রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ১০৩৯
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
আযানের ফযীলত: আযানের দু'আ
১০৩৯. হযরত জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আযান শুনে বলবে- اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ (হে আল্লাহ! এই পূর্ণাঙ্গ আহ্বান ও আসন্ন নামাযের প্রতিপালক! আপনি মুহাম্মাদকে দান করুন অসিলা ও শ্রেষ্ঠত্ব। এবং তাঁকে পৌঁছে দিন সেই প্রশংসিত স্থানে, যার ওয়াদা আপনি করেছেন), কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফাআত ওয়াজিব হয়ে যাবে। -বুখারী। (সহীহ বুখারী: ৬১৪; সুনানে আবু দাউদ: ৫২৯; সুনানে নাসাঈ ৬৮০; জামে তিরমিযী: ২১১: সুনানে ইবন মাজাহ ৭২০; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১৯১১; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৬৫; সহীহ ইবন খুযায়মা: ৪২০; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার ৮৯৫; সহীহ ইবন হিব্বান: ১৬৮৯)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1039 - وعن جابر - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «مَنْ قَالَ حِيْنَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ: اللَّهُمَّ رَبَّ هذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلاَةِ القَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الوَسِيلَةَ، وَالفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ، حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتي يَوْمَ القِيَامَةِ». رواه البخاري. (1)

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: البخاري 1/ 159 (614).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটিতে আযানের দু'আ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং সে দু'আর ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। দু'আটির দুটি অংশ রয়েছে। প্রথম অংশে আছে আল্লাহ তা'আলার গুণগান আর দ্বিতীয় অংশে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য প্রার্থনা। সে প্রার্থনায় তাঁর জন্য বিশেষ তিনটি মর্যাদা চাওয়া হয়েছে।

দু'আটির প্রথম কথা হলো- اَللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ (হে আল্লাহ! এই পূর্ণাঙ্গ আহ্বানের প্রতিপালক)! পরিপূর্ণ আহ্বান বলতে আযানকে বোঝানো হয়েছে। ডাক হিসেবে আযান অত্যন্ত পরিপূর্ণ। কোনওরকম ত্রুটি এর ভেতর নেই। এতে ইসলামের মৌলিক দু'টি অঙ্গ ঈমান ও আমলের উল্লেখ রয়েছে। ঈমান হলো আল্লাহ তা'আলার একত্ব ও হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সাক্ষ্য। এ দুই সাক্ষ্যের ভেতর ঈমানের অন্যান্য সকল শাখা নিহিত রয়েছে। আমলের সবচে' বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো নামায। নামায একটি শিরোনাম। এটি বললে বাকি সব ইবাদত-বন্দেগী আপনা-আপনিই চলে আসে। ঈমান ও আমলের সমষ্টিই হলো ইসলাম। ইসলামের অনুসরণেই মানুষের দোজাহানের সফলতা। এসব কথাই আযানের মধ্যে রয়েছে। কাজেই এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আহ্বান। আমাদের মহান দীন ইসলাম ছাড়া আর কোনও ধর্মেই এমন পূর্ণাঙ্গ আহ্বান নেই।

আল্লাহ তা'আলাকে এ পূর্ণাঙ্গ আহ্বান তথা আযানের রব্ব বলা হয়েছে। এর এক কারণ তো এই যে, আযান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতেই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এর ভেতর রয়েছে আল্লাহ তা'আলার রবুবিয়াত ও তাঁর প্রতিপালকত্বের নিদর্শন। প্রকৃতপক্ষে আযান হলো মানুষের দীনী প্রতিপালনের মৌলিক সবক।

দ্বিতীয়ত আযান দ্বারা মানুষকে তার রব্বের দিকে ডাকা হয়। মানুষ যাতে আল্লাহ তা'আলাকে রব্ব স্বীকার করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের যথাযথ চেষ্টায় রত থাকে, তাই আযানের মূল বার্তা। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা আযানের রব্ব তথা এ পূর্ণাঙ্গ আযান দ্বারা যাঁর অভিমুখী মানুষকে করা হয়, তিনি সেই মহান সত্তা।

তারপর বলা হয়েছে- وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ এবং আসন্ন নামাযের (প্রতিপালক!) অথবা এর অর্থ, স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় নামাযের (প্রতিপালক)। الْقَائِمَةُ এর উৎপত্তি قيام থেকে। قيام অর্থ দাঁড়ানো, প্রতিষ্ঠিত হওয়া। কাজেই الْقَائِمَة এর অর্থ যা শীঘ্রই দাঁড়াবে বা যা প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং الصَّلَاةَ الْقَائِمَة এর অর্থ- যে নামায আসন্ন, যা শীঘ্রই দাঁড়াবে। অথবা এর অর্থ- যে নামায প্রতিষ্ঠিত ও স্থায়ী। অর্থাৎ যা কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, যাতে কোনওরূপ রদবদলের অবকাশ নেই এবং যা কখনও রহিত হওয়ার নয়। যতদিন না কিয়ামত হবে, তত দিন পর্যন্ত এ নামায প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

তো আল্লাহ তা'আলা এই নামাযের রব্ব ও প্রতিপালক। অর্থাৎ এ নামায আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং এ নামায তাঁরই উদ্দেশ্যে পড়া হয়। নামায এক মহান ইবাদত। এ ইবাদতের উদ্দেশ্য কেবলই মহান প্রতিপালক আল্লাহর তা'আলার সামনে বান্দার চরম আনুগত্য প্রকাশ করা ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা।

অসিলা দ্বারা কী বোঝানো উদ্দেশ্য
দু'আটিতে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য যে তিনটি বিষয় প্রার্থনা করা হয়েছে, তার প্রথম হলো অসিলা। الْوَسِيلَة শব্দের মূল অর্থ নৈকট্যপ্রাপ্ত বা নিকটবর্তী। বলা হয়, وَسَلَ إِلَيْهِ (সে তার নিকটবর্তী হলো)। কবি লাবীদ রাযি.-এর কবিতায় আছে بَلَى كُلُّ ذِي رَأْي إِلَى اللهِ وَاسِلُ ‘নিশ্চয়ই প্রত্যেক বুদ্ধিমান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনকারী (হতে পারে)'।

শব্দটি নৈকট্য প্রাপ্তির অবলম্বন অর্থেও ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ যা দ্বারা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করা হয়। যেমন কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ

'হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর পর্যন্ত পৌঁছার জন্য অসিলা সন্ধান করো। (সূরা মায়েদা, আয়াত ৩৫)

মুফাসসিরগণের মতে আয়াতে 'অসিলা' দ্বারা 'সৎকর্ম' বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম হতে পারে। বোঝানো হচ্ছে যে, তোমরা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জনের জন্য সৎকর্মকে অসিলা বানাও। অপর এক আয়াতে ইরশাদ-

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ یَدۡعُوۡنَ یَبۡتَغُوۡنَ اِلٰی رَبِّہِمُ الۡوَسِیۡلَۃَ اَیُّہُمۡ اَقۡرَبُ وَیَرۡجُوۡنَ رَحۡمَتَہٗ وَیَخَافُوۡنَ عَذَابَہٗ ؕ اِنَّ عَذَابَ رَبِّکَ کَانَ مَحۡذُوۡرًا

'তারা যাদেরকে ডাকে, তারা নিজেরাই তো এই লক্ষ্যে তাদের প্রতিপালক পর্যন্ত পৌঁছার অসিলা সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে আল্লাহর বেশি নিকটবর্তী হতে পারে এবং তারা তাঁর রহমতের আশা করে ও তাঁর আযাবকে ভয় করে। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালকের আযাব এমন, যাকে ভয় করাই উচিত। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৫৭)

এ আয়াতেও 'অসিলা' শব্দটি আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জনের অবলম্বন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বস্তুত সর্বপ্রকার সৎকর্মই আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তির অসিলা। তবে বিশেষ অর্থে অসিলা হলো জান্নাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্ধারিত একটি মর্যাদাপূর্ণ স্থান। হযরত আবু সা'ঈদ খুদরী রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِنَّ الْوَسِيلَةَ دَرَجَةٌ عِنْدَ اللهِ لَيْسَ فَوْقَهَا دَرَجَةٌ، فَسَلُوا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ يُؤْتِينِي الْوَسِيلَةَ عَلَى خَلْقِهِ

'অসিলা হলো আল্লাহ তা'আলার নিকট মর্যাদার একটি স্তর, যার উপর কোনও স্তর নেই। তোমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করো যেন তিনি তাঁর মাখলুকের উপর আমাকে সেই অসিলা দান করেন। (আল মু'জামুল আওসাত: ১৪৬৬; মুসনাদে আহমাদ: ১১৮০৫)

জান্নাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্ধারিত স্থানকে অসিলা বলা হয় এ কারণে যে, এটি জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থান এবং এটি আল্লাহ তা'আলার সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী মঞ্জিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু ইবাদত-বন্দেগীর দিক থেকে আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠতম মাখলুক, আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা বেশি জ্ঞানী, তাঁকে সর্বাপেক্ষা বেশি ভয়কারী এবং সর্বোচ্চ মুহাব্বতকারী, তাই তাঁর জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান অসিলা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এখানে প্রশ্ন হতে পারে, আমরা তো জানি জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর হলো 'আল-ফিরদাওসুল আ'লা'। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِنَّ فِي الْجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ أَعَدَّهَا اللَّهُ لِلْمُجَاهِدِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ مَا بَيْنَ الدَّرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ فَاسْأَلُوهُ الْفِرْدَوْسَ فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الْجَنَّةِ وَأَعْلَى الْجَنَّة

'জান্নাতে একশটি স্তর আছে। আল্লাহর পথে মুজাহিদদের জন্য আল্লাহ তা প্রস্তুত রেখেছেন। প্রতি দুই স্তরের মধ্যবর্তী দূরত্ব আসমান-যমীনের মধ্যবর্তী দূরত্ব পরিমাণ তোমরা যখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে, তখন ফিরদাওস প্রার্থনা করবে। কেননা ফিরদাওস জান্নাতের সর্বোত্তম ও সর্বোচ্চ স্তর। (সহীহ বুখারী: ২৭৯০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩৪০৭৬; মুসনাদুল বাযযার: ৪২০৩; সহীহ ইবন হিব্বান: ৪৬১১; হাকিম, আল মুসতাদরাক ২৬৭; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৭৭৬৬)

এ হাদীছে ফিরদাওসকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর বলা হয়েছে। অপরদিকে উপরের হাদীছে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর বলা হয়েছে অসিলাকে। এর সমাধান কী?

উলামায়ে কেরাম এর সমাধান করেছেন এভাবে যে, জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর ফিরদাওস বটে, কিন্তু সে ফিরদাওসেরও আবার বহু স্তরভেদ রয়েছে। একই স্তর বহু স্তরে বিভক্ত ও বিন্যস্ত হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। তো ফিরদাওস যে বহু স্তরে বিভক্ত, তার মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর হলো অসিলা, যা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্ধারিত। তা তাঁর জন্য নির্ধারিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাদেরকে তাঁর জন্য এর দু'আ করতে বলেছেন এ লক্ষ্যে যে, যাতে করে এ দু'আর বদৌলতে আমরাও জান্নাতের এমন কোনও স্তর লাভ করতে পারি, যা তুলনামূলকভাবে আল্লাহ তা'আলার বেশি নিকটবর্তী।

দু'আটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য দ্বিতীয় যে বিষয় চাওয়া হয়েছে তা হচ্ছে- الْفَضيلَة (ফাযীলা)। ফাযীলা শব্দের অর্থ শ্রেষ্ঠত্ব, উচ্চ মর্যাদা, উত্তম চরিত্র, বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব। আযানের দু'আয় এর দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য এমন উচ্চ ও বিশেষ মর্যাদা, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্দিষ্ট। এ মর্যাদা কুল মাখলুকাতের মর্যাদা অপেক্ষা অনেক উঁচু। অসিলা ও ফাযীলা এক নয়। অসিলা জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর বা স্থান, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্ধারিত। আর ফাযীলা হলো অন্য সকলের তুলনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উচ্চ মর্যাদা।

মাকামে মাহমূদ বলতে কী বোঝায়
দু'আটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য তৃতীয় যে বিষয় চাওয়া হয়েছে তা হচ্ছে- مَقَامًا مَحْمُوْدًا (প্রশংসিত স্থান)। সূরা বনী ইসরাঈলে এ সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-

وَمِنَ الَّیۡلِ فَتَہَجَّدۡ بِہٖ نَافِلَۃً لَّکَ عَسٰۤی اَنۡ یَّبۡعَثَکَ رَبُّکَ مَقَامًا مَّحۡمُوۡدًا

'রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়বে, যা তোমার জন্য এক অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছাবেন। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৭৯)

এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেওয়া আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা যে, তিনি তাঁকে মাকামে মাহমূদে পৌঁছাবেন। মাকাম মানে স্থান, অবস্থান ও পদমর্যাদা। মাহমূদ মানে প্রশংসিত। প্রশংসিত স্থান বা মাকামে মাহমুদ দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য শাফা'আতের স্থান বা অবস্থান। এটা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্ধারিত। একে প্রশংসিত বলা হয়েছে এ কারণে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এ অবস্থান থেকে আল্লাহ তা'আলার অভাবনীয় ও অকল্পনীয় প্রশংসা করবেন। এটা ঘটবে হাশরের ময়দানে। এর বিস্তারিত বিবরণ বিভিন্ন হাদীছে এসেছে। তার সারমর্ম নিম্নরূপ-

হাশরের মাঠে হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্তকার সমস্ত মানুষ একত্র হবে। তা হবে এক বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত মাঠ। সে মাঠে বড়-ছোট, সাদা-কালো, পাপী-পুণ্যবান, শাসক-শাসিত নির্বিশেষে সমস্ত মানুষ সমবেত থাকবে।

সকলেই হিসাব-নিকাশ ও বিচারকার্যের অপেক্ষায় থাকবে। সূর্য থাকবে মাথার উপর। প্রচণ্ড গরমে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে যাবে। অন্যদিকে বিচারকার্যের অপেক্ষা। মনের ভেতর ভয়। না জানি কী হবে! প্রত্যেকেরই থাকবে আপন মুক্তির চিন্তা। এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সেখানে বিরাজ করবে। সময়টা হবে বড় দীর্ঘ। মানুষ পেরেশান হয়ে কোনও সুপারিশকারীর সন্ধান করবে, যাতে তার সুপারিশে আল্লাহ তা'আলা বিচারকার্য শুরু করেন। একের পর এক নবী-রাসূলের কাছে ছোটাছুটি করবে। কিন্তু কারও সুপারিশ করার হিম্মত হবে না। সবশেষে মানুষ মহানবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত হবে। তিনি বলবেন, হাঁ, এটা আমারই কাজ। অনন্তর তিনি আরশের নিচে সিজদায় পড়ে যাবেন। এ অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করতে থাকবেন। এমন প্রশংসা করবেন, যা কখনও কোনও মানুষের অন্তরে আসেনি। কোনও কোনও বর্ণনায় এর কিছুটা বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যেমন হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন বলবেন-

لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ ، وَالْخَيْرُ فِي يَدَيْكَ ، وَالشَّرُّ لَيْسَ إِلَيْكَ ، وَالْمَهْدِيُّ مِنْ هَدَيْتَ ، وَعَبْدُكَ بَيْنَ يَدَيْكَ ، وَبِكَ وَإِلَيْكَ ، لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجَا مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ ، تَبَارَكْتَ وَتَعَالَيْتَ ، سُبْحَانَكَ رَبَّ الْبَيْتِ

'আমি হাজির, আমি হাজির। আমি আপনার আনুগত্যের জন্য প্রস্তুত। সমস্ত কল্যাণ আপনার হাতে। কোনও মন্দের সম্বন্ধ আপনার সঙ্গে স্থাপিত নয়। আপনি যাকে হিদায়াত দিয়েছেন, সে হিদায়াতপ্রাপ্ত। আপনার বান্দা আপনার সামনে উপস্থিত। সে আপনারই। তার প্রত্যাবর্তন আপনারই কাছে। আপনি ভিন্ন তার কোনও আশ্রয়স্থল নেই। আপনার শাস্তি হতে মুক্তির জন্য আপনার ব্যতীত কোনও স্থান নেই। আপনি কল্যাণময়। আপনি সমুচ্চ। আপনি মহান ও পবিত্র হে বায়তুল্লাহর মালিক!' (হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৩৩৮৪; আল আজুররী, আশ-শারী'আহ: ১০৯২)

পরিশেষে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে শাফাআতের অনুমতি দেবেন। তিনি শাফাআত করবেন। ফলে বিচারকার্য ও হিসাব-নিকাশ শুরু হবে। একে মহা শাফা'আত বলা হয়। তাঁর এ সুপারিশের ফলে মানুষ হাশর ময়দানের কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তিলাভকরবে। ফলে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত মানুষ তাঁর প্রশংসা করবে। তো এক হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা, আর দ্বিতীয় হলো সমস্ত মানুষ কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসা। এ উভয়বিধ প্রশংসা তাঁর সেই মাকাম ও অবস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই একে মাহমূদ বা প্রশংসিত বলা হয়।

বোঝা গেল, মাকামে মাহমূদের মূল বিষয় হলো হাশর ময়দানের শাফা'আত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরশের নিচে কোনও এক স্থান থেকে এ শাফা'আত করবেন। কাজেই মাকামে মাহমুদ বলতে যেমন শাফা'আতের সেই স্থানকে বোঝায়, তেমনি শাফা'আতের যে মহা মর্যাদা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্ধারিত, সে মর্যাদাকেও বোঝায়। হযরত আনাস রাযি. থেকে শাফা'আত সম্পর্কে বর্ণিত দীর্ঘ এক হাদীছের শেষে আছে-

ثُمَّ تَلاَ هَذِهِ الآيَةَ: {عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا} [الإسراء: 79] قَالَ: «وَهَذَا المَقَامُ المَحْمُودُ الَّذِي وُعِدَهُ نَبِيُّكُمْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ»

'অতঃপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন- عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا (আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে মাকামে মাহমূদে পৌঁছাবেন) (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৭৯)। তারপর তিনি বলেন, এটাই সেই মাকামে মাহমুদ, যার ওয়াদা তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেওয়া হয়েছে।' হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাযি. থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। (সহীহ বুখারী: ৭৪৪০; সুনানে নাসাঈ ৬৮০; জামে' তিরমিযী: ৩১৪৮; মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী: ৩৮৯. সুনানে দারিমী ২৮৪২; মুসনাদে আবু ইয়া'লা ৩০৬৪; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ১০০১৭; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ২৯৮)
হযরত কা'ব ইবন মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

يُبْعَثُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَكُونُ أَنَا وَأُمَّتِي عَلَى تَلٍّ وَيَكْسُونِي رَبِّي تَبَارَكَ وَتَعَالَى حُلَّةً خَضْرَاءَ ثُمَّ يُؤْذَنُ لِي فَأَقُولُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ أَقُولَ فَذَاكَ الْمَقَامُ الْمَحْمُود

'কিয়ামতের দিন মানুষকে (কবর থেকে জীবিত করে) ওঠানো হবে। আমি ও আমার উম্মত একটি উঁচু স্থানে থাকব। আমার প্রতিপালক আমাকে এক জোড়া সবুজ কাপড় পরাবেন। তারপর আমি বলব আল্লাহ তা'আলার যা আমি বলব বলে ইচ্ছা হয়। এটাই মাকামে মাহমূদ। (সহীহ ইবন হিব্বান ৬৪৭৯; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার ১০১৮; তাবারানী, মুসনাদুশ শামিয়‍্যীন: ১৭৫৯)

উল্লেখ্য, অনেকে আযানের দু'আয় অতিরিক্ত কিছু শব্দ ব্যবহার করে থাকে, যেমন آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ এর পর وَالدَّرَجَةَ الرَّفِيعَةَ ‘এবং (তাকে দান করুন) উচ্চ মর্যাদা'। কিন্তু এ অংশটি কোনও সহীহ বর্ণনায় নেই। সহীহ বর্ণনায় যা নেই, তা মাসনূন দু'আর অংশ হিসেবে পাঠ করা উচিত নয়।

দু'আটির শেষে অনেকে إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعًاد (নিশ্চয়ই আপনি ওয়াদা ভঙ্গ করেন না) পড়ে থাকে। বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী এটা পড়ার অবকাশ আছে। কেননা ইমাম বায়হাকী গ্রহণযোগ্য এক সনদে হযরত জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাযি. থেকে আযানের যে দু'আ উল্লেখ করেছেন, তার শেষে এ অংশটি আছে। (বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৯৩৩)

আযানের দু'আ পড়ার ফযীলত
এতক্ষণ আযানের দু'আর ব্যাখ্যা করা হলো। এ দু'আর ফযীলত অনেক বড়। যে ব্যক্তি আযানের পর দু'আটি পড়বে, তার সম্পর্কে এ হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-

حَلَّت له شَفاعَتي يَومَ القيامةِ. (কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফাআত ওয়াজিব হয়ে যাবে)। কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে শাফা'আত করবেন, এটা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের প্রতিষ্ঠিত এক আকীদা। কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা এর সত্যতা প্রমাণিত। কুরআন মাজীদের বহু আয়াতে শাফা'আতের উল্লেখ আছে।

يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَىٰ وَهُم مِّنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ

'তিনি তাদের সম্মুখ ও পেছনের সবকিছু জানেন। তারা কারও জন্য সুপারিশ করতে পারে না, কেবল তাদের ছাড়া, যাদের জন্য আল্লাহর পছন্দ হয়। তারা তাঁর ভয়ে থাকে ভীত। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ২৮)


আয়াতুল কুরসীতে আছে- مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَةً إِلَّا بِإِذْنِهِ (কে আছে, যে তাঁর সমীপে তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করবে?)। (সূরা বাকারা, আয়াত ২৫৫)

শাফাআতের সত্যতা ও এর প্রকারভেদ
এসব আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় আল্লাহ তা'আলার অনুমতিক্রমে সুপারিশের কাজটি অবশ্যই ঘটবে। এ সুপারিশ বিভিন্ন রকমের। এক হলো الشَّفَاعَةُ الْكُبْرَى (মহা সুপারিশ)। এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্দিষ্ট। হাশরের ময়দানে দীর্ঘ অবস্থানের পরও যখন হিসাব-নিকাশ ও বিচারের কাজ শুরু হবে না, তখন মানুষ সুপারিশের জন্য হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে বড় বড় সব নবী-রাসূলের কাছে ছোটাছুটি করবে। কিন্তু কারওই সুপারিশ করার হিম্মত হবে না। সবশেষে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসলে তিনি তাতে সম্মত হবেন। তিনি মাকামে মাহমূদ থেকে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসাপূর্বক সুপারিশ করলে সে সুপারিশ গৃহীত হবে। তারপর বিচারকার্য শুরু হবে। হাদীছের সকল গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে এ মহা সুপারিশের কথা বর্ণিত আছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. থেকে বর্ণিত এক সংক্ষিপ্ত হাদীছে আছে-

إِنَّ النَّاسَ يَصِيرُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ جُثًا، كُلُّ أُمَّةٍ تَتْبَعُ نَبِيَّهَا يَقُولُونَ: يَا فُلاَنُ اشْفَعْ، يَا فُلاَنُ اشْفَعْ، حَتَّى تَنْتَهِيَ الشَّفَاعَةُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَذَلِكَ يَوْمَ يَبْعَثُهُ اللَّهُ المَقَامَ المَحْمُود

'কিয়ামতের দিন মানুষ বিভিন্ন দলে বিভক্ত থাকবে। প্রত্যেক উম্মত তার নবীর অনুগামী হবে। তারা বলবে, হে অমুক! সুপারিশ করুন। হে অমুক! সুপারিশ করুন। সবশেষে শাফা'আতের বিষয়টা পৌঁছবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। এটাই সেই দিন, যেদিন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে মাকামে মাহমূদে পৌঁছাবেন। (সহীহ বুখারী: ১৭৪৮)

আরেক সুপারিশ হলো জান্নাতবাসীদের জান্নাতে প্রবেশের জন্য। হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

آتِي بَابَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَسْتَفْتِحُ فَيَقُولُ الْخَازِنُ مَنْ أَنْتَ فَأَقُولُ مُحَمَّدٌ . فَيَقُولُ بِكَ أُمِرْتُ لاَ أَفْتَحُ لأَحَدٍ قَبْلَك

'কিয়ামতের দিন আমি জান্নাতের দরজায় আসব এবং দরজা খুলতে বলব। রক্ষী বলবে, আপনি কে? বলব, মুহাম্মাদ। সে বলবে, আমাকে আপনার জন্যই হুকুম করা হয়েছে। আপনার আগে অন্য কারও জন্য আমি দরজা খুলব না।' (সহীহ মুসলিম: ৩৩৩)

আরেক সুপারিশ হলো ওই সকল মুমিনদের নাজাতের জন্য, যারা গুনাহের কারণে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ بِأَشَدَّ مُنَاشَدَةً لِلَّهِ فِي اسْتِقْصَاءِ الْحَقِّ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ لِلَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ فِي النَّارِ يَقُولُونَ رَبَّنَا كَانُوا يَصُومُونَ مَعَنَا وَيُصَلُّونَ وَيَحُجُّونَ . فَيُقَالُ لَهُمْ أَخْرِجُوا مَنْ عَرَفْتُمْ . فَتُحَرَّمُ صُوَرُهُمْ عَلَى النَّارِ فَيُخْرِجُونَ خَلْقًا كَثيرًا قَدْ أَخَذَتِ النَّارُ إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ وَإِلَى رُكْبَتَيْهِ ثُمَّ يَقُولُونَ رَبَّنَا مَا بَقِيَ فِيهَا أَحَدٌ مِمَّنْ أَمَرْتَنَا بِهِ . فَيَقُولُ ارْجِعُوا فَمَنْ وَجَدْتُمْ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ دِينَارٍ مِنْ خَيْرٍ فَأَخْرِجُوهُ . فَيُخْرِجُونَ خَلْقًا كَثِيرًا ثُمَّ يَقُولُونَ رَبَّنَا لَمْ نَذَرْ فِيهَا أَحَدًا مِمَّنْ أَمَرْتَنَا . ثُمَّ يَقُولُ ارْجِعُوا فَمَنْ وَجَدْتُمْ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ نِصْفِ دِينَارٍ مِنْ خَيْرٍ فَأَخْرِجُوهُ . فَيُخْرِجُونَ خَلْقًا كَثِيرًا ثُمَّ يَقُولُونَ رَبَّنَا لَمْ نَذَرْ فِيهَا مِمَّنْ أَمَرْتَنَا أَحَدًا . ثُمَّ يَقُولُ ارْجِعُوا فَمَنْ وَجَدْتُمْ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ فَأَخْرِجُوهُ . فَيُخْرِجُونَ خَلْقًا كَثِيرًا

'যাঁর হাতে আমার প্রাণ সেই সত্তার কসম! কিয়ামতের দিন মুমিনগণ তাদের সেই ভাইদের জন্য আল্লাহর সঙ্গে যেমনটা বাদানুবাদ করবে, যারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, সেরকম বাদানুবাদ তোমাদের কেউ নিজ অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য করে না। তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! ওইসকল লোক আমাদের সঙ্গে রোযা রাখত, নামায পড়ত ও হজ্জ করত। তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যাদের চেন, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। (ঈমানের কারণে) আগুনের জন্য তাদের চেহারা হারাম থাকবে। আগুন তাদের কারও পায়ের নলার মাঝামাঝি, কারও হাঁটু পর্যন্ত দগ্ধ করবে। এরকম বহু লোককে তারা জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে। তারপর বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক। আপনি যাদের বের করে আনার আদেশ করেছেন, তাদের কেউ অবশিষ্ট নেই। আল্লাহ বলবেন, যাও, যার অন্তরে আধা দীনার বরাবর ঈমান আছে, তাকেও বের করে আনো। তারা গিয়ে বহু লোককে বের করে আনবে। তারপর বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি যাদেরকে বের করে আনার আদেশ করেছেন, তাদের কাউকে জাহান্নামে ছেড়ে আসিনি। আল্লাহ বলবেন, যাও, যার অন্তরে কণা পরিমাণও ঈমান আছে, তাকেও বের করে আনো। তারা এরূপ বহু লোককে বের করে আনবে। (সহীহ মুসলিম: ১৮-৩)

এছাড়া জান্নাতে মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, যারা জাহান্নামের উপযুক্ত হয়ে গেছে, তাদেরকে যাতে জাহান্নামে দেওয়া না হয় সেজন্য, জাহান্নামের শাস্তি হালকা করার জন্য, এমনিভাবে আরও বিভিন্ন রকমের সুপারিশের বর্ণনা বিভিন্ন হাদীছে পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, প্রথম প্রকার ছাড়া অন্যসব সুপারিশ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশাপাশি অন্যরাও করবে, যেমন উপরের হাদীছটি দ্বারা জানা যাচ্ছে।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. আযান দীনের এক পূর্ণাঙ্গ দাওয়াত।

খ. জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরের নাম অসিলা। এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্ধারিত।

গ. আখিরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমস্ত মাখলুকের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম মর্যাদা দেওয়া হবে।

ঘ. হাশরের ময়দানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসাপূর্বক মহা শাফা'আতের অবস্থান দান করা হবে। এর নাম মাকামে মাহমূদ। এ শাফা'আত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষত্ব।

ঙ. নিয়মিত আযানের দু'আ পড়ার দ্বারা আখিরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা'আত লাভ হবে। কাজেই এ দু'আ শিখতে ও পড়তে অলসতা করা উচিত নয়।

চ. আখিরাতে মুমিনদের শাফা'আত লাভের বিষয়টি সত্য। এটা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের সর্বস্বীকৃত আকীদা।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান