সাদপন্থিদের কতিপয় আপত্তির জবাব
প্রশ্নঃ ৭৮৮১. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার কিছু প্রশ্ন আছে।
সাদ পন্থিরা বলে:১.হুজুররা মাদ্রাসায় পড়িয়ে কেন টাকা নেয়
২.মুসা আ: এর দোষ আল্লাহ কোরআনে বলেছেন।
৩.হুজুররা দীনি কাজ করেনা
৪. আমরা মানুষের ডেকে ডেকে নামাজের জন্য বলি কিন্তু হুজুর তা বলেনা।
৫.ওলামা গণ তো তাবলিগের কেউ নন। তারা কেন আমাদের বিষয়ে নাক গলান।
৬.হেফাজতের কেউ তাবলীগে থাকতে পারবেনা।কারণ তারা রাজপথ দখল করে।
৭.হুজুররা কেন সাদ সাহেবের নামে বদনাম করে।তিনি তো নিজে নিজে আমির হন নাই। তাকে আমির বানানো হয়েছে।
একজন সাদ পন্থি আমাকে এই কথা গুলো বলেছে।আমি তার কোনো জবাব দিতে পারিনি। দয়া করে আমাকে এই ৭টা কথার জবাব জানাবেন। জাঝাকাললহু খইরন।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
১. মাদরাসায় পড়িয়ে টাকা নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হোক। ফলে জীবিকার তাগিদে মুসলমানদের বাচ্চাদেরকে কোরআন শেখানো বন্ধ করে দেয়া হোক। এ ধরনের চিন্তা কাদের হতে পারে?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সময় যারা মুসলমানদের বাচ্চাদের কোরআন শিক্ষা দিত, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যারা মুয়াল্লিম তথা শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন, তাদের জন্য বায়তুলমাল থেকে ভাতা ধার্য ছিল। যেহেতু এখন ইসলামী হুকুমত নেই, সেই ভাতা দেয়ার প্রচলন বন্ধ, শিক্ষকদের জীবিকা নির্বাহের এই দিকটি দেখার মত কেউ নেই। দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ নেই। এজন্য বায়তুল মালে যেখান থেকে টাকা উঠানো হতো অর্থাৎ সাধারণ জনগণ থেকে এখন সেখান থেকে মাদরাসার তহবিলের ভায়া হয়ে আলেমদের কাছে টাকাগুলো চলে আসছে।
সে যুগে বায়তুল মালে টাকা উঠানো হতো, এখন মাদরাসার তহবিলে টাকা উঠানো হয়। তখন বায়তুলমাল থেকে দেওয়া হতো, এখন মাদরাসার তহবিল থেকে দেওয়া হয়। নিয়ম ও ধারা একই রয়েছে। জায়গা পরিবর্তন হয়েছে।
আল্লাহ করে দিক, ইসলামী হুকুমত কায়েম হয়ে যাক, বায়তুলমাল থেকে মাদরাসা শিক্ষকদের ভাতা চালু হয়ে যাবে। উনারা মাদরাসা থেকে বেতন নামে আর কিছুই নেবেন না।
২. চোখে কালো চশমা থাকলে সাদা জিনিসটাও কালো দেখায়।
আমাদের সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে এ পর্যন্ত হক্কানি ওলামায়ে কেরাম কুরআনুল কারীমে মুসা আলাইহিস সালাম এর সমালোচনা খুঁজে পাচ্ছেন না।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা এই যে, সকল নবীগণ নিষ্পাপ ছিলেন। তারা সমালোচনার উর্ধ্বে থাকবেন। এই বিশ্বাস আমাদের সকল মুমিনের হৃদয়ে হৃদয়ে।
কিছুক্ষণের জন্য ধরে নেওয়া হলো আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমের মুসা আলাইহিস সালাম এর সমালোচনা করেছেন, তাই বলে একজন সাধারন মানুষ নবীর সমালোচনা করতে পারবে? আল্লাহ খালিক-মালিক। তিনি তাঁর বান্দার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে আলোচনা করবেন। সুইটি সম্পূর্ণ তার ইখতিয়ারাধীন। আমি আর আপনি কোন অধিকারে একজন নবী সম্পর্কে সমালোচনা মূলক কথা বলব?
৩. হুজুররা নামাজ পড়ে, কোরআন পড়ে ও পড়ায়, দাওয়াতের কাজ করে, মানুষের ইসলাহ করে, মানুষকে দ্বীন শিখায়, মাসআলা-মাসায়েল শিখায়, কিতাব লেখে, ধর্মীয় যত সব কাজ হুজুরেরা আঞ্জাম দেয়। তারপরও যদি বলা হয় হুজুররা দ্বীনী কাজ করে না। তো যারা সমালোচনা করছে তারা কালিমা, নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি কোত্থেকে শিখেছেন? ফাযায়েলে আমাল পড়ছে, এ কিতাব কে লিখেছেন? হাদীস পড়ছে, হাদীস কার মাধ্যমে পেয়েছে? সারা দুনিয়াতে দ্বীনী যা কাজ চলছে এগুলো কাদের মাধ্যমে চলছে?
হুজুররা না থাকলে তিনি সহীহ শুদ্ধ করে কালিমা পড়তে পারতেন? সূরা ফাতিহা সহীহ শুদ্ধ করে পড়তে পারতেন?
আল্লাহ যদি ওদের চোখ অন্ধ করে দেন, তবে ওরা দেখবে কি করে?
৪. যেকোনো জিনিস বিনির্মাণে সকলেই একই কাজ করে না। ডানে বামে সামনে উপরে বিভিন্ন সেকশন থেকে যার যার দায়িত্ব পালন করতে হবে।
কেউ সাধারণ মানুষকে ডেকে ডেকে নিয়ে আসবে। আর কেউ মসজিদের মিনার থেকে আজান দিবে। কেউ নামায পড়াবে। আর কেউ লোকজন একত্র হয়ে গেলে তাদেরকে দ্বীনী আলোচনা শোনাবে। এভাবেই কাজের ভাগ হবে।
আচ্ছা, দেখুনতো নামাজের দিকে ডাকা (আযান দেয়া) কত উত্তম কাজ। কিন্তু সারাজীবনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবারের জন্যেও আযান দেননি। তাই বলে আপনি কি বলবেন তিনি দাওয়াতের কাজ ছেড়ে দিয়েছেন? (নাউজুবিল্লাহ!)
আল্লাহর রহমতে এখনো হুজুররা যেসব সেকশন থেকে মানুষকে নামাজের কথা বলে, এক এক হুজুরের কথায় হাজার হাজার মানুষ নামাজী হয়। দাওয়াতের ঐ গুরুত্বপূর্ণ অংশকে সম্পূর্ণ কি অস্বীকার করা হবে?
৫. ওলামাগণ তাবলীগের কেউ নন, ভালো কথা। তাবলীগ করতে হবে কে শিখিয়েছে? তাবলীগের বর্তমান এই ধারা কাদের মাধ্যমে এসেছে? মাওলানা ইলিয়াস রাহিমাহুল্লাহ তিনি কে ছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তরে তারা কী বলবেন?
তাবলীগের মূলনীতি, তাবলীগ কখন করতে হবে? কখন তাবলীগ করা যাবে না, এইসব তো ওলামায়েকেরাম ই বলে দেবেন।
সমালোচক লোকটি গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হল। পথে উল্টাপাল্টা করল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার পথরোধ করল। লোকটি যদি তখন বলে তুমি গাড়ির কেউ নও। তুমি গাড়ি সম্পর্কে রাস্তা সম্পর্কে কিছু বলতে পারবে না। মেনে নেয়া হবে?
৬. বিশেষ কোনও মহল ধর্মীয় কোন বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্তে গেলে তাদেরকে শোধরানোর জন্য এই সমাজে প্রচলিত ধারায় শোধরানোর পদ্ধতি হিসেবে কোন একটি পদ্ধতি যদি হেফাজত ইসলাম গ্রহণ করে থাকে সেটি তাদের নাহি আনিল মুনকারের অন্তর্ভুক্ত।
৭. মূল বিতর্ক সাদ সাহেবের আমির হওয়া না হওয়া নয়। এটি একটি অনুষঙ্গ মাত্র। মূল বিষয় হলো, তিনি আমিরের জায়গায় বসে যেসব উক্তি পেশ করছেন এবং তার কথায় প্রণোদিত হয়ে তার অনুসারীরা যেসব কান্ড কারখানা ইতোমধ্যে ঘটিয়েছে এবং যেসব সমালোচনার দ্বার খুলে দিয়েছে। সেটি হল বিতরকের বিষয়। এর সাথে প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো তিনি ঐ জায়গাতে গিয়েছেন কি করে? সেটি একটি অনুষঙ্গ মাত্র।
তিনি যেসব মুরব্বিদের সঙ্গে থেকে দাওয়াতের কাজ করছিলেন, সেসব মুরুব্বিরা তাকে আমির হিসেবে মেনে নিলে কারো কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু দেখা গেল তার ওস্তাদ এবং তার চেয়েও বয়োজ্যেষ্ঠ ও দীর্ঘদিনের মুরুব্বিরা তার এই বিষয়টিকে মেনে নেননি। তারা অন্যত্র চলে গিয়ে ভিন্ন মারকাজ করেছেন। তো এখানে সাধারণ ওলামায়ে কেরামের আপত্তি দিয়ে শুরু নয়। বরং তাদের ভিতরগত অন্তর্দ্বন্দ্ব বাহিরে প্রকাশ হয়েছে। সেটি আলোচনার অংশে এসে গেছে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন