প্রবন্ধ
সাহাবায়ে কেরাম; ঈমানের মহাকাশে দেদীপ্যমান নক্ষত্র
৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৩৭২
০
আঁধার রাতে পথ হারানো পথিকের জন্য যেমন আকাশে জেগে থাকা ধ্রুবতারা ধ্রুব সত্য, তেমনি কিয়ামত তক আগত প্রতিটি মুমিনের ঈমান ও বিশ্বাসের আলোকবর্তিকা হলেন সাহাবায়ে কেরাম। ইসলামী শরীয়তে ঈমানের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের কোনো বিমূর্ত যন্ত্র নেই; বরং এর একমাত্র জীবন্ত ও শাশ্বত কষ্টিপাথর হলো নবীর পাঠশালায় গড়ে ওঠা সেই মহান কাফেলা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁদের বিশ্বাস ও আমলকে সত্য-মিথ্যার এমন এক চিরন্তন মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, যা এড়িয়ে হিদায়াতের রাজপথে পা রাখা অসম্ভব।
১. আসমানি ফরমান: সাহাবীদের মতো ঈমান আনাই মুক্তি
যখন মদিনার মুনাফিকরা নিজেদের ঈমানের বড়াই করত, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে, ঈমান যদি হতে হয় তবে তা হতে হবে সাহাবীদের মতো নিঃশর্ত ও স্বচ্ছ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُوا أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَٰكِن لَّا يَعْلَمُونَ
যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরাও সেই রকম ঈমান আন, যেমন অন্য লোকে ঈমান এনেছে। তখন তারা বলে, আমরাও কি সেই রকম ঈমান আনব, যে রকম ঈমান এনেছে নির্বোধ লোকেরা? জেনে রেখ, এরাই নির্বোধ, কিন্তু তারা তা জানে না। (সূরা বাকারা: ১৩)
এই আয়াতে আন-নাস (মানুষ) বলতে সেই মহান সত্তাদের বোঝানো হয়েছে, যাঁরা আল্লাহর রাসূলের জন্য নিজেদের জীবন ও সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ এখানে মুনাফিকদের চপেটাঘাত করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, সাহাবীদের ঈমানকে ‘বোকামি’ মনে করা ব্যক্তিরাই আসলে প্রকৃত নির্বোধ।
২. হিদায়াতের একমাত্র শর্ত: সাহাবীদের আদর্শের প্রতিফলন
হিদায়াত বা সঠিক পথ পাওয়ার জন্য কোনো দার্শনিক তত্ত্ব নয়, বরং সাহাবীদের জীবনদর্শনকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করা অনিবার্য। আল্লাহ তাআলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন:
فَانْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنْتُمْ بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوْا وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ
অতঃপর তারাও যদি সে রকম ঈমান আনে যেমন তোমরা ঈমান এনেছ, তবে তারা সঠিক পথ পেয়ে যাবে। আর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তারা মূলত শত্রুতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং শীঘ্রই আল্লাহ তোমার সাহায্যার্থে তাদের দেখে নেবেন এবং তিনি সকল কথা শোনেন ও সবকিছু জানেন। (সূরা বাকারা: ১৩৭)
এই আয়াতে বিনিময়ে বা অনুরূপ (بِمِثْلِ) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, সাহাবীদের আকিদাই হলো ঈমানের সেই ছাঁচ, যার সাথে হুবহু মিল না থাকলে কোনো বিশ্বাসই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।
৩. আসমান থেকে আসা সন্তুষ্টির সনদ
দুনিয়ার কোনো আদালত নয়, বরং মহাকাশের অধিপতি স্বয়ং যাঁদের চারিত্রিক সনদ প্রদান করেছেন, তাঁরাই হলেন সাহাবা। সূরা তাওবায় মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন:
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা ঈমানে প্রথমে অগ্রগামী হয়েছে এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যানরাজি তৈরি করে রেখেছেন, যার তলদেশে নহর বহমান। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। এটাই মহা সাফল্য। (সূরা তাওবা: ১০০)
যাঁদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁদের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া মানেই খোদ আল্লাহর অসন্তুষ্টির পথে পা বাড়ানো।
৪. রসূলের (সা.) দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড
নবীজি (সা.) তাঁর সাহাবীদের যুগের শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ
মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম হলো আমার যুগের লোক (সাহাবীরা), এরপর তাঁদের পরবর্তী যুগের লোক, এরপর তাঁদের পরবর্তী যুগের লোক। (সহীহ বুখারী: ২৬৫২)
অন্য এক হাদীসে নবীজি (সা.) সাহাবীদের নক্ষত্রের সাথে তুলনা করে বলেছেন যে, তাঁদের অনুসরণই হলো উম্মতের জন্য নাজাতের উসিলা।
৫. ফেতনার যুগে সুরক্ষাকবচ
শেষ জামানায় যখন মতাদর্শিক লড়াই চরমে পৌঁছাবে, তখন নবীজি (সা.) আমাদের জন্য যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তা হলো সাহাবীদের পথ। তিনি ইরশাদ করেন:
فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ
তোমরা আমার সুন্নাহ এবং আমার হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরো এবং তা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে থাকো। (সুনানে আবু দাউদ: ৪৬০৭)
‘দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরা’র এই রূপকটি সাহাবীদের আদর্শের প্রতি আমাদের পরম আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তাকে ফুটিয়ে তোলে।
৬. সাহাবীদের চারিত্রিক দৃঢ়তা
সাহাবায়ে কেরাম নবীজির (সা.) ছায়াসঙ্গী হিসেবে কেমন ছিলেন, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:
مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ ۚ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ
মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল। তাঁর সঙ্গে যারা আছে, তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং আপসের মধ্যে একে অন্যের প্রতি দয়ার্দ্র। (সূরা ফাতহ: ২৯)
এই ‘معیت’ বা ‘রাসূলের সাথে থাকা’ কেবল শারীরিক নৈকট্য নয়, বরং এটি ছিল আদর্শিক ও আধ্যাত্মিক একাত্মতা।
তাই সাহাবায়ে কেরাম কেবল ইতিহাসের অংশ নন, তাঁরা ইসলামের প্রাণভোমরা। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা রাখা ঈমানের অংশ, আর তাঁদের সমালোচনা করা নিফাকের লক্ষণ। তাঁরা ছিলেন এমন এক কাফেলা, যাঁদের হৃদয়ে ছিল তাকওয়া, মুখে ছিল সত্য এবং কর্মে ছিল ইখলাস। তাই আজকের এই বিভ্রান্তির গোলকধাঁধায় যদি আমরা নিজেদের ঈমানকে রক্ষা করতে চাই, তবে সাহাবায়ে কেরামের পবিত্র জীবন ও আকিদাকে ধ্রুবতারা বানিয়ে এগিয়ে চলতে হবে। মনে রাখতে হবে, সূর্যের আলো যেমন চন্দ্রের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করে, তেমনি নবীজির নবুয়তের নূর সাহাবীদের মাধ্যমেই আমাদের কাছে পৌঁছেছে। তাঁদের পথই জান্নাতের পথ, তাঁদের পথই চিরমুক্তির পথ।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (২য় পর্ব)
...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (৩য় পর্ব)
...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (১ম পর্ব)
...
মূর্তি ও ভাস্কর্যপ্রীতি : ইসলাম কী বলে?
ইসলামের যে বিষয়গুলোর নিষিদ্ধতা অকাট্য ও মুতাওয়াতিরভাবে প্রমাণিত তার মধ্যে প্রাণীর প্রতিকৃতি নির্মাণ ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন