یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مَا لَکُمۡ اِذَا قِیۡلَ لَکُمُ انۡفِرُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ اثَّاقَلۡتُمۡ اِلَی الۡاَرۡضِ ؕ اَرَضِیۡتُمۡ بِالۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا مِنَ الۡاٰخِرَۃِ ۚ فَمَا مَتَاعُ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا فِی الۡاٰخِرَۃِ اِلَّا قَلِیۡلٌ
তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী
৩৭. এখান থেকে তাবুক যুদ্ধের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা শুরু হয়েছে, যা সূরার প্রায় শেষ পর্যন্ত চলতে থাকবে। সংক্ষেপে এ যুদ্ধের ঘটনা এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয় ও হুনায়নের যুদ্ধ শেষে যখন মদীনা মুনাওয়ারায় ফিরে আসলেন, তার কিছুদিন পর শাম থেকে আগত কতিপয় ব্যবসায়ী মুসলিমদেরকে জানাল, রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস মদীনা মুনাওয়ারায় এক জোরালো হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতদুদ্দেশ্যে সে শাম ও আরবের সীমান্তে এক বিশাল বাহিনীও মোতায়েন করেছে। এমনকি সৈন্যদেরকে এক বছরের অগ্রিম বেতনও আদায় করে দিয়েছে। যদিও সাহাবায়ে কেরাম এ যাবৎকাল বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, কিন্তু তা সবই জাযিরাতুল আরবের ভিতরে। কোনও বহিঃশক্তির সাথে এ পর্যন্ত মুকাবিলা হয়নি। এবার তাঁরা সেই পরীক্ষার সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন। তাও দুনিয়ার এক বৃহৎ শক্তির সাথে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফায়সালা করলেন যে, হিরাক্লিয়াসের আক্রমণের অপেক্ষায় না থেকে আমরা নিজেরাই অগ্রসর হয়ে তাদের উপর হামলা চালাব। সুতরাং তিনি মদীনা মুনাওয়ারার সমস্ত মুসলিমকে এ যুদ্ধে শরীক হওয়ার হুকুম দিলেন। মুসলিমদের পক্ষে এটা ছিল এক কঠিন পরীক্ষা। কেননা এটা ছিল দীর্ঘ দশ বছরের উপর্যুপরি যুদ্ধ, অবশেষে পবিত্র মক্কায় জয়লাভের পর প্রথমবারের মত এক সুযোগ, যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার কিছুটা সময় পাওয়া গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার সময়টা ছিল এমন, যখন মদীনা মুনাওয়ারার খেজুর বাগানগুলোতে খেজুর পাকছিল। এই খেজুরের উপরই মদীনাবাসীদের সারা বছরের জীবিকা নির্ভরশীল ছিল। সন্দেহ নেই এমন অবস্থায় বাগান ছেড়ে যাওয়াটা অত সহজ ব্যাপার ছিল না। তৃতীয়ত এটা ছিল আরব অঞ্চলে তীব্র গরমের সময়। মনে হত আকাশ থেকে আগুন ঝরছে ও ভূমি থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। চতুর্থত তাবুকের সফর ছিল অনেক দীর্ঘ। প্রায় আটশ’ মাইলের সবটা পথই ছিল দুর্গম মরুভূমির উপর দিয়ে। আবার বাহন পশুর সংখ্যাও ছিল খুব কম। তদুপরি সফরের উদ্দেশ্য ছিল রোমানদের সাথে যুদ্ধ করা, যারা ছিল তখনকার বিশ্বের সর্ববৃহৎ শক্তি এবং তাদের যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কেও মুসলিমদের কোনও জানাশোনা ছিল না। মোদ্দাকথা সব দিক থেকেই এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং জান-মাল ও আবেগ-অনুভূতি বিসর্জন দেওয়ার জিহাদ। যা হোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ত্রিশ হাজার সাহাবায়ে কিরামের এক বাহিনী নিয়ে তাবুকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। আল্লাহ তাআলা হিরাক্লিয়াস ও তার বাহিনীর উপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই দুঃসাহসিক অগ্রাভিযানের এমন প্রভাব ফেললেন যে, তারা কালবিলম্ব না করে সেখান থেকে ওয়াপস চলে গেল। ফলে যুদ্ধ করার অবকাশ হল না। উপরে বর্ণিত সমস্যাদি সত্ত্বেও সাহাবায়ে কিরামের অধিকাংশই শাহাদাতের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে অত্যন্ত খুশী মনে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য এমন কিছু সাহাবীও ছিলেন, যাদের কাছে এ অভিযান অত্যন্ত কঠিন মনে হয়েছিল, ফলে শুরুর দিকে তারা কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাও সৈন্যদের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়েছিলেন। তারপরও কয়েকজন সাহাবী এমন রয়ে গিয়েছিলেন, যারা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হননি। ফলে তারা অভিযানে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত থাকেন। আর মুনাফিকদের দল তো ছিলই, যারা প্রকাশ্যে নিজেদেরকে মুমিন বলে দাবী করলেও আন্তরিকভাবে ঈমানদার ছিল না। এমন সমস্যাসংকুল অভিযানে তাদের পক্ষে মুসলিমদের সহযাত্রী হওয়া সম্ভবই ছিল না। তাই তারা বিভিন্ন রকমের ছল ও বাহানা দেখিয়ে মদীনায় থেকে গিয়েছিল। এ সূরার সামনের আয়াতসমূহে এই সকল শ্রেণীর লোকদের সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। তাতে তাদের কর্মপন্থা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। ৩৮নং আয়াতে যে সকল লোকের নিন্দা করা হয়েছে তারা কারা, এ সম্পর্কে দু’টো সম্ভাবনা আছে। (ক) তারা হয়ত মুনাফিক শ্রেণী। আর এ অবস্থায় ‘হে মুমিনগণ’ বলে যে সম্বোধন করা হয়েছে, এটা তাদের বাহ্যিক দাবীর ভিত্তিতে করা হয়েছে। (খ) এমনও হতে পারে যে, যে সকল সাহাবীর অন্তরে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল, তাদেরকে বোঝানো হয়েছে। তবে এটা নিশ্চিত যে, ৪২ নং আয়াত থেকে মুনাফিকদের সম্পর্কেই আলোচনা হয়েছে।