আখলাকুন্নবী (ﷺ)

কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ

হাদীস নং: ৮৫৪
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
নবী (ﷺ) পার্থিব বস্তুর প্রতি অনাসক্ত, ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে নিজের তুলনায় অপরকে প্রাধান্য দিতেন, দুর্বলদের মাঝে সম্পদ বণ্টন করে দিতেন। দানশীলতা আর অল্পে তুষ্ট থাকা ছিলো তাঁর স্বভাবজাত গুণ। তিনি পার্থিব বস্তুর চাইতে পরকালীন বিষয়কে অধিক ভালবাসতেন। এ ছাড়া তিনি কোন যাঞ্চাকারীকে কখনোই খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না, কোন আবেদনকারীকেই নিষেধ করতেন না। আল্লাহ্ তাঁর উপর, তাঁর বংশধরদের উপর ও তাঁর মহীয়সী স্ত্রীদের উপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।
৮৫৪। হযরত (আব্দুল্লাহ্) ইব্‌ন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর গোসলখানার মত একটি কক্ষে প্রবেশ করে দেখলাম যে, তিনি চাটাইয়ের উপর ঘুমিয়ে আছেন। তাঁর (শরীর মুবারকের) দু'পাশে চাটাইয়ের দাগ সুস্পষ্ট। এ অবস্থা দেখে আমি কেঁদে ফেললাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আব্দুল্লাহ্! তুমি কাঁদছো কেন? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! পারস্য ও রোম সম্রাট কিস্‌রা ও কায়সার রেশমী ও সোনালি গালিচায় আরামে দিন কাটাচ্ছে। (আর আপনার এই অবস্থা) তিনি বললেন, হে আব্দুল্লাহ্! কেঁদো না। দুনিয়া তো তাদের জন্যেই আর আমাদের জন্যে রয়েছে পরকাল। দুনিয়া ও আমার উদাহরণ তো ঐ ব্যক্তির মতই যে ব্যক্তি কোন গাছের ছায়াতলে বিশ্রাম করতে নামল তারপর তা ছেড়ে চলে গেল।
أبواب الكتاب
بَابٌ: ذِكْرُ زُهْدِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَإِيثَارِهِ الْأَمْوَالَ عَلَى نَفْسِهِ، وَتَفْرِيقِهَا عَلَى الْمُخْفِينِ مِنْ أَصْحَابِهِ إِذِ الْكَرَمُ طَبْعُهُ، وَالْبُلْغَةُ مِنْ شَأْنِهِ، وَالْقَنَاعَةُ سَجِيَّتُهُ، وَاخْتِيَارِهِ الْبَاقِي عَلَى الْفَانِي، وَأَنَّهُ مِنْ عَادَتِهِ أَلَا يَرُدَّ سَائِلًا، وَلَا يَمْنَعَ طَالِبًا، صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ.
854 - أَخْبَرَنَا ابْنُ أَبِي عَاصِمٍ، نَا الْحُسَيْنُ بْنُ عَلِيٍّ، نَا يَحْيَى بْنُ سُلَيْمَانَ الْجُعْفِيُّ، نَا عَمْرُو بْنُ عُثْمَانَ، حَدَّثَنِي عَمِّي عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ مُسْلِمٍ أَبُو مُسْلِمٍ صَاحِبُ الْأَعْمَشِ، عَنِ الْأَعْمَشِ، عَنْ حَبِيبِ بْنِ أَبِي ثَابِتٍ، عَنْ أَبِي عَبْدِ الرَّحْمَنِ السُّلَمِيِّ، عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ، قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي غُرْفَةٍ لَهُ، كَأَنَّهَا بَيْتُ حَمَامٍ، وَهُوَ نَائِمُ عَلَى حَصِيرٍ، قَدْ أَثَّرَ بِجَنْبَيْهِ، فَبَكَيْتُ، فَقَالَ لِي: مَا يُبْكِيكَ يَا عَبْدَ اللَّهِ؟ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ كِسْرَى وَقَيْصَرُ فِي الْحَرِيرِ وَالدِّيبَاجِ، فَقَالَ لِي: لَا تَبْكِ يَا عَبْدَ اللَّهِ فَإِنْ لَهُمُ الدُّنْيَا، وَلَنَا الْآخِرَةُ، وَمَا أَنَا وَالدُّنْيَا، وَمَا مَثَلِي وَمَثَلُ الدُّنْيَا، إِلَّا كَرَاكِبٍ نَزَلَ تَحْتَ شَجَرَةٍ، ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا

হাদীসের ব্যাখ্যা:

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দারিদ্র্য ভালোবাসতেন। তিনি স্বেচ্ছায় দারিদ্র্যের জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর খাওয়া-পরা এবং জীবনাচারের সবকিছুই ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। খেজুর পাতার চাটাইয়ে শুইতেন। তাতে তাঁর শরীরে চাটাইয়ের বুননের ছাপ পড়ে যেত, যেমন এ হাদীছে বলা হয়েছে। কখনও তিনি খাটেও শুতেন। কিন্তু তা কেমন খাট? সে খাটের ছাউনী ছিল রশির। তাঁর শরীরে সে রশির দাগ বসে যেত। তাঁর পবিত্র শরীর ছিল অত্যন্ত কোমল। হযরত আনাস রাযি. বলেন-
ما مَسسْتُ شَيْئًا قط را وَلا حَرِيرًا ألين مِنْ كفْ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতের চেয়ে বেশি কোমল কোনওকিছু কখনও স্পর্শ করিনি। না রেশম, না অন্যকিছু।

মানুষ হাত দিয়ে কাজকর্ম করে থাকে। তাই অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় হাত বেশি শক্ত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সে হাতই যখন এমন কোমল ছিল, তখন তাঁর পবিত্র দেহের অন্যান্য অঙ্গ কেমন কোমল ছিল? এমন কোমল শরীরের জন্য তো কোমল বিছানাই দরকার। অথচ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যবহার করতেন শক্ত বিছানা। শরীরের আরামের প্রতি তাঁর কোনও খেয়াল ছিল না। কিন্তু সাহাবীগণ তো তাঁকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। তাঁর শরীরে চাটাইয়ের দাগ কিভাবে তারা মেনে নেবেন? তিনি নিজে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করলেও তাদের পক্ষে তা ছিল অসহনীয়। তাই ইব্‌ন মাসউদ (রা) কেঁদে কেঁদে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! পারস্য ও রোম সম্রাট কিস্‌রা ও কায়সার রেশমী ও সোনালি গালিচায় আরামে দিন কাটাচ্ছে। (আর আপনার এই অবস্থা!)

অন্য বর্ণনায় আছে, এর উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- ما لي وللدنيا؟ (দুনিয়ার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?)। অর্থাৎ দুনিয়ার প্রতি আমার কোনও মহব্বত ও ভালোবাসা নেই। দুনিয়াও নয় আমার সঙ্গী। কাজেই আমি দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হব কী কারণে? অথবা এর অর্থ- দুনিয়া ও আমার মধ্যে মিলটা কোথায় যে, আমি তাতে লিপ্ত হয়ে পড়ব? এর সাদামাটা অর্থ এমনও হতে পারে যে, দুনিয়া দিয়ে আমার কোনই প্রয়োজন নেই। কিন্তু তিনি দুনিয়ায় বাস তো করতেন। সে হিসেবে একটা সম্পর্ক ছিলই। তবে সে সম্পর্ক আমাদের মত নয়। তিনি সে সম্পর্কের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন-
(দুনিয়ায় তো আমি একজন মুসাফিরস্বরূপ, যে কোনও গাছের নিচে ছায়া গ্রহণ করে, তারপর তা ছেড়ে চলে যায়)। অর্থাৎ দুনিয়া স্থায়ীভাবে থাকার জায়গা নয়। এটা আরামের ঠিকানা নয়। এটা তো অতিক্রম করে যাওয়ার নিবাস। এর বাসিন্দা অবিরত এ ঠিকানা পার হয়ে যাচ্ছে। সে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে আখিরাতের দিকে। সুতরাং এ দুনিয়ায় মানুষ হল একজন মুসাফিরের মত। সে পথিমধ্যে কোনও গাছতলায় বিশ্রাম নেয়। রোদের তাপ থেকে বাঁচার জন্য গাছের ছায়ার আশ্রয় গ্রহণ করে। তারপর রোদের তাপ কিছুটা কমে আসলে আবার যাত্রা শুরু করে এবং ক্ষণিকের সে বিশ্রামস্থল ছেড়ে চলে যায়। তো এই যখন দুনিয়ার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের অবস্থা, তখন এই দুনিয়ার আরাম-আয়েশে পড়ে যাওয়া আমার পক্ষে সাজে কি?

প্রকাশ থাকে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথা বলার উদ্দেশ্য দুনিয়া ত্যাগ করা নয়; বরং দুনিয়ার ভালোবাসা ত্যাগ করা। ক্ষণিকের জন্য হলেও গাছের যে ছায়ায় অবস্থান করার প্রয়োজন হয়, সে ছায়াকে তো সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করা চলে না। বরং ছায়া সন্ধান করতে হয়। তা মিলে যাওয়ার পর হেফাজতও করতে হয়। অর্থাৎ কোনওভাবে যাতে তা নষ্ট না হয় এবং বিশ্রামের উপযুক্ত থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হয়। ঠিক তেমনি দুনিয়া আমাদের পক্ষে মুসাফিরখানা হলেও কিছুক্ষণের জন্য উপকারী তো বটে। তাই কিছুক্ষণ যাতে স্বস্তিতে ও নিরুপদ্রবে থাকা যায় সেজন্য একটা স্থান অবশ্যই চাই।

কাজেই দুনিয়ার প্রয়োজনীয় আসবাব-উপকরণ অবশ্যই অর্জন করতে হবে। অর্জিত হওয়ার পর যাতে অযথা নষ্ট না হয় সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। তবে সর্বাবস্থায় জীবনের আসল লক্ষ্যবস্তু হবে আখিরাতের স্থায়ী ঠিকানা। দুনিয়ার আসবাব-উপকরণের সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহার এমনভাবে করতে হবে, যাতে এর দ্বারা সে আসল ঠিকানা হাতছাড়া না হয়; বরং তা অর্জনের পক্ষে সহায়ক হয়।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. এ হাদীছ আমাদেরকে দুনিয়ার প্রেম-ভালোবাসায় লিপ্ত না হওয়ার উৎসাহ যোগায়।

খ. দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতায় লিপ্ত হওয়া প্রকৃত নবীপ্রেমিকের পক্ষে সাজে না।

গ. দুনিয়ায় যতদিন থাকা হয়, ততদিন নিজেকে একজন মুসাফিরের বেশি কিছু ভাবা উচিত নয়।

ঘ. দুনিয়ার এ অস্থায়ী ঠিকানা যখন গাছের ছায়াতুল্য, তখন একে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা চলে না। ক্ষণিকের জন্য হলেও ঈমান ও ইজ্জত নিয়ে থাকার একটা ব্যবস্থা করা চাই।

ঙ. দুনিয়াকে অবশ্যই গাছের ছায়াতুল্য গণ্য করব, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে এর আসবাব-উপকরণ নষ্ট করব না।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)