প্রবন্ধ
মীরাসের বর্তমান চিত্র ও শরয়ী বিধান
১৯ আগস্ট, ২০২৬
৭২১
০
ইসলাম একটি বৈশিষ্ট্যময় পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এর বহু বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো - ইসলাম মানুষের জন্য মীরাস (উত্তরাধিকার) বণ্টনের মাধ্যমে একটি অত্যন্ত উন্নত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রদান করেছে।
জাহেলি যুগে মীরাস বণ্টনের ব্যাপারে চরম অবহেলা ছিল। মীরাস বণ্টন করার কোনো রকম চেতনা ছিল না। মক্কার মুশরিকরা মৃত ব্যক্তির সম্পদ আত্মসাৎ করত। তাদের এই নিকৃষ্ট অভ্যাসের কথা কুরআনুল কারিমের সূরা ফাজরে তুলে ধরা হয়েছে :
وتأكلون التُراثَ أكلاً لمّاً
“আর তোমরা মীরাসের সম্পদ একেবারে গ্রাস করো।” (সুরা ফাজর, আয়াত নং ১৯)
ইসলামই সর্বপ্রথম, সেই প্রাচীন অন্যায় প্রথাগুলো বিলুপ্ত করে দুর্বল, এতিম, নারী ও শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। মীরাসের প্রাপ্য হওয়া পরিশ্রম ,শক্তি, ক্ষমতা ও বীরত্বের উপর নির্ভর করে না; বরং এটি একটি আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার ও উপঢৌকন,যা বিনা পরিশ্রমে ও বিনা কষ্টে ওয়ারিসদের মালিকানাধীন হয়ে যায়।
অন্যদিকে আধুনিক যুগে নারী-পুরুষের তথাকথিত সমতার নামে যে প্রতারণামূলক স্লোগান দেওয়া হয়, ইসলাম সেগুলোও গ্রহণ করেনি।
ইসলাম মীরাসের ন্যায়ভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা দিয়েছে। এখানে নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সকলের জন্য মৃতের সম্পদে শরিয়তের নির্ধারিত অংশ রয়েছে।
মীরাস সংক্রান্ত বিধান
সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনায়-
عن ابن عباس -رضي الله عنهما - قال: كان المال للولد ، وكانت الوصية للوالدين ، فنسخ الله من ذلك ما أحَبَّ ، فجعل للذكر مثل حظّ الأنثيينِ ، وجعل للأبوين لكل واحد منهما السدس والثلث ،وجعل للمرأة الثمن والربع ، وللزوج الشطر والربع.[4578]، الصحيح البخاري ؛ باب قوله تعالى: (ولكم نصف ما ترك أزواجكم...)]
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মৃত ব্যক্তির সম্পদ ছিল সন্তানের জন্য, আর ওসীয়ত ছিল পিতামাতার জন্য। এরপর তা থেকে আল্লাহ তাআলা তাঁর পছন্দ অনুযায়ী কিছু বিধান রহিত করলেন এবং পুরুষদের জন্য মহিলার দ্বিগুণ নির্ধারণ করলেন।( ক্ষেত্র বিশেষে )পিতামাতা প্রত্যেকের জন্য ৬ ভাগের ১ অংশ ও ৩ ভাগের ১ অংশ নির্ধারণ করলেন, স্ত্রীদের জন্য ৮ ভাগের ১ ও ৪ ভাগের ১ অংশ নির্ধারণ করলেন এবং স্বামীর জন্য ২ ভাগের ১ ও ৪ ভাগের ১ অংশ নির্ধারণ করলেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৫৭৮)
মোটকথা, জাহেলি যুগে সমস্ত সম্পত্তি কেবলমাত্র পুত্র সন্তানরা পেত। সম্পত্তিতে মৃতের পিতা-মাতা বা অন্য আত্মীয়দের কোনো হক্ক বা অধিকার দেওয়া হতো না।
ইসলাম আগমনের পর, পরিত্যক্ত সম্পত্তি বন্টনের উদ্দেশ্যে প্রথমে এই আয়াত নাযিল হয়-
کُتِبَ عَلَیۡکُمۡ اِذَا حَضَرَ اَحَدَکُمُ الۡمَوۡتُ اِنۡ تَرَکَ خَیۡرَۨا ۚۖ الۡوَصِیَّۃُ لِلۡوَالِدَیۡنِ وَالۡاَقۡرَبِیۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ حَقًّا عَلَی الۡمُتَّقِیۡنَ ؕ
"তোমাদের উপর ফরয করা হয়েছে যে, তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অর্থ-সম্পদ রেখে যায়, তবে যখন তার মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হবে, তখন নিজ পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পক্ষে ন্যায়সঙ্গতভাবে ওসিয়ত করবে। এটা মুত্তাকীদের অবশ্য কর্তব্য। (সুরা বাকারা, আয়াত নং ১৮০)
উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ করার সময়, যেহেতু ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের সুযোগ থাকে, তাই পরবর্তীতে এই বিধান রহিত করা হয় এবং স্থায়ীভাবে মীরাসের কানুন নাযিল হয়-
لِلرِّجَالِ نَصِیۡبٌ مِّمَّا تَرَکَ الۡوَالِدٰنِ وَالۡاَقۡرَبُوۡنَ ۪ وَلِلنِّسَآءِ نَصِیۡبٌ مِّمَّا تَرَکَ الۡوَالِدٰنِ وَالۡاَقۡرَبُوۡنَ مِمَّا قَلَّ مِنۡہُ اَوۡ کَثُرَ ؕ نَصِیۡبًا مَّفۡرُوۡضًا
পুরুষদের জন্য সেই সম্পদে অংশ রয়েছে, যা পিতা-মাতা ও নিকটতম আত্মীয়বর্গ রেখে যায়, আর নারীদের জন্যও সেই সম্পদে অংশ রয়েছে, যা পিতা-মাতা ও নিকটতম আত্মীয়বর্গ রেখে যায়, চাই সে (পরিত্যক্ত) সম্পদ কম হোক বা বেশি। এ অংশ (আল্লাহর তরফ থেকে) নির্ধারিত। (সুরা নিসা, আয়াত নং ৭)
তারপর কুরআন ও হাদিসে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, কে উত্তরাধিকার হবে ? , কাকে কতটুকু অংশ দেওয়া হবে?।
পুরুষদের জন্য মহিলার দ্বিগুণ নির্ধারণ করা হয়েছে। (ক্ষেত্র বিশেষে) পিতামাতা প্রত্যেকের জন্য এক ষষ্ঠাংশ ও এক তৃতীয়াংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, স্ত্রীর জন্য এক অষ্ঠমাংশ ও এক চতুর্থাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, এবং স্বামীর জন্য অর্ধেক অংশ ও এক চতুর্থাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। (বিস্তারিত পড়ুনঃ সুরা নিসা এর ১১,১২ নং আয়াতের তাফসীর ও মীরাস বিষয়ক মাসায়েল)
মীরাস ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ মানুষের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি; বরং আল্লাহ নিজেই তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কারোও অংশ কমিয়ে দেওয়া বা বঞ্চিত করার অধিকার কোনোও ব্যক্তির নেই। অন্যের অধিকার হরণ করে সম্পদ ভোগ করা মহাপাপ।
মীরাস আত্মসাৎকারীদের জন্য সতর্কবাণী হিসেবে, কুরআন পাকের এক স্থানে আবেগপূর্ণ ভাষায় মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে-
وَلۡیَخۡشَ الَّذِیۡنَ لَوۡ تَرَکُوۡا مِنۡ خَلۡفِہِمۡ ذُرِّیَّۃً ضِعٰفًا خَافُوۡا عَلَیۡہِمۡ ۪ فَلۡیَتَّقُوا اللّٰہَ وَلۡیَقُوۡلُوۡا قَوۡلًا سَدِیۡدًا
আর সেইসব লোক (ইয়াতীমদের সম্পদে অসাধুতা করতে) ভয় করুক, যারা নিজেদের পেছনে অসহায় সন্তান রেখে গেলে তাদের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন থাকত। সুতরাং তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং সরল-সঠিক কথা বলে। (সুরা নিসা, আয়াত নং ৯)
ভেবে দেখুন! যদি আপনার মৃত্যু হয় এবং আপনার ছোট ছোট সন্তানদের, অন্যরা সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে, তাহলে আপনার কেমন লাগবে? সুতরাং আপনারও উচিত , অন্যের মীরাস আপনিও যেন আত্মসাৎ না করেন।
আর এক আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে-
اِنَّ الَّذِیۡنَ یَاۡکُلُوۡنَ اَمۡوَالَ الۡیَتٰمٰی ظُلۡمًا اِنَّمَا یَاۡکُلُوۡنَ فِیۡ بُطُوۡنِہِمۡ نَارًا ؕ وَسَیَصۡلَوۡنَ سَعِیۡرًا
যারা ইয়াতীমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করে, তারা নিজেদের পেটে কেবল আগুন ভরতি করে। তারা অচিরেই এক জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে। (সুরা নিসা, আয়াত নং ১০)
আল্লাহ তাআলা মীরাসের পূর্ণাঙ্গ বিধান বর্ণনার পর বলেছেন।
وَصِیَّۃً مِّنَ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَلِیۡمٌ ؕ
(এসব) আল্লাহর বিশেষ হুকুম। আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞাত, সহনশীল। (সুরা নিসা, আয়াত নং ১২)
সারকথা, মীরাস বণ্টন আল্লাহর পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ, যা আমলে রুপান্তরিত করা অপরিহার্য । এর বিপরীতে আল্লাহর আদেশ অমান্য করার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর কানুন ভঙ্গ করে মোটেও ভাবা উচিত নয় যে, আমি বেঁচে গেলাম এবং আমার সম্পত্তি বৃদ্ধি পেল ; বরং এর হিসাব অবশ্যই নেওয়া হবে। কেননা আল্লাহ তাআলা সর্ববিষয়ে জ্ঞাত।
আর মীরাস বন্টন বিষয়ে অবহেলার কারণে তাৎক্ষণিক শাস্তি নেমে না আসা, আল্লাহ তাআলার "হালীম" বা সহনশীল হওয়া গুণের কারণে হয়।
মীরাস ভাগ-বন্টন না করে অর্থ-সম্পদ নিজের দখলে রাখা জুলুম ও অবিচার।
কারণ উত্তরাধিকারভুক্ত সম্পদ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকৃত ওয়ারিসদের জন্য নির্ধারিত পুরস্কার। কর্তব্য ছিল,সেই অধিকার তাদের হাতে তুলে দেওয়া । তার পরিবর্তে নিজের কাছে রেখে দেওয়া, নিজে ব্যবহার করা, আমানতের খেয়ানত ও স্পষ্ট অন্যায়।
তারপর সাধারণত এটাই হয়ে থাকে , যারা ভাই , বোন ও আত্বীয় স্বজনদের প্রাপ্য অংশ আটকে রেখে তাদের অধিকার নষ্ট করে , জুলুম করে, তাদের মাঝে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ ধরনের অন্যায়, চলতে থাকে। প্রথম ব্যক্তি যেমন, নিজের কর্মের কারণে গুনাহগার হয়, তেমনি পরবর্তীদের গুনাহের অংশও তার ওপর বর্তায়। অতএব এই অন্যায় থেকে বিরত থাকা জরুরী।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ঘটনা
একবার ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এক অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলেন। তিনি সেখানেই বসে ছিলেন , তখন রোগীর মৃত্যু হয়।
রোগীর পাশে একটি প্রদীপ জ্বলছিল। রোগীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) প্রদীপটি নিভিয়ে দিলেন।
লোকেরা বলল: “এখন তো আলো আরও বেশি প্রয়োজন ছিল।” তিনি বললেন: “লোকটি জীবিত থাকাকালীন এটি তার সম্পত্তি ছিল। এখন তার মৃত্যুর পর এটি উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি হয়ে গেছে। তাদের অনুমতি ছাড়া এটি ব্যবহার করা যাবে না।”
ডা. আবদুল হাই আরিফী (রহ.)-এর ঘটনা
মুফতি শফী সাহেব (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর , একবার ডা. আবদুল হাই আরিফী (রহ.) তাঁর পুত্রদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। নিজেকে অসুস্থ বোধ করলেন, তাই মুফতি তাকি উসমানী সাহেব তাঁর পিতার রেখে যাওয়া ওষুধ পরিবেশন করেন।
ডা. আরিফী (রহ.) জিজ্ঞেস করলেন: “মীরাস কি বণ্টন করা হয়েছে?”
উত্তরে বলা হলো: “না।” তখন তিনি বললেন: “তাহলে সকল উত্তরাধিকারীর অনুমতি ছাড়া কীভাবে এই ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে?” পরে জানানো হলো যে, সকল উত্তরাধিকারী উপস্থিত আছেন এবং তাদের অনুমতি নিয়েই তা ব্যবহার করা হয়েছে।
আমাদের অবহেলা ও সমাজের ধ্বংস
আজ মুসলিম সমাজে এমন অবস্থা হয়েছে যে, আমরা নিজেদের ধর্ম এবং ইসলামী শরিয়তের পরিবর্তে, অমুসলিমদের রীতিনীতি অনুসরণ করে চলেছি।
অনেকেই মেয়েদের বিয়েতে প্রচুর যৌতুক ও উপহার দিয়ে উত্তরাধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করেন।
অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো: মেয়েকে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ উপহার দিলেও সে উত্তরাধিকারের অধিকারী থাকবে এবং তাকে তার নির্ধারিত অংশ দিতে হবে। যদি দুনিয়াতে না দেন, তাহলে আখেরাতে নিজের নেকী দিতে হবে। কেউ কেউ বোন বা মেয়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে থাকে এবং "অধিকার মওকুফ" এর কাগজ লিখিয়ে নেন, যা শরিয়তসম্মত নয়। তবে, তাদের নিজেদের অংশ হাতে তুলে নেওয়ার পর, স্বেচ্ছায় কেউ হাদিয়া করলে, এর অবকাশ রয়েছে।
মীরাসের মাসায়েল সম্পর্কে অবহেলার চিত্র
মুসলমানদের মধ্যে অন্যান্য লেনদেনের মতো,উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রেও ব্যাপক অবহেলা দেখা যায়। ইসলামের পূর্বে যে অবিচার এবং বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি ছিল , বর্তমানেও বিভিন্ন রুপে দেখা যায়। যদিও মাদরাসা ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সিলেবাসে মীরাস বিষয়টি পড়ানো হয়, তবুও খুব কম মানুষই শরিয়ত অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন করেন।
আনুমানিক মাত্র পাঁচ শতাংশ নারী, তাদের উত্তরাধিকার অংশ পান।
প্রতিদিন হাজার হাজার মুসলমান মারা যাচ্ছেন। যে জন্ম নিয়েছে, তাকেই মরতে হবে। ফলাফল এই হওয়া উচিত ছিল যে, আলেমগণের কাছে মাসায়েল জানার জন্য লাইন লেগে যেত , ফতোয়া বিভাগে মীরাস সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্ন বিদ্যমান হতো। কেননা প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির সম্পদ শরিয়ত অনুযায়ী বণ্টন করা ফরজ । যখন বন্টন করা ফরয , তখন পদ্ধতি জানাও ফরয । কিন্তু মীরাসের মাসায়েলের পরিবর্তে সেখানে তালাক এবং খুলা' এর মাসায়েল অসংখ্য জমা হয়েছে। তাই প্রত্যেকের উচিত, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধান শেখা এবং বাস্তবায়ন করা।
মৃত্যুর পর ধন-সম্পত্তিতে চারটি কাজ আবশ্যক
কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার সম্পদের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে চারটি কাজ করতে হবে:
১. শরিয়তসম্মতভাবে কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা।
২. মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা।
৩. মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বৈধ ওসিয়ত বাস্তবায়ন করা।
৪. অবশিষ্ট সম্পদ শরিয়ত অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা।
জাহেলি যুগে নারীদের অবস্থা
জাহেলি যুগে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার স্ত্রীকেও সম্পদের মতো উত্তরাধিকার হিসেবে গণ্য করা হতো।
উত্তরাধিকারীরা তাকে নিজেদের সম্পত্তি মনে করত, ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করত, অন্যের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে মোহর নিজেরা আত্মসাৎ করত, অথবা সারাজীবন বিয়ে করতে দিত না। এমনকি কখনও সৎপুত্রও সৎমাকে জোরপূর্বক বিয়ে করত।
ইসলাম এই নিষ্ঠুর প্রথা বিলুপ্ত করে ঘোষণা করেছে:
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَرِثُوا النِّسَآءَ کَرۡہًا ؕ وَلَا تَعۡضُلُوۡہُنَّ لِتَذۡہَبُوۡا بِبَعۡضِ مَاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ
হে ঈমাণদারগণ! বলপূর্বক নারীদেরকে উত্তরাধিকারে গ্রহন করা তোমাদের জন্যে হালাল নয় , এবং তাদেরকে আটক রেখো না যাতে তোমরা তাদেরকে যা প্রদান করেছ তার কিয়দংশ নিয়ে নাও; যদি না তারা কোন প্রকাশ্য অশ্লীলতা করে।
এভাবেই ইসলাম নারীর সম্মান, স্বাধীনতা এবং উত্তরাধিকারের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। (সুরা নিসা, আয়াত নং ১৯)
মীরাসের আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট
হযরত আওস ইবনে সাবিত আনসারী (রা.) মৃত্যুবরণ করলে, তাঁর স্ত্রী ও তিন কন্যা জীবিত ছিল।
তাঁর চাচাতো ভাইয়েরা সমস্ত সম্পত্তি নিজেদের দখলে নিয়ে স্ত্রী ও কন্যাদের বঞ্চিত করেন। তখন স্ত্রী রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে অভিযোগ করেন।
একই রকম ভাবে কিছু দিন পর হযরত সা'দ ইবনে রাবী (রা.) শহীদ হলেন ,তাঁর ভায়েরাও সমস্ত সম্পত্তি দখল করে নেন এবং স্ত্রী ও দুই কন্যাকে বঞ্চিত করেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে অভিযোগ করা হলে, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো হুকুম অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ধোর্য্যের আদেশ করেন। ওহির মাধ্যমে নির্দেশ আসে, আল্লাহ মীরাসের মধ্যে মহিলাদেরও অংশ রেখেছেন। ( و للنساء نصيب مما ترك.....)
তারপর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই অংশ নির্ধারিত করেন: দুই কন্যা মোট সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ পাবে।
স্ত্রী এক-অষ্টমাংশ পাবে। অবশিষ্ট অংশ অন্য উত্তরাধিকারীরা পাবে। ইসলামী শরীয়তের মাধ্যমে জাহেলি যুগের এই অন্যায় কানুন বিলুপ্ত হয়।
মীরাসের কানুন ভঙ্গ করা ইহুদী সূলভ আচরণ
আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
اَفَتُؤۡمِنُوۡنَ بِبَعۡضِ الۡکِتٰبِ وَتَکۡفُرُوۡنَ بِبَعۡضٍ ۚ فَمَا جَزَآءُ مَنۡ یَّفۡعَلُ ذٰلِکَ مِنۡکُمۡ اِلَّا خِزۡیٌ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَیَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ یُرَدُّوۡنَ اِلٰۤی اَشَدِّ الۡعَذَابِ ؕ وَمَا اللّٰہُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ এবং কিছু অংশ অস্বীকার কর? তাহলে বলো, তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তাদের শাস্তি এ ছাড়া আর কী হতে পারে যে, পার্থিব জীবনে তাদের জন্য থাকবে লাঞ্ছনা আর কিয়ামতের দিন তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে কঠিনতর আযাবের দিকে? তোমরা যা-কিছু কর আল্লাহ সে সম্পর্কে উদাসীন নন। (সুরা বাকারা, আয়াত নং ৮৫)
হাশরের দিন মীরাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হবে
কেয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে পাঁচটি করে প্রশ্ন করা হবে। যার উত্তর না দিয়ে কেউ আগে যেতে পারবেনা। অর্থ্যাৎ ১০০ নাম্বারের মধ্যে দুটি প্রশ্ন ৪০ নম্বরের হবে ।
প্রশ্ন হবে, সম্পদ কোথায় থেকে উপার্জন করেছো? কোথায় ব্যয় করেছো?
তখন অন্যান্য সম্পদের প্রশ্নের সাথে সাথে, মীরাস আত্মসাৎকারীদের কাছেও জিজ্ঞাসা করা হবে, কেন তারা অন্যদের অধিকার হরণ করে ছিল।
যখন কেয়ামতের দিন সকল হক্কদারের অধিকার তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, একদিকে আমরা থাকবো, অপরদিকে আমাদের সামনে আমাদের বোন, মেয়ে ও স্ত্রী থাকবে, যাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তারা আল্লাহর দরবারে নিজেদের দাবি উত্থাপন করবে।
কি জবাব হবে তখন আমাদের !! ??
মীরাস বান্দার হক্ক
সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলতেন: "কোনো মানুষের একটি অধিকার নিজের ঘাড়ে নিয়ে কেয়ামতের দিন উপস্থিত হওয়ার চেয়ে, আল্লাহর সত্তরটি অবাধ্যতা নিয়ে উপস্থিত হওয়া হালকা হবে।" কারণ, আল্লাহ চাইলে, ক্ষমা করতে পারেন ; কিন্তু মানুষের অধিকার মানুষকেই পরিশোধ করতে হবে।
মূল কথা : মীরাস আদায় করা আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরয এবং এই আদেশ পালন করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
হাদীসের পাঠ : নাজাতের পথ
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد الأنبياء والمرسلين سيدنا ومولانا محمد وعلى آله وأصحاب...
তিনটি বড় গুনাহ- বদযবানী, বদনেগাহী, বদগুমানী
মুরাদাবাদ। একটি প্রসিদ্ধ শহর। ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি জেলা। এ শহরেই অবস্থিত প্রসিদ্ধ একটি মাদরাসা...
সাধারণ মানুষদের ইলম অর্জনের পথ ও পদ্ধতি
জেনারেল শিক্ষিত ভাই-বোনরা দ্বীনের পথে আসার পরে ইলম অর্জনের প্রতি সচেষ্ট হচ্ছেন এটি খুবই সুসংবাদের কথ...
ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে বয়সের বাঁধা পেরিয়ে কীর্তিমান মনীষীগণ
ইলম অর্জনের অভাবিতপূর্ব মর্যাদা ও গুরুত্ব কুরআন-হাদীস ও তাফসীর গ্রন্থে দীনি ইলম অর্জনের অভাবিতপূর্ব...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন