সভ্যতা ও দ্বীন: জীবনের দুই পথ
সভ্যতা ও দ্বীন: জীবনের দুই পথ
الحمد لله نستعينه ونعوذ به من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلله فلا هادي له. ونشهد ان لا إله إلا الله ونشهد أن محمد عبده ورسوله.
فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم بسم الله الرحمن الرحيم، مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ.
وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إن أمة أمية لا نكتب ولا نحسب. أو كما قال عليه السلاة والسلام.
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। মানুষকে জীবন দিয়েছেন। জীবন হলো বিরাট এক সম্পদ। এই সম্পদের মহৎ এক বৈশিষ্ট্য হলো, সে অনবরত চেষ্টা করতে পারে। অনবরত চেষ্টা করতে পারার নামই বলা যেতে পারে জীবন। কেউ যদি জীবনের সংজ্ঞা বর্ণনা করতে গিয়ে বলে যে, চেষ্টা করতে পারা—তবে খুব ভুল বলা হবে না। যতদিন যতক্ষণ পর্যন্ত সে বেঁচে আছে, সে কিছু না কিছু চেষ্টা করতেই থাকে। জীবনের একেবারে শেষ মুহূর্তে শ্বাস নিতে পারছে না, তবুও প্রাণপণে চেষ্টা করেই যায় যে, যদি একটু বাতাস ভিতরে নেওয়া সম্ভব হয়। আর জন্ম হওয়ার পরের মুহূর্তেও তাই... ছোট বাচ্চা, শ্বাস নেয় বড় কষ্ট করে, আর চিৎকার করে ওঠে।
তো আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে জীবন দিয়েছেন। আর জীবন মানেই হচ্ছে চেষ্টা। আর চেষ্টা মানেই হলো, সে তার লক্ষ্যে কিছু একটা অর্জন করতে চায়। সুতরাং ভালো জীবন পাওয়ার জন্য চেষ্টা সবাই করে। এ ব্যাপারে মুমিন-কাফির, ভালো-মন্দ, সুস্থ-অসুস্থ, ধনী-গরিব... কোনো ধরনের কোনো পার্থক্য নেই—সবাই এখানে শরিক। সবাই ভালো জীবন পেতে চায়, সবাই ভালো জীবনের চেষ্টা করে।
দুটি ধারা: সভ্যতা ও দীন
এই যে ভালো জীবনের জন্য চেষ্টা করে.... মোটামুটি বলা যেতে পারে যে, এই চেষ্টার দুটো ধারা, দুটো প্রবাহ: একটিকে আমরা সাধারণত সভ্যতা বলি আর অপরটিকে দীন বলা যেতে পারে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ওপর বড় মেহেরবানি করেছেন আর আমরা এখানে এসেছি দীন বোঝার জন্য। আমরা বুঝব। শুধু বোঝার জন্যই বোঝা নয়; বরং যাতে দীনের ওপর চলতে পারি, চেষ্টা করতে পারি। অপরদিকে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সভ্যতা এবং সভ্যতার সাথে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের চেষ্টার সাথেও জড়িত করেছেন। আমাদের স্বাভাবিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট করেছেন। যারা পড়াশোনা ইত্যাদি করেন, তার লেখাপড়া ইত্যাদির মাধ্যমেও সভ্যতার সাথে জড়িত। সেহেতু আমরা দুটোর সাথেই জড়িত। এ দুটো আমাদের জীবনে বিভিন্নভাবে আসতে থাকে। এই বিষয়টি বুঝলে আমাদের হয়তো সুবিধা হতে পারে।
সভ্যতা: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই ভালো জীবন পাওয়ার চেষ্টার একটি ধারায় সভ্যতা দিয়েছেন। স্কুল-কলেজ ইত্যাদিতে ছোট ছেলেরা সভ্যতা এবং সভ্যতার ইতিহাস সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় পাঠ করেছে। আবার কখনো বিভিন্ন স্তরে এর বিন্যাস করা হয়েছে। যেমন, এক সময়কার মানুষদের সভ্যতার স্তরকে বলা হতো পাথর যুগ। আরেক সময়কে বলা হতো তাম্র যুগ। আরেক স্তরকে বলা হতো লোহার যুগ। আর আল্লাহ তায়ালা ভালো জানেন যে, পরবর্তী প্রজন্ম বর্তমান যুগকে কী বলবে। হয়তো অনেকদিন পরের প্রজন্ম কোনো নাম দেবে। বর্তমান সভ্যতার কোনো যুতসই নাম দিতে চাইলে তারা যে বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, সেগুলোর নাম দেবে। মোটামুটিভাবে এমন হতে পারে যে, জেট যুগ, এটম যুগ, ইলেকট্রনিক যুগ ইত্যাদি। এই সবগুলোই হলো বিভিন্ন জিনিসের জ্ঞান অর্জন করা এবং সেই জ্ঞানকে ব্যবহার করা। এর সাথে সব সভ্যতাগুলোই জড়িত এবং সে হিসাবেই এ নামকরণ হয়েছে।
পাথর যুগ যে সভ্যতাকে বলা হয়, সে সভ্যতার লোকদের কাজ ছিল পাথর কেটে আনা। 'জ্ঞান অর্জনে'র অর্থ কী? পাথর কেটে আনা কি মানুষ জানত না? জানত, দেখেছে; কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করেনি। যেরকম পথে সব ধরনের পথিকই হাঁটছে; কিন্তু একেকজনের লক্ষ্য করার ধরন একেক রকম। যে গাড়ির মেকানিক, তার চোখ সব গাড়ির দিকে যাবে না; তার চোখ ভাঙা গাড়ির প্রতিই যাবে। এ ধরনের গাড়িই তার নজরে পড়বে। যদি পরিচ্ছন্নতাকর্মী হয়, সে কার কী চেহারা দেখবে না; সে শুধু জুতা পরিষ্কার কি না, তাই দেখবে।
তো পাথর যুগ হলো সেটি, যে যুগে মানুষ পাথরের দিকে বিশেষভাবে তাকিয়েছিল। পাথরের বৈশিষ্ট্যগুলো ভালো করে প্রত্যক্ষ করেছে এবং সেই হিসাবে এর ব্যবহার করা শিখেছে। এর আগেও পাথর ছিল, কিন্তু এ ধরনের ব্যবহার ইত্যাদি জানত না। তো জিনিসকে জানা, এটিকে আমরা সাধারণত বিজ্ঞান বলে থাকি। ব্যবহার করা, এটিকে প্রযুক্তি বলি। এক কথায়: সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি। অতএব, পাথরকে চিনল—এটি বিজ্ঞানের অংশ; পাথরকে অস্ত্র বানাল—এটি প্রযুক্তির অংশ। জমিকে চিনল... মরুভূমিতে বীজ বপন করলে যেখানে কিছুই উৎপন্ন হবে না। নরম ভেজা মাটিতে বীজ বপন করলে অঙ্কুর গজায়—ইত্যাদি কৃষি সম্পর্কে জানল, এটি বিজ্ঞানের অংশ; বীজ বপন করাটা প্রযুক্তির অংশ।
তো এই জিনিসকে চেনা এবং ব্যবহার করাটা এটি সবসময় জড়িত। সে জন্য একেবারে প্রথম যামানা থেকেই বিজ্ঞানও আছে, প্রযুক্তিও আছে। যে মাটিকে চিনেছে, বীজ বপন করেছে... এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। পাথরকে চিনেছে, অস্ত্র বানিয়েছে, সেটি দিয়ে শিকার করেছে... এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি।
সভ্যতায় মানুষের চরিত্রের স্থান নেই
এ কথা যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, পাথর যুগের মানুষ কেমন ছিল? তারা কি ভালো মানুষ ছিল নাকি মন্দ মানুষ ছিল? তারা সৎ ছিল নাকি অসৎ ছিল? তারা কি অন্যের প্রতি দয়া করত নাকি স্বার্থপর ছিল? ইত্যাদি প্রশ্ন যদি কেউ করে তবে ঐতিহাসিকরা বলবে, এগুলো আমাদের গবেষণার বিষয় নয়। এগুলো ব্যক্তিগত বিষয়। পাথর যুগের মানুষ ভালো হতে পারে আবার মন্দও হতে পারে। সুতরাং সভ্যতা চিনতে গিয়ে প্রধান দৃষ্টি থাকে তাদের জিনিসপত্রের দিকে। ওই ঘুরে ফিরে গিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। অর্থাৎ, তাদের জিনিস গড়ার দক্ষতা কেমন ছিল আর ব্যবহার করার দক্ষতা কেমন ছিল।
যখন কোনো সভ্যতা আবিষ্কার হয়, তো বইপত্র লিখে অন্যদের নিকট পরিচিতি করানো হয়। সুতরাং এগুলোই দেখবে যে, ময়নামতি ইত্যাদিতে কী আবিষ্কার করেছে? তারা বাড়ি, রাস্তা, দীঘি, ইত্যাদি জিনিস তারা কীভাবে বানাতে পেরেছে?
মিসরের সভ্যতার উদাহরণ
মিসরের প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে গর্ব করা হয় যে, তারা মমি বানাতে পেরেছিল। মমি হলো লাশকে সংরক্ষণ করার বিশেষ প্রযুক্তি। এটি এমন এক প্রযুক্তি, এখন পর্যন্ত আধুনিক মানুষেরা এটিকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। আধুনিক মানুষদের সভ্যতা নিয়ে বড় গর্ব, বড় অহংকার; অথচ মমি সংরক্ষণের দক্ষতার প্রসঙ্গ এলে বিষয়টি পাশ কেটে অন্য দিকে চলে যায়। অর্থাৎ, এটি এতই লজ্জার ব্যাপার যে, নিজেরা তো এমনটি করতেই পারলাম না, আর ওরা যে কীভাবে করেছে, সেটিও বুঝে উঠতে পারলাম না। এটি তো বিজ্ঞানীদের জন্য মারাত্মক ধরনের একটা পরাজয়।
শুধু তাই নয়, তাদের পিরামিডগুলোর বিভিন্ন ধরনের থিওরি যে, পাথরগুলো আনল কেমন করে। এত ভারী পাথর, চূড়ায় উঠাল কেমন করে। শুনেছি, জাপানেও ওই ধরনের পিরামিড বানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। পিরামিডে কোনো সিমেন্ট জাতীয় কিছু নেই। পাথরের ওপর পাথর রাখা হয়েছে। মাঝখানে কত ভূমিকম্প, কত বন্যা কত কিছু হয়ে গিয়েছে। তো জাপানিরাও এরকম পিরামিড বানানোর চেষ্টা করেছে যে, টিকে কি না। তো সেই পিরামিড ভূমিকম্প বা বন্যা হওয়ার আগেই ভেঙে পড়ল অথচ মিসরের পিরামিডগুলো ভাঙে না।
গত জুন মাসে ছিলাম মিসরে। তো লক্ষ্য করেছি, পাথরগুলো আঁকাবাঁকা শেপের। এই শেপগুলো যেন ফিট করে—এর জন্য যদি হিসাব-নিকাশ এখনকার কম্পিউটার দিয়ে করা হতো তবে কম্পিউটারও হয়রান হয়ে যেত। তাহলে মিসরীয়রা কীভাবে করল? তো শেষ পর্যন্ত এর এটিই একটি থিওরি—যদিও এই থিওরি বিজ্ঞানীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়—এগুলো কোনো অশরীরি জিনরা করে দিয়েছে। কেননা এগুলো মানুষের সাধ্যের কাজ নয়।
কিন্তু ওখানে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, সেই যুগের মানুষ কেমন ছিল? এই ব্যাপারে কোনো বিস্তারিত উত্তর পাওয়া যাবে না। আর ঐতিহাসিকদের মধ্যে এই বিষয়ে কোনো কৌতূহলও নেই। পিরামিড কেমন করে বানিয়েছে, বা ফেরাউনের লাশগুলো কেমন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে যে, ওগুলো পচেও না, নিঃশেষও হয় না, কিছুই হয় না—এ ব্যাপারে গবেষণা চলছেই চলছে। কিন্তু সে জামানার মানুষের বৈশিষ্ট্য কী ছিল গুণাবলির দিক থেকে, তারা সুখী মানুষ ছিল নাকি দুঃখী মানুষ ছিল, তাদের পারিবারিক জীবন কেমন ছিল, তারা ভালো মানুষ ছিল নাকি মন্দ মানুষ ছিল, প্রতিবেশীদের সাথে তাদের আচরণ কেমন ছিল? গরিব-ধনীদের মধ্যে আচরণ কেমন ছিল, ধনীরা গরিবদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল কি ছিল না—এ ধরনের মানুষ সম্বন্ধে কোনো প্রশ্ন নেই। আর যদি এই প্রশ্নগুলো করা হয় তবে ঐতিহাসিকরা বলবে, এ ধরনের ফালতু চিন্তার জন্য আমরা এখানে আসিনি।
এ তো গেল এক সভ্যতা।
নবুওয়াতের সভ্যতা
আরেকটি সভ্যতা হলো, আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর প্রথম মানুষকে নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন; আর সভ্যতার প্রবাহ হতে বেশি দিন লাগেনি। আদম আলাইহিস সালাম-এর ছেলেদের মধ্যেই কৃষিকাজের দক্ষতা এসে গিয়েছিল। বীজ বপন করা, ফসল কাটা এগুলো এসে গিয়েছিল। আবার তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিবাদও হয়েছিল। তো সভ্যতার প্রবাহ—এটিও নতুন নয়; শুধু এক পুরুষের পার্থক্য। পিতা নবী ছিলেন। সভ্য জগতের সাথে বনবাসীদের সম্পর্ক ছিল বলে কোনো লক্ষণ পাওয়া যায় না। আর তাঁর ছেলেদের মধ্যেই সভ্যতার লক্ষণ দেখা গেছে। কৃষিকাজই হলো সভ্যতার আরম্ভ।
নবুওয়াতি মেহনত কী?
নবুওয়াতি মেহনত হলো মানুষকে উন্নত করা। মানুষ নিজেকে চেনা আর তার নিজের সৎ ব্যবহার বা শুদ্ধ ব্যবহার করা। জিনিসের জগতে যেমন দুটি স্তর: ১. জিনিসকে চেনা এবং ২. ব্যবহার করা। মাটিকে চেনা; তো শুধু চিনলেই হবে না, মাটিকে বুঝতে হবে এবং সে অনুযায়ী বীজ বপন করতে হবে। আবার এটিকে বাদ দিলেও হবে না। মাটির বৈশিষ্ট্য না বুঝে বীজ বপন করা যাবে না। করলে লাভ হবে না। আবার মাটির বৈশিষ্ট্য খুব বুঝল কিন্তু বীজ বপন করল না, তাহলে সে দার্শনিক হবে, বৈজ্ঞানিক হবে, কিন্তু এতে তো মানুষের পেট ভরবে না। পাথর চিনল কিন্তু পাথর দিয়ে কোনো অস্ত্র বানাল না, এতে তো কোনো শিকার হবে না। পাথর চিনল, এবং অস্ত্র বানাল, তবেই তো শিকার হবে।
সুতরাং মানুষের জীবনও এরকম যে, নিজেকে চিনতে হবে যে, আমার মধ্যে আল্লাহ তায়ালা কী কী সিফাত দিয়েছেন, আমার নিজের বৈশিষ্ট্যগুলো কী? আর সে আলোকেই নিজেকে ব্যবহার করা।
নিজেকে চেনা সবচেয়ে কঠিন
কাছের জিনিসগুলো চেনা বড় মুশকিল। যেমন চেহারা মানুষের অনেক কাছে তবুও নিজের চেহারা চেনা যায় না, বোঝা যায় না। পরবর্তী ধাপে পিতা-মাতার নিকট ছেলে-মেয়েদের চেনা বড় মুশকিল। ছেলে ভালো নাকি মন্দ, চোর নাকি দরবেশ—মা-বাবা কিছুই আন্দাজ করতে পারে না বেশি কাছে হওয়ার কারণে। তো মানুষের নিকট নিজের কাছের জিনিস চেনা বড় মুশকিল।
বর্তমান যুগে নানান ধরনের বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মধ্যে বেশ পিছিয়ে আছে চিকিৎসা বিজ্ঞান। আধুনিক চিকিৎসা জগতের সম্পূর্ণটা হলো, 'প্রচেষ্টা করে দেখি, হলেও হয়ে যেতে পারে' ধরনের। বাকি সেক্টরগুলো যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি এত পিছিয়ে নেই। এগুলোতে বেশ গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিসংগত থিওরি আছে; কিন্তু মানুষের চিকিৎসার ব্যাপারে থিওরি প্রায় নেই বললেই চলে।
ওপেন হার্ট সার্জারিতে হার্ট খুলে ঠিকঠাক করে আবার লাগিয়ে দেয়, ইলেকট্রিক শক দেয় সচল করার জন্য। তো এতে কিছু সচল হয় আবার কিছু সচল হয় না। যেটি সচল হলো, এটি কেন সচল হলো আর সেটি সচল হল না, সেটি কেন সচল হল না—এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। আর যেসব ওষুধ দেয়, যাকে ড্রাগস দেয়—সেগুলোতে কেন কাজ হয়, এর যে ব্যাখ্যা, এগুলো খুব ভালো ধরনের নয়। মূল কথা হলো, দিয়ে দেখি, কাজ করে কি না—এটুকুই, এরচেয়ে বেশি নয়। একটু ভালো করে যখন বুঝে যে, শরীরের ওপর তার প্রভাব পড়েনি, তখন ওগুলোকে নিষিদ্ধ করে দেয়।
এজন্য খুব বেশিদিন আগে যেতে হবে না... বিশ বছর আগের প্রেসক্রিপশন নিয়ে যদি বাজারে যান, তবে এর মধ্যে কিছু কিছু ওষুধ হয়তো আমাদের দেশে পেতে পারেন; কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকাতে ইতিমধ্যে এগুলো সব নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে এগুলো আর খাওয়া যাবে না। অর্থাৎ, যখন এর কার্যকারিতা সম্পর্কে জানতে পেরেছে, তখনই বুঝেছে যে, এগুলো ব্যবহার করা ঠিক নয়। আর ইতিমধ্যে বহুদিন ব্যবহার করা হয়ে গিয়েছে জানতে না পারার কারণে। অথচ অন্যান্য বিজ্ঞানগুলো এত অন্ধকারের মধ্যে নেই।
এর বড় একটি কারণ হলো, মানুষের স্বয়ং তার শরীরের সবচেয়ে কাছে। দূরের বিষয়গুলো সে যত সহজে বুঝতে পারে, নিজের শরীরের সবচেয়ে কাছেরটি তত সহজে বুঝতে পারে না। শরীর মোটামুটি স্থূল একটি জিনিস—মাপা যায়, পর্যবেক্ষণ করা যায়, তারপরও যদি তাকে চেনা এত কঠিন হয়... যেমন, মানুষের মন এতই সূক্ষ্ম যে, মানুষের মন বলতে কিছু আদৌ আছে কি নেই—এটি জানা বড় মুশকিল। তো এটিকে চেনা, এর ঠিকমতো ব্যবহার করা বড়ই কঠিন জিনিস।
আল্লাহর সহজীকরণ
সে জন্য আল্লাহ তায়ালা বড় মেহেরবানি করে মানুষের জন্য নিজের মন চেনার ব্যাপারে বেশি কিছু বলেননি। বিষয়টি যেন এমন যে, হাবাগোবা ছেলেকে এলজেব্রা চেনাতে গেলে যেমন বেশ গলদঘর্ম হতে হয়। তাই আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বেশি কিছু বলেননি। শুধু সহজ করে করণীয় বলে দিয়েছেন যে, তোমার প্রয়োজনানুযায়ী বিষয়টি আস্তে আস্তে বুঝে নেবে আর বেশি তত্ত্বতালাশের দরকার নেই। তবে যারা বেশি বুঝতে চায়, তাদের পথও রুদ্ধ করেননি। সেজন্য অল্পসল্প আভাস-ইঙ্গিতে কিছু কিছু কথা এখানে সেখানে বলেও দিয়েছেন। নফস সম্পর্কেও বলেছেন, রূহ সম্পর্কেও বলেছেন। আবার এ কথাও বলে দিয়েছেন, বেশি কিছু বুঝবে না। ইরশাদ করেছেন:
وَمَا أُوتِيتُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا
রূহ সম্পর্কে তারা জিজ্ঞাসা করে। এর সংক্ষিপ্ত একটি উত্তর দিয়েছেন। এরপর এ কথাও বলে দিয়েছেন, এরচেয়ে বেশি বোঝার চেষ্টা করে লাভ নেই। অর্থাৎ, সবদিকে সামলাতে হয়। একেবারে না বললেও মুশকিল, কারণ, সবাই জানতে চায়। আবার বোঝাতে গেলেও মুশকিল, বেশির ভাগ মানুষ হয়রান হয়ে যাবে। তো নফস কী, রূহ কী, এগুলো বোঝাই কঠিন। মানুষ তার সামান্য একটি শরীর, এটিকেই বুঝতে পারে না।
শরীরের মধ্যে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে তার জান। জান জিনিসটা কী? লাইফ জিনিসটি কী? এটি যারা গবেষণা করে, তাদেরকে যদি হয়রান করতে চাও, তবে জিজ্ঞাসা করবে, লাইফ কাকে বলে। অথবা কেমিস্ট্রিওয়ালাদেরকে জিজ্ঞাসা করবে যারা এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করে। তো দেখা যাবে, তারা অন্য প্রসঙ্গে যেতে চাচ্ছে। আমি নিজেও যদি চিন্তা করি, মনে হবে সহজেই তো বুঝি—জীবিত কী? মৃত কী? কিন্তু কোরবানির সময় গরু জবাই করার এক ঘণ্টা/আধা ঘণ্টা পরে চামড়া তুলে ফেলার পরেও দেখা যায় কিছু মাসল নড়াচড়া করছে। তাহলে এটি নড়ল কেমন করে? নিশ্চয়ই এর ভিতর লাইফ ছিল। এতক্ষণ তো একে মৃত মনে হয়েছে! অর্থাৎ, এগুলো যে শুধু কথার কথা, তাও নয়। কারণ, কোনো কিছু নাড়াতে হলে যথেষ্ট শক্তির প্রয়োজন। এ শক্তি কোথেকে এলো? এই শক্তি এতক্ষণ কোথায় ছিল?
নিজেকে শুদ্ধ করার পথ
মানুষের জন্য নিজেকে চেনা বড়ই কঠিন। আর চেনা যদি কঠিন হয়, তবে ব্যবহার করা তো আরও দুষ্কর। দুনিয়ার সব প্রযুক্তির মধ্যে বিজ্ঞান আগে আসে, প্রযুক্তি পরে আসে। চিনতে হয় আগে, ব্যবহার করতে হয় পরে। আর নিজেকে যদি চিনতেই না পারলাম, তাহলে ব্যবহার কীভাবে করব। এতো আরও কঠিন হয়ে গেল। আল্লাহ তায়ালা বড় সহজ করে দিয়েছেন। যে যতটুকু বুঝতে পারে, তারচেয়ে বেশি বুঝার জন্য বোঝা চাপিয়ে দেননি। অপরদিকে তার জীবন যাতে শুদ্ধ হয়ে যায়, সেজন্য তার সহজ করণীয় পথও শিখিয়ে দিয়েছেন।
নবীদের মেহনতের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের নিজের জীবনকে শুদ্ধ করা। প্রথমে যে প্রসঙ্গ বলেছিলাম, সভ্যতা। সভ্যতা নিজের লক্ষ্য নয়। আমার জীবন শুদ্ধ হওয়া হলো লক্ষ্য। বাকি সবকিছুকে আমি আমার পছন্দমতো ব্যবহার করি। আমরা কতকিছু জয় করি... আকাশ জয় করি, সমুদ্র জয় করি, এটাসেটা কতকিছু জয় করি। অর্থাৎ, দু-চারটি যুদ্ধ করলেই জয় উপভোগ করবে। কারণ, এগুলোকে নিজে ব্যবহার করে করে নিজের অনুগত বানানো। কিন্তু নিজের জন্য? সে নিজেই নিজের অনুগত। আর এ ব্যাপারে কোনো মেহনত ইত্যাদি কিছু করছে না।
বড় বড় বৈজ্ঞানিকদের ইতিহাস রয়েছে যে, তারা দুনিয়ার সবকিছু জয় করে ফেলেছে। অবশেষে নিজে গিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এমনটি অতীতেও ঘটেছে, ইদানীংও ঘটেছে। ইদানীং বলতে গত শতক ইত্যাদি। নোবেল প্রাইজ আবিষ্কার খুব বেশি দিনের নয়, কিছুদিন ধরে মানুষ পাচ্ছে। নোবেল প্রাইজ যারা পেয়েছেন, তারা তো বৈজ্ঞানিক। একবারে ছোটখাটো বিজ্ঞানী হলে তো আর নোবেল প্রাইজ পাবে না; সেই সব প্রাইজধারী বিজ্ঞানীরা নিজেকে জয় করতে পারেনি, আত্মহত্যা করেছে।
তো নিজেকে যদি আমি আনন্দ দিতে না পারলাম তাহলে আমার এই সবকিছু দিয়ে কী হবে। তার অবস্থা যেন এমন যে, বাজারের সব ভালো ভালো জিনিস আনল, দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তম বাবুর্চিও আনল, রান্নাবান্না সব ঠিকঠাক মতো হলো, শুধু খেতে পারল না। তো এই সব রান্নাবান্না দিয়ে কী হবে, যদি আমি খেতে না পারলাম, আমি ভোগ করতে না পারলাম! অতএব, আমি দুনিয়ার সবকিছু জয় করে ফেললাম; কিন্তু আমার নিজের মনকেই বুঝতে না পারি! মৃত্যুর পরের বিষয় তো পরের কথা, দুনিয়াতেই যদি আরাম-আনন্দ না পাই, তাহলে এ সবকিছুই তো বৃথা।
আল্লাহর ওয়াদা: দুনিয়া ও আখেরাতের সুখ
আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-কে পাঠিয়েছেন মানুষকে তার নিজের জীবন শুদ্ধ করার পথ দেখাতে আর দুটো জিনিসের ওয়াদা করেছেন, খুব সাদাসিধে ওয়াদা যে, ১. এই দুনিয়ার জীবনে তুমি সুখে থাকবে, ২. মৃত্যুর পরের জীবনে তুমি সুখে থাকবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ**
'যে নেক আমল করে এবং সে ঈমানদার চাই সে পুরুষ হোক বা নারী, আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করছেন, আমি নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই (বড় তাকিদের সাথে) তাকে ভালো জীবন দান করব। আর তার ভালো আমলের উত্তম প্রতিদান দেব।' [সূরা নাহল: ৯৭]
তো এ আয়াতে ইঙ্গিত হচ্ছে, দুনিয়ার ভালো জীবন এবং আখেরাতেরও ভালো জীবন; অর্থাৎ, দুনিয়া এবং আখেরাত—দুটোই। আর সাদাসিধে মানুষদের জীবন দেখলে এর প্রতিফলনও দেখা যায়। নেক মানুষ যারা... আখেরাতের বিষয়ে মানুষ ধারণা করে যে, ওখানে গেলে তো মানুষ সুখেই থাকবে আর দুনিয়াতেও দেখা যায়, তারা সুখে আছেন, হাসিখুশি আছেন। কোনো পেরেশানি নেই। খোশগল্প করছেন। আর এর বিপরীতে যে ব্যক্তি দীন থেকে দূরে, তার আখেরাতের বিষয়ে দুশ্চিন্তা তো আছেই, আর সাথে সাথে দুনিয়াবি বিষয়ে পেরেশানিতে ভুগছে।
আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-কে পাঠিয়েছেন মানুষকে তার জীবনের পথ দেখাতে যে, কীভাবে ভালো হওয়া যায়, কীভাবে দুনিয়া ও আখেরাতের উন্নতি করা যায়। এই পেরেশানি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
দক্ষতা ও শুদ্ধতার পার্থক্য
সভ্যতার দ্বিতীয় বিষয়টি হলো জিনিসকে ভালো ব্যবহার করতে পারা। জিনিস চেনা এবং এর ব্যবহার করা—এগুলোর সাথে জড়িত হচ্ছে দক্ষতা। দক্ষ কৃষক, দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, দক্ষ ডাক্তার। দক্ষ ডাক্তার, যে অন্যের চিকিৎসা করতে পারে। দক্ষ ডাক্তার কিন্তু নিজের চিকিৎসা করতে পারে না। আর চিকিৎসা জগতে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়ম যে, নিজের চিকিৎসা নিজে করে না। সুতরাং দক্ষতা সবসময় অন্যের দিকে ধাবিত হয়। সে যে ব্যাপারেই হোক না কেন।
চিকিৎসকরা নিজের চিকিৎসা তো করেই না; বরং নিজের ছেলেমেয়েদের চিকিৎসাও করে না। ছোটখাটো সর্দি-কাশি যদি হয় তবে হয়তো করতে পারে; কিন্তু যদি বড় হার্ট প্রবলেম জাতীয় কোনো রোগ হয়, আর সেটি যদি হয় তার নিজের স্ত্রীর বা সন্তানের, তবে অন্য ডাক্তারের নিকট পাঠিয়ে দেয়।
এর বিপরীতে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম যে মেহনত নিয়ে এসেছেন, ওই মেহনতের প্রথম লক্ষ্য হলো স্বয়ং নিজ সত্তা। স্বয়ং নিজকে সংশোধন করা। আর এখানে ওই 'দক্ষতা' শব্দটি ব্যবহার করা হয় না; বরং 'শুদ্ধতা' ব্যবহার করা হয়। আমার আচরণ শুদ্ধ কি না, ঠিক কি না, ভালো কি না। এখানে এসে দুটো পথ আলাদা হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের ভালো জীবন জড়িত করেছেন তার নিজের জীবনের শুদ্ধতার সাথে।
দক্ষতা ও সম্পদের ধাঁধা
তবে মানুষ দক্ষতা কেন অর্জন করতে চায়? এটি ধাঁধার মতো। ধাঁধাটি কী? দক্ষতার মাধ্যমে সাধারণত সম্পদ এবং খ্যাতি পাওয়া যায়। দক্ষতা দিয়ে সম্পদ উপার্জন করা যায় আর খ্যাতি দিয়ে মান-সম্মান অর্জন করা যায়। মানুষের ধারণা, যদি এ দুটো পাওয়া যায় তবে আমি সুখী হব। সম্পদের মাধ্যমে সুখি হব; খ্যাতির মাধ্যমে সুখি হব। দক্ষতা দিয়ে এ দুটোই পাওয়া যায়—সম্পদও পাওয়া যায়, খ্যাতিও পাওয়া যায়।
এর মোকাবেলায়, শুদ্ধতা দিয়ে, ভালো আচরণ দিয়ে—সব অর্থে ভালো, ইংরেজিতে যাকে গুডনেস বলে—ভালো মানুষ হওয়া যায়। আর তিনি আল্লাহর নজরেও ভালো। মানুষের নজরেও ভালো। তবে ভালো মানুষ, যার গুডনেস দিয়ে টাকা উপার্জন করা যায় না, খ্যাতিও অর্জন করা যায় না; কিন্তু মানুষের মন জয় করা যায়, আল্লাহও সন্তুষ্ট হন, বান্দাও সন্তুষ্ট হয়। কাছের মানুষেরা তাকে ভালোবাসে। বলে, তিনি বড় ভালো মানুষ। এ কথা বলে বলে তার জন্য চোখের পানি ফেলে। তবে এটি কোনো পত্রিকা ছাপানোর মতো বিষয় হয় না।
এরপরও মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের জন্য ভালো জীবন চায়। অথচ মানুষ ধাঁধার মধ্যে পড়ে মানুষ সম্পদ আর খ্যাতির পিছনে দৌড়ায় আর শয়তান তাকে পেরেশান রাখতে চায়। কোনো জিনিস পাওয়ার আগ পর্যন্ত মনে হতে থাকে, কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি পেলে বড় ভালো হতো। আর যখনই পেয়ে যায়, তখন তার থেকে তার মন উঠে যায়। সম্পদের ব্যাপারেও তাই, খ্যাতির ব্যাপারেও তাই।
সম্পদ পাওয়ার আগে মনে হতো যে, পেলে কত ভালো হতো। আর পাওয়ার পরে সুর বদলে যায়। ধনীরা বলে, গরিবরাই আরামে আছে; কিন্তু তখন যদি তাকে বলা হয় যে, গরিব হওয়া তো কোনো কঠিন বিষয় নয়। তোমার যা কিছু সম্পদ আছে, সব দান করে দিলেই তো গরিব হয়ে যেতে পার! আর দান করার জন্য যদি মানুষ না পাও তবে আমি নিতে রাজি আছি! সব আমাকে দিয়ে তুমি গরিব হয়ে যাও! দেখবেন, তখন সে সুর বদলে ফেলছে। অর্থাৎ, দ্বিধার মধ্যে আছে। যখন বলেছে, গরিবরাই ভালো আছে, তো অনেকটা বিশ্বাসের সাথেই বলছে। অনেকটা.... কিন্তু সম্পদ ত্যাগ করার এই সিদ্ধান্ত সে নিতে পারছে না।
তো আল্লাহ তায়ালা দীন দিয়েছেন আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর মাধ্যমে। আর এর লক্ষ্য হচ্ছে 'আমি যেন শুদ্ধ হই।'
কুমারের উদাহরণ
আমি শুদ্ধ আর আমার কাজ দক্ষতার সাথে করা—এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। একজন কুমার (যে মাটি দিয়ে তৈজসপত্র তৈরি করে) বড় দক্ষ কুমার। সে যে পাতিল বানিয়েছে, সেটি বড়ই সুনিপুণ হয়েছে। কোনো আঁকাবাঁকা নেই অর্থাৎ, একেবারে মসৃণ, গোলাকার, শক্তপোক্ত যে, ভেঙে যায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। পাতিল বড়ই শুদ্ধ হয়েছে। পাতিলের বাজারে দাম হবে। আর নিজে যদি অশুদ্ধ হয় তবে তার কোনো কদর হবে না। এই পাতিল কেউ কিনে নেওয়ার পরে যদি ভেঙে যায়, তবে দুঃখ করবে যে, এত সুন্দর পাতিল ভেঙে গেল। আর নিয়ে যাওয়ার পরে যদি খবর পায় যে, যে কুমার বানিয়েছিল, সে মারা গিয়েছে। তবে বলবে, তাতে আমার কী!
তো পাতিল ভেঙে যাওয়ার কারণে যে পরিমাণ দুঃখ করত, পাতিল তৈরিকারী কুমার মরে যাওয়ার কারণে সে পরিমাণ দুঃখ তো করবেই না; বরং যদি খুবই ভালো পাতিল হয় তবে একটু খুশি হবে যে, আমার পাতিলের দাম আরও বেড়ে গেল। কারণ, এ জাতীয় পাতিল যে বানাত সে তো মরে গিয়েছে। এখন এরকম পাতিল আর কেউ বানাতে পারবে না। সুতরাং আমার পাতিলের দাম আরও বেড়ে গেল। কারণ, যদি সেই কুমার বেঁচে থাকত তবে এরকম ভালো পাতিল সে আরও বানাত আর আমার পাতিলের দাম কমে যেত।
এর বিপরীতে, একজন লোক বড় ভালো মানুষ; কিন্তু সে কাজে দক্ষ নয়। সেও পাতিল বানিয়েছে। লোকটি ভালো, এ জন্য তার সাথে মানুষের সম্পর্ক আছে, মানুষ তাকে ভালোবাসে। ওর বানানো পাতিল যদি ভেঙে যায়, তবে বলবে, এক পাতিল ভেঙেছে তো কী হয়েছে, আরও কত পাতিল আসবে—অর্থাৎ, এ বিষয়ে কোনো ভ্রূক্ষেপই করবে না। আর যদি সে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তবে তার খোঁজখবর নেবে, তার যত্ন নেবে যতক্ষণ সে জীবিত থাকবে। এমনকি যদি মারাও যায় তবে তার জন্য দোয়া করবে। ক্ষেত্রবিশেষে খোঁজখবরও নেবে যে, তার কোনো ঋণ ছিল কি না। যদি থাকে, তবে তার পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ করে দেবে। তার জন্য দোয়া করবে।
আল্লাহর কাছে মাকবুল হওয়ার মেহনত
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন ওই মেহনতের জন্য, যে মেহনতে ওই মানুষটি আল্লাহর কাছে মাকবুল হয়। আর যখন আল্লাহর কাছে মাকবুল হবে, তখন সে মানুষের কাছেও প্রিয় হয়ে যাবে।
মানুষের উপর আল্লাহ তাআলার যত ইহসান আছে, যত মেহেরবানি আছে, সেসব মেহেরবানির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইহসান আল্লাহ তাআলা মানুষের উপর করেছেন যে, মানুষকে নিজের রুচি দিয়ে দুনিয়ায় সৃষ্টি করেছেন। আদম আলাইহিস সালামের ভেতর নিজের রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। ইরশাদ করেছেন:
فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُّوحِي
অর্থ: 'আদম আলাইহিস সালামকে যখন সৃষ্টি করলাম, তাঁর ভেতরে আমি আমার প্রাণ বা রূহ ফুঁকে দিলাম।'
এর একটি অর্থ এটিই হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা যা কিছুকে ভালো জানেন, মানুষও স্বভাবগতভাবে ওই জিনিসগুলোকে ভালো জানবে। আর আল্লাহ তাআলার কাছে যেসব জিনিস অপছন্দ, মানুষের কাছেও স্বভাবগতভাবে সেসব জিনিস অপছন্দ।
নাপাকি ও পবিত্রতার উদাহরণ
একজন মুত্তাকি লোক নামাজ পড়তে যাচ্ছেন। রাস্তায় একটি মরা কুকুর পড়ে ছিল। পাশ দিয়ে গাড়ি যাওয়ার সময় সেই মরা কুকুরের পচা নাপাকি ছিটকে এসে তাঁর গায়ের জামায় ভরে গেল। এতে তাঁর খুব খারাপ লাগল। তাই বাড়িতে ফিরে গিয়ে এসব ধুয়ে দিচ্ছেন। কেন? কারণ এগুলো নাপাক। এই অবস্থায় নামাজ হবে না, এজন্য ধুয়ে দিচ্ছেন।
এর বিপরীতে আরেকজন ব্যক্তি নামাজি নয়, হয়তো সে মুসলমানও নয়। তার গায়েও সেই মরা কুকুর থেকে নির্গত নাপাকি গাড়ির চাকায় লেগে ছিটকে এসে জামা ভরে গেল। সেও বাড়ি ফিরে সেগুলো ধুয়ে দিচ্ছে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তুমি এগুলো কেন ধুয়ে দিচ্ছ? তার উত্তরের ভাষা হয়তো ভিন্ন হবে। কারণ, সে নাপাকি শব্দটি জানে না। তাই সে নাজিসও বলল না, নাপাকিও বলল না। তবে সে বলল, আমার ঘৃণা লাগে।
অর্থাৎ, কাজ কিন্তু সেই একই। সুতরাং যে জিনিসটিকে নাপাকি বলা হয়, নাজিস বলা হয়, সেই একই জিনিস আল্লাহ তাআলা তার মনে রেখেছেন ঘৃণার নামে। শব্দ ভিন্ন। এই বিষয়টি মানুষ, অর্থাৎ মুমিন ফাসেক, কাফের, মুশরিক—সবার মাঝেই আল্লাহ তাআলা লিখে দিয়েছেন ঘৃণার নামে। সবার মনের ভেতরে এই একই হুকুম।
নেক আচরণ ও আদব
নেক আচরণ আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন। মানুষও নেক আচরণ ভালোবাসে। সেজন্য আল্লাহ তাআলা যাদেরকে পছন্দ করেন, স্বাভাবিকভাবে মানুষও তাদেরকে পছন্দ করে।
কিছুদিন আগে এখান থেকে চিল্লার জামাত গিয়েছিল। সেখানে আমাদের এক সাথী ছিল। মিরাঠ অঞ্চলের জামাত ছিল। জামাতের যে আমির তিনি বলছিলেন, কোনো এক জায়গায় ট্রেনের টিকিট কিনতে গিয়েছেন। ট্রেনের গন্তব্য স্টেশনের নাম হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া স্টেশন।
তিনি কাউন্টারে গিয়ে নাম সংক্ষিপ্ত করে বললেন, নিজামুদ্দিনের জন্য একটি টিকিট দিন! যিনি টিকিট বিক্রি করছে, তিনি তার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে অন্যদের থেকে টাকা নিচ্ছে, টিকিট দিচ্ছে। তিনি আবার বললেন, নিজামুদ্দিনের একটি টিকিট দিন! কিন্তু বিক্রেতা তাঁর দিকে তাকাচ্ছে না, উপেক্ষা করে অন্যদেরকে টিকিট দিচ্ছে।
অতঃপর সম্ভবত চতুর্থবার তিনি বললেন, হযরত নিজামুদ্দিনের জন্য আমাকে একটি টিকিট দিন! তখন টিকিট বিক্রেতা বলল, "আব ঠিক বোলা।" এবার তাঁর দিকে তাকাল এবং টিকিট বিক্রি করল। অর্থাৎ এতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর উপস্থিতির কোনো স্বীকৃতি দেয়নি যে, যে লোক আদব জানে না, তার সাথে আমি কী কথা বলব। অথচ যে টিকিট বিক্রি করছে, সে সম্ভবত মুসলমানও নয়। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যাকে ভালোবাসেন, মানুষ জেনে হোক আর না জেনে হোক তাকে ভালোবাসে।
হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহির ঘটনা
বাদশাহ আবদুল মালিক গুণী বাদশাহ ছিলেন। তাঁর পরে হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি খলিফা হলেন। তিনি বড় আল্লাহওয়ালা ছিলেন। আবদুল মালিক বাদশাহ থাকাবস্থায় অনেক সরকারি সম্পত্তি জনগণকে জায়গির হিসেবে দিয়েছিলেন। সেগুলো তারা ভোগ করছিল। উমর ইবনে আবদুল আজিজ ক্ষমতায় আসার পরে এগুলো ফিরিয়ে নিলেন। যার ফলে অনেক ধনী লোকদের সম্পদ হাতছাড়া হয়ে গেল।
যদিও সে সম্পদ মূলত তাদের ছিল না, কিন্তু পূর্বের বাদশাহ তাদেরকে জায়গির হিসেবে দিয়ে রেখেছিলেন। উমর ইবনে আবদুল আজিজ মসনদে বসে সেগুলো নিয়ে নিলেন। তিনি স্বল্পসময় ক্ষমতায় ছিলেন, মাত্র আড়াই বছরের মতো। আল্লাহ তাআলা এই আড়াই বছরে তাঁকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নিয়েছেন।
এরপর পরবর্তীতে নতুন বাদশাহ এসে আবার সবকিছু আগের মতো করে দিল। এজন্য এক লোক এসে বাদশাহকে বলল, বাদশাহ আবদুল হামিদ আমাকে অমুক জায়গির দিয়েছিলেন। হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি সেগুলো আমার থেকে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। আপনি আমাকে সে জায়গির আবার ফিরিয়ে দিন!
তো যিনি বাদশাহ ছিলেন, তিনি খুব আল্লাহওয়ালা ছিলেন না, তবে বাদশাহি মেজাজের ছিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কী বললেন? তো লোকটি আবার বলল যে, বাদশাহ আবদুল হামিদ আমাকে অমুক জায়গির দিয়েছিলেন। হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি সেগুলো ফেরত নিয়েছিলেন। আপনি আমাকে সে জায়গির আবার ফিরিয়ে দিন!
বাদশাহ তৃতীয়বার বললেন, আপনি কী বললেন, সেটি আবার বলুন? তো সেই ব্যক্তি আবার বলল, বাদশাহ আবদুল হামিদ আমাকে অমুক জায়গির দিয়েছিলেন। হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি সেগুলো ফেরত নিয়েছিলেন। আপনি আমাকে সে জায়গির আবার ফিরিয়ে দিন!
তিনবার শুনে কথাটি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হওয়ার পর বললেন, তুমি তিনবার আবদুল মালিকের নাম নিলে, কিন্তু একবারও তুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললে না। না তাকে সম্মান দেখালে, না তার জন্য দোয়া করলে। আর এরপর তুমি তিনবার আবদুল আজিজের নাম নিলে, আর তিনবারই তুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললে। সম্মানও দেখালে, দোয়াও করলে। যাও! জায়গির তুমি পাবে না।
অর্থাৎ, যার কাছে সে এতবড় সম্পত্তি পেল, তাকে সে সম্মান দেখাল না, তার জন্য দোয়াও করল না। আর যে তাকে ফকির বানাল, তার সম্পদ ছিনিয়ে নিল, তার নাম যতবার নিয়েছে, সেখানে তাকে সম্মানও দেখাল, তার জন্য দোয়াও করল।
কুরআনের আয়াত
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে ওই আহকামগুলো লিখে দিয়েছেন, সেগুলো আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য আসমানি কিতাবের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন। সবগুলো না হলেও বেশিরভাগ দিয়েছেন। এজন্য নেক আমলের কারণে আল্লাহ তাআলা মানুষকে ভালোবাসেন, সেসব নেক আমলের কারণে মানুষও মানুষকে ভালোবাসে। ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا
অর্থ: 'যারা ইমান এনেছে এবং নেক আমল করে, আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে তাদের জন্য মহব্বত ঢেলে দেন।'
আর এই একই বৈশিষ্ট্যের কারণে অর্থাৎ, ইমান এবং নেক আমলের কারণে আল্লাহ তাআলা নিজেই ভালোবাসেন। এই ইমান এবং আমলের কারণে আল্লাহ তাআলা অন্যের অন্তরে তার ভালোবাসা ঢেলে দেন। (সুবহানাল্লাহ।) সুতরাং সে মাহবুব (প্রিয়ভাজন) হয়ে যায়।
মহব্বতের গুরুত্ব
আর দুনিয়ায় ভালো জীবন পাওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন যে জিনিসের, সেটি হচ্ছে মহব্বত। সভ্যতা দক্ষতা অর্জন করে, আরাম দেয়। এগুলো যে ঠেলে দেওয়ার জিনিস—তা নয়; বরং এগুলোর মূল্য আছে, গুরুত্ব আছে; কিন্তু মানুষ যতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, ঠিক ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আমাদের জীবনই এগুলোর ছোটখাটো প্রমাণ। ছেলেদেরকে অনেক সময় রচনা লিখতে বলা হয় যে, তোমার আনন্দের ঘটনা বলো। তোমার সফরের কথা লেখ ইত্যাদি। তখন অনেক ছেলে এসব আনন্দের ঘটনার বর্ণনা শুরু করে ঠিক এভাবে, 'আমরা বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়স্বজন মিলে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলাম...'
তো এই আনন্দময় সফরের বর্ণনায় আরামের চেয়ে কষ্টের বর্ণনাই থাকে বেশি। ট্রেনে ভিড় ছিল... বসার জায়গা ছিল না... আমাদের সারারাত জেগে থাকতে হয়েছিল... ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ তার রচনার বিষয়বস্তু ছিল 'আনন্দের সফর।'
অর্থাৎ, সে তো আনন্দের সফর বর্ণনা করছে কিন্তু বিষয়বস্তুতে সব বর্ণনা কষ্টের। মূলত এর ভেতর দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাকে ঠিকই আনন্দ দিয়েছেন আর এটি সে বিশ্বাসও করে। অর্থাৎ, শরীরে যদিও আনন্দ ছিল না; কিন্তু সবার সাথে মহব্বত থাকার কারণে ওই ভিড়ের মধ্যে না খেয়ে, সারারাত জেগে থেকে সে আনন্দ পেয়েছে।
এর মোকাবেলায় বড় কষ্টের সফরের বর্ণনা ছিল ঠিক এরকম, 'শীতের কোনো এক রাত ছিল। বড় খুশি মনে ট্রেনে উঠে বসেছি। কিন্তু কম্পার্টমেন্টে গিয়ে দেখলাম, যার বিরুদ্ধে মামলা লড়ছি, সে আমার মুখোমুখি আসনে বসে আছে। আমরা দুজনই শহরের সম্ভ্রান্ত ঘরের। উভয়েই হাসিখুশি। আমরা পরস্পরে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করি। গল্পস্বল্প সবই হচ্ছে; কিন্তু উভয়েরই মনের ভেতর জ্বালা যে, দুনিয়ায় এত মানুষ থাকতে এই আপদ কেন এখানে আসল!'
অর্থাৎ, কেউ কাউকে মারল না, ধরল না, গালিগালাজও করল না; বরং অতি ভদ্র ব্যবহার করল। কিন্তু উভয়ে অপরজনকে মুসিবত মনে করে সারা রাস্তা অতিবাহিত করল। কারণ কী? কারণ সম্পর্ক খারাপ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেহনত
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন মানুষকে ওই গুণে গুণান্বিত করার জন্য যে গুণ স্বয়ং আল্লাহ ভালোবাসেন। ইরশাদ হয়েছে:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ
অর্থ: 'যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন।' (সূরা আলে ইমরান: ৩১)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণের সবটা জুড়েই ছিল নিজেকে সুন্দর বানানো। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো দক্ষতার জ্ঞান নিয়ে আসেননি। দক্ষতার উপকারিতা অস্বীকার করেননি; কিন্তু নিজেও জড়িত হননি।
খেজুর চাষের ঘটনা
হিজরত করে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনায় গেলেন, দেখলেন মদিনার মানুষ কৃষিকাজ করে থাকে। তাদের খেজুরের বাগান ছিল। খেজুর চাষে একটি বিশেষ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হতো যে, খেজুরের নর ও মাদি গাছ আলাদা আলাদা থাকত। ধান-গম ইত্যাদির সবকিছুতেই নর মাদি থাকে। তবে এগুলো মিশানো অবস্থায় থাকে।
জীবজগতেও কিছু কিছু প্রাণী আছে, তাদের নর-মাদি এক সাথে থাকে। কিন্তু খেজুরের মধ্যে এই নর গাছ, আর মাদি গাছ আলাদা। তো এখানে নর গাছকে মাদি গাছের সাথে মিশিয়ে দিতে হয়, তাতে পরাগায়ন ভালো হয়। আর এতে ফসলও ভালো হয়। এটাকে তা'বিরে নখল বলে।
তো রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে এমনটি করতে দেখলেন। তিনি এ বিষয়ে পূর্ব থেকে জানতেন না, সেহেতু এটি তাঁর কাছে নতুন জিনিস ছিল। কৌতূহল ছিল যেমন আমরা এদিকে তাকাই, ওদিকে তাকাই, পত্রিকা পড়ি। তো তিনিও জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এমনটি কেন করো? তারা বিস্তারিত বলল।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিক্রিয়া থেকে তাদের ধারণা হলো, এই বিষয়টি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঠিক পছন্দ করছেন না। এটি তাদের ধারণা ছিল, নিশ্চিত না। এই ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে পরের মৌসুমে তারা এই তা'বিরে নখল করলেন না।
আর এই তাবির না করাতে ফসলও কম উৎপন্ন হলো। এ ঘটনাটি যখন রাসূল (সা.) জানতে পারলেন, তখন তিনি বললেন, "এই সমস্ত দুনিয়াবি কাজ তোমরা যেভাবে জানো সেভাবেই করবে।" অর্থাৎ, তিনি আদেশও দিলেন না, আবার নিষেধও করলেন না। তিনি স্বয়ং এর সাথে জড়িতও হলেন না।
আল্লাহ তাআলা রাসূলে কারীম (সা.)-কে মুআল্লিম তথা শিক্ষক হিসেবে পাঠিয়েছেন। "তোমরা যেভাবে জানো সেভাবেই করবে" - এটি শিক্ষকের মতো কথা নয়।
রাসূলে কারীম (সা.) তাহলে কীসের শিক্ষক?
তিনি উৎপাদনের শিক্ষক নন; বরং তিনি নিজেকে সুন্দর বানানোর শিক্ষক। মানুষ নিজে কীভাবে ভালো হবে - সম্পূর্ণ মেহনত তিনি এই জিনিসের উপরই করেছেন। অন্য জিনিসের সাথে জড়িত হননি।
আর এই সম্পূর্ণ ঘটনাটা আল্লাহ তাআলা এজন্য ঘটালেন যাতে রাসূল (সা.) শেষ পর্যন্ত এই কথাটি বলেন। প্রথমে প্রত্যক্ষ করা, জিজ্ঞাসা করা, জানতে পারা, অপছন্দ করা, ফসল কমে যাওয়া... এই সবকিছুর মাধ্যমে ময়দান প্রস্তুত করা হচ্ছিল শেষ ওই কথাটির জন্য যে, "তোমরা যেভাবে জানো সেভাবেই করো।" অর্থাৎ, আদেশও দিলেন না, নিষেধও করলেন না, জড়িতও হলেন না।
এজন্য বলা যেতে পারে যে, নবীরা সভ্যতার পথ বন্ধ করেননি; কিন্তু নিজে এর সাথে জড়িতও হননি।
একটি উদাহরণ: রাজবাড়ির দৃষ্টান্ত
প্রয়োজনীয় সব কাজ করা যায়; কিন্তু তা নিজের শানের খিলাফ। ড্রেন পরিষ্কার করা - রাজবাড়ির রাজা এ কথা বলবেন না যে, "এটি তো রাজমহল, সুতরাং এখানে যেন ড্রেন পরিষ্কার না করা হয়।" এমন কথা বলবেন না; কিন্তু এজন্য নিজের ছেলেকে ড্রেন পরিষ্কার করার কাজে নিয়োজিতও করবেন না, আবার নিজেও করবেন না।
আবার এ কথাও বলবেন না যে, "এটি রাজবাড়ি, তাই এখানে ধোপাগিরি চলবে না।" কিন্তু আবার নিজেও ধোপাগিরি করবেন না, আবার ছেলেকেও নিয়োজিত করবেন না।
সুতরাং অনেকগুলো করণীয় জিনিস আছে, যার উপকারিতা স্বীকার করা হয়। তাই বলে আমি নিজেই করবো - তা কিন্তু নয়।
সুলাইমান (আ.)-এর নির্মাণকাজ
নানান ধরনের জিনিস থেকে ফায়দা নেওয়া নবীরাও করেছেন; কিন্তু ঠিক নবুওয়াতের অংশ নয়, অর্থাৎ শানের খিলাফ।
সুলাইমান (আ.) নির্মাণকাজ করলেন। বিশাল বায়তুল মাকদিস মসজিদ বানালেন। দুনিয়াবি কাজগুলোর মধ্যে কিছু কাজ, বিশেষ করে নির্মাণকাজ, মানুষের অন্তরকে মৃত বানিয়ে দেয়। বলা হয়, নির্মাণকাজ দিলকে মেরে ফেলে। নির্মাণকাজ মানুষের রুহানি যোগ্যতা ইত্যাদি নষ্ট করে দেয়। সেজন্য আল্লাহওয়ালারা আলিশান বাড়ি নির্মাণ ইত্যাদিকে অপছন্দ করে থাকেন।
অথচ সুলাইমান (আ.) আল্লাহর আদেশে মসজিদ নির্মাণ করছিলেন। তো তিনিও নির্মাণকাজ করছিলেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁর জান কবজ করে নিলেন; কিন্তু কাজটি ঠিকই করালেন, অথচ তিনি মৃত অবস্থায় ছিলেন।
সেজন্য আল্লাহওয়ালারা বলে থাকেন - এর সমর্থনে কোনো হাদিস বা নস আছে কি না, উলামারা ভালো বলতে পারবেন - নির্মাণকাজ হলো মুর্দা দিলের লক্ষণ। বড় বড় আলিশান মহল বানাচ্ছেন, এগুলো হলো মুর্দা দিলের লক্ষণ। সুলাইমান (আ.) বড় মসজিদ নির্মাণ করেছেন, অথচ তিনি নিজে ছিলেন মুর্দা। জীবিত অবস্থায় আরম্ভ করেছিলেন আর নির্মাণকাজ চলাবস্থায় ইন্তেকাল করেন। অথচ জিনরা বুঝতেই পারেনি যে তিনি ইতিমধ্যে ইন্তেকাল করে ফেলেছেন।
এরপর নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর জিনরা জানতে পারলো যে তিনি বহু পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন। তখন তারা আফসোস করে বলতে লাগলো যে, "হায়! আগে যদি জানতাম তিনি মারা গেছেন, তাহলে এই খাটুনিটা করতাম না।" তার মানে তাদের কোনো ইখলাস ছিল না। ঠেকায় পড়ে কাজগুলো করেছে।
ইখলাসের গুরুত্ব
দুনিয়ার কাজে আভ্যন্তরীণ সিফাত ইত্যাদি চাওয়া হয় না, বিনা ইখলাসে করলেও হয়ে যাবে। আর এভাবে দুনিয়াবি দক্ষতা অর্জন হবে; কিন্তু ইখলাস ছাড়া আল্লাহর কাছে মকবুল হবে না, আর ইখলাস ছাড়া মানুষ মানুষের কাছেও মকবুল হবে না।
"অমুকে আমার খুব উপকার করলো; কিন্তু সে আমার উপকার করতে চায়নি। ঘটনাক্রমে হয়ে গিয়েছে।" - ওই উপকার করাটা সত্য, তবে এর কারণে তার প্রতি আমার কোনো কৃতজ্ঞতাবোধও নেই, কোনো ভালোবাসাও নেই। কেউ যদি বলে যে, "সে তো তোমার কত বড় উপকার করলো। তুমি কেন কৃতজ্ঞ নও?" বলবে, "তার তো নিয়ত ভালো ছিল না।"
মুসা (আ.) ও ফেরাউনের ঘটনা
মুসা (আ.) ফেরাউনের কাছে এই উত্তরই দিলেন। ফেরাউন যখন মুসা (আ.)-এর আক্রমণে পড়লো, তখন সে তার ইহসান জাতানোর চেষ্টা করলো। বলল, "আমি কি তোমাকে ছেলে হিসেবে বড় করিনি! আর এত বছর তোমাকে রাখিনি... ইত্যাদি।"
মুসা (আ.) বললেন, "এগুলো তো তুমি বনি ইসরাইলকে অনুগত রাখার জন্য করেছ। মূলত তোমার কোনো ইখলাস ছিল না। এজন্য মুসা (আ.)-এর জন্য প্রযোজ্য নয় যে তুমি কৃতজ্ঞ থাকো।"
মানুষের হৃদয় ও ইখলাস
এজন্য মানুষের ক্ষেত্রে এরকম হয়ে থাকে - যখন বলল যে, "সে তো আমার উপকার করেছে; কিন্তু উপকার করাটা তার উদ্দেশ্য ছিল না।" মানুষের অন্তরকে আল্লাহ তাআলা এমনভাবে বানিয়েছেন যে, সে হিন্দু হোক, মুসলমান হোক বা যেই হোক, ইখলাস শব্দটি হয়তো সে জানেও না; কিন্তু তবুও উপকারকারীর উপর তার মুহব্বত হবে না। বলবে, "সে তো আসলে আমার উপকার চায়নি। ঘটনাক্রমে হয়ে গিয়েছে।"
এর মোকাবেলায়, "একজনের দ্বারা আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে; কিন্তু আমি তাকে ভালোবাসি।" কেউ যদি বলে যে, "তার দ্বারা তোমার এতবড় ক্ষতি হয়েছে আর তুমি তাকে ভালোবাসো?" সে বলবে, "হ্যাঁ; কিন্তু সে আমাকে ভালোবাসে। আমার ভালোই করতে চেয়েছিল। ঘটনাক্রমে তার উল্টোটা হয়ে গিয়েছে।"
আল্লাহ তাআলা যেরকমভাবে মানুষের দিলকে দেখেন, আল্লাহ তাআলা মানুষকেও বানিয়েছেন এমন করে যে, মানুষও মানুষের দিলকে দেখে। আর ইখলাসওয়ালাকেই কদর করে।
আগুনের উদাহরণ
অবহেলার কারণে ঘরে আগুন লেগে গেল। স্ত্রী বা অন্য কেউ হয়তো কোনো ভুলত্রুটি করে ফেলেছে আর চুলা থেকে আগুন বাড়িতে ছড়িয়ে পড়েছে। বাড়ি নষ্ট হলো, সম্পদ নষ্ট হলো, ছেলে-মেয়েরা জ্বলেপুড়ে মারা গেল... অর্থাৎ, এত ক্ষতির সম্মুখীন হওয়াটা কেউ চিন্তাও করতে পারে না। অন্য কেউ সম্মুখীন হয়েছেন শুনলে মন কেঁপে ওঠে যে, "হায়, এত বড় ক্ষতি!" কিন্তু এরপরও সে তার স্ত্রীকে তালাক দেবে না; বরং দুজনে বসে কাঁদবে। কারণ, সে এই ক্ষতি করতে চায়নি। এটি অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে গিয়েছে।
এর বিপরীতে এর চেয়ে লাখো গুণ ছোট ক্ষতির জন্যও মানুষ তালাক দিয়ে দেয়। কারণ, সে ক্ষতি করতে চেয়েছিল। সেজন্য "ওর সাথে আমার আর টিকবে না।" আর মানুষ অন্তরের অবস্থানুযায়ী বিচার করে থাকে। মূলত আল্লাহ তাআলাও অন্তরের অবস্থানুযায়ী বিচার করেন।
নবীদের মেহনতের সারকথা
মানুষের এই অন্তরকে আল্লাহ তাআলাই বানিয়েছেন আর মানুষ এই অন্তর অনুযায়ীই বিচার করে থাকে। সেই অন্তর শুদ্ধ হওয়া আর সেই শুদ্ধ অন্তরের প্রকাশকেই নেক আমল বলা হয়।
**নবীদের মেহনতের সম্পূর্ণটা জুড়েই আছে মানুষের অন্তরকে ভালো করা আর ভালো দিলের প্রকাশ হিসেবে তাকে নেক আমল শেখানো।**
যে অন্তরকে ভালো করবে, আল্লাহ তাআলার নিকট তার কদর হবে, মানুষের নিকটও তার কদর হবে। আল্লাহ তাআলাই মেহেরবানি করে তার নিজ ভান্ডার থেকে তৃপ্তি ঢেলে দেবেন।
আল্লাহওয়ালাদের বৈশিষ্ট্য
আল্লাহওয়ালারা অন্যের উপকার করতে চান আর অন্যের থেকে উপকারও পেয়ে যান। যার উপকার করতে চেয়েছে, আল্লাহ জানেন কবে করতে পারবে; কিন্তু যে মুহূর্তে সে উপকার করতে চেয়েছে, আল্লাহর নিকট ওই মুহূর্তেই তার নিজের উপকার হয়ে যায়।
হারুনুর রশিদ (রহ.)-এর ঘটনা
হারুনুর রশিদ (রহ.) সফরে বের হয়েছেন। এক জায়গায় বৃদ্ধ এক লোককে পেলেন বীজ রোপণ করছে। খুব বয়স্ক একজন। তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "খেজুরের বীজ রোপণ করার পর এটি গাছ হয়ে ফসল উৎপন্ন হতে কতদিন সময় লাগবে?"
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, "মোটামুটি বিশ বছর।"
হারুনুর রশিদ (রহ.) বৃদ্ধের বয়স আর খেজুর গাছ বিশ বছরে ফল দেবে - এ দুটো বিষয় ভেবে একটু মুচকি হাসলেন। বৃদ্ধ ছিলেন বড় হুশিয়ার! বুঝতে পারলেন এ হাসির অর্থ কী। হারুনুর রশিদ ফিরে যাচ্ছিলেন, উনাকে ডাকলেন, "একটু কথা শুনে যান।"
হারুনুর রশিদ বললেন, "জি বলুন।"
বৃদ্ধ বললেন, "আপনি যেমনটি ভাবছেন, আমাদের পিতৃপুরুষরা যদি ওভাবে ভাবতেন, তাহলে দুনিয়াতে আমাদের জন্য আর কোনো খেজুরের গাছ অবশিষ্ট থাকত না।"
উত্তর শুনে হারুনুর রশিদ বড় মুগ্ধ হয়ে বললেন, "হ্যাঁ, নাআম।"
হারুনুর রশিদ ভ্রমণের পূর্বেই তার উজিরকে এরকম আদেশ দিয়ে রেখেছিলেন যে, যার বিষয়ে তিনি নাআম বলবেন তাকে এক থলি স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেবে। তো বৃদ্ধকে পুরস্কার দিয়ে যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন বৃদ্ধ তাকে আবার ডাকলেন, "আমার একটি কথা শুনে যান!"
হারুনুর রশিদ বললেন, "কী?"
বৃদ্ধ বললো, "মানুষ গাছ রোপণ করে বিশ বছর পরে ফসল পায়, আর আমি বীজ বপণ করে হাতের ধুলো এখনো ঝাড়িনি, তার আগেই পুরস্কার পেয়ে গেলাম!"
হারুনুর রশিদ আবার বললেন, "নাআম, বড় সুন্দর কথা।"
তো যথারীতি নাআম বলার কারণে তাকে আরেক থলি পুরস্কার দেওয়া হলো। তারা যখন আবার ফিরে যাচ্ছিলো, তখন বৃদ্ধ আরেকবার ডেকে বললেন, "আমার আরেকটি কথা শুনে যান!"
হারুনুর রশিদ বললেন, "বলুন!"
বৃদ্ধ বললো, "মানুষ বাগান করে মৌসুমে একবার ফসল পায়, আর আমি এক মৌসুমে দুই দুই বার ফসল পেয়ে গেলাম!"
তখন হারুনুর রশিদ বললেন, "নাআম।"
তখন উজির হারুনুর রশিদকে বললো, "বাদশাহ! এখান থেকে দ্রুত চলে যাওয়া ভালো।"
শিক্ষা
তো যে বান্দা অন্যের মঙ্গল চায়, সে তার দ্বারা পরবর্তী প্রজন্মের মঙ্গল চাচ্ছে যে, "আমার দ্বারা অন্যের কিছু মঙ্গল তো হোক।" সে মঙ্গল হয়তো বিশ বছর পরে হবে; কিন্তু বান্দা যখন অন্যের মঙ্গল চায়, ঠিক যে মুহূর্তে সে অন্যের মঙ্গল চাইলো, সেই মুহূর্তেই তার নিজের মঙ্গল হয়েই যায়। (সুবহানাল্লাহ)
এজন্য মঙ্গলকামী মানুষ যাদের মঙ্গল কামনা করে, তাদের মঙ্গল হয় কি না বলা মুশকিল; কিন্তু সে নিজে দুনিয়াতে ভালো জীবন পেতে আরম্ভ করে। এজন্য দেখা যায়, নেককার মানুষদের দুনিয়াবি জীবন বড় আনন্দের। তার চেহারা বলে যে, তার ভেতরে এক তৃপ্তি রয়েছে।
বিপরীত অবস্থা
এর মোকাবেলায় তার বিপরীতটিও সত্য। কেউ অন্যের অমঙ্গল করতে চাইলে, যার অমঙ্গল কামনা করা হয়, যার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়, তার অমঙ্গল হয় কি না, এটি অনেক পরের কথা; কিন্তু তার নিজের অমঙ্গল তখন থেকেই শুরু হয়ে যায়। এমনকি কেউ যদি তা না-ও জানে তবুও।
প্রথম কথা, রাতে তার ঘুম হবে না। পেরেশান থাকবে, ছটফট করবে, অস্বস্তি লাগবে। রাতে যদি ঘুম না হয় তবে দিনে বদমেজাজ থাকবে। ছেলেকে মারবে, বউকে পিটাবে। ছেলে হয়তো আজ ছোট বলে মার খাচ্ছে, কিছুদিন পরে সে বড় হয়ে এর প্রতিশোধ নেবে। আর স্ত্রী হয়তো মারতে পারছে না, কিন্তু সবার নিকট নিজ নিজ অস্ত্র রয়েছে।
পুরুষ মানুষ মহিলাদেরকে হত্যা করতে পারে, আর মহিলারা পুরুষদেরকে আত্মহত্যায় বাধ্য করাতে পারে। সুতরাং কারো হাতই খালি নয়, সবার নিকটই নিজ নিজ অস্ত্র রয়েছে। অন্যের অমঙ্গল করতে চাওয়ার মাধ্যমে নিজের অমঙ্গলের সূচনা হয়ে গেলো।
নিজেকে ভালো করার পথ
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া (আ.)-কে পাঠিয়েছেন নিজেকে ভালো করার জন্য। এর সুরত কী? এর সুরত হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি চাওয়া। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই মাখলুকের উপকার করো।
কারো হাতে কারো উপকার করার কোনো ক্ষমতা আল্লাহ তাআলা দেননি। আল্লাহ তাআলা শুধু ইচ্ছা শক্তি দিয়েছেন। আর আল্লাহ তাআলা তার ইচ্ছার উপরই সব পুরস্কার দিয়ে থাকেন।
এজন্য আল্লাহর পথে বের হয়ে নিজেকে নবুওয়াতের পথের পথিক, দ্বীনের পথের পথিক বানানো। দুনিয়ার মানুষ নানান ধরনের দক্ষতা অর্জন করে, এতে খ্যাতি পায়, সম্পদ পায়; কিন্তু ভালো জীবন পায় না। এর মধ্যে হয়তো উপকার থাকতে পারে। রাসূল (সা.) পরিষ্কারভাবে এই বিষয়ের কোনোটির কথা বলেননি।
ঠিক আছে, আমার মন যেহেতু চায়, তাই জিনিসটি করি। কিন্তু ভালো জীবনের সম্পর্ক তো আমার নিজের জীবন শুদ্ধ হওয়ার সাথে। আমার করণীয় হলো, প্রথমে আমার অন্তরকে শুদ্ধ করা। আর অন্তর শুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সেই অন্তর থেকে প্রকাশিত সর্বপ্রকার আমল—চোখের দেখা, কানের শোনা, হাতের ধরা—সে কাজটি ছোট হোক বা বড়, সবগুলো নেক আমলের মধ্যে পড়বে, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, মানুষের মঙ্গলের জন্য হয়। এতে অন্যের মঙ্গল হোক বা না হোক, নিজের মঙ্গল অবশ্যই হয়ে যাবে।
বিশর হাফি রহ.-এর ঘটনা
বিশর হাফি রহ. বাগদাদে এক প্রচণ্ড শীতের মধ্যে প্রায় খালি গায়ে কষ্ট সহ্য করছিলেন। কেউ একজন তাকে জিজ্ঞাসা করলো, "এই প্রচণ্ড শীতে আপনার শরীরে উষ্ণ পোশাক নেই?"
তিনি বললেন, "অনেক মানুষ আছে, যাদের সামর্থ্য নেই। কাঁথা, কম্বল নেই। শীতে কষ্ট পায়। আমার তো এই সামর্থ্য নেই যে, আমি তাদের জন্য কিছু করি, তাদের কষ্ট লাঘব করি। এজন্য এতটুকু তো করতেই পারি যে, আমিও তাদের সঙ্গী হই।"
তো উনি নিজ জায়গায় বসে শীতে কষ্ট পাচ্ছেন, এতে কি আরেকজন—যার গায়ে শীতের পোশাক নেই—তার শীত কি কমবে? কিছুই কমবে না। কিন্তু তিনি নিজে আল্লাহর নিকট বড় মকবুল হয়ে যাবেন। উনার এই চেষ্টায় অন্যের শীত দূর হবে না, কিন্তু আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি তার দিকে ধাবিত হবে।
হায়াতে তায়্যিবাহ
বান্দা যখন নিজের অন্তরকে ভালো করে, আর সেই ভালো মনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নেক আমল করে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট হন এবং আল্লাহ তাআলা তাকে সন্তুষ্ট করে দেন। দুনিয়াতেও, আখেরাতেও। এজন্য আল্লাহ তাআলার ওয়াদা:
**مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ**
*"যে নারী বা পুরুষ নেক আমল করে ঈমানওয়ালা অবস্থায়, আমি তাকে নিশ্চয়ই ভালো জীবন তথা হায়াতে তায়্যিবাহ দান করবো।"* [সূরা নাহল: ৯৭]
তায়্যিব শব্দটি বড় ব্যাপক শব্দ। বাহিরের-ভিতরের সবকিছু তার মাঝে শামিল। যদি এর পরিবর্তে বলা হতো যে, আরামের জীবন দান করবো, তবে এ শব্দটি সংকীর্ণ শব্দ হতো।
বড় আরামের বিছানায় সে ঘুমালো, অতঃপর তাকে শোনানো হলো যে, "আপনার ফাঁসির হুকুম হয়েছে। আগামীকাল আপনার ফাঁসি।" মূলত জেলখানায় এমনটিই হয়ে থাকে। এটি ব্যঙ্গ নাকি বিদ্রূপ যে, ফাঁসির আসামিকে ফাঁসির পূর্বে জিজ্ঞাসা করা হয়, "আপনার মন কী চায়?" অথচ আগামীকালই তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে।
নবীদের আগমনের উদ্দেশ্য
আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে পাঠিয়েছেন আমাদেরকে ওই ভালো জীবনের পথ দেখানোর জন্য। মানুষকে বুদ্ধি দিয়েছেন সভ্যতার পথ আবিষ্কার করার জন্য। এই বুদ্ধির ব্যবহারকে নিষেধ করেননি। যেরকম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনাবাসীদের কৃষিকাজকে নিষেধ করেননি। আর সেই বাগানে যদি ভালো ফসল হয়, তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সেই বাগানের ফসল-ফলফলাদি খাবেন না, এ কথাও বলেননি। এগুলো যে পছন্দ করেন না, এমনও বলেননি।
তো নিজে তো ফায়দা নিবেন, কিন্তু তাঁর নিজের আগমন হলো দুনিয়ার মানুষকে তার নিজের জীবন শুদ্ধ করা, সুন্দর করা আর পথ দেখানো। এই পথে যে বের হবে, আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন তাকে দুনিয়ার ভালো জীবন দিবেন। আর দুনিয়ার মানুষের ভালো জীবনের উপলক্ষ্য বানাবেন।
সম্মান ও মর্যাদা
এটি বড় সম্মানের। আমার দ্বারা দুনিয়ার মানুষের মঙ্গল হওয়া—এর মধ্যে আল্লাহ তাআলা সব সম্মান রেখেছেন। আমার নিজের জীবন ভালো হবে, আর আমি অন্যের মঙ্গলের কারণ হবো। এই মর্যাদাটি আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে দিয়েছেন এবং নবীদের অনুসারীদেরকেও দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুন। সবাই নিয়ত করি, আমরা আল্লাহর পথে বের হয়ে দ্বীনওয়ালা হবো।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
আদরের ভাইটিকে বলছি
( দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের আলোকিত পরশে দ্বীন পাওয়া প্রতিটি কলেজ বা ভার্সিটির জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র ...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১১৩৭৫
জরুরত - মানুষের প্রয়োজন ও ইবাদত
(প্রদত্ত বয়ান হতে সংগৃহীত) স্থান: আলাইপুর মারকাজ মসজিদ, নাটোর তারিখ: ১৬ নভেম্বর,২০০৭ ,শুক্রবার ফজরে...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
১৪০২
কাজ ও আমল: বাস্তবতা ও গায়েবের নিরিখে
الحمد لله نستعينه ونعوذ به من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلله فلا ...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
১৪৮৫
আল্লাহর হাতে সোপর্দ: দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের পথ
(প্রদত্ত বয়ান হতে সংগৃহীত اَلْحَمْدُ للهِ نَسْتَعِيْنُهُ وَنَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِن...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
১৬৫৯