প্রবন্ধ
LGBT: উৎপত্তি, বিস্তার, বৈশ্বিক বৈধতা ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
২৫ জানুয়ারী, ২০২৬
৫৭৬১
০
অমুসলিমদের আচার-আচরণ ও কালচার Vs ইসলামী সভ্যতার মূলনীতি। পর্ব ৫
ভূমিকা
মানবসভ্যতা কেবল বস্তুগত উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা ভোগ-বিলাসের নাম নয়; বরং নৈতিকতা, শালীনতা, মানবিক মূল্যবোধ ও আল্লাহভীতির সমন্বিত রূপই হলো প্রকৃত সভ্যতা। যে সমাজে মানুষ নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায়বিচার পায়, সেই সমাজই সত্যিকার অর্থে সভ্য। ইসলাম মানুষের জীবনকে এই সুশৃঙ্খল, ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণময় পথে পরিচালিত করার উদ্দেশ্যেই এসেছে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে গড়ে ওঠা সমাজব্যবস্থাই এমন এক আদর্শ সভ্যতার রূপরেখা দেয়, যেখানে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র সব স্তরেই ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইসলাম মানবসভ্যতার ভিত্তি হিসেবে আকীদা, আখলাক ও আমল এই তিনটি মৌলিক বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। ঈমান মানুষের অন্তরকে শুদ্ধ ও দৃঢ় করে, উত্তম চরিত্র মানুষকে অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখে এবং সৎ আমল সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করে। এ কারণেই ইসলাম শিক্ষা, ইনসাফ, পারস্পরিক সহানুভূতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে সভ্যতার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছে।
ইসলামি সভ্যতায় পরিবার হলো সমাজের মূল ভিত্তি ও কেন্দ্রবিন্দু। পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে সুস্পষ্ট অধিকার ও দায়িত্ববোধই একটি সুস্থ সমাজ গঠনের প্রধান উপায়। পরিবার ভেঙে গেলে সমাজ দুর্বল হয়ে পড়ে, আর সমাজ ভেঙে গেলে সভ্যতা অবশ্যম্ভাবীভাবে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়। তাই ইসলাম পরিবার সংরক্ষণ, লজ্জাশীলতা, চারিত্রিক পবিত্রতা ও নৈতিক শুদ্ধতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে সভ্যতার নামে কিছু চিন্তাধারা মানুষের স্বভাববিরোধী ও নৈতিক অবক্ষয়মূলক আচরণকে বৈধ ও স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে “LGBT” মতবাদ আজ আর কেবল ব্যক্তিগত আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং আইন, শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি প্রভাবশালী আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সমকামিতা, উভকামিতা ও লিঙ্গ-পরিচয় পরিবর্তনের ধারণা ইসলামি দৃষ্টিকোণে মানব প্রকৃতি, পারিবারিক ব্যবস্থা এবং সমাজের স্বাভাবিক কাঠামোর পরিপন্থী।
কুরআনে বর্ণিত লূত (আ.)–এর কওমের ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে এ ধরনের আচরণ সমাজ ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম এসব কর্মকাণ্ডকে হারাম ঘোষণা করে মানবসভ্যতাকে নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে চায়। একজন মুসলিম হিসেবে এই বিষয়টি ইতিহাস, সমকালীন বাস্তবতা ও শরিয়তের আলোকে গভীরভাবে অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি।
সভ্যতা টিকে থাকলেই মানবতা টিকে থাকবে। আর ইসলামি সভ্যতা হলো এমন এক পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই কল্যাণের পথ দেখায়। নৈতিকতা, লজ্জাশীলতা ও আল্লাহভীতি পরিত্যাগ করলে সভ্যতার নামে কেবল ধ্বংসই ডেকে আনা হয়। তাই মানবতার অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য ইসলামি সভ্যতাকে আঁকড়ে ধরাই একমাত্র নিরাপদ ও কল্যাণকর পথ।
পরিচিতি:
১. LGBT ধারণার সংজ্ঞা
LGBT শব্দটি চারটি ইংরেজি পরিভাষার সংক্ষিপ্ত রূপ:
Lesbian: নারী-নারীর যৌন সম্পর্ক
Gay: পুরুষ-পুরুষ যৌন সম্পর্ক
Bisexual: উভয় লিঙ্গের প্রতি যৌন আকর্ষণ
Transgender: জন্মগত লিঙ্গের বিপরীত লিঙ্গ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেওয়া। পরবর্তীতে এর সঙ্গে আরও অক্ষর (Q+, etc.) যোগ হয়ে একটি বিস্তৃত মতাদর্শে রূপ নিয়েছে।
২. ঐতিহাসিক উৎপত্তি: প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক কাল
ক. প্রাচীন সভ্যতা
ইতিহাসে সমকামিতার অস্তিত্ব প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজে দেখা যায়, তবে তা কখনোই “নৈতিক আদর্শ” বা “স্বাভাবিক পরিবারব্যবস্থা” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি ছিল ক্ষমতাবানদের বিকৃতি বা সীমিত সামাজিক চর্চা।
প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় সমকামিতার কিছু দৃষ্টান্ত ইতিহাসে পাওয়া গেলেও তা কখনোই আধুনিক অর্থে কোনো “নৈতিক আদর্শ”, “স্বাভাবিক যৌন পরিচয়” বা “পারিবারিক বিকল্প ব্যবস্থা” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না; গ্রিক সমাজে যে চর্চাটি বেশি আলোচিত “পেডেরাস্টি” তা ছিল মূলত একজন প্রাপ্তবয়স্ক অভিজাত পুরুষ ও কিশোর বালকের মধ্যকার সীমিত, সাময়িক ও কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধের অধীন সম্পর্ক, যার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা ও সামাজিকীকরণ, স্থায়ী দাম্পত্য বা সমবয়সী প্রেম নয়, আর কিশোর প্রাপ্তবয়স্ক হলে সেই সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটত; একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের জন্য গ্রহণকারী (passive) ভূমিকা নেওয়াকে সামাজিকভাবে লজ্জাজনক ও অপমানজনক মনে করা হতো এবং নারী–পুরুষের বিবাহ ও সন্তান উৎপাদনকেই রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হতো। এ কথা প্লেটো, অ্যারিস্টটলসহ বহু গ্রিক দার্শনিকের লেখায় স্পষ্ট; রোমান সমাজে বিষয়টি আরও ক্ষমতা ও ভূমিকা-নির্ভর ছিল, যেখানে যৌন আচরণ বিচার হতো কার সঙ্গে নয় বরং কোন ভূমিকায় তার ওপর, ফলে একজন স্বাধীন রোমান নাগরিক পুরুষের জন্য প্রভাবশালী ভূমিকা সহনীয় হলেও গ্রহণকারী ভূমিকা তাকে সামাজিকভাবে অপমানিত (infamis) করত, আর দাস ও নিম্নশ্রেণির সঙ্গে এমন সম্পর্ককে স্পষ্টতই ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখা হতো; রোমান আইনে বিবাহ ছিল সুস্পষ্টভাবে নারী–পুরুষের প্রতিষ্ঠান, সমকামী বিবাহের কোনো স্বীকৃতি ছিল না এবং অগাস্টাসের পারিবারিক আইনসহ রাষ্ট্রীয় বিধানসমূহ প্রমাণ করে যে বংশরক্ষা ও সন্তান জন্মই ছিল নাগরিক কর্তব্য; সুতরাং ঐতিহাসিকভাবে বলা যায়, প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজে সমকামিতার অস্তিত্ব থাকলেও তা ছিল সীমিত, শ্রেণিভিত্তিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সামাজিক ব্যতিক্রম কখনোই সার্বজনিক নৈতিক মানদণ্ড, স্বাভাবিক পরিবারব্যবস্থা বা সভ্যতার আদর্শ রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং বহু ক্ষেত্রে তা ক্ষমতাবানদের বিকৃতি ও মানবিক দুর্বলতার প্রকাশ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছিল।
খ. আসমানি ধর্মসমূহের অবস্থান
ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম তিনটি আসমানি ধর্মেই সমকামিতা স্পষ্টভাবে নিন্দিত। বিশেষত হযরত লূত (আ.)-এর কওম ছিল ইতিহাসে এই বিকৃতির প্রতীক। তাদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তাআ’লা বলেন, “তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে পৃথিবীর কেউ করেনি?”
(সূরা আল-আ‘রাফ: ৮০)
সামনে বিস্তারিত আসছে।
৩. আধুনিক LGBT আন্দোলনের জন্ম:
১৯শ–২০শ শতক:
শিল্পবিপ্লবের পর ইউরোপে ধর্মীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হয়। ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও ভোগবাদ জোরদার হয়। ১৯৬০-এর দশকে পশ্চিমা সমাজে Sexual Revolution শুরু হয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে বিশ্বের প্রথম সংগঠিত সমকামী আন্দোলনের বিকাশ ঘটে। পুরুষদের সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা আইন (অনুচ্ছেদ ১৭৫), তুলনামূলক শিথিল সেন্সরশিপ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পরিবেশ এই আন্দোলনের সূচনায় ভূমিকা রাখে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি জার্মান লেখকরাই “সমকামী” শব্দটি প্রবর্তন করেন এবং এর অপরাধীকরণের বিরোধিতা করেন। ১৮৯৭ সালে ম্যাগনাস হির্শফেল্ড বৈজ্ঞানিক-মানবিক কমিটি প্রতিষ্ঠা করেন, যার লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তির মাধ্যমে সমকামিতার প্রতি সহনশীলতা বাড়ানো এবং অনুচ্ছেদ ১৭৫ বাতিল করা। শুরুতে এটি অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও জার্মান বিপ্লবের পর আন্দোলনটি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়।
ওয়েইমার প্রজাতন্ত্রের সময় সেন্সরশিপ কমে যাওয়া এবং নগরভিত্তিক সমকামী উপ-সংস্কৃতির বিকাশ আন্দোলনকে শক্তিশালী করে। ১৯১৯ সালের পর সমকামী, লেসবিয়ান ও ট্রান্সভেস্টাইটদের জন্য প্রথম গণ-বাজার সাময়িকী প্রকাশিত হয়। এ সময় জার্মান ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি ও লীগ ফর হিউম্যান রাইটসের মতো সংগঠন মানবাধিকার ও সামাজিক মর্যাদার রাজনীতিকে গুরুত্ব দেয়, যদিও তারা আন্দোলনের ভাবমূর্তি রক্ষার নামে কিছু গোষ্ঠীকে বাদ দেয়। তবুও সাধারণ সমাজে আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা সীমিতই ছিল।
১৯২৯ সালের মহামন্দা, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অনুচ্ছেদ ১৭৫ বাতিলের ব্যর্থতার ফলে আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৩৩ সালে নাৎসিরা ক্ষমতায় আসার পর কয়েক মাসের মধ্যেই এই আন্দোলনের অবসান ঘটে এবং সমকামী পুরুষদের ওপর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ নির্যাতন শুরু হয়। তবে ওয়েইমার যুগের এই সংক্ষিপ্ত স্বাধীনতার অভিজ্ঞতা পরবর্তী LGBTQ আন্দোলনগুলোর ওপর গভীর প্রভাব রেখে যায়।
প্রথম সমকামী আন্দোলন - উইকিপিডিয়া https://share.google/VQgGGDdndvqpDdOk6
মনোবিজ্ঞানের ভূমিকা:
১৯৭৩ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন সমকামিতাকে “মানসিক রোগ” তালিকা থেকে বাদ দেয়, এটি ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের ফল, বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য নয়।
মনোবিজ্ঞানে সমকামিতাকে মানুষের একটি স্বাভাবিক যৌন অভিমুখীতা হিসেবে বিস্তৃতভাবে গবেষণা করা হয়েছে। যদিও আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (APA) ১৯৫২ সালে DSM-I-এ একে মানসিক ব্যাঘাত হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল, পরবর্তী বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই ধারণার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষণাগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখিয়েছে যে সমকামিতা মানব যৌনতার একটি প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক ও সুস্থ প্রকাশ।
এই বৈজ্ঞানিক ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে APA ১৯৭৩ সালে DSM-II থেকে সমকামিতাকে বাদ দেয় এবং ১৯৭৫ সালে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন মানসিক রোগের কলঙ্ক দূর করার আহ্বান জানায়। পরবর্তীতে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ সোশ্যাল ওয়ার্কার্সও একই অবস্থান গ্রহণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯০ সালে ICD-10 থেকে সমকামিতাকে বাদ দেয়।
বর্তমান বৈজ্ঞানিক ও ক্লিনিক্যাল ঐকমত্য হলো, সমকামী আকর্ষণ, অনুভূতি ও আচরণ মানব যৌনতার স্বাভাবিক ও ইতিবাচক বৈচিত্র্য এবং এটি স্বাভাবিক মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক জীবনের সাথে সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সমকামিতা এবং মনোবিজ্ঞান - উইকিপিডিয়া https://share.google/y9vw3ep3oZ5v1FAcJ
৪. বর্তমান বিশ্বে LGBT-এর বৈধতা (সারসংক্ষেপ)
১) পূর্ণ বৈধতা ও আইনি সুরক্ষা
পশ্চিম ইউরোপ
উত্তর আমেরিকা
অস্ট্রেলিয়া ও কিছু ল্যাটিন আমেরিকান অঞ্চল। এখানে সমকামী বিয়ে, দত্তক গ্রহণ ও শিক্ষায় LGBT প্রচার বৈধ।
বিশ্বে ৩২ টি দেশেই বৈধ, কেন সমকামী মানুষদের বিবাহের বিরুদ্ধে নরেন্দ্র মোদির সরকার? https://share.google/8kkTz2Jk06HFXX9rr
২) আংশিক বৈধতা
কিছু এশীয় ও আফ্রিকান দেশ
ব্যক্তিগত আচরণ হিসেবে শাস্তি নেই, তবে বিয়ে বা প্রচার নিষিদ্ধ।
এলজিবিটিকিউ অধিকারে বিভক্ত ইউরোপ https://share.google/nRc7WfiZUGggrlv0I
৩) সম্পূর্ণ অবৈধ
অধিকাংশ মুসলিম দেশ
কিছু আফ্রিকান ও এশীয় রাষ্ট্র
এখানে শরিয়াহ বা রক্ষণশীল আইনের ভিত্তিতে সমকামিতা অপরাধ।
ইসলাম কোনো মানব-রচিত ধর্ম নয়; এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। তাই মানবীয় কোনো আইন বা চিন্তাধারা আল্লাহর আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ রাখে না। আল্লাহর আইনই সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বন্যায়পূর্ণ ও মানবকল্যাণে পরিপূর্ণ। সেই বিধান অনুযায়ী সমকামিতা ও এলজিবিটি-ধরনের সকল আচরণ স্পষ্টভাবে হারাম ও নিষিদ্ধ। “Human Rights” বনাম “Divine Limits” আধুনিক বিশ্বে LGBT-কে মানবাধিকারের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ইসলামে, ১. মানবাধিকার আল্লাহ নির্ধারিত সীমার অধীন। ২. ব্যক্তিস্বাধীনতা ফাহেশা বৈধ করে না। ৩. সমাজ রক্ষা করা ব্যক্তির খেয়ালের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
৫. বাংলাদেশে LGBT এজেন্ডা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও প্ল্যাটফর্ম
বাংলাদেশে এলজিবিটি এজেন্ডার নেপথ্যে কারা? • https://share.google/wQReKJLhJ6F84JGfC
আমাদের তালাশে যারা উঠে এসেছে,
১) Inclusive Bangladesh
ওয়েবসাইট:
https://inclusivebangla.org
পরিচিতি: ট্রান্সজেন্ডার-নেতৃত্বাধীন LGBTIQ+ মানবাধিকার সংগঠন। যুব উন্নয়ন, লিঙ্গ বৈচিত্র্য ও “inclusive society” প্রচারে কাজ করে।
প্রতিষ্ঠা: ২০১৩
২) Shongshoptok
ওয়েবসাইট:
https://www.shongshoptok.com
পরিচিতি: নন-বাইনারি ও LGBTIQ+ নেতৃত্বাধীন সংগঠন। নিরাপদ স্থান, মানসিক সহায়তা ও অধিকারভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
৩) Pathchola Foundation
ওয়েবসাইট:
https://sites.google.com/view/pathchola-fbd-forlgbtiqa2019/who-are-we
পরিচিতি: ফেমিনিস্ট ও যুব-নেতৃত্বাধীন সংগঠন। LGBTIQAP+ ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, শিক্ষা ও SRHR বিষয়ে কাজ করে।
৪) Boys of Bangladesh (BoB)
উইকিপিডিয়া:
https://en.wikipedia.org/wiki/Boys_of_Bangladesh
পরিচিতি: ২০০২ সাল থেকে সক্রিয় অনলাইন গে-কমিউনিটি। এটি কোনো সরকারিভাবে নিবন্ধিত NGO নয়, বরং সামাজিক প্ল্যাটফর্ম।
৫) Roopbaan Magazine
উইকিপিডিয়া:
https://en.wikipedia.org/wiki/Roopbaan
পরিচিতি: বাংলাদেশের প্রথম LGBT-বিষয়ক ম্যাগাজিন (২০১৪)। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত।
৬) JusticeMakers Bangladesh in France (JMBF)
পরিচিতি: ফ্রান্সভিত্তিক সংগঠন। বাংলাদেশে LGBT সংক্রান্ত সহিংসতা ও বৈষম্য নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচারণা চালায়।
আইনি প্রেক্ষাপট (বাংলাদেশ)
বাংলাদেশে এখনো দণ্ডবিধির Section 377 কার্যকর রয়েছে।
সূত্র (আইন):
https://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-11/section-3233.html
বাংলাদেশে LGBTQ অধিকার - উইকিপিডিয়া https://share.google/bWLGvzDeHUtMz9ugG
৬. ইসলামী দৃষ্টিকোণ
আল্লাহ যা আদেশ ও নিষেধ করেছেন, তাতে প্রজ্ঞা রয়েছে
একজন মুসলিমের জন্য এক মুহূর্তের জন্যও এ বিষয়ে সন্দেহ করা বৈধ নয় যে, আল্লাহ যা বিধান করেছেন তা পরম প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ যা আদেশ করেছেন এবং যা নিষিদ্ধ করেছেন, সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে গভীর হিকমত। এটাই সরল ও সঠিক পথ, একমাত্র পথ যা মানুষের জন্য নিরাপত্তা, শান্তি, সম্মান, বিবেক ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করে—এবং তা সেই স্বাভাবিক প্রকৃতি (ফিতরাহ) অনুযায়ী, যার ওপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।
কিছু বিভ্রান্ত লোক ইসলাম ও তার বিধানকে আক্রমণ করার চেষ্টা করেছে। তারা তালাক ও বহুবিবাহকে নিন্দা করেছে, আর মদ্যপানকে বৈধ করেছে। কিন্তু যে কেউ তাদের সমাজের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাবে, সেসব সমাজ কী ভয়াবহ দুর্দশায় নিপতিত হয়েছে।
তারা যখন তালাক প্রত্যাখ্যান করল, তখন তার জায়গা নিল খুনোখুনি। যখন বহুবিবাহ প্রত্যাখ্যান করল, তখন পুরুষেরা অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলল। আর যখন মদ্যপান বৈধ করা হলো, তখন লজ্জাহীনতা ও অশ্লীলতার সব রূপ সমাজে ছড়িয়ে পড়ল।
সমকামী ও লেসবিয়ানরা স্বাভাবিক প্রকৃতির বিরোধিতা করে
সমকামী ও লেসবিয়ান উভয়েই সেই স্বাভাবিক প্রকৃতির (ফিতরাহ) বিরোধিতা করে, যার ওপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, এমনকি পশুদের মাঝেও, যেখানে পুরুষ স্বাভাবিকভাবে নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং নারী পুরুষের প্রতি। যে ব্যক্তি এর বিরোধিতা করে, সে মানবজাতির স্বাভাবিক প্রকৃতির বিরোধিতা করে।
সমকামিতা ও লেসবিয়ানিজমের ভয়াবহ ক্ষতি
সমকামিতার বিস্তারের ফলে এমন সব মারাত্মক রোগ ছড়িয়ে পড়েছে, যার অস্তিত্ব পূর্ব বা পশ্চিম, কেউই অস্বীকার করতে পারে না। যদি এই বিকৃত আচরণের একমাত্র ফল এইডস রোগই হতো, যা মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়, তবুও তা নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট হতো।
এ ছাড়া এটি পরিবারব্যবস্থা ভেঙে দেয় এবং মানুষকে কাজ ও পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য করে, কারণ তারা এসব বিকৃত কামনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
যেহেতু এই নিষেধাজ্ঞা তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে, তাই একজন মুসলিমের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ দেওয়ার অপেক্ষা করা উচিত নয় যে এতে ক্ষতি আছে। বরং তাকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ মানুষের জন্য কেবল কল্যাণকর জিনিসই বিধান করেন। আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো কেবল আল্লাহর প্রজ্ঞার প্রতি তার বিশ্বাস ও দৃঢ়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, “ব্যভিচার ও সমকামিতা উভয়ই এমন অশ্লীলতা, যা আল্লাহর সৃষ্টির ও বিধানের প্রজ্ঞার সম্পূর্ণ বিরোধী। সমকামিতায় অসংখ্য অকল্যাণ ও ক্ষতি রয়েছে। যার সঙ্গে এ কাজ করা হয়, তার জন্য হত্যা হওয়াই এ কাজ সহ্য করার চেয়ে উত্তম; কারণ এরপর সে এমনভাবে নৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায় যে তার সংশোধনের আর কোনো আশা থাকে না। তার ভেতর থেকে সব কল্যাণ নিঃশেষ হয়ে যায়, সে আল্লাহ ও সৃষ্টির সামনে লজ্জাবোধ হারিয়ে ফেলে। যে ব্যক্তি এ কাজ করে তার বীর্য ওই ব্যক্তির দেহ ও আত্মার জন্য বিষের মতো কাজ করে। আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, যার সঙ্গে এ কাজ করা হয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে কি না। এ বিষয়ে দুটি মত রয়েছে, যা আমি শায়খুল ইসলাম (রহ.)-এর কাছ থেকে শুনেছি।”
(আল-জাওয়াবুল কাফি, পৃষ্ঠা ১১৫)
লেসবিয়ানিজম কী?
লেসবিয়ানিজম হলো, এক নারী অন্য নারীর সঙ্গে এমন আচরণ করা, যা সাধারণত একজন পুরুষ নারীর সঙ্গে করে।
সমকামিতা (Homosexuality) কী?
সমকামিতা বলতে বোঝায়, পুরুষের সঙ্গে পেছনের পথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা। এটি নবী লূত (আ.)-এর অভিশপ্ত জাতির কাজ ছিল। শরিয়তের পরিভাষায়, পুরুষের পায়ুপথে পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ প্রবেশ করানোকে সমকামিতা বলা হয়।
কুরআনে লেসবিয়ানিজম ও সমকামিতার উল্লেখ
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর স্মরণ কর লূতকে, যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল: ‘তোমরা কি এমন জঘন্য কাজ করছ, যা তোমাদের আগে সৃষ্টিজগতের কেউ করেনি? তোমরা নারীদের ছেড়ে পুরুষদের সঙ্গে কামাচার করছ। বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।’”
(সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৮০-৮১)
“নিশ্চয়ই আমরা তাদের ওপর পাথরের প্রচণ্ড ঝড় পাঠিয়েছিলাম, লূতের পরিবার ছাড়া, তাদের আমরা রাতের শেষ প্রহরে রক্ষা করেছিলাম।”
(সূরা আল-কামার ৫৪:৩৪)
এ ছাড়া সূরা আল-আনকাবুত ২৯:২৮, আল-আম্বিয়া ২১:৭৪ এবং আন-নামল ২৭:৫৪-৫৮-এ এ অপরাধ ও শাস্তির বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে।
লূত (আ.)-এর কওমের ওপর নেমে আসা শাস্তি
এই আয়াতগুলো লূত (আ.)-এর কওমের ওপর অবতীর্ণ শাস্তির কথা উল্লেখ করে। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন: “আর তোমাদের মধ্য থেকে যে দু’জন এ অশ্লীল কাজে লিপ্ত হবে, তাদের কষ্ট দাও। অতঃপর যদি তারা তওবা করে ও সংশোধন করে নেয়, তবে তাদের ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
(সূরা আন-নিসা ৪:১৬)
ইবন কাসীর (রহ.) বলেন, এ আয়াতে প্রথমিক শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যা পরে চাবুক ও রজমের বিধান দ্বারা রহিত হয়েছে। কোনো কোনো সাহাবি ও তাবেয়ি এ আয়াতকে সমকামিতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলেছেন।
সুন্নাহতে লেসবিয়ানিজম ও সমকামিতার উল্লেখ
ইসলামে সমকামীতার যে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে তা দণ্ডবিধি হিসেবে ফৌজদারী আইন হিসেবে সংযুক্ত করা।
সমকামীতার ইসলামী শাস্তি হলো: যদি উভয়ের সম্মতিতে হয়, তাহলে উভয়কে হত্যা করা হবে। আর যদি জোরপূর্বক হয়, তাহলে যে করবে শুধু তাকে হত্যা করা হবে।
হত্যার পদ্ধতি হবে সবার জন্য শিক্ষানীয়, উঁচু পাহাড় থেকে ফেলে দিয়ে, কিংবা দুই পাথরের মাঝে রেখে পিশে ফেলা। এমন কঠোর শাস্তি প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে আশা করি সমকামিতার মতো নিকৃষ্ট বিকৃত রুচির কাজ বন্ধ হবে।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمِ لُوطٍ، فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ
হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম ইরশাদ করেন, যাকে তোমরা কওমে লুতের কাজ করতে দেখো [সমকামিতা], তাহলে যে করে এবং যার সাথে করে উভয়কে হত্যা কর। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-২৫৬১, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৪৬২, সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-১৪৫৬]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الَّذِي يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمِ لُوطٍ قَالَ: ارْجُمُوا الْأَعْلَى وَالْأَسْفَلَ، ارْجُمُوهُمَا جَمِيعًا
হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। কওমে লুতের মত কার্যসম্পাদনকারী তথা সমকামীদের ব্যাপারে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যে, এদের উপরের এবং নিচের উভয়কে পাথর মেরে হত্যা কর। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-২৫৬২]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” اقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ، فِي عَمَلِ قَوْمِ لُوطٍ،
হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, লুত আঃ এর কওমের মত কুকর্মে লিপ্ত উভয়কে হত্যা করে ফেল। {মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৭২৭, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-২৫৬১, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৪৬২, সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-১৪৫৬, সুনানে দারাকুতনী, হাদীস নং-৩২৩৪}
আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করি, তিনি যেন আমাদের ঈমান ও চরিত্রকে হিফাজত করেন, কুরআন–সুন্নাহর উপর অটল রাখেন এবং সব প্রকার গোমরাহি, ফিতনা ও হারাম চিন্তাধারা থেকে আমাদের ও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহই সর্বোত্তম হিফাজতকারী ও পথপ্রদর্শক।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন