মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

৭. নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ৩৬১
নামাযের অধ্যায়
(১২) পরিচ্ছেদঃ বাড়িতে মসজিদ তৈরী করার প্রসঙ্গে
(৩৬১) আনাস ইবন্ মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার বাবা সিরিয়া থেকে প্রতিনিধি হয়ে আসলেন, তখন আমিও তাঁর সাথে ছিলাম, তখন মাহমুদ ইবন্ রাবীর সাথে আমাদের দেখা হল, তখন তিনি আমার বাবাকে ইতবান ইবন্ মালিক (রা) থেকে একটা হাদীস শোনান। তিনি বলেন, আমার পিতা আমাকে বলেন, হে বৎস। এ হাদীসটি মুখস্ত কর এটি হলো হাদীসের খনি। অতঃপর সফর থেকে ফিরে আমরা যখন মদীনা পৌঁছলাম তখন তাঁর (ইতবান) সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি জীবিত ছিলেন, তাঁর সাথে ছিলেন এক অন্ধ বৃদ্ধ। তিনি বলেন, আমরা তাঁকে হাদীসটি সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেন, হ্যাঁ রাসূল (ﷺ)-এর যুগে আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তখন আমি রাসূল (ﷺ)-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছি। আপনার পিছনে নামায পড়ার শক্তি আমার নেই, আপনি যদি আমার বাড়িতে একটি নামাযের জায়গা তৈরী করতেন, আর সেখানে নামায পড়তেন তা হলে আমি সেখানে নামাযের জায়গা ঠিক করে নিতাম। রাসূল (ﷺ) বললেন, হ্যাঁ, আগামীকাল আমি তোমার নিকট আসবো, তিনি বলেন, পরদিন নামায শেষে তাঁর দিকে ফিরলেন। তারপর উঠে তাঁর কাছে আসলেন। (অন্য বর্ণনায় আছে,) তিনি আবূ বকর ও উমর (রা) আসলেন তিনি এসে বসলেন, হে ইতবান। কোন জায়গাটি তুমি তোমার নামাযের জন্য নির্ধারণ করতে পছন্দ কর? তিনি ঘরের একটি স্থানের দিকে ইঙ্গিত করলেন, রাসূল (ﷺ) সে স্থানটি নির্ধারণ করলেন এবং সেখানে নামায পড়লেন, তারপর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন, অথবা বসলেন, (অন্য বর্ণনায় আছে) খাওয়ার জন্য তাঁকে কিছুক্ষণ আটকে রাখলাম, আমাদের প্রতিবেশী আনসারদের কাছে এ খবর পৌছে গেল। তখন তাঁরা চলে আসলো তাতে আমার ঘর ভরে গেল। তারা মুনাফিকদের পক্ষ থেকে যে কষ্ট ও অসদাচরণ পাচ্ছিলেন তার বর্ণনা দিলেন, শেষ পর্যন্ত মালিক ইবন্ দুখসুম নামক এক ব্যক্তির প্রতি ইশারা করলেন, (অন্য বর্ণনায় তাঁর নামে দুখসুন, অথবা দুখাইসিন বর্ণিত হয়েছে) তারা তার বিভিন্ন অসৎ চরিত্রের বিবরণ দিচ্ছিলেন, তখন রাসূল (ﷺ) নিরব ছিলেন। তাঁরা যখন তার বেশী দোষ ত্রুটির কথা বলাবলি করছিলেন, তখন রাসূল (ﷺ) বললেন, সে কি
لا اله الا الله
(আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই)
এ কথার সাক্ষী দেয় না? এভাবে তিনি তিনবার বলার পর তাঁরা বললো, হ্যাঁ সে এ কথার সাক্ষ্য দেয়। তখন রাসূল (ﷺ) বললেন, যিনি আমাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ করে বলছি, যদি সে একনিষ্ঠ ও সত্য অন্তরে এ কথা বলে তাহলে জাহান্নামের আগুন কখনও তাকে ভক্ষণ করবে না। তারা বলে, একথা শুনে তারা এমনভাবে আনন্দিত হলেন, যা অতীতে কখনও হন নি।
(অন্য বর্ণনায় আছে) আনাস ইবন্ মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, ইতবান ইবন্ মালিকের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পেয়েছিল তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আপনি যদি আমার ঘরে এসে নামায পড়তেন, অথবা বাড়িতে (নামায পড়তেন) তাহলে আপনার সে নামাযের জায়গাটি আমি আমার নামাযের স্থান করে নিতাম। তখন নবী (ﷺ) আসলেন এবং তাঁর ঘরে নামায পড়লেন। অথবা বললেন, তাঁর বাড়িতে (নামায পড়লেন) তখন ইতবানের গোত্রের কিছু লোক ঘরে এসে নবী (ﷺ)-এর কাছে একত্রিত হলেন। ইতবান বলেন, তারা মালিক ইবন্ দুখসুনের নাম উল্লেখ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল। সে আকারে ইঙ্গিতে মুনাফিক হয়ে গেছে। তখন রাসুল (ﷺ) বললেন, তোমরা কি দেখ না সে আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল একথার সাক্ষ্য দেয়? তারা বলল হ্যাঁ। রাসূল (ﷺ) বলেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, যে ব্যক্তি সত্য মনে তা বলবে, আল্লাহ তার জন্য দোযখের আগুন হারাম করে দিবেন।
(বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ, ইবন্ মাজাহ।)
كتاب الصلاة
(12) باب ما جاء فى اتخاذ المساجد فى البيوت
(361) عن على بن زيد بن جدعان قال حدثنى أبو بكر بن أنس ابن مالك قال قدم أبى من الشام وافدا وأنا معه فلقينا محمود بن الربيع فحدث أبي حديثا عن عتبان (1) بن مالك قال أبى أى بنى احفظ هذا الحديث فإنه من كنوز الحديث، فلما قفلنا (2) انصرفنا إلى المدينة فسألنا عنه فإذا هو حى، وإذا شيخ أعمى معه، قال فسألناه عن الحديث فقال نعم، ذهب بصرى على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم فقلت يا رسول الله ذهب بصرى ولا أستطيع الصلاة خلفك فلو بوأت (3) فى دارى مسجدا فصليت فيه فأتخذه مصلى قال نعم، فإنى غاد عليك غدا، قال فلما صلى من الغد التفت إليه فقام حتى أتاه (وفى رواية فجاء هو أبو بكر وعمر) فقال يا عتبان أين تحب أن أبوئ لك فوصف له مكانا فبوأ له وصلى فيه، ثم حبس (4) أو جلس (وفى رواية فاحتبسوا على طعام) وبلغ من حولنا من الأنصار فجاؤا حتى ملئت علينا الدار فذكروا المنافقين وما يلقون من أذاهم وشرهم حتى صيروا وأمرهم (5) إلى رجل منهم يقال له مالك بن الدخشم (6) (وفى رواية الدخشن أو الدخيشن) وقالوا من حاله ومن حاله (1) ورسول الله صلى الله عليه وسلم ساكت، فلما أكثروا قال رسول الله صلى الله عليه وسلم أليس يشهد أن لا إله إلا الله؟ فلما كان فى الثالثة قالوا إنه ليقوله، قال والذى بعثنى بالحق لئن قالها صادقا من قلبه لا تأكله النار أبدا (2) قالوا فما فرحوا بشئ قط كفرحهم بما قال (3) (ومن طريق ثان) (4) عن ثابت عن أنس (بن مالك) رضى الله عنه أن عتبان بن مالك ذهب بصره فقال يا رسول الله لو جئت صليت فى دارى أو قال فى بيتى لاتخذت مصلاك مسجدا، فجاء النبى صلى الله عليه وسلم فصلى في داره أو قال فى بيته، واجتمع قوم عتبان إلى النبى صلى الله عليه وسلم قال فذكروا مالك بن الدخشم، فقالوا يا رسول الله إنه وإنه يعرضون (5) بالنفاق، فقال النبى صلى الله عليه وسلم أليس يشهد أن لا إله إلا الله وأنى رسول الله؟ قالوا بلى، قال والذى نفسي بيده لا يقولها عبد صادق بها إلا حرمت عليه النار

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হযরত ইতবান ইবন মালিক রাযি. নিজ গোত্র বনূ সালিমের মসজিদের ইমাম ছিলেন। তাঁর দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। শেষদিকে তিনি পরিপূর্ণ অন্ধই হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর দৃষ্টিশক্তি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনকার কথা এ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর বাড়ি থেকে মসজিদে আসতে একটি উপত্যকা পার হতে হতো। বৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢলে উপত্যকা ভরে যেত। ফলে তাঁর পক্ষে সেটি পার হয়ে মসজিদে আসা সম্ভব হতো না, যেমনটা তিনি এ হাদীছে বর্ণনা করেছেন।

তিনি চাচ্ছিলেন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাড়িতে এসে নির্দিষ্ট একটি স্থানে নামায পড়লে তিনি বরকতস্বরূপ সে স্থানটিকে নিজ নামাযের স্থানরূপে গ্রহণ করতেন। তিনি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এর জন্য অনুরোধ করলে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অনুরোধ রক্ষা করেন।

একদিন তিনি সূর্যোদয়ের পর বেলা চড়ে আসলে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-কে সঙ্গে নিয়ে তাঁর বাড়িতে আসেন। পরে হযরত উমর ফারূক রাযি.-ও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। দিনটি ছিল শনিবার। তিনি হযরত ইতবান রাযি.-এর দেখানো স্থানে সকলকে নিয়ে দু' রাক'আত নামায আদায় করেন। তারপর তাঁর সামনে খাযীরা পেশ করা হয়। খাযীরা হল আটার সঙ্গে চর্বি মিশিয়ে তৈরি করা এক প্রকার খাদ্য। তিনি তা খেয়ে নেন। ইত্যবসরে মহল্লায় তাঁর আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়লে লোকজন জমা হয়ে যায়।

হযরত মালিক ইবন দুখশুম রাযি. এ গোত্রেরই একজন সাহাবী। উপস্থিত লোকজনের মধ্যে তাঁকে দেখা না যাওয়ায় তাঁকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। কেউ একজন তাঁকে মুনাফিকও বলে বসে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মন্তব্যের প্রতিবাদ করেন এবং তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দেন যে, তিনি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্যই কালেমায়ে তায়্যিবা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করে থাকেন। এটা তাঁর মুমিন হওয়ার দলীল।

এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বলে মন্তব্যকারীর প্রতিবাদ করেছিলেন যে, সে কি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি? ইবন ইসহাক রহ. তার মাগাযী গ্রন্থে এ কথাও বর্ণনা করেছেন যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মালিক ইবন দুখশুম ও মা'ন ইবন 'আদী রাযি.-কে মুনাফিকদের প্রতিষ্ঠিত মসজিদ- মসজিদে যিরার ধ্বংস করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা সেটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। এটাও তাঁর খাঁটি মুমিন হওয়া ও মুনাফিকী থেকে মুক্ত থাকার প্রমাণ বহন করে।

যারা তাঁকে মুনাফিক বলে মন্তব্য করেছিলেন তারা এর কারণ দেখিয়েছিলেন এই যে, তাঁকে মুনাফিকদের সঙ্গে উঠাবসা করতে দেখা যায়। কিন্তু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেখানো এ কারণটিকে তাঁর মুনাফিকীর দলীলরূপে গ্রহণ করেননি। সম্ভবত তাদের সঙ্গে তাঁর উঠাবসা করার বিশেষ কোনও কারণ ছিল। সবশেষে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কালেমায়ে তায়্যিবার ফযীলত বয়ান করেছেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এটা পাঠ করে, অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনও মা'বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এ ঘোষণা দান করে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেন। এ হারাম হওয়ার অর্থ ওই ব্যক্তির কবীরা গুনাহ না থাকলে জাহান্নামে আদৌ যাবে না। যদি কবীরা গুনাহ থাকে এবং আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দেন, তখনও সে জাহান্নামে যাবে না। আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা না করলে নির্দিষ্ট মেয়াদে শাস্তিভোগ করার পর সে জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভ করবে। এ কালেমার কারণে তাকে অনন্তকাল জাহান্নামে থাকতে হবে না।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কারও বিশেষ ওজর থাকলে সে মসজিদে না গিয়ে ফরয নামায নিজ ঘরেও আদায় করতে পারে।

খ. তাবাররুকের ধারণা ইসলামবিরোধী নয়। তাবাররুক হিসেবেই হযরত ইতবান ইবন মালিক রাযি. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামায আদায়ের স্থানকে নিজের জন্য নামাযের স্থানরূপে গ্রহণ করেছিলেন।

গ. কারও বাড়িতে বিশেষ কোনও বুযুর্গ ব্যক্তির শুভাগমন হলে মহল্লার লোকজনের উচিত তার সঙ্গে দেখা করতে আসা এবং কিছুক্ষণ তার সাহচর্যে কাটানো। বাড়িওয়ালারও উচিত তাদেরকে সেই সুযোগ দেওয়া।

ঘ. অকাট্য কারণ ছাড়া কালেমা পাঠকারী কোনও ব্যক্তিকে মুনাফিক বলা উচিত নয়। কেননা দিলের খবর আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কেউ জানে না।

ঙ. সঙ্গত কারণ ছাড়া কাফের-মুশরিক ও ফাসেক-ফাজেরদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করা উচিত না। তাতে অন্যদের মনে অহেতুক সন্দেহ সৃষ্টি হয়। অহেতুক সন্দেহ সৃষ্টি হতে দেওয়া সমীচীন নয়।

চ. আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে যে ব্যক্তি কালেমা পাঠ করে আর এ অবস্থায় মারা যায়, জাহান্নামের স্থায়ী শাস্তি তার জন্য নয়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান