প্রবন্ধ
দুনিয়ার জীবনে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বাস্তবতা
৪ অক্টোবর, ২০২৬
৩৩৪
০
প্রারম্ভিকা:
ক.
আমরা মানুষ। পৃথিবী নামক গ্রহে বাস করি। আমাদের জন্ম হয়। কিছু সময় জীবিত থাকি। আবার এখান থেকে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিদায় নিতে হয়। পৃথিবীর এ সামান্য সময়ের মধ্যে আমরা জীবনের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করি। সময়ের সাথে সাথে জীবনবোধ পরিবর্তন হয়, পরিপক্ব হয়। প্রাচীনকাল থেকেই, বরং বলতে গেলে আমাদের ধারাবাহিকতার সূচনা থেকেই এ প্রশ্ন চলে আসছে—আমরা কোত্থেকে এখানে আসি? কেনই বা আসি? আবার এখান থেকে আমরা কোথায় যাই, কেনই বা যাই? মানুষ যে মেধা এবং চিন্তাশক্তি নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করে শুধু তার মাধ্যমে এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। মানুষ সাধারণত যা দুচোখে দেখে তাই বিশ্বাস করে। যা তার সামনে নেই, যা তার সাধারণ আকলের পরিধির বাইরে—তা অস্বীকার করে। মানুষ দেখে, মৃত্যুর পর তারা প্রকৃতির সাথে মিশে যায়, হাড্ডিগুলো পর্যন্ত এক সময় মাটি হয়ে যায়। যার কারণে তারা পরকালকে অস্বীকার করে বসে। তারা বলে, দুনিয়াই তাদের একমাত্র জীবন। একবার মৃত্যুর মাধ্যমেই সবকিছু শেষ। এমনটাই যদি না হবে, তাহলে তাদের বাপ-দাদারা কেন কখনো ফিরে আসে না?
এদের কথা আল্লাহ তাআলা এভাবে বলেছেন,
یَقُوۡلُوۡنَ ءَاِنَّا لَمَرۡدُوۡدُوۡنَ فِی الۡحَافِرَۃِ . ءَاِذَا کُنَّا عِظَامًا نَّخِرَۃً
তারা বলে, আমরা কি পূর্বাবস্থায় প্রত্যাবর্তিত হবই—গলিত অস্থিতে পরিণত হওয়ার পরও? [সুরা নাযিয়াত, আয়াত নং: ১০-১১]
إِنۡ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا ٱلدُّنۡيَا نَمُوتُ وَنَحۡيَا وَمَا نَحۡنُ بِمَبۡعُوثِينَ
একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, আমরা মরি বাঁচি এইখানেই এবং আমরা উত্থিত হব না। [সুরা মুমিনুন, আয়াত নং: ৩৭]
إِنۡ هِيَ إِلَّا مَوۡتَتُنَا ٱلۡأُولَىٰ وَمَا نَحۡنُ بِمُنشَرِينَ . فَأۡتُواْ بِـَٔابَآئِنَآ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ
আমাদের প্রথম মৃত্যু ব্যতীত আর কিছুই নাই এবং আমরা আর উত্থিত হব না। অতএব তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে আমাদের পূর্বপুরুষদিগকে উপস্থিত করো। [সুরা দুখান, আয়াত নং: ৩৫-৩৬]
খ.
আমাদের আদি পিতা আদম (আ.) ও মাতা হাওয়া (আ.)। সর্বপ্রথম তাঁরা আল্লাহর নির্দেশে পৃথিবীতে আগমন করেন। এক সময় তাঁদের বংশ বৃদ্ধি পাবে, সময়ের পরিবর্তনে মানুষের মধ্যে বিস্মৃতি আসবে, আল্লাহকে ভুলে বসবে, গন্তব্যের পথ হারিয়ে ভুল পথে এগুতে থাকবে—এসবই আল্লাহ জানতেন, তিনি সর্বজ্ঞ। পাশাপাশি তিনি বান্দার প্রতি অসীম দয়ালু ও অনুগ্রহশীল। তিনি তাঁদেরকে এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিকনির্দেশনাহীন ছেড়ে দেননি। বরং তাঁদেরকে দুনিয়াতে প্রেরণের প্রাক্কালেই এই বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে—তোমাদের কাছে আমার পক্ষ থেকে হিদায়াত আসবে, যারা তা মেনে চলবে, তাদের কোনো ভয় নেই, তাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। তারা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلۡنَا ٱهۡبِطُواْ مِنۡهَا جَمِيعٗاۖ فَإِمَّا يَأۡتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدٗى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ
আমি বললাম, তোমরা সকলেই এ স্থান হতে নেমে যাও। পরে যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট সৎপথের কোনো নির্দেশ আসবে তখন যারা আমার সৎপথের নির্দেশ অনুসরণ করবে তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। [সুরা বাকারা, আয়াত নং: ৩৮]
قَالَ ٱهۡبِطَا مِنۡهَا جَمِيعَۢاۖ بَعۡضُكُمۡ لِبَعۡضٍ عَدُوّٞۖ فَإِمَّا يَأۡتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدٗى فَمَنِ ٱتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشۡقَىٰ
তিনি বললেন, তোমরা উভয়ে এক সঙ্গে জান্নাত থেকে নেমে যাও। তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রু। পরে আমার পক্ষ হতে তোমাদের নিক সৎপথের নির্দেশ আসলে যে আমার পথ অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না ও দুঃখ-কষ্ট পাবে না। [সুরা তহা, আয়াত নং: ১২৩]
সূচনা থেকেই মানব কাফেলা দুই ভাগে বিভক্ত। গন্তব্য দুই দিকে। কেউ তাদের রবের পক্ষ থেকে আসা হিদায়াত গ্রহণ করেছে। জীবন ব্যবস্থা হিসেবে দ্বীনকে মেনে নিয়েছে। আবার কেউ এর বিপরীত গন্তব্য বেছে নিয়েছে। প্রবৃত্তি আর ইবলিসের অনুসরণই তাদের জীবনের ফালসাফা। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। ঈমানের ওপর অবিচল থেকে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।
গ.
আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা। তিনি আমাদের প্রতিপালক। তিনিই আমাদের রিজিক দান করেন। আমাদের জীবনের প্রতিটি প্রাপ্তি তাঁর দান ও অনুগ্রহ। প্রতিটি অপ্রাপ্তি তাঁর ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আমরা মানব। মানবিক দুর্বলতা আমাদের সত্তাগত বৈশিষ্ট্য। সৃষ্টিকর্তাই বলেছেন, তিনি আমাদেরকে দুর্বল করে সৃষ্টি করেছেন। যার কারণে আমরা বরাবরই এ দুর্বলতার শিকার হই, কখনো ভ্রান্তির বেড়াজালে আটকে গিয়ে উত্তরণের পথ খুঁজতে খুঁজতে হতাশায় নিমজ্জিত থাকি। যদিও হাত বাড়ালেই তার সমাধান পেয়ে যেতাম কুরআন ও সুন্নাহ থেকে।
‘পার্থিব জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি’ আমাদের জীবনের একটি বড় অধ্যায়। আমরা দেখি, কারও দৈহিক অবয়ব সুঠাম ও সুন্দর, আবার আরেকজন কৃশকায় ও নিতান্তই দুর্বল প্রকৃতির। কেউ দীর্ঘকায় দেহের অধিকারী, আবার কেউ একেবারেই বেঁটে। কাউকে প্রচণ্ড মেধা ও তীক্ষ্ণ ধীশক্তি দেওয়া হয়েছে, আবার কাউকে অক্ষর জ্ঞান শেখাতেই শিক্ষকের চুল পেকে যাওয়ার উপক্রম। কাউকে সম্পদের প্রাচুর্য দান করা হয়েছে, আবার কারও নুন আনতেই পান্তা ফুরায় অবস্থা। কেউ সন্তানের পর নাতি-নাতনি দেখে চতুর্থ প্রজন্ম দেখার অপেক্ষায়, অপরদিকে কেউ একজন সন্তানের আশায়ই জীবন পার করে দিচ্ছেন।
এই হলো পার্থিব জীবনের প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির সাধারণ চিত্র। যে পাচ্ছে সে হয়ত এ ভেবে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে যে, সৃষ্টিকর্তা তাকে পছন্দ করেন বিধায় তাকে এতকিছু দান করছেন। আর যে পাচ্ছে না সে হয়ত এ ভেবে প্রতিনিয়ত হীনম্মন্যতায় ভুগছেন যে, তিনি হয়ত আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়, তাই তাকে সর্বদা বঞ্চিত রাখছেন। সারকথা, এ পার্থিব প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তিই কখনো কখনো অঘোষিতভাবে আমাদের জীবনের সফলতা-বিফলতা এবং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতার মূল মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আমরা দেখব, পার্থিব জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বাস্তবতা কী। আসলেই কি এটি ব্যক্তির সফলতা-বিফলতা ও আল্লাহর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতার মান নির্ণায়ক নাকি ভিন্ন কিছু? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করব আমাদের পার্থিব জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সঠিক দর্শন।
আল্লাহর ইবাদতই পার্থিব জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য
পৃথিবীতে সাধারণ একজন মানুষও যদি অতি সাধারণ কোনো কাজ করে বা কোনো কিছু তৈরি করে, তার পেছনে কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকে। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা। যিনি সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়। তিনি একটি জাতি সৃষ্টি করবেন, তাদের বাসের জন্য নিখুঁতভাবে একটি জগত তৈরি করবেন, আর তার পেছনে কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকবে না—তা হতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
هُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي ٱلۡأَرۡضِ جَمِيعٗا
তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছন। [সুরা বাকারা, আয়াত নং: ২৯]
পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবকিছু সৃষ্টির উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলেছেন, তিনি তা সৃষ্টি করেছেন আমাদের তথা মানব জাতির জন্য। আর মানব জাতিকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন,
وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ
আর আমি জিন ও মানুষকে কেবল এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে। [সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬]
وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ
অথচ তাদেরকে তো কেবল এই নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল যে, তারা একনিষ্ঠভাবে শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে। [সূরা আল-বায়্যিনাহ: ৫]
উল্লেখিত আয়াত দুটি থেকে স্পষ্ট, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে একমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইবাদত কী জিনিস? আমরা তাঁর ইবাদত করব কীভাবে?
ইবাদতের সরল কথা হলো, জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর সকল আদেশ বাস্তবায়ন করা এবং তাঁর সকল নিষেধ থেকে বিরত থাকার নামই হলো ইবাদত। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রাহ.) বলেন—
ইবনু তায়মিয়া রাহ. বলেন,
" الْعِبَادَةُ " هِيَ اسْمٌ جَامِعٌ لِكُلِّ مَا يُحِبُّهُ اللَّهُ وَيَرْضَاهُ: مِنْ الْأَقْوَالِ، وَالْأَعْمَالِ الْبَاطِنَةِ وَالظَّاهِرَةِ
অর্থাৎ, ‘ইবাদত এমন একটি ব্যাপক নাম, যা আল্লাহ ভালোবাসেন এবং যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন—এমন সকল প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কথা ও কাজকে অন্তর্ভুক্ত করে।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া: ১০/১৪৯)
পার্থিব জীবন একটি পরীক্ষাকেন্দ্র
আমরা জেনেছি, মানব জাতির পার্থিব জীবনের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর ইবাদত করা। আর ইবাদতের সারকথা হলো, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকা। মানবজাতি সর্বাবস্থায় আল্লাহর আদেশ-নিষেধ তথা তাঁর দেওয়া জীবন ব্যবস্থার ওপর অটল-অবিচল থাকে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্যই পার্থিব জীবনের এ মঞ্চায়ন করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلۡمَوۡتَ وَٱلۡحَيَوٰةَ لِيَبۡلُوَكُمۡ أَيُّكُمۡ أَحۡسَنُ عَمَلٗاۚ وَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡغَفُورُ
যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য—কে তোমাদের মধ্যে কর্মে সর্বোত্তম? আর তিনি পরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল। [সূরা আল-মুলক: ২]
وَهُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ وَكَانَ عَرۡشُهُۥ عَلَى ٱلۡمَآءِ لِيَبۡلُوَكُمۡ أَيُّكُمۡ أَحۡسَنُ عَمَلٗاۗ
আর তিনিই ছয় দিনে আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, তখন তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর; তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যে, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে সর্বোত্তম। [সূরা হুদ: ৭]
إِنَّا جَعَلۡنَا مَا عَلَى ٱلۡأَرۡضِ زِينَةٗ لَّهَا لِنَبۡلُوَهُمۡ أَيُّهُمۡ أَحۡسَنُ عَمَلٗا
নিশ্চয়ই পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে, আমি সেগুলোকে তার জন্য শোভা বানিয়েছি, মানুষকে এই পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কর্মে কে শ্রেষ্ঠ। [সূরা আল-কাহফ: ৭]
وَلَنَبۡلُوَنَّكُمۡ حَتَّىٰ نَعۡلَمَ ٱلۡمُجَٰهِدِينَ مِنكُمۡ وَٱلصَّٰبِرِينَ وَنَبۡلُوَاْ أَخۡبَارَكُمۡ
আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব, যতক্ষণ না আমি জেনে নিই তোমাদের মধ্যকার মুজাহিদ ও ধৈর্যশীলদেরকে এবং আমি তোমাদের অবস্থাগুলো যাচাই করে নিই। [সূরা মুহাম্মাদ: ৩১]
উল্লেখিত আয়াতগুলো থেকে আমরা সুস্পষ্ট একটি বার্তা পাই—আল্লাহ আমাদেরকে পার্থিব জীবনে পরীক্ষা করবেন। তিনি দেখবেন, আমাদের মধ্য থেকে কে উত্তম আমল করে আর কে মন্দ করে।
পরীক্ষার ক্ষেত্র ও ধরণ
পূর্বের আয়াতগুলো থেকে আমরা জেনেছি, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আমাদেরকে পার্থিব জীবনে পরীক্ষা করবেন। এবার জানিয়ে দিচ্ছেন, তিনি আমাদেরকে কোন ক্ষেত্রে পরীক্ষা করবেন এবং কীভাবে পরীক্ষা করবেন। আসুন, আয়াতগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ি-
وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةٗۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ
আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করব এবং আমারই নিকট প্রত্যানীত হবে। [সুরা আম্বিয়া, আয়াত নং: ৩৫]
এই আয়াতের তাফসিরে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, আয়াতে ‘মন্দ ও ভালো’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সচ্ছলতা-অসচ্ছলতা; কেননা উভয়টাই পার্থিব জীবনে পরীক্ষার উপকরণ।
وَلَنَبۡلُوَنَّكُم بِشَيۡءٖ مِّنَ ٱلۡخَوۡفِ وَٱلۡجُوعِ وَنَقۡصٖ مِّنَ ٱلۡأَمۡوَٰلِ وَٱلۡأَنفُسِ وَٱلثَّمَرَٰتِۗ وَبَشِّرِ ٱلصَّٰبِرِينَ
আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর আপনি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দিন। [সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৫]
إِنَّمَآ أَمۡوَٰلُكُمۡ وَأَوۡلَٰدُكُمۡ فِتۡنَةٞۚ وَٱللَّهُ عِندَهُۥٓ أَجۡرٌ عَظِيمٞ
তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষার বস্তু মাত্র। আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে মহাপুরস্কার। [সূরা আত-তাগাবুন: ১৫]
لَتُبۡلَوُنَّ فِيٓ أَمۡوَٰلِكُمۡ وَأَنفُسِكُمۡ وَلَتَسۡمَعُنَّ مِنَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ مِن قَبۡلِكُمۡ وَمِنَ ٱلَّذِينَ أَشۡرَكُوٓاْ أَذٗى كَثِيرٗاۚ وَإِن تَصۡبِرُواْ وَتَتَّقُواْ فَإِنَّ ذَٰلِكَ مِنۡ عَزۡمِ ٱلۡأُمُورِ
তোমাদের ধন-সম্পদ ও জান-প্রাণের ব্যাপারে তোমাদেরকে অবশ্যই পরীক্ষা করা হবে এবং তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে আর মুশরিকদের কাছ থেকে তোমরা অবশ্যই বহু কষ্টদায়ক কথা শুনবে। তবে যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে নিশ্চয়ই তা হবে দৃঢ়সংকল্পের কাজ। [সূরা আলে ইমরান: ১৮৬]
أَمۡ حَسِبۡتُمۡ أَن تَدۡخُلُواْ ٱلۡجَنَّةَ وَلَمَّا يَأۡتِكُم مَّثَلُ ٱلَّذِينَ خَلَوۡاْ مِن قَبۡلِكُمۖ مَّسَّتۡهُمُ ٱلۡبَأۡسَآءُ وَٱلضَّرَّآءُ وَزُلۡزِلُواْ حَتَّىٰ يَقُولَ ٱلرَّسُولُ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَعَهُۥ مَتَىٰ نَصۡرُ ٱللَّهِۗ أَلَآ إِنَّ نَصۡرَ ٱللَّهِ قَرِيبٞ
তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ এখনও তোমাদের কাছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের মতো অবস্থা আসেনি? তাদেরকে স্পর্শ করেছিল চরম অভাব-অনটন ও দুঃখ-কষ্ট এবং তারা এতটা প্রকম্পিত হয়েছিল যে, এমনকি রাসূল ও তাঁর সাথে ঈমান আনয়নকারীরা বলে উঠেছিল, "আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে?" জেনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটে। [সূরা আল-বাকারাহ: ২১৪]
পার্থিব জীবনে প্রাপ্তির বাস্তবতা
এতক্ষণে আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে, আমাদের পার্থিব জীবন হলো পরীক্ষাকেন্দ্র। পরীক্ষার মাধ্যম হবে কখনো রিজিকের প্রশস্ততার মাধ্যমে, আবার কখনো রিজিকের সংকীর্ণতার মাধ্যমে। কখনো সন্তান দানের মাধ্যমে, তো আবার কখনো নিঃসন্তান রেখে। কখনো অঢেল শস্য ও সম্পদ দানের মাধ্যমে, আবার কখনো দীর্ঘ পরিশ্রমের পর গুছিয়ে আনা শস্যক্ষেতও প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারে। এ বাস্তবতা আল্লাহ তাআলা একাধিক আয়াতে সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন।
ٱللَّهُ يَبۡسُطُ ٱلرِّزۡقَ لِمَن يَشَآءُ وَيَقۡدِرُۚ وَفَرِحُواْ بِٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَمَا ٱلۡحَيَوٰةُ ٱلدُّنۡيَا فِي ٱلۡأٓخِرَةِ إِلَّا مَتَٰعٞ
আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা রিযিক প্রশস্ত করেন এবং সংকুচিত করেন। আর তারা দুনিয়ার জীবন নিয়েই মেতে আছে, অথচ আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবন তো সামান্য ভোগ্যবস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়। [সূরা আর-রাদ: ২৬]
إِنَّ رَبَّكَ يَبۡسُطُ ٱلرِّزۡقَ لِمَن يَشَآءُ وَيَقۡدِرُۚ إِنَّهُۥ كَانَ بِعِبَادِهِۦ خَبِيرَۢا بَصِيرٗا
নিশ্চয়ই আপনার রব যার জন্য ইচ্ছা রিযিক প্রশস্ত করেন এবং সংকুচিত করেন। তিনি তো তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত, সর্বদ্রষ্টা। [সূরা বনী ইসরাঈল: ৩০]
وَقَالُواْ نَحۡنُ أَكۡثَرُ أَمۡوَٰلٗا وَأَوۡلَٰدٗا وَمَا نَحۡنُ بِمُعَذَّبِينَ 35 قُلۡ إِنَّ رَبِّي يَبۡسُطُ ٱلرِّزۡقَ لِمَن يَشَآءُ وَيَقۡدِرُ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ 36 وَمَآ أَمۡوَٰلُكُمۡ وَلَآ أَوۡلَٰدُكُم بِٱلَّتِي تُقَرِّبُكُمۡ عِندَنَا زُلۡفَىٰٓ إِلَّا مَنۡ ءَامَنَ وَعَمِلَ صَٰلِحٗا فَأُوْلَٰٓئِكَ لَهُمۡ جَزَآءُ ٱلضِّعۡفِ بِمَا عَمِلُواْ وَهُمۡ فِي ٱلۡغُرُفَٰتِ ءَامِنُونَ
আর তারা বলে, "ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আমরাই অধিক সমৃদ্ধ এবং আমাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে না।" বলুন, "নিশ্চয়ই আমার রব যার জন্য ইচ্ছা রিযিক প্রশস্ত করেন এবং সংকুচিত করেন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।" আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন কিছু নয় যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে দেবে; তবে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই তাদের কর্মের বিনিময়ে পাবে বহুগুণ পুরস্কার, আর তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে। [সূরা সাবা: ৩৫-৩৭]
لَهُۥ مَقَالِيدُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ يَبۡسُطُ ٱلرِّزۡقَ لِمَن يَشَآءُ وَيَقۡدِرُۚ إِنَّهُۥ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٞ
আসমানসমূহ ও জমিনের চাবিকাঠি তাঁরই কাছে। তিনি যার জন্য ইচ্ছা রিযিক প্রশস্ত করেন এবং সংকুচিত করেন। নিশ্চয়ই তিনি সব বিষয়ে সর্বজ্ঞ। [সূরা আশ-শূরা: ১২]
إِنَّمَآ أَمۡوَٰلُكُمۡ وَأَوۡلَٰدُكُمۡ فِتۡنَةٞۚ وَٱللَّهُ عِندَهُۥٓ أَجۡرٌ عَظِيمٞ
তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষার বস্তু মাত্র। আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে মহাপুরস্কার। [সূরা আত-তাগাবুন: ১৫]
فَأَمَّا ٱلۡإِنسَٰنُ إِذَا مَا ٱبۡتَلَىٰهُ رَبُّهُۥ فَأَكۡرَمَهُۥ وَنَعَّمَهُۥ فَيَقُولُ رَبِّيٓ أَكۡرَمَنِ . وَأَمَّآ إِذَا مَا ٱبۡتَلَىٰهُ فَقَدَرَ عَلَيۡهِ رِزۡقَهُۥ فَيَقُولُ رَبِّيٓ أَهَٰنَنِ . كَلَّاۖ بَل لَّا تُكۡرِمُونَ ٱلۡيَتِيمَ . وَلَا تَحَٰٓضُّونَ عَلَىٰ طَعَامِ ٱلۡمِسۡكِينِ . وَتَأۡكُلُونَ ٱلتُّرَاثَ أَكۡلٗا لَّمّٗا . وَتُحِبُّونَ ٱلۡمَالَ حُبّٗا جَمّٗا
মানুষ তো এমন যে, যখন তার রব তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর তাকে সম্মান ও নিআমত দান করেন, তখন সে বলে, "আমার রব আমাকে সম্মানিত করেছেন।" আর যখন তিনি তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর তার ওপর তার রিযিক সংকুচিত করে দেন, তখন সে বলে, "আমার রব আমাকে অপমানিত করেছেন।" কখনোই নয়; বরং তোমরা ইয়াতিমকে সম্মান করো না, এবং মিসকিনকে খাদ্য দানে পরস্পরকে উৎসাহিত করো না, আর তোমরা উত্তরাধিকারের সম্পদ সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফেলো, এবং তোমরা ধন-সম্পদকে অতিশয় ভালোবাসো। [সূরা আল-ফাজর: ১৫-২০]
উল্লেখিত আয়াতগুলো থেকে আমরা বলতে পারি, পার্থিব জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মূল তাৎপর্য ও রহস্য হলো—মানব জাতির দুনিয়াবি পরীক্ষা নামক একই মুদ্রার দুই প্রান্ত। কাউকে দিয়ে পরীক্ষা করা হয়, আবার কাউকে না দিয়ে।
যেমন সূরা আত-তাগাবুনের ১৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষার বস্তু মাত্র।’ আমরা সন্তানাদি ও সম্পদকে প্রাপ্তি ও সফলতার নিদর্শন হিসেবেই গণ্য করে থাকি। অথচ আল্লাহ তাআলা বলছেন 'পরীক্ষার বস্তু'। অর্থাৎ সন্তান ও প্রাপ্ত সম্পদ আমার জন্য অকল্যাণকরও হতে পারে, যদি আমি ওই ক্ষেত্রে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হতে পারি।
এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা সূরা আল-ফাজরে সুস্পষ্টভাবে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি উভয়কেই পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এও বলে দিয়েছেন যে, উভয় ক্ষেত্রে ব্যক্তির মানসিকতা কেমন হয়ে থাকে। ব্যক্তি প্রাপ্তিকেই নিজের সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতার নিদর্শন হিসেব বিবেচনা করে। অপরদিকে বঞ্চিত ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর অপ্রিয় বান্দা হিসেবে সাব্যস্ত করে। উভয় মানসিকতাকেই আল্লাহ তাআলা অবাস্তব বলেছেন। কেননা পার্থিব এ নগণ্য বিষয় বান্দার গ্রহণযোগ্যতা ও চূড়ান্ত সম্মান নির্ণায়ক হিসেবে কখনোই বিবেচিত হতে পারে না।
অপ্রাপ্তি মানেই বিফলতা নয়, অপ্রাপ্তির আড়ালেই থাকতে পারে মূল প্রাপ্তি
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি উভয়টিই যখন পরীক্ষার মাধ্যম, অপ্রাপ্তি তখন কোনোভাবেই বিফলতা হতে পারে না। বরং কখনো কখনো অপ্রাপ্তির আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে মূল প্রাপ্তি। কারণ অপ্রাপ্তির অর্থ হলো, আল্লাহ আমাকে দেননি। আর প্রজ্ঞাময় আল্লাহর না দেওয়ার পেছনে লুক্কায়িত রহস্য আমার দৃষ্টিতে নাও ধরা দিতে পারে। যেদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَعَسَىٰٓ أَن تَكۡرَهُواْ شَيۡـٔٗا وَهُوَ خَيۡرٞ لَّكُمۡۖ وَعَسَىٰٓ أَن تُحِبُّواْ شَيۡـٔٗا وَهُوَ شَرّٞ لَّكُمۡۚ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ
তোমরা যা অপছন্দ করো হতে পারে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং যা তোমরা ভালোবাস হাতে পারে তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন আর তোমারা জান না। [সুরা বাকারা, আয়াত নং: ২১৬]
এবার আগত আয়াতগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক-
وَلَوۡ بَسَطَ ٱللَّهُ ٱلرِّزۡقَ لِعِبَادِهِۦ لَبَغَوۡاْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَلَٰكِن يُنَزِّلُ بِقَدَرٖ مَّا يَشَآءُۚ إِنَّهُۥ بِعِبَادِهِۦ خَبِيرُۢ بَصِيرٞ
আর আল্লাহ যদি তাঁর বান্দাদের জন্য রিযিক প্রশস্ত করে দিতেন, তবে তারা পৃথিবীতে সীমালঙ্ঘন করত। কিন্তু তিনি যা ইচ্ছা তা এক নির্দিষ্ট পরিমাণে নাযিল করেন। নিশ্চয়ই তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত ও সর্বদ্রষ্টা। [সূরা আশ-শূরা: ২৭]
অর্থাৎ, কখনো কখনো বান্দার কল্যাণেই আল্লাহ তাআলা তার রিজিক সংকীর্ণ করে দেন, যেন বান্দা সীমালঙ্ঘন না করে।
وَأَمَّآ إِذَا مَا ٱبۡتَلَىٰهُ فَقَدَرَ عَلَيۡهِ رِزۡقَهُۥ فَيَقُولُ رَبِّيٓ أَهَٰنَنِ
আর যখন তিনি তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর তার ওপর তার রিযিক সংকুচিত করে দেন, তখন সে বলে, "আমার রব আমাকে অপমানিত করেছেন।" [সূরা আল-ফাজর: ১৬]
এ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রিজিক সংকুচিত করার মূল লক্ষ্য হলো বান্দাকে পরীক্ষা করা যে, সে ওই অবস্থাতেও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কি না।
لِيُنفِقۡ ذُو سَعَةٖ مِّن سَعَتِهِۦۖ وَمَن قُدِرَ عَلَيۡهِ رِزۡقُهُۥ فَلۡيُنفِقۡ مِمَّآ ءَاتَىٰهُ ٱللَّهُۚ لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِلَّا مَآ ءَاتَىٰهَاۚ سَيَجۡعَلُ ٱللَّهُ بَعۡدَ عُسۡرٖ يُسۡرٗا
সামর্থ্যবান ব্যক্তি যেন তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করে। আর যার রিযিক সংকুচিত করা হয়েছে, সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকেই ব্যয় করে। আল্লাহ যাকে যতটুকু দিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি দায়িত্ব তার ওপর চাপিয়ে দেন না। আল্লাহ অচিরেই কাঠিন্যের পর সহজতা দান করবেন। [সূরা আত-তালাক: ৭]
এ আয়াতে বলা হয়েছে, যাকে যতটুকু রিজিক দান করা হয়েছে, সে তার সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করবে এবং এটাই মূলত পরীক্ষা। আর আয়াতের শেষে আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি অচিরেই কাঠিন্যতার পর সহজতা দান করবেন।
أَمَّا ٱلسَّفِينَةُ فَكَانَتۡ لِمَسَٰكِينَ يَعۡمَلُونَ فِي ٱلۡبَحۡرِ فَأَرَدتُّ أَنۡ أَعِيبَهَا وَكَانَ وَرَآءَهُم مَّلِكٞ يَأۡخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ غَصۡبٗا
(খিজির আ. বললেন) "নৌকাটির বিষয় হলো, তা ছিল কতিপয় দরিদ্র লোকের, যারা সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষণ করত। আমি সেটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে চেয়েছি, কারণ তাদের সামনে ছিল এক রাজা, যে প্রত্যেকটি নিখুঁত নৌকা বলপূর্বক ছিনিয়ে নিত। [সূরা আল-কাহফ: ৭৯]
এ ঘটনার বাহ্যিক দিকে তাকালে মনে হবে, ভালো নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করা হয়েছে, যেমনটি মূসা (আ.)-ও মনে করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল আসলে ত্রুটিযুক্ত করার মাধ্যমে মূলত নৌকাটিকেই মালিকের জন্য হেফাজত করা হয়েছে।
হতে পারে আপনাকে সন্তান দেওয়া হয়নি, কিন্তু প্রতিটি মানুষের ভালোবাসা আপনি পেয়েছেন:
لِّلَّهِ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۚ يَخۡلُقُ مَا يَشَآءُۚ يَهَبُ لِمَن يَشَآءُ إِنَٰثٗا وَيَهَبُ لِمَن يَشَآءُ ٱلذُّكُورَ . أَوۡ يُزَوِّجُهُمۡ ذُكۡرَانٗا وَإِنَٰثٗاۖ وَيَجۡعَلُ مَن يَشَآءُ عَقِيمًاۚ إِنَّهُۥ عَلِيمٞ قَدِيرٞ
আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। [সূরা আশ-শূরা: ৪৯-৫০]
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তিনি সর্বজ্ঞ ও সবকিছু করতে সক্ষম’। অর্থাৎ তিনি যেকোনো ধরনের সন্তান দিতেও সক্ষম, আবার কাউকে কোনো সন্তান না দিয়ে নিঃসন্তান রাখতেও সক্ষম। তবে তিনি সর্বজ্ঞ। তিনি জানেন, কাকে কোন ধরনের সন্তান দিতে হবে, আর কাকে দিতে হবে না। প্রতিটি বিষয় তাঁর হেকমত অনুযায়ীই বাস্তবায়িত হয়ে থাকে।
إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ سَيَجۡعَلُ لَهُمُ ٱلرَّحۡمَٰنُ وُدّٗا
নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, পরম করুণাময় অবশ্যই তাদের জন্য (মানুষের অন্তরে) ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেবেন। [সূরা মারইয়াম: ৯৬]
অপরদিকে পার্থিব প্রাপ্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে আসল বঞ্চনা
হতে পারে আপনাকে সন্তান দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ওই সন্তানের কারণেই আপনি আপনার রব থেকে দূরে সরে গেছেন। আপনি হয়ত কারও সন্তান ও সম্পদের প্রাচুর্য দেখে প্রতিনিয়ত হীনম্মন্যতায় ভুগছেন, অথচ সেই প্রাচুর্যই তার ধ্বংসের কারণ।
আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تُلۡهِكُمۡ أَمۡوَٰلُكُمۡ وَلَآ أَوۡلَٰدُكُمۡ عَن ذِكۡرِ ٱللَّهِۚ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٰلِكَ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡخَٰسِرُونَ
হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে। আর যারা এ কারণে উদাসীন হবে, তারাই তো প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত। [সূরা আল-মুনাফিকূন: ৯]
সুতরাং কোনো অবাধ্যকেও সন্তান এবং সম্পদের প্রাচুর্য দান করা হতে পারে। সেদিকে কোনো মুমিনের দৃষ্টি নিবদ্ধ হতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَا تُعۡجِبۡكَ أَمۡوَٰلُهُمۡ وَلَآ أَوۡلَٰدُهُمۡۚ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُعَذِّبَهُم بِهَا فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَتَزۡهَقَ أَنفُسُهُمۡ وَهُمۡ كَٰفِرُونَ
সুতরাং তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন আপনাকে বিস্মিত না করে। আল্লাহ তো এগুলোর দ্বারা দুনিয়ার জীবনে তাদেরকে শাস্তি দিতে চান, আর তারা কাফির থাকা অবস্থায়ই তাদের প্রাণ বের হয়ে যাবে। [সূরা আত-তাওবাহ: ৫৫]
أَيَحۡسَبُونَ أَنَّمَا نُمِدُّهُم بِهِۦ مِن مَّالٖ وَبَنِينَ 55 نُسَارِعُ لَهُمۡ فِي ٱلۡخَيۡرَٰتِۚ بَل لَّا يَشۡعُرُونَ
তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে সাহায্যস্বরূপ যে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করি, তার মাধ্যমে তাদের জন্য সকল কল্যাণ ত্বরান্বিত করছি? বরং তারা তো উপলব্ধিই করে না। [সূরা আল-মুমিনূন: ৫৫-৫৬]
وَلَوۡلَآ أَن يَكُونَ ٱلنَّاسُ أُمَّةٗ وَٰحِدَةٗ لَّجَعَلۡنَا لِمَن يَكۡفُرُ بِٱلرَّحۡمَٰنِ لِبُيُوتِهِمۡ سُقُفٗا مِّن فِضَّةٖ وَمَعَارِجَ عَلَيۡهَا يَظۡهَرُونَ . وَلِبُيُوتِهِمۡ أَبۡوَٰبٗا وَسُرُرًا عَلَيۡهَا يَتَّكِـُٔونَ . وَزُخۡرُفٗاۚ وَإِن كُلُّ ذَٰلِكَ لَمَّا مَتَٰعُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۚ وَٱلۡأٓخِرَةُ عِندَ رَبِّكَ لِلۡمُتَّقِينَ
আর সকল মানুষ একই পথের অনুসারী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকলে, যারা পরম করুণাময়কে অস্বীকার করে আমি তাদের ঘরের জন্য রৌপ্যনির্মিত ছাদ ও সিঁড়ি বানিয়ে দিতাম, যা বেয়ে তারা ওপর তলায় উঠত; এবং তাদের ঘরের জন্য বানিয়ে দিতাম রৌপ্যনির্মিত দরজা ও পালঙ্ক, যাতে তারা হেলান দিয়ে বসত, এবং বানিয়ে দিতাম স্বর্ণনির্মিত সৌন্দর্য ও চাকচিক্য। আর এসব তো পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্তু ছাড়া কিছুই নয়। আর আপনার রবের কাছে আখিরাত তো মুত্তাকিদের জন্যই নির্ধারিত। [সূরা আয-যুখরুফ: ৩৩-৩৫]
সুতরাং প্রতিটি প্রাপ্তি যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা, প্রতিটি অপ্রাপ্তিও আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। প্রাপ্তির সময় যেমন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে, অপ্রাপ্তির সময় তেমনই ধৈর্য ধারণ করতে হবে। প্রাপ্তির সময় যেমন প্রাপ্ত নিয়ামতের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, অপ্রাপ্তির সময়ও ধৈর্যের মাধ্যমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে দ্বীনের ওপর অবিচল থাকতে হবে।
রাসূল সা. ও সালাফে সালেহিনের দৃষ্টিতে পার্থিব অপ্রাপ্তি
পার্থিব প্রাচুর্য ভাগ্যে না থাকা কখনোই ব্যক্তির অগ্রহণযোগ্যতা ও অসম্মানের নিদর্শন হতে পারে না। বরং কখনো কখনো পার্থিব অপ্রাপ্তিই ব্যক্তির অপার্থিব অর্জন ও গ্রহণযোগ্যতার দলিল হতে পারে।
হাদিস :
«عن قَتادَةَ بن النُّعْمانِ، أنَّ رسولَ الله صلى الله عليه وسلم قال: "إذا أحَبَّ اللهُ عَبْدًا، حَمَاهُ الدُّنْيا، كما يَظَلُّ أحَدُكُم يَحْمي سَقيمَهُ الماءَ".» رواه الترمذ في جامعه
কাতাদাহ ইবনু নুমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি তাকে দুনিয়া থেকে এমনভাবে রক্ষা করেন (দূরে রাখেন), যেভাবে তোমাদের কেউ তার অসুস্থ রোগীকে পানি থেকে বিরত রাখে।’ (জামে তিরমিযি, হাদিস: ২১৫৭)
হাদিস :
«عَنْ مَحْمُودِ بْنِ لَبِيدٍ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ: " إِنَّ اللهَ يَحْمِي عَبْدَهُ الْمُؤْمِنَ الدُّنْيَا وَهُوَ يُحِبُّهُ، كَمَا تَحْمُونَ مَرِيضَكُمُ الطَّعَامَ وَالشَّرَابَ تَخَافُونَ عَلَيْهِ "
মাহমুদ ইবনু লাবীদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাকে ভালোবেসেই দুনিয়া থেকে রক্ষা করেন, ঠিক যেভাবে তোমরা তোমাদের অসুস্থ রোগীর ক্ষতির আশঙ্কায় তাকে খাবার ও পানীয় থেকে বিরত রাখো।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৬২৭)
ইমাম মানাবি (রাহ.) হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেন,
«(إذا أحب الله عبدا حماه) أي حفظه من متاع (الدنيا) أي حال بينه وبين نعيمها وشهواتها ووقاه أن يتلوث بزهرتها لئلا يمرض قلبه بها وبمحبتها وممارستها ويألفها ويكره الآخرة (كما يحمي) أي يمنع (أحدكم سقيمه الماء) أي شربه إذا كان يضره وللماء حالة مشهورة في الحماية عند الأطباء بل هو منهي عنه للصحيح أيضا إلا بأقل ممكن فإنه يبلد الخاطر ويضعف المعدة ولذلك أمروا بالتقليل منه وحموا المريض عنه فهو جل اسمه يذود من أحبه عنها حتى لا يتدنس بها وبقذارتها ولا يشرق بغصصها كيف وهي للكبار مؤذية وللعارفين شاغلة وللمريدين حائلة ولعامة المؤمنين قاطعة والله تعالى لأوليائه ناصر ولهم منها حافظ وان أرادوها»
অর্থাৎ, (আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন তাকে রক্ষা করেন) অর্থাৎ তাকে দুনিয়ার ভোগ্যবস্তু থেকে হেফাজত করেন। (দুনিয়া থেকে) অর্থাৎ দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা এবং বান্দার মাঝে তিনি আড়াল তৈরি করে দেন এবং দুনিয়ার চাকচিক্যে কলুষিত হওয়া থেকে তাকে বাঁচিয়ে রাখেন; যাতে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং তাতে ডুবে থাকার কারণে তার অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত না হয়ে পড়ে, সে দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে না পড়ে এবং আখিরাতের প্রতি বিমুখ না হয়। (যেভাবে তোমাদের কেউ তার রোগীকে পানি থেকে বিরত রাখে) অর্থাৎ যখন পানি পান করা রোগীর জন্য ক্ষতিকর হয়, তখন তাকে তা পান করা থেকে বিরত রাখে। চিকিৎসকদের কাছে রোগীকে পানি থেকে বিরত রাখার বিষয়টি খুবই প্রসিদ্ধ; বরং সুস্থ ব্যক্তির জন্যও প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি পান করা নিষিদ্ধ, কেননা তা মেধা ভোঁতা করে দেয় এবং পাকস্থলীকে দুর্বল করে ফেলে। এ কারণেই চিকিৎসকগণ পানি কম পান করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং রোগীকে তা থেকে বিরত রেখেছেন। তাই মহান আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন তাকে দুনিয়া থেকে দূরে রাখেন, যাতে সে দুনিয়ার পঙ্কিলতা ও আবর্জনায় কলুষিত না হয় এবং এর তিক্ততায় তার গলা আটকে না যায়। তা কেনই-বা হবে না! অথচ এই দুনিয়া বড়দের জন্য কষ্টদায়ক, আল্লাহওয়ালাদের (আরেফদের) জন্য অমনোযোগীকারী, আল্লাহর পথের পথিকদের (মুরিদদের) জন্য বাধাদানকারী এবং সাধারণ মুমিনদের জন্য গন্তব্য বিচ্ছিন্নকারী। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর ওলিদের সাহায্যকারী এবং তারা দুনিয়া চাইলেও তিনি তা থেকে তাদেরকে হেফাজতকারী। (ফাইযুল কাদীর: ১/২৪৬)
ইবনুল কাইয়্যিম (রাহ.) বলেন,
فَلَمْ يَمْنَعِ الرَّبُّ عَبْدَهُ مَا الْعَبْدُ مُحْتَاجٌ إِلَيْهِ، بُخْلًا مِنْهُ، وَلَا نَقْصًا مِنْ خَزَائِنِهِ، وَلَا اسْتِئْثَارًا عَلَيْهِ بِمَا هُوَ حَقٌّ لِلْعَبْدِ؛ بَلْ مَنَعَهُ لِيَرُدَّهُ إِلَيْهِ، وَلِيُعِزَّهُ بِالتَّذَلُّلِ لَهُ، وَلِيُغْنِيَهُ بِالِافْتِقَارِ إِلَيْهِ، وَلِيَجْبُرَهُ بِالِانْكِسَارِ بَيْنَ يَدَيْهِ، وَلِيُذِيقَهُ بِمَرَارَةِ الْمَنْعِ حَلَاوَةَ الْخُضُوعِ لَهُ، وَلَذَّةَ الْفَقْرِ إِلَيْهِ، وَلِيُلْبِسَهُ خِلْعَةَ الْعُبُودِيَّةِ، وَيُوَلِّيهِ بِعَزْلِهِ أَشْرَفَ الْوِلَايَاتِ، وَلِيُشْهِدَهُ حِكْمَتَهُ فِي قُدْرَتِهِ وَرَحْمَتَهُ فِي عِزَّتِهِ، وَبِرَّهُ وَلُطْفَهُ فِي قَهْرِهِ. وَأَنَّ مَنْعَهُ عَطَاءٌ، وَعَزْلَهُ تَوْلِيَةٌ، وَعُقُوبَتَهُ تَأْدِيبٌ، وَامْتِحَانَهُ مَحَبَّةٌ وَعَطِيَّةٌ.
অর্থাৎ, ‘মহান রব তাঁর বান্দাকে তার প্রয়োজনীয় বস্তু থেকে কৃপণতাবশত বঞ্চিত করেন না, তাঁর ভাণ্ডারে ঘাটতি পড়ার কারণেও নয়, কিংবা বান্দার প্রাপ্য হক নিজের কাছে আটকে রাখার জন্যও নয়; বরং তিনি বান্দাকে বঞ্চিত করেন তাকে তাঁর দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য, তাঁর সামনে বিনীত হওয়ার মাধ্যমে তাকে সম্মানিত করার জন্য, তাঁর মুখাপেক্ষী হওয়ার মাধ্যমে তাকে অভাবমুক্ত করার জন্য এবং তাঁর সামনে হৃদয় ভেঙে পড়ার মাধ্যমে তার ভাঙা মন জোড়া লাগানোর জন্য। তিনি তাকে অপ্রাপ্তির তিক্ততার মাধ্যমে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণের মিষ্টতা এবং তাঁর মুখাপেক্ষী থাকার স্বাদ আস্বাদন করাতে চান। তিনি তাকে বন্দেগির সম্মানজনক পোশাক পরিয়ে দিতে চান এবং দুনিয়াবি পদ বা প্রাপ্তি থেকে সরিয়ে দিয়ে তাকে সর্বোত্তম অভিভাবকত্ব ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে চান। এছাড়া এর মাধ্যমে তিনি বান্দাকে তাঁর কুদরতের মাঝে তাঁর প্রজ্ঞা, তাঁর পরাক্রমের মাঝে তাঁর রহমত এবং তাঁর কঠোরতার মাঝে তাঁর অনুগ্রহ ও কোমলতা প্রত্যক্ষ করান। মূলত তাঁর বঞ্চিত করাটাই এক প্রকার দান, তাঁর পক্ষ থেকে অপসারণই প্রকৃত পদায়ন, তাঁর শাস্তিই হলো সংশোধন ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া এবং তাঁর পরীক্ষাই হলো ভালোবাসা ও উপহার।’ (যাদুল মাআদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদ: ২/৩২৮)
পার্থিব পরীক্ষার ক্ষেত্রে সালাফের আচরণ যেমন ছিল
আবু আমর আল-কিন্দি (রাহ.) বলেন,
قَالَ أَبُو عَمْرٍو الْكِنْدِيُّ، قَالَ: أَغَارَتِ الرُّومُ عَلَى جَوَامِيسَ لِبَشِيرٍ الطَّبَرِيِّ نَحْوٌ مِنْ أَرْبَعِمِائَةِ جَامُوسٍ قَالَ: فَاسْتَرْكَبَنِي فَرَكِبْتُ مَعَهُ أَنَا وَابْنٌ لَهُ قَالَ: فَلَقِيَنَا عَبِيدُهُ الَّذِينَ كَانُوا مَعَ الْجَوَامِيسِ مَعَهُمْ عِصِيُّهُمْ قَالُوا: يَا مَوْلَانَا ذَهَبَتِ الْجَوَامِيسُ فَقَالَ: «وَأَنْتُمْ أَيْضًا فَاذْهَبُوا مَعَهَا فَأَنْتُمْ أَحْرَارٌ لِوَجْهِ اللَّهِ» ، فَقَالَ لَهُ ابْنُهُ: يَا أَبَاهُ أَفْقَرْتَنَا فَقَالَ: «اسْكُتْ يَا بُنَيَّ إِنَّ رَبِّي عز وجل اخْتَبَرَنِي فَأَحْبَبْتُ أَنْ أَزِيدَهُ»
রোমান সৈন্যরা বাশির আত-তাবারির প্রায় চারশ মহিষ লুট করে নিয়ে গেল। তিনি আমাকে তাঁর সাথে বাহনে তুলে নিলেন, আমি এবং তাঁর এক ছেলে তাঁর সাথে সওয়ার হলাম। পথে তাঁর সেই গোলামদের সাথে আমাদের দেখা হলো যারা মহিষগুলো চরানোর দায়িত্বে ছিল, তাদের হাতে তখন কেবল লাঠিগুলোই অবশিষ্ট ছিল। তারা বলল, ‘হে আমাদের মনিব! মহিষগুলো সব চলে গেছে (লুট হয়ে গেছে)।’ তখন তিনি বললেন, ‘তোমরাও সেগুলোর সাথে চলে যাও, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমরাও আজ থেকে আজাদ (মুক্ত)।’ তখন তাঁর ছেলে তাঁকে বলল, ‘হে বাবা! আপনি তো আমাদেরকে নিঃস্ব করে ফেললেন!’ তিনি বললেন, ‘চুপ করো বাছা! নিশ্চয়ই আমার মহান রব আমাকে পরীক্ষা করেছেন, তাই আমি চাইলাম যে আমিও তাঁর সন্তুষ্টির জন্য আমার ত্যাগ আরও বাড়িয়ে দিই।’ (আর-রিদা আনিল্লাহি বিকাদাইহি, ইবনু আবিদ্দুনইয়া, পৃষ্ঠা: ৫৫)
سَبْرَةُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ بْنِ سَبْرَةَ، قَالَ: حَدَّثَنِي أَبِي، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: لَمَّا هَلَكَ عَبْدُ الْمَلِكِ بْنُ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ وَسَهْلُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ وَمُزَاحِمُ مَوْلَى عُمَرَ فِي أَيَّامٍ مُتَتَابِعَةٍ دَخَلَ عَلَيْهِ الرَّبِيعُ بْنُ سَبْرَةَ فَقَالَ: عَظَّمَ اللَّهُ أَجْرَكَ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ فَمَا رَأَيْتُ أَحَدًا أُصِيبَ بِأَعْظَمَ مِنْ مُصِيبَتِكَ فِي أَيَّامٍ مُتَتَابِعَةٍ وَاللَّهِ مَا رَأَيْتُ مِثْلَ ابْنِكَ ابْنًا وَلَا مِثْلَ أَخِيكَ أَخًا وَلَا مِثْلَ مَوْلَاكَ مَوْلًى قَطُّ فَطَأْطَأَ رَأْسَهُ فَقَالَ لِي رَجُلٌ مَعَهُ عَلَى الْوِسَادِ: لَقَدْ هَيَّجْتَ عَلَيْهِ قَالَ: ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ فَقَالَ: «كَيْفَ قُلْتَ لِى يَا رَبِيعُ؟» فَأَعَدْتُ عَلَيْهِ مَا قُلْتُ أَوَّلًا فَقَالَ: " لَا وَالَّذِي قَضَى عَلَيْهِ أَوْ قَالَ: عَلَيْهِمُ الْمَوْتَ مَا أُحِبُّ أَنَّ شَيْئًا كَانَ مِنْ ذَلِكَ لَمْ يَكُنْ ".
সাবরাহ ইবনু আবদিল আযীয ইবনু সাবরাহ তাঁর পিতার সূত্রে তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যখন খলিফা উমর ইবনু আবদিল আযীয (রাহ.)-এর পুত্র আবদুল মালিক, তাঁর ভাই সাহল ইবনু আবদিল আযীয এবং তাঁর আযাদকৃত গোলাম মুযাহিম পরপর কয়েক দিনের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করেন, তখন রাবী ইবনু সাবরাহ তাঁর কাছে প্রবেশ করে বললেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ আপনার প্রতিদানকে মহান করুন। পরপর কয়েক দিনে আপনার চেয়ে বড় বিপদে পড়তে আমি আর কাউকে দেখিনি। আল্লাহর কসম! আপনার ছেলের মতো কোনো ছেলে, আপনার ভাইয়ের মতো কোনো ভাই এবং আপনার গোলামের মতো কোনো গোলাম আমি কখনো দেখিনি।’ এ কথা শুনে খলিফা মাথা নিচু করলেন। তখন তাঁর সাথে একই বালিশে হেলান দিয়ে বসা এক ব্যক্তি আমাকে বললেন, ‘তুমি তো তাঁর শোককে উসকে দিলে!’ বর্ণনাকারী বলেন, এরপর খলিফা মাথা তুলে বলেন, ‘হে রাবী, তুমি যেন আমাকে কী বললে?’ আমি তখন পূর্বে যা বলেছিলাম তা পুনরায় বলি। তিনি বলেন, ‘কখনোই নয়; যে মহান সত্তা তাদের মৃত্যুর ফয়সালা করেছেন তাঁর কসম! যা কিছু ঘটেছে তার কোনো একটিও না ঘটুক—এমনটি আমি আদৌ পছন্দ করি না (অর্থাৎ আল্লাহর ফয়সালার ওপর আমি পূর্ণ সন্তুষ্ট)।’ (আর-রিদা আনিল্লাহি বিকাদাইহি, ইবনু আবিদ্দুনইয়া, পৃষ্ঠা: ১০৩)
কখনো বান্দার কল্যাণেই তাকে দুনিয়া থেকে বিরত রাখা হয়, কিন্তু সে-ই তা উপলব্ধি করতে পারে না। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. বলেন,
«وقال ابنُ مسعود: إنَّ العبد ليهمُّ بالأمرِ من التجارة والإِمارة حتَّى يُيسر له، فينظر الله إليه فيقول للملائكة: اصرفوه عنه، فإني إن يسرته له أدخلتُه النار، فيصرفه الله عنه، فيظل يتطيَّرُ يقول: سبقني فلان دهاني فلان، وما هو إلا فضل الله عز وجل.» «جامع العلوم والحكم»
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) বলেন: ‘বান্দা অনেক সময় ব্যবসা-বাণিজ্য বা নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের কোনো বিষয়ে প্রবল ইচ্ছা পোষণ করে, এমনকি তা তার জন্য প্রায় সহজও হয়ে আসে। তখন আল্লাহ তাআলা তার দিকে তাকান এবং ফেরেশতাদের বলেন, “এটি তার কাছ থেকে ফিরিয়ে নাও। কেননা আমি যদি এটি তার জন্য সহজ করে দিই (এবং সে তা পেয়ে যায়), তবে এর কারণে আমি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাব।” ফলে আল্লাহ তা তার কাছ থেকে সরিয়ে নেন। কিন্তু বান্দা তখন কুলক্ষণ ভাবতে থাকে এবং আক্ষেপ করে বলতে থাকে, “অমুক আমার আগে চলে গেল, অমুক আমার সাথে চাতুরী করল!” অথচ এটি তার প্রতি মহান আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ১/৪৭০)
পথ দুটোই স্পষ্ট। এবার আমাদের এখতিয়ার করার পালা। আসলে আমরা কোনটি চাই—পার্থিব প্রাপ্তি, নাকি অপার্থিব জীবনের অন্তহীন নিয়ামতের প্রাচুর্য?
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَأَمَّا مَنۡ أَعۡطَىٰ وَٱتَّقَىٰ . وَصَدَّقَ بِٱلۡحُسۡنَىٰ 6 فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلۡيُسۡرَىٰ . وَأَمَّا مَنۢ بَخِلَ وَٱسۡتَغۡنَىٰ 8 وَكَذَّبَ بِٱلۡحُسۡنَىٰ . فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلۡعُسۡرَىٰ . وَمَا يُغۡنِي عَنۡهُ مَالُهُۥٓ إِذَا تَرَدَّىٰٓ
সুতরাং যে দান করে ও তাকওয়া অবলম্বন করে, এবং যা উত্তম তা সত্য বলে গ্রহণ করে, আমি অচিরেই তার জন্য সহজ পথকে সুগম করে দেব। আর যে কৃপণতা করে ও নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করে, এবং যা উত্তম তা অস্বীকার করে, আমি অচিরেই তার জন্য কঠিন পথকে সুগম করে দেব। আর তার সম্পদ তার কোনোই কাজে আসবে না, যখন সে ধ্বংসে পতিত হবে। [সূরা আল-লাইল: ৫-১১]
অর্থাৎ, বান্দা নিজের জন্য যে পথ বেছে নিবে এবং যে পথে চলার চেষ্টা করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য সে পথই সহজ করে দিবেন। যেমনটি কুরআনের আরেক আয়াতে বলেছেন, যারা আমার পথে চলার জন্য মুজাহাদা করে, আমি অবশ্যই অবশ্যই তাদেরকে আমার পথ দেখাব।
مَّن كَانَ يُرِيدُ ٱلۡعَاجِلَةَ عَجَّلۡنَا لَهُۥ فِيهَا مَا نَشَآءُ لِمَن نُّرِيدُ ثُمَّ جَعَلۡنَا لَهُۥ جَهَنَّمَ يَصۡلَىٰهَا مَذۡمُومٗا مَّدۡحُورٗا . وَمَنۡ أَرَادَ ٱلۡأٓخِرَةَ وَسَعَىٰ لَهَا سَعۡيَهَا وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَأُوْلَٰٓئِكَ كَانَ سَعۡيُهُم مَّشۡكُورٗا . كُلّٗا نُّمِدُّ هَٰٓؤُلَآءِ وَهَٰٓؤُلَآءِ مِنۡ عَطَآءِ رَبِّكَۚ وَمَا كَانَ عَطَآءُ رَبِّكَ مَحۡظُورًا . ٱنظُرۡ كَيۡفَ فَضَّلۡنَا بَعۡضَهُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٖۚ وَلَلۡأٓخِرَةُ أَكۡبَرُ دَرَجَٰتٖ وَأَكۡبَرُ تَفۡضِيلٗا
যে কেউ এই নগদ জীবন (দুনিয়া) চায়, আমি সেখানে যাকে ইচ্ছা আমার ইচ্ছামতো দ্রুত দিয়ে দিই; পরন্তু তার জন্য নির্ধারণ করে রাখি জাহান্নাম, সেখানে সে প্রবেশ করবে নিন্দিত ও বিতাড়িত অবস্থায়। আর যে আখিরাত চায় এবং মুমিন অবস্থায় তার জন্য যথাযথ চেষ্টা-সাধনা করে, এমন লোকদের চেষ্টা-সাধনা তো মূল্যায়িত ও গৃহীত হবে। এদেরকে এবং ওদেরকে—প্রত্যেককেই আমি আপনার রবের দান থেকে সাহায্য করে থাকি, আর আপনার রবের দান তো কারও জন্য নিষিদ্ধ নয়। লক্ষ্য করুন, আমি কীভাবে তাদের এক দলকে অন্য দলের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি; আর আখিরাত তো মর্যাদায় মহত্তর এবং শ্রেষ্ঠত্বেও বৃহত্তর। [সূরা বনী ইসরাঈল: ১৮-২১]
مَن كَانَ يُرِيدُ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيۡهِمۡ أَعۡمَٰلَهُمۡ فِيهَا وَهُمۡ فِيهَا لَا يُبۡخَسُونَ . أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ لَيۡسَ لَهُمۡ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ إِلَّا ٱلنَّارُۖ وَحَبِطَ مَا صَنَعُواْ فِيهَا وَبَٰطِلٞ مَّا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ
যারা দুনিয়ার জীবন ও তার জাঁকজমক কামনা করে, আমি তাদেরকে তাদের কাজের পূর্ণ ফল দুনিয়াতেই দিয়ে দিই এবং সেখানে তাদেরকে কিছুমাত্র কম দেওয়া হবে না। এরাই তারা, যাদের জন্য আখিরাতে আগুন ছাড়া আর কিছুই নেই; আর তারা দুনিয়াতে যা কিছু করেছিল তা নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তারা যা করত তা সবই পণ্ডশ্রম। [সূরা হুদ: ১৫-১৬]
مَن كَانَ يُرِيدُ حَرۡثَ ٱلۡأٓخِرَةِ نَزِدۡ لَهُۥ فِي حَرۡثِهِۦۖ وَمَن كَانَ يُرِيدُ حَرۡثَ ٱلدُّنۡيَا نُؤۡتِهِۦ مِنۡهَا وَمَا لَهُۥ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِن نَّصِيبٍ
যে আখিরাতের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য তার ফসল বাড়িয়ে দিই; আর যে দুনিয়ার ফসল কামনা করে, আমি তাকে তা থেকেই কিছু দিয়ে দিই, কিন্তু আখিরাতে তার জন্য কোনো অংশই থাকবে না। [সূরা আশ-শূরা: ২০]
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : إِنَّ اللهَ قَسَمَ بَيْنَكُمْ أَخْلَاقَكُمْ ، كَمَا قَسَمَ بَيْنَكُمْ أَرْزَاقَكُمْ ، وَإِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يُعْطِي الدُّنْيَا مَنْ يُحِبُّ وَمَنْ لَا يُحِبُّ ، وَلَا يُعْطِي الدِّينَ إِلَّا لِمَنْ أَحَبَّ ، فَمَنْ أَعْطَاهُ اللهُ الدِّينَ فَقَدْ أَحَبَّهُ..
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের মাঝে তোমাদের চরিত্র ও স্বভাব বণ্টন করে দিয়েছেন, যেভাবে তিনি তোমাদের মাঝে তোমাদের রিযিক বণ্টন করেছেন। আর নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন এবং যাকে ভালোবাসেন না—উভয়কেই দুনিয়া দান করেন; কিন্তু তিনি কেবল তাকেই দ্বীন দান করেন যাকে তিনি ভালোবাসেন। সুতরাং আল্লাহ যাকে দ্বীন দান করেছেন, তিনি অবশ্যই তাকে ভালোবেসেছেন।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম: ১/৩৩, হাদিস: ৯৫; মুসনাদে আহমাদ: ২/৮৫৫, হাদিস: ৩৭৪৬; মুসনাদে ত্বয়ালিসি: ১/২৩৭, হাদিস: ২৯৪; মুসনাদে বাযযার: ৫/৩৪৭, হাদিস: ১৯৭৬; মুসান্নাফে ইবনু আবি শাইবাহ: ১৫/৩৪৭, হাদিস: ৩০৩৪৪; আল-মুজামুল কাবীর লিত-তাবারানি: ৯/২০৩, হাদিস: ৮৯৯০; আল-মুজামুল আওসাত: ৭/৩৫৯, হাদিস: ৭৭২৮)
মুমিনের সফলতা যেখানে নিহিত
কুরআন আমাদের সফলতা যেভাবে চিত্রায়ন করে
الٓمٓ . ذَٰلِكَ ٱلۡكِتَٰبُ لَا رَيۡبَۛ فِيهِۛ هُدٗى لِّلۡمُتَّقِينَ . ٱلَّذِينَ يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡغَيۡبِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَمِمَّا رَزَقۡنَٰهُمۡ يُنفِقُونَ . وَٱلَّذِينَ يُؤۡمِنُونَ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبۡلِكَ وَبِٱلۡأٓخِرَةِ هُمۡ يُوقِنُونَ . أُوْلَٰٓئِكَ عَلَىٰ هُدٗى مِّن رَّبِّهِمۡۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ
আলিফ, লাম, মিম। এটি সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য এটি পথ-নির্দেশ, যারা অদৃশ্যে ইমান আনে, সালাত কায়েম করে ও তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দান করেছি তা হতে ব্যয় করে। এবং তোমার প্রতি যা নাযিল হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তাতে যারা ইমান আনে ও আখিরাতে যারা নিশ্চিত বিশ্বাসী তারাই তাদের প্রতিপালক নির্দেশিত পথে রয়েছে এবং তারাই সফলকাম। [সুরা বাকারা : ১-৫]
قَدۡ أَفۡلَحَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ . ٱلَّذِينَ هُمۡ فِي صَلَاتِهِمۡ خَٰشِعُونَ . وَٱلَّذِينَ هُمۡ عَنِ ٱللَّغۡوِ مُعۡرِضُونَ . وَٱلَّذِينَ هُمۡ لِلزَّكَوٰةِ فَٰعِلُونَ . وَٱلَّذِينَ هُمۡ لِفُرُوجِهِمۡ حَٰفِظُونَ . إِلَّا عَلَىٰٓ أَزۡوَٰجِهِمۡ أَوۡ مَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُهُمۡ فَإِنَّهُمۡ غَيۡرُ مَلُومِينَ . فَمَنِ ٱبۡتَغَىٰ وَرَآءَ ذَٰلِكَ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡعَادُونَ . وَٱلَّذِينَ هُمۡ لِأَمَٰنَٰتِهِمۡ وَعَهۡدِهِمۡ رَٰعُونَ . وَٱلَّذِينَ هُمۡ عَلَىٰ صَلَوَٰتِهِمۡ يُحَافِظُونَ . أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡوَٰرِثُونَ . ٱلَّذِينَ يَرِثُونَ ٱلۡفِرۡدَوۡسَ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ . وَلَقَدۡ
অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা বিনয়-নম্র নিজেদের সালাতে, যারা অসার ক্রিয়াকলাপ হতে বিরত থাকে, যারা যাকাতদানে সক্রিয়, যারা নিজেদের যৌন অংগকে সংযত রাখে নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসিগণ ব্যতীত, এতে তারা নিন্দনীয় হবে না এবং কেউ এদের ছাড়া অন্য কাউকে কামনা করলে তারা হবে সীমালংঘনকারী। এবং যারা নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এবং যারা নিজেদের সালাতে যত্নবান থাকে, তারাই হবে অধিকারী। অধিকারী হবে ফিরদাওসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে। [সুরা মুমিনুন : ১-১২]
وَٱلۡوَزۡنُ يَوۡمَئِذٍ ٱلۡحَقُّۚ فَمَن ثَقُلَتۡ مَوَٰزِينُهُۥ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ . وَمَنۡ خَفَّتۡ مَوَٰزِينُهُۥ فَأُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ خَسِرُوٓاْ أَنفُسَهُم بِمَا كَانُواْ بِـَٔايَٰتِنَا يَظۡلِمُونَ
সেদিনের ওজন করা সত্য। যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে, যেহেতু তারা আমার নিদর্শনসমূহকে প্রত্যাখ্যান করত। [সুরা আরাফ : ৮-৯]
كُلُّ نَفۡسٖ ذَآئِقَةُ ٱلۡمَوۡتِۗ وَإِنَّمَا تُوَفَّوۡنَ أُجُورَكُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۖ فَمَن زُحۡزِحَ عَنِ ٱلنَّارِ وَأُدۡخِلَ ٱلۡجَنَّةَ فَقَدۡ فَازَۗ وَمَا ٱلۡحَيَوٰةُ ٱلدُّنۡيَآ إِلَّا مَتَٰعُ ٱلۡغُرُورِ
জীবনমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দেওয়া হবে। যাকে অগ্নি হতে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে দাখিল করা হবে সে-ই সফলকাম এবং পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়। [সুরা আলু ইমরান : ১৮৫]
সুতরাং সরল কথা হলো, আমাদের চূড়ান্ত সফলতা অর্জিত হবে জাহান্নাম থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর অনুগ্রহে জান্নাতে প্রবেশ করার মাধ্যমে। আর দুনিয়াতে কোনো ব্যক্তি সফলতার ওই পথে সঠিক পন্থায় এগুচ্ছে কি না তা বুঝতে পারব কুরআনের ওই আয়াতগুলো দিয়ে, যেখানে সফল মুমিনের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচিত হয়েছে।
আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান হওয়ার চূড়ান্ত মানদণ্ড
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,
إِنَّ أَكۡرَمَكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ أَتۡقَىٰكُمۡۚ
তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসমপন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী। [সুরা হুজুরাত : ১৩]
সুতরাং ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদার মাপকাঠি পার্থিব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নয়, বরং তার তাকওয়াই একমাত্র চূড়ান্ত মানদণ্ড।
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি উভয় ক্ষেত্রে করণীয় : ধৈর্য ও শোকর
জীবনকে সরলভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে—প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, সচ্ছলতা-অসচ্ছলতা, সুখ-দুঃখ বা হাসি-কান্না। যেভাবেই বলি না কেন; আমাদের জীবনের দুই প্রান্তকেই নির্দেশ করে। বিপরীতমুখী এ দুই অবস্থার সমষ্টিই আমাদের পুরো জীবন। আর পুরো জীবনকে কল্যাণময় করার জন্য রাসূল (সা.)-এর এ একটি হাদিসই আমাদের জন্য যথেষ্ট, যার সারকথা হলো—নিয়ামত প্রাপ্তির সময় শুকরিয়া আদায় করা আর বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা। তাহলেই আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠবে কল্যাণময়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَبَشِّرِ ٱلصَّٰبِرِينَ
আর আপনি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দিন। [সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৫]
وَإِذۡ تَأَذَّنَ رَبُّكُمۡ لَئِن شَكَرۡتُمۡ لَأَزِيدَنَّكُمۡۖ وَلَئِن كَفَرۡتُمۡ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٞ
আর স্মরণ করো, যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে বাড়িয়ে দেব; আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর।’ [সূরা ইবরাহীম: ৭]
إِنَّمَا يُوَفَّى ٱلصَّٰبِرُونَ أَجۡرَهُم بِغَيۡرِ حِسَابٖ
ধৈর্যশীলদেরকে তো তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণরূপে দেওয়া হবে বিনা হিসাবে। [সূরা আয-যুমার: ১০]
«عن صهيب، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم "عجبا لأمر المؤمن. إن أمره كله خير. وليس ذاك لأحد إلا للمؤمن. إن أصابته سراء شكر. فكان خيرا له. وإن أصابته ضراء صبر. فكان خيرا له".»
সুহাইব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মুমিনের বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর! তার সবকিছুই তার জন্য কল্যাণকর। আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্যই নয়। যদি তার কোনো খুশির বিষয় বা সচ্ছলতা আসে, তবে সে শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি তার কোনো বিপদ বা অসচ্ছলতা আসে, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তা-ও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’ (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: «أَوَّلُ مَنْ يُدْعَى إِلَى الْجَنَّةِ الَّذِينَ يَحْمَدُونَ اللَّهَ عَلَى السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ»
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম জান্নাতে ডাকা হবে সেইসব লোকদেরকে, যারা সুখে ও দুঃখে (সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতায়) সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা করে।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম: ১/৫০২, হাদিস: ১৮৫৭; মুসনাদে বাযযার: ১১/২৪৭, হাদিস: ৫০২৯; আল-মুজামুল কাবীর লিত-তাবারানি: ১২/১৯, হাদিস: ১২৩৪৫; আল-মুজামুল আওসাত: ৩/২৪০, হাদিস: ৩০৩৩; আল-মুজামুস সগীর: ১/১৮১, হাদিস: ২৮৮)
রাসূল সা.-এর সেই হাদিসটির মাধ্যমেই আমাদের কথার ইতি টানছি-
«عن صهيب، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم "عجبا لأمر المؤمن. إن أمره كله خير. وليس ذاك لأحد إلا للمؤمن. إن أصابته سراء شكر. فكان خيرا له. وإن أصابته ضراء صبر. فكان خيرا له".»
সুহাইব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘মুমিনের বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর! তার সবকিছুই তার জন্য কল্যাণকর। আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্যই নয়। যদি তার কোনো খুশির বিষয় বা সচ্ছলতা আসে, তবে সে শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি তার কোনো বিপদ বা অসচ্ছলতা আসে, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তা-ও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’ (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেকের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কল্যাণময় করে তুলুন। আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
মূর্তি ও ভাস্কর্য : যুগে যুগে শিরকের সর্ববৃহৎ প্রণোদনা
...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (২য় পর্ব)
...
মূর্তি ও ভাস্কর্যপ্রীতি : ইসলাম কী বলে?
ইসলামের যে বিষয়গুলোর নিষিদ্ধতা অকাট্য ও মুতাওয়াতিরভাবে প্রমাণিত তার মধ্যে প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণ ...
তাহাফফুযে খতমে নবুওত ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়
الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونؤمن به ونتوكل عليه،ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا،...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন