নেককার-মুত্তাকী হওয়ার উপায়
প্রশ্নঃ ১৩৫০৫০. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, নেককার বা মুওাকি হওয়ার উপায় কি?
২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
রাজশাহী
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
নেককার-মুত্তাকী হওয়ার উপায়
কুরআন মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত। অর্থাৎ কুরআনের প্রকৃত হিদায়াত দ্বারা উপকৃত হবে কেবল মুত্তাকীগণ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ.
এটি এমন কিতাব, যার মধ্যে কোনও সন্দেহ নেই। এটা হিদায়াত মুত্তাকীদের জন্য। -সূরা বাকারা, আয়াত নং ২
তাই তাকওয়া অর্জনের সহজ উপায় হলো, কুরআন ও সুন্নাহয় মুত্তাকীদের যে সব গুণাবলি উল্লেখ করা হয়েছে সে গুণগুলো অর্জন করার আপ্রাণ চেষ্টা করা।
দীর্ঘ কোন ভূমিকায় না গিয়ে সরাসরি এমন কিছু আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করছি, যাতে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, মুত্তাকীদের গুণাবলি কি কি?
কুরআনুল কারীমের শুরুতে সূরা বাকারার প্রথমেই মুত্তাকীদের কিছু মৌলিক গুণ-পরিচয় দিয়ে আল্লাহ বলেন-
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ (3) وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ (4) أُولَئِكَ عَلَى هُدًى مِنْ رَبِّهِمْ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ .
যারা অদৃশ্য জিনিসসমূহে ঈমান রাখে এবং সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা-কিছু দিয়েছি, তা থেকে (আল্লাহর সন্তোষজনক কাজে) ব্যয় করে।
এবং যারা ঈমান রাখে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতেও এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতেও এবং তারা আখিরাতে পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখে।
এরাই এমন লোক, যারা তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে সঠিক পথের উপর আছে এবং এরাই এমন লোক, যারা সফলতা লাভকারী। -সূরা বাকারা, আয়াত নং ৩-৫
উপরোক্ত আয়াতসমূহে মুত্তাকীদের যে গুণগুলো উল্লেখ করা হয়েছে-
১. ঈমান বিল গায়ব। অর্থাৎ অদৃশ্য বিষয়াবলীর উপর ঈমান রাখা, যা কেবলই আল্লাহ তায়ালার ওহীর মাধ্যমে জানা সম্ভব। ঈমান সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ই এর অন্তর্ভুক্ত। এর সারমর্ম হল- আল্লাহ তাআলা যা-কিছু কুরআন মাজীদে বর্ণনা করেছেন কিংবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে ইরশাদ করেছেন সে সবের প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস রাখা। যেমন আল্লাহ তাআলার গুণাবলী, জান্নাত ও জাহান্নামের অবস্থাদি, ফিরিশতা প্রভৃতি। -তাওযীহুল কুরআন
২. সালাত কায়েম করা। অর্থাৎ যথাযথভাবে নামায আদায় করা। কায়িক ইবাদতের মধ্যে এটা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. নিজের অর্থ-সম্পদ থেকে আল্লাহ তাআলার পথে ব্যয় করা। যাকাত-সদকা সবই এর অন্তর্ভুক্ত।
৪. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি যে ওহী অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে সত্য বলে বিশ্বাস করা। এবং তাঁর পূর্ববর্তী আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম- হযরত মূসা আ. হযরত ঈসা আ. প্রমুখের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তাও সত্য ছিল, যদিও পরবর্তীকালের লোকেরা তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেনি, বরং তাতে নানা রকম রদ-বদল ও বিকৃতি সাধন করেছে। -তাওযীহুল কুরআন
৫. আখিরাত-বিচার দিবসের ব্যাপারে পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখা।
অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকীদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-
الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ (134) وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ ...
যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় (আল্লাহর জন্য অর্থ) ব্যয় করে এবং যারা নিজের ক্রোধ হজম করতে ও মানুষকে ক্ষমা করতে অভ্যস্ত। আল্লাহ এরূপ পুণ্যবানদেরকে ভালোবাসেন।
এবং তারা সেই সকল লোক, যারা কখনও কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা (অন্য কোনওভাবে) নিজেদের প্রতি জুলুম করলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার ফলশ্রুতিতে নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। -সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১৩৪-১৩৫
উক্ত দুই আয়াতে মুত্তাকীদের চারটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে।
১. সুখ, দুঃখ উভয় অবস্থায় (আল্লাহর জন্য অর্থ) ব্যয় করা।
২. রাগ-ক্রোধকে সংবরণ করা।
৩. মানুষকে ক্ষমা করা।
৪. কোন অন্যায় কাজ বা নিজের উপর জুলুম করে ফেললে তাওবা ইস্তেগফার করা।
অন্য আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুত্তাকীদের আরও পরিচয় দিয়েছেন-
الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ (16) الصَّابِرِينَ وَالصَّادِقِينَ وَالْقَانِتِينَ وَالْمُنْفِقِينَ وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ .
যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা (তোমার প্রতি) ঈমান এনেছি। সুতরাং আমাদের পাপরাশি ক্ষমা কর এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা কর।
তারা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, ইবাদতগোযার, (আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের লক্ষ্যে) অর্থ ব্যয়কারী এবং সাহরীর সময় ক্ষমা প্রার্থনাকারী। -সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১৬-১৭
উক্ত দুই আয়াতে মুত্তাকীদের ৮ টি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে।
১. ঈমানের স্বীকৃতি দেওয়া।
২. গুনাহ হয়ে গেলে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৩. জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাওয়া।
৪. সবর-ধৈর্য্যশীল হওয়া।
৫. সত্যবাদী হওয়া।
৬. ইবাদতগোযার বান্দা হওয়া।
৭. আল্লাহর সন্তুষ্টিতে অর্থ ব্যয় করা।
৮. শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
সূরা বাকারার আরেক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কিছু নেক কাজের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, এসব কাজ যারা করবে তারাই মুত্তাকী।
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ .
পুণ্য তো কেবল এটাই নয় যে, তোমরা নিজেদের চেহারা পূর্ব বা পশ্চিম দিকে ফেরাবে; বরং পুণ্য হল (সেই ব্যক্তির কার্যাবলী), যে ঈমান রাখে আল্লাহর, শেষ দিনের ও ফিরিশতাদের প্রতি এবং (আল্লাহর) কিতাব ও নবীগণের প্রতি। আর আল্লাহর ভালোবাসায় নিজ সম্পদ দান করে আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন, মুসাফির ও সওয়ালকারীদেরকে এবং দাসমুক্তিতে এবং সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় এবং যারা কোনও প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূরণে যত্নবান থাকে এবং সঙ্কটে, কষ্টে ও যুদ্ধকালে ধৈর্যধারণ করে। এরাই তারা, যারা সাচ্চা (নামে অভিহিত হওয়ার উপযুক্ত) এবং এরাই মুত্তাকী।
উল্লেখিত গুনগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ-
১. ঈমান আনয়ন করা-
১.১. আল্লাহর উপর
১.২. শেষ দিনের উপর।
১.৩. ফিরিশতাদের উপর।
১.৪. আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি।
১.৫. নবীগণের প্রতি।
২. নিজ সম্পদ ব্যয় করা-
২.১. আত্মীয়-স্বজনদের জন্য।
২.২. ইয়াতীমদের জন্য।
২.৩. অসহায় মিসকীনদের জন্য।
২.৪. মুসাফিরদের জন্য।
২.৫. ভিক্ষাপ্রার্থীদের জন্য।
২.৬. দাসমুক্তির জন্য।
৩. সালাত-নামায আদায় করা।
৪. যাকাত আদায় করা।
৫. প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা।
৬. ধৈর্য ধারণ করা-
৬.১. সংকটে।
৬.২. কষ্টের মধ্যে।
৬.৩. যুদ্ধের সময়।
এছাড়া হাদীসের মধ্যেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকওয়ার মাধ্যমে ইবাদতকারী বান্দা হওয়ার উপায় বলেছেন।
اتَّقِ الْمَحَارِمَ تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ،
হারামের ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন করো, অর্থাৎ হারাম সম্পদসহ সর্ব প্রকার হারাম বিষয় থেকে বেঁচে থাক, তাহলে তুমি মানুষের মাঝে সবচেয়ে বেশি ইবাদতকারী বলে পরিগণিত হতে পারবে। -সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩০৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮০৯৫
এ হাদীসের মূল কথা হলো, প্রকৃত মুত্তাকীও ইবাদতকারী হতে হলে সর্ব প্রকার হারাম থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুহাম্মাদ আশরাফুল আলম
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
প্রসঙ্গসমূহ:
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১