আল বাকারা

সূরা নং: ২, আয়াত নং: ৩৭

তাফসীর
فَتَلَقّٰۤی اٰدَمُ مِنۡ رَّبِّہٖ کَلِمٰتٍ فَتَابَ عَلَیۡہِ ؕ اِنَّہٗ ہُوَ التَّوَّابُ الرَّحِیۡمُ

উচ্চারণ

ফাতালাক্কা আ-দামুমির রাব্বিহী কালিমা-তিন ফাতা-বা ‘আলাইহি ইন্নাহূ হুওয়াত্তাওওয়া-বুর রাহীম।

অর্থ

মুফতী তাকী উসমানী

অতঃপর আদম স্বীয় প্রতিপালকের পক্ষ হতে (তওবার) কিছু শব্দ শিখে নিল (যা দ্বারা সে তওবা করল) ফলে আল্লাহ তার তওবা কবুল করলেন। ৩৮ নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

৩৮. হযরত আদম আলাইহিস সালাম যখন নিজের ভুল বুঝতে পারলেন, তখন ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন না, আল্লাহ তাআলার কাছে কি শব্দে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। তাই তাঁর মুখ দিয়ে কিছুই বের হচ্ছিল না। আল্লাহ তাআলা তো অন্তর্যামী এবং তিনি পরম দয়ালু ও দাতাও বটে। তিনি হযরত আদম আলাইহিস সালামের মনের এ অবস্থার কারণে নিজেই তাঁকে তওবার ভাষা শিখিয়ে দিলেন, যা সূরা আরাফে (৭ : ২৩) বর্ণিত আছে এবং তা এরূপ- قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَۤا اَنْفُسَنَا وَاِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُوْنَنَّ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ ـ ‘তারা বললো, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের সত্তার প্রতি জুলুম করে ফেলেছি। আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব।’ এভাবে পৃথিবীতে পাঠানোর আগেই মানুষকে আল্লাহ তাআলা শিখিয়ে দিলেন যে, সে যদি কখনও শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে কিংবা ইন্দ্রিয় পরবশতার কারণে কোনও গুনাহ করে ফেলে তবে তার কর্তব্য তৎক্ষণাৎ তওবা করে ফেলা। তওবার জন্য যদিও বিশেষ কোনও শব্দ ও ভাষা ব্যবহার অপরিহার্য নয়, বরং নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা ও পরবর্তীতে অনুরূপ না করার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ পায়- এমন যে-কোনও বাক্য দ্বারাই তওবা হতে পারে, কিন্তু উপরে বর্ণিত বাক্য যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তাআলার শেখানো, তাই এর দ্বারা তওবা করলে তা কবুল হওয়ার বেশি আশা করা যায়। এ স্থলে কয়েকটা কথা বিশেষভাবে বুঝে নেওয়া চাই- ক. যেমনটা পূর্বে ৩০নং আয়াত দ্বারাও পরিস্ফুট হয়েছে, আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আলাইহিস সালামকে পৃথিবীতে নিজ খলীফা বানিয়ে পাঠানোর জন্যই সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু সৃষ্টি করার পর তাকে প্রথমেই পৃথিবীতে না পাঠিয়ে তার আগে জান্নাতে থাকতে দিলেন। তারপর এতকিছু ঘটনা ঘটল। এর উদ্দেশ্য দৃশ্যত এই যে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম যাতে জান্নাতের নি‘আমতসমূহ চাক্ষুষ দেখে নিজের আসল ঠিকানা সম্পর্কে ভালভাবে জেনে নিতে পারেন এবং পৃথিবীতে পৌঁছার পর এ ঠিকানা অর্জনে কি রকমের প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে এবং কোন পন্থায় তা থেকে মুক্তি লাভ করা যেতে পারে সে সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতে পারেন। যেহেতু ফিরিশতাগণের বিপরীতে মানুষের স্বভাবের ভেতরই ভাল ও মন্দ উভয়ের যোগ্যতা রাখা হয়েছে, তাই এ বৈশিষ্ট্যের কারণে পৃথিবীতে আসার আগেই এ রকমের একটা অভিজ্ঞতা লাভ করা তার জন্য জরুরী ছিল। খ. নবী যেহেতু মা‘সূম ও নিষ্পাপ হন, ফলে তাঁর দ্বারা কোনও গুনাহের কাজ সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়, তাই হযরত আদম আলাইহিস সালামের এ ভুল মূলত ইজতিহাদী ভুল ছিল (Bonafold_old_ide Mistake) অর্থাৎ চিন্তাগত ভুল। তিনি শয়তানের কুমন্ত্রণার ফলে আল্লাহ তাআলার নির্দেশকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর সীমাবদ্ধ মনে করেছিলেন। অন্যথায় তাঁর পক্ষ হতে সরাসরি আল্লাহ তাআলার নাফরমানী হওয়ার কল্পনাও করা যায় না। তথাপি একজন নবীর পক্ষে এ জাতীয় ভুলও যেহেতু শোভনীয় ছিল না, তাই কোনও কোনও আয়াতে এটাকে গুনাহ বা সীমালংঘন শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে এবং এজন্য তওবা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে আলোচ্য আয়াতে এটাও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল করে নিয়েছেন। গ. এর দ্বারা মানুষের পাপ সংক্রান্ত খ্রিস্টীয় বিশ্বাস খণ্ডন হয়ে গেছে। খ্রিস্টানদের কথা হল, হযরত আদম আলাইহিস সালামের এ গুনাহ স্থায়ীভাবে মানব প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে, যদ্দরুণ প্রতিটি মানব-শিশু মায়ের পেট থেকে পাপী হয়ে জন্মগ্রহণ করে। মানুষের এই সংকট মোচনের লক্ষ্যেই আল্লাহ তাআলার নিজ পুত্রকে দুনিয়ায় পাঠিয়ে কুরবানী করানোর দরকার পড়েছে, যাতে তাঁর দ্বারা দুনিয়ার সমস্ত মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যায়। কুরআন মাজীদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করে দিয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আলাইহিস সালামের তওবা কবুল করে নিয়েছিলেন। ফলে তার সে গুনাহও বাকি থাকেনি এবং তার সন্তানদের মধ্যে সে গুনাহের স্থানান্তরিত হওয়ারও কোনও অবকাশ থাকেনি। তাছাড়া আল্লাহ তাআলার ইনসাফ ভিত্তিক বিধান অনুযায়ী এক ব্যক্তির পাপের বোঝা কখনও অন্যের মাথায় চাপানো হয় না।