সূরা
পারা
Loading verses...
সূরা
পারা
Loading verses...
অন্যান্য
অনুবাদ
তেলাওয়াত
সূরা আল বুরুজ (البروج) | নক্ষত্রপুন্জ
মাক্কী
মোট আয়াতঃ ২২
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَالسَّمَآءِ ذَاتِ الۡبُرُوۡجِ ۙ ١
ওয়াছ ছামাই যা-তিল বুরূজ।
শপথ বুরূজ-বিশিষ্ট ১ আকাশের
তাফসীরঃ
১. বুরূজ (بروج) শব্দটি ‘র্বুজ’-এর বহুবচন। এর দ্বারা হয়ত সেই বারটি মনযিল বোঝানো হয়েছে, যা সূর্য এক বছরে প্রদক্ষিণ করে অথবা আকাশের সেই সব দূর্গকে, যাতে অবস্থান করে ফেরেশতাগণ পাহারাদারী করে অথবা গ্রহ-নক্ষত্রকেও বোঝানো হতে পারে (-অনুবাদক তাফসীরে উছমানী থেকে গৃহীত)।
وَشَاہِدٍ وَّمَشۡہُوۡدٍ ؕ ٣
ওয়া শা-হিদিওঁ ওয়া মাশহূদ।
এবং যে উপস্থিত হয় তার এবং যার নিকট উপস্থিত হয় ৩ তার
তাফসীরঃ
৩. কুরআন মাজীদে শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে ‘শাহিদ’ ও ‘মাশহুদ’। ‘শাহিদ’-এর তরজমা করা হয়েছে ‘যে উপস্থিত হয়’ আর ‘মাশহুদ’-এর ‘যার কাছে উপস্থিত হয়’। এর বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেমন (ক) ‘শাহিদ’ হল জুমুআর দিন আর ‘মাশহুদ’ আরাফার দিন। তিরমিযী শরীফের একটি হাদীছ দ্বারা এর সমর্থন পাওয়া যায়। হাদীসটি হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তবে ইমাম তিরমিযী (রহ.) হাদীসটিকে যয়ীফ (দুর্বল) বলেছেন। তাছাড়া তাবারানী শরীফে হযরত আবু মালিক আশরাফী (রাযি.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসও এর সমর্থন করে। কিন্তু হায়ছামী (রহ.) এটিকেও যয়ীফ বলে মন্তব্য করেছেন।
(খ) শাহিদ হল মানুষ আর মাশহুদ কিয়ামত দিবস। কেননা প্রতিটি মানুষ সে দিন আল্লাহ তাআলার সামনে উপস্থিত হবে। হাফেজ ইবনে জারীর (রহ.) এ ব্যাখ্যা হযরত মুজাহিদ (রহ.), হযরত দাহহাক (রহ.) প্রমূখ থেকে বর্ণনা করেছেন।
(গ) ‘শাহিদ’-এর এক অর্থ সাক্ষীও করা যেতে পারে আর ‘মাশহুদ’ সেই, যার সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়া হয়। কিয়ামতের দিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের ঈমান সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবেন। কাজেই আয়াতের ইশারা এদিকেও হতে পারে। হাফেজ ইবনে জারীর (রহ.) সবগুলো ব্যাখ্যা উল্লেখ করার পর বলেন, কুরআন মাজীদের শব্দের মধ্যে এসবগুলো ব্যাখ্যারই অবকাশ আছে।
قُتِلَ اَصۡحٰبُ الۡاُخۡدُوۡدِ ۙ ٤
কুতিলা আসহা-বুল উখদূদ ।
ধ্বংস করা হয়েছিল গর্ত-ওয়ালাদেরকে ৪
তাফসীরঃ
৪. প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা অনুযায়ী এ আয়াতসমূহে বিশেষ একটি ঘটনার দিকে ইশারা করা হয়েছে, যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে। ঘটনাটি এরূপ, পূর্বকালে কোন এক জাতির রাজার একজন বিশেষ যাদুকর ছিল। রাজা তার কাজ-কর্মে সেই যাদুকরের সাহায্য গ্রহণ করত। সেই যাদুকর যখন বৃদ্ধ হয়ে গেল, তখন রাজাকে বলল, আমার কাছে কোন এক বালককে পাঠিয়ে দিন। আমি তাকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিয়ে যাব, যাতে আমার মৃত্যুর পর সে আপনার কাজে আসে। রাজা একটি বালক নির্বাচন করল এবং তাকে যাদুকরের কাছে পাঠিয়ে দিল। বালকটি তার কাছে আসা-যাওয়া শুরু করে দিল। তার যাতায়াত পথে একটি আশ্রম ছিল। তাতে ছিল এক আবেদ, যে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের ধর্মের অনুসারী ও তাওহীদে বিশ্বাসী ছিল। এই আবেদ ছিলেন সংসার-জীবন থেকে বিমুখ, যাদেরকে ‘রাহিব’ বলা হয়ে থাকে। বালকটি যাতায়াত পথে তার কাছে বসত ও তার কথাবার্তা মনোযোগ দিয়ে শুনত। সে সব কথা বালকটিকে বড় আকর্ষণ করত। একদিন সে যথারীতি সেই পথে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখল একটি হিংস্র পশু পথ বন্ধ করে রেখেছে। লোকজন চলাচল করতে পারছে না। কোন কোন বর্ণনায় আছে, সেটি ছিল একটি সিংহ। বালকটি একটি পাথর তুলে নিল এবং আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করল, হে আল্লাহ! তোমার কাছে যদি যাদুকর অপেক্ষা রাহিবের কথা বেশি পছন্দ হয়, তবে এই পাথরটি দ্বারা সিংহটির মৃত্যু ঘটাও। এই বলে যেই না সে পাথরটি ছুড়ে মারল, সঙ্গে সঙ্গে সিংহটি মারা গেল। ফলে রাস্তা উম্মুক্ত হয়ে গেল। এ ঘটনায় মানুষের অন্তরে বালকটির প্রতি ভক্তি-বিশ্বাস জন্মাল। তারা মনে করল তার বিশেষ কোন বিদ্যা জানা আছে, যার বলে এটা করতে পেরেছে। অতঃপর এক অন্ধ ব্যক্তি তাকে অনুরোধ করল যেন তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। বালকটি বলল, রোগ-বালাই আল্লাহ তাআলাই দেন এবং ভালোও তিনিই করেন। কাজেই তুমি যদি ওয়াদা কর আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনবে ও তাঁকে এক বলে বিশ্বাস করবে, তবে আমি তোমার জন্য তাঁর কাছে দুআ করব। লোকটি শর্ত মেনে নিল। ফলে বালকটির দুআয় আল্লাহ তাআলা তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। লোকটি তার কথা মত ঈমান আনল। এসব ঘটনার খবর যখন রাজার কানে পৌঁছল, রাজা ভীষণ ক্ষিপ্ত হল। তার নির্দেশে সেই অন্ধ, রাহিব ও বালকটিকে বন্দী করা হল। রাজা তাদেরকে তাওহীদ ও ঈমান পরিত্যাগ করার জন্য চাপ দিল। কিন্তু তারা তা গ্রাহ্য করল না। ফলে রাজার নির্দেশে অন্ধ ও রাহিবকে শূলে চড়ানো হল। রাজা বালকটির ব্যাপারে কর্মচারীদেরকে হুকুম দিল, তারা যেন তাকে কোন উঁচু পাহাড়ে নিয়ে যায় এবং তার চুড়া থেকে নিচে নিক্ষেপ করে। সেমতে তারা বালকটিকে এক উঁচু পাহাড়ে নিয়ে গেল। বালকটি আল্লাহ তাআলার কাছে ফরিয়াদ করল। ফলে পাহাড়ে প্রচণ্ড কম্পন শুরু হল এবং তাতে রাজার কর্মচারীদের মৃত্যু ঘটল, কিন্তু বালকটিকে আল্লাহ তাআলা রক্ষা করলেন। রাজা দ্বিতীয়বার হুকুম দিল তাকে নৌকায় চড়িয়ে সাগরে নিয়ে যাওয়া হোক এবং তাকে গভীর সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হোক। রাজ-কর্মচারীরা তাকে সাগরে নিয়ে গেল। বালকটি আবার আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করল। ফলে নৌকা উল্টে গেল এবং কর্মচারীরা সকলে ডুবে মরল। এবারও বালকটি নিরাপদ থাকল। রাজা যখন কোনভাবেই তাকে মারতে সক্ষম হল না, শেষে বালকটি তাকে বলল, আপনি যদি আমাকে মারতে চান তবে আমার পরামর্শ মত কাজ করুন। আপনি এক উম্মুক্ত ময়দানে জনসাধারণকে সমবেত হতে বলুন এবং তাদের সামনে আমাকে শূলে চড়ান। তারপর ধনুকে তীর যোজনা করুন ও ‘এই বালকটির প্রতিপালক আল্লাহর নামে’ এই বলে আমার প্রতি নিক্ষেপ করুন। রাজা তাই করল। তীর বালকটির কান ও মাথার মাঝখানে বিদ্ধ হল এবং তাতে সে শহীদ হয়ে গেল। এ দৃশ্য উপস্থিত দর্শকদের অন্তরে প্রবল ঝাঁকুনি দিল। তখনই তাদের অনেকে আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনল। তাতে রাজা আরও বেশি ক্ষিপ্ত হল। কাজেই তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার জন্য সড়কের পাশে পাশে গর্ত খুড়ে তাতে আগুন জ্বালানো হল এবং ঘোষণা করে দেওয়া হল, যারা ঈমান পরিত্যাগ করবে না তাদেরকে আগুনের এ গর্তসমূহে নিক্ষেপ করা হবে। কিন্তু মুমিনগণ তাতে একটুও পিছপা হল না। ফলে তাদের বহু সংখ্যককে সেই সব অগ্নিকু-ে ফেলে জ্যান্ত পুঁড়ে ফেলা হল।
মুসলিম শরীফের যে বর্ণনায় এ ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে বলা হয়নি যে, সূরা বুরূজে যে গর্তওয়ালাদের কথা বলা হয়েছে তার ইশারা এ ঘটনারই দিকে। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রহ.) এরই কাছাকাছি একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন এবং তাকে সূরা বুরূজের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এস্থলে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়। হযরত মাওলানা হিফজুর রহমান সীওহারূবী (রহ.) ‘কিসাসুল কুরআন’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিদগ্ধ পাঠক তা দেখে নিতে পারেন।
وَّہُمۡ عَلٰی مَا یَفۡعَلُوۡنَ بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ شُہُوۡدٌ ؕ ٧
ওয়া হুম ‘আলা-মা-ইয়াফ‘আলূনা বিলমু’মিনীনা শুহূদ।
এবং মুমিনদের সাথে তারা যা করছিল, তা প্রত্যক্ষ করছিল ৫
তাফসীরঃ
৫. এর দ্বারা তাদের নিষ্ঠুরতার চিত্রাঙ্কন করা হয়েছে যে, তারা আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে সকল মুমিনকে একেকজন করে আগুনে পুড়ে মারছিল এবং সেই বীভৎস দৃশ্য চোখের সামনে দেখছিল, অথচ তাতে তাদের মন একটু কাঁপছিল না। মক্কার মুশরিকরাও মুসলিমদের সাথে এরূপ নির্মম আচরণ করছিল এবং সবযুগেই ঈমানদারদের সাথে বেদীন কিসিমের লোক এ রকম নির্দয় আচরণই করে থাকে। -অনুবাদক
اِنَّ الَّذِیۡنَ فَتَنُوا الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ ثُمَّ لَمۡ یَتُوۡبُوۡا فَلَہُمۡ عَذَابُ جَہَنَّمَ وَلَہُمۡ عَذَابُ الۡحَرِیۡقِ ؕ ١۰
ইন্নাল্লাযীনা ফাতানুলমু’মিনীন ওয়াল মু’মিনা-তি ছু ম্মা লাম ইয়াতূবূফালাহুম ‘আযা-বু জাহান্নামা ওয়া লাহুম ‘আযা-বুল হারীক।
নিশ্চয়ই যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে নির্যাতন করেছে, তারপর তাওবাও করেনি, তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি এবং তাদেরকে আগুনে জ্বলার শাস্তি দেওয়া হবে।
اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَہُمۡ جَنّٰتٌ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ۬ؕؑ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡکَبِیۡرُ ؕ ١١
ইন্নাল্লাযীনা আ-মানূওয়া ‘আমিলুসসা-লিহা-তি লাহুম জান্না-তুন তাজরী মিন তাহতিহাল আনহা-রু যা-লিকাল ফাওঝুল কাবীর।
যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, নিশ্চয়ই তাদের জন্য আছে এমন উদ্যান, যার নিচে নহর প্রবাহিত। এটাই মহা সাফল্য।