সূরা
পারা

Loading verses...

অন্যান্য

অনুবাদ
তেলাওয়াত

সূরা আল আ'রাফ (الأعراف) | উচু স্থানসমূহ

মাক্কী

মোট আয়াতঃ ২০৬

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

الٓـمّٓصٓ ۚ ١

আলিফ লাম মীম সা দ।

আলিফ-লাম-মীম-সাদ।

তাফসীরঃ

১. সূরা বাকারার শুরুতে বলা হয়েছে যে, বিভিন্ন সূরার প্রথমে এভাবে যে বিচ্ছিন্ন হরফসমূহ ব্যবহৃত হয়েছে, একে ‘আল-হুরূফুল মুকাত্তাআত’ বলে। এর প্রকৃত অর্থ আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কেউ জানে না। আর এর অর্থ বোঝার উপর দীনের কোনও বিষয় নির্ভরশীলও নয়।

کِتٰبٌ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ فَلَا یَکُنۡ فِیۡ صَدۡرِکَ حَرَجٌ مِّنۡہُ لِتُنۡذِرَ بِہٖ وَذِکۡرٰی لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ ٢

কিতা-বুন উনঝিলা ইলাইকা ফালা-ইয়াকুনফীসাদরিকাহারাজুম মিনহু লিতুনযিরা বিহী ওয়া যিকরা-লিলমু’মিনীন।

(হে নবী! এটি) একখানি কিতাব, যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে, যাতে তুমি এর দ্বারা (মানুষকে) সতর্ক কর। সুতরাং এর কারণে তোমার অন্তরে যেন কোন কুণ্ঠা দেখা না দেয় এবং এটা মুমিনদের জন্য এক উপদেশবাণী।

তাফসীরঃ

২. অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত বিষয়াবলী আপনি নির্ভয়ে অসংকোচে মানুষের কাছে প্রচার করুন। কারও অবিশ্বাস, অপপ্রচার ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের পরোয়া করবেন না। এর দাওয়াতকে আপনি মানুষের দ্বারা কিভাবে মানাবেন এবং তারা না মানলে তখন কী হবে এসব নিয়ে আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। কেননা আপনার দায়িত্ব কেবল তাদেরকে সতর্ক করা। তাদের মানা-না মানার যিম্মাদারী আপনার উপর নয়।

اِتَّبِعُوۡا مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکُمۡ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ وَلَا تَتَّبِعُوۡا مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اَوۡلِیَآءَ ؕ قَلِیۡلًا مَّا تَذَکَّرُوۡنَ ٣

ইত্তাবি‘ঊ মাউনঝিলা ইলাইকুম মির রাব্বিকুম ওয়ালা-তাত্তাবি‘ঊ মিন দূ নিহীআওলিয়াআ কালীলাম মা-তাযাক্কারূন।

(হে মানুষ!) তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে যে কিতাব নাযিল করা হয়েছে, তার অনুসরণ কর এবং নিজেদের প্রতিপালককে ছেড়ে অন্য (মনগড়া) অভিভাবকদের অনুসরণ করো না। (কিন্তু) তোমরা উপদেশ কমই গ্রহণ কর।

وَکَمۡ مِّنۡ قَرۡیَۃٍ اَہۡلَکۡنٰہَا فَجَآءَہَا بَاۡسُنَا بَیَاتًا اَوۡ ہُمۡ قَآئِلُوۡنَ ٤

ওয়া কাম মিন কারইয়াতিন আহলাকনা-হা-ফাজাআহা-বা’ছুনা-বাইয়া-তান আও হুম কাইলূন।

কত জনপদকেই আমি ধ্বংস করেছি। আমার শাস্তি তাদের কাছে এসে পড়েছিল রাতের বেলা অথবা দুপুরে যখন তারা বিশ্রাম করছিল।

فَمَا کَانَ دَعۡوٰىہُمۡ اِذۡ جَآءَہُمۡ بَاۡسُنَاۤ اِلَّاۤ اَنۡ قَالُوۡۤا اِنَّا کُنَّا ظٰلِمِیۡنَ ٥

ফামা-কা-না দা‘ওয়া-হুম ইযজাআহুম বা’ছুনা-ইল্লাআন কা-লূইন্না-কুন্না-জা-লিমীন।

যখন আমার শাস্তি তাদের উপর আপতিত হয়েছিল, তখন তাদের তো বলার কিছুই ছিল না কেবল তাদের এই কথা ছাড়া যে, বাস্তবিকই আমরা জালেম ছিলাম।

فَلَنَسۡـَٔلَنَّ الَّذِیۡنَ اُرۡسِلَ اِلَیۡہِمۡ وَلَنَسۡـَٔلَنَّ الۡمُرۡسَلِیۡنَ ۙ ٦

ফালানাছআলান্নালাযীনা উরছিলা ইলাইহিম ওয়া লানাছআলান্নাল মুরছালীন।

অতঃপর যাদের নিকট রাসূল পাঠানো হয়েছিল, আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করব এবং আমি রাসূলগণকেও জিজ্ঞেস করব (যে, তারা কি বার্তা পৌঁছিয়েছিল এবং তারা কী জবাব পেয়েছিল?)।

فَلَنَقُصَّنَّ عَلَیۡہِمۡ بِعِلۡمٍ وَّمَا کُنَّا غَآئِبِیۡنَ ٧

ফালানাকুসসান্না ‘আলাইহিম বি‘ইলমিওঁ ওয়ামা-কুন্না-গাইবীন।

অতঃপর আমি স্বয়ং তাদের সামনে নিজ জ্ঞানের ভিত্তিতে (যাবতীয় ঘটনা) বর্ণনা করব। (কেননা) আমি তো (সে সব ঘটনাকালে) অনুপস্থিত ছিলাম না।

তাফসীরঃ

৩. অর্থাৎ তারা প্রকাশ্যে ও গোপনে ক্ষুদ্র-বৃহৎ যা কিছু বলে ও করে, তার কিছুই আমার অগোচরে থাকে না। সর্বাবস্থায়ই আমি তাদের কাছে হাজির থাকি এবং সবকিছু প্রত্যক্ষ করি। আমার নিযুক্ত ফিরিশতাগণও সব কিছু লিপিবদ্ধ করে রাখছে। কিয়ামতের দিন আমি তা তাদেরকে যথাযথভাবে অবহিত করব এবং তাদের সামনে রেজিস্ট্রার খুলে দেব। সেদিন তারা তা দেখে হতভম্ব হয়ে যাবে। সুতরাং তারা হুঁশিয়ার হয়ে যাক। -অনুবাদক

وَالۡوَزۡنُ یَوۡمَئِذِ ۣالۡحَقُّ ۚ فَمَنۡ ثَقُلَتۡ مَوَازِیۡنُہٗ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ ٨

ওয়াল ওয়াঝনুইয়াওমাইযিনিল হাক্কু ফামান ছাকুলাত মাওয়া-ঝীনুহু ফাউলাইকা হুমুল মুফলিহূন।

এবং সে দিন (আমলসমূহের) ওজন (করার বিষয়টি) একটি অকাট্য সত্য। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই হবে কৃতকার্য।

وَمَنۡ خَفَّتۡ مَوَازِیۡنُہٗ فَاُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ خَسِرُوۡۤا اَنۡفُسَہُمۡ بِمَا کَانُوۡا بِاٰیٰتِنَا یَظۡلِمُوۡنَ ٩

ওয়া মান খাফফাত মাওআ-ঝীনুহূফাউলাইকাল্লাযীনা খাছিরূআনফুছাহুম বিমা-কা-নূ বিআ-য়া-তিনা-ইয়াজলিমূন।

আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই তো সেই সব লোক, যারা আমার আয়াতসমূহের ব্যাপারে সীমালংঘন করে নিজেদেরকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

তাফসীরঃ

৪. আমল ওজন করার অর্থ কেউ বলেছেন আমলনামা ওজন করা। কেউ বলেন, কিয়ামতের দিন আমলকে বস্তুর রূপ দান করা হবে, তারপর তা ওজন করা হবে। কারও মতে ওজন করা হবে আমলকারী ব্যক্তিকে। কিন্তু এতসব ব্যাখ্যার আশ্রয় নেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা খোদ আমলকেই যদি ওজন করা হয়, তাতে আশ্চর্যের কি আছে? আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে যখন শীত, তাপ, বাতাস ও শব্দকে পর্যন্ত পরিমাপ করা যাচ্ছে, তখন আহকামুল-হাকিমীনের আদালতে আমলের পরিমাপ করাটা তো কোন ব্যাপারই নয়। যিনি হও বললে সব হয়ে যায় এবং যার ‘হও’-এর কল্যাণে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সৃষ্টি থেকে মহাস্থূল মহাজগত পর্যন্ত অস্তিত্ব লাভ করেছে, তার সকাশে কঠিন ও অসম্ভব বলতে কিছু নেই। -অনুবাদক
১০

وَلَقَدۡ مَکَّنّٰکُمۡ فِی الۡاَرۡضِ وَجَعَلۡنَا لَکُمۡ فِیۡہَا مَعَایِشَ ؕ  قَلِیۡلًا مَّا تَشۡکُرُوۡنَ ٪ ١۰

ওয়া লাকাদ মাক্কান্না-কুম ফিল আরদিওয়া জা‘আলনা-লাকুম ফীহা-মা‘আ-য়িশা কালীলাম মা-তাশকুরূন।

আমি তো পৃথিবীতে তোমাদেরকে থাকার জায়গা দিয়েছি এবং তাতে তোমাদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থাও করেছি। তথাপি তোমরা অল্পই কৃতজ্ঞতা আদায় কর।
১১

وَلَقَدۡ خَلَقۡنٰکُمۡ ثُمَّ صَوَّرۡنٰکُمۡ ثُمَّ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ ٭ۖ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ لَمۡ یَکُنۡ مِّنَ السّٰجِدِیۡنَ ١١

ওয়া লাকাদ খালাকনা-কুম ছুম্মা সাওওয়ারনা-কুম ছুম্মা কুলনা-লিলমালাইকাতিছজু দূ লিআ-দামা ফাছাজাদূ ইল্লা-ইবলীছা লাম ইয়াকুম মিনাছ ছা-জিদীন।

এবং আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তারপর তোমাদের আকৃতি গঠন করেছি, তারপর ফিরিশতাদেরকে বলেছি, আদমকে সিজদা কর। সুতরাং সকলে সিজদা করল, ইবলীস ছাড়া। সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হল না।

তাফসীরঃ

৫. এ ঘটনার কিছুটা বিস্তারিত বিবরণ সূরা বাকারায় (২ : ৩৪-৩৯) গত হয়েছে। সেসব আয়াতের ব্যাখ্যায় আমি যে টীকা লিখেছি, তাতে এ ঘটনা সম্পর্কিত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরও দেওয়া হয়েছে। সম্মানিত পাঠক তা দেখে নিতে পারেন।
১২

قَالَ مَا مَنَعَکَ اَلَّا تَسۡجُدَ اِذۡ اَمَرۡتُکَ ؕ قَالَ اَنَا خَیۡرٌ مِّنۡہُ ۚ خَلَقۡتَنِیۡ مِنۡ نَّارٍ وَّخَلَقۡتَہٗ مِنۡ طِیۡنٍ ١٢

কা-লা মা-মানা‘আকা আল্লা-তাছজু দা ইয আমারতুকা কা-লা আনা খাইরুম মিনহু খালাকতানী মিন না-রিওঁ ওয়া খালাকতাহূমিন তীন।

আল্লাহ বললেন, আমি যখন তোকে আদেশ করলাম তখন কিসে তোকে সিজদা করা হতে বিরত রাখল? সে বলল, আমি তার চেয়ে উত্তম। তুমি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছ, আর তাকে সৃষ্টি করেছ মাটি দ্বারা।

তাফসীরঃ

৬. এ হল ইবলীসের যুক্তি। এ যুক্তির অন্তর্নিহিত অসংগতির কথা বাদ দিলেও আল্লাহ তা‘আলার আদেশের বিপরীতে যুক্তির পেছনে পড়াটাই একটা চরম ধৃষ্টতা, যে কারণে তাকে ধিকৃত ও বিতাড়িত হতে হয়েছে। এর শিক্ষা হল, আল্লাহ তা‘আলার হুকুম বিনাবাক্যে শিরোধার্য। দীন যেহেতু আল্লাহ তা‘আলার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আদেশ-নিষেধের সমষ্টি, তাই দীনী কোন বিধানের বিপরীতে নিজ যুক্তি ও অভিমত দাঁড় করালে তা হবে চরম গর্হিত কাজ এবং এরূপ ব্যক্তি ইবলীসের পদাঙ্কানুসারী বলে গণ্য হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে হেফাজত করুনআমীন। -অনুবাদক
১৩

قَالَ فَاہۡبِطۡ مِنۡہَا فَمَا یَکُوۡنُ لَکَ اَنۡ تَتَکَبَّرَ فِیۡہَا فَاخۡرُجۡ اِنَّکَ مِنَ الصّٰغِرِیۡنَ ١٣

কা-লা ফাহবিতমিনহা-ফামা-ইয়াকূনুলাকা আন তাতাকাববরা ফীহা- ফাখরুজ ইন্নাকা মিনাসসা-গিরীন।

আল্লাহ বললেন, তাহলে তুই এখান থেকে নেমে যা। কেননা তোর এই অধিকার নেই যে, এখানে (থেকে) অহংকার করবি। সুতরাং বের হয়ে যা। তুই হীনদের অন্তর্ভুক্ত।
১৪

قَالَ اَنۡظِرۡنِیۡۤ اِلٰی یَوۡمِ یُبۡعَثُوۡنَ ١٤

কা-লা আনজিরনীইলা-ইয়াওমি ইউব‘আছূ ন।

সে বলল, যে দিন মানুষকে (কবর থেকে) জীবিত করে তোলা হবে, সেই দিন পর্যন্ত আমাকে (জীবিত থাকার) সুযোগ দাও।
১৫

قَالَ اِنَّکَ مِنَ الۡمُنۡظَرِیۡنَ ١٥

কা-লা ইন্নাকা মিনাল মুনজারীন।

আল্লাহ বললেন, তোকে সুযোগ দেওয়া হল।

তাফসীরঃ

৭. শয়তান আবেদন করেছিল, যে দিন হাশর হবে এবং মানুষকে কবর থেকে জীবিত করে উঠানো হবে সেই দিন পর্যন্ত যেন তাকে অবকাশ দেওয়া হয়। এখানে সেই আবেদনের উত্তরে অবকাশ দেওয়ার কথা তো বলা হয়েছে, কিন্তু এ অবকাশ কোন পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে, এ আয়াতে স্পষ্ট করে তা বর্ণনা করা হয়নি। এ ঘটনা সূরা হিজর (২৬ : ৩৮) ও সূরা সোয়াদ (৩৮ : ৮১)-এও বর্ণিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, “এক নির্দিষ্ট কাল” পর্যন্ত অবকাশ দেওয়া হল। তা দ্বারা বোঝা যায়, তার আবেদন মত হাশরের দিন পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেওয়ার ওয়াদা করা হয়নি; বরং বলা হয়েছে, এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেওয়া হল, যা আল্লাহ তাআলার জ্ঞানে আছে। অন্যান্য দলীল-প্রমাণ দ্বারা জানা যায়, শয়তান কিয়ামতের প্রথম ফুঁৎকার পর্যন্ত জীবিত থাকবে। শিঙ্গার সেই প্রথম ফুঁৎকারে যেমন অন্য মাখলুকসমূহের মৃত্যু ঘটবে, তেমনি তারও মৃত্যু ঘটবে। অতঃপর যখন সকলকে জীবিত করা হবে, তখন তাকেও জীবিত করা হবে।
১৬

قَالَ فَبِمَاۤ اَغۡوَیۡتَنِیۡ لَاَقۡعُدَنَّ لَہُمۡ صِرَاطَکَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ ۙ ١٦

কা-লা ফাবিমাআগওয়াইতানী লাআক‘উদান্না লাহুম সিরা-তাকাল মুছতাকীম।

সে বলল, তুমি যেহেতু আমাকে পথভ্রষ্ট করেছ, তাই আমিও শপথ করছি যে, আমি তাদের (অর্থাৎ মানুষের) জন্য তোমার সরল পথে ওঁৎ পেতে বসে থাকব।

তাফসীরঃ

৮. শয়তান তার দুষ্কর্মের দায় নিজে স্বীকার না করে (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহ তাআলার উপর চাপানোর চেষ্টা করল। অথচ আল্লাহ তাআলার স্থিরীকৃত তাকদীরের কারণে কারও এখতিয়ার বা ইচ্ছাশক্তি কেড়ে নেওয়া হয় না। তাকদীরের অর্থই হল এই যে, অমুক ব্যক্তি নিজ ইচ্ছাক্রমে অমুক কাজ করবে। তাছাড়া শয়তানের এ কথার অর্থ এও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে এমন আদেশ করলেনই বা কেন, যা তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাই পরোক্ষভাবে তার পথভ্রষ্টতার কারণ তো আল্লাহ তাআলার এই আদেশই হল (নাউযুবিল্লাহ)।
১৭

ثُمَّ لَاٰتِیَنَّہُمۡ مِّنۡۢ بَیۡنِ اَیۡدِیۡہِمۡ وَمِنۡ خَلۡفِہِمۡ وَعَنۡ اَیۡمَانِہِمۡ وَعَنۡ شَمَآئِلِہِمۡ ؕ وَلَا تَجِدُ اَکۡثَرَہُمۡ شٰکِرِیۡنَ ١٧

ছু ম্মা লাআ-তিইয়ান্নাহুম মিম বাইনি আইদীহিম ওয়া মিন খালফিহিম ওয়া ‘আন আইমা-নিহিম ওয়া ‘আন শামাইলিহিম ওয়ালা-তাজিদুআকছারাহুম শা-কিরীন।

তারপর আমি (চারও দিক থেকে) তাদের উপর হামলা করব, তাদের সম্মুখ থেকে, তাদের পিছন থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাম দিক থেকেও। আর তুমি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবে না।
১৮

قَالَ اخۡرُجۡ مِنۡہَا مَذۡءُوۡمًا مَّدۡحُوۡرًا ؕ لَمَنۡ تَبِعَکَ مِنۡہُمۡ لَاَمۡلَـَٔنَّ جَہَنَّمَ مِنۡکُمۡ اَجۡمَعِیۡنَ ١٨

কা-লাখরুজ মিনহা-মাযঊমাম মাদহূরাল লামান তাবি‘আকা মিনহুম লাআমলাআন্না জাহান্নামা মিনকুম আজমা‘ঈন।

আল্লাহ বললেন, এখান থেকে ধিকৃত ও বিতাড়িত হয়ে বের হয়ে যা। তাদের মধ্যে যারা তোর পিছনে চলবে (তারাও তোর সঙ্গী হবে), আমি তোদের সকলকে দিয়ে জাহান্নাম ভরব।
১৯

وَیٰۤاٰدَمُ اسۡکُنۡ اَنۡتَ وَزَوۡجُکَ الۡجَنَّۃَ فَکُلَا مِنۡ حَیۡثُ شِئۡتُمَا وَلَا تَقۡرَبَا ہٰذِہِ الشَّجَرَۃَ فَتَکُوۡنَا مِنَ الظّٰلِمِیۡنَ ١٩

ওয়া ইয়া-আ-দামছ কুন আনতা ওয়া ঝাওজুকাল জান্নাতা ফাকুলা-মিন হাইছুশি’তুমাওয়ালা তাকরাবা-হা-যিহিশশাজারাতা ফাতাকূনা-মিনাজ্জা-লিমীন।

এবং হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী উভয়ে জান্নাতে বাস কর এবং যেখান থেকে (যে বস্তু) ইচ্ছা হয় খাও, তবে এই (বিশেষ) গাছটির কাছেও যেয়ো না। গেলে তোমরা (দু’জন) সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
২০

فَوَسۡوَسَ لَہُمَا الشَّیۡطٰنُ لِیُبۡدِیَ لَہُمَا مَا وٗرِیَ عَنۡہُمَا مِنۡ سَوۡاٰتِہِمَا وَقَالَ مَا نَہٰکُمَا رَبُّکُمَا عَنۡ ہٰذِہِ الشَّجَرَۃِ اِلَّاۤ اَنۡ تَکُوۡنَا مَلَکَیۡنِ اَوۡ تَکُوۡنَا مِنَ الۡخٰلِدِیۡنَ ٢۰

ফাওয়াছওয়াছা লাহুমাশশাইতা-নু লিইউবদিয়া লাহুমা-মাঊরিয়া ‘আনহুমা-মিন ছাওআতিহিমা-ওয়া কা-লা মা-নাহা-কুমা-রাব্বুকুমা ‘আন হা-যিহিশশাজারাতি ইল্লাআন তাকূনামালাকাইনি আও তাকূনা-মিনাল খা-লিদীন।

অতঃপর (এই ঘটল যে,) শয়তান তাদের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিল, যাতে তাদের লজ্জাস্থান, যা তাদের থেকে গোপন রাখা হয়েছিল, তাদের পরস্পরের সামনে প্রকাশ করতে পারে। সে বলতে লাগল, তোমাদের প্রতিপালক অন্য কোনও কারণে নয়; বরং কেবল এ কারণেই এই গাছ থেকে তোমাদেরকে বারণ করেছিলেন, পাছে তোমরা ফিরিশতা হয়ে যাও কিংবা তোমরা স্থায়ী জীবন লাভ কর। ১০

তাফসীরঃ

৯. বাহ্যত বোঝা যায়, সে গাছের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তার ফল খেলে জান্নাতের পোশাক খুলে যেত এবং এ কথা ইবলীসের জানা ছিল। সুতরাং যখন হযরত আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালাম সে ফল খেলেন, তখন তাদের শরীর থেকে জান্নাতী পোশাক খুলে গেল।
২১

وَقَاسَمَہُمَاۤ اِنِّیۡ لَکُمَا لَمِنَ النّٰصِحِیۡنَ ۙ ٢١

ওয়া কা-ছামাহুমা-ইন্নী লাকুমা-লামিনান না-সিহীন।

সে তাদের সামনে কসম খেয়ে বলল, বিশ্বাস কর, আমি তোমাদের কল্যাণকামীদের একজন।
২২

فَدَلّٰىہُمَا بِغُرُوۡرٍ ۚ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَۃَ بَدَتۡ لَہُمَا سَوۡاٰتُہُمَا وَطَفِقَا یَخۡصِفٰنِ عَلَیۡہِمَا مِنۡ وَّرَقِ الۡجَنَّۃِ ؕ وَنَادٰىہُمَا رَبُّہُمَاۤ اَلَمۡ اَنۡہَکُمَا عَنۡ تِلۡکُمَا الشَّجَرَۃِ وَاَقُلۡ لَّکُمَاۤ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ لَکُمَا عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ ٢٢

ফাদাল্লা- হুমা-বিগুরূরিন ফালাম্মা-যা-কাশশাজারাতা বাদাত লাহুমা-ছাওআ-তুহুমাওয়া তাফিকা-ইয়াখসিফা-নি ‘আলাইহিমা-মিওঁ ওয়া রাকিল জান্নাতি ওয়া না-দাহুমা-রাব্বুহুমা-আলাম আনহাকুমা-‘আন তিলকুমাশশাজারাতি ওয়া আকুল্লাকুমা ইন্নাশশাইতা-না লাকুমা-‘আদুওউম মুবীন।

এভাবে সে উভয়কে ধোঁকা দিয়ে নিচে নামিয়ে দিল। ১১ সুতরাং যখন তারা সে গাছের স্বাদ গ্রহণ করল, তখন তাদের উভয়ের লজ্জাস্থান উভয়ের কাছে প্রকাশ হয়ে গেল। অনন্তর তারা জান্নাতের কিছু পাতা (জোড়া দিয়ে) নিজেদের শরীরে জড়াতে লাগল। ১২ তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে ডেকে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এ গাছ থেকে বারণ করিনি এবং তোমাদেরকে বলিনি, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?

তাফসীরঃ

১১. নিচে নামানোর এক অর্থ হতে পারে, তারা আনুগত্যের যে উচ্চ স্তরে ছিলেন, তা থেকে নিচে নামিয়ে দিল। আর এ অর্থও হতে পারে যে, তাদেরকে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নামিয়ে দিল।
২৩

قَالَا رَبَّنَا ظَلَمۡنَاۤ اَنۡفُسَنَا ٜ وَاِنۡ لَّمۡ تَغۡفِرۡ لَنَا وَتَرۡحَمۡنَا لَنَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ ٢٣

কা-লা রাব্বানা-জালামনাআনফুছানা-ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা-ওয়া তারহামনা-লানাকূনান্না মিনাল খা-ছিরীন।

তারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজ সত্তার উপর জুলুম করে ফেলেছি। আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন ও আমাদের প্রতি রহম না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অকৃতকার্যদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। ১৩

তাফসীরঃ

১৩. এটাই ইসতিগফার ও ক্ষমাপ্রার্থনার সেই শব্দমালা, যে সম্পর্কে সূরা বাকারায় (২ : ৩৭) বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলাই তাদেরকে এটা শিক্ষা দিয়েছিলেন। কেননা তখনও পর্যন্ত তাওবা করার নিয়ম তাদের জানা ছিল না। এর দ্বারা বোঝা যায়, তাওবা করার জন্য এই শব্দসমূহ অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এর মাধ্যমে তাওবা করলে তা কবুল হওয়ার বেশি আশা করা যায়, যেহেতু এটা স্বয়ং আল্লাহ তাআলারই শেখানো। এভাবে আল্লাহ তাআলা এক দিকে যেমন শয়তানকে অবকাশ দিয়ে মানুষকে গোমরাহ করার যোগ্যতা দান করেছেন, যা মানুষের জন্য বিষতুল্য। অপর দিকে মানুষকে তাওবা ও ইসতিগফারও শিক্ষা দিয়েছেন, যা সেই বিষের প্রতিষেধকতুল্য। কাজেই শয়তানের ধোঁকায় পড়ে কেউ কোন গুনাহ করে ফেললে তার উচিত, সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করে ফেলা। অর্থাৎ সে তার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে, ভবিষ্যতে আর না করার অঙ্গীকার করবে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। এর ক্রিয়ায় শয়তান যে বিষ প্রয়োগ করেছিল তা নেমে যাবে।
২৪

قَالَ اہۡبِطُوۡا بَعۡضُکُمۡ لِبَعۡضٍ عَدُوٌّ ۚ وَلَکُمۡ فِی الۡاَرۡضِ مُسۡتَقَرٌّ وَّمَتَاعٌ اِلٰی حِیۡنٍ ٢٤

কা-লাহ বিতুবা‘দুকুম লিবা‘দিন ‘আদুওউওঁ ওয়া লাকুম ফিল আরদিমুছতাকাররুওঁ ওয়া মাতা-‘উন ইলা-হীন।

আল্লাহ (আদম, তার স্ত্রী ও ইবলীসকে) বললেন, তোমরা সকলে এখান থেকে নেমে যাও, একে অন্যের শত্রুরূপে। আর পৃথিবীতে তোমাদের জন্য রয়েছে একটা কাল পর্যন্ত অবস্থান ও ক্ষাণিকটা ভোগ।
২৫

قَالَ فِیۡہَا تَحۡیَوۡنَ وَفِیۡہَا تَمُوۡتُوۡنَ وَمِنۡہَا تُخۡرَجُوۡنَ ٪ ٢٥

কা-লা ফীহা-তাহইয়াওনা ওয়া ফীহা-তামূতূনা ওয়া মিনহা-তুখরাজূন।

তিনি বললেন, সেখানেই (পৃথিবীতে) জীবন যাপন করবে, সেখানেই তোমাদের মৃত্যু হবে এবং সেখান থেকেই তোমাদেরকে পুনরায় (জীবিত করে) ওঠানো হবে।
২৬

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ قَدۡ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡکُمۡ لِبَاسًا یُّوَارِیۡ سَوۡاٰتِکُمۡ وَرِیۡشًا ؕ وَلِبَاسُ التَّقۡوٰی ۙ ذٰلِکَ خَیۡرٌ ؕ ذٰلِکَ مِنۡ اٰیٰتِ اللّٰہِ لَعَلَّہُمۡ یَذَّکَّرُوۡنَ ٢٦

ইয়া-বানীআ-দামা কাদ আনঝালনা-‘আলাইকুম লিবা-ছাইঁ ইউওয়া-রী ছাওআ-তিকুম ওয়া রীশাওঁ ওয়া লিবা-ছুততাকওয়া-যা-লিকা খাইরুন যা-লিকা মিন আ-য়া-তিল্লা-হি লা‘আল্লাহুম ইয়াযযাক্কারূন।

হে আদমের সন্তান-সন্ততি! আমি তোমাদের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করেছি, যা তোমাদের দেহের যে অংশ প্রকাশ করা দূষণীয় তা আবৃত করে এবং তা শোভাস্বরূপ। ১৪ বস্তুত তাকওয়ার যে পোশাক, সেটাই সর্বোত্তম। ১৫ এসব আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্যতম, যাতে মানুষ উপদেশ গ্রহণ করে। ১৬

তাফসীরঃ

১৪. ২৬ থেকে ৩২ পর্যন্ত আয়াতসমূহ আরবদের একটা অদ্ভুত রেওয়াজের প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে। রেওয়াজটি নিম্নরূপ, কুরাইশ গোত্র এবং মক্কা মুকাররমার আশপাশের আরও কিছু গোত্র হুম্স (কঠোর ধর্মপরায়ণ) নামে পরিচিত ছিল। হারাম শরীফের সেবায়েত হওয়ার কারণে আরবের অন্যান্য গোত্র তাদেরকে বড় সম্মান করত। এক্ষেত্রে আরবদের বাড়াবাড়ি এ পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তাদের বিশ্বাস ছিল কাপড় পরে তাওয়াফ করার অধিকার কেবল তাদেরই (হুমস্দেরই) জন্য সংরক্ষিত। তারা (অন্যান্য আরবগণ) বলত, আমরা যে কাপড় পরে গুনাহও করে থাকি, তা নিয়ে কাবা ঘরের তাওয়াফ করতে পারি না। সুতরাং তারা যখন তাওয়াফ করতে আসত, তখন ‘হুম্স’-এর কোনও লোকের কাছে কাপড় চাইত, তার কাছে কাপড় পাওয়া গেলে তাই পরে বাইতুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করত। যদি কোনও হুমসের কাছে কাপড় পাওয়া না যেত, তবে তারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়েই তাওয়াফ করত। তাদের এই বেহুদা রসমের মূলোৎপাটনের জন্যই এ আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছে। এর ভেতর মানুষের জন্য পোশাক যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তাও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, পোশাকের মূল উদ্দেশ্য দেহ আবৃত করা। সেই সঙ্গে পোশাক মানব দেহের ভূষণ ও সৌন্দর্যের উপকরণও বটে। যে পোশাকের ভেতর এই উভয়বিধ গুণ পাওয়া যায়, সেটাই উৎকৃষ্ট পোশাক। আর যে পোশাক দ্বারা মানব দেহ যথাযথভাবে আবৃত হয় না, তা মানব-স্বভাবেরই পরিপন্থী।
২৭

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ لَا یَفۡتِنَنَّکُمُ الشَّیۡطٰنُ کَمَاۤ اَخۡرَجَ اَبَوَیۡکُمۡ مِّنَ الۡجَنَّۃِ یَنۡزِعُ عَنۡہُمَا لِبَاسَہُمَا لِیُرِیَہُمَا سَوۡاٰتِہِمَا ؕ اِنَّہٗ یَرٰىکُمۡ ہُوَ وَقَبِیۡلُہٗ مِنۡ حَیۡثُ لَا تَرَوۡنَہُمۡ ؕ اِنَّا جَعَلۡنَا الشَّیٰطِیۡنَ اَوۡلِیَآءَ لِلَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ ٢٧

ইয়া-বানীআ-দামা লা-ইয়াফতিনান্নাকুমুশ শাইতা-নুকামাআখরাজা আবাওয়াইকুম মিনাল জান্নাতি ইয়ানঝি‘উ ‘আনহুমা-লিবা-ছাহুমা-লিইউরিয়াহুমা-ছাওআ-তিহিমা- ইন্নাহূ ইয়ারা-কুম হুওয়া ওয়াকাবীলুহূমিন হাইছুলা-তারাওনাহুম ইন্না-জা‘আলনাশ শায়াতীনা আওলিয়াআ লিল্লাযীনা লা-ইউ’মিনূন।

হে আদমের সন্তান-সন্ততিগণ! শয়তান যেন কিছুতেই তোমাদেরকে প্রতারিত করতে না পারে, যেমন সে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল। সে তাদেরকে তাদের পরস্পরের লজ্জাস্থান দেখানোর উদ্দেশ্যে তাদের দেহ থেকে তাদের পোশাক অপসারণ করিয়েছিল। সে ও তার দল এমন স্থান থেকে তোমাদেরকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। যারা ঈমান আনে না, আমি শয়তানকে তাদের বন্ধু বানিয়ে দিয়েছি।
২৮

وَاِذَا فَعَلُوۡا فَاحِشَۃً قَالُوۡا وَجَدۡنَا عَلَیۡہَاۤ اٰبَآءَنَا وَاللّٰہُ اَمَرَنَا بِہَا ؕ قُلۡ اِنَّ اللّٰہَ لَا یَاۡمُرُ بِالۡفَحۡشَآءِ ؕ اَتَقُوۡلُوۡنَ عَلَی اللّٰہِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ٢٨

ওয়া ইযা-ফা‘আলূফা-হিশাতান কা-লুওয়াজাদনা-‘আলাইহাআ-বাআনা-ওয়াল্লা-হু আমারানা-বিহা- কুল ইন্নাল্লা-হা লা-ইয়া’মুরু বিল ফাহশাই আতাকূলূনা ‘আলাল্লা-হি মা-লা-তা‘লামূন।

তারা (অর্থাৎ কাফেরগণ) যখন কোন অশ্লীল কাজ করে, তখন বলে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এরূপই করতে দেখেছি এবং আল্লাহ আমাদেরকে এরই আদেশ করেছেন। ১৭ তুমি (তাদেরকে) বল, আল্লাহ অশ্লীলতার আদেশ করেন না। তোমরা কি আল্লাহর সম্পর্কে এমন কথা বলছ যা তোমরা জান না?

তাফসীরঃ

১৭. তারা যে উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করত, এর দ্বারা তাদের সেই রসমের দিকেই ইশারা করা হয়েছে। রসমটি প্রাচীন হওয়ার কারণে তাদের দলীল ছিল যে, এটা পুরুষানুক্রমে চলে আসছে, যা দ্বারা বোঝা যায়, আল্লাহ তাআলা এ রকমই আদেশ করে থাকবেন।
২৯

قُلۡ اَمَرَ رَبِّیۡ بِالۡقِسۡطِ ۟  وَاَقِیۡمُوۡا وُجُوۡہَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّادۡعُوۡہُ مُخۡلِصِیۡنَ لَہُ الدِّیۡنَ ۬ؕ  کَمَا بَدَاَکُمۡ تَعُوۡدُوۡنَ ؕ ٢٩

কুল আমারা রাববী বিলকিছতিওয়া আকীমূউজূহাকুম ‘ইনদা কুল্লি মাছজিদিওঁ ওয়াদ‘ঊহু মুখলিসীনা লাহুদদীনা কামা-বাদাআকুম তা‘ঊদূ ন।

বল, আমার প্রতিপালক তো ইনসাফ করার হুকুম দিয়েছেন ১৮ এবং (আরও আদেশ করেছেন যে,) যখন (কোথাও) সিজদা করবে, তখন নিজ রোখ ঠিক রাখবে এবং তাকে ডাকবে এই বিশ্বাসের সাথে যে, আনুগত্য কেবল তাঁরই প্রাপ্য। তিনি যেভাবে প্রথমে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তোমরা সেভাবেই ফিরে আসবে। ১৯

তাফসীরঃ

১৮. উপরিউক্ত আলোচনা প্রসঙ্গে ‘ইনসাফ’-এর বিষয়টা উল্লেখ করার এক কারণ এই যে, ‘হুম্স’-ভুক্ত লোকেরা নিজেদের জন্য যে স্বতন্ত্র নিয়ম চালু করেছিল, তার কোনও-কোনওটি ইনসাফেরও পরিপন্থী ছিল। যেমন তাওয়াফকালে এই কাপড় পরার বিষয়টিই। কেবল হুম্সের লোকেরা পোশাক পরিহিত অবস্থায় তাওয়াফ করতে পারবে, অন্যরা নয় এটা কেমন ইনসাফের কথা? অথচ গুনাহই যদি কারণ হয়, তবে অন্যান্য লোক গুনাহ করে থাকলে হুমসের লোকও তো নিষ্পাপ ছিল না!
৩০

فَرِیۡقًا ہَدٰی وَفَرِیۡقًا حَقَّ عَلَیۡہِمُ الضَّلٰلَۃُ ؕ اِنَّہُمُ اتَّخَذُوا الشَّیٰطِیۡنَ اَوۡلِیَآءَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ وَیَحۡسَبُوۡنَ اَنَّہُمۡ مُّہۡتَدُوۡنَ ٣۰

ফারীকান হাদা-ওয়া ফারীকান হাক্কা ‘আলাইহিমুদ্দালা-লাতু ইন্নাহুমুততাখাযুশশায়া-তীনা আওলিয়াআ মিন দূ নিল্লা-হি ওয়া ইয়াহছাবূনা আন্নাহুম মুহতাদূ ন।

(তোমাদের মধ্যে) একটি দলকে আল্লাহ হিদায়াত দান করেছেন এবং একটি দল এমন, যাদের প্রতি পথভ্রষ্টতা অবধারিত হয়ে গেছে। কেননা তারা আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছে, আর তারা মনে করছে যে, তারা সরল পথে প্রতিষ্ঠিত আছে।
৩১

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ ٪ ٣١

ইয়া-বানীআ-দামা-খুযূঝীনাতাকুম ‘ইনদা কুল্লি মাছজিদিওঁ ওয়া কুলূওয়াশরাবূওয়ালাতুছরিফূ ইন্নাহূলা-ইউহিব্বুল মুছরিফীন।

হে আদমের সন্তান-সন্ততিগণ! যখনই তোমরা কোনও মসজিদে আসবে, তখন নিজেদের শোভার বস্তু (অর্থাৎ শরীরের পোশাক) নিয়ে আসবে এবং খাও ও পান কর, কিন্তু অপব্যয় করো না। আল্লাহ অপব্যয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।
৩২

قُلۡ مَنۡ حَرَّمَ زِیۡنَۃَ اللّٰہِ الَّتِیۡۤ اَخۡرَجَ لِعِبَادِہٖ وَالطَّیِّبٰتِ مِنَ الرِّزۡقِ ؕ قُلۡ ہِیَ لِلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا خَالِصَۃً یَّوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ کَذٰلِکَ نُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ ٣٢

কুল মান হাররামা ঝীনাতাল্লা-হিল্লাতীআখরাজা-লি‘ইবা-দিহী ওয়াত্তাইয়িবা-তি মিনার রিঝকি কুল হিয়া লিল্লাযীনা আ-মানূফিল হায়া-তিদদুনইয়া-খা-লিসাতাইঁ ইয়াওমাল কিয়া-মাতি কাযা-লিকা নুফাসসিলুল আ-য়া-তি লিকাওমিইঁ ইয়া‘লামূন।

বল, আল্লাহ নিজ বান্দাদের জন্য যে শোভার উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, কে তা হারাম করেছে? এবং (এমনিভাবে) উৎকৃষ্ট জীবিকার বস্তুসমূহ? ২০ বল, এসব পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্য (এবং) কিয়ামতের দিনে বিশেষভাবে (তাদেরই)। ২১ যারা জ্ঞানকে কাজে লাগায়, তাদের জন্য এভাবেই আমি আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করি।

তাফসীরঃ

২০. এটা মূলত মক্কার কাফেরদের একটা কথার উত্তর। তারা বলত, আমাদের প্রচলিত নিয়ম যদি আল্লাহ তাআলার অপছন্দ হয়, তবে তিনি আমাদেরকে রিযক দিচ্ছেন কেন? উত্তর দেওয়া হয়েছে, মৌলিকভাবে পার্থিব নি‘আমতরাজি মু‘মিনদের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে তারা এসব দ্বারা উপকৃত হয়ে সৃষ্টিকর্তার কৃতজ্ঞতা জানাতে ও তাঁর ইবাদত-আনুগত্যে মশগুল থাকতে পারে। এ হিসেবে কাফের ও অবাধ্যদের এসব নি‘আমত ভোগ করার কোন অধিকার থাকে না। কিন্তু তারপরও আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অফুরন্ত দয়ায় ইহজগতে রিযকের দস্তরখান সকলের জন্য অবারিত রেখেছেন এবং বাহ্যত এতে মুমিন-কাফিরের কোনও ভেদাভেদ নেই। কিন্তু আখিরাতে এসব নি‘আমত কেবল মুমিনগণই ভোগ করবে। সুতরাং দুনিয়ায় কারও প্রাচুর্য দেখে মনে করা উচিত নয় যে, এটা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির নির্দেশক এবং সে আখিরাতেও এ রকম প্রাচুর্য লাভ করবে।
৩৩

قُلۡ اِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّیَ الۡفَوَاحِشَ مَا ظَہَرَ مِنۡہَا وَمَا بَطَنَ وَالۡاِثۡمَ وَالۡبَغۡیَ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ وَاَنۡ تُشۡرِکُوۡا بِاللّٰہِ مَا لَمۡ یُنَزِّلۡ بِہٖ سُلۡطٰنًا وَّاَنۡ تَقُوۡلُوۡا عَلَی اللّٰہِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ٣٣

কুল ইন্নামা- হাররামা রাব্বিয়াল ফাওয়া-হিশা মা-জাহারা মিনহা-ওয়া মা- বাতানা ওয়াল ইছমা ওয়াল বাগইয়া বিগাইরিল হাক্কি ওয়া আন তুশরিকূবিল্লা-হি মা-লাম ইউনাঝঝিল বিহী ছুলতা-নাওঁ ওয়া আন তাকূলূ‘আলাল্লা-হি মা-লা-তা‘লামূন।

বলে দাও, আমার প্রতিপালক তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজসমূহ প্রকাশ্য হোক বা গোপন এবং সর্বপ্রকার গুনাহ, অন্যায়ভাবে (কারও প্রতি) সীমালংঘন, আল্লাহ যে সম্পর্কে কোনও প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, এমন জিনিসকে আল্লাহর শরীক সাব্যস্তকরণ এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কথা বলাকে, যে সম্পর্কে তোমাদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই। ২২

তাফসীরঃ

২২. এমনিতে তো যে কারও নামেই কোন অসত্য কথা চালানো সর্ব বিচারে একটি অন্যায় ও অনৈতিক কাজ, কিন্তু এ অপরাধ যদি আল্লাহ তাআলার সঙ্গে করা হয়, তবে তা এতই গুরুতর হয় যে, তা মানুষকে কুফর পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়। এ কারণেই আল্লাহ তাআলার বরাতে কোনও কথা বলার সময়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনও বিষয় নিশ্চিতভাবে জানা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে বিষয়কে আল্লাহর সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত করা উচিত নয়। আরবের মূর্তিপূজারীগণ নিজেদের পক্ষ হতে বিভিন্ন কথা তৈরি করে আল্লাহর নামে চালিয়ে দিয়েছিল। সে সব কথার কোন জ্ঞানগত ভিত্তি ছিল না; বরং কেবলই আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে তা রচনা করত। নিজেরাও জানত না, তা কতটুকু বাস্তব।
৩৪

وَلِکُلِّ اُمَّۃٍ اَجَلٌ ۚ فَاِذَا جَآءَ اَجَلُہُمۡ لَا یَسۡتَاۡخِرُوۡنَ سَاعَۃً وَّلَا یَسۡتَقۡدِمُوۡنَ ٣٤

ওয়া লিকুল্লি উম্মাতিন আজালুন ফাইযা-জাআ আজালুহুম লা-ইয়াছতা’খিরূনা ছা‘আতাওঁ ওয়ালা-ইয়াছতাকদিমূন।

প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য এক নির্দিষ্ট সময় আছে। যখন তাদের সেই নির্দিষ্ট সময় এসে পড়ে, তখন তারা এক মুহূর্তও বিলম্ব করতে পারে না এবং ত্বরাও করতে পারে না।
৩৫

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ اِمَّا یَاۡتِیَنَّکُمۡ رُسُلٌ مِّنۡکُمۡ یَقُصُّوۡنَ عَلَیۡکُمۡ اٰیٰتِیۡ ۙ فَمَنِ اتَّقٰی وَاَصۡلَحَ فَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ ٣٥

ইয়া-বানীআ-দামা ইম্মা-ইয়া’তিইয়ান্নাকুম রুছুলুম মিনকুম ইয়াকু সসূনা ‘আলাইকুম আ-য়াতী ফামানিত্তাকা-ওয়া আস লাহা ফালা-খাওফুন ‘আলাইহিম ওয়ালা-হুম ইয়াহঝানূন।

(মানুষকে সৃষ্টি করার সময়ই আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে,) হে বনী আদম! তোমাদের কাছে যদি তোমাদেরই মধ্য হতে কোন রাসূল এসে আমার আয়াতসমূহ তোমাদেরকে পড়ে শোনায়, তবে তখন যারা তাকওয়া অবলম্বন করবে ও নিজেদেরকে সংশোধন করবে, তাদের কোনও ভয় দেখা দেবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না।
৩৬

وَالَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَاسۡتَکۡبَرُوۡا عَنۡہَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ٣٦

ওয়ালাযীনা কাযযাবূবিআ-য়া-তিনা-ওয়াছতাকবারূ‘আনহা-উলাইকা আসহা-বুন্নারি হুম ফীহা-খা-লিদূ ন।

আর যারা আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে ও অহংকারবশে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তারা হবে জাহান্নামবাসী। তারা তাতে সর্বদা থাকবে।
৩৭

فَمَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنِ افۡتَرٰی عَلَی اللّٰہِ کَذِبًا اَوۡ کَذَّبَ بِاٰیٰتِہٖ ؕ اُولٰٓئِکَ یَنَالُہُمۡ نَصِیۡبُہُمۡ مِّنَ الۡکِتٰبِ ؕ حَتّٰۤی اِذَا جَآءَتۡہُمۡ رُسُلُنَا یَتَوَفَّوۡنَہُمۡ ۙ قَالُوۡۤا اَیۡنَ مَا کُنۡتُمۡ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ ؕ قَالُوۡا ضَلُّوۡا عَنَّا وَشَہِدُوۡا عَلٰۤی اَنۡفُسِہِمۡ اَنَّہُمۡ کَانُوۡا کٰفِرِیۡنَ ٣٧

ফামান আজলামুমিম্মানিফ তারা-‘আলাল্লা-হি কাযিবান আও কাযযাবা বিআ-য়া-তিহী উলাইকা ইয়ানা-লুহুম নাসীবুহুম মিনাল কিতা-বি হাত্তাইযা-জাআতহুম রুছুলুনা-ইয়াতাওয়াফফাওনাহুম কা-লূআইনামা-কুনতুম তাদ‘ঊনা মিন দূ নিল্লা-হি কা-লূদাললূ‘আন্না-ওয়া শাহিদূ‘আলাআনফুছিহিম আন্নাহুম কা-নূকা-ফিরীন।

সুতরাং (বল), তার চেয়ে বড় জালেম আর কে হবে, যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে অথবা তার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে? এরূপ লোকদের ভাগ্যে (রিযকের) যতটুকু অংশ লেখা আছে, তা তাদের নিকট (দুনিয়ার জীবনে) পৌঁছবেই। ২৩ অবশেষে যখন আমার প্রেরিত ফিরিশতাগণ তাদের রূহ কবজ করার জন্য তাদের নিকট আসবে তখন তারা বলবে, তারা কোথায়, আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে তোমরা ডাকতে? তারা বলবে, তারা আমাদের থেকে অন্তর্হিত হয়েছে এবং তারা নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, আমরা কাফের ছিলাম।

তাফসীরঃ

২৩. এখানে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, দুনিয়ায় রিযক দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা মুমিন ও কাফেরের মধ্যে কোনও প্রভেদ করেননি। বরং প্রত্যেকের জন্য রিযকের একটা অংশ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যা সর্বাবস্থায়ই তার কাছে পৌঁছবে, সে ঘোরতর কাফেরই হোক না কেন। সুতরাং দুনিয়ায় যদি কারও জীবিকার প্রাচুর্য লাভ হয়, তবে সে যেন মনে না করে, তার কর্মপন্থা আল্লাহ তাআলার পছন্দ, যেমন ওই কাফেরগণ মনে করছে। যখন মৃত্যু এসে উপস্থিত হবে, তখনই তারা প্রকৃত সত্য টের পাবে।
৩৮

قَالَ ادۡخُلُوۡا فِیۡۤ اُمَمٍ قَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ مِّنَ الۡجِنِّ وَالۡاِنۡسِ فِی النَّارِ ؕ کُلَّمَا دَخَلَتۡ اُمَّۃٌ لَّعَنَتۡ اُخۡتَہَا ؕ حَتّٰۤی اِذَا ادَّارَکُوۡا فِیۡہَا جَمِیۡعًا ۙ قَالَتۡ اُخۡرٰىہُمۡ لِاُوۡلٰىہُمۡ رَبَّنَا ہٰۤؤُلَآءِ اَضَلُّوۡنَا فَاٰتِہِمۡ عَذَابًا ضِعۡفًا مِّنَ النَّارِ ۬ؕ قَالَ لِکُلٍّ ضِعۡفٌ وَّلٰکِنۡ لَّا تَعۡلَمُوۡنَ ٣٨

কা-লাদ খুলূফীউমামিন কাদ খালাত মিন কাবলিকুম মিনাল জিন্নি ওয়াল ইনছি ফিন্না-রি কুল্লামা-দাখালাত উম্মাতুল লা‘আনাত উখতাহা- হাত্তা-ইযাদ্দা-রাকূফীহাজামী‘আন কা-লাত উখরা-হুম লিঊলা-হুম রাব্বানা-হাউলাই আদাললূনা-ফাআতিহিমি ‘আযা-বান দি‘ফাম মিনান্না-রি কা-লা লিকুল্লিন দি‘ফুওঁ ওয়ালা-কিল্লাতা‘লামূন।

আল্লাহ বলবেন, তোমাদের পূর্বে জিন ও মানুষদের যেসব দল গত হয়েছে, তাদের সাথে তোমরাও জাহান্নামে প্রবেশ কর। (এভাবে) যখনই কোনও দল (জাহান্নামে) প্রবেশ করবে, তারা অপর দলকে অভিসম্পাত করবে। ২৪ এমনকি যখন একের পর এক সকলে তাতে গিয়ে একত্র হবে, তখন তাদের পরবর্তীগণ পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! এরাই আমাদেরকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করেছিল। সুতরাং এদেরকে আগুন দ্বারা দ্বিগুণ শাস্তি দাও। আল্লাহ বলবেন, প্রত্যেকের জন্যই দ্বিগুণ শাস্তি রয়েছে। ২৫ কিন্তু তোমরা (এখনও পর্যন্ত) জান না।

তাফসীরঃ

২৪. অর্থাৎ প্রত্যেকের শাস্তিই পূর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। সুতরাং নেতৃবর্গকে যে দ্বিগুণ শাস্তি দেওয়া হবে তার অর্থ এ নয় যে, তোমরা নিজেরা সে রকম কঠিন শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যাবে; বরং একটা সময় আসবে, যখন তোমাদের শাস্তি বৃদ্ধি পেতে পেতে তাদের বর্তমান শাস্তির মতই কঠিন হয়ে যাবে হোক না তাদের শাস্তি তখন আরও অনেক বেড়ে যাবে।
৩৯

وَقَالَتۡ اُوۡلٰىہُمۡ لِاُخۡرٰىہُمۡ فَمَا کَانَ لَکُمۡ عَلَیۡنَا مِنۡ فَضۡلٍ فَذُوۡقُوا الۡعَذَابَ بِمَا کُنۡتُمۡ تَکۡسِبُوۡنَ ٪ ٣٩

ওয়া কা-লাত ঊলা-হুম লিউখরা-হুম ফামা-কা-না লাকুম‘আলাইনা-মিন ফাদলিন ফাযূকুল ‘আযা-বা বিমা-কুনতুম তাকছিবূন।

আর তাদের পূর্ববর্তীগণ পরবর্তীগণকে বলবে, আমাদের উপর তোমাদের কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সুতরাং তোমরা তোমাদের নিজ কৃতকর্মের কারণে শাস্তি ভোগ কর।
৪০

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَاسۡتَکۡبَرُوۡا عَنۡہَا لَا تُفَتَّحُ لَہُمۡ اَبۡوَابُ السَّمَآءِ وَلَا یَدۡخُلُوۡنَ الۡجَنَّۃَ حَتّٰی یَلِجَ الۡجَمَلُ فِیۡ سَمِّ الۡخِیَاطِ ؕ وَکَذٰلِکَ نَجۡزِی الۡمُجۡرِمِیۡنَ ٤۰

ইন্নাল্লাযীনা কাযযাবূবিআ-য়া-তিনা-ওয়াছতাকবারূ‘আনহা-লা-তুফাত্তাহুলাহুম আবওয়াবুছছামাই ওয়ালা-ইয়াদখুলূনাল জান্নাতা হাত্তা-ইয়ালিজাল জামালুফী ছাম্মিল খিয়া-তি ওয়া কাযা-লিকা নাজঝিল মুজরিমীন।

নিশ্চয়ই যারা আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং অহংকারের সাথে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাদের জন্য আকাশের দরজাসমূহ খোলা হবে না ২৬ এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করে। ২৭ এভাবেই আমি অপরাধীদেরকে (তাদের কৃতকর্মের) বদলা দেই।

তাফসীরঃ

২৬. এটা এক আরবী প্রবচন। এর অর্থ, যেমন সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে উটের প্রবেশ অসম্ভব, তেমনি তাদেরও জান্নাতে প্রবেশও সম্পূর্ণ অসম্ভব।
৪১

لَہُمۡ مِّنۡ جَہَنَّمَ مِہَادٌ وَّمِنۡ فَوۡقِہِمۡ غَوَاشٍ ؕ وَکَذٰلِکَ نَجۡزِی الظّٰلِمِیۡنَ ٤١

লাহুম মিন জাহান্নামা মিহা-দুওঁ ওয়া মিন ফাওকিহিম গাওয়া-শিওঁ ওয়া কাযা-লিকা নাজঝিজ্জা-লিমীন।

তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামেরই বিছানা এবং উপর দিক থেকে তারই আচ্ছাদন। এভাবেই আমি জালেমদেরকে (তাদের কৃতকর্মের) প্রতিফল দিয়ে থাকি।
৪২

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَا نُکَلِّفُ نَفۡسًا اِلَّا وُسۡعَہَاۤ ۫ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ٤٢

ওয়াল্লাযীনা আ-মানূওয়া ‘আমিলুসসা-লিহা-তি লা-নুকালিলফুনাফছান ইল্লা-উছ‘আহা উলাইকা আসহা-বুল জান্নাতি হুম ফীহা-খা-লিদূ ন।

আর যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে আর (মনে রাখতে হবে) আমি কারও প্রতি তার সাধ্যের বেশি ভার অর্পণ করি না, ২৮ তারাই হবে জান্নাতবাসী। তারা তাতে সর্বদা থাকবে।

তাফসীরঃ

২৮. এখানে সৎকর্মের উল্লেখের সাথে একটি অন্তর্বর্তী বাক্য হিসেবে এ কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সৎকর্ম এমন কোনও বিষয় নয়, যা মানুষের সাধ্যের বাইরে। কেননা আমি মানুষকে এমন কোনও হুকুম দেইনি, যা করার ক্ষমতা তাদের নেই। তাছাড়া এ দিকেও ইশারা করা হয়ে থাকবে যে, কেউ যদি তার সাধ্যানুযায়ী সৎকর্ম করার চেষ্টা করে আর তারপরও তার দ্বারা কোনও ভুল-চুক্ হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তাআলা সেজন্য তাকে ধরবেন না।
৪৩

وَنَزَعۡنَا مَا فِیۡ صُدُوۡرِہِمۡ مِّنۡ غِلٍّ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہِمُ الۡاَنۡہٰرُ ۚ وَقَالُوا الۡحَمۡدُ لِلّٰہِ الَّذِیۡ ہَدٰىنَا لِہٰذَا ۟ وَمَا کُنَّا لِنَہۡتَدِیَ لَوۡلَاۤ اَنۡ ہَدٰىنَا اللّٰہُ ۚ لَقَدۡ جَآءَتۡ رُسُلُ رَبِّنَا بِالۡحَقِّ ؕ وَنُوۡدُوۡۤا اَنۡ تِلۡکُمُ الۡجَنَّۃُ اُوۡرِثۡتُمُوۡہَا بِمَا کُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ ٤٣

ওয়া নাঝা‘না-মা-ফী সুদূ রিহিম মিন গিলিলন তাজরী মিন তাহতিহিমুল আনহা-রু ওয়া কা-লুল হামদুলিল্লা-হিল্লাযী হাদা-না-লিহা-যা- ওয়া মা-কুন্না-লিনাহতাদিইয়া লাওলাআন হাদা-নাল্লা-হু লাকাদ জাআত রুছুলুরাব্বিনা-বিলহাক্কি ওয়া নূদূ আন তিলকুমুল জান্নাতুঊরিছতুমূহা-বিমা-কুনতুম তা‘মালূন।

আর (ইহজীবনে) তাদের বুকের ভেতর (পারস্পরিক) কোন কষ্ট থাকলে আমি তা বের করে দেব। ২৯ তাদের তলদেশে নহর বহমান থাকবে। আর তারা বলবে, সমস্ত শোকর আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে এই স্থানে পৌঁছিয়েছেন। আল্লাহ আমাদেরকে না পৌঁছালে আমরা কখনই (এ স্থলে) পৌঁছতে পারতাম না। বাস্তবিকই আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ আমাদের কাছে সম্পূর্ণ সত্য কথাই নিয়ে এসেছিলেন। আর তাদেরকে ডেকে বলা হবে, হে মানুষ! এই হল জান্নাত, তোমরা যে আমল করতে তারই ভিত্তিতে তোমাদেরকে এর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তাফসীরঃ

২৯. জান্নাত যেহেতু সব রকম কষ্ট থেকে মুক্ত থাকবে, তাই সেখানে পারস্পরিক দুঃখ-কষ্টও জায়গা পাবে না। এমনকি দুনিয়ায় পরস্পরের মধ্যে যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়ে থাকে, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তা সম্পূর্ণরূপে দূর করে দেবেন। ফলে সমস্ত জান্নাতবাসী সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করবে।
৪৪

وَنَادٰۤی اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ اَصۡحٰبَ النَّارِ اَنۡ قَدۡ وَجَدۡنَا مَا وَعَدَنَا رَبُّنَا حَقًّا فَہَلۡ وَجَدۡتُّمۡ مَّا وَعَدَ رَبُّکُمۡ حَقًّا ؕ  قَالُوۡا نَعَمۡ ۚ  فَاَذَّنَ مُؤَذِّنٌۢ بَیۡنَہُمۡ اَنۡ لَّعۡنَۃُ اللّٰہِ عَلَی الظّٰلِمِیۡنَ ۙ ٤٤

ওয়া না-দা-আসহা-বুল জান্নাতি আসাহা-বান্না-রি আন কাদ ওয়াজাদনা-মা-ওয়া‘আদানারাব্বুনা-হাক্কান ফাহাল ওয়াজাততুম মা-ওয়া‘আদা রাব্বুকুম হাক্কান কা-লূনা‘আম ফাআযযানা মুআযযিনুম বাইনাহুম আল লা‘নাতুল্লা-হি ‘আলাজ্জা-লিমীন।

আর জান্নাতবাসীগণ জাহান্নামীদেরকে ডেকে বলবে, আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তো তা সত্য পেয়েছি। এবার (তোমরা বল), তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তোমরাও কি তাকে সত্য পেয়েছ? তারা উত্তরে বলবে, হাঁ। এমনই সময় তাদের মধ্যে এক ঘোষক ঘোষণা করবে, আল্লাহর লানত জালেমদের প্রতি-
৪৫

الَّذِیۡنَ یَصُدُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَیَبۡغُوۡنَہَا عِوَجًا ۚ  وَہُمۡ بِالۡاٰخِرَۃِ کٰفِرُوۡنَ ۘ ٤٥

আল্লাযীনা ইয়াসুদ্দূনা ‘আন ছাবীলিল্লা-হি ওয়া ইয়াবগূনাহা-‘ইওয়াজা- ওয়া হুম বিল আখিরাতি কা-ফিরূন।

যারা আল্লাহর পথে (মানুষকে) বাধা দিত এবং তাতে বক্রতা সন্ধান করত এবং যারা আখিরাতকে অস্বীকার করত।
৪৬

وَبَیۡنَہُمَا حِجَابٌ ۚ وَعَلَی الۡاَعۡرَافِ رِجَالٌ یَّعۡرِفُوۡنَ کُلًّۢا بِسِیۡمٰہُمۡ ۚ وَنَادَوۡا اَصۡحٰبَ الۡجَنَّۃِ اَنۡ سَلٰمٌ عَلَیۡکُمۡ ۟ لَمۡ یَدۡخُلُوۡہَا وَہُمۡ یَطۡمَعُوۡنَ ٤٦

ওয়া বাইনাহুমা-হিজা-বুওঁ ওয়া ‘আলাল আ‘রা-ফি রিজা-লুইঁ ইয়া‘রিফূনা কুল্লাম বিছীমাহুম ওয়া না-দাও আসহা-বাল জান্নাতি আন ছালা-মুন ‘আলাইকুম লাম ইয়াদখুলূহা-ওয়া হুম ইয়াতমা‘ঊন।

এবং (জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসী এই) উভয় দলের মধ্যে একটি আড়াল থাকবে। আর আরাফ-এ (অর্থাৎ সেই আড়ালের উচ্চতায়) কিছু লোক থাকবে, যারা প্রত্যেক দলের লোককে তাদের চিহ্ন দ্বারা চিনতে পারবে। ৩০ তারা জান্নাতবাসীদেরকে ডেকে বলবে, তোমাদের প্রতি সালাম। তারা (অর্থাৎ আরাফবাসী) তখনও পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করেনি, কিন্তু তারা সাগ্রহে (তার) আশাবাদী হবে।

তাফসীরঃ

৩০. এমনিতে তো আরাফের লোক জান্নাতবাসী ও জাহান্নামী উভয় শ্রেণীর লোকদেরকেই সরাসরি দেখতে পাবে। তাই কোনও দলের লোকদেরকেই চেনার জন্য তাদের কোন আলামতের দরকার হবে না। তারপরও যে এখানে আলামতের কথা বলা হয়েছে, এর দ্বারা ইশারা করা উদ্দেশ্য যে, তারা জান্নাত ও জাহান্নামবাসীদেরকে দুনিয়ায়ও তাদের লক্ষণ দ্বারা চিনত। আর তারা যেহেতু ঈমানদার ছিল, তাই দুনিয়ায়ও আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এতটুকু অনুভূতি দিয়েছিলেন, যা দ্বারা তারা চেহারা দেখেই বুঝতে পারত যে, এরা মুত্তাকী-পরহেজগার ও নেককার লোক। এমনিভাবে তারা কাফেরদের চেহারা দেখেও চিনে ফেলত যে, এরা কাফের (ইমাম রাযী, তাফসীরে কাবীর)।
৪৭

وَاِذَا صُرِفَتۡ اَبۡصَارُہُمۡ تِلۡقَآءَ اَصۡحٰبِ النَّارِ ۙ  قَالُوۡا رَبَّنَا لَا تَجۡعَلۡنَا مَعَ الۡقَوۡمِ الظّٰلِمِیۡنَ ٪ ٤٧

ওয়া ইযা-সুরিফাত আবসা-রুহুম তিলকাআ আসহা-বিন্না-রি কা-লূরাব্বানা-লাতাজ‘আলনা-মা‘আল কাওমিজ্জা-লিমীন।

আর যখন তাদের দৃষ্টি জাহান্নামবাসীদের প্রতি ফিরিয়ে দেওয়া হবে, তখন তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ওই জালেমদের সঙ্গে রেখ না।
৪৮

وَنَادٰۤی اَصۡحٰبُ الۡاَعۡرَافِ رِجَالًا یَّعۡرِفُوۡنَہُمۡ بِسِیۡمٰہُمۡ قَالُوۡا مَاۤ اَغۡنٰی عَنۡکُمۡ جَمۡعُکُمۡ وَمَا کُنۡتُمۡ تَسۡتَکۡبِرُوۡنَ ٤٨

ওয়ানা-দাআসহা-বুল আ‘রাফি রিজালাইঁ ইয়া‘রিফূনাহুম বিছীমা-হুম কা-লূমাআগনা‘আনকুম জাম‘উকুম ওয়া মা-কুনতুম তাছতাকবিরূন।

আরাফবাসীগণ একদল লোককে, যাদেরকে তারা তাদের চিহ্ন দ্বারা চিনবে, ডাক দিয়ে বলবে, তোমাদের সংগৃহীত সঞ্চয় তোমাদের কোনও কাজে আসল না এবং তোমরা যাদেরকে বড় মনে করতে তারাও না। ৩১

তাফসীরঃ

৩১. এর দ্বারা তাদের সেই দেবতাদের প্রতি ইশারা করা হয়েছে, যাদেরকে তারা আল্লাহ তাআলার শরীক সাব্যস্ত করত। এমনিভাবে এটা সেই সর্দার ও নেতাদের প্রতিও ইঙ্গিত, যাদেরকে তারা বড় মনে করে অন্ধের মত অনুসরণ করত ও মনে করত, তারা তাদেরকে আল্লাহ তাআলার ক্রোধ থেকে বাঁচাবে। (বাক্যটির আরেক অর্থ হতে পারে ‘তোমাদের অহংকারও না। অর্থাৎ তোমরা যে নিজেদেরকে অন্যদের তুলনায় বড় মনে করেছিলে এবং সেই অহমিকায় দীন কবুল করাকে নিজেদের জন্য অমর্যাদাকর গণ্য করছিলে, আজ দেখ সেই অহংকার কত মিথ্যা ছিল। জাহান্নামের আযাব ও লাঞ্ছনা থেকে তা তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারল কি? -অনুবাদক)
৪৯

اَہٰۤؤُلَآءِ الَّذِیۡنَ اَقۡسَمۡتُمۡ لَا یَنَالُہُمُ اللّٰہُ بِرَحۡمَۃٍ ؕ اُدۡخُلُوا الۡجَنَّۃَ لَا خَوۡفٌ عَلَیۡکُمۡ وَلَاۤ اَنۡتُمۡ تَحۡزَنُوۡنَ ٤٩

আহাউলাইল্লাযীনা আকছামতুম লা-ইয়ানা-লুহুমুল্লা-হু বিরাহমাতিন উদখুলুল জান্নাতা লা-খাওফুন ‘আলাইকুম ওয়ালা-আনতুম তাহঝানূন।

(অতঃপর জান্নাতবাসীদের প্রতি ইশারা করে বলবে,) এরাই কি তারা, যাদের সম্পর্কে তোমরা শপথ করে বলতে, আল্লাহ তাদেরকে নিজ রহমতের কোনও অংশ দেবেন না? (তাদেরকে তো বলে দেওয়া হয়েছে,) তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর। তোমাদের কোনও ভয় নেই এবং তোমরা কোনও দুঃখেরও সম্মুখীন হবে না।
৫০

وَنَادٰۤی اَصۡحٰبُ النَّارِ اَصۡحٰبَ الۡجَنَّۃِ اَنۡ اَفِیۡضُوۡا عَلَیۡنَا مِنَ الۡمَآءِ اَوۡ مِمَّا رَزَقَکُمُ اللّٰہُ ؕ  قَالُوۡۤا اِنَّ اللّٰہَ حَرَّمَہُمَا عَلَی الۡکٰفِرِیۡنَ ۙ ٥۰

ওয়া না-দাআসহা-বুন্না-রি আসহা-বাল জান্নাতি আন আফীদূ ‘আলাইনা-মিনাল মাই আও মিম্মা-রাঝাকাকুমুল্লা-হু কা-লূইন্নাল্লা-হা হাররামাহুমা-‘আলাল কা-ফিরীন।

আর জাহান্নামবাসীগণ জান্নাতবাসীদেরকে ডেকে বলবে, আমাদের উপর সামান্য কিছু পানিই ঢেলে দাও অথবা আল্লাহ তোমাদেরকে যে নিয়ামত দিয়েছেন তার কিছু অংশ (আমাদের কাছে পৌঁছে দাও)। তারা উত্তর দেবে, আল্লাহ এ দু’টো জিনিস ওই কাফেরদের জন্য হারাম করে দিয়েছেন-
৫১

الَّذِیۡنَ اتَّخَذُوۡا دِیۡنَہُمۡ لَہۡوًا وَّلَعِبًا وَّغَرَّتۡہُمُ الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَا ۚ فَالۡیَوۡمَ نَنۡسٰہُمۡ کَمَا نَسُوۡا لِقَآءَ یَوۡمِہِمۡ ہٰذَا ۙ وَمَا کَانُوۡا بِاٰیٰتِنَا یَجۡحَدُوۡنَ ٥١

আল্লাযীনাততাখাযূদীনাহুম লাহওয়াওঁ ওয়া লা‘ইবাওঁ ওয়া গাররাতহুমুল হায়া-তুদ দুনইয়া- ফালইয়াওমা নানছা-হুম কামা-নাছূলিকাআ ইয়াওমিহিম হা-যা- ওয়ামা-কা-নূ বিআ-য়া-তিনা-ইয়াজহাদূ ন।

যারা নিজেদের দীনকে ক্রীড়া-কৌতুকের বস্তুতে পরিণত করেছিল এবং যাদেরকে পার্থিব জীবন ধোঁকায় ফেলে রেখেছিল। সুতরাং আজ আমি তাদেরকে বিস্মৃত হব, যেভাবে তারা ভুলে গিয়েছিল যে, তাদেরকে এই দিনের সম্মুখীন হতে হবে এবং যেভাবে তারা আমার আয়াতসমূহকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করত।
৫২

وَلَقَدۡ جِئۡنٰہُمۡ بِکِتٰبٍ فَصَّلۡنٰہُ عَلٰی عِلۡمٍ ہُدًی وَّرَحۡمَۃً لِّقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ ٥٢

ওয়া লাকাদ জি‘না-হুম বিকিতা-বিন ফাসসালনা-হু‘আলা-‘ইলমিন হুদাওঁ ওয়ারাহমাতাল লিকাওমিইঁ ইউ’মিনূন।

বস্তুত আমি তাদের কাছে এমন এক কিতাব উপস্থিত করেছি, যার ভেতর আমি (আমার) জ্ঞানের ভিত্তিতে (প্রতিটি বিষয়ের) বিশদ ব্যাখ্যা করেছি। যারা ঈমান আনে, তাদের পক্ষে এটা হিদায়াত ও রহমত।
৫৩

ہَلۡ یَنۡظُرُوۡنَ اِلَّا تَاۡوِیۡلَہٗ ؕ  یَوۡمَ یَاۡتِیۡ تَاۡوِیۡلُہٗ یَقُوۡلُ الَّذِیۡنَ نَسُوۡہُ مِنۡ قَبۡلُ قَدۡ جَآءَتۡ رُسُلُ رَبِّنَا بِالۡحَقِّ ۚ  فَہَلۡ لَّنَا مِنۡ شُفَعَآءَ فَیَشۡفَعُوۡا لَنَاۤ اَوۡ نُرَدُّ فَنَعۡمَلَ غَیۡرَ الَّذِیۡ کُنَّا نَعۡمَلُ ؕ  قَدۡ خَسِرُوۡۤا اَنۡفُسَہُمۡ وَضَلَّ عَنۡہُمۡ مَّا کَانُوۡا یَفۡتَرُوۡنَ ٪ ٥٣

হাল ইয়ানজুরূনা ইল্লা-তা’বীলাহু ইয়াওমা ইয়া’তী তা’বীলুহূ ইয়াকূলুল্লাযীনা নাছূহু মিন কাবলুকাদ জাআত রুছুলুরাব্বিনা-বিলহাক্কি ফাহাল লানা-মিন শুফা‘আআ ফাইয়াশফা‘ঊলানাআও নুরাদ্দ ফানা‘মালা গাইরাল্লাযী কুন্না-না‘মালু কাদ খাছিরূআনফছাহুম ওয়াদাল্লা ‘আনহুম মা-কানূইয়াফতারূন।

কাফিরগণ কি এই কিতাবে বর্ণিত শেষ পরিণামেরই অপেক্ষা করছে? ৩২ (অথচ) এই কিতাবের বর্ণিত শেষ পরিণাম যে দিন আসবে সে দিন, যারা পূর্বে সে পরিণামের কথা ভুলে গিয়েছিল তারা বলবে, বাস্তবিকই আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ সত্যবাণী নিয়েই এসেছিলেন। এখন আমাদের কি এমন কোন সুপারিশকারী লাভ হবে, যারা আমাদের পক্ষে সুপারিশ করবে? অথবা আমাদেরকে কি পুনরায় (দুনিয়ায়) ফেরত পাঠানো হবে, যাতে আমরা যে (মন্দ) কাজ করতাম তার বিপরীত কাজ করতে পারি? বস্তুত তারা নিজেরাই নিজেদের লোকসানে ফেলেছে এবং তারা যা-কিছু গড়ে রেখেছিল (অর্থাৎ তাদের দেবতাগণ), তারা তাদের থেকে অন্তর্হিত হয়েছে।

তাফসীরঃ

৩২. ‘শেষ পরিণাম’ দ্বারা কিয়ামত দিবসকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ঈমান আনার জন্য তারা কি কিয়ামত দিবসেরই অপেক্ষা করছে, অথচ সেদিন ঈমান আনলেও তা গৃহীত হবে না। আর যখন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে, তখন আক্ষেপ করা ছাড়া তাদের আর কিছু করার থাকবে না।
৫৪

اِنَّ رَبَّکُمُ اللّٰہُ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ ۟ یُغۡشِی الَّیۡلَ النَّہَارَ یَطۡلُبُہٗ حَثِیۡثًا ۙ وَّالشَّمۡسَ وَالۡقَمَرَ وَالنُّجُوۡمَ مُسَخَّرٰتٍۭ بِاَمۡرِہٖ ؕ اَلَا لَہُ الۡخَلۡقُ وَالۡاَمۡرُ ؕ تَبٰرَکَ اللّٰہُ رَبُّ الۡعٰلَمِیۡنَ ٥٤

ইন্না-রাব্বাকুমুল্লা-হুল্লাযী খালাকাছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদা ফী ছিত্তাতি আইইয়া-মিন ছু ম্মাছ তাওয়া-‘আলাল ‘আরশি ইউগশিল লাইলান নাহা-রা ইয়াতলুবুহূহাছীছাওঁ ওয়াশশামছা ওয়াল কামারা ওয়ান নুজূমা মুছাখখারা-তিম বিআমরিহী আলা-লাহুল খালকুওয়াল আমরু তাবা-রাকাল্লা-হু রাব্বুল ‘আ-লামীন।

নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক সেই আল্লাহ, যিনি সমস্ত আসমান ও যমীন ছয় দিনে ৩৩ সৃষ্টি করেন। তারপর তিনি আরশে ইস্তিওয়া ৩৪ গ্রহণ করেন। তিনি দিনকে রাতের দ্বারা ঢেকে দেন, যা দ্রুতগতিতে ধাবিত হয়ে তাকে ধরে ফেলে। এবং সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি (সৃষ্টি করেছেন), যা সবই তাঁরই আজ্ঞাধীন। স্মরণ রেখ, সৃষ্টি ও আদেশ দান তাঁরই কাজ। আল্লাহ অতি বরকতময়, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।

তাফসীরঃ

৩৩. ইসতিওয়া (استواء) আরবী শব্দ। এর অর্থ সোজা হওয়া, কায়েম হওয়া, আয়ত্তাধীন করা ইত্যাদি। কখনও এ শব্দটি বসা ও সমাসীন হওয়া অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা যেহেতু শরীর ও স্থান থেকে মুক্ত ও পবিত্র, তাই তাঁর ক্ষেত্রে শব্দটি দ্বারা এরূপ অর্থ গ্রহণ সঠিক নয় যে, মানুষ যেভাবে কোনও আসনে সমাসীন হয়, তেমনিভাবে (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহ তাআলাও আরশে উপবিষ্ট ও সমাসীন হন। প্রকৃতপক্ষে ‘ইস্তিওয়া’ আল্লাহ তাআলার একটি গুণ। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কিরামের মতে এর প্রকৃত ধরণ-ধারণ আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কেউ জানে না। তাদের মতে এটা মুতাশাবিহাত (দ্ব্যর্থবোধক) বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত, যার খোড়াখুড়িতে লিপ্ত হওয়া ঠিক নয়। সূরা আলে ইমরানের শুরুভাগে আল্লাহ তাআলা এরূপ মুতাশাবিহ বিষয়ের অনুসন্ধানে লিপ্ত হতে নিষেধ করেছেন। সে হিসেবে এর কোনও তরজমা করাও সমীচীন মনে হয় না। কেননা এর যে-কোনও তরজমাতেই বিভ্রান্তি সৃষ্টির অবকাশ আছে। এ কারণেই আমরা এস্থলে এর তরজমা করিনি। তাছাড়া এর উপর কর্মগত কোনও মাসআলাও নির্ভরশীল নয়। এতটুকু বিশ্বাস রাখাই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাআলা নিজ শান অনুযায়ী ‘ইসতিওয়া’ গ্রহণ করেছেন, যার স্বরূপ ও প্রকৃতি উপলব্ধি করার মত জ্ঞান-বুদ্ধি মানুষের নেই।
৫৫

اُدۡعُوۡا رَبَّکُمۡ تَضَرُّعًا وَّخُفۡیَۃً ؕ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُعۡتَدِیۡنَ ۚ ٥٥

উদ‘ঊ রাব্বাকুম তাদাররু‘আওঁ ওয়া খুফইয়াতান ইন্নাহূলা-ইউহিব্বুল মু‘তাদীন।

তোমরা বিনীতভাবে ও চুপিসারে নিজেদের প্রতিপালককে ডাক। নিশ্চয়ই তিনি সীমালংঘন- কারীদেরকে পছন্দ করেন না। ৩৫

তাফসীরঃ

৩৫. সীমালংঘন বিভিন্ন রকম হতে পারে, যেমন অতি উচ্চ স্বরে দোয়া করা কিংবা কোন নাজায়েয বা অসম্ভব বস্তু প্রার্থনা করা, যদ্দরুন দোয়া তামাশায় পরিণত হয়, যথা এই দোয়া করা যে, আমি যেন এখনই আকাশে পৌঁছে যাই। কাফেরগণ অনেক সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ জাতীয় দোয়া করতে বলত।
৫৬

وَلَا تُفۡسِدُوۡا فِی الۡاَرۡضِ بَعۡدَ اِصۡلَاحِہَا وَادۡعُوۡہُ خَوۡفًا وَّطَمَعًا ؕ اِنَّ رَحۡمَتَ اللّٰہِ قَرِیۡبٌ مِّنَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ٥٦

ওয়ালা-তুফছিদূফিল আরদিবা‘দা ইসলা-হিহা-ওয়াদ‘ঊহু খাওফাওঁ ওয়া তামা‘আন ইন্না রাহমাতাল্লা-হি কারীবুম মিনাল মুহছিনীন।

এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর তাতে অশান্তি বিস্তার করো না ৩৬ এবং (অন্তরে তাঁর) ভয় ও আশা রেখে তাঁর ইবাদত কর। ৩৭ নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।

তাফসীরঃ

৩৬. এ আয়াতে যে ‘দোয়া’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে এর দ্বারা ইবাদত বোঝানো হয়েছে। এ কারণেই আমরা এর তরজমা করেছি ইবাদত। আয়াতে প্রকৃত ইবাদতের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে যে, ইবাদতকারীর অন্তরে ইবাদতের কারণে অহংকার সৃষ্টি তো হবেই না; বরং এই ভয় জাগ্রত থাকবে যে, জানি না আমি ইবাদতের হক আদায় করতে পেরেছি কি না এবং আমার এ ইবাদত আল্লাহ তাআলার দরবারে কবুল হওয়ার উপযুক্ত কি না! অপর দিকে ইবাদতের ত্রুটির প্রতি লক্ষ্য করে তার অন্তরে হতাশাও সৃষ্টি হবে না; বরং আল্লাহ তাআলার রহমতের প্রতি লক্ষ্য করে আশা সঞ্চার হবে যে, তিনি নিজ দয়ায় এটা কবুল করে নেবেন। অর্থাৎ নিজ ত্রুটিজনিত ভয় ও আল্লাহ তাআলার রহমতপ্রসূত আশা-এ উভয় গুণের সম্মিলন দ্বারাই ইবাদত যথার্থ রূপ লাভ করে।
৫৭

وَہُوَ الَّذِیۡ یُرۡسِلُ الرِّیٰحَ بُشۡرًۢا بَیۡنَ یَدَیۡ رَحۡمَتِہٖ ؕ حَتّٰۤی اِذَاۤ اَقَلَّتۡ سَحَابًا ثِقَالًا سُقۡنٰہُ لِبَلَدٍ مَّیِّتٍ فَاَنۡزَلۡنَا بِہِ الۡمَآءَ فَاَخۡرَجۡنَا بِہٖ مِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ ؕ کَذٰلِکَ نُخۡرِجُ الۡمَوۡتٰی لَعَلَّکُمۡ تَذَکَّرُوۡنَ ٥٧

ওয়া হুওয়াল্লাযীইউরছিলুর রিয়া-হাবুশরাম বাইনা ইয়াদাই রাহমাতিহী হাত্তা-ইযাআকাল্লাত ছাহা-বান ছিকা-লান ছুকনা-হু লিবালাদিম মাইয়িতিন ফাআনঝালনা-বিহিল মাআ ফাআখরাজনা-বিহী মিন কুল্লিছছামারা-তি কাযা-লিকা নুখরিজুল মাওতালা‘আল্লাকুম তাযাক্কারূন।

এবং তিনিই (সেই সত্তা), যিনি নিজ রহমতের (অর্থাৎ বৃষ্টির) পূর্বক্ষণে (বৃষ্টির) সুসংবাদবাহীরূপে বায়ু প্রেরণ করেন। যখন তা ভারী মেঘমালাকে বয়ে নিয়ে যায়, তখন আমি তাকে কোন মৃত ভূখণ্ডের দিকে চালিয়ে নিয়ে যাই, তারপর সেখানে পানি বর্ষণ করি এবং তা দ্বারা সর্বপ্রকার ফল উৎপন্ন করি। এভাবেই আমি মৃতদেরকেও জীবিত করে তুলব। হয়ত (এসব বিষয়ে চিন্তা করে) তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে। ৩৮

তাফসীরঃ

৩৮. অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা যেভাবে মৃত ভূমিতে প্রাণ সঞ্চার করেন, তেমনিভাবে তিনি মৃত মানুষের মধ্যেও প্রাণ দিতে সক্ষম। মৃত ভূমির সঞ্জীবিত হওয়ার বিষয়টা তোমরা দৈনন্দিন জীবনে লক্ষ্য করে থাক এবং এটাও স্বীকার কর যে, এসব আল্লাহ তাআলার কুদরতেই হয়। এর থেকে তোমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত যে, মানুষকে পুনর্জীবিত করার ক্ষমতাও আল্লাহর আছে। এটাকে তার ক্ষমতা-বহির্ভূত কাজ মনে করা এক চরম মূর্খতা।
৫৮

وَالۡبَلَدُ الطَّیِّبُ یَخۡرُجُ نَبَاتُہٗ بِاِذۡنِ رَبِّہٖ ۚ  وَالَّذِیۡ خَبُثَ لَا یَخۡرُجُ اِلَّا نَکِدًا ؕ  کَذٰلِکَ نُصَرِّفُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّشۡکُرُوۡنَ ٪ ٥٨

ওয়াল বালাদুততাইয়িবুইয়াখরুজুনাবা-তুহূবিইযনি রাব্বিহী ওয়াল্লাযী খাবুছা লাইয়াখরুজুইল্লা-নাকিদান; কাযা-লিকা নুসাররিফুল আ-য়া-তি লিকাওমিইঁ ইয়াশকুরুন।

আর যে ভূমি উৎকৃষ্ট, তার ফসল তার প্রতিপালকের হুকুমে উৎপন্ন হয় এবং যে ভূমি নষ্ট হয়ে গেছে, তাতে মন্দ ফসল ছাড়া কিছুই উৎপন্ন হয় না। ৩৯ এভাবেই আমি নিদর্শনসমূহ বিভিন্নভাবে বিবৃতি করি, সেই সব লোকের জন্য যারা মূল্যায়ন করে।

তাফসীরঃ

৩৯. এর ভেতর সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে যে, উৎকৃষ্ট জমির ফসলও যেমন উৎকৃষ্ট হয়, তেমনি যে সকল লোকের অন্তর উৎকৃষ্ট, অর্থাৎ তাতে সত্যের অনুসন্ধিৎসা আছে, তারা আল্লাহ তাআলার কালাম দ্বারা যথেষ্ট পরিমাণে উপকৃত হয়। অপর দিকে নিকৃষ্ট জমিতে বৃষ্টি পড়া সত্ত্বেও যেমন তা থেকে বিশেষ উপকারী ফসল লাভ করা যায় না, তেমনি যাদের অন্তর জেদ ও হঠকারিতার দোষে দূষিত হয়ে গেছে, আল্লাহ তাআলার কালাম দ্বারা তারা উপকার লাভ করতে পারে না।
৫৯

لَقَدۡ اَرۡسَلۡنَا نُوۡحًا اِلٰی قَوۡمِہٖ فَقَالَ یٰقَوۡمِ اعۡبُدُوا اللّٰہَ مَا لَکُمۡ مِّنۡ اِلٰہٍ غَیۡرُہٗ ؕ اِنِّیۡۤ اَخَافُ عَلَیۡکُمۡ عَذَابَ یَوۡمٍ عَظِیۡمٍ ٥٩

লাকাদ আরছালনা-নূহান ইলা-কাওমিহী ফাকা-লা ইয়া-কাওমি‘বুদুল্লা-হা মা-লাকুম মিন ইলা-হিন গাইরুহূ ইন্নীআখা-ফু‘আলাইকুম ‘আযা-বা ইয়াওমিন ‘আজীম।

আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। ৪০ সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়ের লোক! আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন মাবুদ নেই। নিশ্চয়ই আমি আশংকা করি, তোমাদের উপর এক মহা দিনের শাস্তি আপতিত হবে।

তাফসীরঃ

৪০. ইসরাঈলী বর্ণনা অনুযায়ী হযরত নূহ আলাইহিস সালাম হযরত আদম আলাইহিস সালামের ওফাতের এক হাজার বছরেরও কিছু বেশি কাল পর জন্মগ্রহণ করেন। বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কিরাম এ সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। তাদের দু’জনের মধ্যে ঠিক কত কালের ব্যবধান ছিল তা নিশ্চিতভাবে জানার কোনও উপায় নেই। কুরআন মাজীদ দ্বারা জানা যায়, এ দীর্ঘ কাল পরিক্রমায় মূর্তিপূজার ব্যাপক প্রচলন ঘটেছিল। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের কওমও বিভিন্ন রকম মূর্তি গড়ে নিয়েছিল। সূরা নূহে তাদের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আনকাবুতে (২৯ : ১৪) আছে, হযরত নূহ আলাইহিস সালাম তাদেরকে সাড়ে নয়শ’ বছর পর্যন্ত সত্যের পথে ডেকেছিলেন। তিনি সর্বপ্রকারেই তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। সামান্য সংখ্যক ভাগ্যবান সাথী তাঁর কথায় ঈমান এনেছিল, যাদের অধিকাংশই ছিল গরীব শ্রেণীর লোক। কওমের বেশির ভাগ লোকই কুফরের পথ ধরে রাখে। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম অবিরত তাদেরকে আল্লাহ তাআলার আযাব সম্পর্কে ভয় দেখাতে থাকেন, কিন্তু কোনও মতেই যখন তারা মানল না, পরিশেষে তিনি বদদোয়া করলেন। ফলে তাদেরকে এক ভয়াল বন্যায় নিমজ্জিত করা হয়। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের ঘটনা ও তার কওমের উপর আপতিত বন্যা সম্পর্কে সূরা হুদ (১১ : ২৫-৪৯) ও সূরা নূহে (সূরা নং ৭১) বিস্তারিত বিবরণ আসবে। তাছাড়া সূরা মুমিনুন (২৩ : ২৩), সূরা শুআরা (২৬ : ১০৫) সূরা কামারেও (৫৪ : ৯) তাদের ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। অন্যান্য স্থানে তাদের কেবল বরাত দেওয়া হয়েছে।
৬০

قَالَ الۡمَلَاُ مِنۡ قَوۡمِہٖۤ اِنَّا لَنَرٰىکَ فِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ ٦۰

কা-লাল মালাউ মিন কাওমিহীইন্না-লানারা-কা ফী দালা-লিম মুবীন।

তার সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গ বলল, আমরা তো নিশ্চিতরূপেই দেখছি, তুমি স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে লিপ্ত রয়েছ।
৬১

قَالَ یٰقَوۡمِ لَیۡسَ بِیۡ ضَلٰلَۃٌ وَّلٰکِنِّیۡ رَسُوۡلٌ مِّنۡ رَّبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ٦١

কা-লা ইয়া-কাওমি লাইছা বী দালা-লাতুওঁ ওয়া লা-কিন্নী রাছূলুম মির রাব্বিল ‘আ-লামীন।

নূহ উত্তর দিল, হে আমার সম্প্রদায়! কোনও বিভ্রান্তি আমাকে স্পর্শ করেনি। প্রকৃতপক্ষে আমি রাব্বুল আলামীনের প্রেরিত রাসূল।
৬২

اُبَلِّغُکُمۡ رِسٰلٰتِ رَبِّیۡ وَاَنۡصَحُ لَکُمۡ وَاَعۡلَمُ مِنَ اللّٰہِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ٦٢

উবালিলগুকুমরিাছা-লা-তি রাব্বি ওয়া আনসাহু লাকুমওয়াআ‘লামুমিনাল্লা-হি মা-লা তা‘লামূন।

আমি তোমাদের কাছে আমার প্রতিপালকের বাণী পৌঁছাই ও তোমাদের কল্যাণ কামনা করি। আল্লাহর পক্ষ হতে আমি এমন বিষয় জানি, যা তোমরা জান না।
৬৩

اَوَعَجِبۡتُمۡ اَنۡ جَآءَکُمۡ ذِکۡرٌ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ عَلٰی رَجُلٍ مِّنۡکُمۡ لِیُنۡذِرَکُمۡ وَلِتَتَّقُوۡا وَلَعَلَّکُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ ٦٣

আওয়া ‘আজিবতুমআনজাআকুমযিকরুম মির রাব্বিকুম‘আলা-রাজুলিম মিনকুম লিইউনযিরাকুম ওয়া লিতাত্তাকূওয়া লা‘আল্লাকুম তুরহামূন।

তবে কি তোমরা এই কারণে বিস্ময়বোধ করছ যে, তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের উপদেশ পৌঁছেছে তোমাদেরই মধ্যকার একজন লোকের মাধ্যমে, যাতে সে তোমাদেরকে সতর্ক করে এবং তোমরা (মন্দ কাজ থেকে) বেঁচে থাক, আর যাতে তোমাদের প্রতি (আল্লাহর) রহমত হয়?
৬৪

فَکَذَّبُوۡہُ فَاَنۡجَیۡنٰہُ وَالَّذِیۡنَ مَعَہٗ فِی الۡفُلۡکِ وَاَغۡرَقۡنَا الَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا ؕ  اِنَّہُمۡ کَانُوۡا قَوۡمًا عَمِیۡنَ ٪ ٦٤

ফাকাযযাবূহু ফাআনজাইনা-হু ওয়াল্লাযীনা মা‘আহূফিল ফুলকি ওয়া আগরাকনাল্লাযীনা কাযযাবূবিআ-য়া-তিনা- ইন্নাহুম কা-নূকাওমান ‘আমীন।

তথাপি তারা নূহকে মিথ্যাবাদী বলল। সুতরাং আমি তাকে ও তার সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল তাদেরকে রক্ষা ৪১ করি আর, যারা আমার নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছিল তাদেরকে নিমজ্জিত করি। নিশ্চয়ই তারা ছিল অন্ধ লোক।

তাফসীরঃ

৪১. নৌকা ও বন্যার পূর্ণ ঘটনা ইনশাআল্লাহ সূরা হুদে আসবে।
৬৫

وَاِلٰی عَادٍ اَخَاہُمۡ ہُوۡدًا ؕ قَالَ یٰقَوۡمِ اعۡبُدُوا اللّٰہَ مَا لَکُمۡ مِّنۡ اِلٰہٍ غَیۡرُہٗ ؕ اَفَلَا تَتَّقُوۡنَ ٦٥

ওয়া ইলা-‘আ-দিন আখা-হুম হূদান কা-লা ইয়া-কাওমি‘বুদুল্লা-হা মা-লাকুম মিন ইলাহিন গাইরুহূ আফালা-তাত্তাকূন।

আর আদ জাতির নিকট আমি তাদের ভাই হুদকে (পাঠাই)। ৪২ সে বলল, হে আমার কওম! আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন মাবুদ নেই। তবুও কি তোমরা (আল্লাহকে) ভয় করবে না?

তাফসীরঃ

৪২. আদ ছিল আরবদের প্রাথমিক যুগের একটি জাতি। হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের আনুমানিক দু’ হাজার বছর পূর্বে ইয়ামানের হাজরামাওত অঞ্চলে তাদের বসবাস ছিল। দৈহিক শক্তি ও পাথর-ছেদনশিল্পে তাদের বিশেষ খ্যাতি ছিল। কালক্রমে তারা মূর্তি বানিয়ে তার পূজা শুরু করে দেয়। দৈহিক শক্তির কারণেও তারা মদমত্ত হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে হযরত হুদ আলাইহিস সালামকে তাদের কাছে নবী বানিয়ে পাঠানো হল। তিনি অত্যন্ত দরদের সাথে নিজ কওমকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন এবং তাদের সামনে তাওহীদের শিক্ষা পেশ করে আল্লাহ তাআলার শোকরগোজার বান্দা হওয়ার আহ্বান জানালেন। কিন্তু সৎ স্বভাবের সামান্য কিছু লোক ছাড়া বাকি সকলে তার কথা প্রত্যাখ্যান করল। এ অবস্থায় প্রথমে তাদেরকে খরায় আক্রান্ত করা হল। হযরত হুদ আলাইহিস সালাম তাদেরকে বললেন, এর দ্বারা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তোমাদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে। এখনও যদি তোমরা তোমাদের অসৎ কর্ম ছেড়ে দাও, তবে আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করবেন (১১ : ৫২)। কিন্তু কওমের উপর এ কথার কোন আছর হল না। উত্তরোত্তর তারা কুফর ও শিরকের পথেই এগিয়ে চলল। পরিশেষে তাদের প্রতি প্রচণ্ড ঝড়-ঝঞ্ঝা পাঠানো হল। এ আযাব একাধারে আট দিন তাদের উপর প্রবাহিত থাকল এবং তাতে গোটা কওম ধ্বংস হয়ে গেল। এ জাতির ঘটনা আলোচ্য সূরা ছাড়াও সূরা হুদ (১১ : ৫০-৮৯), সূরা মুমিনুন (২৩ : ৩২), সূরা শুআরা (২৬ : ১২৪), সূরা হা-মীম-সাজদা (৪১ : ১৫), সূরা আহকাফ (৪৬ : ২১), সূরা কামার (৫৪ : ১৮), সূরা হাক্কা (৬৯ : ৬) ও সূরা ফাজরে (৮৯ : ৬) বর্ণিত হয়েছে। ইনশাআল্লাহ এসব সূরায় তাদের ঘটনার বিভিন্ন দিক বিস্তারিত আসবে।
৬৬

قَالَ الۡمَلَاُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡ قَوۡمِہٖۤ اِنَّا لَنَرٰىکَ فِیۡ سَفَاہَۃٍ وَّاِنَّا لَنَظُنُّکَ مِنَ الۡکٰذِبِیۡنَ ٦٦

কা-লাল মালাউল্লাযীনা কাফারূমিন কাওমিহী-ইন্না-লানারা-কা ফী ছাফা-হাতিওঁ ওয়া ইন্নালানাজুন্নুকা মিনাল কা-যিবীন।

তার সম্প্রদায়ের যে সর্দারগণ কুফর অবলম্বন করেছিল, তারা বলল, আমরা তো নিশ্চিতভাবে তোমাকে নির্বুদ্ধিতার ভেতর দেখছি এবং নিশ্চয়ই আমাদের ধারণা, তুমি একজন মিথ্যুক লোক।
৬৭

قَالَ یٰقَوۡمِ لَیۡسَ بِیۡ سَفَاہَۃٌ وَّلٰکِنِّیۡ رَسُوۡلٌ مِّنۡ رَّبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ٦٧

কা-লা ইয়া-কাওমি লাইছা বী ছাফা-হাতুওঁ ওয়া লা-কিন্নী রাছূলুম মিররাব্বিল ‘আ-লামীন।

হুদ বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমার কোনও নির্বুদ্ধিতা দেখা দেয়নি। বরং আমি রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে প্রেরিত রাসূল।
৬৮

اُبَلِّغُکُمۡ رِسٰلٰتِ رَبِّیۡ وَاَنَا لَکُمۡ نَاصِحٌ اَمِیۡنٌ ٦٨

উবালিলগুকুম রিছা-লা-তি রাববী ওয়া আনা-লাকুম না-সিহুন আমীন।

আমি তোমাদের কাছে আমার প্রতিপালকের বার্তাসমূহ পৌঁছিয়ে থাকি এবং আমি তোমাদের এক বিশ্বস্ত কল্যাণকামী।
৬৯

اَوَعَجِبۡتُمۡ اَنۡ جَآءَکُمۡ ذِکۡرٌ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ عَلٰی رَجُلٍ مِّنۡکُمۡ لِیُنۡذِرَکُمۡ ؕ وَاذۡکُرُوۡۤا اِذۡ جَعَلَکُمۡ خُلَفَآءَ مِنۡۢ بَعۡدِ قَوۡمِ نُوۡحٍ وَّزَادَکُمۡ فِی الۡخَلۡقِ بَصۜۡطَۃً ۚ فَاذۡکُرُوۡۤا اٰلَآءَ اللّٰہِ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ ٦٩

আওয়া ‘আজিবতুম আন জাআকুম যিকরুম মিররাব্বিকুম ‘আলা-রাজুলিম মিনকুম লিইউনযিরাকুম ওয়াযকুরূইযজা‘আলাকুম খুলাফাআ মিম বা‘দি কাওমি নূহিওঁ ওয়া ঝা-দাকুম ফিল খালকিবাছতাতান ফাযকুরূআ-লাআল্লা-হি লা‘আল্লাকুম তুফলিহূন।

তবে কি তোমরা এ কারণে বিস্ময়বোধ করছ যে, তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের উপদেশ পৌঁছেছে তোমাদেরই মধ্যকার একজন লোকের মাধ্যমে, যাতে সে তোমাদেরকে সতর্ক করে? তোমরা সেই সময়কে স্মরণ কর, যখন তিনি নূহের সম্প্রদায়ের পর তোমাদেরকে (তাদের) স্থলাভিষিক্ত করেছেন এবং শারীরিকভাবে তোমাদেরকে (অন্যদের অপেক্ষা) বাড়-বাড়ন্ত রেখেছেন। ৪৩ সুতরাং তোমরা তাঁর নিয়ামতসমূহ স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলতা লাভ কর।

তাফসীরঃ

৪৩. তারা এত লম্বা-চওড়া দেহের অধিকারী ছিল যে, সূরা ফাজরে (৮৯ : ৬) আল্লাহ তাআলা বলেন, তাদের মত জাতি কখনও কোনও দেশে জন্ম নেয়নি।
৭০

قَالُوۡۤا اَجِئۡتَنَا لِنَعۡبُدَ اللّٰہَ وَحۡدَہٗ وَنَذَرَ مَا کَانَ یَعۡبُدُ اٰبَآؤُنَا ۚ فَاۡتِنَا بِمَا تَعِدُنَاۤ اِنۡ کُنۡتَ مِنَ الصّٰدِقِیۡنَ ٧۰

কা-লূআজি’তানা-লিনা‘বুদাল্লা-হা ওয়াহদাহূওয়া নাযারা মা-কা-না ইয়া‘বুদুআবাউনা- ফা’তিনা-বিমা-তা‘ইদুনা-ইন কুনতা মিনাসসা-দিকীন।

তারা বলল, তুমি কি এজন্যই আমাদের কাছে এসেছ যে, আমরা যেন শুধু আল্লাহরই ইবাদত করি এবং আমাদের বাপ-দাদাগণ যাদের (যে মূর্তিদের) ইবাদত করত, তাদেরকে ত্যাগ করি? ঠিক আছে, তুমি যদি সত্যবাদী হও, তবে তুমি আমাদেরকে যে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ, তা আমাদের সামনে উপস্থিত কর।
৭১

قَالَ قَدۡ وَقَعَ عَلَیۡکُمۡ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ رِجۡسٌ وَّغَضَبٌ ؕ اَتُجَادِلُوۡنَنِیۡ فِیۡۤ اَسۡمَآءٍ سَمَّیۡتُمُوۡہَاۤ اَنۡتُمۡ وَاٰبَآؤُکُمۡ مَّا نَزَّلَ اللّٰہُ بِہَا مِنۡ سُلۡطٰنٍ ؕ فَانۡتَظِرُوۡۤا اِنِّیۡ مَعَکُمۡ مِّنَ الۡمُنۡتَظِرِیۡنَ ٧١

কা-লা কাদ ওয়াকা‘আ ‘আলাইকুম মির রাব্বিকুম রিজছুওঁ ওয়া গাদাবুন আতুজাদিলুনানী ফীআছমাইন; ছাম্মাইতুমূহাআনতুম ওয়া আ-বাউকুম মা-নাঝঝালাল্লা-হু বিহামিন ছুলতা-নিন ফানতাজিরূইন্নী মা‘আকুম মিনাল মুনতাজিরীন।

হুদ বলল, তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে শাস্তি ও ক্রোধ অবধারিত হয়ে গেছে। তোমরা কি আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হচ্ছ এমন কতগুলো (মূর্তির) নাম সম্বন্ধে, যা তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদাগণ রেখে দিয়েছ, যার সমর্থনে আল্লাহ কোনও প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি? সুতরাং তোমরা অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করছি।
৭২

فَاَنۡجَیۡنٰہُ وَالَّذِیۡنَ مَعَہٗ بِرَحۡمَۃٍ مِّنَّا وَقَطَعۡنَا دَابِرَ الَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَمَا کَانُوۡا مُؤۡمِنِیۡنَ ٪ ٧٢

ফাআনজাইনা-হুওয়াল্লাযীনা মা‘আহূবিরাহমাতিম মিন্না-ওয়া কাতা‘না-দা-বিরাল্লাযীনা কাযযাবূবিআ-য়া-তিনা-ওয়ামা-কা-নূমু’মিনীন।

সুতরাং আমি তাকে (হুদ আলাইহিস সালামকে) ও তার সঙ্গীদেরকে নিজ দয়ায় রক্ষা করলাম; আর যারা আমার নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছিল ও যারা মুমিন ছিল না, তাদেরকে নির্মূল করলাম।
৭৩

وَاِلٰی ثَمُوۡدَ اَخَاہُمۡ صٰلِحًا ۘ قَالَ یٰقَوۡمِ اعۡبُدُوا اللّٰہَ مَا لَکُمۡ مِّنۡ اِلٰہٍ غَیۡرُہٗ ؕ قَدۡ جَآءَتۡکُمۡ بَیِّنَۃٌ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ ؕ ہٰذِہٖ نَاقَۃُ اللّٰہِ لَکُمۡ اٰیَۃً فَذَرُوۡہَا تَاۡکُلۡ فِیۡۤ اَرۡضِ اللّٰہِ وَلَا تَمَسُّوۡہَا بِسُوۡٓءٍ فَیَاۡخُذَکُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ٧٣

ওয়া ইলা-ছামূদাআখা-হুম সা-লিহা- । কা-লা ইয়া-কাওমি‘বুদুল্লা-হা মা-লাকুম মিন ইলা-হিন গাইরুহূ কাদ জাআতকুম বাইয়িনাতুম মির রাব্বিকুম; হা-যিহী নাকাতুল্লা-হি লাকুম আ-য়াতান ফাযারূহা-তা’কুল ফী-আরদিল্লা-হি ওয়ালা-তামাছছূহাবিছূইন ফাইয়া’খুযাকুম ‘আযা-বুন আলীম।

আর ছামুদ জাতির কাছে তাদের ভাই সালিহকে ৪৪ (পাঠাই)। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনও মাবুদ নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এক উজ্জ্বল প্রমাণ এসে গেছে। এটা আল্লাহর উটনী, যা তোমাদের জন্য একটি নিদর্শনস্বরূপ। সুতরাং তোমরা এটিকে স্বাধীনভাবে আল্লাহর জমিতে (চরে) খেতে দাও এবং একে কোন মন্দ ইচ্ছায় স্পর্শ করো না। পাছে কোনও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তোমাদের পাকড়াও করে।

তাফসীরঃ

৪৪. ছামুদও ছিল আদ জাতিরই বংশধর। দৃশ্যত হযরত হুদ আলাইহিস সালাম ও তাঁর যে সকল সঙ্গী আযাব থেকে রক্ষা পেয়েছিল, এরা তাদেরই আওলাদ ছিল। ছামুদ তাদের ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষের নাম। তাই এ জাতিকে দ্বিতীয় আদও বলা হয়ে থাকে। আরব ও শামের মধ্যবর্তী যে অঞ্চলকে তখন ‘হিজর’ বলা হত এবং বর্তমানে ‘মাদাইনে সালিহ’ বলা হয়, এ সম্প্রদায় সেখানেই বাস করত। এখনও সে অঞ্চলে তাদের ঘর-বাড়ির ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে। ৭৪ নং আয়াতে তাদের পাহাড় কেটে নির্মিত যে ইমারতের কথা বর্ণিত হয়েছে আজও তার ধ্বংসাবশেষ লক্ষ্য করা যায়। আরবের মুশরিকগণ বাণিজ্য উপলক্ষে যখন সিরিয়া অঞ্চলে যেত, এই উপদেশমূলক ধ্বংসাবশেষ তখন তাদের পথে পড়ত। কুরআন মাজীদের কয়েক স্থানে সেদিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এ সম্প্রদায়ের ভেতর কালক্রমে মূর্তিপূজার প্রচলন ঘটেছিল এবং এর ফলে তাদের সমাজে নানা রকম অন্যায়-অপরাধ বিস্তার লাভ করেছিল। হযরত সালিহ আলাইহিস সালাম ছিলেন এ জাতিরই একজন লোক। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সঠিক পথ দেখানোর লক্ষ্যে তাকে নবী করে পাঠান। কিন্তু এক্ষেত্রেও সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটল। কওমের অধিকাংশ লোকই তার কথা প্রত্যাখ্যান করল। হযরত সালিহ আলাইহিস সালাম যৌবন থেকে বৃদ্ধকাল পর্যন্ত ক্রমাগত তাদের মধ্যে তাবলীগের কাজ করে যেতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তারা দাবী করল, আপনি যদি সত্যিই নবী হয়ে থাকেন, তবে আপনি এই পাহাড় থেকে কোনও উটনী বের করে আমাদের সামনে উপস্থিত করুন। এটা করতে পারলে আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনব। হযরত সালিহ আলাইহিস সালাম দোয়া করলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়ায় পাহাড় থেকে একটি উটনী বের করে দেখালেন। তা দেখে কিছু লোক তো ঈমান আনল, কিন্তু তাদের বড় বড় সর্দার কথা রাখল না। তারা যে তাদের জেদ বজায় রাখল তাই নয়, বরং অন্য যেসব লোক ঈমান আনতে ইচ্ছুক ছিল তাদেরকেও নিবৃত্ত করল। হযরত সালিহ আলাইহিস সালামের আশংকা হল, ওয়াদা ভঙ্গের কারণে তাদের উপর আল্লাহ তাআলার কোন আযাব এসে যেতে পারে। তাই তাদেরকে বললেন, তোমরা অন্ততপক্ষে এই উটনীটির কোনও ক্ষতি করো না। তাকে স্বাধীনভাবে চলে-ফিরে খেতে দাও। উটনীটির পূর্ণ এক কুয়া পানি দরকার হত। তাই তিনি পালা বণ্টন করে দিলেন যে, একদিন উটনীটি পানি পান করবে এবং একদিন এলাকার লোকে। কিন্তু কওমের লোক গোপনে চক্রান্ত করল। তারা ঠিক করল উটনীটিকে হত্যা করবে। পরিশেষে ‘কুদার’ নামক এক ব্যক্তি সেটিকে হত্যা করল। এ অবস্থায় হযরত সালিহ আলাইহিস সালাম তাদেরকে সতর্ক করে দিলেন যে, এখন শাস্তি আসতে মাত্র তিন দিন বাকি আছে। অতঃপর তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। কোনও কোনও রিওয়ায়াতে আরও আছে, তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, যে, এই তিন দিনের প্রতিদিন তাদের চেহারার রং পরিবর্তন হতে থাকবে। প্রথম দিন চেহারার রং হবে হলুদ, দ্বিতীয় দিন লাল এবং তৃতীয় দিন সম্পূর্ণ কালো হয়ে যাবে। এতদসত্ত্বেও জেদী সম্প্রদায়টি তাওবা ও ইস্তিগফারে রত হল না; বরং তারা হযরত সালিহ আলাইহিস সালামকেই হত্যা করার ষড়যন্ত্র আঁটল, যা সূরা নামলে (২৭ : ৪৮) বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পথেই ধ্বংস করে দেন। ফলে তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়। অন্য দিকে হযরত সালিহ আলাইহিস সালাম যেমন বলেছিলেন, সেভাবেই তাদের তিন দিন কাটে। এ অবস্থায়ই প্রচণ্ড ভূমিকম্প শুরু হয়ে যায়। সেই সাথে আসমান থেকে এক ভয়াল শব্দ আসতে থাকে এবং তাতে গোটা সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে যায়। হযরত সালিহ আলাইহিস সালাম ও তার সম্প্রদায়ের ঘটনা বিস্তারিতভাবে সূরা হুদ (১১ : ৬১), সূরা শুআরা (২৬ : ১৪১), সূরা নামল (২৭ : ৪৫) ও সূরা কামারে (৫৪ : ২৩) বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া সূরা হিজর, সূরা যারিয়াত, সূরা নাজম, সূরা হাক্কা ও সূরা শামসেও তাদের অবস্থা সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে।
৭৪

وَاذۡکُرُوۡۤا اِذۡ جَعَلَکُمۡ خُلَفَآءَ مِنۡۢ بَعۡدِ عَادٍ وَّبَوَّاَکُمۡ فِی الۡاَرۡضِ تَتَّخِذُوۡنَ مِنۡ سُہُوۡلِہَا قُصُوۡرًا وَّتَنۡحِتُوۡنَ الۡجِبَالَ بُیُوۡتًا ۚ فَاذۡکُرُوۡۤا اٰلَآءَ اللّٰہِ وَلَا تَعۡثَوۡا فِی الۡاَرۡضِ مُفۡسِدِیۡنَ ٧٤

ওয়াযকুরূ ইযজা‘আলাকুম খুলাফাআ মিম বা‘দি ‘আ-দিওঁ ওয়া বাওওয়াআকুম ফিল আরদিতাত্তাখিযূনা মিন ছুহূলিহা-কুসূরাওঁ ওয়া তানহিতূনাল জিবা-লা বুইয়ূতান ফাযকুরূআ-লাআল্লা-হি ওয়ালা-তা‘ছাও ফিল আরদিমুফছিদীন।

স্মরণ কর, যখন আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে (তাদের) স্থলাভিষিক্ত করেন এবং যমীনে তোমাদেরকে এভাবে প্রতিষ্ঠা দান করেন যে, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ করছ ও পাহাড় কেটে গৃহের মত তৈরি করছ। সুতরাং আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ কর এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে বেড়িয়ো না।
৭৫

قَالَ الۡمَلَاُ الَّذِیۡنَ اسۡتَکۡبَرُوۡا مِنۡ قَوۡمِہٖ لِلَّذِیۡنَ اسۡتُضۡعِفُوۡا لِمَنۡ اٰمَنَ مِنۡہُمۡ اَتَعۡلَمُوۡنَ اَنَّ صٰلِحًا مُّرۡسَلٌ مِّنۡ رَّبِّہٖ ؕ قَالُوۡۤا اِنَّا بِمَاۤ اُرۡسِلَ بِہٖ مُؤۡمِنُوۡنَ ٧٥

কা-লাল মালাউল্লাযীনাছ তাকবারূমিন কাওমিহী লিল্লাযীনাছ তুদ‘ইফূলিমান আ-মানা মিনহুম আতা‘লামূনা আন্না সা-লিহাম মুরছালুম মিররাব্বিহী কালূইন্না-বিমাউরছিলা বিহী মু’মিনূন।

তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক নেতৃবর্গ, যে সকল দুর্বল লোক ঈমান এনেছিল, তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কি এটা বিশ্বাস কর যে, সালিহ নিজ প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রেরিত রাসূল? তারা বলল, নিশ্চয়ই আমরা তো তাঁর মাধ্যমে প্রেরিত বানীতে ঈমান রাখি।
৭৬

قَالَ الَّذِیۡنَ اسۡتَکۡبَرُوۡۤا اِنَّا بِالَّذِیۡۤ اٰمَنۡتُمۡ بِہٖ کٰفِرُوۡنَ ٧٦

কা-লাল্লাযীনাছতাকবারূইন্না-বিল্লাযীআ-মানতুম বিহী কা-ফিরূন।

সেই দাম্ভিক লোকেরা বলল, তোমরা যে বাণীতে ঈমান এনেছ আমরা তো তা প্রত্যাখ্যান করি।
৭৭

فَعَقَرُوا النَّاقَۃَ وَعَتَوۡا عَنۡ اَمۡرِ رَبِّہِمۡ وَقَالُوۡا یٰصٰلِحُ ائۡتِنَا بِمَا تَعِدُنَاۤ اِنۡ کُنۡتَ مِنَ الۡمُرۡسَلِیۡنَ ٧٧

ফা‘আকারুন্না-কাতা ওয়া‘আতাও ‘আন আমরি রব্বিহিম ওয়া কা-লূইয়া-সা-লিহু’তিনাবিমা-তা‘ইদুনাইন কুনতা মিনাল মুরছালীন।

সুতরাং তারা উটনীটি মেরে ফেলল ও তাদের প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করল এবং বলল, সালিহ! সত্যিই তুমি নবী হয়ে থাকলে আমাদেরকে যার (যে শাস্তির) ভয় দেখাচ্ছ, তা আমাদের কাছে নিয়ে এসো।
৭৮

فَاَخَذَتۡہُمُ الرَّجۡفَۃُ فَاَصۡبَحُوۡا فِیۡ دَارِہِمۡ جٰثِمِیۡنَ ٧٨

ফাআখাযাতহুমুররাজফাতুফাআসবাহূফী দা-রিহিম জা-ছিমীন।

পরিণামে তারা ভূমিকম্পে আক্রান্ত হল এবং তারা নিজ-নিজ বাড়িতে অধঃমুখে পড়ে থাকল।
৭৯

فَتَوَلّٰی عَنۡہُمۡ وَقَالَ یٰقَوۡمِ لَقَدۡ اَبۡلَغۡتُکُمۡ رِسَالَۃَ رَبِّیۡ وَنَصَحۡتُ لَکُمۡ وَلٰکِنۡ لَّا تُحِبُّوۡنَ النّٰصِحِیۡنَ ٧٩

ফাতাওয়াল্লা-‘আনহুম ওয়া কা-লা ইয়া-কাওমি লাকাদ আবলাগতুকুমরিছা-লাতা রাববী ওয়া নাসাহতুলাকুম ওয়ালা-কিল লা-তুহিববূনান না-সিহীন।

অতঃপর সালিহ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল এবং বলতে লাগল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের কাছে আমার প্রতিপালকের বাণী পৌঁছিয়েছিলাম এবং তোমাদের কল্যাণ কামনা করেছিলাম, কিন্তু (আফসোস!) তোমরা কল্যাণকামীদেরকে পছন্দ কর না।
৮০

وَلُوۡطًا اِذۡ قَالَ لِقَوۡمِہٖۤ اَتَاۡتُوۡنَ الۡفَاحِشَۃَ مَا سَبَقَکُمۡ بِہَا مِنۡ اَحَدٍ مِّنَ الۡعٰلَمِیۡنَ ٨۰

ওয়া লূতান ইযকা-লা লিকাওমিহীআতা’তূনাল ফা-হিশাতা মা-ছাবাকাকুমবিহা-মিন আহাদিম মিনাল ‘আল-লামীন।

এবং লুতকে (পাঠালাম)। ৪৫ যখন সে নিজ সম্প্রদায়কে বলল, তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের আগে সারা বিশ্বে কেউ করেনি?

তাফসীরঃ

৪৫. হযরত লুত আলাইহিস সালাম ছিলেন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ভাতিজা। মহান চাচার মত তিনিও ইরাকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন ইরাক থেকে হিজরত করেন, তখন তিনিও তাঁর সাথে দেশ ত্যাগ করেছিলেন। অতঃপর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তো ফিলিস্তিন অঞ্চলে বসত গ্রহণ করেছিলেন। আর আল্লাহ তাআলা হযরত লুত আলাইহিস সালামকে জর্ডানের সাদূম (Sodom) এলাকায় নবী করে পাঠান। সাদূম ছিল একটি কেন্দ্রীয় নগর। আমূরা প্রভৃতি জনপদ তার আওতাধীন ছিল। এসব জনপদের লোকজন একটি নির্লজ্জ কুকর্মে লিপ্ত ছিল। তারা সমকাম (Homosexsuality) করত। কুরআন মাজীদের বর্ণনা অনুযায়ী এ রকম অভিশপ্ত কাজ তাদের আগে দুনিয়ায় আর কেউ কখনও করেনি। হযরত লুত আলাইহিস সালাম তাদের কাছে আল্লাহ তাআলার বিধানাবলী পৌঁছালেন এবং তাঁর শাস্তি সম্পর্কেও সতর্ক করলেন, কিন্তু তারা কিছুতেই নিজেদের নির্লজ্জতা পরিত্যাগ করতে রাজি হল না। পরিশেষে তাদের উপর পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করা হল এবং গোটা জনপদটিকে উল্টিয়ে দেওয়া হল। বর্তমানে মৃত সাগর (Dead Sea) নামে যে প্রসিদ্ধ সাগর আছে, বলা হয়ে থাকে সে জনপদটি এর ভেতর তলিয়ে গেছে অথবা তা এর আশপাশেই ছিল, কিন্তু তার কোনও চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। এ সম্প্রদায়ের সাথে হযরত লুত আলাইহিস সালামের কোন বংশীয় সম্পর্ক ছিল না। তবুও এ আয়াতে তাদেরকে তার কওম বলা হয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা ছিল তার উম্মত এবং তাদের কাছে তাঁকে নবী করে পাঠানো হয়েছিল। তাদের ঘটনা সর্বাপেক্ষা বিস্তারিত পাওয়া যায় সূরা হুদে (১১ : ৬৯-৮৩)। তাছাড়া সূরা হিজর (১৫ : ৫২-৮৪), শুআরা (২৬ : ১৬০-১৭৪) ও আনকাবূতেও (২৯ : ২৬-৩৫) তাদের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। সূরা যারিয়াত (৫১ : ২৪-৩৭) ও সূরা তাহরীমেও (৬৬ : ১০) তাদের বরাত দেওয়া হয়েছে।
৮১

اِنَّکُمۡ لَتَاۡتُوۡنَ الرِّجَالَ شَہۡوَۃً مِّنۡ دُوۡنِ النِّسَآءِ ؕ بَلۡ اَنۡتُمۡ قَوۡمٌ مُّسۡرِفُوۡنَ ٨١

ইন্নাকুম লাতা’তূনার রিজা-লা শাহওয়াতাম মিন দূ নিন নিছাই বাল আনতুম কাওমুম মুছরিফূন।

তোমরা কামেচ্ছা পূরণের জন্য নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষের কাছে গিয়ে থাক (আর এটা তো কোনও আকস্মিক ব্যাপার নয়;) বরং তোমরা এক সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।
৮২

وَمَا کَانَ جَوَابَ قَوۡمِہٖۤ اِلَّاۤ اَنۡ قَالُوۡۤا اَخۡرِجُوۡہُمۡ مِّنۡ قَرۡیَتِکُمۡ ۚ اِنَّہُمۡ اُنَاسٌ یَّتَطَہَّرُوۡنَ ٨٢

ওয়া মা-কা-না জাওয়া-বা কাওমিহীইল্লাআন কা-লূআখরিজূহুম মিন কারইয়াতিকুম ইন্নাহুম উনা-ছুইঁ ইয়াতাতাহহারূন।

তার সম্প্রদায়ের উত্তর ছিল কেবল এই বলা যে, ‘এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক, যারা বড় পবিত্র থাকতে চায়।
৮৩

فَاَنۡجَیۡنٰہُ وَاَہۡلَہٗۤ اِلَّا امۡرَاَتَہٗ ۫ۖ کَانَتۡ مِنَ الۡغٰبِرِیۡنَ ٨٣

ফাআনজাইনা-হু ওয়া আহলাহূইল্লামরাআতাহূ কা-নাত মিনাল গা-বিরীন।

পরিণামে আমি তাকে (অর্থাৎ লুত আলাইহিস সালামকে) ও তার পরিবারবর্গকে (জনপদ থেকে বের করে) রক্ষা করলাম, তবে তার স্ত্রী ছাড়া। সে অবশিষ্ট লোকদের মধ্যে শামিল থাকল (যারা আযাবের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়)।
৮৪

وَاَمۡطَرۡنَا عَلَیۡہِمۡ مَّطَرًا ؕ  فَانۡظُرۡ کَیۡفَ کَانَ عَاقِبَۃُ الۡمُجۡرِمِیۡنَ ٪ ٨٤

ওয়া আমতারনা-‘আলাইহিম মাতারান ফানজু র কাইফা কা-না ‘আ-কিবাতুল মুজ রিমীন।

আর আমি তাদের উপর (পাথরের) প্রচণ্ড বৃষ্টি বর্ষণ করলাম। সুতরাং দেখ, সে অপরাধীদের পরিণাম কেমন (ভয়াবহ) হয়েছিল।
৮৫

وَاِلٰی مَدۡیَنَ اَخَاہُمۡ شُعَیۡبًا ؕ  قَالَ یٰقَوۡمِ اعۡبُدُوا اللّٰہَ مَا لَکُمۡ مِّنۡ اِلٰہٍ غَیۡرُہٗ ؕ  قَدۡ جَآءَتۡکُمۡ بَیِّنَۃٌ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ فَاَوۡفُوا الۡکَیۡلَ وَالۡمِیۡزَانَ وَلَا تَبۡخَسُوا النَّاسَ اَشۡیَآءَہُمۡ وَلَا تُفۡسِدُوۡا فِی الۡاَرۡضِ بَعۡدَ اِصۡلَاحِہَا ؕ  ذٰلِکُمۡ خَیۡرٌ لَّکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ۚ ٨٥

ওয়া ইলা-মাদইয়ানা আখা-হুম শু‘আইবান কা-লা ইয়া-কাওমি‘বুদুল্লা-হা মা-লাকুম মিন ইলা-হিন গাইরুহূ কাদ জাআতকুম বাইয়িনাতুম মিররাব্বিকুম ফাআওফুল কাইলা ওয়াল মীঝা-না ওয়ালা-তাবখাছুন্না-ছা আশইয়াআহুম ওয়ালা-তুফছিদূফিল আরদিবা‘দা ইসলা-হিহা- যা-লিকুম খাইরুল্লাকুম ইন কুনতুম মু’মিনীন।

আর মাদয়ানের কাছে তাদের ভাই শুআইবকে ৪৬ (পাঠালাম)। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন মাবুদ নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে স্পষ্ট প্রমাণ এসে গেছে। সুতরাং মাপ ও ওজন ঠিকভাবে দিবে ও মানুষের মালিকানাধীন বস্তুসমূহে তাদের অধিকার খর্ব করবে না ৪৭ আর দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর অশান্তি বিস্তার করবে না। ৪৮ এটাই তোমাদের পক্ষে কল্যাণকর পথ যদি তোমরা (আমার কথা) মেনে নাও।

তাফসীরঃ

৪৬. মাদয়ান একটি গোত্রের নাম। এ নামে একটি জনপদও ছিল, যেখানে হযরত শুআইব আলাইহিস সালামকে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর আমল ছিল হযরত মূসা আলাইহিস সালামের সামান্য আগে। কোনও কোনও বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, তিনিই হযরত মূসা আলাইহিস সালামের শ্বশুর ছিলেন। মাদয়ান ছিল একটি সবুজ-শ্যামল এলাকা। লোকজন বড় সচ্ছল ও সমৃদ্ধশালী ছিল। কালক্রমে তাদের মধ্যে কুফর ও শিরকসহ বহু দুষ্কর্ম চালু হয়ে যায়। তারা মাপজোখে হেরফের করত। তাদের মধ্যে যাদের পেশিশক্তি ছিল, তারা পথে-পথে টোল বসিয়ে পথচারীদের থেকে জোরপূর্বক কর আদায় করত। অনেকে ডাকাতিও করত। তাছাড়া যাদেরকে দেখত, হযরত শুআইব আলাইহিস সালামের কাছে যাওয়া আসা করে তাদেরকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করত ও তাদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন করত। সামনে দুই আয়াতে তাদের দুষ্কর্মের বর্ণনা আসছে। হযরত শুআইব আলাইহিস সালামকে তাদের কাছে নবী করে পাঠান হল। তিনি বিভিন্ন পন্থায় তাদেরকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে বক্তৃতা-বিবৃতির বিশেষ যোগ্যতা দান করেছিলেন, এ কারণেই তিনি খাতীবুল আম্বিয়া (নবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম বাগ্মী) উপাধিতে খ্যাত। কিন্তু নিজ কওমের উপর তার হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতার কোনও আছর হল না। পরিশেষে তারা আল্লাহ তাআলার আযাবের নিশানা হয়ে গেল। হযরত শুআইব আলাইহিস সালাম ও তার সম্প্রদায়ের ঘটনা সর্বাপেক্ষা বিস্তারিতভাবে সূরা হুদে (১১ : ৮৪-৯৫) বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া সূরা শুআরা (২৬ : ১৭৭) ও সূরা আনকাবুতে (২৯ : ৩৬) তাদের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। সূরা হিজরে (১৫ : ৭৮) সংক্ষেপে তাদের বরাত দেওয়া হয়েছে।
৮৬

وَلَا تَقۡعُدُوۡا بِکُلِّ صِرَاطٍ تُوۡعِدُوۡنَ وَتَصُدُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ مَنۡ اٰمَنَ بِہٖ وَتَبۡغُوۡنَہَا عِوَجًا ۚ وَاذۡکُرُوۡۤا اِذۡ کُنۡتُمۡ قَلِیۡلًا فَکَثَّرَکُمۡ ۪ وَانۡظُرُوۡا کَیۡفَ کَانَ عَاقِبَۃُ الۡمُفۡسِدِیۡنَ ٨٦

ওয়ালা-তাক‘উদূবিকুল্লি সিরা-তিন তূ‘ইদূ না ওয়া তাসূদ্দূনা ‘আন ছাবীলিল্লা-হি মান আমানা বিহী ওয়া তাবগূনাহা-‘ইওয়াজাওঁ ওয়াযকুরূইযকুনতুম কালীলান ফাকাছছারাকুম ওয়ানজু রূকাইফা কা-না ‘আ-কিবাতুল মুফছিদীন।

(মানুষকে) ধমকানোর জন্য এবং যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে তাদেরকে আল্লাহর পথে বাধা দান ও তাতে বক্রতা সন্ধানের উদ্দেশ্যে পথে-ঘাটে বসে থাকবে না। স্মরণ কর, যখন তোমরা অল্প ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের সমৃদ্ধি দিলেন ৪৯ এবং লক্ষ্য কর, অশান্তি সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কী হয়েছে।

তাফসীরঃ

৪৯. এর দ্বারা জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য উভয়ই বোঝানো হয়েছে।
৮৭

وَاِنۡ کَانَ طَآئِفَۃٌ مِّنۡکُمۡ اٰمَنُوۡا بِالَّذِیۡۤ اُرۡسِلۡتُ بِہٖ وَطَآئِفَۃٌ لَّمۡ یُؤۡمِنُوۡا فَاصۡبِرُوۡا حَتّٰی یَحۡکُمَ اللّٰہُ بَیۡنَنَا ۚ وَہُوَ خَیۡرُ الۡحٰکِمِیۡنَ ٨٧

ওয়া ইন কা-না তাইফাতুম মিনকুম আ-মানূবিল্লাযীউরছিলতুবিহী ওয়া তাইফাতুল লাম ইউ’মিনূফাসবিরূহাত্তা-ইয়াহকুমাল্লা-হু বাইনানা- ওয়া হুওয়া খাইরুল হাকিমীন।

আমার মাধ্যমে যা পাঠানো হয়েছে, তাতে যদি তোমাদের এক দল ঈমান আনে এবং অন্য দল ঈমান না আনে, তবে সবর কর, যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেন। ৫০ আর তিনি শ্রেষ্ঠতম ফায়সালাকারী।

তাফসীরঃ

৫০. প্রকৃতপক্ষে এটা তাদের একটি কথার উত্তর। তারা বলত, আমরা তো মুমিন ও কাফেরদের মধ্যে কোনও পার্থক্য দেখতে পাচ্ছি না। যারা ঈমান আনেনি, তারাও সুখণ্ডসাচ্ছন্দ্যের ভেতর জীবন যাপন করছে। তাদের পথ যদি আল্লাহর পছন্দ না হত, তবে তাদেরকে তিনি এমন সুখের জীবন দেবেন কেন? উত্তর দেওয়া হয়েছে যে, বর্তমানের সুখণ্ডসমৃদ্ধি দেখে এই ধোঁকায় পড়া উচিত নয় যে, অবস্থা সর্বদা এমনই থাকবে। আগামীতে আল্লাহ তাআলার ফায়সালা কী হয় সেই অপেক্ষা কর।
৮৮

قَالَ الۡمَلَاُ الَّذِیۡنَ اسۡتَکۡبَرُوۡا مِنۡ قَوۡمِہٖ لَنُخۡرِجَنَّکَ یٰشُعَیۡبُ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مَعَکَ مِنۡ قَرۡیَتِنَاۤ اَوۡ لَتَعُوۡدُنَّ فِیۡ مِلَّتِنَا ؕ  قَالَ اَوَلَوۡ کُنَّا کٰرِہِیۡنَ ۟ ٨٨

কা-লাল মালউল্লাযীনাছ তাকবারূমিন কাওমিহী লানুখরিজান্নাকা ইয়া-শু‘আইবুওয়াল্লাযীনা আ-মানূমা‘আকা মিন কারইয়াতিনা-আও লাতা‘ঊদুন্না ফী মিল্লাতিনা কা-লা আওয়ালাও কুন্না-কা-রিহীন ।

তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক সর্দারগণ বলল, হে শুআইব! আমরা অবশ্যই তোমাকে ও তোমার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেব, অন্যথায় তোমাদের (সকলকে) অবশ্যই আমাদের দীনে ফিরে আসতে হবে। ৫১ শুআইব বলল, আমরা যদি (তোমাদের দীনকে) ঘৃণা করি তবুও কি?

তাফসীরঃ

৫১. হযরত শুআইব আলাইহিস সালামের সঙ্গীগণ পূর্বে তো তাদের কওমের ধর্মেই ছিল। পরে তারা ঈমান এনেছে। কাজেই তাদের সম্পর্কে ‘পুরানো ধর্মে ফিরে যাওয়া’ শব্দের ব্যবহার ঠিকই আছে, কিন্তু হযরত শুআইব আলাইহিস সালাম তো কখনও তাদের ধর্মে ছিলেন না। তাঁর সম্পর্কে এ শব্দ ব্যবহারের কারণ কী? এর উত্তর এই যে, নবুওয়াতের আগে তাঁর কওমের লোক মনে করত, তিনি তাদেরই ধর্মের অনুসারী। এ কারণেই তারা তাঁর জন্যও এ শব্দ ব্যবহার করেছিল। হযরত শুআইব আলাইহিস সালাম উত্তরও দিয়েছেন তাদেরই শব্দে। (অথবা তাঁর সঙ্গীদের সংখ্যাধিক্যের কারণে তাঁকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে সকলের জন্য একই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। পরিভাষায় একে, তাগলীব’ বলে। -অনুবাদক)
৮৯

قَدِ افۡتَرَیۡنَا عَلَی اللّٰہِ کَذِبًا اِنۡ عُدۡنَا فِیۡ مِلَّتِکُمۡ بَعۡدَ اِذۡ نَجّٰنَا اللّٰہُ مِنۡہَا ؕ وَمَا یَکُوۡنُ لَنَاۤ اَنۡ نَّعُوۡدَ فِیۡہَاۤ اِلَّاۤ اَنۡ یَّشَآءَ اللّٰہُ رَبُّنَا ؕ وَسِعَ رَبُّنَا کُلَّ شَیۡءٍ عِلۡمًا ؕ عَلَی اللّٰہِ تَوَکَّلۡنَا ؕ رَبَّنَا افۡتَحۡ بَیۡنَنَا وَبَیۡنَ قَوۡمِنَا بِالۡحَقِّ وَاَنۡتَ خَیۡرُ الۡفٰتِحِیۡنَ ٨٩

কাদিফ তারাইনা-‘আলাল্লা-হি কাযিবান ইন ‘উদনা-ফী মিল্লাতিকুম বা‘দা ইযনাজ্জানাল্লাহু মিনহা ওয়ামা-ইয়াকূনুলানা আন্না‘ঊদা ফীহা ইল্লা আইঁ ইয়াশাআল্লা-হু রাব্বুনা- ওয়াছি‘আ রাব্বুনা-কুল্লা শাইইন ‘ইলমান ‘আলাল্লা-হি তাওয়াক্কালনা- রাব্বানাফতাহ বাইনানা -ওয়া বাইনা-কাওমিনা-বিলহাক্কিওয়া আনতা খাইরুল ফা-তিহীন।

আমরা যদি তোমাদের দীনে ফিরে যাই, যখন আল্লাহ আমাদেরকে তা থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তবে তো আমরা আল্লাহর প্রতি অতি বড় মিথ্যারোপ করব। ৫২ বস্তুত তাতে ফিরে যাওয়া আমাদের পক্ষে কখনও সম্ভব নয় হাঁ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা করলে (সেটা ভিন্ন কথা)। ৫৩ আমাদের প্রতিপালক নিজ জ্ঞান দ্বারা সবকিছু বেষ্টন করে রেখেছেন। আমরা আল্লাহরই প্রতি নির্ভর করেছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যায্যভাবে ফায়সালা করে দিন। আপনিই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী।

তাফসীরঃ

৫২. অর্থাৎ তোমাদের ধর্মে ফিরে যাওয়ার অর্থ দাঁড়ায় আমরা তোমাদের ধর্মকে আল্লাহর দেওয়া সত্য ধর্ম বলে স্বীকার করে নেব। অথচ সে ধর্ম সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং তা আদৌ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত ও তার মনোনীত নয়। এরূপ ধর্মকে সত্যবিশ্বাসে গ্রহণ করে নেওয়া আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলা ও তার প্রতি অপবাদ আরোপ করার নামান্তর। আল্লাহ-প্রেরিত কোন নবী এবং তাঁর দ্বারা হিদায়াতপ্রাপ্ত কোন দলের পক্ষে তা করা আদৌ সম্ভব কি? -অনুবাদক
৯০

وَقَالَ الۡمَلَاُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡ قَوۡمِہٖ لَئِنِ اتَّبَعۡتُمۡ شُعَیۡبًا اِنَّکُمۡ اِذًا لَّخٰسِرُوۡنَ ٩۰

ওয়া কা-লাল মালাউল্লাযীনা কাফারূমিন কাওমিহী লাইনিততাবা‘তুম শু‘আইবান ইন্নাকুম ইযাল লাখা-ছিরূন।

তার সম্প্রদায়ের সর্দারগণ যারা কুফরকেই ধরে রেখেছিল, (সম্প্রদায়ের সাধারণ লোকদেরকে) বলল, তোমরা যদি শুআইবের অনুসরণ কর, তবে (মনে রেখ), তোমরা তখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
৯১

فَاَخَذَتۡہُمُ الرَّجۡفَۃُ فَاَصۡبَحُوۡا فِیۡ دَارِہِمۡ جٰثِمِیۡنَ ۚۖۛ ٩١

ফাআখাযাতহুমুর রাজফাতুফাআসবাহূফী দা-রিহিম জা-ছিমীন।

অতঃপর তারা ভূমিকম্পে আক্রান্ত হল ৫৪ এবং প্রভাতকালে তারা নিজেদের বাড়িতে অধঃমুখে পড়ে থাকল।

তাফসীরঃ

৫৪. সে জাতির উপর যে আযাব এসেছিল তা বোঝানোর জন্য কুরআন মাজীদ এখানে الرجفة (ভূমিকম্প) শব্দ ব্যবহার করেছে। সূরা হুদে বলা হয়েছে صيحة (প্রচণ্ড শব্দ), আর সূরা শুআরায় বলা হয়েছে عذاب يوم الظلة (মেঘাচ্ছন্ন দিবসের শাস্তি)। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.)-এর একটি বর্ণনায় আছে, তাদের উপর প্রথমে প্রচণ্ড গরম পড়ে, যাতে অস্থির হয়ে তারা চিৎকার করতে থাকে। তারপর নগরের বাইরে মেঘ দেখা দেয়। সেখানে ঠাণ্ডা বাতাস বইছিল। তারা সবাই শহর ছেড়ে সেখানে গিয়ে জড়ো হয়। সহসা সেই মেঘ থেকে অগ্নি বর্ষণ শুরু হল। একেই মেঘাচ্ছন্ন দিবস শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। তারপর আসল ভূমিকম্প (রূহুল মাআনী)। ভূমিকম্পের সাথে সাধারণত আওয়াজও থাকে। তাই এ শাস্তিকে صيحة অর্থাৎ প্রচণ্ড শব্দ বলা হয়েছে।
৯২

الَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا شُعَیۡبًا کَاَنۡ لَّمۡ یَغۡنَوۡا فِیۡہَا ۚۛ اَلَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا شُعَیۡبًا کَانُوۡا ہُمُ الۡخٰسِرِیۡنَ ٩٢

আল্লাযীনা কাযযাবূশু‘আইবান কাআল্লাম ইয়াগনাও ফীহা-আল্লাযীনা কাযযাবূ শু‘আইবান কা-নূহুমুল খা-ছিরীন।

যারা শুআইবকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তারা (এমন হয়ে গেল), যেন সেখানে কখনও বসবাসই করেনি। যারা শুআইবকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, শেষ পর্যন্ত তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হল।
৯৩

فَتَوَلّٰی عَنۡہُمۡ وَقَالَ یٰقَوۡمِ لَقَدۡ اَبۡلَغۡتُکُمۡ رِسٰلٰتِ رَبِّیۡ وَنَصَحۡتُ لَکُمۡ ۚ  فَکَیۡفَ اٰسٰی عَلٰی قَوۡمٍ کٰفِرِیۡنَ ٪ ٩٣

ফাতাওয়াল্লা-‘আনহুম ওয়া কা-লা ইয়া-কাওমি লাকাদ আবলাগতুকুম রিছা-লা-তি রাববী ওয়া নাসাহতুলাকুম ফাকাইফা আ-ছা-‘আলা-কাওমিন কা-ফিরীন।

সুতরাং সে (শুআইব আলাইহিস সালাম) তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল এবং বলতে লাগল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের কাছে আমার রবের বাণীসমূহ পৌঁছে দিয়েছিলাম এবং তোমাদের কল্যাণ কামনা করেছিলাম। (কিন্তু) যে সম্প্রদায় ছিল অকৃতজ্ঞ, আমি তাদের জন্য কিভাবে আক্ষেপ করি!
৯৪

وَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا فِیۡ قَرۡیَۃٍ مِّنۡ نَّبِیٍّ اِلَّاۤ اَخَذۡنَاۤ اَہۡلَہَا بِالۡبَاۡسَآءِ وَالضَّرَّآءِ لَعَلَّہُمۡ یَضَّرَّعُوۡنَ ٩٤

ওয়া মাআরছালনা-ফী কারইয়াতিম মিন নাবিইয়িন ইল্লা-আখাযনাআহলাহা-বিলবা’ছাই ওয়াদ্দাররাই লা‘আল্লাহুম ইয়াদ্দাররা‘ঊন।

আমি যে-কোনও জনপদে নবী পাঠিয়েছি, তার অধিবাসীদেরকে অবশ্যই অর্থ-সংকট ও দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত করেছি, যাতে তারা বিনয় অবলম্বন করে। ৫৫

তাফসীরঃ

৫৫. বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা যাদেরকে শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করেছেন, তাদেরকে যে আকস্মিক রাগের বশে ধ্বংস করেছেন এমন নয়। বরং তাদেরকে সঠিক পথে আসার জন্য বছরের পর বছর সুযোগ দিয়েছেন এবং সব রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। প্রথমত তাদের কাছে নবী পাঠিয়েছেন, যে নবী তাদেরকে বছরের পর বছর সাবধান করতে থেকেছেন। তারপর তাদেরকে আর্থিক কষ্ট ও বিভিন্ন রকমের বালা-মুসিবতে ফেলেছেন, যাতে তাদের মন কিছুটা নরম হয়। কেননা বহু লোক এ রকম অবস্থায় আল্লাহর দিকে রুজু হয় এবং কষ্ট-ক্লেশের ভেতর অনেক সময় সত্য গ্রহণের যোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। এরূপ ক্ষেত্রে যখন নবী তাদেরকে এই বলে সতর্ক করেন যে, এখনও সময় আছে তোমরা শুধরে যাও, আল্লাহ তাআলা এ মুসিবত দ্বারা একটা সংকেত দিয়েছেন মাত্র, এটা যে কোনও সময় মহাশাস্তির রূপও নিতে পারে, তখন কোনও কোনও লোকের মন ঠিকই নরম হয়। অপর দিকে কিছু লোক এমনও থাকে, সুখণ্ডসাচ্ছন্দ্য লাভ হলে যাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলার দয়া ও কৃপার অনুভূতি জাগ্রত হয় এবং তখন সত্য গ্রহণের জন্য তারা অপেক্ষাকৃত বেশি আগ্রহী হয়। সুতরাং তাদেরকে দুঃখণ্ডদৈন্যের পর সুখণ্ডসাচ্ছন্দ্যও দান করা হয়ে থাকে, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ পায়। অবস্থার এ পরিবর্তন দ্বারা কিছু লোক তো অবশ্যই শিক্ষা গ্রহণ করে এবং সঠিক পথে চলে আসে, কিন্তু জেদী চরিত্রের কিছু এমন লোকও থাকে, যারা এসব দ্বারা কোনও শিক্ষা গ্রহণ করে না। বরং তারা বলে, এরূপ সুখণ্ডদুঃখ ও ঠাণ্ডা-গরমের পালাবদল আমাদের বাপ-দাদাদের জীবনেও দেখা দিয়েছে। কাজেই এসবকে অহেতুকভাবে আল্লাহ তাআলার কোনও সংকেত সাব্যস্ত করার দরকার কী? এভাবে যখন তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার সব রকমের প্রমাণ চূড়ান্ত হয়ে যায়, তখন এক সময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে আযাব এসে পড়ে। তখন তাদেরকে এমন আকস্মিকভাবে ধরা হয় যে, তারা আগে থেকে কিছুই টের করতে পারে না।
৯৫

ثُمَّ بَدَّلۡنَا مَکَانَ السَّیِّئَۃِ الۡحَسَنَۃَ حَتّٰی عَفَوۡا وَّقَالُوۡا قَدۡ مَسَّ اٰبَآءَنَا الضَّرَّآءُ وَالسَّرَّآءُ فَاَخَذۡنٰہُمۡ بَغۡتَۃً وَّہُمۡ لَا یَشۡعُرُوۡنَ ٩٥

ছু ম্মা বাদ্দালনা-মাকা-নাছছাইয়িআতিল হাছানাতা হাত্তা-‘আফাওঁ ওয়া কা-লূকাদ মাছছা আ-বাআনাদ্দাররাউ ওয়াছছাররাউ ফাআখাযনা-হুম বাগতাতাওঁ ওয়া হুম লাইয়াশ‘উরূন।

তারপর আমি অবস্থা বদলে দূরাবস্থার স্থানে সুখণ্ডসাচ্ছন্দ্য দিয়েছি, এমনকি তারা সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে এবং বলতে শুরু করে, দুঃখ ও সুখ তো আমাদের বাপ-দাদাদেরকেও স্পর্শ করেছে। অতঃপর আমি অকস্মাৎ তাদেরকে এভাবে পাকড়াও করি যে, তারা (আগে থেকে কিছুই) টের করতে পারেনি।
৯৬

وَلَوۡ اَنَّ اَہۡلَ الۡقُرٰۤی اٰمَنُوۡا وَاتَّقَوۡا لَفَتَحۡنَا عَلَیۡہِمۡ بَرَکٰتٍ مِّنَ السَّمَآءِ وَالۡاَرۡضِ وَلٰکِنۡ کَذَّبُوۡا فَاَخَذۡنٰہُمۡ بِمَا کَانُوۡا یَکۡسِبُوۡنَ ٩٦

ওয়া লাও আন্না আহলাল কুরাআ-মানূওয়াত্তাকাও লাফাতাহনা -‘আলাইহিম বারাকা-তিম মিনাছছামাই ওয়াল আরদি ওয়ালা-কিন কাযযাবূ ফাআখাযনা-হুম বিমা-কা-নূ ইয়াকছিবূন।

যদি সে সকল জনপদবাসী ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী থেকে কল্যাণধারা মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা (সত্য) প্রত্যাখ্যান করল। সুতরাং তারা ক্রমাগত যা করে যাচ্ছিল, তার পরিণামে আমি তাদেরকে পাকড়াও করি।
৯৭

اَفَاَمِنَ اَہۡلُ الۡقُرٰۤی اَنۡ یَّاۡتِیَہُمۡ بَاۡسُنَا بَیَاتًا وَّہُمۡ نَآئِمُوۡنَ ؕ ٩٧

আফা আমিনা আহলুল কুরা আইঁআইয়া’তিয়াহুম বা’ছুনা-বায়া-তাওঁ ওয়া হুম নাইমূন।

তবে কি জনপদবাসীরা এ বিষয় হতে সম্পূর্ণ নির্ভয় হয়ে গেছে যে, কোনও রাতে তাদের উপর আমার শাস্তি আপতিত হবে, যখন তারা থাকবে ঘুমন্ত? ৫৬

তাফসীরঃ

৫৬. এসব ঘটনার বরাত দিয়ে মক্কার কাফেরদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলার গযব ও ক্রোধ সম্বন্ধে কারওই নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকা উচিত নয়। আসলে এটা কেবল মক্কার কাফেরদের জন্যই নয়; বরং যে ব্যক্তিই কোনও রকমের গুনাহ, মন্দ কাজ বা জুলুমে লিপ্ত থাকে, তার উচিত সদা-সর্বদা এসব আয়াতে বর্ণিত বিষয়বস্তুর প্রতি খেয়াল রাখা।
৯৮

اَوَاَمِنَ اَہۡلُ الۡقُرٰۤی اَنۡ یَّاۡتِیَہُمۡ بَاۡسُنَا ضُحًی وَّہُمۡ یَلۡعَبُوۡنَ ٩٨

আওয়া আমিনা আহলুল কুরাআইঁ ইয়া’তিয়াহুম বা’ছুনা-দু হাওঁ ওয়া হুম ইয়াল‘আবূন।

এসব জনপদবাসী কি এর থেকে নির্ভয় হয়ে গেছে যে, তাদের উপর আমার শাস্তি আপতিত হবে পূর্বাহ্নে, যখন তারা খেলাধুলায় মেতে থাকবে?
৯৯

اَفَاَمِنُوۡا مَکۡرَ اللّٰہِ ۚ  فَلَا یَاۡمَنُ مَکۡرَ اللّٰہِ اِلَّا الۡقَوۡمُ الۡخٰسِرُوۡنَ ٪ ٩٩

আফা আমিনূমাকরাল্লা-হি, ফালা-ইয়া’মানুমাকরাল্লা-হি ইল্লাল কাওমুল খা-ছিরূন।

তবে কি তারা আল্লাহ প্রদত্ত অবকাশ (-এর পরিণাম) সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে? ৫৭ (যদি তাই হয়) তবে (তারা যেন স্মরণ রাখে), আল্লাহ প্রদত্ত অবকাশ সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকে কেবল সেই সব লোক, যারা শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তাফসীরঃ

৫৭. এখানে মূল শব্দ হচ্ছে مكر-এর অর্থ এমন গুপ্ত কৌশল, যার উদ্দেশ্য যার বিরুদ্ধে তা প্রয়োগ করা হয় সে বুঝতে পারে না। আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এমন কৌশলের অর্থ হচ্ছে, তিনি মানুষকে তাদের পাপাচার সত্ত্বেও দুনিয়ায় বাহ্যিক সুখণ্ডসাচ্ছন্দ্য দিয়ে থাকেন, যার উদ্দেশ্য হয় তাদেরকে ঢিল ও অবকাশ দেওয়া। তারা যখন সেই অবকাশের ভেতর উপর্যুপরি পাপাচার করেই যেতে থাকে, তখন এক পর্যায়ে আকস্মিকভাবে তাদেরকে পাকড়াও করা হয়। সুতরাং সুখণ্ডসাচ্ছন্দ্যের ভেতরও নিজ আমল সম্পর্কে মানুষের গাফেল থাকা উচিত নয়। বরং সর্বদা আত্মসংশোধনে যত্নবান থাকা চাই। অন্তরে এই ভীতি জাগরুক রাখা চাই যে, সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হলে এই সুখণ্ডসাচ্ছন্দ্য আমার জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে প্রদত্ত ঢিল ও অবকাশও হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে নিজ আশ্রয়ে রাখুন।
১০০

اَوَلَمۡ یَہۡدِ لِلَّذِیۡنَ یَرِثُوۡنَ الۡاَرۡضَ مِنۡۢ بَعۡدِ اَہۡلِہَاۤ اَنۡ لَّوۡ نَشَآءُ اَصَبۡنٰہُمۡ بِذُنُوۡبِہِمۡ ۚ وَنَطۡبَعُ عَلٰی قُلُوۡبِہِمۡ فَہُمۡ لَا یَسۡمَعُوۡنَ ١۰۰

আওয়া লাম ইয়াহদি লিল্লাযীনা ইয়ারিছূনাল আরদা মিম বা‘দিআহলিহা-আল নাও নাশাউ আসাবনা-হুম বিযুনূবিহিম ওয়া নাতবা‘উ ‘আলা-কুলূবিহিম ফাহুম লাইয়াছমা‘ঊন।

যারা কোন ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের (ধ্বংসপ্রাপ্তির) পর তার উত্তরাধিকারী হয়, তাদের কি এই শিক্ষা লাভ হয়নি যে, আমি চাইলে তাদেরকেও তাদের গুনাহের কারণে শাস্তি দান করতে পারি? এবং (হঠকারিতাবশত এ শিক্ষা গ্রহণ না করার কারণে) আমি তাদের অন্তরে মোহর করে দিতে পারি, ফলে তারা (কোনও কথা) শুনতে পাবে না?
১০১

تِلۡکَ الۡقُرٰی نَقُصُّ عَلَیۡکَ مِنۡ اَنۡۢبَآئِہَا ۚ وَلَقَدۡ جَآءَتۡہُمۡ رُسُلُہُمۡ بِالۡبَیِّنٰتِ ۚ فَمَا کَانُوۡا لِیُؤۡمِنُوۡا بِمَا کَذَّبُوۡا مِنۡ قَبۡلُ ؕ کَذٰلِکَ یَطۡبَعُ اللّٰہُ عَلٰی قُلُوۡبِ الۡکٰفِرِیۡنَ ١۰١

তিলকাল-কুরা-নাকুসসু‘আলাইকা মিন আমবাইহা ওয়া লাকাদ জাআতহুম রুছুলুহুম বিলবাইয়িনা-তি ফামা-কা-নূলিইউ‘মিনূবিমা-কাযযাবূমিন কাবলু কাযা-লিকা ইয়াতবা‘ঊল্লা-হু ‘আলা-কুলূবিল কা-ফিরীন।

এই হচ্ছে সেই সব জনপদ, যার বৃত্তান্ত তোমাকে শোনাচ্ছি। বস্তুত তাদের কাছে তাদের রাসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিল, কিন্তু তারা পূর্বে যা প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাতে ঈমান আনার জন্য কখনও প্রস্তুত ছিল না। যারা কুফর অবলম্বন করে, আল্লাহ তাদের অন্তরে এভাবেই মোহর করে দেন।
১০২

وَمَا وَجَدۡنَا لِاَکۡثَرِہِمۡ مِّنۡ عَہۡدٍ ۚ وَاِنۡ وَّجَدۡنَاۤ اَکۡثَرَہُمۡ لَفٰسِقِیۡنَ ١۰٢

ওয়া মা-ওয়াজাদনা-লিআকছারিহিম মিন ‘আহদিওঁ ওয়া ইওঁ ওয়াজাদনা আকছারাহুম লাফা-ছিকীন।

আমি তাদের অধিকাংশের ভেতরই অঙ্গীকার নিষ্ঠা পাইনি। ৫৮ প্রকৃতপক্ষে আমি তাদের অধিকাংশকেই পেয়েছি অবাধ্য।

তাফসীরঃ

৫৮. অর্থাৎ তাদেরকে যে স্বভাবধর্ম তথা আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের মানসিকতার উপর সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং যার প্রতিশ্রুতি তাদের থেকে রূহানী জগতে নেওয়া হয়েছিল, তা রক্ষার কোন ইচ্ছা ও আগ্রহ তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়নি। এমনিভাবে মসিবতকালে তারা যে ঈমান আনার ও ভালো মানুষ হয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করে এবং পারস্পরিক কাজ-কর্ম ও লেনদেনের ক্ষেত্রে যে সব অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়, তা রক্ষারও কোন গরজ তাদের মধ্যে দেখা যায়নি; বরং সকল ক্ষেত্রেই তারা কেবল অবাধ্যতাই করেছে। (-অনুবাদক)
১০৩

ثُمَّ بَعَثۡنَا مِنۡۢ بَعۡدِہِمۡ مُّوۡسٰی بِاٰیٰتِنَاۤ اِلٰی فِرۡعَوۡنَ وَمَلَا۠ئِہٖ فَظَلَمُوۡا بِہَا ۚ فَانۡظُرۡ کَیۡفَ کَانَ عَاقِبَۃُ الۡمُفۡسِدِیۡنَ ١۰٣

ছু ম্মা বা‘আছনা-মিম বা‘দিহিম মূছা-বিআ-য়া-তিনাইলা-ফির‘আওনা ওয়া মালাইহী ফাজালামূবিহা- ফানজু র কাইফা কা-না ‘আ-কিবাতুল মুফছিদীন।

অতঃপর আমি তাদের সকলের পর মূসাকে আমার নিদর্শনাবলীসহ ফির‘আউন ও তার পারিষদবর্গের কাছে পাঠালাম। ৫৯ তারাও এর (অর্থাৎ নিদর্শনাবলীর) প্রতি অবিচার করল। সুতরাং দেখ, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছে।

তাফসীরঃ

৫৯. এখান থেকে ১৬২ নং আয়াত পর্যন্ত হযরত মূসা আলাইহিস সালামের ঘটনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এতে ফির‘আউনের সাথে তার কথোপকথন ও উভয়ের পারস্পরিক মুকাবিলা, ফির‘আউনের নিমজ্জন ও হযরত মূসা আলাইহিস সালামের প্রতি তাওরাত নাযিলের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ছিলেন হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের চতুর্থ অধঃস্তন পুরুষ। সূরা ইউসুফে আছে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যখন মিসরের অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়, তখন তিনি নিজ পিতা-মাতা ও ভাইদেরকে ফিলিস্তিন থেকে মিসরে আনিয়ে নিয়েছিলেন। ইসরাঈলী বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের বংশধরগণ, যারা বনী ইসরাঈল নামে পরিচিত, মিসরেরই বাসিন্দা হয়ে যায়। মিসরের বাদশাহ তাদের জন্য নগরের বাইরে পৃথক একটি জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল। মিসরের প্রত্যেক বাদশাকে ফির‘আউন বলা হত। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ইন্তিকালের পর মিসরের বাদশাহের কাছে বনী ইসরাঈল নিজেদের মর্যাদা হারাতে শুরু করে, এমনকি এক পর্যায়ে বাদশাহগণ তাদেরকে নিজেদের দাস বানিয়ে নেয়। অপর দিকে তাদের মধ্যকার এক ফির‘আউন (আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী যার নাম মিনিফ্তাহ) ক্ষমতার মদমত্ততায় নিজেকে খোদা দাবী করে বসে। এহেন পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে তার কাছে নবী বানিয়ে পাঠালেন। তাঁর জন্ম, মাদয়ান অভিমুখে হিজরত, অতঃপর নবুওয়াত লাভ ইত্যাদি ঘটনাবলী ইনশাআল্লাহ সূরা তোয়াহা (সূরা নং ২০) সূরা কাসাসে (সূরা নং ২৮) আসবে। এছাড়া আরও ৩৫টি সূরায় তার ঘটনার বিভিন্ন দিক বর্ণিত হয়েছে। ফির‘আউনের সাথে তাঁর যেসব ঘটনা ঘটেছিল, এস্থলে তা বিবৃত হচ্ছে।
১০৪

وَقَالَ مُوۡسٰی یٰفِرۡعَوۡنُ اِنِّیۡ رَسُوۡلٌ مِّنۡ رَّبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ۙ ١۰٤

ওয়া কা-লা মুছা-ইয়া-ফির‘আওনুইন্নী রাছূলুম মির রাব্বিল ‘আ-লামীন।

মূসা বলেছিল, হে ফির‘আউন! নিশ্চয়ই আমি রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে একজন রাসূল।
১০৫

حَقِیۡقٌ عَلٰۤی اَنۡ لَّاۤ اَقُوۡلَ عَلَی اللّٰہِ اِلَّا الۡحَقَّ ؕ  قَدۡ جِئۡتُکُمۡ بِبَیِّنَۃٍ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ فَاَرۡسِلۡ مَعِیَ بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ ؕ ١۰٥

হাকীকুন ‘আলাআল্লাআকূলা ‘আলাল্লা-হি ইল্লাল হাক্কা কাদ জি’তুকুম ব্বিাইয়িনাতিম মিররাব্বিকুম ফাআরছিল মা‘ইয়া বানীইছরাঈল।

এটা আমার অবশ্য কর্তব্য যে, আমি আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে সত্য ছাড়া বলব না। আমি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এক স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছি। অতএব বনী ইসরাঈলকে আমার সাথে যেতে দাও।
১০৬

قَالَ اِنۡ کُنۡتَ جِئۡتَ بِاٰیَۃٍ فَاۡتِ بِہَاۤ اِنۡ کُنۡتَ مِنَ الصّٰدِقِیۡنَ ١۰٦

কা-লা ইন কুনতা জি’তা বিআ-য়াতিন ফা’তি বিহা ইন কু নতা মিনাসসা-দিকীন।

সে বলল, তুমি কোন নিদর্শন এনে থাকলে তা পেশ কর যদি তুমি সত্যবাদী হও।
১০৭

فَاَلۡقٰی عَصَاہُ فَاِذَا ہِیَ ثُعۡبَانٌ مُّبِیۡنٌ ۚۖ ١۰٧

ফাআলকা-‘আসা-হু ফাইযা-হিয়া ছু‘বা-নুম মুবীন।

তখন মূসা নিজ লাঠি নিক্ষেপ করল এবং তৎক্ষণাৎ তা এক সাক্ষাৎ অজগরে পরিণত হল।
১০৮

وَّنَزَعَ یَدَہٗ فَاِذَا ہِیَ بَیۡضَآءُ لِلنّٰظِرِیۡنَ ٪ ١۰٨

ওয়া নাঝা‘আ ইয়াদাহূফাইযা-হিয়া বাইদাউ লিন না-জিরীন।

এবং নিজ হাত (বগল থেকে) টেনে আনল, সহসা তা দর্শকদের সামনে চমকাতে লাগল। ৬০

তাফসীরঃ

৬০. এ দু’টি ছিল মুজিযা, যা আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে দান করেছিলেন। কথিত আছে, সে যুগে যাদুর ব্যাপক প্রচলন ছিল। তাই তাঁকে এমন মুজিযা দেওয়া হল, যা যাদুকরদেরকেও হার মানিয়ে দেয় এবং সাধারণ ও বিশিষ্ট সকলের কাছে তাঁর নবুওয়াতের সত্যতা স্পষ্ট হয়ে যায়।
১০৯

قَالَ الۡمَلَاُ مِنۡ قَوۡمِ فِرۡعَوۡنَ اِنَّ ہٰذَا لَسٰحِرٌ عَلِیۡمٌ ۙ ١۰٩

কা-লাল মালাউ মিন কাওমি ফির‘আওনা ইন্না হা-যা-লাছা-হিরুন ‘আলীম।

ফির‘আউনের কওমের সর্দারগণ (একে অন্যকে) বলতে লাগল, নিশ্চয়ই এ একজন দক্ষ যাদুকর।
১১০

یُّرِیۡدُ اَنۡ یُّخۡرِجَکُمۡ مِّنۡ اَرۡضِکُمۡ ۚ فَمَاذَا تَاۡمُرُوۡنَ ١١۰

ইউরীদুআইঁ ইউখরিজাকুম মিন আরদিকুম ফামা-যা-তা’মুরূন।

সে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দিতে চায়। এখন (বল), তোমরা কী পরামর্শ দাও?
১১১

قَالُوۡۤا اَرۡجِہۡ وَاَخَاہُ وَاَرۡسِلۡ فِی الۡمَدَآئِنِ حٰشِرِیۡنَ ۙ ١١١

কা-লূআরজিহ ওয়া আখা-হু ওয়া আরছিল ফিল মাদাইনি হা-শিরীন।

তারা বলল, তাকে ও তার ভাইকে কিঞ্চিৎ অবকাশ দিন এবং নগরে নগরে সংগ্রাহক পাঠান।
১১২

یَاۡتُوۡکَ بِکُلِّ سٰحِرٍ عَلِیۡمٍ ١١٢

ইয়া’তূকা বিকুল্লি ছা-হিরীন ‘আলীম।

যাতে তারা সকল দক্ষ যাদুকরকে আপনার কাছে নিয়ে আসে। ৬১

তাফসীরঃ

৬১. যাদুকরদেরকে একত্র করার উদ্দেশ্য ছিল তাদের দ্বারা মুকাবিলা করিয়ে মূসা আলাইহিস সালামকে হার মানানো।
১১৩

وَجَآءَ السَّحَرَۃُ فِرۡعَوۡنَ قَالُوۡۤا اِنَّ لَنَا لَاَجۡرًا اِنۡ کُنَّا نَحۡنُ الۡغٰلِبِیۡنَ ١١٣

ওয়া জাআছছাহারাতুফির‘আওনা কা-লূইন্না লানা-লাআজরান ইন কুন্না-নাহনুলগালিবীন।

(সুতরাং তাই করা হল) এবং যাদুকরগণ ফির‘আউনের কাছে চলে আসল (এবং) তারা বলল, আমরা যদি (মূসার বিরুদ্ধে) জয়ী হই, তবে আমরা অবশ্যই পুরস্কার লাভ করব তো?
১১৪

قَالَ نَعَمۡ وَاِنَّکُمۡ لَمِنَ الۡمُقَرَّبِیۡنَ ١١٤

কা-লা না‘আম ওয়া ইন্নাকুম লামিনাল মুকাররাবীন।

ফির‘আউন বলল, হাঁ এবং তোমরা (আমার) ঘনিষ্ঠ লোকদের মধ্যে গণ্য হবে।
১১৫

قَالُوۡا یٰمُوۡسٰۤی اِمَّاۤ اَنۡ تُلۡقِیَ وَاِمَّاۤ اَنۡ نَّکُوۡنَ نَحۡنُ الۡمُلۡقِیۡنَ ١١٥

কা-লূইয়া-মূছা ইম্মাআন তুলকিয়া ওয়া ইম্মাআন নাকূনা নাহনুল মুলক ীন।

তারা (মূসা আলাইহিস সালামকে) বলল, হে মূসা! চাইলে তুমি (যা নিক্ষেপের ইচ্ছা রাখ তা) নিক্ষেপ কর, নয়ত আমরা (আমাদের যাদুর বস্তু) নিক্ষেপ করি?
১১৬

قَالَ اَلۡقُوۡا ۚ فَلَمَّاۤ اَلۡقَوۡا سَحَرُوۡۤا اَعۡیُنَ النَّاسِ وَاسۡتَرۡہَبُوۡہُمۡ وَجَآءُوۡ بِسِحۡرٍ عَظِیۡمٍ ١١٦

কা-লা আলকূ ফালাম্মা আলকাও ছাহারূআ‘ইউনান না-ছি ওয়াছতারহাবূহুম ওয়া জাঊ বিছিহরিন ‘আজীম।

মূসা বলল, তোমরাই নিক্ষেপ কর। সুতরাং তারা যখন (তাদের রশি ও লাঠি) নিক্ষেপ করল, তখন তারা লোকের চোখে যাদু করল, তাদেরকে আতঙ্কিত করল এবং বিরাট যাদু প্রদর্শন করল।
১১৭

وَاَوۡحَیۡنَاۤ اِلٰی مُوۡسٰۤی اَنۡ اَلۡقِ عَصَاکَ ۚ  فَاِذَا ہِیَ تَلۡقَفُ مَا یَاۡفِکُوۡنَ ۚ ١١٧

ওয়া আওহাইনাইলা-মূছাআন আলকি‘আসা-কা ফাইযা-হিয়া তালকাফুমাইয়া’ফিকূন।

আর আমি ওহীর মাধ্যমে মূসাকে আদেশ করলাম, তুমি নিজ লাঠি নিক্ষেপ কর। (সে তাই করল), অমনি সেটা তারা যে ভোজবাজি দেখাচ্ছিল তা গ্রাস করতে লাগল।
১১৮

فَوَقَعَ الۡحَقُّ وَبَطَلَ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ۚ ١١٨

ফাওয়াকা‘আল হাক্কুওয়া বাতালা মা-কা-নূইয়া‘মালূন।

এভাবে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল এবং তারা যা-কিছু করছিল তা মিথ্যা সাব্যস্ত হল।
১১৯

فَغُلِبُوۡا ہُنَالِکَ وَانۡقَلَبُوۡا صٰغِرِیۡنَ ۚ ١١٩

ফাগুলিবূহুনা-লিকা ওয়ান কালাবূসা-গিরীন।

সেখানে তারা পরাজিত হল ও (প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে) লাঞ্ছিত হয়ে ফিরে গেল।
১২০

وَاُلۡقِیَ السَّحَرَۃُ سٰجِدِیۡنَ ۚۖ ١٢۰

ওয়া উলকিয়াছছাহারাতুছা-জিদীন।

আর এ ঘটনা যাদুকরগণকে (তাদের অচিন্তিতে) সিজদায় ৬২ ফেলে দিল।

তাফসীরঃ

৬২. এখানে কুরআন মাজীদে কর্মবাচ্য ক্রিয়াপদ القى ব্যবহার করা হয়েছে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘ফেলে দেওয়া হল’। এর দ্বারা ইশারা করা হয়েছে যে, পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়াল যে, তাদের অন্তকরণ তাদেরকে সিজদায় পড়ে যেতে বাধ্য করল। আয়াতের তরজমায় এ দিকটা রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ স্থলে ঈমানের শক্তি লক্ষ্য করুন, নিজ ধর্মের পক্ষে লড়াই করার জন্য যে যাদুকরগণ ক্ষণিক পূর্বে ফির‘আউনের কাছে পুরস্কার লাভের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিল, আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনামাত্র তাদের বুকে এমনই সাহস দেখা দিল যে, ফির‘আউনের মত স্বৈরাচারী শাসকের হুমকিকে তারা একটুও পাত্তা দিল না। আল্লাহ তাআলার কাছে চলে যাওয়ার অদম্য আগ্রহে তার সম্মুখে কেমন বেপরোয়া হয়ে উঠল!
১২১

قَالُوۡۤا اٰمَنَّا بِرَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ۙ ١٢١

কা-লূআ-মান্না-বিরাব্বিল ‘আ-লামীন।

তারা বলে উঠল, আমরা ঈমান আনলাম রাব্বুল আলামীনের প্রতি
১২২

رَبِّ مُوۡسٰی وَہٰرُوۡنَ ١٢٢

রাব্বি মূছা-ওয়া হা-রূন।

যিনি মূসা ও হারূনের প্রতিপালক।
১২৩

قَالَ فِرۡعَوۡنُ اٰمَنۡتُمۡ بِہٖ قَبۡلَ اَنۡ اٰذَنَ لَکُمۡ ۚ اِنَّ ہٰذَا لَمَکۡرٌ مَّکَرۡتُمُوۡہُ فِی الۡمَدِیۡنَۃِ لِتُخۡرِجُوۡا مِنۡہَاۤ اَہۡلَہَا ۚ فَسَوۡفَ تَعۡلَمُوۡنَ ١٢٣

কা-লা ফির‘আওনুআ-মানতুম বিহী কাবলা আন আ-যানা লাকুম ইন্না হা-যালামাকরুম মাকারতুমূহু ফিল মাদীনাতি লিতুখরিজূমিনহাআহলাহা- ফাছওফা তা‘লামূন।

ফির‘আউন বলল, আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেওয়ার আগেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে? নিশ্চয়ই এটা কোন চক্রান্ত। তোমরা শহরে এই চক্রান্ত করেছ, যাতে তোমরা এর বাসিন্দাদেরকে এখান থেকে বহিষ্কার করতে পার। আচ্ছা, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে।
১২৪

لَاُقَطِّعَنَّ اَیۡدِیَکُمۡ وَاَرۡجُلَکُمۡ مِّنۡ خِلَافٍ ثُمَّ لَاُصَلِّبَنَّکُمۡ اَجۡمَعِیۡنَ ١٢٤

লাউকাত্তি‘আন্না আইদিয়াকুমওয়াআরজুলাকুমমিনখিলা-ফিন ছু ম্মা লাউসালিলবান্নাকুম আজমা‘ঈন।

আমি অবশ্যই তোমাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব, তারপর তোমাদের সকলকে শূলে চড়িয়ে ছাড়ব।
১২৫

قَالُوۡۤا اِنَّاۤ اِلٰی رَبِّنَا مُنۡقَلِبُوۡنَ ۚ ١٢٥

কা-লূইন্নাইলা-রাব্বিনা-মুনকালিবূন।

তারা বলল, (মৃত্যুর পর) আমরা অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাব।
১২৬

وَمَا تَنۡقِمُ مِنَّاۤ اِلَّاۤ اَنۡ اٰمَنَّا بِاٰیٰتِ رَبِّنَا لَمَّا جَآءَتۡنَا ؕ  رَبَّنَاۤ اَفۡرِغۡ عَلَیۡنَا صَبۡرًا وَّتَوَفَّنَا مُسۡلِمِیۡنَ ٪ ١٢٦

ওয়ামা-তানকিমুমিন্না ইল্লাআন আ-মান্না-বিআ-য়া-তি রাব্বিনা-লাম্মা-জাআতনা- রাব্বানা-আফরিগ ‘আলাইনা-সাবরাওঁ ওয়াতাওয়াফফানা-মুছলিমীন।

তুমি কি রুষ্ট হচ্ছ কেবল আমাদের এ কাজের দরুণই যে, যখন আমাদের কাছে আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী এসে গেল তখন আমরা তাতে ঈমান এনেছি? হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর সবর ঢেলে দাও এবং (তোমার) তাবেদাররূপে আমাদের মৃত্যু দান কর।
১২৭

وَقَالَ الۡمَلَاُ مِنۡ قَوۡمِ فِرۡعَوۡنَ اَتَذَرُ مُوۡسٰی وَقَوۡمَہٗ لِیُفۡسِدُوۡا فِی الۡاَرۡضِ وَیَذَرَکَ وَاٰلِہَتَکَ ؕ قَالَ سَنُقَتِّلُ اَبۡنَآءَہُمۡ وَنَسۡتَحۡیٖ نِسَآءَہُمۡ ۚ وَاِنَّا فَوۡقَہُمۡ قٰہِرُوۡنَ ١٢٧

ওয়া কা-লাল মালাউ মিন কাওমি ফির‘আওনা আতাযারু মূছা-ওয়া কাওমাহূলিইউফছিদূ ফিল আরদিওয়া ইয়াযারাকা ওয়া আ-লিহাতাকা কা-লা ছানুকাত্তিলুআবনাআহুম ওয়া নাছতাহঈ নিছাআহুম, ওয়া ইন্না-ফাওকাহুম কা-হিরূন।

ফির‘আউনের কওমের নেতৃবর্গ (ফির‘আউনকে) বলল, আপনি কি মূসা ও তার সম্প্রদায়কে ছেড়ে দিবেন, যাতে তারা (অবাধে) পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করতে এবং আপনাকে ও আপনার উপাস্যদেরকে বর্জন করতে পারে? ৬৩ সে বলল, আমরা তাদের পুত্রদেরকে হত্যা করব এবং তাদের নারীদেরকে জীবিত রাখব, আর তাদের উপর তো আমাদের পরিপূর্ণ ক্ষমতা আছেই।

তাফসীরঃ

৬৩. অনুমান করা যায়, যে সকল যাদুকর ঈমান এনেছিল ফির‘আউন তাদেরকে শাস্তির হুমকি দিলেও হযরত মূসা আলাইহিস সালামের মুজিযা এবং যাদুকরদের ঈমান ও অবিচলতা দেখে মানসিকভাবে দমে গিয়েছিল। বিশেষত বনী ইসরাঈলের বিপুল সংখ্যক লোক ঈমান আনায় তাৎক্ষণিকভাবে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও তার অনুসারীদের উপর হাত তোলার সাহস তার হয়নি। সমাবেশ ভেঙ্গে যাওয়ার পর হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর অনুসারীগণ নিজ-নিজ বাড়ি চলে গেল। এ সময়েই ফির‘আউনের অমাত্যবর্গ ওই কথা বলেছিল, যা আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। তাদের কথার সারমর্ম এই যে, আপনি তো ওদেরকে স্বাধীন ছেড়ে দিলেন। এখন দিন-দিন শক্তি সঞ্চয় করে ওরা আপনার জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠবে। ফির‘আউন নিজ অপমান লুকানোর জন্য তাদেরকে উত্তর দিল, আপাতত আমি তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ না করলেও আগামীতে আমি তাদের দেখে নেব। আমি বনী ইসরাঈলকে এক-একজন করে খতম করব। তবে তাদের নারীদেরকে হত্যা করব না। তাদেরকে আমাদের সেবিকা বানাব। সে তার লোকদেরকে এ ব্যাপারেও আশ্বস্ত করল যে, পরিবেশ-পরিস্থিতি তার করায়ত্ত রয়েছে এবং তার কর্ম-কৌশল এমন নিখুঁত যে, কোনও রকম বিপদ সৃষ্টিরও আশঙ্কা নেই। এভাবে বনী ইসরাঈলের পুরুষদেরকে হত্যা করার এক নতুন যুগ শুরু হয়ে গেল। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এ পরিস্থিতিতে মুমিনদেরকে সবর করতে বললেন এবং আশা দিলেন যে, ইনশাআল্লাহ শুভ পরিণাম তোমাদেরই অনুকূলে থাকবে।
১২৮

قَالَ مُوۡسٰی لِقَوۡمِہِ اسۡتَعِیۡنُوۡا بِاللّٰہِ وَاصۡبِرُوۡا ۚ اِنَّ الۡاَرۡضَ لِلّٰہِ ۟ۙ یُوۡرِثُہَا مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖ ؕ وَالۡعَاقِبَۃُ لِلۡمُتَّقِیۡنَ ١٢٨

কা-লা মূছা-লিকাওমিহিছ তা‘ঈনূবিল্লা-হি ওয়াসবিরূ ইন্নাল আরদা লিল্লা-হি ইউরিছু হা- মাইঁ ইয়াশাউ মিন ‘ইবা-দিহী ওয়াল ‘আ-কিবাতুলিলমুত্তাকীন।

মূসা নিজ সম্প্রদায়কে বলল, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও ও ধৈর্য ধারণ কর। বিশ্বাস রাখ, যমীন আল্লাহর। তিনি নিজ বান্দাদের মধ্যে যাকে চান এর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন, আর শেষ পরিণাম মুত্তাকীদেরই অনুকূলে থাকে।
১২৯

قَالُوۡۤا اُوۡذِیۡنَا مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ تَاۡتِیَنَا وَمِنۡۢ بَعۡدِ مَا جِئۡتَنَا ؕ  قَالَ عَسٰی رَبُّکُمۡ اَنۡ یُّہۡلِکَ عَدُوَّکُمۡ وَیَسۡتَخۡلِفَکُمۡ فِی الۡاَرۡضِ فَیَنۡظُرَ کَیۡفَ تَعۡمَلُوۡنَ ٪ ١٢٩

কা-লূ ঊযীনা-মিন কাবলি আন তা’তিয়ানা-ওয়া মিম বা‘দি মা-জি’তানা- কা-লা ‘আছা-রাব্বুকুম আইঁ ইউহলিকা ‘আদুওওয়াকুম ওয়া ইয়াছতাখলিফাকুম ফিল আরদি ফাইয়ানজু রা কাইফা তা‘মালূন।

তারা বলল, আমাদেরকে তো আপনার আগমনের আগেও উৎপীড়ন করা হয়েছে এবং আপনার আগমনের পরেও (উৎপীড়ন করা হচ্ছে)। মূসা বলল, আশা করা যায়, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের দুশমনকে ধ্বংস করবেন এবং যমীনে তোমাদেরকে (তাদের) স্থলাভিষিক্ত করবেন। তারপর দেখবেন, তোমরা কীরূপ কাজ কর।
১৩০

وَلَقَدۡ اَخَذۡنَاۤ اٰلَ فِرۡعَوۡنَ بِالسِّنِیۡنَ وَنَقۡصٍ مِّنَ الثَّمَرٰتِ لَعَلَّہُمۡ یَذَّکَّرُوۡنَ ١٣۰

ওয়া লাকাদ আখাযনাআ-লা ফির‘আওনা বিছছিনীনা ওয়া নাকসিম মিনাছছামারা-তি লা‘আল্লাহুম ইয়াযযাক্কারূন।

আমি ফির‘আউনের সম্প্রদায়কে দুর্ভিক্ষ ও ফসলাদির ক্ষতিতে আক্রান্ত করলাম, যাতে তারা সতর্ক হয়। ৬৪

তাফসীরঃ

৬৪. পূর্ব ৯৪নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা যে মূলনীতি বলেছিলেন, সে অনুযায়ী ফির‘আউন ও তার কওমকে প্রথম দিকে বিভিন্ন বিপদাপদ দিলেন, যাতে তারা কিছুটা নরম হয়। এর মধ্যে প্রথমে চাপানো হল খরার মুসিবত। ফলে তাদের ফল-ফসল খুব কম জন্মাল।
১৩১

فَاِذَا جَآءَتۡہُمُ الۡحَسَنَۃُ قَالُوۡا لَنَا ہٰذِہٖ ۚ وَاِنۡ تُصِبۡہُمۡ سَیِّئَۃٌ یَّطَّیَّرُوۡا بِمُوۡسٰی وَمَنۡ مَّعَہٗ ؕ اَلَاۤ اِنَّمَا طٰٓئِرُہُمۡ عِنۡدَ اللّٰہِ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ١٣١

ফাইযা-জাআতহুমুল হাছানাতুকা-লূলানা-হা-যিহী ওয়া ইন তুসিবহুম ছাইয়িআতুইঁ ইয়াত্তাইয়ারূবিমূছা-ওয়া মাম মা‘আহূ আলাইন্নামা তাইরুহুম ‘ইনদাল্লা-হি ওয়ালাকিন্না আকছারাহুম লা-ইয়া‘লামূন।

(কিন্তু ফল হল এই যে), যখন তাদের সুখের দিন আসত তখন বলত, এটা তো আমাদের প্রাপ্য ছিল। আর যখন কোন বিপদ দেখা দিত, তখন তাকে মূসা ও তার সঙ্গীদের অশুভতা সাব্যস্ত করত। শোন, (এটা তো) তাদেরই অশুভতা (ছিল এবং যা) আল্লাহর জ্ঞানে ছিল, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানত না।
১৩২

وَقَالُوۡا مَہۡمَا تَاۡتِنَا بِہٖ مِنۡ اٰیَۃٍ لِّتَسۡحَرَنَا بِہَا ۙ فَمَا نَحۡنُ لَکَ بِمُؤۡمِنِیۡنَ ١٣٢

ওয়া কা-লূমাহমা-তা‘তিনা-বিহী মিন আ-য়াতিল লিতাছহারানা-বিহা- ফামা-নাহনু লাকা বিমু‘মিনীন।

এবং তারা (মূসাকে) বলত, আমাদেরকে যাদু করার জন্য তুমি আমাদের সামনে যে-কোনও নিদর্শনই উপস্থিত কর না কেন, আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনার নই।
১৩৩

فَاَرۡسَلۡنَا عَلَیۡہِمُ الطُّوۡفَانَ وَالۡجَرَادَ وَالۡقُمَّلَ وَالضَّفَادِعَ وَالدَّمَ اٰیٰتٍ مُّفَصَّلٰتٍ ۟ فَاسۡتَکۡبَرُوۡا وَکَانُوۡا قَوۡمًا مُّجۡرِمِیۡنَ ١٣٣

ফাআরাছালনা-‘আলাইহিমুততূফা-না ওয়াল জারা-দা ওয়াল কুম্মালা ওয়াদ্দাফা-দি‘আ ওয়াদ্দামা আ-য়া-তিম মুফাসসালা-তিন ফাছতাকবারূওয়া কা-নূকাওমাম মুজরিমীন।

সুতরাং আমি তাদের উপর পৃথক-পৃথক নিদর্শনরূপে ছেড়ে দেই প্লাবন, পঙ্গপাল, ঘুণপোকা, ব্যাঙ ও রক্ত। ৬৫ তথাপি তারা অহংকার প্রদর্শন করে। বস্তুত তারা ছিল এক অপরাধী সম্প্রদায়।

তাফসীরঃ

৬৫. এগুলো ছিল বিভিন্ন রকমের আযাব। ফির‘আউনী সম্প্রদায়ের উপর এগুলো একের পর এক আসতে থাকে। প্রথমে আসল বন্যা, যাতে তাদের ফসল নষ্ট হয়ে গেল। অতঃপর তারা যখন ঈমান আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে দিয়ে দোয়া করাল, তখন পুনরায় ফসল জন্মাল। কিন্তু তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল। ঈমান আনল না। তখন পঙ্গপাল এসে সেই ফসল বরবাদ করে দিল। আবারও সেই প্রতিশ্রুতি দিল, ফলে বিপদ দূর হল এবং সাচ্ছন্দ্য ফিরে আসল। কিন্তু এবারও তারা ঈমান না এনে নিশ্চিন্তে বসে থাকল। ফলে তাদের শস্যে ঘুণ দেখা দিল। এবারও একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি করল। অতঃপর তাদের উপর বিপুল পরিমাণ ব্যাঙ ছেড়ে দেওয়া হল, যা খাবার পাত্রে লাফিয়ে পড়ে সব খাবার নষ্ট করে দিত। অন্যদিকে খাবার পানিতে রক্ত দেখা যেতে লাগল। ফলে তাদের পানি পান করা দুঃসাধ্য হয়ে গেল।
১৩৪

وَلَمَّا وَقَعَ عَلَیۡہِمُ الرِّجۡزُ قَالُوۡا یٰمُوۡسَی ادۡعُ لَنَا رَبَّکَ بِمَا عَہِدَ عِنۡدَکَ ۚ  لَئِنۡ کَشَفۡتَ عَنَّا الرِّجۡزَ لَنُؤۡمِنَنَّ لَکَ وَلَنُرۡسِلَنَّ مَعَکَ بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ ۚ ١٣٤

ওয়া লাম্মা-ওয়া কা‘আ ‘আলাইহিমুর রিজঝুকা-লূইয়া-মূছাদ‘উলানা-রাব্বাকা বিমা‘আহিদা ‘ইনদাকা লাইন কাশাফতা ‘আন্নার রিজঝা লানু’মিনান্না লাকা ওয়ালানুরছিলান্না মা‘আকা বানীইছরাঈল।

যখন তাদের উপর শাস্তি আসত তারা বলত, হে মূসা! তোমার সাথে তোমার প্রতিপালকের যে ওয়াদা রয়েছে, তার অছিলায় আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালকের কাছে দোয়া কর (যাতে তিনি এ আযাব দূর করে দেন)। তুমি আমাদের থেকে এই আযাব অপসারণ করলে আমরা তোমার কথা মেনে নেব এবং বনী ইসরাঈলকে অবশ্যই তোমার সঙ্গে যেতে দেব।
১৩৫

فَلَمَّا کَشَفۡنَا عَنۡہُمُ الرِّجۡزَ اِلٰۤی اَجَلٍ ہُمۡ بٰلِغُوۡہُ اِذَا ہُمۡ یَنۡکُثُوۡنَ ١٣٥

ফালাম্মা-কাশাফনা-‘আনহুমুর রিজঝা ইলাআজালিন হুম বা-লিগূহু ইযা-হুম ইয়ানকুছূ ন।

অতঃপর যেই আমি তাদের উপর থেকে এক মেয়াদকাল পর্যন্ত আযাব দূর করতাম, যে পর্যন্ত তাদের পৌঁছা অবধারিত ছিল, ৬৬ অমনি তারা তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে ফিরে যেত।

তাফসীরঃ

৬৬. অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার জ্ঞানে ও তাদের নিয়তিতে একটা সময় তো স্থিরীকৃত ছিলই, যে সময় আসলে তাদেরকে আযাব দিয়ে ধ্বংস করা হবে। কিন্তু তার আগে যে ছোট-ছোট আযাব আসছিল তা কিছু কালের জন্য সরিয়ে নেওয়া হল।
১৩৬

فَانۡتَقَمۡنَا مِنۡہُمۡ فَاَغۡرَقۡنٰہُمۡ فِی الۡیَمِّ بِاَنَّہُمۡ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَکَانُوۡا عَنۡہَا غٰفِلِیۡنَ ١٣٦

ফানতাকামনা-মিনহুম ফাআগরাকনা-হুম ফিল ইয়াম্মি বিআন্নাহুম কাযযাবূবিআ-য়া-তিনাওয়া কা-নূ‘আনহা-গা-ফিলীন।

সুতরাং আমি তাদের থেকে বদলা নিলাম এবং তাদেরকে সাগরে নিমজ্জিত করলাম। ৬৭ কেননা তারা আমার নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং তা থেকে বিলকুল গাফেল হয়ে গিয়েছিল।

তাফসীরঃ

৬৭. ফির‘আউনকে সাগরে ডুবিয়ে ধ্বংস করার ঘটনা বিস্তারিতভাবে সূরা ইউনুস (১০ : ৮৯-৯২), সূরা তোয়াহা (২০ : ৭৭) ও সূরা শুআরায় (২৬ : ৬০-৬৬) আসছে।
১৩৭

وَاَوۡرَثۡنَا الۡقَوۡمَ الَّذِیۡنَ کَانُوۡا یُسۡتَضۡعَفُوۡنَ مَشَارِقَ الۡاَرۡضِ وَمَغَارِبَہَا الَّتِیۡ بٰرَکۡنَا فِیۡہَا ؕ وَتَمَّتۡ کَلِمَتُ رَبِّکَ الۡحُسۡنٰی عَلٰی بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ ۬ۙ بِمَا صَبَرُوۡا ؕ وَدَمَّرۡنَا مَا کَانَ یَصۡنَعُ فِرۡعَوۡنُ وَقَوۡمُہٗ وَمَا کَانُوۡا یَعۡرِشُوۡنَ ١٣٧

ওয়া আওরাছনাল কাওমাল্লাযীনা কা-নূইউছতাদ‘আফূনা মাশা-রিকাল আরদিওয়া মাগা-রিবাহাল্লাতী বা-রাকনা-ফীহা- ওয়া তাম্মাত কালিমাতুরাব্বিকাল হুছনা-‘আলাবানীইছরাঈলা বিমা-সাবারূ ওয়া দাম্মারনা-মা-কা-না ইয়াসনা‘উ ফির‘আওনু ওয়া কাওমুহূওয়া মা-কা-নূইয়া‘রিশূন।

আর যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত, আমি তাদেরকে সেই দেশের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী বানালাম, যেথায় আমি বরকত নাযিল করেছিলাম ৬৮ এবং বনী ইসরাঈলের ব্যাপারে তোমার প্রতিপালকের শুভ বাণী পূর্ণ হল, যেহেতু তারা সবর করেছিল; আর ফির‘আউন ও তার সম্প্রদায় যা-কিছু বানাত ও যা কিছু চড়াত, ৬৯ তা সব আমি ধ্বংস করে দিলাম।

তাফসীরঃ

৬৮. কুরআন মাজীদে যে বরকতপূর্ণ ভূমির কথা বলা হয়েছে তা দ্বারা শাম ও ফিলিস্তিন অঞ্চল বোঝানো উদ্দেশ্য। সুতরাং এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে, ফির‘আউন যাদেরকে দাস বানিয়ে রেখেছিল, তাদেরকে শাম ও ফিলিস্তিনির মালিক বানিয়ে দেওয়া হল। প্রকাশ থাকে যে, এ অঞ্চলে বনী ইসরাঈলের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ফির‘আউনের নিমজ্জিত হওয়ার দীর্ঘকাল পর, যা বিস্তারিতভাবে সূরা বাকারায় ২৪৬ থেকে ২৫১ নং আয়াতে গত হয়েছে।
১৩৮

وَجٰوَزۡنَا بِبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ الۡبَحۡرَ فَاَتَوۡا عَلٰی قَوۡمٍ یَّعۡکُفُوۡنَ عَلٰۤی اَصۡنَامٍ لَّہُمۡ ۚ قَالُوۡا یٰمُوۡسَی اجۡعَلۡ لَّنَاۤ اِلٰـہًا کَمَا لَہُمۡ اٰلِـہَۃٌ ؕ قَالَ اِنَّکُمۡ قَوۡمٌ تَجۡہَلُوۡنَ ١٣٨

ওয়া জাওয়াঝনা-ব্বিানীইছরাঈলাল বাহরা ফাআতাওঁ‘আলা-কাওমিইঁ ইয়া‘কুফূনা ‘আলাআসনা-মিল্লাহুম কা-লূইয়া-মূছাজ‘আল্লানাইলা-হান কামা-লাহুম আলিহাতুন কা-লা ইন্নাকুম কাওমুন তাজহালূন।

আমি বনী ইসরাঈলকে সাগর পার করিয়ে দিলাম। অতঃপর তারা এমন কিছু লোকের নিকট উপস্থিত হল, যারা তাদের মূর্তিপূজায় রত ছিল। বনী ইসরাঈল বলল, হে মূসা! এদের যেমন দেবতা আছে, তেমনি আমাদের জন্যও কোন দেবতা বানিয়ে দাও। ৭০ মূসা বলল, তোমরা এমন (আজব) লোক যে, মূর্খতাসুলভ কথা বলছ।

তাফসীরঃ

৭০. বনী ইসরাঈল মূসা আলাইহিস সালামের প্রতি ঈমান এনেছিল বটে এবং ফির‘আউনের জুলুম-নির্যাতনে বেশ সবরও করেছিল, যার প্রশংসা কুরআন মাজীদে করা হয়েছে, কিন্তু পরবর্তীতে তারা হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে নানাভাবে বিরক্তও করেছে। এখান থেকে আল্লাহ তাআলা এ রকম কিছু ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
১৩৯

اِنَّ ہٰۤؤُلَآءِ مُتَبَّرٌ مَّا ہُمۡ فِیۡہِ وَبٰطِلٌ مَّا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ١٣٩

ইন্না-হাউলাই মুতাব্বারুম মা-হুম ফীহি ওয়া বা-তিলুম মা-কা-নূইয়া‘মালূন।

নিশ্চয়ই এসব লোক যে ধান্ধায় লেগে আছে, সব ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তারা যা-কিছু করছে সব ভ্রান্ত।
১৪০

قَالَ اَغَیۡرَ اللّٰہِ اَبۡغِیۡکُمۡ اِلٰـہًا وَّہُوَ فَضَّلَکُمۡ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ ١٤۰

কা-লা আগাইরাল্লা-হি আবগীকুম ইলা-হাওঁ ওয়া হুওয়া ফাদ্দালাকুম ‘আলাল ‘আ-লামীন।

(এবং) সে বলল, তোমাদের জন্য কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য খুঁজে আনব? অথচ তিনিই তোমাদেরকে বিশ্বজগতের সমস্ত মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।
১৪১

وَاِذۡ اَنۡجَیۡنٰکُمۡ مِّنۡ اٰلِ فِرۡعَوۡنَ یَسُوۡمُوۡنَکُمۡ سُوۡٓءَ الۡعَذَابِ ۚ  یُقَتِّلُوۡنَ اَبۡنَآءَکُمۡ وَیَسۡتَحۡیُوۡنَ نِسَآءَکُمۡ ؕ  وَفِیۡ ذٰلِکُمۡ بَلَآءٌ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ عَظِیۡمٌ ٪ ١٤١

ওয়া ইযআনজাইনা-কুম মিন আ-লি ফির‘আওনা ইয়াছূমূনাকুম ছূআল ‘আযা-বি ইউকাত্তিলূনা আবনাআকুম ওয়া ইয়াছতাহইউনা নিছাআকুম ওয়াফী যা-লিকুম বালাউম মিররাব্বিকুম ‘আজীম।

এবং (আল্লাহ বলছেন স্মরণ কর), আমি তোমাদেরকে ফির‘আউনের লোকদের থেকে মুক্তি দিয়েছি, যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্টতম শাস্তি দিত তোমাদের পুত্রদেরকে হত্যা করত এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত। এ বিষয়ের মধ্যে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ছিল এক মহা পরীক্ষা।
১৪২

وَوٰعَدۡنَا مُوۡسٰی ثَلٰثِیۡنَ لَیۡلَۃً وَّاَتۡمَمۡنٰہَا بِعَشۡرٍ فَتَمَّ مِیۡقَاتُ رَبِّہٖۤ اَرۡبَعِیۡنَ لَیۡلَۃً ۚ وَقَالَ مُوۡسٰی لِاَخِیۡہِ ہٰرُوۡنَ اخۡلُفۡنِیۡ فِیۡ قَوۡمِیۡ وَاَصۡلِحۡ وَلَا تَتَّبِعۡ سَبِیۡلَ الۡمُفۡسِدِیۡنَ ١٤٢

ওয়া ওয়া-‘আদনা-মূছা-ছালা-ছীনা লাইলাতাওঁ ওয়া আতমামনা-হা-বি‘আশরিন ফাতাম্মা মীকা-তুরাব্বিহীআরবা‘ঈনা লাইলাতাওঁ ওয়া কা-লা মূছা-লিআখীহি হা-রূনাখ লুফনী ফী কাওমী ওয়া আসলিহওয়ালা-তাত্তাবি‘ ছাবীলাল মুফছিদীন।

আমি মূসার জন্য ত্রিশ রাতের মেয়াদ স্থির করেছিলাম (যে, এ রাতসমূহে তূর পাহাড়ে এসে ইতিকাফ করবে)। তারপর আরও দশ দ্বারা তা পূর্ণ করি। ৭১ এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত মেয়াদ চল্লিশ রাত হয়ে গেল এবং মূসা তার ভাই হারুনকে বলল, আমার অনুপস্থিতিতে তুমি আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সবকিছু ঠিকঠাক রাখবে এবং অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অনুসরণ করবে না।

তাফসীরঃ

৭১. ফির‘আউনের থেকে মুক্তি লাভ ও সাগর পার হওয়ার পর যা-কিছু ঘটেছিল তার কিছু ঘটনা এস্থলে উল্লেখ করা হয়নি। সূরা মায়েদায় ( ৫ : ২০-২৬) তার কিছু ঘটনা গত হয়েছে। সেসব আয়াতের টীকায় আমরা তার প্রয়োজনীয় বিবরণও উল্লেখ করেছি। এখানে তীহ উপত্যকা (সীনাহ মরুভূমি)-এর কিছু ঘটনা উল্লেখ করা হচ্ছে। বনী ইসরাঈলকে তাদের নাফরমানীর কারণে এ মরুভূমিতে চল্লিশ বছর পর্যন্ত আটকে রাখা হয়েছিল। (সূরা মায়েদায় সে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে)। এ সময় তারা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের কাছে দাবী করেছিল, আপনি নিজ ওয়াদা অনুযায়ী আমাদেরকে কোন আসমানী কিতাব এনে দিন, যে কিতাবে আমাদের জীবন যাপনের নীতিমালা লিপিবদ্ধ থাকবে। এ প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে তূর পাহাড়ে এসে ত্রিশ দিন ইতিকাফ করতে বললেন। পরে বিশেষ কোনও কারণে এ মেয়াদ বৃদ্ধি করে চল্লিশ দিন করে দেওয়া হল। এই ইতিকাফ চলাকালেই আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সৌভাগ্য দান করেন এবং মেয়াদ শেষে তাঁর উপর তাওরাত গ্রন্থ নাযিল করেন। এ কিতাব অনেকগুলো ফলকে লেখা ছিল।
১৪৩

وَلَمَّا جَآءَ مُوۡسٰی لِمِیۡقَاتِنَا وَکَلَّمَہٗ رَبُّہٗ ۙ قَالَ رَبِّ اَرِنِیۡۤ اَنۡظُرۡ اِلَیۡکَ ؕ قَالَ لَنۡ تَرٰىنِیۡ وَلٰکِنِ انۡظُرۡ اِلَی الۡجَبَلِ فَاِنِ اسۡتَقَرَّ مَکَانَہٗ فَسَوۡفَ تَرٰىنِیۡ ۚ فَلَمَّا تَجَلّٰی رَبُّہٗ لِلۡجَبَلِ جَعَلَہٗ دَکًّا وَّخَرَّ مُوۡسٰی صَعِقًا ۚ فَلَمَّاۤ اَفَاقَ قَالَ سُبۡحٰنَکَ تُبۡتُ اِلَیۡکَ وَاَنَا اَوَّلُ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ١٤٣

ওয়া লাম্মা-জাআ মূছা-লিমীকা-তিনা ওয়া কাল্লামাহূরাব্বুহূ কা-লা রাব্বি আরিনীআনজুর ইলাইকা কা-লা লান তারা-নী ওয়ালা-কিনিনজু র ইলাল জাবালি ফাইনিছতাকাররা মাকা-নাহূফাছাওফা তারা-নী ফালাম্মা-তাজাল্লা-রাব্বুহূলিলজাবালি জা‘আলাহূদাক্কাওঁ ওয়া খার রা মূছা-সা‘ঈকা- ফালাম্মাআফা-কা কা-লা ছুবহানাকা তুবতুইলাইকা ওয়া আনা আওওয়ালূল মু’মিনীন।

মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে এসে পৌঁছল এবং তার প্রতিপালক তাঁর সাথে কথা বললেন, তখন সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দেখা দিন, আমি আপনাকে দেখব। তিনি বললেন, তুমি আমাকে কিছুতেই দেখতে পাবে না। তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি দৃষ্টিপাত কর। তা যদি আপন স্থানে স্থির থাকে, তবে তুমি আমাকে দেখতে পারবে। ৭২ অতঃপর যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে তাজাল্লী ফেললেন (জ্যোতি প্রকাশ করলেন), তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেল। পরে যখন তার সংজ্ঞা ফিরে আসল, তখন সে বলল, আপনার সত্তা পবিত্র। আমি আপনার দরবারে তাওবা করছি এবং (দুনিয়ায় কেউ আপনাকে দেখতে সক্ষম নয় এ বিষয়ের প্রতি) আমি সবার আগে ঈমান আনছি।

তাফসীরঃ

৭২. এ দুনিয়ায় আল্লাহ তাআলাকে দেখা সম্ভব নয়। মানুষ তো দূরের কথা পাহাড়-পর্বতেরও এ ক্ষমতা নেই যে, আল্লাহ তাআলার তাজাল্লী বরদাশত করবে অর্থাৎ তিনি নিজ জ্যোতি প্রকাশ করলে তা সহ্য করবে। এ বিষয়টা হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে চাক্ষুষ দেখানোর জন্যই আল্লাহ তাআলা তূর পাহাড়ে তাজাল্লী ফেলেছিলেন, যা সে পাহাড়ের পক্ষে বরদাশত করা সম্ভব হয়নি।
১৪৪

قَالَ یٰمُوۡسٰۤی اِنِّی اصۡطَفَیۡتُکَ عَلَی النَّاسِ بِرِسٰلٰتِیۡ وَبِکَلَامِیۡ ۫ۖ فَخُذۡ مَاۤ اٰتَیۡتُکَ وَکُنۡ مِّنَ الشّٰکِرِیۡنَ ١٤٤

কা-লা ইয়া-মূছাইন্নিসতাফাইতুকা ‘আলান্না-ছি বিরিছা-লা-তী ওয়া বিকালা-মী ফাখুযমাআ-তাইতুকা ওয়া কুম মিনাশশা-কিরীন।

বললেন, হে মূসা! আমি আমার রিসালাত ও বাক্যালাপ দ্বারা মানুষের মধ্যে তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। সুতরাং আমি তোমাকে যা-কিছু দিলাম তা গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।
১৪৫

وَکَتَبۡنَا لَہٗ فِی الۡاَلۡوَاحِ مِنۡ کُلِّ شَیۡءٍ مَّوۡعِظَۃً وَّتَفۡصِیۡلًا لِّکُلِّ شَیۡءٍ ۚ فَخُذۡہَا بِقُوَّۃٍ وَّاۡمُرۡ قَوۡمَکَ یَاۡخُذُوۡا بِاَحۡسَنِہَا ؕ سَاُورِیۡکُمۡ دَارَ الۡفٰسِقِیۡنَ ١٤٥

ওয়া কাতাবনা-লাহূফিল আলওয়া-হিমিন কুল্লি শাইয়িম মাও‘ইজাতাওঁ ওয়া তাফসীলাল লিকুল্লি শাইয়িন ফাখুযহা-বিকুওওয়াতিওঁ ওয়া’মুর কাওমাকা ইয়া’খুযূবিআহছানিহা- ছাঊরীকুম দা-রাল ফা-ছিকীন।

এবং আমি ফলকসমূহে তার জন্য সর্ববিষয়ে উপদেশ এবং সবকিছুর বিস্তারিত ব্যাখ্যা লিখে দিয়েছি। (এবং আদেশ করেছি) এবার এগুলো শক্তভাবে ধর এবং নিজ সম্প্রদায়কে হুকুম দাও, এর উত্তম বিধানাবলী যেন মেনে চলে। ৭৩ আমি শীঘ্রই তোমাদেরকে অবাধ্যদের বাসস্থান দেখাব। ৭৪

তাফসীরঃ

৭৩. এর এক অর্থ হতে পারে এই যে, তাওরাতের সমস্ত বিধানই উত্তম। কাজেই সবগুলোই মেনে চলা উচিত। আবার এরূপ অর্থও করা যায় যে, তাওরাতে কোথাও একটি কাজকে জায়েয বলা হলে অন্যত্র অন্য কাজকে উত্তম বা মুস্তাহাব বলা হয়েছে। যেমন কিসাস গ্রহণ জায়েয, কিন্তু ক্ষমা করা উত্তম এবং প্রতিশোধ গ্রহণ জায়েয, কিন্তু সবর করা উত্তম। তো আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দাবী হচ্ছে, যে কাজকে উত্তম বলা হয়েছে তারই অনুসরণ করা।
১৪৬

سَاَصۡرِفُ عَنۡ اٰیٰتِیَ الَّذِیۡنَ یَتَکَبَّرُوۡنَ فِی الۡاَرۡضِ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ ؕ وَاِنۡ یَّرَوۡا کُلَّ اٰیَۃٍ لَّا یُؤۡمِنُوۡا بِہَا ۚ وَاِنۡ یَّرَوۡا سَبِیۡلَ الرُّشۡدِ لَا یَتَّخِذُوۡہُ سَبِیۡلًا ۚ وَاِنۡ یَّرَوۡا سَبِیۡلَ الۡغَیِّ یَتَّخِذُوۡہُ سَبِیۡلًا ؕ ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَکَانُوۡا عَنۡہَا غٰفِلِیۡنَ ١٤٦

ছাআসরিফু‘আন আ-য়া-তিয়াল্লাযীনা ইয়াতাকাব্বারূনা ফিল আরদিবিগাইরিল হাক্কি ওয়াইয়ঁইয়ারাও কুল্লা আ-য়াতিল লা-ইউ’মিনূবিহা- ওয়াইয়ঁইয়ারাও ছাবীলাররুশদি লাইয়াত্তাখিযূহু ছাবীলাওঁ ওয়াইয়ঁইয়ারাও ছাবীলাল গাইয়ি ইয়াত্তাখিযূহু ছাবীলান যালিকা বিআন্নাহুম কাযযাবূবিআ-য়া-তিনা-ওয়া কা-নূ‘আনহা-গা-ফিলীন।

পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে অহংকার প্রকাশ করে, তাদেরকে আমি আমার নিদর্শনাবলী হতে বিমুখ করে রাখব। তারা সব রকমের নিদর্শন দেখলেও তাতে ঈমান আনবে না। তারা যদি হিদায়াতের সরল পথ দেখতে পায়, তবে তাকে নিজের পথ হিসেবে গ্রহণ করবে না, আর যদি গোমরাহীর পথ দেখতে পায়, তাকে নিজের পথ বানাবে। কারণ তারা আমার নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তা থেকে বিলকুল গাফেল হয়ে গেছে।
১৪৭

وَالَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَلِقَآءِ الۡاٰخِرَۃِ حَبِطَتۡ اَعۡمَالُہُمۡ ؕ  ہَلۡ یُجۡزَوۡنَ اِلَّا مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ٪ ١٤٧

ওয়াল্লাযীনা কাযযাবূবিআ-য়া-তিনা-ওয়া লিকাইল আ-খিরাতি হাবিতাতআ‘মালুহুম হাল ইউজঝাওনা ইল্লা-মা-কা-নূইয়া‘মালূন।

যারা আমার নিদর্শনসমূহ ও আখিরাতের সম্মুখীন হওয়াকে অস্বীকার করেছে, তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল হয়ে গেছে। তাদেরকে তো কেবল তারা যা কিছু করত তারই বদলা দেওয়া হবে। ৭৫

তাফসীরঃ

৭৫. উপরে যে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে অহংকার প্রকাশ করে, তাদেরকে আমি আমার নিদর্শনাবলী হতে বিমুখ করে রাখব’, এর দ্বারা কারও মনে এই খটকা জাগতে পারত যে, আল্লাহ তাআলা নিজেই যখন তাদেরকে নিজের নিদর্শনসমূহ হতে ফিরিয়ে রেখেছেন, তখন তাদের কী অপরাধ? এই খটকার নিরসন করা হয়েছে এই বাক্য দ্বারা। বলা হচ্ছে যে, কেউ যখন নিজ ইচ্ছাক্রমে কুফরকেই ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, তখন আমি সেই পথই তার জন্য স্থির করে দেই, যা সে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে নিয়েছে। সে যেহেতু আমার নিদর্শনসমূহ থেকে ফিরে থাকতেই চাচ্ছিল, তাই আমি তাকে তার ইচ্ছার বিপরীতে অন্য কিছু করতে বাধ্য করি না। বরং তাকে তার ইচ্ছানুসারে বিমুখ করেই রাখি। সুতরাং সে যে শাস্তি ভোগ করে, তা তার নিজ কর্মেরই কারণে ভোগ করে, যা সে স্বেচ্ছায় ক্রমাগত করে যাচ্ছিল।
১৪৮

وَاتَّخَذَ قَوۡمُ مُوۡسٰی مِنۡۢ بَعۡدِہٖ مِنۡ حُلِیِّہِمۡ عِجۡلًا جَسَدًا لَّہٗ خُوَارٌ ؕ اَلَمۡ یَرَوۡا اَنَّہٗ لَا یُکَلِّمُہُمۡ وَلَا یَہۡدِیۡہِمۡ سَبِیۡلًا ۘ اِتَّخَذُوۡہُ وَکَانُوۡا ظٰلِمِیۡنَ ١٤٨

ওয়াত্তাখাযা কাওমু মূছা-মিম বা‘দিহী মিন হুলিইয়িহিম ‘ইজলান জাছাদাল্লাহূখুওয়া-রুন আলাম ইয়ারাও আন্নাহূলা-ইউকালিলমুহুম ওয়ালা-ইয়াহদীহিম ছাবীলা- । ইত্তাখাযূহু ওয়া কা-নূজা-লিমীন।

আর মূসার সম্প্রদায় তার অনুপস্থিতিতে তাদের অলংকার দ্বারা একটি বাছুর বানাল, (বাছুরটি কেমন ছিল?), একটি (প্রাণহীন) দেহ, যা থেকে গরুর মত ডাক বের হচ্ছিল। ৭৬ তারা কি এতটুকুও দেখল না যে, তা না তাদের সাথে কথা বলতে পারে আর না তাদেরকে কোনও পথ দেখাতে পারে? (কিন্তু) তারা সেটিকে (উপাস্য) বানিয়ে নিল এবং (নিজেদের প্রতিই) জুলুমকারী হয়ে গেল।

তাফসীরঃ

৭৬. এ বাছুরটির বৃত্তান্ত সংক্ষেপে সূরা বাকারায় (২ : ৫১) গত হয়েছে। আর বিস্তারিতভাবে সূরা তোয়াহায় (২০ : ৮৮) আসবে। সেখানে বলা হবে, যাদুকর সামেরী বাছুরটি তৈরি করেছিল এবং বনী ইসরাঈলকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে, এটিই তোমাদের খোদা (নাউযুবিল্লাহ)।
১৪৯

وَلَمَّا سُقِطَ فِیۡۤ اَیۡدِیۡہِمۡ وَرَاَوۡا اَنَّہُمۡ قَدۡ ضَلُّوۡا ۙ قَالُوۡا لَئِنۡ لَّمۡ یَرۡحَمۡنَا رَبُّنَا وَیَغۡفِرۡ لَنَا لَنَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ ١٤٩

ওয়া লাম্মা-ছুকিতা ফীআইদীহিম ওয়া রাআও আন্নাহুম কাদ দাললূ কা-লূলাইল্লাম ইয়ারহামনা-রাব্বুনা-ওয়া ইয়াগফির লানা-লানাকূনান্না মিনাল খা-ছিরীন।

তারা যখন (নিজ কৃতকর্মের কারণে) অনুতপ্ত হল এবং উপলব্ধি করল যে, তারা বিপথগামী হয়ে গেছে, তখন বলতে লাগল, আল্লাহ যদি আমাদের প্রতি দয়া না করেন ও আমাদেরকে ক্ষমা না করেন, তবে নিশ্চয়ই আমরা বরবাদ হয়ে যাব।
১৫০

وَلَمَّا رَجَعَ مُوۡسٰۤی اِلٰی قَوۡمِہٖ غَضۡبَانَ اَسِفًا ۙ قَالَ بِئۡسَمَا خَلَفۡتُمُوۡنِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِیۡ ۚ اَعَجِلۡتُمۡ اَمۡرَ رَبِّکُمۡ ۚ وَاَلۡقَی الۡاَلۡوَاحَ وَاَخَذَ بِرَاۡسِ اَخِیۡہِ یَجُرُّہٗۤ اِلَیۡہِ ؕ قَالَ ابۡنَ اُمَّ اِنَّ الۡقَوۡمَ اسۡتَضۡعَفُوۡنِیۡ وَکَادُوۡا یَقۡتُلُوۡنَنِیۡ ۫ۖ فَلَا تُشۡمِتۡ بِیَ الۡاَعۡدَآءَ وَلَا تَجۡعَلۡنِیۡ مَعَ الۡقَوۡمِ الظّٰلِمِیۡنَ ١٥۰

ওয়া লাম্মা-রাজা‘আ মূছাইলা-কাওমিহীগাদবা-না আছিফান কা-লা বি’ছামাখালাফতুমূনী মিম বা‘দী আ‘আজিলতুম আমরা রাব্বিকুম ওয়া আলকাল আলওয়াহা ওয়া আখাযা বিরা’ছি আখীহি ইয়াজুররুহূইলাইহি কা-লাবনা উম্মা ইন্নাল কাওমাছ তাদ‘আফূনী ওয়া কা-দূইয়াকতুলূনানী ফালা-তুশমিত বিয়াল আ‘দাআ ওয়ালাতাজ‘আলনী মা‘আল কাওমিজ্জা-লিমীন।

এবং মূসা যখন ক্রুদ্ধ ও ব্যথিত হয়ে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে আসল, তখন সে বলল, তোমরা আমার অনুপস্থিতিতে আমার কতইনা নিকৃষ্ট প্রতিনিধিত্ব করেছ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের আদেশের অপেক্ষা না করে তাড়াহুড়া করলে? ৭৭ এবং (এই বলে) সে ফলকগুলি ফেলে দিল ৭৮ এবং নিজ ভাই (হারুন আলাইহিস সালাম)-এর মাথা ধরে তাকে নিজের দিকে টানছিল। ৭৯ সে বলল, হে আমার মায়ের পুত্র! বিশ্বাস কর, লোকজন আমাকে দুর্বল মনে করেছিল এবং আমাকে প্রায় হত্যা করেই ফেলেছিল। তুমি শত্রুদেরকে আমার প্রতি হাসার সুযোগ দিয়ো না এবং আমাকে জালেমদের মধ্যে গণ্য করো না।

তাফসীরঃ

৭৭. অর্থাৎ আমি তো তোমাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার বিধান আনতেই গিয়েছিলাম এবং সেজন্য আল্লাহ তা‘আলা চল্লিশ দিনের সময় দিয়েছিলেন। এটা এমন কিছু দীর্ঘ সময় ছিল না যে, তোমাদের পক্ষে ধৈর্য ধরা অসম্ভব হত। তা হলে কেন তোমরা তাড়াহুড়া করে এভাবে আমার শিক্ষার বিপরীতে বাছুর পূজায় লিপ্ত হলে? -অনুবাদক
১৫১

قَالَ رَبِّ اغۡفِرۡ لِیۡ وَلِاَخِیۡ وَاَدۡخِلۡنَا فِیۡ رَحۡمَتِکَ ۫ۖ  وَاَنۡتَ اَرۡحَمُ الرّٰحِمِیۡنَ ٪ ١٥١

কা-লা রাব্বিগফিরলী ওয়া লিআখী ওয়া আদখিলনা-ফী রাহমাতিকা ওয়া আনতা আরহামুর রা-হিমীন।

মূসা বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা কর এবং আমাদেরকে তোমার দয়ার ভেতর দাখিল কর। তুমি শ্রেষ্ঠতম দয়ালু।
১৫২

اِنَّ الَّذِیۡنَ اتَّخَذُوا الۡعِجۡلَ سَیَنَالُہُمۡ غَضَبٌ مِّنۡ رَّبِّہِمۡ وَذِلَّۃٌ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ؕ وَکَذٰلِکَ نَجۡزِی الۡمُفۡتَرِیۡنَ ١٥٢

ইন্নাল্লাযীনাত তাখাযুল ‘ইজলা ছাইয়ানা-লুহুম গাদাবুম মির রাব্বিহিম ওয়া যিল্লাতুন ফিল হায়া-তিদদুনইয়া ওয়া কাযা-লিকা নাজযিল মুফতারীন।

(আল্লাহ বললেন), যারা বাছুরকে (উপাস্য) বানিয়েছে, তাদের উপর শীঘ্রই তাদের প্রতিপালকের ক্রোধ এবং পার্থিব জীবনেই লাঞ্ছনা আপতিত হবে। যারা মিথ্যা রচনা করে, আমি এভাবেই তাদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি।
১৫৩

وَالَّذِیۡنَ عَمِلُوا السَّیِّاٰتِ ثُمَّ تَابُوۡا مِنۡۢ بَعۡدِہَا وَاٰمَنُوۡۤا ۫ اِنَّ رَبَّکَ مِنۡۢ بَعۡدِہَا لَغَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ١٥٣

ওয়াল্লাযীনা ‘আমিলুছছাইয়িআ-তি ছুম্মা তা-বূমিম বা‘দিহা-ওয়া আ-মানূ ইন্না রাব্বাকা মিম বা‘দিহা-লাগাফুরুর রাহীম।

আর যারা মন্দ কাজ করে ফেলে তারপর তাওবা করে নেয় ও ঈমান আনে, তোমার প্রতিপালক সেই তাওবার পর (তাদের পক্ষে) অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
১৫৪

وَلَمَّا سَکَتَ عَنۡ مُّوۡسَی الۡغَضَبُ اَخَذَ الۡاَلۡوَاحَ ۚۖ وَفِیۡ نُسۡخَتِہَا ہُدًی وَّرَحۡمَۃٌ لِّلَّذِیۡنَ ہُمۡ لِرَبِّہِمۡ یَرۡہَبُوۡنَ ١٥٤

ওয়া লাম্মা-ছাকাতা ‘আম মূছাল গাদাবুআখাযাল আলওয়া-হা ওয়া ফী নুছখাতিহাহুদাওঁ ওয়া রাহমাতুললিল্লাযীনা হুম লিরাব্বিহিম ইয়ারহাবূন।

আর যখন মূসার রাগ থেমে গেল, তখন সে ফলকগুলো তুলে নিল, আর তাতে যা লেখা ছিল তা ছিল সেই সকল লোকের পক্ষে হিদায়াত ও রহমত, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে।
১৫৫

وَاخۡتَارَ مُوۡسٰی قَوۡمَہٗ سَبۡعِیۡنَ رَجُلًا لِّمِیۡقَاتِنَا ۚ فَلَمَّاۤ اَخَذَتۡہُمُ الرَّجۡفَۃُ قَالَ رَبِّ لَوۡ شِئۡتَ اَہۡلَکۡتَہُمۡ مِّنۡ قَبۡلُ وَاِیَّایَ ؕ اَتُہۡلِکُنَا بِمَا فَعَلَ السُّفَہَآءُ مِنَّا ۚ اِنۡ ہِیَ اِلَّا فِتۡنَتُکَ ؕ تُضِلُّ بِہَا مَنۡ تَشَآءُ وَتَہۡدِیۡ مَنۡ تَشَآءُ ؕ اَنۡتَ وَلِیُّنَا فَاغۡفِرۡ لَنَا وَارۡحَمۡنَا وَاَنۡتَ خَیۡرُ الۡغٰفِرِیۡنَ ١٥٥

ওয়াখতা-রা মূছা-কাওমাহূছাবা‘ঈনা রাজুলাল লিমীকা-তিনা- ফালাম্মাআখাযাতহুমুর রাজফাতুকা-লা রাব্বি লাও শি’তা আহলাকতাহুম মিন কাবলুওয়াইয়্যা-ইয়া আতুহলিকুনা-বিমা-ফা‘আলাছছুফাহাউ মিন্না- ইন হিয়া ইল্লা-ফিতনাতুকা তুদিল্লু বিহা-মান তাশাউ ওয়া তাহদী মান তাশাউ আনতা ওয়ালিইউনা-ফাগফিরালানাওয়ারহামনা-ওয়া আনতা খাইরুল গা-ফিরীন।

মূসা তার সম্প্রদায় হতে সত্তর জন লোককে আমার স্থিরীকৃত সময়ে (তূর পাহাড়ে) আনার জন্য মনোনীত করল। ৮০ অতঃপর যখন তাদেরকে ভূমিকম্প আক্রান্ত করল তখন মূসা বলল, হে আমার প্রতিপালক! আপনি চাইলে পূর্বেই তো তাদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতেন। আমাদের মধ্যকার কিছু নির্বোধ লোকের কর্মকাণ্ডের কারণে কি আমাদের সকলকে ধ্বংস করবেন? ৮১ (বলাবাহুল্য, আপনি তা করবেন না। সুতরাং বোঝা গেল) এ ঘটনা আপনার পক্ষ হতে কেবল এক পরীক্ষা, যার মাধ্যমে আপনি যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করবেন এবং যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করবেন। আপনিই আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন ও আমাদের প্রতি রহম করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ক্ষমাশীল।

তাফসীরঃ

৮০. সত্তরজন লোককে কী কারণে তূর পাহাড়ে আনা হয়েছিল, সে সম্পর্কে মুফাসসিরগণ বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। কেউ বলেন, বনী ইসরাঈলের দ্বারা বাছুর পূজার যে গুরুতর পাপ ঘটেছিল, সেজন্য তাওবা করানোর লক্ষ্যে তাদেরকে তূর পাহাড়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু সেটাই যদি হয়, তবে তাদেরকে ভূমিকম্পের কবলে ফেলার কোন যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা করা মুশকিল। যেসব ব্যাখ্যা করা হয়েছে তার কোনওটাই টানাকষা থেকে মুক্ত নয়। সুতরাং সর্বাপেক্ষা সঠিক কথা সম্ভবত এই, যেমন কোনও কোনও বর্ণনায় আছে, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন তাওরাত নিয়ে আসলেন এবং বনী ইসরাঈলকে তার অনুসরণ করতে হুকুম দিলেন, তখন তাদের মধ্য হতে কেউ কেউ বলল, আমরা এটা কি করে বিশ্বাস করব যে, এ কিতাব আল্লাহ তাআলাই নাযিল করেছেন? তখন আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে বললেন, তিনি যেন কওমের সত্তর জন প্রতিনিধি বাছাই করে তাদেরকে তূর পাহাড়ে নিয়ে আসেন। কোনও কোনও বর্ণনায় আছে, সেখানে তাদেরকে আল্লাহর কথা শুনিয়ে দেওয়া হল। কিন্তু এতে তাদের দাবী আরও বেড়ে গেল। বলল, আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলাকে চাক্ষুষ না দেখব, ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস করব না। এই হঠকারিতাপূর্ণ দাবির কারণে তাদের উপর এমন বজ্রধ্বনি হল যে, তাতে ভূমিকম্পের মত অবস্থা সৃষ্টি হয়ে গেল এবং তারা সকলে বেহুঁশ হয়ে গেল। ঘটনার এ বিবরণ কুরআন মাজীদের বর্ণনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। সূরা বাকারা (২ : ৫৫-৫৬) ও সূরা নিসায় (৪ : ১৫৩) বলা হয়েছে, বনী ইসরাঈল দাবী করেছিল, আমাদেরকে খোলা চোখে আল্লাহ দর্শন করাও এবং আমরা নিজেরা যতক্ষণ আল্লাহকে না দেখব ততক্ষণ পর্যন্ত তাওরাত মানব না। উল্লিখিত সূরা দু’টিতে একথাও আছে যে, এ দাবীর কারণে তাদের উপর বজ্রপাত করা হয়েছিল। সম্ভবত সেই বজ্রপাতের কারণেই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়েছিল, যার উল্লেখ এ আয়াতে করা হয়েছে। প্রকাশ থাকে যে, সূরা নিসায় (৪ : ১৫৩) বজ্রপাতের উল্লেখ করার পর ثم اتخذوا العجل (অতঃপর তারা বাছুর পূজায় লিপ্ত হল) বলার দ্বারা এটা অনিবার্য হয়ে যায় না যে, বজ্রপাত হয়েছিল বাছুর পূজায় লিপ্ত হওয়ার আগে। কেননা সেখানে বনী ইসরাঈলের অনেকগুলো কুকর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, আর সেগুলো যে কালগতক্রম অনুসারে সাজানো হয়েছে এটা জরুরী নয়। তাছাড়া ثم শব্দটি ‘তদুপরি’ অর্থেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
১৫৬

وَاکۡتُبۡ لَنَا فِیۡ ہٰذِہِ الدُّنۡیَا حَسَنَۃً وَّفِی الۡاٰخِرَۃِ اِنَّا ہُدۡنَاۤ اِلَیۡکَ ؕ  قَالَ عَذَابِیۡۤ اُصِیۡبُ بِہٖ مَنۡ اَشَآءُ ۚ  وَرَحۡمَتِیۡ وَسِعَتۡ کُلَّ شَیۡءٍ ؕ  فَسَاَکۡتُبُہَا لِلَّذِیۡنَ یَتَّقُوۡنَ وَیُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ بِاٰیٰتِنَا یُؤۡمِنُوۡنَ ۚ ١٥٦

ওয়াকতুব লানা-ফী হা-যিহিদ দুনইয়া-হাছানাতাওঁ ওয়া ফিল আ-খিরাতি ইন্নাহুদনাইলাইকা কা-লা ‘আযা-বী উসীবুবিহী মান আশাউ, ওয়া রাহমাতী ওয়াছি‘আত কুল্লা শাইয়িন ফাছাআকতুবুহা-লিল্লাযীনা ইয়াত্তাকূনা ওয়া ইয়ু’তূনাঝঝাকাতা ওয়াল্লাযীনা হুম বিআ-য়া-তিনা-ইউ’মিনূন।

আমাদের জন্য এ দুনিয়াতেও কল্যাণ লিখে দিন এবং আখিরাতেও। (এতদুদ্দেশ্যে) আমরা আপনারই দিকে রুজু করছি। আল্লাহ বললেন, আমি আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছাকরি দিয়ে থাকি আর আমার দয়া সে তো প্রত্যেক বস্তুতে ব্যাপ্ত। ৮২ সুতরাং আমি এ রহমত (পরিপূর্ণভাবে) সেই সব লোকের জন্য লিখব, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যাকাত দেয় এবং যারা আমার আয়াত সমূহে ঈমান রাখে ৮৩

তাফসীরঃ

৮২. অর্থাৎ আমার রহমত আমার ক্রোধ অপেক্ষা উপরে। দুনিয়ার শাস্তি আমি সকল অপরাধীকে দেই না; বরং আমি নিজ জ্ঞান ও হিকমত অনুযায়ী যাকে ইচ্ছা করি তাকেই দিয়ে থাকি। আখিরাতেও প্রতিটি অপরাধের কারণে শাস্তি দান অবধারিত নয়। বরং যারা ঈমান আনে, তাদের বহু অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিয়ে থাকি। হ্যাঁ, যাদের অবাধ্যতা কুফর ও শিরকরূপে সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাদেরকে আমি নিজ ইচ্ছা ও হিকমত অনুযায়ী শাস্তি দান করি। অপর দিকে দুনিয়ায় আমার রহমত সর্বব্যাপী। মুমিন ও কাফের এবং পাপিষ্ঠ ও পুণ্যবান সকলেই তা ভোগ করে। সুতরাং তিনি সকলকেই রিযক দেন এবং সকলেই সুস্থতা ও নিরাপত্তা লাভ করে। আখিরাতেও কুফর-শিরক ছাড়া অপরাপর গুনাহ তার সেই দয়ায় ক্ষমা করা হবে।
১৫৭

اَلَّذِیۡنَ یَتَّبِعُوۡنَ الرَّسُوۡلَ النَّبِیَّ الۡاُمِّیَّ الَّذِیۡ یَجِدُوۡنَہٗ مَکۡتُوۡبًا عِنۡدَہُمۡ فِی التَّوۡرٰىۃِ وَالۡاِنۡجِیۡلِ ۫  یَاۡمُرُہُمۡ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَیَنۡہٰہُمۡ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَیُحِلُّ لَہُمُ الطَّیِّبٰتِ وَیُحَرِّمُ عَلَیۡہِمُ الۡخَبٰٓئِثَ وَیَضَعُ عَنۡہُمۡ اِصۡرَہُمۡ وَالۡاَغۡلٰلَ الَّتِیۡ کَانَتۡ عَلَیۡہِمۡ ؕ  فَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِہٖ وَعَزَّرُوۡہُ وَنَصَرُوۡہُ وَاتَّبَعُوا النُّوۡرَ الَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ مَعَہٗۤ ۙ  اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ ٪ ١٥٧

আল্লাযীনা ইয়াত্তাবি‘ঊনার রাছূলান্নাবিইয়াল উম্মিইয়াল্লাযী ইয়াজিদূ নাহূমাকতূবান ‘ইনদাহুম ফিততাওরা-তি ওয়াল ইনজীলি ইয়া’মরুহুম বিলমা‘রূফি ওয়া ইয়ানহা-হুম ‘আনিল মুনকারি ওয়া ইউহিল্লুলাহুমুততাইয়িবা-তি ওয়া ইউ হাররিমু‘আলাইহিমুল খাবাইছা ওয়া ইয়াদা‘উ ‘আনহুম ইসরাহুম ওয়াল আগলা-লাল্লাতী কা-নাত ‘আলাইহিম ফাল্লাযীনা আমানূবিহী ওয়া ‘আঝঝারুহু ওয়া নাসারুহু ওয়াত্তাবা‘উন নূরাল্লাযী উনঝিলা মা‘আহূ উলাইকা হুমুল মুফলিহূন।

যারা এই রাসূলের অর্থাৎ উম্মী নবীর অনুসরণ করে, যার কথা তারা তাওরাত ও ইনজীলে, যা তাদের নিকট আছে, লিপিবদ্ধ পাবে, ৮৪ যে তাদেরকে সৎকাজের আদেশ করবে ও মন্দ কাজে নিষেধ করবে এবং তাদের জন্য উৎকৃষ্ট বস্তু হালাল করবে ও নিকৃষ্ট বস্তু হারাম করবে এবং তাদের থেকে ভার ও গলার বেড়ি নামাবে, যা তাদের উপর চাপানো ছিল। ৮৫ সুতরাং যারা তার (অর্থাৎ নবীর) প্রতি ঈমান আনবে, তাকে সম্মান করবে, তার সাহায্য করবে এবং তার সঙ্গে যে নূর অবতীর্ণ করা হয়েছে তার অনুসরণ করবে, তারাই হবে সফলকাম।

তাফসীরঃ

৮৪. হযরত মূসা আলাইহিস সালামের ওফাতের পরও বনী ইসরাঈলের সামনে শত-শত বছরের পথ-পরিক্রমা ছিল। তিনি দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ চেয়ে যে দোয়া করেছিলেন, তার ভেতর বনী ইসরাঈলের আগামী প্রজন্মও শামিল ছিল। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করার সময় এটাও স্পষ্ট করে দিলেন যে, শেষ নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমলে বনী ইসরাঈলের যে সকল লোক জীবিত থাকবে, তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ কেবল সেই অবস্থায়ই হতে পারে, যখন তারা শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান আনবে ও তার অনুসরণ করবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা তাঁর কিছু বৈশিষ্ট্যও উল্লেখ করে দিয়েছেন। প্রথম বৈশিষ্ট্য হল, তিনি নবী হওয়ার সাথে সাথে রাসূলও হবেন। সাধারণত রাসূল শব্দটি এমন নবীর জন্য প্রযোজ্য হয়, যিনি নতুন শরীয়ত (বিধি-বিধান) নিয়ে আসেন। সুতরাং এ শব্দ দ্বারা ইশারা করে দেওয়া হয়েছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নতুন শরীয়ত নিয়ে আসবেন। সে শরীয়তের কিছু-কিছু বিধান তাওরাতে প্রদত্ত বিধান থেকে ভিন্ন রকমও হতে পারে। তখন একথা বলা যাবে না যে, ইনি যেহেতু আমাদের শরীয়ত থেকে ভিন্ন রকমের বিধান শেখাচ্ছেন, তাই আমরা তার প্রতি ঈমান আনতে পারি না। সুতরাং আগেই বলে দেওয়া হচ্ছে যে, প্রতি যুগের প্রয়োজন ও চাহিদা আলাদা হয়ে থাকে, যে কারণে যে রাসূল নতুন শরীয়ত নিয়ে আসেন তাঁর প্রদত্ত শাখাগত বিধান পূর্বের শরীয়ত থেকে পৃথক হতেই পারে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে, তিনি উম্মী হবেন অর্থাৎ তার লেখাপড়া জানা থাকবে না। সাধারণত বনী ইসরাঈল উম্মী বা নিরক্ষর ছিল না। আরবদেরকেই উম্মী বলা হত (দেখুন কুরআন মাজীদ ২ : ৭৮; ৩ : ২০; ৬২ : ২)। খোদ ইয়াহুদীরাও আরবদের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশের জন্য এ শব্দটি ব্যবহার করত (দেখুন সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ৭৫)। সুতরাং এ শব্দটি দ্বারা ইশারা করে দেওয়া হয়েছে যে, শেষ নবীর আবির্ভাব বনী ইসরাঈলের নয়; বরং আরবদের মধ্যেই হবে। তাঁর তৃতীয় বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে এই যে, তাওরাত ও ইনজীল উভয় গ্রন্থে তাঁর উল্লেখ থাকবে। এর দ্বারা সেই সব সুসংবাদ ও ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি ইশারা করা হয়েছে, যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তাওরাত ও ইনজীলে তার আগমনের বহু আগেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যাপক রদবদল সত্ত্বেও আজও বাইবেলে এ রকমের বহু ভবিষ্যদ্বাণীর উল্লেখ পাওয়া যায়। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন মাওলানা রহমাতুল্লাহ কীরানবী (রহ.) রচিত ‘ইজহারুল হক’ গ্রন্থের উর্দূ অনুবাদ, যা ‘বাইবেল ছে কুরআন তাক’ নামে প্রকাশিত হয়েছে (-অনুবাদক মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী উসমানী)।
১৫৮

قُلۡ یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰہِ اِلَیۡکُمۡ جَمِیۡعَۨا الَّذِیۡ لَہٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ یُحۡیٖ وَیُمِیۡتُ ۪ فَاٰمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَرَسُوۡلِہِ النَّبِیِّ الۡاُمِّیِّ الَّذِیۡ یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَکَلِمٰتِہٖ وَاتَّبِعُوۡہُ لَعَلَّکُمۡ تَہۡتَدُوۡنَ ١٥٨

কুল ইয়াআইয়ূহান্না-ছুইন্নী রাছূলুল্লা-হি ইলাইকুম জামী‘আ নিল্লাযী লাহূমুলকুছছামাওয়া-তি ওয়াল আরদি লাইলা-হা ইল্লা-হুওয়া ইউহয়ী ওয়া ইউমীতু ফাআ-মিনূ বিল্লা-হি ওয়া রাছূলিহিন নাবিইয়িল উম্মিইয়িল্লাযী ইউ’মিনুবিল্লা-হি ওয়া কালিমা-তিহী ওয়াত্তাবি‘উহু লা‘আল্লাকুম তাহতাদূ ন।

(হে রাসূল! তাদেরকে) বল, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি সেই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, ৮৬ যার আয়ত্তে আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর রাজত্ব। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর সেই রাসূলের প্রতি ঈমান আন, যিনি উম্মী নবী এবং যিনি আল্লাহ ও তার বাণীসমূহে বিশ্বাস রাখেন এবং তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা হিদায়াত লাভ কর।

তাফসীরঃ

৮৬. পূর্বে বলা হয়েছিল যে, হযরত মূসা আলাইহিস সালামের দোয়া কবুল করার সময় তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, বনী ইসরাঈলের ভবিষ্যত প্রজন্মকে মুক্তি লাভ করতে হলে শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অবশ্যই ঈমান আনতে হবে। সেই প্রসঙ্গে এস্থলে একটি অন্তর্বর্তী বাক্যস্বরূপ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, তিনি যেন বনী ইসরাঈলসহ বিশ্বের সমস্ত মানুষকে তাঁর নবুওয়াতের প্রতি ঈমান আনা ও তাঁর অনুসরণ করার দাওয়াত দেন।
১৫৯

وَمِنۡ قَوۡمِ مُوۡسٰۤی اُمَّۃٌ یَّہۡدُوۡنَ بِالۡحَقِّ وَبِہٖ یَعۡدِلُوۡنَ ١٥٩

ওয়া মিন কাওমি মূছাউম্মাতুইঁ ইয়াহদূনা বিলহাক্কিওয়া বিহী ইয়া‘দিলূন।

মূসার সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একটি দলও আছে, যারা (মানুষকে) সত্যের পথ দেখায় এবং সেই (সত্য) অনুসারে ইনসাফ করে। ৮৭

তাফসীরঃ

৮৭. ইয়াহুদীদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান আনার যে দাওয়াত দেওয়া হয় এবং এর আগে তাদের যে বিভিন্ন দুষ্কর্মের বর্ণনা দেওয়া হয়, তা দৃষ্টে কারও মনে এই ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, বনী ইসরাঈলের সমস্ত মানুষই সেসব দুষ্কর্মে লিপ্ত ছিল। তাই আল্লাহ তাআলা এস্থলে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, বনী ইসরাঈলের সব লোক এ রকম নয়। বরং তাদের মধ্যে এমন কিছু লোকও আছে, যারা সত্যকে স্বীকার করে, সত্যের অনুসরণ করে এবং মানুষকে সত্যের পথ দেখায়। বনী ইসরাঈলের যে সমস্ত লোক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগে সত্য দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তারাও যেমন এর অন্তর্ভুক্ত, তেমনি সেই সকল বনী ইসরাঈলও, যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান এনেছে, যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাযি.) ও তার সঙ্গীগণ। এ বিষয়টা স্পষ্ট করে দেওয়ার পর হযরত মূসা আলাইহিস সালামের সমকালীন বনী ইসরাঈলের যে ঘটনাবলী বর্ণিত হয়ে আসছিল, পুনরায় তা শুরু করা হচ্ছে।
১৬০

وَقَطَّعۡنٰہُمُ اثۡنَتَیۡ عَشۡرَۃَ اَسۡبَاطًا اُمَمًا ؕ وَاَوۡحَیۡنَاۤ اِلٰی مُوۡسٰۤی اِذِ اسۡتَسۡقٰىہُ قَوۡمُہٗۤ اَنِ اضۡرِبۡ بِّعَصَاکَ الۡحَجَرَ ۚ فَانۡۢبَجَسَتۡ مِنۡہُ اثۡنَتَا عَشۡرَۃَ عَیۡنًا ؕ قَدۡ عَلِمَ کُلُّ اُنَاسٍ مَّشۡرَبَہُمۡ ؕ وَظَلَّلۡنَا عَلَیۡہِمُ الۡغَمَامَ وَاَنۡزَلۡنَا عَلَیۡہِمُ الۡمَنَّ وَالسَّلۡوٰی ؕ کُلُوۡا مِنۡ طَیِّبٰتِ مَا رَزَقۡنٰکُمۡ ؕ وَمَا ظَلَمُوۡنَا وَلٰکِنۡ کَانُوۡۤا اَنۡفُسَہُمۡ یَظۡلِمُوۡنَ ١٦۰

য়া কাত্তা‘না-হুমুছনাতাই ‘আশরাতা আছবা-তান উমামা- ওয়াআওহাইনাইলামূছা-ইযিছতাছকা-হু কাওমুহূআনিদরিব বি‘আসা-কাল হাজারা ফামবাজাছাত মিনহুছনাতা- ‘আশরাতা ‘আইনান কাদ ‘আলিমা কুল্লুউনা-ছিম মাশরাবহুম ওয়াজাল্লালনা-‘আলাইহিমুল গামা-মা ওয়া আনঝালনা-‘আলাইহিমুল মান্না ওয়াছছালওয়া- কুলূমিন তাইয়িবা-তি মা-রাঝাকনা-কুম ওয়া মা-জালামূনা-ওয়ালা-কিন কা-নূ আনফুছাহুম ইয়াজলিমূন।

আমি তাদেরকে (অর্থাৎ বনী ইসরাঈলকে) পৃথক-পৃথক দলরূপে বারটি খান্দানে বিভক্ত করে দিয়েছিলাম। যখন মূসার কওম তার কাছে পানি চাইল, তখন আমি ওহী মারফত তাকে হুকুম দিলাম, তোমার লাঠি দ্বারা অমুক পাথরে আঘাত কর। ৮৮ সুতরাং সে পাথর থেকে বারটি প্রস্রবণ উৎসারিত হল। প্রত্যেক খান্দান নিজ-নিজ পানি পানের স্থান জানতে পারল। আর আমি তাদেরকে মেঘের ছায়া দিলাম এবং তাদের উপর মান্ন ও সালওয়া অবতীর্ণ করলাম (ও বললাম,) আমি তোমাদেরকে যে উত্তম রিযক দান করেছি তা খাও। (এতদসত্ত্বেও তারা আমার যে অকৃতজ্ঞতা করল, তাতে) তারা আমার কোন ক্ষতি করেনি; বরং তারা তাদের নিজেদের প্রতিই জুলুম করেছে।

তাফসীরঃ

৮৮. ১৬০ থেকে ১৬২ নং পর্যন্ত আয়াতসমূহে যে সমস্ত ঘটনার দিকে ইশারা করা হয়েছে, তা সূরা বাকারায় (২ : ৫৭-৬১) গত হয়েছে। এর ব্যাখ্যার জন্য সেসব আয়াতের টীকা দেখুন।
১৬১

وَاِذۡ قِیۡلَ لَہُمُ اسۡکُنُوۡا ہٰذِہِ الۡقَرۡیَۃَ وَکُلُوۡا مِنۡہَا حَیۡثُ شِئۡتُمۡ وَقُوۡلُوۡا حِطَّۃٌ وَّادۡخُلُوا الۡبَابَ سُجَّدًا نَّغۡفِرۡ لَکُمۡ خَطِیۡٓـٰٔتِکُمۡ ؕ سَنَزِیۡدُ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ١٦١

ওয়া ইযকীলা লাহুমুছ কুনূহা-যিহিল কারইয়াতা ওয়া কুলূমিনহা-হাইছুশি’তুম ওয়া কূলূহিত্তাতুওঁ ওয়াদখুলুল বা-বা ছুজ্জাদান নাগফিরলাকুম খাতিূআ-তিকুম ছানাঝীদুল মুহছিনীন।

এবং (সেই সময়কে স্মরণ কর) যখন তাদেরকে বলা হয়েছিল, এই জনপদে বাস কর এবং তার যেখান থেকে ইচ্ছা খাও। আর বলতে থাক, (হে আল্লাহ!) আমরা তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আর (জনপদটির) প্রবেশদ্বার দিয়ে নতশিরে প্রবেশ কর। আমি তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করব (এবং) সৎকর্মশীলদেরকে আরও বেশি (সওয়াব) দেব।
১৬২

فَبَدَّلَ الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا مِنۡہُمۡ قَوۡلًا غَیۡرَ الَّذِیۡ قِیۡلَ لَہُمۡ فَاَرۡسَلۡنَا عَلَیۡہِمۡ رِجۡزًا مِّنَ السَّمَآءِ بِمَا کَانُوۡا یَظۡلِمُوۡنَ ٪ ١٦٢

ফাবাদ্দালাল্লাযীনা জালামূমিনহুম কাওলান গাইরাল্লাযীকীলা লাহুম ফাআরছালনা‘আলাইহিম রিজঝাম মিনাছছামাই বিমা-কা-নূইয়াজলিমূন।

কিন্তু তাদেরকে যে কথা বলা হয়েছিল, তাদের মধ্যকার জালেমগণ তা পরিবর্তন করে অন্য কথা তৈরি করে নিল। সুতরাং তাদের ক্রমাগত সীমালংঘনের কারণে আমি তাদের উপর আসমান থেকে শাস্তি পাঠালাম।
১৬৩

وَسۡـَٔلۡہُمۡ عَنِ الۡقَرۡیَۃِ الَّتِیۡ کَانَتۡ حَاضِرَۃَ الۡبَحۡرِ ۘ اِذۡ یَعۡدُوۡنَ فِی السَّبۡتِ اِذۡ تَاۡتِیۡہِمۡ حِیۡتَانُہُمۡ یَوۡمَ سَبۡتِہِمۡ شُرَّعًا وَّیَوۡمَ لَا یَسۡبِتُوۡنَ ۙ لَا تَاۡتِیۡہِمۡ ۚۛ کَذٰلِکَ ۚۛ نَبۡلُوۡہُمۡ بِمَا کَانُوۡا یَفۡسُقُوۡنَ ١٦٣

ওয়াছআলহুম ‘আনিল কারইয়াতিল্লাতী কা-নাত হা-দিরাতাল বাহর । ইযইয়া‘দূ না ফিছছাবতি ইয তা’তীহিম হীতা-নুহুম ইয়াওমা ছাবতিহিম শুররা‘আওঁ ওয়া ইয়াওমা লাইয়াছবিতূনা লা-তা’তীহিম কাযা-লিকা নাবলূহুম বিমা-কা-নূইয়াফছুকূন।

এবং তাদের কাছে সাগর-তীরে অবস্থিত জনপদবাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর যখন তারা শনিবারের ব্যাপারে সীমালংঘন করত, ৮৯ যখন তাদের (সাগরের) মাছ শনিবার দিন তো পানিতে ভেসে ভেসে তাদের সামনে আসত; আর যখন তারা শনিবার উদযাপন করত না, (অর্থাৎ অন্যান্য দিনে) তা আসত না। এভাবে আমি তাদেরকে তাদের উপর্যুপরি অবাধ্যতার কারণে পরীক্ষা করেছিলাম। ৯০

তাফসীরঃ

৮৯. এ ঘটনাও সংক্ষেপে সূরা বাকারায় (২ : ৬৫-৬৬) গত হয়েছে। ঘটনার সার-সংক্ষেপ এই যে, আরবী ও হিব্রু ভাষায় শনিবারকে ‘সাব্ত’ বলে। ইয়াহুদীদের জন্য এ দিনটিকে একটি পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ দিন সাব্যস্ত করা হয়েছিল। এ দিন তাদের জন্য জীবিকা উপার্জনমূলক যে-কোনও কাজ-কর্ম নিষিদ্ধ ছিল। এস্থলে যে ইয়াহুদীদের কথা বলা হচ্ছে, (খুব সম্ভব তারা হযরত দাঊদ আলাইহিস সালামের আমলে) কোন এক সাগর-উপকূলে বাস করত এবং মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। তাদের জন্য শনিবার মাছ ধরা জায়েয ছিল না। প্রথম দিকে তারা ছল-চাতুরী করে এ বিধান অমান্য করেছিল। পরবর্তীকালে প্রকাশ্যেই এ দিন মাছ ধরা শুরু করে দিল। কিছু সংখ্যক ভালো লোক তাদেরকে এ কাজ করতে নিষেধ করল ও তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তারা তাতে কর্ণপাত করল না। পরিশেষে তাদের উপর শাস্তি আপতিত হল এবং তাদের আকৃতি বিকৃত করে তাদেরকে বানর বানিয়ে দেওয়া হল। সূরা বাকারার বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায়, এ ঘটনা যদিও বর্তমান বাইবেলে পাওয়া যায় না, কিন্তু আরবের ইয়াহুদীগণ এটা ভালো করেই জানত।
১৬৪

وَاِذۡ قَالَتۡ اُمَّۃٌ مِّنۡہُمۡ لِمَ تَعِظُوۡنَ قَوۡمَۨا ۙ اللّٰہُ مُہۡلِکُہُمۡ اَوۡ مُعَذِّبُہُمۡ عَذَابًا شَدِیۡدًا ؕ قَالُوۡا مَعۡذِرَۃً اِلٰی رَبِّکُمۡ وَلَعَلَّہُمۡ یَتَّقُوۡنَ ١٦٤

ওয়া ইযকা-লাত উম্মাতুম মিনহুম লিমা তা‘ইজূনা কাওমানিল্লা-হু মুহলিকুহুম আও মু‘আযযিবুহুম ‘আযা-বান শাদীদান কা-লূমা‘যিরাতান ইলা-রাব্বিকুম ওয়া লা‘আল্লাহুম ইয়াত্তাকূন।

এবং (তাদেরকে সেই সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দাও) যখন তাদেরই একটি দল (অন্য দলকে) বলেছিল, তোমরা এমন সব লোককে কেন উপদেশ দিচ্ছ, যাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করে ফেলবেন কিংবা কঠোর শাস্তি দিবেন? ৯১ তারা বলল, (আমরা এটা করছি) তোমাদের প্রতিপালকের নিকট দায়িত্বমুক্ত হওয়ার জন্য এবং (এ উপদেশ দ্বারা) হতে পারে, তারা তাকওয়া অবলম্বন করবে। ৯২

তাফসীরঃ

৯১. মূলত তারা তিন দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। (ক) একদল তো ক্রমাগত নাফরমানী করে যাচ্ছিল; (খ) দ্বিতীয় দল তাদের, যারা প্রথম দিকে তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা যখন মানল না, তখন হতাশ হয়ে বোঝানো ছেড়ে দিল; আর (গ) তৃতীয় দলটি তাদের, যারা হতাশ না হয়ে তাদেরকে অবিরাম উপদেশ দিতে থাকল। এই তৃতীয় দলকে দ্বিতীয় দলের লোক বলল, এরা যখন ক্রমাগত নাফরমানী করে যাচ্ছে, তখন বোঝা যায় আল্লাহ তাআলার শাস্তি তাদের জন্য অবধারিত। কাজেই তাদেরকে বুঝিয়ে সময় নষ্ট করার কোনও অর্থ হয় না।
১৬৫

فَلَمَّا نَسُوۡا مَا ذُکِّرُوۡا بِہٖۤ اَنۡجَیۡنَا الَّذِیۡنَ یَنۡہَوۡنَ عَنِ السُّوۡٓءِ وَاَخَذۡنَا الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا بِعَذَابٍۭ بَئِیۡسٍۭ بِمَا کَانُوۡا یَفۡسُقُوۡنَ ١٦٥

ফালাম্মা- নাছূ মা-যুক্কিরূ বিহীআনজাইনাল্লাযীনা ইয়ানহাওনা ‘আনিছছূইওয়া আখাযনাল্লাযীনা জালামূবি‘আযা-বিম বাঈছিম বিমা-কা-নূইয়াফছুকূন।

তাদেরকে যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল, তা যখন তারা ভুলে গেল, তখন অসৎ কাজে যারা বাধা দিচ্ছিল তাদেরকে তো আমি রক্ষা করি। কিন্তু যারা সীমালংঘন করেছিল, উপর্যুপরি অবাধ্যতার কারণে তাদেরকে এক কঠোর শাস্তি দ্বারা আক্রান্ত করি।
১৬৬

فَلَمَّا عَتَوۡا عَنۡ مَّا نُہُوۡا عَنۡہُ قُلۡنَا لَہُمۡ کُوۡنُوۡا قِرَدَۃً خٰسِئِیۡنَ ١٦٦

ফালাম্মা-‘আতাও ‘আম্মা-নুহূ‘আনহু কুলনা-লাহুম কূনূকিরাদাতান খা-ছিঈন।

সুতরাং তাদেরকে যে কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছিল, তারা যখন তার বিপরীতে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করল, তখন আমি তাদেরকে বললাম, ঘৃণিত বানর হয়ে যাও। ৯৩

তাফসীরঃ

৯৩. এর অর্থ হল, তাদের আকার-আকৃতি পরিবর্তন করে তাদেরকে বাস্তবিকই বানর বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আধুনিক কালের কিছু লোক এ জাতীয় কথা বিশ্বাস করতে চায় না, তারা এরূপ ক্ষেত্রে নিজেদের খেয়াল-খুশী মত কুরআন মাজীদের ব্যাখ্যা করছে এবং এভাবে কুরআন মাজীদের অর্থগত বিকৃতি সাধনের দুয়ার খুলে দিচ্ছে। আশ্চর্য কথা হল, ডারউইন যখন অকাট্য কোনও প্রমাণ ছাড়াই এ মতবাদ প্রকাশ করল যে, বিবর্তন ও ক্রমবিকাশের ধারায় বানর মানুষে পরিণত হয়েছে, তখন এটা মানতে তারা কোনরূপ দ্বিধাবোধ করল না, অথচ আল্লাহ তাআলা তার অকাট্য বাণীতে যখন বললেন, মানুষ অধঃপতিত হয়ে বানরে পতিত হয়েছে, তখন তারা এটা মানতে কুণ্ঠাবোধ করল এবং নিজেদের মনমত এর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করল।
১৬৭

وَاِذۡ تَاَذَّنَ رَبُّکَ لَیَبۡعَثَنَّ عَلَیۡہِمۡ اِلٰی یَوۡمِ الۡقِیٰمَۃِ مَنۡ یَّسُوۡمُہُمۡ سُوۡٓءَ الۡعَذَابِ ؕ اِنَّ رَبَّکَ لَسَرِیۡعُ الۡعِقَابِ ۚۖ وَاِنَّہٗ لَغَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ١٦٧

ওয়া ইযতাআযযানা রাব্বুকা লাইয়াব‘আছান্না ‘আলাইহিম ইলা-ইয়াওমিল কিয়া-মাতি মাইঁ ইয়াছূমূহুম ছূআল ‘আযা-বি ইন্না রাব্বাকা লাছারী‘উল ইকা-বি ওয়া ইন্নাহূ লাগাফূরুর রাহীম।

এবং (সেই সময়ের কথা স্মরণ কর) যখন তোমার প্রতিপালক ঘোষণা করলেন, তিনি কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তাদের উপর এমন লোকদেরকে কর্তৃত্ব দান করতে থাকবেন, যারা তাদেরকে নিকৃষ্ট রকমের শাস্তি দেবে। ৯৪ নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক দ্রুত শাস্তিদানকারী এবং নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালুও বটে।

তাফসীরঃ

৯৪. ইয়াহুদীদের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, কিছুকাল পর-পর তাদের উপর এমন অত্যাচারী শাসক চেপে বসেছে, যে তাদের উপর নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর তাদেরকে নানাভাবে জুলুম-নির্যাতন করেছে। যদিও তাদের হাজার-হাজার বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে মাঝে-মধ্যে এমন অবকাশও এসেছে, যখন তারা সুখণ্ডসাচ্ছন্দ্য ভোগ করেছে, যেমন আল্লাহ তাআলা সামনে বলেছেন, ‘আমি তাদেরকে ভালো ও মন্দ অবস্থা দ্বারা পরীক্ষা করেছি।’ এর দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায়, মাঝে-মধ্যে তাদের সুদিনও গেছে, কিন্তু সামষ্টিক ইতিহাসের বিপরীতে তা নিতান্তই কম।
১৬৮

وَقَطَّعۡنٰہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ اُمَمًا ۚ مِنۡہُمُ الصّٰلِحُوۡنَ وَمِنۡہُمۡ دُوۡنَ ذٰلِکَ ۫ وَبَلَوۡنٰہُمۡ بِالۡحَسَنٰتِ وَالسَّیِّاٰتِ لَعَلَّہُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ ١٦٨

ওয়া কাত্তা‘না-হুম ফিল আরদিউমামান মিনহুমুসসা-লিহূনা ওয়া মিনহুম দূ না যালিকা ওয়া বালাওনা-হুম বিলহাছানা-তি ওয়াছছাইয়িআ-তি লা‘আল্লাহুম ইয়ারজি‘ঊন।

এবং আমি পৃথিবীতে তাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দেই। তাদের মধ্যে কতক ছিল সৎকর্মশীল এবং কতক অন্য রকম। আমি তাদেরকে ভালো ও মন্দ অবস্থা দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যাতে তারা (সঠিক পথের দিকে) ফিরে আসে।
১৬৯

فَخَلَفَ مِنۡۢ بَعۡدِہِمۡ خَلۡفٌ وَّرِثُوا الۡکِتٰبَ یَاۡخُذُوۡنَ عَرَضَ ہٰذَا الۡاَدۡنٰی وَیَقُوۡلُوۡنَ سَیُغۡفَرُ لَنَا ۚ وَاِنۡ یَّاۡتِہِمۡ عَرَضٌ مِّثۡلُہٗ یَاۡخُذُوۡہُ ؕ اَلَمۡ یُؤۡخَذۡ عَلَیۡہِمۡ مِّیۡثَاقُ الۡکِتٰبِ اَنۡ لَّا یَقُوۡلُوۡا عَلَی اللّٰہِ اِلَّا الۡحَقَّ وَدَرَسُوۡا مَا فِیۡہِ ؕ وَالدَّارُ الۡاٰخِرَۃُ خَیۡرٌ لِّلَّذِیۡنَ یَتَّقُوۡنَ ؕ اَفَلَا تَعۡقِلُوۡنَ ١٦٩

ফাখালাফা মিমবা‘দিহিম খালফুওঁ ওয়ারিছুলকিতা-বা ইয়া’খুযূনা ‘আরাদাহা-যাল আদনা-ওয়া ইয়াকূলূনা ছাইউগফারুলানা ওয়া ইয়ঁইয়া’তিহিম ‘আরাদুম মিছলুহূ ইয়া’খুযূহু; আলাম ই’খায‘আলাইহিম মীছা-কুল কিতা-বি আল্লাইয়াকূলূ‘আলাল্লা-হি ইল্লাল হাক্কা ওয়া দারাছূমা-ফীহি ওয়াদ্দা-রুল আ-খিরাতুখাইরুল লিল্লাযীনা ইয়াত্তাকূনা আফালা-তা‘কিলূন।

অতঃপর তাদের পর তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়ে কিতাব (অর্থাৎ তাওরাত)-এর উত্তরাধিকারী হল এমন সব উত্তরপুরুষ, যারা এই তুচ্ছ দুনিয়ার সামগ্রী (ঘুষরূপে) গ্রহণ করত এবং বলত, ‘আমাদেরকে ক্ষমা করা হবে’। কিন্তু তার অনুরূপ সামগ্রী তাদের কাছে পুনরায় আসলে তারা (ঘুষরূপে) তাও নিয়ে নিত। ৯৫ তাদের থেকে কি কিতাবে বর্ণিত এই সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর প্রতি সত্য ছাড়া কোন কথা আরোপ করবে না? এবং তাতে (সেই কিতাবে) যা-কিছু (লেখা) ছিল তারা তা যথারীতি পড়েওছিল। যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য আখিরাতের নিবাস শ্রেষ্ঠতর। (হে ইয়াহুদীগণ!) তারপরও কি তোমরা বুদ্ধিকে কাজে লাগাবে না?

তাফসীরঃ

৯৫. এটা তাদের আরেকটি অপকর্ম। তারা মানুষের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে আল্লাহর কিতাবের অপব্যাখ্যা করত এবং সেই সাথে জোর বিশ্বাসের সাথে বলত, আমাদের এ গুনাহ মাফ হয়ে যাবে, অথচ গুনাহ মাফ হয় তাওবা দ্বারা, আর তাওবার অপরিহার্য শর্ত হল আগামীতে সে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা। কিন্তু তাদের অবস্থা সে রকম ছিল না। তাদের সামনে পুনরায় ঘুষ আনা হলে তারা নির্দ্বিধায় তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকে। তারা এসব কিছ্ইু করত এই তুচ্ছ দুনিয়ার জন্য, অথচ বুদ্ধি-বিবেচনাকে কাজে লাগালে তারা বুঝতে পারত, আখিরাতের জীবন কত উত্তম!
১৭০

وَالَّذِیۡنَ یُمَسِّکُوۡنَ بِالۡکِتٰبِ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ ؕ اِنَّا لَا نُضِیۡعُ اَجۡرَ الۡمُصۡلِحِیۡنَ ١٧۰

ওয়াল্লাযীনা ইউমাছছিকূনা বিলকিতা-বি ওয়া আকা-মুসসালা-তা ইন্না-লা-নুদী‘উ আজরাল মুসলিহীন।

আর যারা কিতাবকে মজবুতভাবে ধরে রাখে ও নামায কায়েম করে, আমি এরূপ সংশোধনকারীদের কর্মফল নষ্ট করি না।
১৭১

وَاِذۡ نَتَقۡنَا الۡجَبَلَ فَوۡقَہُمۡ کَاَنَّہٗ ظُلَّۃٌ وَّظَنُّوۡۤا اَنَّہٗ وَاقِعٌۢ بِہِمۡ ۚ  خُذُوۡا مَاۤ اٰتَیۡنٰکُمۡ بِقُوَّۃٍ وَّاذۡکُرُوۡا مَا فِیۡہِ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ ٪ ١٧١

ওয়া ইযনাতাকনাল জাবালা ফাওকাহুম কাআন্নাহূজু ল্লাতুওঁ ওয়া জান্নূ আন্নাহূওয়াকি‘উম বিহিম খুযূমাআ-তাইনা-কুম বিকুওওয়াতিওঁ ওয়াযকুরূমা-ফিহি লা‘আল্লাকুম তাত্তাকূন।

এবং (স্মরণ কর) যখন আমি পাহাড়কে তাদের উপর এভাবে তুলে ধরেছিলাম, যেন সেটি একখানি শামিয়ানা, ৯৬ এবং তারা মনে করেছিল সেটি তাদের উপর পতিত হবে। (তখন আমি হুকুম দিয়েছিলাম) আমি তোমাদেরকে যে কিতাব দিয়েছি, তা আঁকড়ে ধর, ও তাতে বর্ণিত বিষয়সমূহ স্মরণ রাখ, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পার।

তাফসীরঃ

৯৬. এ ঘটনাটি সূরা বাকারা (২ : ৬৩) ও সূরা নিসায় (৪ : ১৫৪) গত হয়েছে। সূরা বাকারায় যে আয়াতে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, তার টীকায় আমরা এর সারসংক্ষেপ উল্লেখ করেছি। সেখানে আমরা একথাও বলেছি যে, আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আয়াতের তরজমা এ রকমও করা সম্ভব যে, আমি তাদের উপর পাহাড়কে এমন তীব্রভাবে দোলাতে থাকলাম, যদ্দরুণ তাদের মনে হচ্ছিল সেটি উৎপাটিত হয়ে তাদের উপর পতিত হবে।
১৭২

وَاِذۡ اَخَذَ رَبُّکَ مِنۡۢ بَنِیۡۤ اٰدَمَ مِنۡ ظُہُوۡرِہِمۡ ذُرِّیَّتَہُمۡ وَاَشۡہَدَہُمۡ عَلٰۤی اَنۡفُسِہِمۡ ۚ  اَلَسۡتُ بِرَبِّکُمۡ ؕ  قَالُوۡا بَلٰی ۚۛ  شَہِدۡنَا ۚۛ  اَنۡ تَقُوۡلُوۡا یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ اِنَّا کُنَّا عَنۡ ہٰذَا غٰفِلِیۡنَ ۙ ١٧٢

ওয়া ইয আখাযা রাব্বুকা মিম বানীআ-দামা মিন জুহূরিহিম যুররিইইয়াতাহুম ওয়া আশহাদাহুম ‘আলাআনফুছিহিম আলাছতুবিরাব্বিকুম কা-লূবালা-শাহিদনা আন তাকূলূইয়াওমাল কিয়া-মাতি ইন্না-কুন্না-‘আন হা-যা-গা-ফিলীন।

এবং (হে রাসূল! মানুষকে সেই সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দাও) যখন তোমার প্রতিপালক আদম সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের সন্তানদেরকে বের করেছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষী বানিয়েছিলেন (আর জিজ্ঞেস করেছিলেন যে,) আমি কি তোমাদের রব্ব নই? সকলে উত্তর দিয়েছিল, কেন নয়? আমরা সকলে (এ বিষয়ে) সাক্ষ্য দিচ্ছি ৯৭ (এবং এ স্বীকারোক্তি আমি এজন্য নিয়েছিলাম) যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পার যে, ‘আমরা তো এ বিষয়ে অনবহিত ছিলাম।’

তাফসীরঃ

৯৭. এ আয়াতে যে সাক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, হাদীসে তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এরূপ যে, আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করার পর, তার ঔরসে যত সন্তান-সন্ততি জন্ম নেওয়ার ছিল তাদের সকলকে এক জায়গায় একত্র করেন। তখন তারা সকলে পিঁপড়ের মত ক্ষুদ্রাকৃতির ছিল। তিনি তাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নেন যে, তারা আল্লাহ তাআলাকে নিজেদের প্রতিপালক স্বীকার করে কিনা? সকলেই স্বীকার করল যে, নিশ্চয়ই তারা আল্লাহ তাআলাকে নিজেদের প্রতিপালক স্বীকার করে (রূহুল মাআনীতে নাসাঈ, হাকিম ও বায়হাকীর বরাতে)। এই স্বীকারোক্তি দ্বারা তারা যেন স্বীকার করে নিল যে, তারা আল্লাহ তাআলার সমস্তআদেশ-নিষেধ বিনাবাক্যে পালন করবে; আর এভাবে আল্লাহ তাআলা মানুষকে দুনিয়ায় পাঠানোর আগেই তাদের দ্বারা আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। দুনিয়ায় এমন মহাপুরুষও জন্ম নিয়েছেন, যাদের এ ঘটনা দুনিয়ায় আসার পরও স্মরণ ছিল, যেমন হযরত যুননুন মিসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে তাঁর এই উক্তি বর্ণিত আছে যে, সে প্রতিশ্রুতির কথা আমার এমনভাবে স্মরণ আছে যেন এখনও তা শুনতে পাচ্ছি (মাআরিফুল কুরআন, ৪র্থ খণ্ড, ১১৫ পৃষ্ঠা)। তবে এ কথা সত্য যে, কিছু ব্যতিক্রম বাদে কারওই একটা প্রতিশ্রুতিরূপে সে কথা স্মরণ নেই। কিন্তু সে কথা স্মরণ না থাকলেও সমস্যা নেই। কেননা এমন কিছু ঘটনা থাকে যা স্মরণ না থাকলেও তার প্রাকৃতিক ক্রিয়া ঠিকই দেখা দেয়। সুতরাং সেই প্রতিশ্রুতির ক্রিয়া আজ দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষের মধ্যে পাওয়া যায়। তাই তো তারা মহাবিশ্বের এক স্রষ্টায় বিশ্বাস রাখে এবং তাঁর মহিমা ও বড়ত্বের গুণকীর্তন করে। যারা বস্তুগত চাহিদা ও জড়বাদী মানসিকতার ঘুর্ণিপাকে ফেঁসে গিয়ে নিজেদের স্বভাব-প্রকৃতি নষ্ট করে ফেলেছে, তাদের কথা আলাদা, নয়ত প্রতিটি মানুষের স্বভাবের ভেতরই আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্বের বোধ এবং তাঁর ভালোবাসা সংস্থাপিত রয়েছে। আর এ কারণেই যে সমস্ত পারিপার্শ্বিক কারণ স্বভাব-ধর্ম হতে দূরে সরিয়ে দেয়, সেগুলো যখন মানুষের সম্মুখ থেকে অপসৃত হয়, তখন মানুষ সত্যের দিকে এভাবে ছুটে যায়, যেন সে সহসা তার হারিয়ে যাওয়া সম্পদের সন্ধান পেয়ে গেছে।
১৭৩

اَوۡ تَقُوۡلُوۡۤا اِنَّمَاۤ اَشۡرَکَ اٰبَآؤُنَا مِنۡ قَبۡلُ وَکُنَّا ذُرِّیَّۃً مِّنۡۢ بَعۡدِہِمۡ ۚ اَفَتُہۡلِکُنَا بِمَا فَعَلَ الۡمُبۡطِلُوۡنَ ١٧٣

আও তাকূলূইন্নামা-আশরাকা আ-বাউনা মিন কাবলুওয়া কুন্না যুররিইয়াতাম মিম বা‘দিহিম আফাতুহলিকুনা-বিমা-ফা‘আলাল মুবতিলূন।

কিংবা এরূপ না বল যে, শিরক (-এর সূচনা) তো (বহু) পূর্বে আমাদের বাপ-দাদাগণই করেছিল। আর আমরা ছিলাম তাদেরই পরবর্তী বংশধর। তবে কি বিভ্রান্ত লোকদের কৃতকর্মের কারণে আপনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন?
১৭৪

وَکَذٰلِکَ نُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ وَلَعَلَّہُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ ١٧٤

ওয়া কাযা-লিকা নুফাসসিলুল আ-য়া-তি ওয়া লা‘আল্লাহুম ইয়ারজি‘ঊন।

এভাবেই আমি নিদর্শনাবলী বিশদভাবে বিবৃত করে থাকি, যাতে মানুষ (সত্যের দিকে) ফিরে আসে।
১৭৫

وَاتۡلُ عَلَیۡہِمۡ نَبَاَ الَّذِیۡۤ اٰتَیۡنٰہُ اٰیٰتِنَا فَانۡسَلَخَ مِنۡہَا فَاَتۡبَعَہُ الشَّیۡطٰنُ فَکَانَ مِنَ الۡغٰوِیۡنَ ١٧٥

ওয়াতলু ‘আলাইহিম নাবাআল্লাযী আ-তাইনা-হুআ-য়া-তিনা-ফানছালাখা মিনহাফাআতবা‘আহুশশাইতা-নুফাকা-না মিনাল গা-বীন।

এবং (হে রাসূল!) তাদেরকে সেই ব্যক্তির ঘটনা পড়ে শোনাও, যাকে আমি আমার নিদর্শনাবলী দিয়েছিলাম, কিন্তু সে তা সম্পূর্ণ বর্জন করে। ফলে শয়তান তার পিছু নেয়। পরিণামে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ৯৮

তাফসীরঃ

৯৮. সাধারণভাবে মুফাসসিরগণ বলেন, এ আয়াতে বালআম ইবনে বাউরার প্রতি ইশারা করা হয়েছে। বালআম ছিল ফিলিস্তিনের মাওআব অঞ্চলের এক প্রসিদ্ধ আবেদ ও সংসারবিমুখ (যাহেদ) ব্যক্তি। কথিত আছে, তার দোয়া খুব বেশি কবুল হত। তার সময়ে সে অঞ্চলটি মূর্তিপূজারীদের দখলে ছিল। ফির‘আউন ডুবে মরার পর হযরত মূসা আলাইহিস সালাম বনী ইসরাঈলের বাহিনী নিয়ে সে এলাকায় আক্রমণ করতে চাইলেন এবং সে উদ্দেশ্যে তিনি নিজ বাহিনী নিয়ে মাওআবের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেলেন। এ সময় সেখানকার বাদশাহ বালআমকে বলল, সে যেন মূসা আলাইহিস সালাম যাতে ধ্বংস হয়ে যান সে লক্ষ্যে বদদোয়া করে। প্রথম দিকে সে তা করতে রাজি ছিল না, কিন্তু বাদশাহ তাকে মোটা অংকের উৎকোচ দিলে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেল। কিন্তু সে যখন বদদোয়া করতে শুরু করল, তখন তার মুখে বদদোয়ার বিপরীতে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের যাতে কল্যাণ হয়, সেই অর্থের শব্দাবলী উচ্চারিত হল। এ অবস্থা দেখে বালআম বাদশাহকে পরামর্শ দিল, তার সৈন্যরা যেন তাদের নারীদেরকে বনী ইসরাঈলের তাঁবুতে পাঠিয়ে দেয়। তাহলে তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়বে আর ব্যভিচারের বৈশিষ্ট্যই হল, তা আল্লাহ তাআলার ক্রোধের কারণ হয়ে যায়। ফলে আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণে বনী ইসরাঈল তাঁর রহমত থেকে মাহরূম হয়ে যাবে। তার এ পরামর্শ মত কাজ করা হল এবং বনী ইসরাঈল ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়ল। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি নারাজ হয়ে গেলেন। শাস্তিস্বরূপ তাদের মধ্যে প্লেগের মহামারী দেখা দিল। বাইবেলেও এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে (দেখুন, শুমারী, পরিচ্ছেদ ২২-২৫ এবং ৩১:১৬)। কুরআন মাজীদ এস্থলে যে ব্যক্তির দিকে ইঙ্গিত করেছে তার নামও উল্লেখ করেনি এবং সে আল্লাহ তাআলার হুকুম অমান্য করে কিভাবে নিজ কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করেছিল তাও ব্যাখ্যা করেনি। উপরে যে ঘটনা উদ্ধৃত করা হল, তাও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত নয়। কাজেই আয়াতে যে সেই ব্যক্তিকেই বোঝানো উদ্দেশ্য এটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কিন্তু তা বলতে না পারলেও কুরআন মাজীদের মূল উদ্দেশ্য যেহেতু সেই ব্যক্তিকে সনাক্তকরণের উপর নির্ভরশীল নয়, তাই এতে কোন সমস্যা নেই। বস্তুত এস্থলে উদ্দেশ্য এই সবক দেওয়া যে, আল্লাহ তাআলা যাকে ইলম ও ইবাদতের মহা সৌভাগ্য দান করেন, তার উচিত অন্যদের তুলনায় বেশি সাবধানতা ও তাকওয়া অবলম্বন করা। এরূপ ব্যক্তি যদি আল্লাহ তাআলার আয়াতের বিপরীতে নিজের অবৈধ কামনা-বাসনা পূরণের পেছনে পড়ে, তবে দুনিয়া ও আখিরাতে তার পরিণতি হয় ভয়াবহ।
১৭৬

وَلَوۡ شِئۡنَا لَرَفَعۡنٰہُ بِہَا وَلٰکِنَّہٗۤ اَخۡلَدَ اِلَی الۡاَرۡضِ وَاتَّبَعَ ہَوٰىہُ ۚ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ الۡکَلۡبِ ۚ اِنۡ تَحۡمِلۡ عَلَیۡہِ یَلۡہَثۡ اَوۡ تَتۡرُکۡہُ یَلۡہَثۡ ؕ ذٰلِکَ مَثَلُ الۡقَوۡمِ الَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا ۚ فَاقۡصُصِ الۡقَصَصَ لَعَلَّہُمۡ یَتَفَکَّرُوۡنَ ١٧٦

ওয়া লাও শি’না-লারাফা‘না-হু বিহা-ওয়ালা-কিন্নাহূআখলাদা ইলাল আরদিওয়াত্তাবা‘আ হাওয়া-হু ফামাছালুহূকামাছালিল কালবি ইন তাহমিল ‘আলাইহি ইয়ালহাছআও তাতরুকহু ইয়ালহাছ যা-লিকা মাছালুল কাওমিল্লাযীনা কাযযাবূবিাআ-য়া-তিনা- ফাকসুসিল কাসাসা লা‘আল্লাহুম ইয়াতাফাক্কারূন।

আমি ইচ্ছা করলে সেই আয়াতসমূহের বদৌলতে তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করতাম। কিন্তু সে তো দুনিয়ার দিকেই ঝুঁকে পড়ল এবং নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করল। সুতরাং তার দৃষ্টান্ত ওই কুকুরের মত, যার উপর তুমি হামলা করলেও সে জিহ্বা বের করে হাঁপাতে থাকবে, আর তাকে (তার অবস্থায়) ছেড়ে দিলেও জিহ্বা বের করে হাঁপাবে। ৯৯ এই হল যে সব লোক আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে তাদের দৃষ্টান্ত। সুতরাং তুমি (তাদেরকে) এসব ঘটনা শোনাতে থাক, যাতে তারা চিন্তা করে।

তাফসীরঃ

৯৯. অন্যান্য পশু হাঁপায় কেবল তখনই, যখন তাদের পিঠে বোঝা চাপানো হয় অথবা তাদের উপর হামলা চালানো হয়। কিন্তু কুকুর ব্যতিক্রম। তার শ্বাস গ্রহণের জন্য সর্বাবস্থায়ই হাঁপানোর দরকার হয়। যারা এ ঘটনাকে বালআম ইবনে বাউরার সাথে সম্পৃক্ত করেন, তারা বলেন, অপকর্মের কারণে তার জিহ্বা কুকুরের মত বের হয়ে গিয়েছিল। তাই আয়াতে তাকে কুকুরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, প্রকৃতপক্ষে এটা তার জৈবিক লালসার উপমা। কুকুরের দিকে কোনও জিনিস ছুঁড়ে মারা হলে, তা যদি তাকে আঘাত করার উদ্দেশ্যেও হয়, তবুও সে জিহ্বা বের করে এই লোভে ছুটে যায় যে, সেটা কোন খাদ্যবস্তুও হতে পারে। এভাবেই যে ব্যক্তি দুনিয়ার প্রতি লালায়িত, সে সব কিছু দিয়েই পার্থিব স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে এবং তার জন্য সর্বাবস্থায় হাঁপাতে থাকে।
১৭৭

سَآءَ مَثَلَاۨ الۡقَوۡمُ الَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَاَنۡفُسَہُمۡ کَانُوۡا یَظۡلِمُوۡنَ ١٧٧

ছাআ মাছালানিল কাওমুল্লাযীনা কাযযাবূবিআ-ইয়া-তিনা- ওয়া আনফুছাহুম কা-নূ ইয়াজলিমূন।

যারা আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে ও নিজেদের প্রতি জুলুম করে, তাদের দৃষ্টান্ত কত মন্দ!
১৭৮

مَنۡ یَّہۡدِ اللّٰہُ فَہُوَ الۡمُہۡتَدِیۡ ۚ وَمَنۡ یُّضۡلِلۡ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ ١٧٨

মাইঁ ইয়াহদিল্লা-হু ফাহুওয়াল মুহতাদী ওয়া মাইঁ ইউদলিল ফাউলাইকা হুমুল খা-ছিরূন।

আল্লাহ যাকে হিদায়াত দান করেন, কেবল সে-ই হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, আর আল্লাহ যাদেরকে বিপথগামী করেন, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।
১৭৯

وَلَقَدۡ ذَرَاۡنَا لِجَہَنَّمَ کَثِیۡرًا مِّنَ الۡجِنِّ وَالۡاِنۡسِ ۫ۖ لَہُمۡ قُلُوۡبٌ لَّا یَفۡقَہُوۡنَ بِہَا ۫ وَلَہُمۡ اَعۡیُنٌ لَّا یُبۡصِرُوۡنَ بِہَا ۫ وَلَہُمۡ اٰذَانٌ لَّا یَسۡمَعُوۡنَ بِہَا ؕ اُولٰٓئِکَ کَالۡاَنۡعَامِ بَلۡ ہُمۡ اَضَلُّ ؕ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡغٰفِلُوۡنَ ١٧٩

ওয়া লাকাদ যারা’না-লিজাহান্নামা কাছীরাম মিনাল জিন্নি ওয়ালইনছি লাহুম কুলূবুল্লাইয়াফকাহূনা বিহা- ওয়া লাহুম আ‘ইউনুল্লা-ইউবসিরূনা বিহা- ওয়া লাহুম আ-যানুল্লা-ইয়াছমা‘উনা বিহা- উলাইকা কালআন‘আ-মি বাল হুম আদাল্লু উলাইকা হুমুল গা-ফিলূন।

আমি জিন ও মানুষের মধ্য হতে বহুজনকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। ১০০ তাদের অন্তর আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা অনুধাবন করে না, তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দ্বারা দেখে না এবং তাদের কান আছে, কিন্তু তা দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তার চেয়েও বেশি বিভ্রান্ত। এরাই গাফেল।

তাফসীরঃ

১০০. অর্থাৎ তাদের তাকদীরে লেখা আছে যে, তারা নিজ ইচ্ছায় এমন কাজ করবে, যা তাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। প্রকাশ থাকে যে, তাকদীরে লেখার অর্থ জাহান্নামের কাজ করতে তাদের বাধ্য হয়ে যাওয়া নয়। এর দৃষ্টান্ত এভাবে দেওয়া যেতে পারে যে, কোনও শিক্ষক তার কোনও ছাত্রের অবস্থা সামনে রেখে লিখে দিল যে, সে ফেল করবে। এর অর্থ এমন নয় যে, শিক্ষক তাকে ফেল করতে বাধ্য করল; বরং সে যা-কিছু লিখেছিল তার অর্থ ছাত্রটি পরিশ্রম না করে সময় নষ্ট করবে, পরিণামে সে ফেল করবে।
১৮০

وَلِلّٰہِ الۡاَسۡمَآءُ الۡحُسۡنٰی فَادۡعُوۡہُ بِہَا ۪ وَذَرُوا الَّذِیۡنَ یُلۡحِدُوۡنَ فِیۡۤ اَسۡمَآئِہٖ ؕ سَیُجۡزَوۡنَ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ١٨۰

ওয়ালিল্লা-হিল আছমাউল হুছনা- ফাদ‘ঊহু বিহা-;ওয়াযারুল্লাযীনা ইউলহিদূনা ফীআছমাইহী; ছাইউজঝাওনা মা-কা-নূইয়া‘মালূন।

উত্তম নামসমূহ আল্লাহরই। সুতরাং তাকে সেই সব নামেই ডাকবে। ১০১ যারা তার নামের ব্যাপারে বক্র পথ অবলম্বন করে, তাদেরকে বর্জন কর। ১০২ তারা যা-কিছু করছে, তাদেরকে তার বদলা দেওয়া হবে।

তাফসীরঃ

১০১. আগের আয়াতে অবাধ্যদের মূল রোগ বলা হয়েছিল এই যে, তারা বড় গাফেল। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার স্মরণ ও তার সামনে জবাবদিহিতার অনুভূতি সম্পর্কে তারা উদাসীন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, দুনিয়ায় সব রকম অনিষ্টতার আসল কারণ এটাই হয়ে থাকে। তাই এবার এ রোগের চিকিৎসা বাতলানো হচ্ছে। আর তা হচ্ছে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করা ও নিজের সব প্রয়োজন তাঁরই কাছে চাওয়া। প্রকাশ থাকে যে, আল্লাহ তাআলাকে ডাকার যে নির্দেশ এ আয়াতে দেওয়া হয়েছে, তা দ্বারা তাসবীহ, তাহলীলের মাধ্যমে তাঁর যিকির করা এবং তাঁর কাছে দোয়া করা উভয়টাই বোঝানো হয়েছে। গাফলতি দূর করার উপায় কেবল এটাই যে, বান্দা নিজ প্রতিপালককে উভয় পন্থায় ডাকবে। অবশ্য তাঁকে ডাকার জন্য তার উত্তম নামসমূহের ব্যবহারকে জরুরী করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর উত্তম নামসমূহ বা আসমাউল হুসনা-এর কতক তো তিনি নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন এবং কতক তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসের মাধ্যমে জানিয়েছেন। কুরআন মাজীদের কয়েক স্থানে আসমাউল হুসনার প্রতি ইশারা করা হয়েছে (দেখুন, সূরা বনী ইসরাঈল ১৭ : ১১০; সূরা তোয়াহা ২০ : ৮ ও সূরা হাশর ৫৯ : ২৪)। সহীহ বুখারী ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলার নিরানব্বইটি নাম আছে। তিরমিযী ও হাকিম সে নামসমূহও বর্ণনা করেছেন। সারকথা, সেই আসমাউল হুসনার অন্তর্ভুক্ত কোন নাম দ্বারাই আল্লাহ তাআলার যিকির ও তাঁর কাছে দোয়া করা চাই। নিজের পক্ষ থেকে তাঁর জন্য কোনও নাম তৈরি করে নেওয়া ঠিক নয়।
১৮১

وَمِمَّنۡ خَلَقۡنَاۤ اُمَّۃٌ یَّہۡدُوۡنَ بِالۡحَقِّ وَبِہٖ یَعۡدِلُوۡنَ ٪ ١٨١

ওয়া মিম্মান খালাকনা-উম্মাতুইঁ ইয়াহদূনা বিলহাক্কিওয়াবিহী ইয়া‘দিলূন।

আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের মধ্যে এমন একটি দল আছে, যারা (মানুষকে) সত্যের পথ দেখায় এবং সেই (সত্য) অনুযায়ী ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।
১৮২

وَالَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا سَنَسۡتَدۡرِجُہُمۡ مِّنۡ حَیۡثُ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ۚۖ ١٨٢

ওয়াল্লাযীনা কাযযাবূবিআ-য়া-তিনা-ছানাছতাদরিজুহুম মিন হাইছুলা-ইয়া‘লামূন।

আর যারা আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে, আমি তাদের এমনভাবে পর্যায়ক্রমে পাকড়াও করব যে, তারা জানতেই পারবে না।
১৮৩

وَاُمۡلِیۡ لَہُمۡ ؕ۟ اِنَّ کَیۡدِیۡ مَتِیۡنٌ ١٨٣

ওয়া উমলী লাহুম ইন্না কাইদী মাতীন।

এবং আমি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই আমার গুপ্ত কৌশল বড় মজবুত। ১০৩

তাফসীরঃ

১০৩. এটা সেই সব লোকের জন্য বিপদ সংকেত, যারা ক্রমাগত নাফরমানী করে যাচ্ছে এবং তা সত্ত্বেও তাদেরকে দুনিয়ার সুখণ্ডসমৃদ্ধি ভোগ করতে দেওয়া হচ্ছে এবং তারা কখনও চিন্তাও করে না যে, তাদেরকে একদিন আল্লাহ তাআলার সামনে হাজির হতে হবে। এরূপ অবাধ্যতা ও গাফলতি সত্ত্বেও সুখণ্ডসমৃদ্ধি লাভ হলে বুঝতে হবে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ঢিল ও অবকাশ দেওয়া হচ্ছে। কুরআন মাজীদে একে ‘ইসতিদরাজ’ বলা হয়েছে। এরূপ ব্যক্তিকে এক সময় হঠাৎ করেই ধরা হয় এবং সেটা কখনও দুনিয়াতেই হয়ে থাকে। আর এখানে ধরা না হলেও আখিরাতে যে হবে তাতে তো কোনও সন্দেহ নেই।
১৮৪

اَوَلَمۡ یَتَفَکَّرُوۡا ٜ مَا بِصَاحِبِہِمۡ مِّنۡ جِنَّۃٍ ؕ اِنۡ ہُوَ اِلَّا نَذِیۡرٌ مُّبِیۡنٌ ١٨٤

আওয়ালাম ইয়াতাফাক্কারূ মা-বিসা-হিবিহিম মিন জিন্নাতিন ইন হুওয়া ইল্লা-নাযীরুম মুবীন।

তবে কি তারা চিন্তা করেনি যে, তাদের এই সহচর (অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মধ্যে উন্মাদগ্রস্ততার কিছু নেই। সে তো কেবল এক সুস্পষ্ট সতর্ককারী। ১০৪

তাফসীরঃ

১০৪. মক্কার মুশরিকগণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবী বলে তো স্বীকার করতই না, উপরন্তু অনেক সময় তাকে উন্মাদ আবার কখনও কবি বা যাদুকর সাব্যস্ত করত (নাউযুবিল্লাহ)। এ আয়াত জানাচ্ছে, যারা আলটপ্কা কথা বলতে অভ্যস্ত কেবল তারাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে এ জাতীয় কথা বলতে পারে। সামান্য একটু চিন্তা করলেই তাদের কাছে এসব অভিযোগের অসারতা স্পষ্ট হয়ে যেত।
১৮৫

اَوَلَمۡ یَنۡظُرُوۡا فِیۡ مَلَکُوۡتِ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَمَا خَلَقَ اللّٰہُ مِنۡ شَیۡءٍ ۙ وَّاَنۡ عَسٰۤی اَنۡ یَّکُوۡنَ قَدِ اقۡتَرَبَ اَجَلُہُمۡ ۚ فَبِاَیِّ حَدِیۡثٍۭ بَعۡدَہٗ یُؤۡمِنُوۡنَ ١٨٥

আওয়া লাম ইয়ানজুরূ ফী মালাকূতিছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদিওয়ামা-খালাকাল্লা-হু মিন শাইয়িওঁ ওয়া আন ‘আছাআইঁ ইয়াকূনা কাদিকতারাবা আজালুহুম, ফাবিআইয়ি হাদীছিম বা‘দাহূইউ‘মিনূন।

তারা কি লক্ষ্য করেনি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বে এবং আল্লাহ যে সকল জিনিস সৃষ্টি করেছেন তার প্রতি এবং এর প্রতিও যে, সম্ভবত তাদের নির্ধারিত সময় কাছেই এসে পড়েছে? সুতরাং এর পর আর কোন কথায় তারা ঈমান আনবে?
১৮৬

مَنۡ یُّضۡلِلِ اللّٰہُ فَلَا ہَادِیَ لَہٗ ؕ وَیَذَرُہُمۡ فِیۡ طُغۡیَانِہِمۡ یَعۡمَہُوۡنَ ١٨٦

মাইঁ ইউদলিলিল্লা-হু ফালা-হা-দিইয়ালাহূ ওয়া ইয়াযারুহুম ফী তুগইয়া-নিহিম ইয়া‘মাহূন।

আল্লাহ যাকে বিপথগামী করেন, তাকে কেউ হিদায়াত দিতে পারে না; আর আল্লাহ তাদেরকে (অসহায়ভাবে) ছেড়ে দেন তাদের অবাধ্যতার ভেতর উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াতে।
১৮৭

یَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ السَّاعَۃِ اَیَّانَ مُرۡسٰہَا ؕ قُلۡ اِنَّمَا عِلۡمُہَا عِنۡدَ رَبِّیۡ ۚ لَا یُجَلِّیۡہَا لِوَقۡتِہَاۤ اِلَّا ہُوَ ؕۘؔ ثَقُلَتۡ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ لَا تَاۡتِیۡکُمۡ اِلَّا بَغۡتَۃً ؕ یَسۡـَٔلُوۡنَکَ کَاَنَّکَ حَفِیٌّ عَنۡہَا ؕ قُلۡ اِنَّمَا عِلۡمُہَا عِنۡدَ اللّٰہِ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ١٨٧

ইয়াছআলূনাকা ‘আনিছ ছা-‘আতি আইঁ ইয়া-না মুরছা-হা- কুল ইন্নামা-‘ইলমুহা-‘ইনদা রাববী লা-ইউজাললীহা-লিওয়াকতিহা-ইল্লা-হূ । ছাকুলাত ফিছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদি লা-তা’তীকুম ইল্লা-বাগতাতান ইয়াছআলূনাকা কাআন্নাকা হাফিইয়ুন ‘আনহা-; কুল ইন্নামা-‘ইলমুহা-‘ইনদাল্লা-হি ওয়ালা-কিন্না আকছারান্নাছি লা-ইয়া‘লামূন।

(হে রাসূল!) লোকে তোমাকে কিয়ামত সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে, তা কখন ঘটবে? বলে দাও, এ বিষয়ের জ্ঞান কেবল আমার প্রতিপালকেরই আছে। তিনিই তা যথাসময়ে প্রকাশ করে দেখাবেন, অন্য কেউ নয়। আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে তা অতি ভারী বিষয়। তোমাদের কাছে তা আসবে হঠাৎ করেই। তারা তোমাকে এমনভাবে জিজ্ঞেস করে, যেন তুমি তা সম্পূর্ণরূপে জেনে রেখেছ। বলে দাও, তার জ্ঞান কেবল আল্লাহরই কাছে রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ (এ বিষয়ে) জানে না।
১৮৮

قُلۡ لَّاۤ اَمۡلِکُ لِنَفۡسِیۡ نَفۡعًا وَّلَا ضَرًّا اِلَّا مَا شَآءَ اللّٰہُ ؕ  وَلَوۡ کُنۡتُ اَعۡلَمُ الۡغَیۡبَ لَاسۡتَکۡثَرۡتُ مِنَ الۡخَیۡرِ ۚۖۛ  وَمَا مَسَّنِیَ السُّوۡٓءُ ۚۛ  اِنۡ اَنَا اِلَّا نَذِیۡرٌ وَّبَشِیۡرٌ لِّقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ ٪ ١٨٨

কুল লাআমলিকুলিনাফছী নাফ‘আওঁ ওয়ালা-দাররান ইল্লা-মা-শাআল্লা-হু ওয়া লাও কুনতুআ‘লামূল গাইবা লাছতাকছারতুমিনাল খাইরি ওয়ামা-মাছছানিয়াছ ছূউ ইন আনা ইল্লা-নাযীরুওঁ ওয়া বাশীরুল লিকাওমিইঁ ইউ’মিনূন।

বল, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ ইচ্ছা না করেন, আমি আমার নিজেরও কোন উপকার ও অপকার করার ক্ষমতা রাখি না। আমার যদি গায়েব সম্পর্কে জানা থাকত, তবে ভালো-ভালো জিনিস প্রচুর পরিমাণে সংগ্রহ করে নিতাম এবং কোনও রকম কষ্ট আমাকে স্পর্শ করত না। ১০৫ আমি তো কেবল একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা সেই সকল লোকের জন্য, যারা (আমার কথা) মানে।

তাফসীরঃ

১০৫. অর্থাৎ গায়েব বা অদৃশ্য বিষয়ক সবকিছু যদি আমার জানা থাকত, তবে দুনিয়ায় যা-কিছু উপকারী ও ভালো জিনিস আছে, সবই আমি সংগ্রহ করে নিতাম এবং কোনও রকমের দুঃখ-কষ্ট আমাকে স্পর্শ করতে পারত না। কেননা তখনতো সকল কাজের পরিণতি আগে থেকেই আমার জানা থাকত। অথচ বাস্তব ব্যাপার এ রকম নয়। এর দ্বারা বোঝা গেল, গায়েব ও অদৃশ্য বিষয়ক সবকিছুর জ্ঞান আমাকে দেওয়া হয়নি। হাঁ, আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে আমাকে যে সকল বিষয়ে অবহিত করেন, সে সম্পর্কে আমার জানা হয়ে যায়। এর দ্বারা সেই সকল কাফের ও অবিশ্বাসীর ধারণাও খণ্ডন করা হয়েছে, যারা মনে করত আল্লাহ তাআলার বিশেষ এখতিয়ার ও ক্ষমতাসমূহের কিছুটা নবীদেরও থাকা জরুরী। সেই সঙ্গে যারা নবীদেরকে মর্যাদা দানের ক্ষেত্রে সীমালংঘন করে এবং তাদেরকে আল্লাহ তাআলার স্তরে পৌঁছিয়ে দেয়; বরং যেই শিরকের মূলোৎপাটনের জন্য নবী-রাসূলকে পাঠানো হয়, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের নামে যারা সেই শিরকী তৎপরতায় লিপ্ত হয়, এ আয়াত তাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছে।
১৮৯

ہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَکُمۡ مِّنۡ نَّفۡسٍ وَّاحِدَۃٍ وَّجَعَلَ مِنۡہَا زَوۡجَہَا لِیَسۡکُنَ اِلَیۡہَا ۚ فَلَمَّا تَغَشّٰہَا حَمَلَتۡ حَمۡلًا خَفِیۡفًا فَمَرَّتۡ بِہٖ ۚ فَلَمَّاۤ اَثۡقَلَتۡ دَّعَوَا اللّٰہَ رَبَّہُمَا لَئِنۡ اٰتَیۡتَنَا صَالِحًا لَّنَکُوۡنَنَّ مِنَ الشّٰکِرِیۡنَ ١٨٩

হুওয়াল্লাযীখালাকাকুম মিন নাফছিওঁ ওয়া-হিদাতিওঁ ওয়া জা‘আলা মিনহা-ঝাওজাহালিইয়াছকুনা ইলাইহা- ফালাম্মা-তাগাশশা-হা-হামালাত হামলান খাফীফান ফামাররাত বিহী, ফালাম্মাআছকালাদ্দা‘আওয়াল্লা-হা রাব্বাহুমা-লাইন আ-তাইতানা-সা-লিহাল লানাকূনান্না মিনাশশা-কিরীন।

আল্লাহ তিনি, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি ১০৬ হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকেই তার স্ত্রীকে বানিয়েছেন, যাতে সে তার কাছে এসে শান্তি লাভ করতে পারে। তারপর পুরুষ যখন স্ত্রীকে আচ্ছন্ন করল, তখন স্ত্রী (গর্ভের) হালকা এক বোঝা বহন করল, যা নিয়ে সে চলাফেরা করতে থাকল। ১০৭ অতঃপর সে যখন ভারী হয়ে গেল, তখন (স্বামী-স্ত্রী) উভয়ে তাদের প্রতিপালক আল্লাহর কাছে দোয়া করল, তুমি যদি আমাদেরকে সুস্থ সন্তান দান কর তবে আমরা অবশ্যই তোমার কৃতজ্ঞতা আদায় করব।

তাফসীরঃ

১০৬. এক ব্যক্তি দ্বারা হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং তাঁর স্ত্রী দ্বারা হযরত হাওয়া আলাইহাস সালামকে বোঝানো হয়েছে।
১৯০

فَلَمَّاۤ اٰتٰہُمَا صَالِحًا جَعَلَا لَہٗ شُرَکَآءَ فِیۡمَاۤ اٰتٰہُمَا ۚ فَتَعٰلَی اللّٰہُ عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ ١٩۰

ফালাম্মাআ-তা-হুমা-সা-লিহান জা‘আলা-লাহূ, শুরাকাআ ফীমাআ-তা-হুমা- ফাতা‘আ-লাল্লা-হু ‘আম্মা-ইউশরিকূন।

কিন্তু আল্লাহ যখন তাদেরকে একটি সুস্থ সন্তান দান করলেন, তখন তারা আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতে আল্লাহর সঙ্গে অন্যদেরকে শরীক করল, অথচ আল্লাহ তাদের অংশীবাদীসুলভ বিষয়াদি হতে বহু ঊর্ধ্বে।
১৯১

اَیُشۡرِکُوۡنَ مَا لَا یَخۡلُقُ شَیۡئًا وَّہُمۡ یُخۡلَقُوۡنَ ۫ۖ ١٩١

আ ইউশরিকূনা মা-লা-ইয়াখলুকুশাইআওঁ ওয়াহুম ইউখলাকূন।

তারা কি এমন সব জিনিসকে (আল্লাহর সাথে) শরীক মানে, যারা কোনও বস্তু সৃষ্টি করতে পারে না; বরং খোদ তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়?
১৯২

وَلَا یَسۡتَطِیۡعُوۡنَ لَہُمۡ نَصۡرًا وَّلَاۤ اَنۡفُسَہُمۡ یَنۡصُرُوۡنَ ١٩٢

ওয়ালা-ইয়াছতাতী‘ঊনা লাহুম নাসরাওঁ ওয়ালাআনফুছাহুম ইয়ানসুরূন।

এবং যারা তাদের কোনও সাহায্য করতে পারে না এবং খোদ নিজেদেরও সাহায্য করতে পারে না।
১৯৩

وَاِنۡ تَدۡعُوۡہُمۡ اِلَی الۡہُدٰی لَا یَتَّبِعُوۡکُمۡ ؕ سَوَآءٌ عَلَیۡکُمۡ اَدَعَوۡتُمُوۡہُمۡ اَمۡ اَنۡتُمۡ صَامِتُوۡنَ ١٩٣

ওয়া ইন তাদ‘উহুম ইলাল হুদা-লা-ইয়াত্তাবি‘উকুম ছাওয়াউন ‘আলাইকুম আদা‘আওতুমূহুম আম আনতুম সা-মিতূন।

তোমরা যদি তাদেরকে সঠিক পথের দিকে ডাক, তবে তারা তোমাদের কথা মানবে না; (বরং) তোমরা তাদেরকে ডাক বা চুপ থাক, উভয় তাদের জন্য সমান।
১৯৪

اِنَّ الَّذِیۡنَ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ عِبَادٌ اَمۡثَالُکُمۡ فَادۡعُوۡہُمۡ فَلۡیَسۡتَجِیۡبُوۡا لَکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ١٩٤

ইন্নাল্লাযীনা তাদ‘ঊনা মিন দূনিল্লা-হি ‘ইবা-দুনআমছা-লুকুম ফাদ‘ঊহুম ফালইয়াছতাজীবূ লাকুম ইন কুনতুম সা-দিকীন।

নিশ্চয়ই তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে ডাক, তারা তোমাদেরই মত (আল্লাহর) বান্দা। সুতরাং তোমরা তাদের কাছে প্রার্থনা কর, অতঃপর তারা তোমাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করুক যদি তোমরা সত্যবাদী হও। ১০৮

তাফসীরঃ

১০৮. অর্থাৎ তোমরা যে তাদেরকে উপাস্য বলে দাবি করছ, এতে তোমরা সত্যবাদী হলে তোমাদের দুঃখ-কষ্ট দূরীকরণ ও কল্যাণ সাধনের জন্য তাদের কাছে প্রার্থনা জানাও এবং তারা তা মঞ্জুর করুক। বলা বাহুল্য, তা মঞ্জুর করার সাধ্য তাদের নেই। এটাই প্রমাণ করে, উপাস্য হওয়ার যোগ্যতা তাদের নেই এবং তোমাদের দাবিও সঠিক নয়। -অনুবাদক
১৯৫

اَلَہُمۡ اَرۡجُلٌ یَّمۡشُوۡنَ بِہَاۤ ۫ اَمۡ لَہُمۡ اَیۡدٍ یَّبۡطِشُوۡنَ بِہَاۤ ۫ اَمۡ لَہُمۡ اَعۡیُنٌ یُّبۡصِرُوۡنَ بِہَاۤ ۫ اَمۡ لَہُمۡ اٰذَانٌ یَّسۡمَعُوۡنَ بِہَا ؕ قُلِ ادۡعُوۡا شُرَکَآءَکُمۡ ثُمَّ کِیۡدُوۡنِ فَلَا تُنۡظِرُوۡنِ ١٩٥

আলাহুম আরজুলুইঁ ইয়ামশূনা বিহা- আম লাহুম আইদিইঁ ইয়াবতিশূনা বিহা- আম লাহুম আ‘ইউনুইঁ ইয়ুবসিরূনা বিহা- আম লাহুম আ-যা-নুইঁ ইয়াছমা‘ঊনা বিহা- কুলিদ‘ঊ শুরাকাআকুম ছুম্মা কীদূ নি ফালা-তুনজিরূন।

তাদের কি পা’ আছে, যা দিয়ে তারা চলবে? অথবা তাদের কি হাত আছে, যা দিয়ে তারা ধরবে? অথবা তাদের কি চক্ষু আছে, যা দিয়ে দেখবে? অথবা তাদের কি কান আছে, যা দ্বারা তারা শুনবে? (তাদের) বলে দাও, তোমরা যে সকল দেবতাদেরকে আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করেছ, তাদেরকে ডাক তারপর আমার বিরুদ্ধে কোন চক্রান্ত কর এবং আমাকে একটুও অবকাশ দিয়ো না। ১০৯

তাফসীরঃ

১০৯. মক্কার কাফেরগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভয় দেখিয়েছিল, আপনি যে আমাদের দেবতাদের সম্পর্কে এমন সব কথা বলেন, যা দ্বারা বোঝা যায় তাদের কোন ক্ষমতা নেই, এ কারণে তারা আপনাকে শাস্তি দেবে (নাউযুবিল্লাহ)। এ আয়াতে তারই উত্তর দেওয়া হচ্ছে।
১৯৬

اِنَّ وَلِیِّ ۦَ اللّٰہُ الَّذِیۡ نَزَّلَ الۡکِتٰبَ ۫ۖ وَہُوَ یَتَوَلَّی الصّٰلِحِیۡنَ ١٩٦

ইন্না ওয়ালিইয়িইয়াল্লা-হুল্লাযী নাঝঝালাল কিতা-বা ওয়া হুওয়া ইয়াতাওয়াল্লাসসা-লিহীন।

আমার অভিভাবক তো আল্লাহ, যিনি কিতাব নাযিল করেছেন, আর তিনি পুণ্যবানদের অভিভাবকত্ব করেন।
১৯৭

وَالَّذِیۡنَ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِہٖ لَا یَسۡتَطِیۡعُوۡنَ نَصۡرَکُمۡ وَلَاۤ اَنۡفُسَہُمۡ یَنۡصُرُوۡنَ ١٩٧

ওয়াল্লাযীনা তাদ‘ঊনা মিন দূনিহী লা-ইয়াছতাতী‘ঊনা নাসরাকুমওয়ালা-আনফুছাহুম ইয়ানসুরূন।

তোমরা তাকে ছেড়ে যাদেরকে ডাক, তারা তোমাদের কোনও সাহায্য করতে সক্ষম নয় এবং খোদ নিজেদেরও কোনও সাহায্য করতে পারে না।
১৯৮

وَاِنۡ تَدۡعُوۡہُمۡ اِلَی الۡہُدٰی لَا یَسۡمَعُوۡا ؕ وَتَرٰىہُمۡ یَنۡظُرُوۡنَ اِلَیۡکَ وَہُمۡ لَا یُبۡصِرُوۡنَ ١٩٨

ওয়া ইন তাদ‘ঊহুম ইলাল হুদা-লা-ইয়াছমা‘ঊ ওয়া তারা-হুম ইয়ানজুরুনা ইলাইকা ওয়া হুম লা-ইউবসিরূন।

তুমি যদি তাদেরকে সঠিক পথের দিকে ডাক তবে তারা তা শুনবেও না। তুমি তাদেরকে দেখবে, যেন তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রকৃতপক্ষে তারা কিছুই দেখে না।
১৯৯

خُذِ الۡعَفۡوَ وَاۡمُرۡ بِالۡعُرۡفِ وَاَعۡرِضۡ عَنِ الۡجٰہِلِیۡنَ ١٩٩

খুযিল ‘আফওয়া ওয়া‘মুর বিল ‘উরফি ওয়া আ‘রিদ‘আনিল জা-হিলীন।

(হে নবী!) তুমি ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন কর এবং (মানুষকে) সৎকাজের আদেশ দাও আর অজ্ঞদের অগ্রাহ্য করো।
২০০

وَاِمَّا یَنۡزَغَنَّکَ مِنَ الشَّیۡطٰنِ نَزۡغٌ فَاسۡتَعِذۡ بِاللّٰہِ ؕ اِنَّہٗ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ٢۰۰

ওয়া ইম্মা-ইয়ানঝাগান্নাকা মিনাশশাইতা-নি নাঝগুন ফাছতা‘ইযবিল্লা-হি ইন্নাহূছামী‘উন ‘আলীম।

যদি শয়তানের পক্ষ হতে তোমাকে কোনও কুমন্ত্রণা দেওয়া হয়, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। ১১০ নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

তাফসীরঃ

১১০. এ আয়াতে সকল মুসলিমকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, শয়তান মনে কখনও মন্দ ভাবনার প্রতি প্ররোচনা দিলে সঙ্গে-সঙ্গে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। ক্ষমাপরায়ণ হওয়ার নির্দেশ দান প্রসঙ্গে এ বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করে বোঝানো হচ্ছে যে, যে ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শনের ফযীলত আছে, সেখানেও যদি শয়তানের প্ররোচনায় কারও রাগ এসে যায় তবে তার ওষুধ হচ্ছে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় চাওয়া।
২০১

اِنَّ الَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا اِذَا مَسَّہُمۡ طٰٓئِفٌ مِّنَ الشَّیۡطٰنِ تَذَکَّرُوۡا فَاِذَا ہُمۡ مُّبۡصِرُوۡنَ ۚ ٢۰١

ইন্নাল্লাযীনাত তাকাও ইযা-মাছছাহুম তাইফুম মিনাশশাইতা-নি তাযাক্কারূফাইযা-হুম মুবসিরূন।

যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, তাদেরকে যখন শয়তানের পক্ষ হতে কোনও কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে, তখন তারা (আল্লাহকে) স্মরণ করে। ১১১ ফলে তৎক্ষণাৎ তাদের চোখ খুলে যায়।

তাফসীরঃ

১১১. প্রবৃত্তি (নফস) ও শয়তানের প্ররোচনায় বড় বড় মুত্তাকীদেরও গুনাহের ইচ্ছা জাগে, কিন্তু তারা তা প্রশমিত করে এভাবে যে, তারা অবিলম্বে আল্লাহর যিকির করে, তাঁর কাছে সাহায্য চায় ও দোয়া করে এবং তাঁর সামনে উপস্থিতির কথা চিন্তা করে। ফলে তাদের চোখ খুলে যায় অর্থাৎ গুনাহের হাকীকত দৃষ্টিগোচর হয়। এভাবে তারা গুনাহ থেকে বেঁচে যায় এবং কখনও গুনাহ হয়ে গেলেও তাওবা করার তাওফীক হয়।
২০২

وَاِخۡوَانُہُمۡ یَمُدُّوۡنَہُمۡ فِی الۡغَیِّ ثُمَّ لَا یُقۡصِرُوۡنَ ٢۰٢

ওয়া ইখওয়া-নুহুম ইয়ামুদ্দূনাহুম ফিল গাইয়ি ছুম্মা লা-ইউকসিরূন।

আর যারা শয়তানের ভাই, শয়তানগণ তাদেরকে বিভ্রান্তির দিকে টেনে নিয়ে যায়। ফলে তারা (বিভ্রান্তি হতে) ফিরে আসে না।
২০৩

وَاِذَا لَمۡ تَاۡتِہِمۡ بِاٰیَۃٍ قَالُوۡا لَوۡلَا اجۡتَبَیۡتَہَا ؕ قُلۡ اِنَّمَاۤ اَتَّبِعُ مَا یُوۡحٰۤی اِلَیَّ مِنۡ رَّبِّیۡ ۚ ہٰذَا بَصَآئِرُ مِنۡ رَّبِّکُمۡ وَہُدًی وَّرَحۡمَۃٌ لِّقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ ٢۰٣

ওয়া ইযা-লাম তা’তিহিম বিআ-য়াতিন কা-লূলাওলাজ তাবাইতাহা- কুল ইন্নামা আত্তাবি‘উ মা-ইউহা ইলাইইয়া মিররাববী হা-যা-বাসাইরু মিররাব্বিকুম ওয়া হুদাওঁ ওয়া রাহমাতুল লিকাওমিইঁ ইউ’মিনূন।

এবং (হে নবী!) তুমি যদি তাদের সামনে (তাদের ফরমায়েশী) মুজিযা উপস্থিত না কর, তবে তারা বলে, তুমি নিজে বাছাই করে এ মুজিযা পেশ করলে না কেন? বলে দাও, আমার প্রতিপালক ওহীর মাধ্যমে আমাকে যে বিষয়ে আদেশ করেন, আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি। ১১২ এ কুরআন তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে জ্ঞান-তত্ত্বের সমষ্টি এবং যারা ঈমান আনে তাদের জন্য হিদায়াত ও রহমত। ১১৩

তাফসীরঃ

১১২. মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বহু মুজিযা তাদের নজরে এসেছিল, তথাপি তারা জেদের বশবর্তীতে নতুন-নতুন মুজিযা দাবি করত। তার উত্তরে এ আয়াতে বলা হয়েছে, আমি নিজের পক্ষ হতে কোন কাজ করতে পারি না। আমি সকল বিষয়ে আল্লাহ তাআলার ওহীর অনুসরণ করে থাকি।
২০৪

وَاِذَا قُرِیٴَ الۡقُرۡاٰنُ فَاسۡتَمِعُوۡا لَہٗ وَاَنۡصِتُوۡا لَعَلَّکُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ ٢۰٤

ওয়া ইযা-কুরিয়াল কুরআ-নুফাছতামি‘ঊ লাহূওয়া আনসিতূলা‘আল্লাকুম তুরহামূন।

যখন কুরআন পড়া হয় তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোন এবং চুপ থাক, যাতে তোমাদের প্রতি রহমত হয়। ১১৪

তাফসীরঃ

১১৪. এ আয়াতে বলা হয়েছে, কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত হলে তা পূর্ণ মনোযোগ সহকারে শোনা চাই। অবশ্য তিলাওয়াতকারীর উচিত যেখানে মানুষ নিজ কাজে ব্যস্ত, সেখানে উচ্চস্বরে না পড়া। এরূপ ক্ষেত্রে লোকে তিলাওয়াতে মনোযোগ না দিলে তার গুনাহ তিলাওয়াতকারীর নিজের উপরই বর্তাবে।
২০৫

وَاذۡکُرۡ رَّبَّکَ فِیۡ نَفۡسِکَ تَضَرُّعًا وَّخِیۡفَۃً وَّدُوۡنَ الۡجَہۡرِ مِنَ الۡقَوۡلِ بِالۡغُدُوِّ وَالۡاٰصَالِ وَلَا تَکُنۡ مِّنَ الۡغٰفِلِیۡنَ ٢۰٥

ওয়াযকুর রাব্বাকা ফী নাফছিকা তাদাররু‘আওঁ ওয়া খীফাতওঁ ওয়া দূনাল জাহরি মিনাল কাওলি বিলগুদুওবিওয়াল আ-সা-লি ওয়ালা-তাকুম মিনাল গা-ফিলীন।

এবং সকালে ও সন্ধ্যায় নিজ প্রতিপালককে স্মরণ কর বিনয় ও ভীতির সাথে, মনে মনে এবং অনুচ্চস্বরে মুখেও। যারা গাফলতিতে নিমজ্জিত, তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।
২০৬

اِنَّ الَّذِیۡنَ عِنۡدَ رَبِّکَ لَا یَسۡتَکۡبِرُوۡنَ عَنۡ عِبَادَتِہٖ وَیُسَبِّحُوۡنَہٗ وَلَہٗ یَسۡجُدُوۡنَ ٪ٛ ٢۰٦

ইন্নাল্লাযীনা ‘ইন্দা রাব্বিকালা-ইয়াছতাকবিরূনা‘আন ‘ইবা-দাতিহীওয়াইউছাব্বিহূনাহূওয়া লাহূইয়াছজুদূন। (ছিজদাহ-১)

স্মরণ রেখ, যারা (অর্থাৎ ফিরিশতাগণ) তোমার রবের সান্নিধ্যে আছে, তারা তাঁর ইবাদত থেকে অহংকারে মুখ ফেরায় না এবং তাঁর তাসবীহ পাঠ করে এবং তাঁরই সম্মুখে সিজদাবনত হয়। ১১৫

তাফসীরঃ

১১৫. এর দ্বারা ইশারা করা হয়েছে, মানুষকে আল্লাহ তাআলার যিকির করার যে হুকুম দেওয়া হয়েছে, তাতে আল্লাহ তাআলার নিজের কোন লাভ নেই। কেননা প্রথম কথা হল, কোনও মাখলূকের ইবাদত বা যিকির থেকে আল্লাহ তাআলা সম্পূর্ণ বেনিয়ায। দ্বিতীয়ত তাঁর এক বড় মাখলুক তথা ফিরিশতাগণ সর্বদা তাঁর যিকিরে মশগুল রয়েছে। আসলে মানুষকে যিকিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার নিজেরই লাভের জন্য। কেননা অন্তরে যিকির থাকলে সে অন্তর শয়তানের হস্তক্ষেপ থেকে নিরাপদ হয়ে যায় আর এভাবে মানুষ নিজেকে গুনাহ ও অন্যায়-অনাচার থেকে বাঁচাতে সক্ষম হয়। প্রকাশ থাকে যে, এটি সিজদার আয়াত। যে ব্যক্তি আরবীতে এ আয়াত পড়বে তার জন্য সিজদা ওয়াজিব হয়ে যায়। কুরআন মাজীদে এরূপ চৌদ্দটি আয়াত রয়েছে। এটি তার মধ্যে প্রথম। سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُوْنَ ـ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِيْنَ - وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعلَمِيْنَ -ـ