প্রবন্ধ
বাংলাদেশের সাথে অন্য দেশের তারিখ মিল নেই কেন?
১০ জানুয়ারি, ২০২২
০
০
আমাদের প্রথমেই মনে রাখতে হবে, সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের চাঁদের তারিখে প্রতি মাসেই যে ১ দিনের ব্যবধান থাকবে—এমনটি জরুরি নয়। বরং কোনো কোনো মাসে ২ দিনের ব্যবধানও হয়ে থাকে।
যেমন, ২০২৬ সালে সৌদিতে পরপর দুই মাস ২৯ দিনের হওয়ায় দুই দেশের মাঝে ২ দিনের ব্যবধান তৈরি হয়েছিল।
গত শাওয়াল মাস:
🔸সৌদিতে: ইংরেজি ২০/৩/২০২৬ = ১ শাওয়াল
🔸বাংলাদেশে: ইংরেজি ২১/৩/২০২৬ = ১ শাওয়াল
এখানে ব্যবধান ছিল ১ দিন।
গত যিলকদ মাস:
🔸সৌদিতে: ইংরেজি ১৮/৪/২০২৬ = ১ যিলকদ
🔸বাংলাদেশে: ইংরেজি ২০/৪/২০২৬ = ১ যিলকদ
এখানে ব্যবধান হয়েছে ২ দিন।
এখন প্রশ্ন হলো—আগে ১ দিনের ব্যবধান ছিল, পরে হঠাৎ ২ দিন হলো কীভাবে?
এর কারণ হলো, শাওয়াল মাস দুই দেশে সমান দৈর্ঘ্যের হয়নি।
🔸সৌদিতে শাওয়াল মাস হয়েছিল ২৯ দিনের।
🔸বাংলাদেশে শাওয়াল মাস হয়েছিল ৩০ দিনের।
ফলে সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে এক দিন আগেই নতুন মাসে (যিলকদে) প্রবেশ করেছে। এভাবেই আগের ১ দিনের ব্যবধান বেড়ে ২ দিন হয়েছে।
সৌদি আরব ও বাংলাদেশের চাঁদ বিষয়ক সমস্যা
মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় বিভিন্ন ঘটনার জন্য চাঁদের উপর নির্ভরশীল। তার প্রধান কারণ হল, ইসলামিক সকল ঘটনা হিজরী বর্ষপঞ্জির উপর ভিত্তি করে তৈরি। হিজরী বর্ষপঞ্জি মূলত চন্দ্র মাসের উপর নির্ভর করে তৈরি। এই মাসের উপর ভিত্তি করে বছরের হিসেব হয়।
প্রতিবছরই এ নিয়ে অনেক অনেক প্রশ্ন দেখি যে, সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশ বা ভারতীয় উপমহাদেশের সময়ের পার্থক্য ২.৫-৩ ঘণ্টা হলেও, রমজান বা ঈদ কেন সাধারণত একদিন পর হয়? সামান্য কিছু সময়ে তো দিন বদলে যায় না!
আসলে বিষয়টা বুঝতে হলে পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্যের গতির বিষয়ে কিছু ধারণা থাকা আবশ্যক। সাথে এটাও জানতে হবে যে, চাঁদের গতির সাথে প্রচলিত সময়ের বেশ পার্থক্য রয়েছে।
সৌরবর্ষ
প্রথমে সৌরবর্ষ নিয়ে কথা বলি। পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরে আসে ১ বছরে। যেটাকে আমরা বলি ১ সৌর বছর। এটা সংঘটিত হয় পৃথিবীর বার্ষিক গতির কারণে। এটা একটা একক। এই একককে ৩৬৫ দিনে ভাগ করা যায়। কেননা পৃথিবী নিজের চারদিকে ১ দিনে ঘুরতে পারে এবং বছরে সেটা ৩৬৫ বার প্রায়। এই গতির নাম আহ্নিক গতি। তো, এই ১ দিনকে আবার হিসেবের সুবিধার্থে ২৪ ঘণ্টায় ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটা ভাগ হচ্ছে এক ঘণ্টা। এই ঘণ্টাকে আবার মিনিট, সেকেন্ড ইত্যাদি ক্ষুদ্র এককে ভাগ করা হয়েছে হিসেবের সুবিধার্থে। এই পর্যন্ত পড়ার পরে কোথাও কি চাঁদকে খুঁজে পেয়েছেন? অর্থাৎ দিনরাত্রির হিসেবে চাঁদ কি কোথাও আছে? তারমানে বোঝা যাচ্ছে এই ঘণ্টার হিসেবেও চাঁদকে ব্যবহার করা যাবে না।
চন্দ্রবর্ষ
চাঁদের পৃথিবীর চারদিকে একবার ঘুরে আসতে সময় লাগে গড়ে প্রায় ২৯.৫৩ দিন। ফলশ্রুতিতে চন্দ্রমাস হয় ২৯ বা ৩০। মজার ব্যাপার হল, চন্দ্রমাস নির্দিষ্ট নয়। ফলে মুসলিমদেরকে রমজান ও ঈদ পালন করতে চাঁদ দেখতে হয়। এই অনির্দিষ্টতার কারণে চন্দ্রবছরও আলাদা হয়। কোন বছর ৩৫৪, আবার কোন বছরে ৩৫৫ দিন হয়। অর্থাৎ এটি গ্রেগরীয় বা সৌরবর্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনন্য। এবং এখানেও সূর্যের কোন কাজ নিজ। যদিও চন্দ্রবর্ষে সূর্য ডোবার পর নতুন দিন গণনা শুরু হয়। অর্থাৎ রাত আগে আসে, তারপর দিন।
আসা করছি বিষয় দুটো পরিষ্কার। তবে এবার মূল বিষয়ে আলোচনা করা যাক।
সময়ের বিশাল তারতম্য
শুরুতে যেই প্রশ্নটা ছিল সেটাই আবার আলোচনা করি। হিসেব অনুযায়ী সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশ ৩ ঘণ্টা এগিয়ে। এতে বরং বাংলাদেশ ৩ ঘণ্টা আগে চাঁদ দেখবে। কিন্তু তা তো হয়ই না, উল্টো সৌদি আরবে একদিন আগে রমজান, ঈদ শুরু হয়ে যায় সাধারণত।
এর উত্তরের সঙ্কেত উপরে খানিকটা দিয়েছিও। সমস্যা হল, আমরা সৌর ও চন্দ্রের হিসেবকে মিলিয়ে ফেলি। সৌর হিসেবে সৌদি আরবের সাথে আমাদের পার্থক্য মাত্র ৩ ঘণ্টা হলেও চন্দ্রের হিসেবে সৌদি আরব ও আমাদের পার্থক্য ২১ ঘণ্টার! কি, অবাক হচ্ছেন? অবাক হওয়ারই কথা। এটা কিভাবে হল, বুঝতে পারছেন না নিশ্চয়ই? চলুন জেনে নিই বিষয়টা।
পৃথিবীর গতির কথা তো জানিই। পৃথিবী নিজের অক্ষের চারিদিকে পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘুরে চলেছে প্রতিনিয়ত। যার আহ্নিক গতি বলি। গতিটা সহজে বোঝা যাবে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিক বা অ্যান্টি ক্লকওয়াইজ (Anti Clockwise) বললে। চাঁদ তো ধীরে ধীরে আবর্তন করছে। ফলশ্রুতিতে প্রতিদিন পশ্চিম দেশ সবার আগে চাঁদের উন্মোচন দেখতে পায়। আমরা তো জানিই, সূর্যোদয় হয় পূর্ব থেকে? তবে চাঁদের ক্ষেত্রে উল্টো। যদিও চাঁদ পূর্বে উঠে পশ্চিমে অস্ত যায়, তবুও পশ্চিমারা চাঁদের আলো সবার আগে পায়।
কেন এক দেশে চাঁদ দেখা গেলেও অন্য দেশে দেখা যেতে দেরি হতে পারে। কেননা খালি চোখে চাঁদকে দেখতে হলে চন্দ্র আর সূর্যের মাঝে ১০.৫ ডিগ্রি কোণ থাকতেই হবে। এবং যে পরিমাণ দূরত্ব অর্জন করলে এই কোণ তৈরি হবে, সে পরিমাণ যেতে যেতে চাঁদের ১৭ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়। এ কারণেই আজ আমেরিকাতে চাঁদ দেখা গেলেই যে বাংলাদেশেও দেখা যাবে, সেটা ভুল ধারণা। যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই কোণ অর্থাৎ ১০.৫ ডিগ্রি অর্জন না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেখা যাবে না। একই বিষয় সৌদি আরব ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। এই সংকট কোণকে ইলঙ্গেশন (Elongation) বলে। তাই চাঁদের বয়স কত সেটা আদৌ আসল কথা নয়, সেই কোণ হয়েছে কিনা সেটার উপর নির্ভর করে চাঁদ দেখা যাবে কিনা।
ফলে আমরা সৌদি আরব থেকে ৩ ঘণ্টা সূর্যের হিসেবে এগিয়ে থাকলেও, চাঁদের হিসেবে ২১ (২৪-৩=২১) ঘণ্টা পিছিয়ে আছি। ২১ ঘণ্টা প্রায় ১ দিন। অর্থাৎ আমরা প্রায় একদিন পিছিয়ে আছি। সেজন্যই সৌর বছরের হিসেবে একদিন পরে চাঁদ দেখি। তবে চন্দ্র বছরের কথা বললে আমরা সবাই একই দিনেই সব করি। তাই কারো এমনটা ভাবার কিছু নেই যে সবাই ভিন্ন দিনে রমজান বা ঈদ পালন করে। সবাই একই দিনেই পালন করে। কিন্তু সেটা যদি ইংরেজি বর্ষপঞ্জি দিয়ে যাচাই করেন, সেটা নিতান্তই বোকামি হবে। শেষ কথা হল, চন্দ্রবর্ষ অনুযায়ী পুরো পৃথিবীর সকলেই একই দিনে রমজান, ঈদ পালন করে। শুধু টাইমজোন (Timezone) আলাদা বলে এমনটা মনে হয়।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন