রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ
৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
হাদীস নং: ১০৪০
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
আযানের ফযীলত: আযানের আরেকটি দুআ
১০৪০. হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি মুআযযিনের আযান শুনে বলবে-
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ ، رَضِيتُ بِاللهِ رَبًّا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا ، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا
(আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আমি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ রব্ব, মুহাম্মাদ আমার রাসূল এবং ইসলাম আমার দীন), তার পাপরাশি ক্ষমা করে দেওয়া হবে। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৬; সুনানে আবু দাউদ: ৫২৫; সুনানে নাসাঈ ৬৭৯; জামে তিরমিযী: ২১০; সুনানে ইবন মাজাহ ৭২০; মুসনাদে আহমাদ: ১৫৬৫; মুসনাদুল বাযযার: ১১৩০: মুসনাদে আবু ইয়া'লা ৭২২; সহীহ ইবন খুযায়মা ৪২১; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৮৯১)
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ ، رَضِيتُ بِاللهِ رَبًّا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا ، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا
(আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আমি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ রব্ব, মুহাম্মাদ আমার রাসূল এবং ইসলাম আমার দীন), তার পাপরাশি ক্ষমা করে দেওয়া হবে। -মুসলিম। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৬; সুনানে আবু দাউদ: ৫২৫; সুনানে নাসাঈ ৬৭৯; জামে তিরমিযী: ২১০; সুনানে ইবন মাজাহ ৭২০; মুসনাদে আহমাদ: ১৫৬৫; মুসনাদুল বাযযার: ১১৩০: মুসনাদে আবু ইয়া'লা ৭২২; সহীহ ইবন খুযায়মা ৪২১; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৮৯১)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1040 - وعن سعدِ بن أَبي وقَّاصٍ - رضي الله عنه - عن النبي - صلى الله عليه وسلم - أنَّه قَالَ: «مَنْ قَالَ حِيْنَ يَسْمَعُ المُؤَذِّنَ: أشْهَدُ أَنْ لاَ إلَه إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، وَأنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، رَضِيتُ بِاللهِ رَبًّا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا، وَبِالإسْلامِ دِينًا، غُفِرَ لَهُ ذَنْبُهُ». رواه مسلم. (1)
হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):
__________
(1) أخرجه: مسلم 2/ 4 (386) (13).
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীছে আযানের আরেকটি দুআ বর্ণিত হয়েছে। মুআযযিন যখন أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّه ও أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ উচ্চারণ করে, তখন এর উত্তরে এ দুআটি পড়ার কথা এ হাদীছে বলা হয়েছে। এর ফযীলত বলা হয়েছে যে, এটি পড়লে গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। এ দু'আটির দুটি অংশ রয়েছে। প্রথম অংশে আছে তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য। প্রথম সাক্ষ্য হলো-
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই)। অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া এমন কোনও সত্তা নেই, যার ইবাদত করা যেতে পারে। কেননা ইবাদতের উপযুক্ত হওয়ার জন্য যেসকল গুণ থাকা জরুরি, তা কেবল আল্লাহ তা'আলারই আছে, অন্য কারও নেই, যেমন সৃষ্টি করা, রিযিক দেওয়া, প্রতিপালন করা, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়া, কারও মুখাপেক্ষী না হওয়া, মৃত্যু ঘটানো ইত্যাদি। এসব গুণে আল্লাহ তা'আলার কোনও শরীক নেই। এর কোনওটিই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও মধ্যে নেই। তাই অন্য কেউ ইবাদতেরও উপযুক্ত হতে পারে না। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এক ও লা-শারীক, যেমন নিজ সত্তায়, তেমনি গুণাবলি ও ইবাদতের উপযুক্ততায়ও।
দ্বিতীয় সাক্ষ্য- وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ (এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল)। এ সাক্ষ্যে হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে দুটি কথা বলা হয়েছে। প্রথম কথা হলো তিনি আল্লাহ তা'আলার বান্দা। যে-কোনও ব্যক্তির পক্ষে আল্লাহ তা'আলার বান্দা হওয়াই সর্বাপেক্ষা গৌরবের বিষয়। এর মধ্যে স্তরভেদ রয়েছে। বান্দা হিসেবে নবী-রাসূলগণ সবার উপরে। তাঁরা আল্লাহ তা'আলার বন্দেগী যে মানে করেন, তা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এক তো তাঁদের হাসিকান্না, চলাফেরা, ঘরসংসার ইত্যাদি দুনিয়ার প্রতিটি কাজও হতো আল্লাহ তা'আলার আবদিয়াত ও বন্দেগীর চেতনাসমৃদ্ধ। আর সরাসরি যে ইবাদত-বন্দেগী করতেন, তার গভীরতা, তার সৌন্দর্য, তার ভাবাবেগ, তার অভিনিবেশ, তাতে হৃদয়-মনের উপস্থিতি, তার আস্বাদ-আনন্দ ও তার মুশাহাদা (আল্লাহ-দর্শনের মাত্রা) কতটা উচ্চস্তরের হতো, তা আমাদের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়।
আমরাও নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলার বান্দা। আমরা নিজেদের মুখে তা প্রকাশ করি। কাজেও প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কোনও রাসূল যখন বলেন আমি আল্লাহর বান্দা, তখন তা বলেন আল্লাহ-পরিচয় ও আত্মপরিচয়ের সর্বোচ্চ মাত্রা থেকে। তাই তাদের বান্দা-পরিচয়কে সে দৃষ্টিতে দেখতে হবে। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম যখন নিজের পরিচয় দিয়েছেন, তখন প্রথমেই বলেছেন- إِنِّي عَبْدُ اللهِ (আমি আল্লাহর বান্দা)। তারপর বলেছেন- آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا (তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী বানিয়েছেন)। কুরআন মাজীদে হযরত নূহ, হযরত ইবরাহীম, হযরত মূসা, হযরত দাউদ, হযরত সুলায়মান, হযরত যাকারিয়া আলাইহিমুস সালাম তথা প্রত্যেক নবী-রাসূলের প্রশংসা করতে গিয়ে বিশেষভাবে عبدٌ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তো বারবার এ শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। বস্তুত নবীদের বেলায় এ শব্দটি আল্লাহ তা'আলার এক প্রিয় সম্ভাষণ। আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় সব বান্দার বেলায়ই এ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। তাই আমাদের এ শব্দটির ভাব-গাম্ভীর্য, মর্যাদা ও তাৎপর্য উপলব্ধি করা উচিত। আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে যে আব্দ ও মাবুদের, তা খুব ভালোভাবে অনুভব করা উচিত। আর সে অনুভব থেকেই এর ব্যবহার করা উচিত।
তারপর হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে যে, তিনি আল্লাহর রাসূল। রাসূল হলেন আল্লাহ তা'আলার বার্তাবাহক, তাঁর দেওয়া বিধানের ব্যাখ্যাতা এবং তাঁর প্রেরিত হিদায়াতের নমুনা। আল্লাহ তা'আলার বার্তা তথা তাঁর পরিচয় ও তাঁর আদেশ-নিষেধ আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেই গ্রহণ করতে হবে। এসবের ব্যাখ্যাও জানতে হবে তাঁরই থেকে। তাঁকে আদর্শ ও নমুনারূপে গ্রহণ করে তাঁর মতো করেই আমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার হিদায়াত অনুসরণ করতে হবে। তিনি যে আল্লাহ তা'আলার রাসূল, এ সাক্ষ্যদানের তাৎপর্য এটাই।
দু'আটির দ্বিতীয় অংশে রয়েছে রব্ব হিসেবে আল্লাহ তা'আলা, রাসূল হিসেবে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং দীন হিসেবে ইসলামের প্রতি নিজ সন্তুষ্টি প্রকাশ। বিষয়টা ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
'আল্লাহ আমার রব্ব'-এর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশের অর্থ
رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبًّا (আল্লাহ আমার রব্ব, এতে আমি সন্তুষ্ট)। এখানে দু'টি কথা। এক হলো আল্লাহ তা'আলা রব্ব ও প্রতিপালক। দ্বিতীয় হলো এর উপর আমার সন্তুষ্টি। আল্লাহ তা'আলা রব্ব- এ কথার অর্থ আল্লাহ তা'আলা আমার সৃষ্টিকর্তা, আমার প্রতিপালক, আমার জীবন ও মরণের মালিক। তিনি সারা জাহানের মালিক ও মাবুদ। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ও পরিচালনা করছেন।
এ কথার উপর আমার সন্তুষ্টির অর্থ হলো- আমি আমার অন্তরে এ বিশ্বাস পোষণ করি। সুতরাং আমি কেবল তাঁকেই ভালোবাসি, তাঁকেই ভয় করি, তাঁরই কাছে আশা রাখি। আমি তাঁরই উপর ভরসা করি। আমি তাঁর বিকল্প খুঁজি না। আমি তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকি, কোনও আপত্তি তুলি না। আমি একনিষ্ঠভাবে কেবল তাঁরই ইবাদত করি। আমি তাঁরই আদেশ-নিষেধ পালনে বদ্ধপরিকর।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার রাসূল এ কথার প্রতি সন্তুষ্টির অর্থ
وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا (আমি এতে সন্তুষ্ট যে,) মুহাম্মাদ আমার রাসূল'। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসূল- এর অর্থ আল্লাহ তা'আলা তাঁকে শেষ যমানার নবী-রাসূল করে পাঠিয়েছেন। তিনি তাঁর মাধ্যমে আমাদের কাছে তাঁর আদেশ-নিষেধ পৌঁছিয়েছেন। তিনি তাঁর মাধ্যমে আমাদের প্রতি তাঁর সর্বশেষ কিতাব কুরআন মাজীদ নাযিল করেছেন। তিনি সর্বশেষ নবী। তাঁর পর আর কোনও নবী-রাসূল আসবে না। এটা আমার বিশ্বাস। আমি এ বিশ্বাসে সন্তুষ্ট। তিনি আমার ভালোবাসা। আমি নিজ প্রাণ অপেক্ষাও তাঁকে বেশি ভালোবাসি। সুতরাং তিনি যে হিদায়াত নিয়ে এসেছেন, আমি খুশিমনে তার অনুসরণ করব। আমি তাঁর সুন্নতমতো জীবনযাপন করব। তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শের উপর অন্য কোনওকিছুকে প্রাধান্য দিব না। বরং আমি আমার জান-মাল দিয়ে তাঁর সুন্নাহের প্রচার-প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত থাকব।
আমি এতে সন্তুষ্ট যে, ইসলাম আমার দীন
وَبِالْإِسْلَام دِينًا 'এবং (আমি এতে সন্তুষ্ট যে,) ইসলাম আমার দীন'। দীন হলো কতিপয় আকীদা-বিশ্বাস ও বিধি-বিধানের সমষ্টি। এর নাম ইসলাম। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক যুগে নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষকে এ দীন প্রদান করেছেন। সবশেষে হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে এটাকে পরিপূর্ণ করেছেন। এ দীনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে কুরআন-সুন্নাহে। আমি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে ইসলাম নামক দীনের নি'আমত দান করেছেন। আমি এর প্রতিটি আদেশ-নিষেধে সন্তুষ্ট। আমি সর্বান্তঃকরণে তা গ্রহণ করে নিয়েছি। আমার অন্তরে দীনের কোনও বিধান নিয়ে বিন্দুমাত্র খটকা নেই। বরং আমি এর অনুসরণ করে পরিতৃপ্তি বোধ করি। আমি এতে শান্তি অনুভব করি। জীবনের কোনও ক্ষেত্রে এ দীনের কোনও বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না। এ দীন পরিপূর্ণ। তাই এর কোনও বিকল্প থাকতেও পারে না। কাজেই এ দীনের অনুসরণকেই আমি আমার দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের নাজাত লাভের উপায় বলে বিশ্বাস করি।
সুতরাং আযানের এ দুআটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এটা নিজ ঈমানের ঘোষণা এবং আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও ইসলাম মোতাবেক জীবনযাপনের এক অঙ্গীকার। আযানের পর নামায আদায় এ অঙ্গীকারের প্রথম প্রতিফলন। অতঃপর নামাযীর কর্তব্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার একজন অনুগত বান্দারূপে আপন কর্তব্যকর্মে নিয়োজিত থাকা। যেহেতু এ দুআ এক পরম আনুগত্যের অঙ্গীকার, তাই এর ফযীলতও অনেক বড়।
দুআটির ফযীলত
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- غُفِرَ له ذَنبه. (তার পাপরাশি ক্ষমা করে দেওয়া হবে)। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আযানের পর এ দুআটি পড়বে, তার সমস্ত সগীরা গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। উলামায়ে কেরাম বলেন, কোনও সৎকর্মের দ্বারা যে গুনাহ মাফ হয়, তা সগীরা গুনাহ, কবীরা গুনাহ নয়। কেননা কবীরা গুনাহ মাফ হওয়ার জন্য তাওবা শর্ত। মুমিন ব্যক্তির বেলায় সাধারণ ধারণা তো এটাই যে, তার কোনও কবীরা গুনাহ থাকবে না। কেননা প্রথমত সে পরিকল্পিতভাবে কোনও কবীরা গুনাহ করবেই না। তারপরও যদি কখনও কোনও কবীরা গুনাহ হয়ে যায়, তবে অবিলম্বে তাওবা করে নেবে। ফলে তার সে গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। বাকি থাকে কেবল সগীরা গুনাহ। তা মাফ হয়ে যায় সৎকর্মের অসিলায়। ফলে মুমিন বান্দা সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হয়ে যায়। নিষ্পাপ ব্যক্তির ঠিকানা জান্নাত। সুতরাং হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَنْ قَالَ : رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا ، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا، وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ.
যে ব্যক্তি বলে - رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا (আমি এতে' সন্তুষ্ট যে, আমার রব্ব আল্লাহ, আমার দীন ইসলাম এবং রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। (সুনানে আবূ দাউদ: ১৫২৯; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ২৯২৮২; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৯৭৪৮; সহীহ ইবন হিব্বান: ৮৬৩: হাকিম, আল মুসতাদরাক: ১৯০৪)
অপর এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِم يَقُولُ حِيْنَ يُصْبِحُ ثَلَاثًا، وَحِيْنَ يُمْسِي رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَبِيًّا، إِلَّا كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يُرْضِيَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
'যে-কোনও মুসলিম বান্দা ভোরবেলা তিনবার ও সন্ধ্যাবেলা তিনবার বলে-
, رَضِيتُ بِاللهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا ، وَبِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَبِيًّا আল্লাহ তাআলার জন্য অবধারিত হয়ে যায় যে, তিনি কিয়ামতের দিন তাকে খুশি করবেন। (নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ৯৭৪৭; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৩২৪)
হযরত মুনায়যির রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
من قالَ إذا أصبحَ رضيتُ باللَّهِ ربًّا وبالإسلامِ دينًا وبمحمَّدٍ نبيًّا فأَنا الزَّعيمُ لآخذنَّ بيدِهِ حتَّى أُدْخِلَهُ الجنَّةَ
'যে ব্যক্তি ভোরবেলা বলবে- رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِيْنَا، وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا আমি তার যিম্মাদার। আমি তার হাত ধরে জান্নাতে প্রবেশ করাব। (তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৮৩৮)
এ দু'আটির একটি নগদ লাভও আছে। সে লাভ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা যেহেতু নিজ ঈমানের ঘোষণা দেওয়া হয়, তাতে নিজ সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয় এবং সে ঈমানের দাবি অনুযায়ী আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও ইসলাম মোতাবেক জীবনাচারের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করা হয়, তাই অন্তরে ঈমানের স্বাদ এসে যায়। ভাবতে ভালো লাগে যে, আল্লাহ আমার রব্ব, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নবী এবং ইসলাম আমার দীন। এ ভালো লাগার কারণে দীনের উপর চলা সহজ হয়ে যায়; বরং দীনের প্রতিটি বিধান পালনে এক অনির্বচনীয় আনন্দ বোধ হয়। সুতরাং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীছে ইরশাদ করেন-
ذَاقَ طَعْمَ الْإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا.
'যে ব্যক্তি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তার রব্ব, ইসলাম তার দীন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রাসূল, সে ঈমানের স্বাদ পেয়ে যায়। (সহীহ মুসলিম: ৩৪; জামে তিরমিযী: ২৬২৩; মুসনাদে আহমাদ: ১৭৭৯; মুসনাদুল বাযযার: ১৩১৮; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ৬৬৯২; সহীহ ইবন হিব্বান ১৬৯৪; বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ১৯৫; শু'আবুল ঈমান ১৯৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২৪)
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. যখন আযান হয়, তখন আযানের মর্যাদা রক্ষা করা উচিত এবং খুব গুরুত্বের সঙ্গে তা শোনা উচিত।
খ. আযানের দুআ পড়তে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ এটা গুনাহ মাফের অনেক বড় অসিলা।
গ. গুনাহ মাফ হওয়াটা একজন মুমিনের পক্ষে অনেক বড় অর্জন। তাই যা-কিছু দ্বারা গুনাহ মাফ হয়, তার প্রত্যেকটিকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
ঘ. আল্লাহ আমার রব্ব- এ বিশ্বাসে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহমুখী করে রাখা ও আল্লাহর আনুগত্যে নিবেদিত থাকা ঈমানের দাবি।
ঙ. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নবী ও রাসূল- অন্তরে এ চেতনা উজ্জীবিত রাখতে হবে। এ চেতনা তাঁর অনুসরণে প্রাণশক্তি জোগাবে।
চ. ইসলাম আমার দীন। এটা আমার গৌরব। এ গৌরববোধ একজন মুমিনের পক্ষে সকল ক্ষেত্রে দীনের উপর চলার অনুপ্রেরণা।
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনও শরীক নেই)। অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া এমন কোনও সত্তা নেই, যার ইবাদত করা যেতে পারে। কেননা ইবাদতের উপযুক্ত হওয়ার জন্য যেসকল গুণ থাকা জরুরি, তা কেবল আল্লাহ তা'আলারই আছে, অন্য কারও নেই, যেমন সৃষ্টি করা, রিযিক দেওয়া, প্রতিপালন করা, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়া, কারও মুখাপেক্ষী না হওয়া, মৃত্যু ঘটানো ইত্যাদি। এসব গুণে আল্লাহ তা'আলার কোনও শরীক নেই। এর কোনওটিই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও মধ্যে নেই। তাই অন্য কেউ ইবাদতেরও উপযুক্ত হতে পারে না। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এক ও লা-শারীক, যেমন নিজ সত্তায়, তেমনি গুণাবলি ও ইবাদতের উপযুক্ততায়ও।
দ্বিতীয় সাক্ষ্য- وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ (এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল)। এ সাক্ষ্যে হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে দুটি কথা বলা হয়েছে। প্রথম কথা হলো তিনি আল্লাহ তা'আলার বান্দা। যে-কোনও ব্যক্তির পক্ষে আল্লাহ তা'আলার বান্দা হওয়াই সর্বাপেক্ষা গৌরবের বিষয়। এর মধ্যে স্তরভেদ রয়েছে। বান্দা হিসেবে নবী-রাসূলগণ সবার উপরে। তাঁরা আল্লাহ তা'আলার বন্দেগী যে মানে করেন, তা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এক তো তাঁদের হাসিকান্না, চলাফেরা, ঘরসংসার ইত্যাদি দুনিয়ার প্রতিটি কাজও হতো আল্লাহ তা'আলার আবদিয়াত ও বন্দেগীর চেতনাসমৃদ্ধ। আর সরাসরি যে ইবাদত-বন্দেগী করতেন, তার গভীরতা, তার সৌন্দর্য, তার ভাবাবেগ, তার অভিনিবেশ, তাতে হৃদয়-মনের উপস্থিতি, তার আস্বাদ-আনন্দ ও তার মুশাহাদা (আল্লাহ-দর্শনের মাত্রা) কতটা উচ্চস্তরের হতো, তা আমাদের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়।
আমরাও নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলার বান্দা। আমরা নিজেদের মুখে তা প্রকাশ করি। কাজেও প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কোনও রাসূল যখন বলেন আমি আল্লাহর বান্দা, তখন তা বলেন আল্লাহ-পরিচয় ও আত্মপরিচয়ের সর্বোচ্চ মাত্রা থেকে। তাই তাদের বান্দা-পরিচয়কে সে দৃষ্টিতে দেখতে হবে। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম যখন নিজের পরিচয় দিয়েছেন, তখন প্রথমেই বলেছেন- إِنِّي عَبْدُ اللهِ (আমি আল্লাহর বান্দা)। তারপর বলেছেন- آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا (তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী বানিয়েছেন)। কুরআন মাজীদে হযরত নূহ, হযরত ইবরাহীম, হযরত মূসা, হযরত দাউদ, হযরত সুলায়মান, হযরত যাকারিয়া আলাইহিমুস সালাম তথা প্রত্যেক নবী-রাসূলের প্রশংসা করতে গিয়ে বিশেষভাবে عبدٌ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তো বারবার এ শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। বস্তুত নবীদের বেলায় এ শব্দটি আল্লাহ তা'আলার এক প্রিয় সম্ভাষণ। আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় সব বান্দার বেলায়ই এ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। তাই আমাদের এ শব্দটির ভাব-গাম্ভীর্য, মর্যাদা ও তাৎপর্য উপলব্ধি করা উচিত। আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে যে আব্দ ও মাবুদের, তা খুব ভালোভাবে অনুভব করা উচিত। আর সে অনুভব থেকেই এর ব্যবহার করা উচিত।
তারপর হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে যে, তিনি আল্লাহর রাসূল। রাসূল হলেন আল্লাহ তা'আলার বার্তাবাহক, তাঁর দেওয়া বিধানের ব্যাখ্যাতা এবং তাঁর প্রেরিত হিদায়াতের নমুনা। আল্লাহ তা'আলার বার্তা তথা তাঁর পরিচয় ও তাঁর আদেশ-নিষেধ আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেই গ্রহণ করতে হবে। এসবের ব্যাখ্যাও জানতে হবে তাঁরই থেকে। তাঁকে আদর্শ ও নমুনারূপে গ্রহণ করে তাঁর মতো করেই আমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার হিদায়াত অনুসরণ করতে হবে। তিনি যে আল্লাহ তা'আলার রাসূল, এ সাক্ষ্যদানের তাৎপর্য এটাই।
দু'আটির দ্বিতীয় অংশে রয়েছে রব্ব হিসেবে আল্লাহ তা'আলা, রাসূল হিসেবে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং দীন হিসেবে ইসলামের প্রতি নিজ সন্তুষ্টি প্রকাশ। বিষয়টা ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
'আল্লাহ আমার রব্ব'-এর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশের অর্থ
رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبًّا (আল্লাহ আমার রব্ব, এতে আমি সন্তুষ্ট)। এখানে দু'টি কথা। এক হলো আল্লাহ তা'আলা রব্ব ও প্রতিপালক। দ্বিতীয় হলো এর উপর আমার সন্তুষ্টি। আল্লাহ তা'আলা রব্ব- এ কথার অর্থ আল্লাহ তা'আলা আমার সৃষ্টিকর্তা, আমার প্রতিপালক, আমার জীবন ও মরণের মালিক। তিনি সারা জাহানের মালিক ও মাবুদ। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ও পরিচালনা করছেন।
এ কথার উপর আমার সন্তুষ্টির অর্থ হলো- আমি আমার অন্তরে এ বিশ্বাস পোষণ করি। সুতরাং আমি কেবল তাঁকেই ভালোবাসি, তাঁকেই ভয় করি, তাঁরই কাছে আশা রাখি। আমি তাঁরই উপর ভরসা করি। আমি তাঁর বিকল্প খুঁজি না। আমি তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকি, কোনও আপত্তি তুলি না। আমি একনিষ্ঠভাবে কেবল তাঁরই ইবাদত করি। আমি তাঁরই আদেশ-নিষেধ পালনে বদ্ধপরিকর।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার রাসূল এ কথার প্রতি সন্তুষ্টির অর্থ
وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا (আমি এতে সন্তুষ্ট যে,) মুহাম্মাদ আমার রাসূল'। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসূল- এর অর্থ আল্লাহ তা'আলা তাঁকে শেষ যমানার নবী-রাসূল করে পাঠিয়েছেন। তিনি তাঁর মাধ্যমে আমাদের কাছে তাঁর আদেশ-নিষেধ পৌঁছিয়েছেন। তিনি তাঁর মাধ্যমে আমাদের প্রতি তাঁর সর্বশেষ কিতাব কুরআন মাজীদ নাযিল করেছেন। তিনি সর্বশেষ নবী। তাঁর পর আর কোনও নবী-রাসূল আসবে না। এটা আমার বিশ্বাস। আমি এ বিশ্বাসে সন্তুষ্ট। তিনি আমার ভালোবাসা। আমি নিজ প্রাণ অপেক্ষাও তাঁকে বেশি ভালোবাসি। সুতরাং তিনি যে হিদায়াত নিয়ে এসেছেন, আমি খুশিমনে তার অনুসরণ করব। আমি তাঁর সুন্নতমতো জীবনযাপন করব। তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শের উপর অন্য কোনওকিছুকে প্রাধান্য দিব না। বরং আমি আমার জান-মাল দিয়ে তাঁর সুন্নাহের প্রচার-প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত থাকব।
আমি এতে সন্তুষ্ট যে, ইসলাম আমার দীন
وَبِالْإِسْلَام دِينًا 'এবং (আমি এতে সন্তুষ্ট যে,) ইসলাম আমার দীন'। দীন হলো কতিপয় আকীদা-বিশ্বাস ও বিধি-বিধানের সমষ্টি। এর নাম ইসলাম। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক যুগে নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষকে এ দীন প্রদান করেছেন। সবশেষে হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে এটাকে পরিপূর্ণ করেছেন। এ দীনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে কুরআন-সুন্নাহে। আমি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে ইসলাম নামক দীনের নি'আমত দান করেছেন। আমি এর প্রতিটি আদেশ-নিষেধে সন্তুষ্ট। আমি সর্বান্তঃকরণে তা গ্রহণ করে নিয়েছি। আমার অন্তরে দীনের কোনও বিধান নিয়ে বিন্দুমাত্র খটকা নেই। বরং আমি এর অনুসরণ করে পরিতৃপ্তি বোধ করি। আমি এতে শান্তি অনুভব করি। জীবনের কোনও ক্ষেত্রে এ দীনের কোনও বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না। এ দীন পরিপূর্ণ। তাই এর কোনও বিকল্প থাকতেও পারে না। কাজেই এ দীনের অনুসরণকেই আমি আমার দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের নাজাত লাভের উপায় বলে বিশ্বাস করি।
সুতরাং আযানের এ দুআটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এটা নিজ ঈমানের ঘোষণা এবং আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও ইসলাম মোতাবেক জীবনযাপনের এক অঙ্গীকার। আযানের পর নামায আদায় এ অঙ্গীকারের প্রথম প্রতিফলন। অতঃপর নামাযীর কর্তব্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার একজন অনুগত বান্দারূপে আপন কর্তব্যকর্মে নিয়োজিত থাকা। যেহেতু এ দুআ এক পরম আনুগত্যের অঙ্গীকার, তাই এর ফযীলতও অনেক বড়।
দুআটির ফযীলত
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- غُفِرَ له ذَنبه. (তার পাপরাশি ক্ষমা করে দেওয়া হবে)। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আযানের পর এ দুআটি পড়বে, তার সমস্ত সগীরা গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। উলামায়ে কেরাম বলেন, কোনও সৎকর্মের দ্বারা যে গুনাহ মাফ হয়, তা সগীরা গুনাহ, কবীরা গুনাহ নয়। কেননা কবীরা গুনাহ মাফ হওয়ার জন্য তাওবা শর্ত। মুমিন ব্যক্তির বেলায় সাধারণ ধারণা তো এটাই যে, তার কোনও কবীরা গুনাহ থাকবে না। কেননা প্রথমত সে পরিকল্পিতভাবে কোনও কবীরা গুনাহ করবেই না। তারপরও যদি কখনও কোনও কবীরা গুনাহ হয়ে যায়, তবে অবিলম্বে তাওবা করে নেবে। ফলে তার সে গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। বাকি থাকে কেবল সগীরা গুনাহ। তা মাফ হয়ে যায় সৎকর্মের অসিলায়। ফলে মুমিন বান্দা সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হয়ে যায়। নিষ্পাপ ব্যক্তির ঠিকানা জান্নাত। সুতরাং হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَنْ قَالَ : رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا ، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا، وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ.
যে ব্যক্তি বলে - رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا (আমি এতে' সন্তুষ্ট যে, আমার রব্ব আল্লাহ, আমার দীন ইসলাম এবং রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। (সুনানে আবূ দাউদ: ১৫২৯; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ২৯২৮২; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৯৭৪৮; সহীহ ইবন হিব্বান: ৮৬৩: হাকিম, আল মুসতাদরাক: ১৯০৪)
অপর এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِم يَقُولُ حِيْنَ يُصْبِحُ ثَلَاثًا، وَحِيْنَ يُمْسِي رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَبِيًّا، إِلَّا كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يُرْضِيَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
'যে-কোনও মুসলিম বান্দা ভোরবেলা তিনবার ও সন্ধ্যাবেলা তিনবার বলে-
, رَضِيتُ بِاللهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا ، وَبِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَبِيًّا আল্লাহ তাআলার জন্য অবধারিত হয়ে যায় যে, তিনি কিয়ামতের দিন তাকে খুশি করবেন। (নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ৯৭৪৭; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৩২৪)
হযরত মুনায়যির রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
من قالَ إذا أصبحَ رضيتُ باللَّهِ ربًّا وبالإسلامِ دينًا وبمحمَّدٍ نبيًّا فأَنا الزَّعيمُ لآخذنَّ بيدِهِ حتَّى أُدْخِلَهُ الجنَّةَ
'যে ব্যক্তি ভোরবেলা বলবে- رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِيْنَا، وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا আমি তার যিম্মাদার। আমি তার হাত ধরে জান্নাতে প্রবেশ করাব। (তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৮৩৮)
এ দু'আটির একটি নগদ লাভও আছে। সে লাভ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা যেহেতু নিজ ঈমানের ঘোষণা দেওয়া হয়, তাতে নিজ সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয় এবং সে ঈমানের দাবি অনুযায়ী আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও ইসলাম মোতাবেক জীবনাচারের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করা হয়, তাই অন্তরে ঈমানের স্বাদ এসে যায়। ভাবতে ভালো লাগে যে, আল্লাহ আমার রব্ব, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নবী এবং ইসলাম আমার দীন। এ ভালো লাগার কারণে দীনের উপর চলা সহজ হয়ে যায়; বরং দীনের প্রতিটি বিধান পালনে এক অনির্বচনীয় আনন্দ বোধ হয়। সুতরাং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীছে ইরশাদ করেন-
ذَاقَ طَعْمَ الْإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا.
'যে ব্যক্তি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তার রব্ব, ইসলাম তার দীন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রাসূল, সে ঈমানের স্বাদ পেয়ে যায়। (সহীহ মুসলিম: ৩৪; জামে তিরমিযী: ২৬২৩; মুসনাদে আহমাদ: ১৭৭৯; মুসনাদুল বাযযার: ১৩১৮; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ৬৬৯২; সহীহ ইবন হিব্বান ১৬৯৪; বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ১৯৫; শু'আবুল ঈমান ১৯৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২৪)
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. যখন আযান হয়, তখন আযানের মর্যাদা রক্ষা করা উচিত এবং খুব গুরুত্বের সঙ্গে তা শোনা উচিত।
খ. আযানের দুআ পড়তে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ এটা গুনাহ মাফের অনেক বড় অসিলা।
গ. গুনাহ মাফ হওয়াটা একজন মুমিনের পক্ষে অনেক বড় অর্জন। তাই যা-কিছু দ্বারা গুনাহ মাফ হয়, তার প্রত্যেকটিকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
ঘ. আল্লাহ আমার রব্ব- এ বিশ্বাসে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহমুখী করে রাখা ও আল্লাহর আনুগত্যে নিবেদিত থাকা ঈমানের দাবি।
ঙ. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নবী ও রাসূল- অন্তরে এ চেতনা উজ্জীবিত রাখতে হবে। এ চেতনা তাঁর অনুসরণে প্রাণশক্তি জোগাবে।
চ. ইসলাম আমার দীন। এটা আমার গৌরব। এ গৌরববোধ একজন মুমিনের পক্ষে সকল ক্ষেত্রে দীনের উপর চলার অনুপ্রেরণা।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)