প্রবন্ধ
সীরাত ও মীলাদের পার্থক্য: কোনটি অনুসরণ করবো
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
২৩৬
০
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ।
وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ سَيِّدَنَا وَسَنَدَنَا وَحَبِيبَنَا وَمَوْلَانَا مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، صَلَّى اللَّهُ تَعَالَى عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَبَارَكَ وَسَلَّمَ تَسْلِيمًا كَثِيرًا كَثِيرًا। أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ، بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيم:
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا﴾
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
আয়াত নাজিলের পটভূমি ও শানে নুজুল
কুরআন মাজিদের ৫ পারার একটি আয়াতের শেষের কিছু অংশ আপনাদের
সামনে আমি তেলাওয়াত করেছি। এই আয়াতের এই অংশটি আল্লাহ তাআলা কেন নাজিল করেছেন, কোন ঘটনার কারণে নাজিল করলেন—এটি বুঝানো উদ্দেশ্য।
মূলত মদিনার মধ্যে দুইজন মানুষ, দুজনই দেখতে মুসলমান;
তাদের
মধ্যে ব্যক্তিগত কিছু বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিল। ব্যক্তিগত কী বিষয়ে
দ্বন্দ্ব—এটা নিয়ে অনেক ধরনের মতামত
কিতাবের মধ্যে পাওয়া যায়। যেই মতামতটি প্রসিদ্ধ, তা হলো: এক জায়গার একটি নালা
ছিল, পানি যাওয়ার রাস্তা ছিল—সেই বিষয়ে দুইজনের মধ্যে কিছু কথা কাটাকাটি হয়েছে।
যদি মসজিদে নববীর আশপাশে মদিনা এলাকায় কারো মধ্যে
কথাবার্তায় কাটাকাটি হতো, কোনো মনমালিন্যতা
দেখা দিত, তাহলে তারা দুনিয়াবি কোনো
ব্যক্তির কাছে বিচারের জন্য যেতেন না। তাদের একমাত্র বিচারক ছিলেন রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। উনার কাছেই বিচার নিয়ে যেতেন। এমনকি অমুসলিম
ইয়াহুদি-নাসারা যারা, তারাও নিজেদের মধ্যে
কোনো সমস্যা হলে—তারা কিন্তু নবীজিকে
নবী বলে মানত না, কিন্তু তা সত্ত্বেও
নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হলে তারা বিচার-শালিসের জন্য আমাদের নবীজির কাছে আসত। কারণ
তাদের মনের ভিতরে আস্থা ছিল যে, এই লোকটার সাথে
আমাদের ধর্মের দ্বন্দ্ব থাকতে পারে, কিন্তু সেই লোক কোনো
সময় বেইনসাফি বিচার করবে না।
তো যেই দুইজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে, এই দুইজনের মধ্যে একজন ছিলেন আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের সাহাবী। আর আরেকজন ছিলেন নবীজির সাথে এসে নামাজ পড়তেন, কথাবার্তা বলতেন,
ভালোবাসার
প্রকাশ করতেন; কিন্তু ভিতরে ভিতরে পিছনে পিছনে
নবীজির বদনাম করতেন—তাদেরকে শরীয়তের
ভাষায় বলা হয় 'মুনাফিক'। দেখতে উভয়ই মুসলমান, কিন্তু একজন মনের থেকে মুসলমান, আর আরেকজন বাহ্যিকভাবে মুসলমান। এই দুইজনের মধ্যে
জায়গা/পানি নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিল। তারা আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের
কাছে বিচারের জন্য চলে আসলেন।
মুনাফিক বলতেছিল,
"নবীজি
তো অনেক বড় মানুষ ঠিক আছে, বাকি মদিনার মধ্যে
আরেকজন বড় ব্যক্তি আছে—সে হলো তাওরাতের অনেক
বড় আলেম, তার নাম ছিল কাব ইবনে
আশরাফ।" (সেই লোক আমাদের নবীজির উপরে ঈমান আনে নাই)। "আমরা তো নবীজিকে মানি, উনি তো আমাদের ধর্মগুরু, উনি তো আমাদের নেতা—সব ঠিক আছে; কিন্তু এই বিচারটা কাব ইবনে আশরাফ করলে ভালো হয়।" এই
কথা ওই মুনাফিক বলতেছিল।
কিন্তু মুমিন সাহাবী বলতেছিলেন, "যিনি আমার ধর্মের নেতা, তিনি আমার ভাষারও নেতা, তিনি আমার পারিবারিক নেতা, তিনি আমার সমাজের
নেতা, তিনি আমার রাষ্ট্রের নেতা, তিনি আমার সব! এইজন্য আমি অন্য কারো কাছে যাব না, আমি তাঁর (নবীজির) কাছেই যাব।"
যাই হোক, নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব
হয়ে কথা কাটাকাটি হয়ে উনারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে
গেলেন। মুনাফিক নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে খুব দলিল-প্রমাণ
দিয়ে প্রমাণ করতে চাইল যে, এই হকটা মূলত আমার হক, এটা ওই মুমিন পাবে না। কিন্তু মুমিন যারা হয়, তারা আবার অনেক বেশি চাপাবাজ হয় না। নিজের কথাটা বলে দেয়; এরপরে যদি বিচার নিজের বিপক্ষেও যায়, তারপরও তেমন কিছু করেন না, আল্লাহর জন্য সবকিছু মেনে নেন। তো সাহাবী শুধু নিজের কথাটা বলে ফেললেন, বলে ফেলার পরে উনি চুপ হয়ে গেলেন।
কিন্তু আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো
বড় বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন। উনি তো একজনের চাপাবাজির কারণে তার দিকে আকৃষ্ট হওয়ার
মতো মানুষ না। উনি সব কথাবার্তা শুনে দেখলেন যে, সে যতই দলিল-প্রমাণ দিক না কেন, আসলে এই জায়গাটার
মূল হকদার হলো এই সাহাবী। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফয়সালা করলেন যে, "এই জায়গার মূল হকদার এই সাহাবী, আমি তার জন্যই ফয়সালা করে দিলাম।"
হযরত ওমর (রাঃ)-এর ফয়সালা
সেখান থেকে বের হয়ে আসার পর মুনাফিক বলতেছে, "নবীজি যে ফয়সালা করলেন, এই ফয়সালা আমি মানি না; চল আবু বকরের কাছে যাই।"
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে উনারা গেলেন। আবু
বকর রা. বললেন: "নবীজি যা ফয়সালা করছেন, আমি এই ফয়সালার উপরেই রাজি আছি। আমি অন্য কোনো ফয়সালা করব না।" এ কথা
বলে আবু বকর বিদায় দিয়ে দিলেন।
এবার মুনাফিক নিজেই বলে, "আবু বকর তো কথা ঠিকমতো বলল না, চল আমরা ওমরের কাছে যাই। কারণ ওমর ভালো ফয়সালা করতে
পারবে।"
পরে উনারা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাসায় গেলেন।
বাসায় যাওয়ার পরে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দরজায়েআওয়াজ দিলেন। উনি
দরজা খুলছেন। দরজা খোলার পরে মুমিন তো কিছু বলে না, মুমিন তো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মুনাফিক বলতেছে, "এই যে দেখেন—এই যুক্তি, এই যুক্তি, এই যুক্তি... এইসব কারণে এই জিনিসটা আমার হওয়া দরকার।
কিন্তু নবীজির কাছে গিয়েছিলাম, নবীজি এই ফয়সালা
করছেন। আপনার কাছে আসছি যে, আপনি আমার জন্য ভালো কোনো ফয়সালা করবেন।"
হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন যে, "আমি ভালো ফয়সালা করব, তবে এক মিনিট দাঁড়াও।"
উনারা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু
তাআলা আনহু বাসার ভিতর থেকে তলোয়ার নিয়ে আসছেন। বাইরে এসে বললেন, "যেই লোক নবীজির ফয়সালার পরে, নবীজির সিদ্ধান্তের পরে আরেকটা কথা বলার সাহস করে—তার জন্য আমার ফয়সালা হলো এই তলোয়ার! আর কোনো ফয়সালা নাই, এই তলোয়ার দিয়ে আমি তার গর্দানটাকে আলাদা করে দিব। এটাই
আমার সিদ্ধান্ত!"
কুরআনের ঘোষণা ও নবীজির আনুগত্যের গুরুত্ব
৫ পারার যে আয়াত আজকে আপনাদের সামনে তেলাওয়াত করেছি, এই আয়াত এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন। কার পক্ষ নিয়ে নাজিল করলেন? হযরত ওমরের পক্ষ নিয়ে নাজিল করলেন! আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَلَا وَرَبِّکَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ حَتّٰی یُحَکِّمُوۡکَ فِیۡمَا شَجَرَ بَیۡنَہُمۡ ثُمَّ لَا یَجِدُوۡا فِیۡۤ اَنۡفُسِہِمۡ حَرَجًا مِّمَّا قَضَیۡتَ وَیُسَلِّمُوۡا تَسۡلِیۡمًا
অর্থ: (হে নবী!) তোমার
প্রতিপালকের শপথ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজেদের পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদের ক্ষেত্রে
তোমাকে বিচারক মানবে, তারপর তুমি যে রায়
দাও, সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে
কোনওরূপ কুণ্ঠাবোধ না করবে এবং অবনত মস্তকে তা গ্রহণ করে নেবে। সূরা নিসা, ৬৫
আয়াতের মর্ম কী?
আল্লাহ
তাআলার তো কসম খাওয়ার কোনো দরকার নাই,
আল্লাহ
তো একটা কথা বললেই হয়। সেখানে কসম অনেক উপরের তাকিদ। আল্লাহ তাআলা আয়াতের মধ্যে
কসম খেয়ে বলেন: "হে নবী! আপনার রবের কসম!" আল্লাহ নিজেই বলতেছেন, "আপননার রবের কসম, মুসলমানদের মধ্যে যদি কোনো বিষয় বাকবিতণ্ডা দেখা যায়, যদি কোনো দ্বন্দ্ব দেখা যায়, যদি কোনো বিষয় নিয়ে কোনো সমাধানে আসার প্রয়োজন মনে হয়, তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মানুষ আপনার ফয়সালার উপরে পূর্ণ
রাজি হতে পারবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মুসলমানই
হতে পারে নাই! সে এখনো মুমিন হইতে পারে নাই।"
আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্তই আল্লাহ তাআলারই সিদ্ধান্ত। আমাদের নবীজি যে সিদ্ধান্ত দিবেন, সেটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসা সিদ্ধান্ত। এইজন্য আল্লাহ তাআলা এই ৫ পারায় আরেক জায়গায় বলছেন
مَنۡ
یُّطِعِ الرَّسُوۡلَ فَقَدۡ اَطَاعَ اللّٰہَ
অর্থ: যে ব্যক্তি
রাসূলের আনুগত্য করে সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।(সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮০)
কেউ যদি নবীজির অনুসরণ করে, নবীজিকে মেনে চলে, তাহলে এটা এমন না যে
শুধু একজন মানুষকে মানা হলো; বরং কেউ যদি নবীজিকে
মানে, সে কেমন যেন স্বয়ং আল্লাহ
তাআলাকে মানল!
এরপরে আল্লাহ তাআলা ওই আয়াতে বলেন:
ثُمَّ لَا یَجِدُوۡا فِیۡۤ اَنۡفُسِہِمۡ
حَرَجًا مِّمَّا قَضَیۡتَ وَیُسَلِّمُوۡا تَسۡلِیۡمً
নবীজির কাছে আসার পরেও নবীজি যেই সিদ্ধান্ত দিয়ে দিবেন, এই সিদ্ধান্ত হওয়ার পর মনের মধ্যে কোনো ধরনের
দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকতে পারবে না যে,
"আহা!
এই সিদ্ধান্ত না হয়ে ঐ সিদ্ধান্ত হলেই ভালো হতো।" এতটুকু হীনমন্যতা, এতটুকু দোদুল্যমান অবস্থা যার মধ্যে থাকে, সেই মানুষও এখন পর্যন্ত মুমিন হইতে পারে নাই!
তার মানে আমরা নিজেদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত বলি, সামাজিক সিদ্ধান্ত বলি, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বলি, অন্য যত সিদ্ধান্ত
বলি—এই সমস্ত সিদ্ধান্তের মধ্যে
আল্লাহ এবং তার রাসূল যে সিদ্ধান্ত জানান,
সেটাই
হলো আসল সিদ্ধান্ত। আর আল্লাহ এবং তার রাসূলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অনেক ধরনের
যুক্তি-প্রমাণ ইত্যাদি দিয়ে দিয়ে মনে হচ্ছে যে, এই জিনিসটা করা আমাদের জন্য বেশি
ভালো, অথচ ওই কাজ নবীজির থেকেও নাই, সাহাবায়ে কেরামের থেকেও নাই—তাহলে বুঝতে হবে যত ধরনের যুক্তি-প্রমাণই থাকুক না কেন, ওই জিনিসের পিছনে যারা দৌড়াবে, তারা এখন পর্যন্ত পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারে নাই।
অনেক সময় আমাদের সমাজে এমন অনেক কিছু আসে, যা বাহ্যিকভাবে অন্য কিছুর চাইতে অনেক ভালো মনে হয়।
লেবাস-পোশাকের দিক থেকে, মাইকিং-প্রচার
প্রচারণার দিক থেকে, অন্যান্য বিভিন্ন
মাধ্যমে দেখতে মনে হয় যে এই জিনিসটাতে তো কোনো খারাপ কিছু নাই! কিন্তু সেই
জিনিসটা কোনো নবীর তরিকার মধ্যেও নাই,
সাহাবায়ে
কেরামের কোনো তরিকার মধ্যেও নাই—এই জিনিসটা যতই ভালো
লেবাস ধরে আসুক না কেন, যত ভালো জিনিস ধরে
আসুক না কেন, এই জিনিসটা কোনো সময় ভালো না, এই জিনিসটা কোনো সময় উপকারী না।
সিরাতুন্নবী (সাঃ) ও এর পরিধি
এই জিনিসটা যদি বুঝে থাকেন, তাহলে আপনাদেরকে একটা জিনিস বুঝাই। সেটা হলো—আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুরা জীবন, একদম আমাদের নবীজি দুনিয়াতে আসা থেকে নিয়ে নবীজি
সংক্রান্ত যত ঘটনা আছে, আমাদের নবীজির একদম
জীবনের শেষ পর্যন্ত ইন্তেকাল পর্যন্ত—মোট আমাদের নবীজি
দুনিয়াতে হায়াত পেয়েছিলেন ৬৩ বছর। এই ৬৩ বছরের পুরা জীবনকে বলা হয় হলো "সিরাত"।
আমাদের নবীজির পুরা ৬৩ বছরের জীবনকে কী বলা হয়? সিরাত। এটাকে যদি আরেক শব্দ বাড়িয়ে দেন, সেটা হলো
"সিরাতুন্নবী"। মানে হলো নবীজির
সিরাত—অর্থাৎ নবীজির পুরা জীবন।
আর নবীজির জীবনের একেকটা সাইড, একেকটা দিক নিয়ে কেউ যদি গবেষণা করে, তাহলে প্রত্যেকটা জিনিসকে নিয়ে আলাদা আলাদা গবেষণা করা
যাবে। যেমন:
· নবীজির জীবনের যুদ্ধ নিয়ে
কেউ যদি গবেষণা করে, তাহলে বলা হবে জিহাদুন্নবী (নবীজির জিহাদ)।
· নবীজির জীবনের পারিবারিক
অবস্থা কেমন ছিল, তা নিয়ে যদি কেউ
গবেষণা করে, তাহলে তার নাম হবে উসরাতুন্নবী (নবীজির পরিবার)।
· নবীজির জীবনের সন্তানাদি এবং
তাঁর বিবিদেরকে নিয়ে কেউ যদি গবেষণা করে,
তাহলে
এটাকে বলা হবে আহলু বাইতিন নবী (নবীজির ঘরের অবস্থা)।
ঠিক এইভাবে আপনি যদি ধারাবাহিকভাবে ভাগ করতে থাকেন—আমাদের নবীজির জীবনী,
আমাদের
নবীজি সাহাবীদেরকে কীভাবে শিখাইতেন, কোন বিষয় কত ঢঙে সাহাবীদের
ভুলগুলো শুধরিয়ে দিতেন—এগুলো নিয়ে যদি
গবেষণা করা হয়, এটার নাম হবে তালিমুন্নবী (নবীজির শিক্ষা-দীক্ষা)। নবীজির নামাজ নিয়ে যদি আলাদা
গবেষণা করা হয়, তার নাম হবে সালাতুন্নবী (নবীজির নামাজ)।
কিন্তু এই সবগুলো আলাদা হলেও এদের ভিতর একটা বড় রেখা আছে—সেই পুরাটার নাম হলো সিরাতুন্নবী (নবীজির সিরাত/নবীজির
জীবন)। এই সিরাত থেকে আলাদা আলাদা পয়েন্ট,
আলাদা
আলাদা ডিপার্টমেন্ট বা শাখা বের করা সম্ভব। কিন্তু যত শাখাই বের করি না কেন, সমস্ত শাখা মূল গিয়ে ফিরবে কার দিকে? সিরাতের দিকে! নবীজির মূল হলো পুরা ৬৩ বছরের জীবনটা হলো
নবীজির সিরাত।
মিলাদুন্নবী (সাঃ) ও অলৌকিক ঘটনাবলী
আর নবীজির জীবনের শুধু জন্ম নিয়ে—শুধুই জন্ম; নবীজির জন্মের সময়
কী হয়েছিল, নবীজির জন্ম কোন মাসে হয়েছিল, নবীজির জন্ম কত তারিখে হয়েছিল, নবীজির জন্মের সময় কী কী ঘটনা ঘটছিল, নবীজির জন্মের আগে তাঁর বাবার অবস্থা কী ছিল, নবীজির জন্মের পরে তাঁর মায়ের অবস্থা কী ছিল—ইত্যাদি ইত্যাদি সব বিষয় নিয়ে যদি গবেষণা করা হয়, এটার নাম হয়
"মিলাদুন্নবী"।
'মিলাদ' মানে জন্ম। মিলাদ মানে কী?
জন্ম। যে কেউ আরবি ভাষা সম্পর্কে জানেন, তারা
জানেন যে সন্তানকে আরবিতে বলা হয় 'ওলাদ' (যার জন্ম হয়েছে)। বাবাকে বলা হয় 'ওয়ালেদ'
(যে জন্ম দিয়েছে)। মাকে বলা হয় 'ওয়ালেদা'
(যিনি জন্মদাত্রী)। এই সবগুলো যারাই জন্ম দেয় বা জন্ম হয়, এই সবগুলোর সমষ্টির নাম হলো মিলাদ।
আমাদের দেশে অবশ্য মিলাদ বলতে বুঝায় হলো, দোকান উদ্বোধন
করা, বাড়ি উদ্বোধন করা—ওখানে গিয়ে কিছু মিলাদ মাহফিল করাকে মিলাদ বলা হয়। কিন্তু
আরবিতে এটাকে মিলাদ বলা হয় না। আরবিতে মিলাদ মানে হলো নবীজির জন্ম নিয়ে আলোচনা
করা, নবীজির জন্ম বিষয়ে কথাবার্তা
বলা, নবীজির জন্ম নিয়ে রিসার্চ
করা, জন্মের আগে-পরে কী হয়েছে সেগুলো
নিয়ে গবেষণা করা।
এরকম গবেষণা যদি করতে যান, গবেষণার কোনো শেষ হবে না। আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
দুনিয়াতে আসার ৫০০ বছর আগে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম দুনিয়াতে ছিলেন। ঈসা আলাইহিস
সালাম দুনিয়াতে আসারও ৫০০ বছর আগে—তার মানে আমাদের
নবীজির জন্মের কত বছর আগে? ১০০০ বছর আগে!
পারস্যের মধ্যে কয়েক কিলোমিটার লম্বা বিশাল বড় গর্ত ছিল। যারা
আগুনকে মনে করত যে আগুন আমাদের খোদা—এদেরকে একটানে কী বলা
হয়? অগ্নিপূজক। এই অগ্নিপূজক যারা
ছিল, আগুন পূজারী যারা ছিল—এরা কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত লম্বা গর্ত করে সেই গর্তের
ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে রাখছিল। বিশাল আগুন দাউ দাউ করে জ্বলত! আর অগ্নিপূজারীরা
এমনও ছিল—নিজের সন্তান বেশি হয়ে গেলে, এই আগুনের ভিতরে নিক্ষেপ করে দেওয়াকে তারা সওয়াবের কাজ
মনে করত! যে সন্তান আগুনে জ্বলে ছাই হয়ে গেছে, আর এই আগুনটা আগের থেকে আরেকটু বেশি জ্বলেছে—"আমি অনেক সওয়াব পেয়েছি, কারণ আমার সন্তানকে
আগুনের মধ্যে আমি দিতে পারছি।" আর যে যত বেশি সন্তানকে এই আগুনে নিক্ষেপ করতে
পারত, সে তত বেশি নেককার—এটা মনে করত। কেউ তার বাসায় বিপদ-আপদ আসলে মান্নত করত, "আমি ওই আগুনের মধ্যে গিয়ে দুইটা কাঠ দিয়ে আসব, যাতে করে আগুনটা একটু ভালো জ্বলে।" অগ্নিপূজারীরা সারাদিন ২৪ ঘণ্টা আগুনের সামনে এসে
পূজা করত।
মক্কার মধ্যে যেদিন আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম দুনিয়াতে আসলেন, জন্মগ্রহণ করলেন—এই ১ হাজার বছর ধরে জ্বলে আসা এই আগুন হঠাৎ করে নিভে একদম
পুরা ছাই হয়ে গেল! অগ্নিপূজারীরা অবাক—যে আগুন হঠাৎ করে
নিভে গেল কেন? তাদের মধ্যে যারা জ্যোতিষী
ছিল, তারা বলতে শুরু করল, "আজকে এমন কেউ দুনিয়াতে আসছে যে এই আগুনের পূজাকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে দিবে!"
ওদিক দিয়ে আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
দুনিয়াতে আসলেন। উনার মা চাইলেন যে উনাকে খতনা করাবেন। উনার লজ্জাস্থানের দিকে
তাকিয়ে দেখেন যে, জন্ম হওয়ার আগেই
খতনা হয়েই তিনি দুনিয়াতে আসছেন! মা দেখলেন,
দাদার
কাছে গেলেন। (বাবা তো নাই, নবীজির বাবা তো পেটে
থাকা অবস্থায় আল্লাহর কাছে চলে গেছেন)। দাদার কাছে গেছেন যে, "আপনার নাতির একটা নাম রাখা দরকার।"
দাদা অনেকক্ষণ চিন্তাভাবনা করে বললেন, "আমার নাতির নাম 'মুহাম্মদ' রাখতে চাই—মুহাম্মদ।" ওই এলাকা, আশপাশের এলাকা—কেউ এই জাতীয় কোনো
নাম জীবনেও শুনে নাই। ওই সময় দাদাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি এই নাম কেন রাখলেন?"
ওলামায়ে কেরাম যারা আছেন তারা বুঝবেন, 'হাম্দ' বা 'তাহমীদ' (বাবে তাফঈল) থেকে যখন
কোনো মাসদার আসে, তখন তার অর্থ হয় অতি
প্রশংসা করা। সেখান থেকে যদি 'মুহাম্মদ' রাখা হয়, তার অর্থ হলো: এমন
মানুষ যেই মানুষটার অতি প্রশংসা করা হবে। উনি বললেন, দাদা বললেন, "আমি চাই আমার এই
নাতিকে যেন আল্লাহ তাআলা অতি প্রশংসাওয়ালা একজন নাতি বানান, তাঁর প্রশংসা করা হবে।"
আল্লাহ আব্দুল মুত্তালিবের এই কথাকে এমনভাবে কবুল করছেন যে, আজ পর্যন্ত আমরা আমাদের নবীজির প্রশংসা করতেছি! আল্লাহ তাআলা
কুরআনের মধ্যে আমাদের নবীজির প্রশংসা করেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের নবীজিকে আশ্চর্য
হয়ে আফসোস করে বলেন: "হে নবীজি! আপনার উম্মত জাহান্নামে যাবে—এই টেনশন আপনার মধ্যে এত বেশি দেখতে পাই, যে কারণে মনে হচ্ছে আপনি তো নিজেকে ধ্বংস করে দিবেন!"
আল্লাহ প্রশংসা করতেছেন।
তো এইভাবে আমাদের নবীজির জন্মের যে অবস্থাগুলো—এই সমস্ত অবস্থাগুলো নিয়ে আলোচনা করা, সমস্ত অবস্থা নিয়ে কথাবার্তা বলা, এগুলোকে বলা হয় মিলাদুন্নবী (নবীর মিলাদ/নবীর জন্ম
বৃত্তান্ত/নবীর জন্ম নিয়ে আলোচনা করা)।
সিরাত ও মিলাদের পার্থক্য এবং বাস্তবায়নের তাগিদ
কিন্তু একটা জিনিস আপনারাও সাধারণভাবেই বুঝে ফেলবেন যে—আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম নিয়ে
আলোচনা করা অনেক ফজিলতের কাজ, অনেক সওয়াবের কাজ, অনেক নেকের কাজ। কিন্তু আমাদের নবীজির জন্ম আমাদের জীবনে
বাস্তবায়ন করা
সম্ভব না!
কারো পক্ষে সম্ভব যে সে খতনা ছাড়া জন্ম হবে দুনিয়াতে? কারো পক্ষে সম্ভব যে উনি মায়ের পেটে ৯-১০ মাস থাকবে, কিন্তু মাকে একটা লাথিও মারবে না? এটা কোনোদিন সম্ভব?
আমাদের
নবীজি তো মাকে কোনো লাথি মারেন নাই! আমাদের নবীজি তো মাকে গর্ভে থাকা অবস্থায়
কোনো কষ্ট দেন নাই। কারো পক্ষে সম্ভব যে উনি যখন দুনিয়াতে আসবে, তখন একটা নূর বের হয়ে আসবে, যে নূরের কারণে তাঁর মা পশ্চিম আর পূর্বের সবকিছু দেখতে পাবে? এটা সম্ভব? সম্ভব না!
মিলাদুন্নবী নিয়ে,
নবীজির
মিলাদ নিয়ে আলোচনা করা, নবীজির মিলাদ নিয়ে
নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলা—এতে নিজেদের ঈমান
বাড়ে, নবীজির প্রতি বিশ্বাস বাড়ে, নবীজির প্রতি আলোচনা বাড়ে, নবীজির প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা বাড়ে যে আমাদের নবীজি কত পবিত্র ছিলেন! কিন্তু
নবীজির মিলাদ আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না।
কিন্তু
নবীজির
সিরাত—নবীজির জীবন, এই জীবন কিন্তু আমাদের বাস্তবায়ন করা সম্ভব তো বটেই, বরং বাস্তবায়ন করতে হবে! কেউ যদি নিজের জীবনে বাস্তবায়ন
করতে গিয়ে বলে যে, "আমি নবীজির সিরাতকে
মানি না, আমি অন্য কাউকে বিচারক হিসেবে
মানি যে নবীজির বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত দিবে"—তাহলে এই লোকটা এখন পর্যন্ত মুমিন হইতে পারে নাই! হযরত ওমরের ভাষায়—ওই লোকের কথা, যেই লোক সিরাতকে এখনো
পর্যন্ত মানতে পারল না, নবীর শিক্ষা-দীক্ষাকে
এখন পর্যন্ত মানতে পারল না, হযরত ওমরের ভাষায়
হলো তরবারি! তার সিদ্ধান্ত হবে কী দ্বারা?
তরবারি
দ্বারা!
তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে,
আমরা
যতদিন পর্যন্ত পুরা সিরাতুন্নবীকে আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন না করব, আমাদের জীবনের আলোচনার মধ্যে না আনব, ততদিন পর্যন্ত আমি পুরা পাক্কা মুমিন হইতে পারি নাই।
নবুওয়াতী ২৩ বছরের গুরুত্ব
আর সিরাতুন্নবীর ভিতরেও বিশেষ একটা জায়গা হলো—আমাদের নবীজির ৪০ বছর বয়সে যে নবুওয়াত প্রাপ্ত হয়েছেন, ওই সময় থেকে নিয়ে নবীজির ইন্তেকাল পর্যন্ত ২৩ বছরের জীবন।
এটা হলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই জীবনটা হলো আমার-আপনার আমলের জীবন। এর আগের যে
জীবন আছে, ওটা আমাদের আমলের জীবন না যে
ওটা আমাদের আমল করতে হবে।
ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য কি আমাদের সিরিয়া যাওয়া সুন্নত? আমাদের নবীজি তো ব্যবসা করতে খাদিজার দায়িত্ব নিয়ে
সিরিয়ায় গেছেন। তো আমাদেরও কি সিরিয়ায় যেতে হবে? যাওয়া কি জরুরি? না, কেউ গেলে গেল, না গেলে নাই। ৪০
বছরের আগের যে জীবন, এই জীবন আমাদের জন্য
এমন অনুসরণীয় না যে আমরা প্রতিটা ক্ষেত্রে সব ওটা অনুযায়ী করতে হবে। কিন্তু ৪০ বছরের পরের প্রত্যেকটা জিনিস আল্লাহর রাসূল
করেছেন। আল্লাহ তাআলা নিজেই ২৭ পারার মধ্যে বলেছেন (সূরা নান-নাজম):
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ إِنْ
هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ
নবীজি যদি মুখ দিয়ে একটা কথা উচ্চারণ করেন, আল্লাহ বলেন,
"তোমরা
মনে করো না, এটা উনি উনার নিজের মনমতো বলেন; আমি যে ওহী পাঠাই, ওই
ওহীটাই নবীর মুখ দিয়ে আমি বের করে দেই।"(সূরা আন-নাজম,
আয়াত: ৩-৪)
তাহলে আমাদের নবীজির ৪০ বছরের পর থেকে নিয়ে যা কথাবার্তা, যা সিদ্ধান্ত, যা তালিম—যত কিছু আছে, এগুলো সব আমাদের
নবীজির একার সিদ্ধান্ত না, এগুলো সব আল্লাহর
পক্ষ থেকে আসা সিদ্ধান্ত! আল্লাহ তাআলাই চেয়েছেন আমাদের নবীজিকে এইভাবে বড় করতে।
নবীজিকে ৪০ বছরের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ইসলামের শুরুতে বিধান দিয়েছেন, ইসলামের মাঝে আবার বিধান দিয়েছেন, ইসলামের শেষে গিয়ে বিধান পরিবর্তন করে উম্মতের জন্য
সিলমোহর মেরে দিয়েছেন—এটাই তোমাদের জন্য
শরীয়ত! এই পুরা জীবনটাকে ফলো করার নাম হলো সিরাতুন্নবী।
নবীজির সুন্নাহর অনুকরণ ও কাজা সালাতের শিক্ষা
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধে গেছেন।
যাওয়ার পরে বিশ্রাম নেওয়া দরকার। রাতের শেষ মুহূর্ত, সারারাত সফর করছেন,
বিশ্রাম
নেওয়া দরকার। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য একটা পাথরের আশপাশে বিভিন্ন জায়গায়
সাহাবীদেরকে নিয়ে তাবু গাড়লেন। আর বললেন যে, "অল্প কিছু রাত বাকি আছে, চল আমরা বিশ্রাম নিয়ে নেই, আমরা ঘুমিয়ে যাই।
বাকি দুইজনকে দায়িত্ব দেই, যারা আমাদেরকে ফজরের
সময় যখন হয়ে যাবে, আমাদেরকে জাগিয়ে
দিবে।"
বললেন যে,
"বেলালকে
দায়িত্ব দাও আর আরেকজনকে দায়িত্ব দাও।" তো দুইজনকে দায়িত্ব দিছেন। উনারা
দুইজন দায়িত্ব নিলেন। উনারা দুইজন পাহারাদারীর ভূমিকায় দুইজন দুই পাশে দাঁড়িয়ে
গেলেন। আর সব সাহাবায়ে কেরাম আমাদের নবীজি সহ ঘুমিয়ে গেলেন।
এখন দুইজন নিজেরা তো আমলী মানুষ। নিজেরা পরস্পর কথাবার্তা
বলতেছে যে, "দুইজন জাগ্রত থাকার
তো দরকার নাই। তুমিও সফর করছ, আমিও সফর করছি। আমি
একটু ঘুমিয়ে নেই, আর তুমি একটু জাগ্রত থাকো।"
"আচ্ছা ঠিক আছে।" উনি ঘুমিয়ে গেলেন। হযরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা
আনহু উনি জাগ্রত আছেন।
ঘুমের চাপ তো সবার মধ্যেই আছে। একটু পরে উনিও পাহারা দিতে
দিতে ঘুমিয়ে গেছেন। কারণ লম্বা জার্নি করলে,
লম্বা
সফর করলে আশপাশে খানা খেতেও মনে চায় না,
মনে হয়
যেন তাড়াতাড়ি ঘুমাই—এত অস্থির লাগে, এত খারাপ লাগে! হযরত বেলাল শরীরের দুর্বলতার কারণে ঘুমিয়ে গেছেন।
সূর্য উঠার পরে,
সূর্যের
যে রোদ আছে, সূর্যের যে তাপ ও আলো আছে—এই আলো আমাদের নবীজির চোখে পড়ছে। আমাদের নবীজি জাগ্রত
হইলেন। দেখলেন যে সূর্য উঠে গেছে,
"আমরা
তো ফজরের নামাজ পড়ি নাই!" নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এই পুরা জায়গার মধ্যে শয়তান এসে আমাদেরকে ঘুমে
রাখছে। আমাদেরকে ফজরের নামাজে উঠতে দেয় নাই। চল এক্ষুনি আমরা এই জায়গা ছেড়ে চলে
যাই।"
নবীজি এই জায়গা ছেড়ে একটু দূরে গিয়ে সব সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে এই ফজরের নামাজ
তাড়াতাড়ি কাজা আদায় করছেন। তাড়াতাড়ি কাজা আদায় করছেন কেন? যে না, নামাজে কোনো দেরি করা
যাবে না, নামাজ তাড়াতাড়ি আদায় করতে
হবে। এটা হলো নবীজির সিরাত, এটা হলো নবীজির আদর্শ।
নেক সুরতে শয়তানের ধোকা
সুতরাং আমরা এটা স্বীকার করি, এটা আমরা মানি যে—আমাদের নবীজির জন্ম
নিয়ে অনেক খুশি হওয়া উচিত, অনেক আলোচনা করা
উচিত। কিন্তু নবীজির জন্ম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে, রবিউল আউয়াল মাস আসার পরে আলোচনা করতে গিয়ে এমনভাবে আলোচনা করলাম যে, আলোচনা করতে করতে জোহরের নামাজও পড়লাম না, আসরের নামাজও পড়লাম না! স্টেজ সাজাইতে সাজাইতে ফজরের
নামাজও পড়লাম না; কারণ ৮টার মধ্যে
মুসল্লিরা আসবে, স্টেজ এমনভাবে সাজাতে
থাকলাম যে আমি ফজরের নামাজও পড়লাম না!
আমরা মনে করি এটা হলো নেক সুরতে শয়তানের ধোকা! নেক সুরতে শয়তানের ধোকা—যে নবীজির জন্ম নিয়ে
ব্যস্ত থাকো, নবীজি কীভাবে দুনিয়াতে আসছেন
তা নিয়ে ব্যস্ত থাকো, কোথায় আগুন নিভে
গেছে, নবীজির মায়ের কী অবস্থা
হয়েছে—এগুলো নিয়ে আলোচনা করতে থাকো; কিন্তু নামাজেরও দরকার নাই, রোজারও দরকার নাই!
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি সোমবারে রোজা
রাখতেন। এখনো মসজিদে নববীতে এবং মক্কা শরীফেও (বিশেষ করে মসজিদে নববীতে) সব
মুসল্লিরা কাতার হয়ে বসে যায়। আমাদের সফরেও হয়েছে—মাগরিবের আগে বসে আছি, হঠাৎ করে দেখি সৌদি
সরকারের পক্ষ থেকে সুন্দর প্যাকেটের মধ্যে আলাদা মাঠা, দই, খেজুর আরও বিভিন্ন
ধরনের খাবার—শত শত না, হাজার হাজার না,
মনে হয়
লাখের উপরে মানুষের কাছে খাবার বিতরণ হচ্ছে প্রতি সোমবারে মাগরিবের আজানের সময়!
কেন? পাশে একজন বলতেছে যে, "দেখেন,
১৪০০
বছর আগে একজন মানুষ—উনি সোমবার দিন রোজা
রাখতেন। আর বলছেন, 'আমি সোমবার দিন
এইজন্য রোজা রাখি যে আল্লাহ তাআলা সোমবার দিন আমাকে দুনিয়াতে পাঠাইছেন।' এই খুশিতে আমি প্রতি সোমবার দিন রোজা রাখি।"
তো আল্লাহর রাসূল প্রতি সোমবার দিন রোজা রাখতেন, আর সেই রোজাটাকে আল্লাহ তাআলা এমনভাবে কবুল করলেন যে এখন
পর্যন্ত এই নফল রোজার জন্য এত লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করা হচ্ছে, জায়গায় জায়গায় খরচ করা হচ্ছে! উত্তরায় এক মসজিদে নামাজ
পড়লাম সোমবার দিন, ওখানেও দেখলাম
মাগরিবের নামাজের সময় একপাশে আলাদাভাবে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে ইফতারির ব্যবস্থা
এবং প্রতি সোমবারে-বৃহস্পতিবার আলাদাভাবে ইফতারির ব্যবস্থা করা হয়। কেন? নবীজি প্রতি সোমবারে রোজা রাখতেন।
তাই চিন্তা করেন যে—নবীজি তাঁর জন্ম
উপলক্ষে উনি শুধু বছরে একবার না, প্রতি সপ্তাহে
সপ্তাহে নবীজি রোজা রাখতেন! আর আমরা নবীজির জন্মদিন পালন করতেছি সারাদিন দাঁড়ায়ে
দাঁড়ায়ে শরবত খেয়ে খেয়ে, তাই না? সারাদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিরিয়ানি খেয়ে খেয়ে, সিন্নি খেয়ে খেয়ে এই সমস্ত কাজের মধ্যে নিজেদেরকে লিপ্ত
করা—এটা কিন্তু নেক সুরতে শয়তানের ধোকা! নেক সুরতে শয়তানের ধোকা।
এই জিনিসটা মনে রাখবেন—শয়তান সবসময় ডাইরেক্ট বলবে না যে তুমি এরকম গুনাহের কাজ করো। অনেক সময় নেক
সুরতে ধোকার কাজের মধ্যে লিপ্ত করবে।
নবীজির সুন্নাহ অনুসরণের চার পুরস্কার
রবিউল আউয়াল মাস যদি আসে, আমাদের জন্য মূল ফলো করার বিষয় হলো সিরাতুন্নবী।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন—যদি তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি আমার সিরাতকে গবেষণা করতে
পারো, আমার সুন্নাতটাকে তোমার জীবনে
বাস্তবায়ন করতে পারো; আমি যেভাবে খানা
খেয়েছি তুমি ওভাবে খানা খাও, আমি যেমন পোশাক
পড়েছি তুমি ওভাবে পোশাক পড়...
নবীজির সিরাত হলো তিন ধরনের: ১. নবীজির
সূরাত (নবীজির আকৃতি/বাহ্যিক রূপ) ২. নবীজির
সিরাত (নবীজির জীবন/আমল) ৩. নবীজির সারীরাত (নবীজির অন্তরের দরদ ও ব্যথা)
সূরাত মানে নবীজির আকৃতি, সিরাত মানে নবীজির জীবন, আর সারীরাত মানে
নবীজির দরদ ও ব্যথা। এই তিন জিনিসে যদি নবীজিকে ফলো করা যায়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "আখেরাতে কী জাজা পাবা সেটা তো পরে, দুনিয়াতে তুমি চোখে দেখতে পাবা আল্লাহ তাআলা তোমাকে চারটা প্রতিদান দান করছেন।"
দুনিয়ার মধ্যে তুমি আমার মতো খানা খাও, আমার মতো নামাজ পড়,
আমার
মতো সুন্নাত তরিকায় পোশাক পড়, দুনিয়ার অন্য সমস্ত
আদর্শ বাদ দাও—
১. المحبة في قلوب
البررة এক নম্বরে তুমি দেখতে পাবা—যারাই নেককার মানুষ,
তারা তোমাকে
ভালোবাসতে শুরু করবে। কারণ তুমি আমাকে (নবীজিকে) ভালোবাস, তাই তোমাকেও মানুষজন ভালোবাসা শুরু করবে।
২. الهيبة في قلوب الفجرةদুই
নম্বরে নবীজি বলেন—যারা বদকার আছে, যারা নামাজ পড়ে না,
যারা
রোজা রাখে না, যারা দ্বীনদারীর সাথে নাই, যারা বিভিন্ন নাজায়েজের/হারামের সাথে আছে—এরা কেন জানি তোমাকে দেখলে ভয় পাবে! তোমার প্রতি আলাদা ভয়
জাগবে, তোমার কথা শুনলে কেমন যেন
তাদের খারাপ লাগবে বা অন্যরকম অবস্থা তৈরি হবে। কাফেরদের কিন্তু এই অবস্থা ছিল।
আমাদের নবীজির দুনিয়াবী কোনো পাওয়ার ছিল না, কিন্তু 'মুহাম্মদ' নামটা শুনলে, ওমরের হাতে তলোয়ার
দেখলে থরথর করে কাঁপত! 'মুহাম্মদ' নামটা শুনছেন—তলোয়ার পড়ে গেছে!
যারা খারাপ লোক আছে, এদের অন্তরে ভয় আর
ভীতি সৃষ্টি হয়ে যাবে।
৩. السعة في الرزق তিন নম্বরে নবীজি বলেন—তুমি যাই রিজিক উপার্জন করবা, যাই টাকা-পয়সা
কামাইবা, দেখবে যে কেন যেন আমার অনুসরণ
করার কারণে, আমার সিরাতুন্নবী মানার কারণে
তোমার রিজিকের মধ্যে আল্লাহ তাআলা অনেক বরকত দিয়ে দিছেন! তোমার বয়সে অন্য মানুষকে
দেখবে বহু হাজারো রোগব্যাধি নিয়ে ঘুরতেছে,
টাকা-পয়সা
খরচ করার মধ্যে তার শেষ নাই, কত ধরনের কাজের মধ্যে
তার টাকা-পয়সা শেষ হয়ে যাইতেছে; কিন্তু তুমি আমাকে
অনুসরণ কর বলে আল্লাহ তাআলা তোমাকে অল্প রিজিকের মধ্যে বরকত দিয়ে দিছেন।
৪. الثقة
في الدين চার নম্বরে নবীজি বলেন—আমাকে যদি অনুসরণ করো,
তাহলে
দুনিয়াতে চলতে গিয়ে এমন অবস্থা তৈরি হবে যে—মনে হবে যেন আজকে আসরের নামাজ পড়ার দরকার নাই, আজকে সবাই অনুষ্ঠানে ব্যস্ত আছি তো আজকে আসরের নামাজটা না পড়লে সমস্যা নাই; অথবা আজকে অমুক কাজটা না করলে সমস্যা নাই, অন্যান্য দিন তেলাওয়াত করি আজকে না করলে সমস্যা নাই—আমাকে যদি অনুসরণ করো,
তাহলে
দ্বীনের উপরে তোমার আমল করার প্রতি মজবুতি তৈরি হয়ে যাবে! কেউ নামাজ পড়ে না—তোমার নামাজ পড়তে ভালো লাগে, কেউ তেলাওয়াত করে না—তোমার তেলাওয়াত করতে
ভালো লাগে, কেউ জিকির করে না—তোমার জিকির করতে ভালো লাগে! এই জিনিসটা তুমি স্বচক্ষে
দেখতে পারবা।
এই চার জিনিস যদি আমাদের তৈরি হয়—সব নেককাররা আমাদেরকে ভালোবাসবে, সব বদকাররা আমাদের থেকে ভয়ে দূরে থাকবে, আমাদের টাকা-পয়সায় বরকত হবে, আর আমাদের আমলে মজবুতি চলে আসবে—তাহলে দুনিয়াতে আর কিছু আমাদের দরকার আছে?
আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে সিরাতুন্নবী পালন করার তৌফিক দান
করেন। মিলাদুন্নবী আমরা মানব, কিন্তু সিরাতুন্নবী
(নবীজির সুন্নাত) এটা আমাদের জীবনের আসল আমলী বিষয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নবীজির
খাঁটি আশেক হওয়ার তৌফিক দান করেন। আমীন।
(জুমার বয়ান থেকে সংকলিত)
পূর্ণ বয়ান শুনতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দু'টি ধারা : কিতাবুল্লাহ ও রিজালুল্লাহ
হিদায়াতের মূল উৎস কুরআন সুন্নাহ'র শিক্ষা। এ শিক্ষা অর্জন করতে হবে শিক্ষকের মাধ্যমে। শিক্ষকের মাধ্যম...
ঈমান-আমল সুরক্ষিত রাখতে হক্কানী উলামায়ে কেরামের সঙ্গে থাকুন, অন্যদের সঙ্গ ছাড়ুন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... قال الله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتّ...
স্ত্রীর অধিকার ও স্বামীর কর্তব্য
মানুষের জীবনে সবচেয়ে অন্তরঙ্গ সঙ্গী হলো তার স্ত্রী। সুখে-দুঃখে, বিপদে- আপদে, ঘরে-সফরে বিবাহ থেকে মৃত...
সোশ্যাল মিডিয়া, নাস্তিক্যবাদ ও আমাদের করণীয়
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন