প্রবন্ধ
হযরত আয়েশা রা. এর সঙ্গে বিবাহের হেকমত
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৪
০
الْحَمْدُ لِلَّهِ الْحَمْدُ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنُؤْمِنُ بِهِ وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْهِ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ سَيِّدَنَا وَسَنَدَنَا وَحَبِيبَنَا وَمَوْلَانَا مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ. أَمَّا بَعْدُ: فَأَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ، بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (خَالِصَةً لَكَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِين)
وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "فَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ" أَوْ كَمَا قَالَ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ।
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে দিল থেকে শুকরিয়া আদায় করি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে জুমার সালাত আদায় করার জন্য এই বৃষ্টি-বাদলের দিনে, সব বৃষ্টি উপেক্ষা করে আগে আগেই মসজিদে আসার তৌফিক দান করেছেন।
ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার ব্যাপারে সমসাময়িক কিছু কারণে আপনাদের সামনে স্পষ্ট করা জরুরি মনে করছি। এই জন্য কোরআন মাজিদের ২২ নম্বর পারার একটি আয়াতের কিছু অংশ তেলাওয়াত করেছি এবং তিরমিজি শরীফের দ্বিতীয় খণ্ডের প্রথম পৃষ্ঠা থেকে একটি হাদিস শরীফ আপনাদের সামনে আরজ করেছি।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবন ও আমানতদারিতা
আল্লাহর রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখি, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছোটকাল
থেকেই এত পুত-পবিত্র জীবনযাপন করেছেন,
যা
মক্কা তো দূরের কথা, বরং পুরা আরব,
পুরা
বিশ্বের মধ্যেও এরকম পুত-পবিত্র মানুষ আর ছিল না।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের জীবন খুব সাজানো ছিল,
খুব
চমৎকার ছিল। যার ফলে যারা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জানের দুশমন
ছিল, রাসূলকে সময়ে সময়ে হত্যা
করার জন্য চক্রান্ত করত, তারাও নিজেদের
স্বর্ণ-রুপা, দিরহাম-দিনার
আমানত হিসেবে রাসূলের কাছে রাখত।
কেন রাখত? তাদের ভরসা ছিল আমরা তার শত্রু
হতে পারি, সেও আমাদের শত্রু হতে পারে; কিন্তু তার আমানত আর তার দিলের তাকওয়া এত
সুন্দর, এত মজবুত যে, শত্রু হতে পারে, কিন্তু আমাদের এক টাকাও মেরে খাওয়া কোনোদিন সম্ভব না।
হিজরতের রাত ও আমানত ফেরতের অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত
যে কারণে যখন হুজুর
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে চলে যাবেন, ওইদিন রাতের বেলা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের বাড়ির চতুর্দিকে কাফেররা ঘেরাও করে আছে। ঘেরাও করার স্টাইল কী? এক গোত্র থেকে তারা আসে নাই। বলছে, "আমার পুরা আরবের মধ্যে যত গোত্র বসবাস করে, প্রত্যেক গোত্র থেকে দুই-তিনজন করে লোক
থাকবে।" কেন? যাতে করে, "আমরা যদি একা হত্যা করি, তাহলে মুহাম্মদ মারা যাওয়ার পরে অন্য গোত্রের
লোকেরা আমাদেরকে বলবে তোমরা এত ভালো মানুষকে
হত্যা করছো কেন? এই কথা কেউ যেন
বলতে না পারে, তাই আমরা সবাই
মিলে মুহাম্মদকে হত্যা করব।" কত মারাত্মক কথা!
সেই ঘরের চার দেয়ালের
মধ্যে আমার প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বসে আছেন। রাসূলের চাচাতো ভাই হযরত আলী (রা.) পাশে বসা। রাসূল বলছেন, "আলী! আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করছেন যে, এই কাফেরদের মাঝখান দিয়ে আমি বের হয়ে চলে
যাব।"
সূরা ইয়াসিনের ৯ নম্বর আয়াতে আছে:
وَجَعَلۡنَا مِنۡۢ بَیۡنِ اَیۡدِیۡہِمۡ سَدًّا وَّمِنۡ خَلۡفِہِمۡ سَدًّا فَاَغۡشَیۡنٰہُمۡ فَہُمۡ لَا یُبۡصِرُوۡنَ
অর্থ: আমি তাদের সামনে এক
অন্তরাল দাঁড় করিয়ে দিয়েছি এবং পিছনেও এক অন্তরাল দাঁড় করিয়ে দিয়েছি, আর এভাবে তাদেরকে সব দিক থেকে ঢেকে দিয়েছি; ফলে তারা কোনো কিছু দেখতে পায় না।
এখানে সাদ্দান শব্দের অর্থ দেয়াল। অর্থাৎ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝখান দিয়ে বের হয়ে চলে গেছেন, কিন্তু তারা কিছুই দেখতে পায় নাই।
এই সময় হুজুর হযরত আলী
(রা.)-কে বললেন, "দেখ আলী! আমি এখন
বের হয়ে চলে যাব; কিন্তু তুমি আমার
বিছানার মধ্যে কাঁথা গায়ে, চাদর মুড়ি দিয়ে
শুয়ে থাকবে।"
হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু
আনহু জিজ্ঞেস করলেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ!
আমিও আপনার সাথে চলে যাই। আপনি হিজরত করে মদিনায় চলে যাবেন, আমিও চলে যাই।"
রাসূল বললেন, "তুমি চলে যেতে পারবা না। তোমাকে একটু থাকতে
হবে। আমি চলে যাই, পরে তুমি
এসো।"
হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু
তাআলা আনহু বললেন, "কেন ইয়া
রাসূলাল্লাহ?"
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বললেন, "দেখো, যারা আমাকে হত্যা করার জন্য তরবারি নিয়ে পাশে
দাঁড়িয়ে আছে, এদের অনেকের
দিরহাম-দিনার আমার কাছে আমানত আছে। আমি যদি তোমাকে সাথে নিয়ে চলে যাই, তাহলে এদের দিরহাম-দিনার, টাকা-পয়সাগুলো বুঝে পাবে না। ওদের টাকা-পয়সা
তো আমার কাছে আমানত। ওদের টাকা-পয়সা ওদের হাতে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য একজন লোক
থাকা দরকার। তাই তুমি থাকো, আমি চলে
যাই।"
চিন্তা করেন! যারা উনাকে
হত্যা করতে আসছে, তারা যেন
টাকা-পয়সা ঠিকমতো বুঝে পায় এই জন্য নবীজীর কত চিন্তা!
নিজের চাচাতো ভাইকে রেখে যাচ্ছেন, যেন
টাকা-পয়সাগুলো বুঝিয়ে দেন। আমাদের নবীর জীবন কত পুত-পবিত্র ছিল! একেকটি ঘটনা
চিন্তা করলে হায়রান হয়ে যেতে এগুলো কী করে সম্ভব!
আমাদেরকে যদি কেউ একটু
গালি দেয়, কোনো খারাপ কথা বলে, তার জীবনে সব ধরনের ক্ষতি করে দেওয়ার চেষ্টা
করি। কিন্তু হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যারা হত্যা করতে আসছে, তাদের এক টাকাও যেন নষ্ট না হয়, এই জন্য রাসূল
নিজের চাচাতো ভাইকে চাদর মুড়ি দিয়ে শুইয়ে রেখে চলে গেলেন।
হযরত খাদিজা (রা.)-এর সাথে বিবাহ ও ব্যবসা
নবীজীর বয়স যখন ২৫ বছর, তখন হযরত খাদিজা (রা.)-কে বিবাহ করেন। উনার
আগে দুইজন স্বামী ছিলেন। প্রথম স্বামী ছিলেন আবু হালা তামীমি; ওই স্বামী থেকে দুইজন সন্তান হয়েছিল। তার
মৃত্যুর পর আরেকজন পুরুষের সাথে বিবাহ বসেছিলেন, তিনি তাকে তালাক দিয়েছিলেন। আগে দুইজন স্বামী, এখন উনি বিধবা মহিলা।
অনেক ধনী ছিলেন খাদিজা
(রা.)। উনি জানতে পারলেন যে, মুহাম্মদ নামে
একজন যুবক আছে এই এলাকায়, যিনি খুব আমানতদার; কারো টাকা-পয়সা কোনোদিন মেরে খায় নাই। মেরে
খাওয়া তো দূরের কথা, ১৯ থেকে ২০-ও হয়
না তার কাছে। "আমি আমার ব্যবসা-বাণিজ্যের সব আসবাব-সামানা বুঝিয়ে দেই, তাহলে আশা করা যায় ভালো হবে।"
তো হযরত খাদিজা (রা.) রাসূলের কাছে আসলেন। ওই সময় তো পর্দার বিধান নাজিল হয়নি। রাসূলের কাছে এসে সমস্ত টাকা-পয়সা বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, "আপনি এই মালামালগুলো নিয়ে যান এবং সিরিয়ায় গিয়ে বিক্রি করেন। বিক্রি করার পরে পুনরায় আবার সিরিয়া থেকে পণ্য কিনে নিয়ে আসবেন, মক্কায় এসে বিক্রি করবেন।" এর বিনিময়ে একটা চুক্তি হয়েছে, আপনাকে এত টাকা দেওয়া হবে।
রাসূলও হযরত খাদিজাকে
চিনেন না, হযরত খাদিজাও রাসূলকে
চিনেন না। তাই হযরত খাদিজা একজন গোলাম সাথে দিয়ে বললেন, এই যুবকের খেদমত করবা
তুমি। হযরত মাইসারা (রা.)-কে দিয়ে দিলেন। হযরত মাইসারা (রা.) সাথে গেলেন।
সিরিয়া থেকে বাণিজ্য ও আমানতদারিতার স্বীকৃতি
সিরিয়ায় গিয়ে আবার ওই পণ্য
নিয়ে আসলেন। এসে মক্কায় বিক্রি করলেন। খাদিজা (রা.) মাইসারাকে জিজ্ঞেস করলেন, "যে যুবকের সাথে তুমি ব্যবসা-বাণিজ্য করছো, ওই যুবককে তুমি কেমন দেখলে এই সফরে?"
হযরত মাইসারা (রা.) সাথে
সাথে বলেন, "আমি যখনই কোনো
রাস্তা দিয়ে এই যুবকের সাথে গেছি, তখনই দেখি রাস্তার
দুই পাশের গাছগুলো যুবকের দিকে ঝুঁকে সালাম দিতে থাকে। এই কাফেলার মধ্যে আরো অনেক
মানুষ ছিল; কিন্তু যখনই আমরা রোদের
মধ্যে হাঁটি, তখনই দেখি যে
আসমানের একটা মেঘ এই যুবকের মাথার উপরে এসে ছায়া দিতে থাকে। সুবহানাল্লাহ!"
হযরত খাদিজা (রা.)
টাকা-পয়সার সব হিসাব করে দেখলেন, অন্যান্য বছর মানুষের কাছ থেকে যা লাভ হতো, তার চাইতে কয়েক গুণ বেশি লাভ হয়েছে। এই বছর
টাকা-পয়সার কোনো গরমিল নাই, হিসাবে কোনো গরমিল
নাই।
হযরত খাদিজা (রা.)-এর বিবাহের প্রস্তাব ও রাসূল (সা.)-এর সম্মতি
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের বাবা তো মারা গেছেন জন্মের আগেই, মা মারা গেলেন ছয় বছর বয়সে, দাদা মারা গেলেন আট বছর বয়সে। এরপরে রাসূলের অভিভাবক ছিলেন
রাসূলের চাচা আবু তালেব। খাদিজা (রা.) রাসূলের আখলাক আর গোলামের এই বর্ণনায় এত
বেশি খুশি হয়েছেন যে, উনি আবু তালেবের
কাছে গিয়ে বললেন, "আপনার ভাতিজার
সাথে আমি বিবাহে বসতে চাই।"
আবু তালেব এবং অন্যান্য
গণ্যমান্য ব্যক্তি যারা আছেন, তারা সবাই মিলে
আমাদের রাসূলের কাছে বললেন, "ভাতিজা, তোমার বয়স ২৫ বছর। এখন তোমার যৌবন। একজন
যুবতী মহিলাকে বিবাহ করতে পারলে তোমার কাছে অনেক ভালো লাগবে এটা আমরা জানি। এই
অবস্থায় তুমি কি এই মহিলাকে বিবাহ করবা,
যার
বয়স ৪০ বছর ও তোমার বয়স ২৫ বছর? একজন মহিলা, যে মহিলা আগের একজন স্বামীর সাথে সংসার করছে
এবং ওই স্বামী তাকে তালাক দিয়েছে।"
তালাক দেওয়া তো দূরের কথা, আমাদের সমাজে যদি কোনো মেয়ের ব্যাপারে জানা
যায় যে একজন পুরুষ এসে ওই মেয়েকে দেখছে, পছন্দ হয় নাই, ফেরত চলে গেছে;
এটা
যদি এলাকায় ছড়াছড়ি হয়ে যায়, ওই মেয়েকে বিবাহ
দেওয়া কষ্ট হয়ে যায়! সেখানে ওই মহিলার স্বামী একসাথে সংসার করার পরে তালাক
দিয়ে দিয়েছে এক নম্বর বিষয়। আরেক স্বামী বিবাহ করার পরে দীর্ঘদিন পর্যন্ত
ঘর-সংসার করছে, দুইজন বড় বড়
সন্তান আছে, ওই স্বামী মারা গেছে।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের ওই দিনের জবাবটা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে:
"চাচাজান! আপনারা আমার অভিভাবক। আপনারা আমার জন্য যা ভালো মনে করবেন, আমি তাতেই রাজি আছি।"
২৫ বছর বয়সে ৪০ বছরের
একজন বুড়ি মহিলাকে বিবাহ করলেন আগের দুইজন স্বামীর থেকে
আলাদা হওয়া ব্যক্তি। ২৫ বছর থেকে পার হয়ে ৪০ বছরে চলে গেলেন।
ইসলামের দাওয়াত ও কাফেরদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
রাসূল নবুয়ত লাভ করলেন।
নবুয়ত লাভ করার পরে রাসূল যখন মক্কার মধ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু করলেন, দাওয়াত দেওয়া শুরু করার পরে মক্কার এক বড়
কাফের রাসূলের কাছে এসে বলে,
"তুমি যদি চাও যে মক্কার সবচেয়ে সুন্দরী সুন্দরী নারীকে তোমার সামনে এনে হাজির
করে দিব, ১০ জন না, ২০ জন না, যতজন মন চায় তোমার সামনে, যত নারী মনে চায় তোমার সামনে হাজির করে দিব; কিন্তু দাওয়াতের কাজটা তোমার বন্ধ করতে
হবে।"
এই শর্তে হুজুর
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি ওই প্রস্তাবকে গ্রহণ করেছিলেন? কোনোদিন গ্রহণ করেন নাই! বরং রাসূল বলেছিলেন, "আমার ডান হাতে যদি তারা সূর্য এনে দেয়, আর আমার বাম হাতে যদি তারা চন্দ্র এনে দেয়, তারপরেও আমি এই দাওয়াতের কাজ থেকে দূরে সরতে
পারব না।"
তারা প্রস্তাব দিল, "ঠিক আছে,
আমরা
মিলেমিশে কাজ করি। কীভাবে? ছয় মাস তুমি
আমাদের মূর্তির পূজা করবা, আর ছয় মাস আমরা
তোমার আল্লাহর পূজা করব।"
আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল
করে বলে দিলেন:
قُلۡ یٰۤاَیُّہَا الۡكٰفِرُوۡنَ ۙ لَاۤ اَعۡبُدُ مَا تَعۡبُدُوۡنَ
অর্থ: হে নবী! আপনি বলে
দিন, হে কাফের সম্প্রদায়!
তোমরা শুনে রাখো, তোমরা যেসব
মূর্তির এবাদত করো, কস্মিনকালেও আমি
মুহাম্মদ এ সমস্ত মূর্তির সামনে মাথা নত করতে পারব না।
পরিষ্কার কথা! তোমরা
তোমাদের ধর্ম পালন করো, যা মন চায় তা করো,
আমি
আমার ধর্মের উপর অটল থাকব। কী পরিষ্কার কথা!
হযরত খাদিজা (রা.)-এর ওফাত ও সন্তানদের দায়িত্ব
তো ২৫ বছর বয়স থেকে হুজুর
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যখন বয়স হয়ে গেল ৫০ বছর... ৪০ বছর বয়সে
নবুয়ত লাভ করলেন, এরপরে আরো ১০ বছর
পার হয়ে গেছে ৫০ বছর পর্যন্ত এই সময়ে হযরত ফাতেমা (রা.), হযরত উম্মে কুলসুম (রা.), হযরত জয়নব (রা.), হযরত রুকাইয়া (রা.)চারজন মেয়ে হযরত খাদিজার
গর্ভ থেকে হলো। দুইজন ছেলে হলো হযরত কাসেম ও হযরত তাহের।
এই মোট ছয় সন্তান রেখে
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.)
দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে যান। ২৫ বছর থেকে নিয়ে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত হুজুর
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয় আর কোনো বিবাহ-শাদী করেন নাই।
কিন্তু ৫০ বছরের পরে যখন
খাদিজা (রা.) চলে গেলেন, দুনিয়া থেকে
বিদায় নিয়ে চলে গেলেন, এখন এই
সন্তানাদিদেরকে লালন-পালন কে করবে?
হযরত সাওদা (রা.) ও হযরত আয়েশা (রা.)-এর বিবাহের প্রেক্ষাপট
ওই সময় খাওলা (রা.) উনি আসলেন। আসার পরে বললেন, "একজন মহিলা আছেন সাওদা, যিনি বয়সে আপনার মতো হবে। আরেকজন ছোট মেয়ে আছে আয়েশা, যিনি আবু বকরের মেয়ে। আপনি এই দুইজনের মধ্যে কাকে বিবাহ করবেন? আপনার তো বিবি মারা গেছেন, একজনকে বিবাহ করা দরকার।"
তখন হুজুর সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি সাওদাকে বিবাহ
করব।"
খাওলা (রা.)-এর
মধ্যস্থতায় হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সাওদাকে বিবাহ করে ফেললেন, যিনি বয়সে রাসূলের মতোই ছিলেন।
রাসূলকে জিজ্ঞেস করা হলো, "আপনি আয়েশাকে বাদ দিয়ে সাওদাকে কেন বিবাহ
করলেন?"
বললেন, "আমার সন্তানাদি ছয়জন। আয়েশাকে যদি আমি বিবাহ
করি, আমার সন্তানাদি লালন-পালন
করতে পারবে না। এই জন্য আমি সাওদাকে বিবাহ করলাম।"
সাওদাকে বিবাহ করার পরে, হযরত জিবরাঈল (আ.) একদিন... রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুয়ে আছেন,
ঘুমিয়ে
আছেন, দেখেন হযরত জিবরাঈল (আ.)
রেশমি কাপড়ে একজন বাচ্চাকে নিয়ে আসলেন।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বললেন, "এটা কী আপনার হাতে?"
বললেন, "আমার ভেতরে এই কাপড়ের মধ্যে যিনি আছেন, উনি আপনার স্ত্রী হবেন। এটা আল্লাহর
ফায়সালা।"
তখন হযরত জিবরাঈল (আ.)
চেহারা খুললেন। খোলার পরে দেখলেন ইনি হযরত আবু বকর (রা.)-এর
মেয়ে হযরত আয়েশা (রা.)।
তখন হযরত খাওলা বললেন যে, "আপনি এই স্বপ্ন দেখছেন, সাওদাকে বিবাহ করেছেন; আমি আবু বকরের কাছে একটু প্রস্তাব করি আয়েশার
ব্যাপারে।"
তখন হযরত খাওলা হযরত আবু
বকর (রা.)-এর কাছে প্রস্তাব করলেন। হযরত আবু বকর বললেন, "আমি তো বিবাহ দিতে পারছি না।"
কেন? হযরত আয়েশা (রা.)-এর ব্যাপারে বলেন, "আমার মেয়ে আয়েশার আরেক জায়গায় বিবাহের
কথাবার্তা চলতেছে।" যুবায়ের বিন মুতইম (রা.) যিনি পরবর্তীতে
সাহাবী হয়ে গিয়েছিলেন, ওই সময় মুসলমান
হন নাই উনার সাথে হযরত আয়েশার বিবাহের কথাবার্তা চলছিল।
পরবর্তীতে যুবায়ের ইবনে
মুতইমের বাবা উনি বললেন, "না, আমি এই আয়েশার সাথে আমার ছেলেকে বিবাহ দিব
না।" কেন? "কারণ আয়েশার বাবা
আবু বকর, সে তো মুহাম্মদের অনুসারী।
আমি মুহাম্মদের অনুসারীর মেয়ের সাথে আমার ছেলেকে বিবাহ দিতে পারব না।"
এই বিয়ে ক্যানসেল হয়ে
গেল। পরবর্তীতে হযরত আবু বকর (রা.) নিজে এসে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামকে প্রস্তাব করলেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও বললেন যে, "আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করেছেন স্বপ্নের
মাধ্যমে। সুতরাং এখন আমি বিবাহ করতে রাজি আছি। বাকি বিবাহ এখন হয়ে যাবে, কিন্তু এখন আমি রুখসতী করব না, উঠায় নিব না; অন্য সময় উঠায় নিব।"
তখন হযরত আয়েশা (রা.)-কে
বিবাহ করার পরে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর উঠায় নেন নাই। মদিনায়
যাওয়ার পরে ৫৩ বছর বয়সে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা
(রা.)-কে উঠায়ে নিছেন।
ইসলামের জ্ঞানে হযরত আয়েশা (রা.)-এর অবদান
এর পর থেকে হযরত আয়েশা
(রা.)-এর এত গুণাগুণ, এত ফজিলত ইসলামের
মধ্যে প্রকাশ পাইল, যা আপনাদের সামনে
বয়ান করে শেষ করতে পারব না! একা একজন মহিলা একসাথে জিহাদ করে, একসাথে রাসূলের হাদিস বয়ান করে, একসাথে জিহাদের ময়দানে যারা আহত হয়ে যায়, তাদের চিকিৎসা করে, তাদের হাতের মধ্যে মরহম লাগায়। সাহাবায়ে
কেরামের মধ্যে যখন কোনো মাসআলার ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্ব লেগে যায়, তখন হযরত আয়েশা (রা.) সমাধান করেন।
যদি হযরত আয়েশা (রা.)
রাসূলের বিবিদের অন্তর্ভুক্ত না হতেন,
অনেক
মাসআলা এমন আছে যা আমাদের সামনে অস্পষ্ট থাকত।
হযরত ওমর (রা.)-এর জামানায়
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে দুইটি ভাগ হয়ে গেছে একটি সেন্সিটিভ মাসআলার ব্যাপারে। যে স্বামী আর স্ত্রী দুইজন যখন একান্তে সাক্ষাৎ করবে, একান্তে মেলামেশা করবে, কিন্তু তাদের প্রয়োজন এখনো পূরণ হয় নাই, এর আগেই দুইজন পৃথক হয়ে যাবে; তখন কি তাদের গোসল ফরজ হবে কি হবে না? প্রয়োজন পূরণ হওয়ার আগেই তারা দুইজন তাদের
কাজ বন্ধ করে দিয়েছে, তখন কি গোসল ফরজ
হবে কিনা?
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে
দুই ভাগ হয়ে একভাগ বলে গোসল ফরজ হবে,
আরেক
ভাগ বলে গোসল ফরজ হবে না। তখন সবাই হযরত ওমর (রা.)-এর কাছে গিয়ে কোনো সমাধান পেলেন
না, অন্যান্য সাহাবায়ে
কেরামের কাছে গিয়েও কোনো সমাধান পেলেন না। সবাই বলেন, "আমরা তো রাসূলের কাছে কিছুই জানি না, কিছুই শুনি নাই এই ব্যাপারে।"
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে
এত বেশি মতানৈক্য হয়েছিল যে, মসজিদে নববীর
মধ্যে আওয়াজ বড় হয়ে গিয়েছিল। অথচ সাহাবায়ে কেরামের আওয়াজ বড় হতো না মসজিদের
মধ্যে! কিন্তু নিজেদের মধ্যে তর্কাতর্কির কারণে, কথা এদিক-সেদিক হওয়ার কারণে আওয়াজ বড় হয়ে গিয়েছিল।
রাসূলের বিবিদের মধ্যে
যারা জীবিত ছিলেন, তাদেরকে পর্দার
আড়াল থেকে গিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন;
কেউ
বলতে পারে না। হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে যখন গিয়েছেন, হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, "আমি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের
সাথে আমার এরকম একান্ত সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং প্রয়োজন পূরণের আগে আমরা আলাদা হয়ে
গিয়েছিলাম; দুজনই আমরা গোসল করেছিলাম।
রাসূল আমাকে গোসল করার জন্য আদেশ করেছেন।"
চিন্তা করেন, কত বড় একটি মাসআলা! যেটা হযরত আয়েশা
(রা.)-এর দ্বারা স্পষ্ট হয়েছে। মহিলাদের প্রতি মাসে যে নাপাকির বিষয় থাকে, এগুলোর অধিকাংশ মাসআলা হযরত আয়েশা (রা.)
সমাধান দিতেন। জিহাদের ময়দানে কোন সময় কী করতে হবে, ঘরে একজন স্ত্রীর সাথে কীভাবে চলাচল করতে হবে, স্বামী আর স্ত্রী দুইজন কীভাবে আনন্দ-ফুর্তি
করতে হবে এই ব্যাপারে হযরত আয়েশা (রা.) যত চমৎকারভাবে ঘটনার বর্ণনা
করেন, অন্য কারো দ্বারা এত
চমৎকারভাবে পাওয়া যায় না।
স্ত্রীর মনোরঞ্জন ও পারিবারিক জীবনের আদর্শ
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বয়সে কত বড়! হযরত আয়েশা (রা.)-কে বলেন, "আয়েশা,
চলো
তো আমরা দৌড়াদৌড়ি করি। আমি আর তুমি দেখো দৌড় প্রতিযোগিতা করি, কে আগে যেতে পারে।" হুজুর সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইচ্ছা করে নিজের দৌড়ের গতিকে একটু কমিয়ে দিলেন। হযরত আয়েশা
(রা.) দৌড় দিয়ে বিজয়ী হয়ে গেলেন,
খুশিতে
বাকবাক!
এরপর অনেক দিন পরে হুজুর
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
"আয়েশা, এবার চলো তো আমরা দৌড়ের
প্রতিযোগিতা করি।" এবার রাসূল ছাড় দেন নাই, বরং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দৌড় দিয়ে আগে
চলে গেছেন। হযরত আয়েশা (রা.) পরাজিত হয়ে গেলেন।
রাসূল তখন বললেন, "তিলকা বিতিলকা" (আগেরবার তুমি জিতছো, এবার আমি জিতলাম)।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, "একটু চিন্তা করো, আমি তার স্ত্রী, আমি তার চাইতে কত ছোট! উনি রহমাতুল্লিল আলামিন, উনার দুনিয়ার ব্যস্ততা তো কম না।
কত
ব্যস্ততা! ওই অবস্থায় নিজের স্ত্রীর মনোরঞ্জনের জন্য কতটা খেয়াল করতেন!"
আমাদের আজকাল ঘরের মধ্যে
প্রবেশ করলে দেখা যায় আমাদের আচার-আচরণ,
কথাবার্তা, বকাঝকায় আমাদের মা-বোনেরা অনেক সময় কষ্ট
পেয়ে থাকেন। অথচ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সব স্ত্রীরা একসাথে বসে
আনন্দ-ফুর্তি করত, গল্প-গুজব করত
বিকেলবেলা। আমাদের সমাজে তো এটা সম্ভব না যে,
একই
পুরুষের দুইজন স্ত্রী, তারা পরস্পর গল্প-গুজব করবে, আনন্দ করবে;
এটা
আমাদের সমাজে দেখা যায় না।
একবার তো এরকম হয়েছে,
হুজুর
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের ভেতরে ঢুকছেন। ঢুকার পরে আমাদের আম্মাজান
যারা ছিলেন, তারা জোরে জোরে কথাবার্তা
বলতেছেন, আনন্দ করতেছেন। ওই সময়
পর্দার বিধান নাজিল হয় নাই।
হযরত ওমর (রা.) ঢুকার সাথে
সাথে সবাই চুপ হয়ে গেছে। হযরত ওমর (রা.) অবাক হয়ে বললেন, "কী ব্যাপার! রহমাতুল্লিল আলামিন যখন তোমাদের
ঘরে প্রবেশ করেন, তখন তোমরা তার
সম্মানে চুপ করো না; কিন্তু আমি ঘরে
প্রবেশ করলে আমার সম্মানে তোমরা থরথর করে কাঁপো কেন?"
তখন ওমর (রা.)-এর মেয়ে, রাসূলের স্ত্রী হযরত হাফসা (রা.) উনি একটা
জবাব দিয়েছিলেন, "আপনার আচার-আচরণ
এমন যে, আপনার আচার-আচরণ দেখলে
আমাদের ভয় লাগে; কিন্তু আমাদের
প্রাণপ্রিয় স্বামীর আচার-আচরণ এত সুন্দর, দেখলে শুধু খুশি লাগে, মায়া লাগে, মনে হয় আমার স্বামী আমাকেই সবচেয়ে বেশি মহব্বত করে।"
অপপ্রচারের জবাব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সুতরাং এমন শ্রেষ্ঠতম একজন
মানুষ... এই পুরা ইতিহাস যাদের জানা আছে,
তারা
যদি এই বিষয়টা একটু সামান্য মাথায় চিন্তা করে যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা
(রা.)-কে বিবাহ করার দ্বারা ইসলামের ক্ষতি হয়েছে না অনেক বেশি লাভ হয়েছে?
যদি হুজুর সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে ওই জাতীয় যৌন আকাঙ্ক্ষা কিংবা এই শব্দ যারা বলে এরকম কোনো কিছু থাকত, তাহলে ৫০ বছর
পর্যন্ত একজন বিধবা নারীকে নিয়ে সংসার করতেন না!
যারা রাসূলের চরিত্রের
উপরে কালিমা লেপন করে, তাদেরকেই যদি বলা
হয় যে, আপনারা একটু ২৫ বছর বয়সে ৪০ বছরের বুড়ি মহিলাকে বিবাহ করেন, যিনি আগের দুই স্বামীর ঘর-সংসার করেছেন; করবে?
তারা
করবে না!
কিন্তু আমাদের নবীজির
ব্যাপারে... আমাদের নবীজির ব্যাপারে জবানদরাজি করা, তার ব্যাপারে লম্বা লম্বা বড় বড় কথাবার্তা বলা এটা বরবাদির আলামত, এটা নাকামির
আলামত। যখন কোনো ব্যক্তির ধ্বংসের সময় কাছিয়ে আসে, তখন ওই ব্যক্তির দ্বারা আমাদের নবীজির ব্যাপারে কালিমা লেপন
করা সম্ভব হয়। আর যারা এই এত কিছু বলার পরেও, এত কিছু করার পরেও তাদের পক্ষ সমর্থন করে, তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত। যদি সমর্থন করে, এই সমর্থন করার কারণে কাল কেয়ামতের ময়দানে
আল্লাহওয়ালা, নবী, সিদ্দীকীনদের সাথে হাশর হবে না; বরং যারা নবীর দুশমন, ওদের সাথেই হাশর হবে।
সাধারণ ভাষায় যদি চিন্তা
করি, আমাদের মডেল কারা? যারা আমাদের মডেল, যাদের আমরা মডেল মনে করি, যেমন বাংলাদেশের
জাতীয় সংগীত যার লেখা, রবি ঠাকুর উনার স্ত্রীর বয়স কত ছিল? ১১ বছর বয়সে উনি
বিবাহ করছেন। আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাসে আরো যারা আছেন অনেক বড় বড়
ব্যক্তিরা, খোদ শেখ মুজিবুর রহমান
সাহেবের স্ত্রীর আট বছর বয়সে বিবাহ হয়েছে। তাই বলে কি আমরা কি শেখ মুজিবুর রহমান
সাহেবকে খারাপ বলি? আমরা কি রবি
ঠাকুরের ব্যাপারে জবানদরাজি করি? কিন্তু উনাদের
ব্যাপারে... উনাদের চরিত্র যদি ঠিক থাকে,
উনাদের
সব কিছু যদি ঠিক থাকে, তাহলে আমাদের নবীর
চরিত্রের উপর কালিমা কেন লেপন করা হবে?
এটা
বড় মারাত্মক কথা!
নবীপ্রেম ও ঈমানের দাবি
হাদিস শরীফে এসেছে:
لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
অর্থ: "তোমাদের মধ্য
থেকে একজন ততদিন পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না,
যতদিন
পর্যন্ত আমি নবী তোমাদের কাছে তোমাদের নেতা,
তোমাদের
বাবা, তোমাদের সন্তান, সবার চাইতে প্রিয়
না হই।"
যদি মুসলমান দাবি করতে চাই, যদি কাল কেয়ামতের ময়দানে নাজাত পেতে চাই, যদি হাফেজে কোরআন, আল্লাহওয়ালা, ওলামায়ে কেরামদের সাথে হাশর করতে চাই, তাহলে নবীকে
সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে হবে। বাংলাদেশে থাকি,
ইরাকে
থাকি, আমেরিকায় থাকি, যেই প্রান্তেই
থাকি না কেন, আমার আত্মা যদি
নবীর রওজায়ে আতহারের সাথে লাগানো থাকে,
তাহলে
নবীর ব্যাপারে যদি কেউ এই ধরনের কালিমা লেপন করে, তাহলে ওটা আমি সহ্য করতে পারব না।
প্রতিবাদ ও অর্থনৈতিক বয়কট
এই জন্য যারা এই ধরনের
চক্রান্ত, এ ধরনের খারাপ কথাবার্তার
সাথে জড়িত, তাদের পণ্য কম ব্যবহার করা
কিংবা ব্যবহার না করা এটা আমাদের দায়িত্ব।
গত এক-দেড় বছর আগে কিংবা
দুই বছর আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। সে নবীর ব্যাপারে বিভিন্ন
ধরনের কার্টুন বানিয়েছিল এক ব্যক্তি,
সে
সমর্থন করছে। বাংলাদেশ থেকে এবং সারা বিশ্ব থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে, তাদের পণ্য বয়কট
করা হোক। এক সপ্তাহের মধ্যে ২৪,০০০ মিলিয়ন তাদের
টাকা লস হয়েছে! যে কারণে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এই ইন্টারভিউ দিতে বাধ্য হয়েছে
যে, "আমরা সবাই ভাই ভাই, আমরা আবার আগের মতো হয়ে যাই।"
কেন? এটা বর্তমানে আমাদের প্রতিবাদ জানানোর একটা
বড় মাধ্যম। কারণ তারা আমাদের কাছে পণ্য বিক্রি করে, আমরা তাদের পণ্য কিনি। কেমন যেন ১০ টাকার পণ্য কিনলে ৮ টাকা
যদি পণ্যের দাম হয়, ২ টাকা তাদের লাভ
হয়; ওই ২ টাকা দিয়ে তারা
মুসলমানদের ব্যাপারে কটূক্তি করে, রাসূলের ব্যাপারে
কটূক্তি করে, মুসলমানদের উপরে
গুলি চালায়, তাহলে তার অংশীদার আমিও হয়ে গেলাম। এই জন্য তাদের থেকে দূরে থাকা আমাদের
জন্য একান্ত জরুরি।
হাদিসে এসেছে:
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
অর্থ: "তোমাদের মধ্যে
কেউ যদি কোনো অন্যায় দেখে, তাহলে সে যেন তা
নিজ হাত দ্বারা বাধা দেয়। যদি তার সামর্থ্য না থাকে, তবে মুখ দ্বারা প্রতিবাদ করবে। আর যদি তাও না
পারে, তবে অন্তর দ্বারা তা ঘৃণা
করবে। আর এটি ঈমানের দুর্বলতম স্তর।"
যারা হাত দ্বারা বাধা দিতে
পারে না, মুখ দ্বারাও বাধা দিতে
পারে না, অন্তত অন্তর দ্বারা ঘৃণা
করবে—তারা দুর্বল ঈমানের অধিকারী। আমরা আমাদের সাধ্যমতো এই জাতীয় কাজ থেকে, তাদের পণ্য থেকে বেঁচে থাকা আমাদের জন্য
একান্ত জরুরি। আমরা আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হব, ইনশাআল্লাহ।
(জুমার বয়ান থেকে সংকলিত)
পূর্ণ বয়ান শুনতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
হযরত উসমান রাঃ সম্পর্কে উত্থিত আপত্তির স্বরূপ সন্ধানে
হযরত উসমান রাঃ এর উপর স্বজনপ্রীতিমূলক আপত্তি সমূহের তাহকিকঃ হযরত উসমান রাঃ সম্পর্কে স্বজনপ্রীতিমূলক ...
প্রসঙ্গ মুয়াবিয়া রাজিআল্লাহু আনহুঃ সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কিত ইতিহাস পাঠের মূলনীতি
...
সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও সাহাবা সমালোচকদের পরিণতি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাগণের মর্যাদা ও ফযীলত কুরআন ও হাদীসের মাঝে বিস্তারিতভাব...
حضرت صدیق اکبرؓ کے اسوہ کے چند پہلو
سیدنا صدیق اکبرؓ کی جناب نبی اکرم صلی اللہ علیہ وسلم کے ساتھ ہجرت کا واقعہ پوری اہمیت اور تفصیل کے س...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন