আখলাকুন্নবী (ﷺ)

কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ

হাদীস নং: ৮৬৯
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
নবী (ﷺ) পার্থিব বস্তুর প্রতি অনাসক্ত, ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে নিজের তুলনায় অপরকে প্রাধান্য দিতেন, দুর্বলদের মাঝে সম্পদ বণ্টন করে দিতেন। দানশীলতা আর অল্পে তুষ্ট থাকা ছিলো তাঁর স্বভাবজাত গুণ। তিনি পার্থিব বস্তুর চাইতে পরকালীন বিষয়কে অধিক ভালবাসতেন। এ ছাড়া তিনি কোন যাঞ্চাকারীকে কখনোই খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না, কোন আবেদনকারীকেই নিষেধ করতেন না। আল্লাহ্ তাঁর উপর, তাঁর বংশধরদের উপর ও তাঁর মহীয়সী স্ত্রীদের উপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।
৮৬৯। হযরত আসওয়াদ (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি আয়েশা (রা)-কে বললাম, হে উম্মুল মু'মিনীন! রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর যুগে আপনাদের জীবন জীবিকা কিরূপ ছিল আমাকে বলবেন কি? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর যুগে আমাদের জীবিকা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছো, তাহলে শোন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) একাধারে এমন তিনদিন পেটভরে পিঙ্গল বর্ণের গমের দানা খান নাই যার মধ্যে একদিন ক্ষুধার্ত না থাকতেন। আর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) পেটভরে খেজুর খেতে পাননি যতদিন পর্যন্ত না মহান আল্লাহ্ আমাদের জন্য কুরাইযা ও নযীর গোত্র জয়ের সুযোগ দিলেন।
أبواب الكتاب
بَابٌ: ذِكْرُ زُهْدِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَإِيثَارِهِ الْأَمْوَالَ عَلَى نَفْسِهِ، وَتَفْرِيقِهَا عَلَى الْمُخْفِينِ مِنْ أَصْحَابِهِ إِذِ الْكَرَمُ طَبْعُهُ، وَالْبُلْغَةُ مِنْ شَأْنِهِ، وَالْقَنَاعَةُ سَجِيَّتُهُ، وَاخْتِيَارِهِ الْبَاقِي عَلَى الْفَانِي، وَأَنَّهُ مِنْ عَادَتِهِ أَلَا يَرُدَّ سَائِلًا، وَلَا يَمْنَعَ طَالِبًا، صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ.
869 - حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يَعْقُوبَ الْأَهْوَازِيُّ، نَا جَعْفَرُ بْنُ مُحَمَّدٍ الْجُنْدَيْسَابُورِيُّ، نَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ رُشَيْدٍ، نَا أَبُو عُبَيْدَةَ مَجَّاعَةُ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي عَرُوبَةَ، عَنْ أَبِي مَعْشَرٍ، عَنِ النَّخَعِيِّ، عَنِ الْأَسْوَدِ، قَالَ: قُلْتُ لِعَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا: يَا أُمَّ الْمُؤْمِنِينَ، خَبِّرِينِي عَنْ عَيْشِكُمْ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ قَالَتْ: تَسْأَلُونَا عَنْ عَيْشِنَا عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مَا شَبِعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ هَذِهِ الْحَبَّةِ السَّمْرَاءِ، ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ لَيْسَ بَيْنَهُنَّ جُوعٌ، وَمَا شَبِعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ هَذَا التَّمْرِ، حَتَّى فَتْحَ اللَّهُ عَلَيْنَا قُرَيْظَةَ وَالنَّضِيرَ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. এ হাদীস থেকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারের জীবিকা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। তাঁরা প্রয়োজনের চাইতে অনেক কম রিয্‌ক আহার করে জীবন কাটাতেন। একাধারে তিনদিন পেটভরে খেতে পান নাই, বরং ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাটিয়ে দিতেন। এরূপ অভাব-অনটন ও ক্ষুধা-দারিদ্র তিনিই আবেদন করে এনেছিলেন। নতুবা মহান আল্লাহ্ তাঁর জন্যে সারা বিশ্বের ধন-ভাণ্ডার প্রদান করতে চেয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, যদি আপনি চান তাহলে পাহাড়সমূহ স্বর্ণে পরিণত করে দিতে পারি যা আপনার সাথে সাথে চলতে থাকবে। কিন্তু তিনি জানতেন, দুনিয়ার নিয়ামত তো ক্ষণস্থায়ী, আর পরকালে যা পাওয়া যাবে তা হবে চিরস্থায়ী এ বিশ্বাসের কারণেই তিনি পরকালীন নিয়ামতকে ইহকালীন নিয়ামতের উপর প্রাধান্য দেন।

২. এ হাদীছটির সঙ্গে অপর একটি বর্ণনাকে সাংঘর্ষিক মনে হয়। তাতে বলা হয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারবর্গকে এক বছরের খাবার একসঙ্গে দিয়ে দিতেন। সে হিসেবে তো তাদের উপোস থাকার কথা নয়। অথচ এ হাদীছে বলা হয়েছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাত পর্যন্ত কখনও পরপর দু'দিন যবের রুটিও পেট ভরে খেতে পাননি?

প্রকৃতপক্ষে উভয়ের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব নেই। কেননা বনূ নাযীর ও খায়বারের সম্পত্তি হাতে আসার পর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারবর্গের এক বছরের খাবার দিয়ে দিতেন বটে, কিন্তু তা যে এক বছর জমা থাকত এমন নয়। কেননা যখনই কোনও মেহমান আসত কিংবা অন্য কোনও জরুরত দেখা দিত, তখন তা থেকেই খরচ করতেন। আর মেহমান তো নিয়মিতই তাঁর কাছে আসত। বিভিন্ন এলাকার প্রতিনিধিবর্গ দলে দলেই তাঁর কাছে আসতে থাকত। তাদেরকে খাওয়ানো ছাড়াও বিদায়কালে তাদের পাথেয়ও দিয়ে দিতেন। তাতে দেখা যেত এক বছরের খাবার অল্প দিনেই শেষ হয়ে যেত। আর সে কারণেই তাদেরকে প্রায়ই অনাহারে দিন কাটাতে হতো।

বস্তুত তাঁর এ কৃচ্ছতা ছিল ইচ্ছাজনিত। আল্লাহ তা'আলা তো তাঁকে এই এখতিয়ার দিয়েওছিলেন যে, তিনি চাইলে মক্কার পাহাড়গুলোকে তাঁর জন্য সোনায় পরিণত করে দেওয়া হবে এবং তিনি যখন যেখানে যাবেন তা তার সঙ্গে চলতে থাকবে। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। দারিদ্র্যকেই বেছে নিয়েছেন। তারপরও যখন যা হাতে আসত তাতে অন্যদের প্রাধান্য দিতেন।

তাঁর এ কর্মপন্থার মূল কারণ ছিল দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তি। তাঁর চোখে দুনিয়া ছিল অতি তুচ্ছ। দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় আসবাব-উপকরণ তাঁর কাছে এমনকিছু মূল্যবান ছিল না, যার আকাঙ্ক্ষা করা যেতে পারে। এ জীবনপদ্ধতি দ্বারা তিনি উম্মতকেও দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত থাকার উৎসাহ যুগিয়েছেন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. অভাব-অনটনে কাতর হতে নেই। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো অভাবের জীবনই বেছে নিয়েছিলেন।

খ. আমরা যে নিয়মিত দু'বেলা খাবার পাচ্ছি, সেজন্য প্রাণভরে শোকর আদায় করা উচিত। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারবর্গ অনাহারের কত কষ্টই না সহ্য করেছেন!
২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান