছি, আমিও তাই বলেছি। তখন তাকে বলা হয়, তুমি সংশয়ের সাথে জীবন যাপন করেছ, সংশয় নিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে এবং সংশয় নিয়েই পুনরুত্থিত হবে। তারপর তার জন্য জাহান্নামের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং তার জন্য বহু বিচ্ছু ও অজগর নিযুক্ত করা হব। তন্মধ্যে যদি কোন একটি দুনিয়াতে নিশ্বাস ছাড়ে তবে দুনিয়াতে আর কিছুই উৎপন্ন হবে না। সেগুলো তাকে দংশন করে এবং ভূমিকে চেপে যাওয়ার জন্য হুকুম দেওয়া হয়। তখন তার উপর ভূমি এভাবে চেপে যায় যে, তার পাঁজরের হাঁড়গুলো একটা অপরটার ফাঁকে ঢুকে পড়ে।
(তারারানী (র) 'আল-আওসাতে' হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, কেবল ইবন লাহী আ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাকিব (র) বলেন, অন্য হাদীসের পোষকতায় ইবন লাহী আর হাদীস হাসান। কিন্তু যে হাদীস কেবল ইবন পাহী'আই বর্ণনা করেছেন, তাকে কম সংখ্যক লোকই প্রমাণ স্বরূপ গ্রহন করেছেন।)
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
“যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী, তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে এবং পরকালে আল্লাহ্ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন।" (১৪:২৭)।
তখন তাকে বলা হয়, তুমি ইয়াকীনের উপর জীবন যাপন করেছ, তারই উপর (স্থিত অবস্থায়) মৃত্যুবরণ করেছ এবং তারই উপর পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং তার জন্য তার কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে, সে যদি সংশয়বাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে সে বলে, আমি জানি না, আমি মানুষকে যা বলতে শুনেছি, আমিও তাই বলেছি। তখন তাকে বলা হয়, তুমি সংশয়ের সাথে জীবন যাপন করেছ, সংশয় নিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে এবং সংশয় নিয়েই পুনরুত্থিত হবে। তারপর তার জন্য জাহান্নামের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং তার জন্য বহু বিচ্ছু ও অজগর নিযুক্ত করা হব। তন্মধ্যে যদি কোন একটি দুনিয়াতে নিশ্বাস ছাড়ে তবে দুনিয়াতে আর কিছুই উৎপন্ন হবে না। সেগুলো তাকে দংশন করে এবং ভূমিকে চেপে যাওয়ার জন্য হুকুম দেওয়া হয়। তখন তার উপর ভূমি এভাবে চেপে যায় যে, তার পাঁজরের হাঁড়গুলো একটা অপরটার ফাঁকে ঢুকে পড়ে।
(তারারানী (র) 'আল-আওসাতে' হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, কেবল ইবন লাহী আ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাকিব (র) বলেন, অন্য হাদীসের পোষকতায় ইবন লাহী আর হাদীস হাসান। কিন্তু যে হাদীস কেবল ইবন পাহী'আই বর্ণনা করেছেন, তাকে কম সংখ্যক লোকই প্রমাণ স্বরূপ গ্রহন করেছেন।)
كتاب الجنائز
فصل
5433- وَعَن أبي هُرَيْرَة رَضِي الله عَنهُ قَالَ شَهِدنَا جَنَازَة مَعَ نَبِي الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فَلَمَّا فرغ من دَفنهَا وَانْصَرف النَّاس قَالَ نَبِي الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم إِنَّه الْآن يسمع خَفق نعالكم أَتَاهُ مُنكر وَنَكِير أعينهما مثل قدور النّحاس وأنيابهما مثل صياصي الْبَقر وأصواتهما مثل الرَّعْد فيجلسانه فيسألانه مَا كَانَ يعبد وَمن كَانَ نبيه فَإِن كَانَ مِمَّن يعبد الله قَالَ أعبد الله ونبيي
مُحَمَّد صلى الله عَلَيْهِ وَسلم جَاءَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَالْهدى فَآمَنا بِهِ واتبعناه فَذَلِك قَول الله يثبت الله الَّذين آمنُوا بالْقَوْل الثَّابِت فِي الْحَيَاة الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَة إِبْرَاهِيم 72 فَيُقَال لَهُ على الْيَقِين حييت وَعَلِيهِ مت وَعَلِيهِ تبْعَث ثمَّ يفتح لَهُ بَاب إِلَى الْجنَّة ويوسع لَهُ فِي حفرته وَإِن كَانَ من أهل الشَّك قَالَ لَا أَدْرِي سَمِعت النَّاس يَقُولُونَ شَيْئا فقلته فَيُقَال لَهُ على الشَّك حييت وَعَلِيهِ مت وَعَلِيهِ تبْعَث ثمَّ يفتح لَهُ بَاب إِلَى النَّار وتسلط عَلَيْهِ عقارب وتنانين لَو نفخ أحدهم على الدُّنْيَا مَا أنبتت شَيْئا تنهشه وتؤمر الأَرْض فتضطم عَلَيْهِ حَتَّى تخْتَلف أضلاعه
رَوَاهُ الطَّبَرَانِيّ فِي الْأَوْسَط وَقَالَ تفرد بِهِ ابْن لَهِيعَة
قَالَ الْحَافِظ ابْن لَهِيعَة حَدِيثه حسن فِي المتابعات وَأما مَا انْفَرد بِهِ فقليل من يحْتَج بِهِ وَالله أعلم
صياصي الْبَقر قُرُونهَا
مُحَمَّد صلى الله عَلَيْهِ وَسلم جَاءَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَالْهدى فَآمَنا بِهِ واتبعناه فَذَلِك قَول الله يثبت الله الَّذين آمنُوا بالْقَوْل الثَّابِت فِي الْحَيَاة الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَة إِبْرَاهِيم 72 فَيُقَال لَهُ على الْيَقِين حييت وَعَلِيهِ مت وَعَلِيهِ تبْعَث ثمَّ يفتح لَهُ بَاب إِلَى الْجنَّة ويوسع لَهُ فِي حفرته وَإِن كَانَ من أهل الشَّك قَالَ لَا أَدْرِي سَمِعت النَّاس يَقُولُونَ شَيْئا فقلته فَيُقَال لَهُ على الشَّك حييت وَعَلِيهِ مت وَعَلِيهِ تبْعَث ثمَّ يفتح لَهُ بَاب إِلَى النَّار وتسلط عَلَيْهِ عقارب وتنانين لَو نفخ أحدهم على الدُّنْيَا مَا أنبتت شَيْئا تنهشه وتؤمر الأَرْض فتضطم عَلَيْهِ حَتَّى تخْتَلف أضلاعه
رَوَاهُ الطَّبَرَانِيّ فِي الْأَوْسَط وَقَالَ تفرد بِهِ ابْن لَهِيعَة
قَالَ الْحَافِظ ابْن لَهِيعَة حَدِيثه حسن فِي المتابعات وَأما مَا انْفَرد بِهِ فقليل من يحْتَج بِهِ وَالله أعلم
صياصي الْبَقر قُرُونهَا
হাদীসের ব্যাখ্যা:
১. উক্ত হাদীসের আলোকে এখন প্রশ্ন হল কবরের যিন্দেগী বলতে কি বুঝায়? বা যাকে কবরের মধ্যে দাফন করা হয় না, যার মৃতদেহকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয় বা শ্মশানে জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং দেহ ভস্মকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয়া হয় তাকে কি করে কবরের যিন্দেগীর বর্ণিত শাস্তি বা পুরস্কার দেয়া হবে?
কবরের আযাব সম্পর্কে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সে সম্পর্কে ব্যাখ্যাকারীগণ বলেন: কবরের আযাবের অর্থ, আলমে বারযাখের আযাব। মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত বিশাল যিন্দেগীকে বারযাখের যিন্দেগী বলা হয়। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তার উল্লেখ রয়েছে। সূরা 'আল-মুমিনুন'-এ বারযাখের যিন্দেগী সম্পর্কে বলা হয়েছে,
وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ -
"তাদের (মৃত ব্যক্তিদের) সামনে রয়েছে বারযাখ যা তাদেরকে পুনরত্থিত করা পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে।" (সূরা 'আল-মুমিনুন' - ১০০)
অর্থাৎ আল্লাহ্ মৃত ব্যক্তি ও দুনিয়ার মধ্যে এক পর্দা টেনে দেন-যার ফলে সে দুনিয়ার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে পারে না এবং কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করতে থাকে।
আলমে বারযাখের প্রমাণ সূরা ইয়াসীনেও রয়েছে। সত্যকথা বলার কারণে এক মুমিনকে তার জাতির লোকেরা হত্যা করে। মৃত্যুর পর আল্লাহ্ তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেন। বেহেশত লাভের পর তিনি তার জাতির জন্য মঙ্গল কামনা করতে থাকেন। বলা হয়েছে,
قِيلَ ادْخُلِ الْجَنَّةَ ۖ قَالَ يَا لَيْتَ قَوْمِي يَعْلَمُونَ (26) بِمَا غَفَرَ لِي رَبِّي وَجَعَلَنِي مِنَ الْمُكْرَمِينَ (27)
"তাকে বলা হলো, জান্নাতে প্রবেশ করো, সে বলে উঠলো হায়! আমার সম্প্রদায় যদি জানতে পারতো। (২৬) কিরূপ আমার প্রতিপালক আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিত করেছেন। (২৭)" (সূরা ইয়াসীন - ২৬-২৭)
মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত আছে। তোমাদের মধ্যে যার মৃত্যু হোক না কেন তাকে সকাল-সন্ধ্যা তার শেষ বাসস্থান দেখানো হয়। সে জান্নাতী কিংবা জাহান্নামী হোক তাকে বলা হয় কিয়ামতের দিন আল্লাহ কর্তৃক তোমার পুনরুত্থানের এ বাসস্থান হবে তোমার।
কিয়ামত অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তি আলমে বারযাখে অবস্থান করবে। তাই তার দেহ পানিতে ভাসুক বা মাটিতে নষ্ট হোক বা জ্বালানো হোক, তাতে কিছু আসে যায় না। সেখানে রূহ হয় শাস্তি, নয় আরাম উপভোগ করবে। মৃত্যুর সাথে সাথে যে সাওয়াল-জাওয়াব হয় তা আলমে বারযাখে হয়ে থাকে। মৃত ব্যক্তির রূহকে সাওয়াল করার জন্য আল্লাহ আলমে বারযাখে কবরের অবস্থা সৃষ্টি করতে পারেন। এবং সাময়িকভাবে রূহকে দেহের ভেতর রাখতে পারেন বা রূহ মনে করতে পারে যে, সে দেহের মধ্যে রয়েছে। দেহ ছাড়া রূহ কিভাবে সুখ-শান্তি অনুভব করবে তা 'স্বপ্ন' থেকে সহজে বুঝা যায়।
স্বপ্নে আমাদের রূহ দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ায় এবং আমাদের দেহ বিছানায় পড়ে থাকে। আলমে বারযাখে যে শাস্তি বা আরাম দেয়া হবে তা স্বপ্নের মত অনুভবের পর্যায়ে থাকবে না, বরং তা হবে বাস্তব। নেক লোকের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হবে এবং মন্দলোকের জন্য জাহান্নামের দরজা খুলে দেয়া হবে।
২. হাদীছে যে আয়াতটি উল্লেখ করা হয়েছে তা দ্বারা বোঝা যায়, যারা সুদৃঢ় কথা অর্থাৎ কালেমায়ে তায়্যিবার উপর ঈমান আনবে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দুনিয়ায়ও দীনের উপর মজবুত রাখবেন অর্থাৎ প্রকৃত ঈমানদার কোনও পরিস্থিতিতেই বিভ্রান্তির শিকার হবে না। বিপথগামিতার কোনও ডাকে তারা সাড়া দেবে না। এমনিভাবে কবর ও হাশর তথা আখিরাতের প্রতিটি ঘাঁটিতে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে অবিচল রাখবেন। কবরের প্রশ্ন ও হাশরের ময়দানের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, কোনও অবস্থায়ই তারা দিশেহারা হবে না। আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদেরকে সাহায্য করবেন। কবর আখিরাতের প্রথম ঘাঁটি। এখানে যে ব্যক্তি মুনকার নাকীরের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে, কবর তার জন্য জান্নাতের টুকরায় পরিণত হবে। এখানে যে শান্তি পেয়ে যাবে, পরবর্তী সকল ঘাঁটি তার জন্য আসান হয়ে যাবে। বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা তা বোঝা যায়। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে ওই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে শামিল রাখুন।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. কবরের সাওয়াল-জাওয়াব সত্য। এতে বিশ্বাস রাখা জরুরি।
খ. কবরে মুনকার-নাকীরের প্রশ্নের যাতে সঠিক উত্তর দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যে আমাদের কর্তব্য কালেমায়ে তায়্যিবার প্রতি অবিচল ঈমান রাখা এবং এর দাবি অনুযায়ী শরী'আত মোতাবেক জীবনযাপন করা। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাওফীক দিন।
কবরের আযাব সম্পর্কে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সে সম্পর্কে ব্যাখ্যাকারীগণ বলেন: কবরের আযাবের অর্থ, আলমে বারযাখের আযাব। মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত বিশাল যিন্দেগীকে বারযাখের যিন্দেগী বলা হয়। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তার উল্লেখ রয়েছে। সূরা 'আল-মুমিনুন'-এ বারযাখের যিন্দেগী সম্পর্কে বলা হয়েছে,
وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ -
"তাদের (মৃত ব্যক্তিদের) সামনে রয়েছে বারযাখ যা তাদেরকে পুনরত্থিত করা পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে।" (সূরা 'আল-মুমিনুন' - ১০০)
অর্থাৎ আল্লাহ্ মৃত ব্যক্তি ও দুনিয়ার মধ্যে এক পর্দা টেনে দেন-যার ফলে সে দুনিয়ার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে পারে না এবং কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করতে থাকে।
আলমে বারযাখের প্রমাণ সূরা ইয়াসীনেও রয়েছে। সত্যকথা বলার কারণে এক মুমিনকে তার জাতির লোকেরা হত্যা করে। মৃত্যুর পর আল্লাহ্ তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেন। বেহেশত লাভের পর তিনি তার জাতির জন্য মঙ্গল কামনা করতে থাকেন। বলা হয়েছে,
قِيلَ ادْخُلِ الْجَنَّةَ ۖ قَالَ يَا لَيْتَ قَوْمِي يَعْلَمُونَ (26) بِمَا غَفَرَ لِي رَبِّي وَجَعَلَنِي مِنَ الْمُكْرَمِينَ (27)
"তাকে বলা হলো, জান্নাতে প্রবেশ করো, সে বলে উঠলো হায়! আমার সম্প্রদায় যদি জানতে পারতো। (২৬) কিরূপ আমার প্রতিপালক আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিত করেছেন। (২৭)" (সূরা ইয়াসীন - ২৬-২৭)
মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত আছে। তোমাদের মধ্যে যার মৃত্যু হোক না কেন তাকে সকাল-সন্ধ্যা তার শেষ বাসস্থান দেখানো হয়। সে জান্নাতী কিংবা জাহান্নামী হোক তাকে বলা হয় কিয়ামতের দিন আল্লাহ কর্তৃক তোমার পুনরুত্থানের এ বাসস্থান হবে তোমার।
কিয়ামত অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তি আলমে বারযাখে অবস্থান করবে। তাই তার দেহ পানিতে ভাসুক বা মাটিতে নষ্ট হোক বা জ্বালানো হোক, তাতে কিছু আসে যায় না। সেখানে রূহ হয় শাস্তি, নয় আরাম উপভোগ করবে। মৃত্যুর সাথে সাথে যে সাওয়াল-জাওয়াব হয় তা আলমে বারযাখে হয়ে থাকে। মৃত ব্যক্তির রূহকে সাওয়াল করার জন্য আল্লাহ আলমে বারযাখে কবরের অবস্থা সৃষ্টি করতে পারেন। এবং সাময়িকভাবে রূহকে দেহের ভেতর রাখতে পারেন বা রূহ মনে করতে পারে যে, সে দেহের মধ্যে রয়েছে। দেহ ছাড়া রূহ কিভাবে সুখ-শান্তি অনুভব করবে তা 'স্বপ্ন' থেকে সহজে বুঝা যায়।
স্বপ্নে আমাদের রূহ দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ায় এবং আমাদের দেহ বিছানায় পড়ে থাকে। আলমে বারযাখে যে শাস্তি বা আরাম দেয়া হবে তা স্বপ্নের মত অনুভবের পর্যায়ে থাকবে না, বরং তা হবে বাস্তব। নেক লোকের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হবে এবং মন্দলোকের জন্য জাহান্নামের দরজা খুলে দেয়া হবে।
২. হাদীছে যে আয়াতটি উল্লেখ করা হয়েছে তা দ্বারা বোঝা যায়, যারা সুদৃঢ় কথা অর্থাৎ কালেমায়ে তায়্যিবার উপর ঈমান আনবে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দুনিয়ায়ও দীনের উপর মজবুত রাখবেন অর্থাৎ প্রকৃত ঈমানদার কোনও পরিস্থিতিতেই বিভ্রান্তির শিকার হবে না। বিপথগামিতার কোনও ডাকে তারা সাড়া দেবে না। এমনিভাবে কবর ও হাশর তথা আখিরাতের প্রতিটি ঘাঁটিতে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে অবিচল রাখবেন। কবরের প্রশ্ন ও হাশরের ময়দানের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, কোনও অবস্থায়ই তারা দিশেহারা হবে না। আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদেরকে সাহায্য করবেন। কবর আখিরাতের প্রথম ঘাঁটি। এখানে যে ব্যক্তি মুনকার নাকীরের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে, কবর তার জন্য জান্নাতের টুকরায় পরিণত হবে। এখানে যে শান্তি পেয়ে যাবে, পরবর্তী সকল ঘাঁটি তার জন্য আসান হয়ে যাবে। বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা তা বোঝা যায়। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে ওই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে শামিল রাখুন।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. কবরের সাওয়াল-জাওয়াব সত্য। এতে বিশ্বাস রাখা জরুরি।
খ. কবরে মুনকার-নাকীরের প্রশ্নের যাতে সঠিক উত্তর দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যে আমাদের কর্তব্য কালেমায়ে তায়্যিবার প্রতি অবিচল ঈমান রাখা এবং এর দাবি অনুযায়ী শরী'আত মোতাবেক জীবনযাপন করা। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাওফীক দিন।
১. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.) ২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)